জুবুথুবু খরগোশ ছানা
নুসরাত সুলতানা
বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইমার্জেন্সি কক্ষ। হেমন্তের রাত এগারোটা। সেই রাতে জোছনার প্লাবনে মাঠ-ঘাট ভেসে যাচ্ছে। তনুজাকে শুইয়ে দেয়া হয়েছে। স্টিলের দুই পাতে দুইদিকে দুটো পা। একজন বড় গোঁফ ওয়ালা মাঝারি উচ্চতার শ্যামবর্ণের ডাক্তার তনুজার যোনীতে তর্জনী আঙুলের এক কড় প্রবেশ করিয়ে বলছে- কোন পর্যন্ত ঢুকাইছে? এই পর্যন্ত? এরপর দুই কড় ঢুকিয়ে বলছে- নাকি এই পর্যন্ত? এরপর অই ডাক্তার পুরো আঙুল প্রবেশ করিয়ে দেয় অই রক্তাক্ত যোনীপথে। ডাক্তার তনুজাকে জিজ্ঞেস করে আর মধ্য বয়স্ক নার্সের দিকে আড়ে আড়ে তাকায়। তনুজার শরীর তখন একেবারে নেতিয়ে গেছে সারাদিনের রক্তপাতে। ফ্যাকাসে, ভীত মেয়েটি কোনো কথা বলে না। শুধু ডাক্তারের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। কিভাবেই বা বলবে- ১১ বছরের মেয়েটির তখনও মাসিক ঋতুস্রাব হয়নি। সে তো জানে না কিভাবে শিস্ন কতদূর অবধি তার যোনীতে গিয়েছিল। শুধু জানে উদ্দীপক যখন শিস্ন প্রবেশ করিয়েছে তখন তার খুব জ্বলে যাচ্ছিল। তনুজা চিৎকার করে বলছিল – ও উদ্দীপক দাদা মোরে ছাইড়রা দ্যান। মুই মইররা যামু। উদ্দীপক বলেছিল- আর ইট্টুখানি। এহন তো তোরও অয়নায়, মোরও অয়নায়। তনুজা বলেছিল- কী অইবে? কোন সময় অইবে?
উদ্দীপক যখন ছেড়ে দেয় তখনই শুরু হয় রক্তপাত। অই ধর্ষক তখন নিজের গায়ের স্যান্ডো গেঞ্জি খুলে তনুজার যোনীর রক্ত মুছে বলে- নে এই গেঞ্জিডা ধুইয়া দিস। বেরিয়ে যায় উদ্দীপক। আর বলে যায় কেওরে কবি না যে তোরে খেলছি। কইলে তোরে খুন করমু যেকোনো দিন।
উদ্দীপক বেরিয়ে গেলে তনুজা দেখতে পায় তার যোনী থেকে গলগল করে রক্ত বেরুচ্ছে। সে তার শাহিনুর চাচীকে বলে- ও কাকীমা মোর এত রক্ত বাইর অয় ক্যা? শাহিনুর বলে- অ বড় অইলে অইরহম অয় মাগো। তোমার জাইঙ্গা আছে? হেলে একটা ন্যাকড়া দিয়া থো। আফায় স্কুইলদা আইলে মুই কমু হানে।
বারবার টয়লেটে গিয়ে রক্ত ধুয়ে ফেলতে থাকে তনুজা। মা শাহানা বেগম স্কুল থেকে আসে চারটায়। মা’কে তনুজা বলে তার শুধু রক্ত বাইর হয়। শাহানা কোমরে একটা রশি বেঁধে তার সাথে পুরোনো ন্যাকড়া বাঁধা শিখিয়ে দেয়। নব্বইয়ের দশকে গ্রামে-গঞ্জে ঋতুবতী হলে এমনই ছিল ব্যবস্থা। সন্ধ্যা নাগাদ রক্তে ভেসে যেতে থাকে তনুজা। শাহানা প্রথমে অনেকক্ষণ জেরা করে মেয়েকে কেউ তাকে ছুঁয়েছে কি না। ঘরে কেউ এসেছে কি না। বিভিন্ন কীরা কাটায়। তনুজা বলে না। বহুবার বলে না। এরপর শাহানা জানায় তার ব্যাংকের দ্বিতীয় শ্রেনীর কর্মকর্তা স্বামী আলতাফ খানকে। আলতাফ শিখিয়ে দেয় মেয়েকে ভালো করে জিজ্ঞেস করো। এক পর্যায়ে শাহানা বলে তোর আতে কোরান শরীফ উডাইয়া দিমু।
