পুচ্ছ-ধারী ময়ূরেরা || শিল্পী নাজনীন
৭.
ধার-দেনা করে প্রায় ছয় লাখ টাকা বিজলির মামাকে পাঠানো হয়েছে গেল সপ্তায়। একমাসের মধ্যে ভিসা চলে আসবে, বলে দিয়েছেন তিনি। এরমধ্যেই বারিষকে হাজার তিরিশেক টাকা পাঠাতে হয়েছে শফিককে। মেঘার ফোন পেয়ে ভীষণ লজ্জায় পড়েছিল সেদিন সে। মেঘা অবশ্য খুব আন্তরিকভাবেই কথা বলেছিল তার সঙ্গে, বরাবরের মতই খুব স্বাভাবিক ছিল মেঘা, শুধু বারিষের টাকাটা যে জরুরি দরকার সেটা মনে করিয়ে দিয়েছিল, সেই সাথে এ-ও বলেছিল যে শফিকের যদি খুব বেশি সমস্যা থাকে তাহলে বরং এখন না পাঠিয়ে পরে সমস্যা মিটলে পাঠাতে। সে তাহলে কোনোভাবে ম্যানেজ করে নেবে তখনকার মত। মেঘার কথায় ভীষণ লজ্জায় পড়ে গেছিল শফিক। নিজের বিদেশ যাওয়ার কথা আর শেষ পর্যন্ত মেঘাকে বলা হয়নি তার। পাছে মেঘা মনে করে বসে যে, বারিষের টাকাটা ইচ্ছে করে আটকে রেখে টাকা না দেওয়ার বাহানা খুঁজছে শফিক। সে বরং মেঘাকে বলেছিল, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বারিষকে টাকাটা অবশ্যই পাঠিয়ে দেবে সে।
আগে কখনো মুখ ফুটে টাকা চায়নি মেঘা বা বারিষ। এবার যখন চাইছে, নিশ্চয়ই জরুরি কোনো দরকার আছে তাদের। শফিক তাই টাকাটা পরে দেবে বা কদিন দেরিতে দেবে, তেমন কিছুই বলতে পারেনি মেঘাকে। টাকাটা জোগাড় করতে অবশ্য অনেক কষ্ট হয়েছে তার। তবু পাঠিয়েছে। চাচার মৃত্যুর পর এই উপার্জনটুকুই একমাত্র সম্বল ছিল তনি চাচির। বাবা সেটা জানতেন। তাই নিজের হাজারো সমস্যা উপেক্ষা করেও তনি চাচির প্রাপ্য অংশটুকু আগে দিতেন বাবা হযরত আলী। তনি চাচি এখন নেই। হযরত আলীও এখন না থাকার মতই প্রায়। জায়গাজমি সব শফিকের তত্ত্বাবধানে। ফলে কাকার ভাগের অংশটুকুও শফিকই নিজ দায়িত্বে লিজ দেয় কিংবা লোক দিয়ে চাষ করায়, তারপর সময়মত লিজের অথবা জমিতে উৎপাদিত ফসল বিক্রির টাকাটা পাঠিয়ে দেয় বারিষকে। বাবার মতই বারিষকে টাকা পাঠাতে কখনো দেরি হয়নি তারও। বরং মেঘাদের টাকাটা আগে সে-ও সবসময় আগেই পাঠিয়ে দেয়, তার নিজের যত সমস্যাই থাকুক কাকার ভাগের টাকাটা পাঠাতে কখনো ভুল হয় না তার। এবার বিদেশ যাওয়ার ডামাডোলে টাকা পাঠানোর কথাটা বেমালুম ভুলে গেছিল শফিক। মেঘার ফোন পেয়ে তড়িঘড়ি করে টাকাটা পাঠিয়েই ভাবনাটা পেয়ে বসল তাকে। চিন্তায় পড়ল শফিক।
এই যে বিদেশ চলে যাবে শফিক, এতগুলো টাকা যোগাড় করে জমা দিয়ে দিল শেষমেশ, কিন্তু কাকার জমিগুলার কী ব্যবস্থা করে রেখে যাবে সে?কে দেখবে সেসব? বাবার জমিজিরাত ধরতে গেলে শফিকের নিজেরই এখন, সেগুলো না হয় বিজলির বাপের জিম্মায় রেখে যাবে সে, কিন্তু কাকার অংশ?বিজলির বাপের যা ফন্দিফিকির, তাতে তার ভরসায় জমি রেখে যাওয়া চরম বোকামি। দখল করে ফেলবে নির্ঘাত। আর নয়ত লিজের টাকা নিজের মনে করে আত্মসাৎ করবে, শফিক কিচ্ছুটি জানতেও পারবে না। মাঝখান থেকে বিপদে পড়বে বারিষ আর মেঘা, লজ্জায় পড়বে শফিক নিজে। তাহলে কী করা যায় এখন? মেঘার সঙ্গে একবার কথা বলতে পারলে বেশ হত। বারিষের সঙ্গে কথা না বলাই ভালো, সে এখনো অতটা বুঝতে শেখেনি, এসব ব্যাপারে তাই তাকে না জড়ানোই ভালো মনে হল শফিকের। বরং ব্যাপারটা নিয়ে মেঘার সঙ্গে খোলাখুলি আলাপ করাটাই যৌক্তিক মনে হল তার। সে তাই মেঘাকে ফোন দিল চুপিসারে। একবার বাজতেই ফোনটা ধরল মেঘা। নরম, মৃদুকণ্ঠে বলল, হ্যালো, শফিক?