তখন তনুজা চিৎকার করে বলে – মোরে উদ্দীপক দাদায় এইরহম করছে। শাহানাও চিৎকার করে বলে- তুই জোরে জোরে আয়াতুল কুরসী পড়লি না ক্যা? আর চিক্কইর দিলি না ক্যা? দ্রুত স্থানীয় বাজারে গিয়ে আলতাফ হোমিওপ্যাথি ডাক্তারের সাথে কথা বলে ঔষধ আনে। কিন্তু তনুজার যোনী থেকে রক্তের বন্যা বইতে শুরু করে। রাত নটায় তনুজা হাত-পা ছেড়ে দেয়। তখনই আলতাফ রিক্সা ডেকে নিয়ে মেয়েকে নিয়ে যায় শেরই বাংলা মেডিকেল কলেজ। ধবধবে ফর্সা তনুজাকে চাঁদের আলোয় একেবারে লাশের মতো ফ্যাকাশে লাগে। শাহানা কাঁদতে কাঁদতে স্রষ্টার কাছে বিচার দেয়। আমার দুধের সরের মতো মাইয়ারে যে এইরহম করছে আল্লাহ তুমি হ্যার বিচার করো। হাসপাতালে পৌঁছানোর পরে রক্তপাত বন্ধের ঔষধ দেয় ডাক্তার।
০২.
আলতাফ খানরা চার ভাই। দুই ভাই বাড়িতে থাকে। দুই ভাই দূর শহরে থাকে। উদ্দীপকের বাবা এবং আলতাফ খান একই বাড়ি থাকে। উদ্দীপকের মা আর শাহানা বেগমের খুটিনাটি বিষয়ে ঝগড়াঝাটি লেগে থাকলেও দুই ভাইয়ের আসা যাওয়া, নেওয়া- থোওয়া, নেমতন্ন খাওয়া আছে এ যাবৎ। আলতাফ এবং শাহানা উদ্দীপককে অনেক স্নেহ করে। কারণ উদ্দীপকের মা ছোট ছেলেকে বেশি আদর করে উদ্দীপকের চাইতে। ছোট ছেলে বেশি মেধাবী তাই। এই কারণেই শাহানা এবং আলতাফ উদ্দীপককে অনেক স্নেহ করত সবসময়ই। আবার শাহানার বড় ছেলে তন্ময়ের সাথে উদ্দীপকের খুব ভালো বন্ধুত্ব। সারাদিন প্রায় একই সাথে থাকে উদ্দীপক আর তমাল।
উদ্দীপকের বিরুদ্ধে এর ভেতরই বাড়ির অন্যান্য কিশোরীদের ওপর যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে।
এই নিপীড়ক বিভিন্ন মেয়েকে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের আহবান জানাতো এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে হাত দিত। তনুজা যখন বাড়ির পুকুর ঘাটে থালা-বাসন ধুতে যেত তখন উদ্দীপক লুঙ্গি উঁচিয়ে শিস্ন দেখাতো। আরও বিভিন্ন অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করতো। তনুজা তখন উদ্দীপককে লাথি দেখাতো, ভেঙাতো রাগে এবং জিদে। একদিন ভর সন্ধ্যায় তনুজা গ্রামের স্কুল থেকে ফিরছিল তখন উদ্দীপক একদম একা পেয়ে যায় তাকে। অমনি স্কুলের দেয়ালের সাথে ঠেসে ধরে বলে-তুই মোরে লাতি দেহাও ক্যা? ভ্যাঙাও ক্যা? এহন যদি তোরে চুইদ্দা দিই তুই কী করবি? তোরে বাঁচাইবে কেডা? আরেকদিন পুকুরের সামনের ঘাটে পেয়ে বলে- তোরে একলা পাইলেই চুদমু। তনুজা বলে- আমনেহ এইসব বাজে কতা কন মুই কইয়া দিমু। অই ধর্ষক জিজ্ঞেস করে – কারে কবি? তনুজা বলে- মুই দাদারে কমু। অমনি উদ্দীপক হা হা হা করে বলে- তোর দাদায় মোরে কী করবে? অরে একটা বুজ দিয়া বওয়াইয়া থুমু।
ঘটনার দিন তনুজা ঘরে একদম একা ছিল। উদ্দীপক এটা টের পেয়েই দুপুর বারোটায় তনুজাদের ঘরে প্রবেশ করে সব দরোজা বন্ধ করে তাকে জোর করে শুইয়ে দেয়। এবং বিবস্ত্র করে যোনীতে শিস্ন প্রবেশ করায়। আর সদ্য গজিয়ে ওঠা স্তন গুলো অত্যন্ত জোরে মর্দন করে। তনুজা কোনোভাবেই শক্তিতে উদ্দীপকের সাথে পারে না। কারণ তনুজা পড়ে ষষ্ঠ শ্রেনীতে আর উদ্দীপক পড়ে বি. এ ফাইনাল বর্ষে। তনুজার যোনীতে যেন আগুন ধরে যায়৷ তখন হাত-পা ধরে মিনতি করে – মোরে ছাড়েন। আমনেহর পায়ে ধরি। উদ্দীপক তখন আরও জোরে জোরে ধর্ষণ চালিয়ে যায়। সে যেন আরও উল্লাসে এই কাজ করতে থাকে।এরপর একসময় নিজের খুশিমতো ছেড়ে দেয়।
০৩.
তিনদিন পর বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে বাড়ি আসে তনুজা। ডাক্তাররা শাহানা এবং আলতাফকে বলে দিয়েছে – তাদের মেয়ে একেবারে রক্তশূণ্য হয়ে গেছে। তাকে প্রচুর রক্ত উৎপাদনকারী খাবার খাওয়াতে হবে। দিয়েছে বহু রকম ভিটামিন এবং আয়রন ট্যাবলেট। তনুজা একেবারে চুপ হয়ে গেছে এবং নিজেকে সে ভীষণ অপরাধী ভাবতে শুরু করেছে।
ঘটনার দিন সন্ধায়ই আলতাফের বড় ভাই এবং ভাবীর পরামর্শে উদ্দীপককে বাড়ি থেকে পাঠিয়ে দেয় তার মা। যাতে কেইস ফাইল হলেও পুলিশ খুঁজে না পায়। বাড়ি ফিরে শাহানা যখন কেইস করার কথা বলে- তখন উদ্দীপকের মা বলে- মোর পোলার একলার দোষ? অর মাইয়ার খাউজানি ওটছে আর মোর পোলারে ভোলাইয়া নেছে। এলাকার মহিলারা- রোজিনা, মায়া, কোহিনূর এরা বিভিন্ন রকম টিপ্পনী কাটে শাহানাকে। মাইয়ায় চিক্কইর দেয়নায় ক্যা? আমনেহ মাইয়ার খোঁজ- খবর রাহেন নায়। মাইয়ায় কেলাসে ফাস্টো অয় আরই কী চরিত্রেও এক নাম্বার? মাইয়া অই পোলার লগে বিয়া দিয়া দ্যান। কেস কামের কী দরকার? চাচাতো ভাইর লগে কত বিয়া অয়! বিয়ার পরও কত মাইয়ারা লেহাপড়া করে!