হ্যাঁ, মেঘা। তুই কি ব্যস্ত? জরুরি কিছু কথা ছিল তোর সঙ্গে।
অফিসে ছিল মেঘা, ব্যস্ততা ছিল না তেমন। সে আর শফিক সমবয়সী। ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে বড় হয়েছে তারা, পরস্পরকে নাম ধরেই ডাকে বরাবর, তুই-তোকারি সম্পর্ক তাদের। তবু জীবন বড় অদ্ভুত। সময়ের খেয়ালি ধূলো কবে কবে যেন ঝাপসা আর ম্লান করে দিয়েছে সম্পর্কটাকে, সহজ সম্পর্কটার মাঝখানে দুজনের অজান্তেই তুলে দিয়েছে অনাকাঙ্ক্ষিত অস্বস্তির দেয়াল। শফিকের ফোনে তাই মনে মনে অবাক আর অপ্রস্তুত হল মেঘা। গত সসপ্তায় সে নিজেই ফোন দিয়েছিল শফিককে, মনে পড়ল। কিন্তু বারিষ তো বলল টাকাটা তাকে পাঠিয়ে দিয়েছে শফিক, তাহলে আবার কেন ফোন করল শফিক? কী এমন জরুরি কথা তার মেঘার সঙ্গে? মুহূর্তেই ভাবনাগুলো মনের ভেতর বুদবুদ তুলেই মিলিয়ে গেল আবার। একমুহূর্ত সময় নিল মেঘা, বুকভরে শ্বাস নিল একবার, তারপর আগের মতই স্বাভাবিক স্বরে বলল, না না, ব্যস্ত নই তেমন। বল কী বলবি, আমি অফিসে এখন।
মেঘার কথাটা শফিককে ভাবনায় ফেলল খানিক। মনে হল মেঘা যেহেতু অফিসে এখন, সেহেতু এখন জমি-জায়গার মত ঝামেলার বিষয়ে কথা না বলাই ভালো। তারই ভুল। মেঘা এ সময়ে অফিসে থাকবে সেটা মাথায় রাখা উচিত ছিল তার। সে সাথে সাথেই বলল, তাহলে এখন থাক মেঘা। আমি বরং রাতে ফোন করব তোকে। কিংবা বাসায় গিয়ে তুই ফ্রি হয়ে ফোন দিস আমাকে। পারিবারিক ব্যাপার তো, অফিসে কথা না বলাই ভালো।
আচ্ছা শফিক। আমি বরং রাতেই ফোন দেব তোকে। কোনো সমস্যা হয়েছে কোথাও? কাকা ভালো আছে তো?
হ্যাঁ রে, আব্বা ভালো আছে। না না, কোনো সমস্যা হয়নি, এমনিতেই একটা ব্যাপারে তোর আর বারিষের মতামত দরকার, সেটা নিয়ে কথা বলতে চাই আর কী।
আচ্ছা। তাহলে রাতে কথা হবে। বাই।
বাই।
ফোনটা কেটে দিয়ে বড় করে একটা শ্বাস টানে শফিক। দীর্ঘশ্বাস গড়ায়। একে একে সব বাঁধন কাটতে হবে তাকে। বেছে নিতে হবে মধ্যপ্রাচ্যের ভীষণ অপছন্দের কামলা জীবন। দাঁতে দাঁত কামড়ায় সে। হোক। তবু যাবে। বিজলিকে একটা শিক্ষা দিতে চায় শফিক, চরম শিক্ষা। লোভী, চতুর নারীর চেয়ে বরং সাপ শ্রেয়। ভেবেই মনে মনে থমকায়। তুলনাটা মনে হয় ভুল হল, বিজলি আশেপাশে থাকলে ইদানীং ভারি অস্বস্তি হয় তার, মনে হয় বিষধর কোনো সাপ কিলবিল করছে চারপাশে, ছোবল দেবে তাকে যে কোনো মুহূর্তে।
এখন শুধু ভিসার জন্য অপেক্ষা। ভিসা এলেই যে কোনো দিন উড়াল দেবে সে। তারপর বিজলিকে সে হিসাবটা বোঝাবে ভালোমত। কিন্তু দেশের অবস্থা টালমাটাল। কোটা আন্দোলনে উত্তাল সারাদেশ। যার আঁচ এসে লেগেছে এই অজপাড়াগাঁয়েও। ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে রাজনীতির হাওয়া। রাজনীতিতে আগ্রহ নাই শফিকের, বোঝেও না তেমন কিছু। তবু বাতাসে কী যেন একটা গন্ধ ভাসে আজকাল। তার মত নিতান্তই সাধারণ, ছাপোষা মানুষও বোঝে দাবানলের পূর্বাভাস। কিন্তু কী আশ্চর্য! সরকার নির্বিকার! তারা বোঝে না ক্রমশ বাড়তে থাকা জনরোষ, হাওয়ার বিরুদ্ধ গতি। ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার মরিয়া প্রচেষ্টা অন্ধ করে দেয় তাদের। কিন্তু অন্ধ হলেও প্রলয় তাতে বন্ধ থাকে না, শফিকের মত আমজনতার কাছে দিবালোকের মত বিষয়টা স্পষ্ট হলেও আওয়ামী সরকারের চোখে তা অমাবস্যার অন্ধকারে ঢাকা থাকে, থাকে পুরোপুরি অদৃশ্য। কী অদ্ভুত! নিজের মনেই বিড়বিড় করে শফিক।
****************************