শাহানা বলে- আমার মাইয়া কেলাস সিক্সে পড়ে। এই মাইয়া আমি ক্যা বিয়া দিমু? আমার মাইয়া মেধাবী এম এ পাশ করবে। অমনি মহিলারা ঠোঁটে ভেংচি কাটে। শাহানা আল্লাহকে ডাকে। কিন্তু আলতাফের বড় ভাই-ভাবীও বলে – কেস করলে আরও মাইয়ার সর্বনাশ! পোলার কী অইবে? বরং চুপ থাহো। মানসে জানি না জানে হেই ব্যবস্থা কর। দমে যায় শাহানা এবং আলতাফ।
০৪.
খুব ছোট হয়ে গেছে তনুজার জগৎ। সবসময়ই তাকে সংসারের কাজ, পড়ালেখা, নামাজ পড়া এসব নিয়ে থাকতে হয়। বাড়ির অন্য মেয়েরা যখন বউচি, হট্টিটি, দাঁড়িয়াবান্ধা খেলে তখন তনুজা হয় থালাবাটি মাজে, কাপড় তোলে, মুরগীর খোপ দেয়। তারপর ও এর পূর্বে কখনো কখনো চাচাতো বোনদের সাথে বউচি বা হট্টিটি খেলার সুযোগ পেতো । সেসব ও অই দুর্ঘটনায় বন্ধ হয়ে গেছে। শাহানা মেয়েকে পর্দা করায় আরও। কোরান তেলাওয়াত করয়ায় বেশি করে। তনুজা নিজেও নিজেকে পাপী এবং জাহান্নামি ভাবে। ভাবে সারাজীবনের জন্য তার গায়ে কলঙ্ক লেগে গেছে। আর কাঁদে নীরবে-নিভৃতে। উদ্দীপকের বোনদের সাথে বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল। একসাথে পুকুরে গোসল করতো, স্কুলে যেত, পোলা-পোলা খেলতো সেসব কিছুই আর হয় না। উদ্দীপকের বাবা প্রথমে বলে- এমন পোলা আমি কাইট্টা নদীতে হালাইয়া দিমু। কিন্তু উদ্দীপকের মা ছেলের জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। তনুজা একদিন ভর সন্ধ্যায় বাড়ির দক্ষিণ দিকের রাস্তায় একা হাঁটতে যায়। ফেরার সাথে সাথে শাহানা মেয়েকে কষে থাপ্পড় দেয় আর বলে- মাগী ওম্মে কোম্মে গেছিলি? তোরে যদি যাইত্তা ধরতে, তুই কী করতি!
সময় গভীর ক্ষতর দাগকেও হালকা করে দেয়। ঘটনার ছয় মাস পরে একদিন উদ্দীপক তন্ময়কে ইনিয়ে বিনিয়ে চিঠি লেখে। চিঠির ভাষ্য হল- আমার কিছুই করার ছিল না। আমি স্বাভাবিক অবস্থায় ছিলাম না। অরে দেইকখা আমার মাতা গরম অইয়া গেছিল! আমি ক্ষমা চাই। সারাজীবন আমি ছোট অইয়া থাকমু। তন্ময় জানায় বাবা-মা ‘কে। সবার মনের জ্বলুনি কমে যেতে থাকে। কেবল একটা জীবন তুষের আগুনে ক্ষয়ে যায়।
০৫.
রাত আড়াইটা- তিনটা হবে। জোরে চিৎকার করে ওঠে তনুজা। ছোট বোনকে পাশে নিয়ে ঘুমায় সে। ছোট বোন জড়িয়ে ধরেছে। অনবরত জিজ্ঞেস করছে- কী অইছে আফা? কী অইছে তোর! দৌড়ে আসে শাহানা, আলতাফ। তনুজা জানায়- কে যেন তার বুকে জোরে চাপ দেয় তারপর চিৎকার করতে গেলে গলা টিপে ধরে। শাহানা বলে তোরে কইছি- পেত্তেকদিন গঞ্জুল আরশ আর সুরা ইয়াসিন পড়বি। এহন আয়াতুল কুরসি পইড়রা বোহে ফু দিয়া ঘুমা।
নদীর স্রোতের মতো মহাকালের স্রোতও বয়ে যায়। উদ্দীপক আর তনুজা একই বাড়িতে বেড়ে উঠতে থাকে। উদ্দীপক বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায় মাঠ-ঘাট- বাজার -কলেজ সর্বত্র। তনুজা পড়াশোনা, সংসারের কাজ আর কালেভদ্রে বাড়ির মেয়েদের সাথে খেলার সুযোগ পায়। একদিন দুপুরে একা পুকুরে গোসল করতে যায়। শাহানা খুব বকা দিয়ে বলে- মাগী যদি মরতে তও আমি বাঁচতাম।
প্রায়ই দু: স্বপ্ন দেখে তনুজা। যতক্ষন না ঘুমিয়ে পারে চোখ মেলে রাখে। ভয়ে ঘুমায় না। শুধু মনে হয় ঘুমালেই কেউ তার বুক সজোরে চেপে ব্যাথা দেবে। চিৎকার করতে গেলেই গলা টিপে ধরবে। কিন্তু এই কথা সে কাউকে বলে না। নিজের পড়ালেখা, নামাজ পড়া, কোরান তেলাওয়াত করা এসব নিয়েই কেটে যায় সময়। শাহানার পাঁচ ছেলেমেয়ের কাপড় ধুয়ে নিজে নোংরা কাপড় পরে। সবচেয়ে ছোট মাছের টুকরোটা তার ভাগ্যে জোটে। মা বলে- তুই তো বড়, তুই বোজ। তথাপি বাবা তাকে রাজকন্যার মতো সম্মান করে, ভালোবাসে। এই এটুকু প্রশ্রয় আর জলেই তনুজার জীবন যেন তিরতির করে পুঁইলতার মতো লতিয়ে ওঠে। স্কুলে ক্যাপ্টেন নির্বাচিত হয়েছে তনুজা। একটু যেন সাবলীল হয়ে উঠছে। এরভেতরই সে ঋতুবতী হয়। শাহানা খুব সাবধান করে বলে দিয়েছে – কোনো ছেলের খুব গা ঘেঁষে যেন না বসে। স্তন ফুঁড়ে উঠছে তনুজার। কেউ তাকে অন্তর্বাস পরার কথা বলেনি। সে জামা-সেলোয়ার আর ওড়না পরে স্কুলে যায়। কিন্তু স্কুলের কোরিডোরে দৌড় দিলে স্তন একটু হলেও লাফায়। তখন ছেলে সহপাঠীরা টিপ্পনী কাটে – ডলাডলি করলে অনেককিছুই বড় অইয়া ওডে। বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান পেয়েছে যথারীতি। স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অনুজা উত্তম চরিত্রের পুরষ্কার পায়। এসব নিয়ে অনেক সহপাঠীদের ভেতর অনেকে বলে- বাপ ম্যানেজিং কমিটিতে থাকলে অনেক আকাম কইররাও উত্তম চরিত্রের পুরষ্কার পাওন যায়।
উদ্দীপক আর তন্ময় আবার বন্ধু হয়ে গেছে। কিন্তু তনুজাদের ঘরে উদ্দীপকের ঠাঁই হয় না তখনও। উদ্দীপকের বাবা খুব চেষ্টা করে যায়- সম্পর্ক ঠিক করতে। এও বলে- ভাই- ভাইয়ের মুখ দেখাদেখি কী চিরদিনের জন্য বন্ধ? তথাপি শাহানা কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেয় না। কালেভদ্রে উদ্দীপকের বোনদের সাথে তনুজা কথা বলে। তখন বাড়ির অন্য মেয়েরা তুমি অগো লগে কতা কবা না। অরা তোমার অনেক ক্ষেতি করছে। অরা তোমার শত্তুর। এইসব দম বন্ধ পরিবেশে থেকেও সবাইকে অবাক করে অষ্টম শ্রেনীতে বৃত্তি পেয়েছে তনুজা। বেশ ডাগর হয়ে উঠেছে সে। গায়ের রঙ আগেই ফর্সা ছিল। এখন আরো ফর্সা, সুন্দর হয়ে উঠেছে। উদ্দীপকের মা বিয়ের কথা বললে- শাহানা ঠোঁট বেঁকায়। বলে- বি. এ থাড ক্লাস পাওয়া ধর্ষকের লগে মাইয়া বিয়া দিমু ক্যা? তনুজা একটু স্বাভাবিক হয়ে আসে। একদিন হাসতে হাসতে মা’কে বলে – আম্মো সুরমা আফায় হ্যার লগের সবুইজজারে চিডি ল্যাকছে! অমনি শাহানা মেয়েকে বলে- তবুও হ্যারা তোর চাইতে ভালো। হ্যাগো গায়ে চরিত্র হীনের দাগ নাই। হঠাৎ বজ্রপাতের মতো তনুজা চুপ হয়ে যায়। এরপর নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করে- কখনো বিয়ে করবে না। জীবনে ব্যারিস্টার হয়ে অসহায় মেয়েদের পাশে দাঁড়াবে।
০৬.
এক শুক্রবার দুপুরে উদ্দীপকের মা এবং শাহানার উঠানে ধান শুকানো নিয়ে ঝগড়া বাঁধে। দুজনেই প্রচুর বাক্যবাণ ছোড়ে এবং গালি দেয়। উদ্দীপক তখন চাচী শাহানার পক্ষ নেয় এবং মা’ কে গালমন্দ করে। আর দূর থেকে বলে- কাকীমা আম্মার পক্ষ থেইকা আমি আপনের কাছে মাফ চাই। আপনে বাড়ির শিক্ষিত বউ, শিক্ষক মানুষ। অশিক্ষিত পঞ্চম শ্রেণী পাস মহিলাদের সাথে ঝগড়া করেন ক্যান? খুব খুশি হয়ে যায় শাহানা।
অই ঝগড়ার মাস দুয়েক পরেই আসে রোযার ঈদ। শাহানা চুলার কাছে পায়েস রান্না করছিল। পাশে বিভিন্ন কাজ করছে তনুজা। শাদা পাজামা-পাঞ্জাবি, সাডা টুপি পরে ঈদের নামাজ পরেই উদ্দীপক আসে তনুজাদের ঘরে। এসেই শাহানার পা জড়িয়ে ধরে বলে- কাকীমা আমারে মাফ কইররা দ্যান। আপনে মাফ না করলে আমি পা ছাড়মু না। আমি জানি মাফ পাওনের যোগ্য না। আজ থেইকা ও আমার বুইন। আমারে একবার সুযোগ দ্যান। শাহানা মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে বলে- মাফ করার মালিক আল্লাহ। তনুজা কেবল অবাক হয়ে দেখে আর ভাবে- আম্মো মাফ করার কেডা? আম্মোর লগে ও কী করছে!
আবার শাহানার পোলাও -কোরমা, পিঠা-পায়েস সবকিছুতে উদ্দীপকের ভাগ তৈরি হয়ে যায়। হরহামেশাই উদ্দীপক আসে তনুজাদের ঘরে। বরং তনুজাকেই বলা হয়েছে উদ্দীপক আসলে সে যেন ভেতর ঘরে চলে যায়। উদ্দীপক খুব বিনীত থাকে আলতাফ, শাহানা, তন্ময় এমনকি ছোটদের প্রতিও। শুধু তনুজা দেখে একজোড়া ঠান্ডা, কামুক হিংস্র চোখের লোলুপ দৃষ্টি। আর তখনই সে ভীত -সন্ত্রস্ত জুবুথুবু খরগোশ ছানার মতো দেয়ালের সাথে লেপটে যেত।
বহুদিন পর উদ্দীপক আবারও এক দুপুরে আসে তনুজাদের ঘরে। তনুজা তখন নবম শ্রেনীতে পড়ে। যথারীতি একা ঘরে। উদ্দীপক তখন তনুজাকে ফুসলিয়ে যৌন সম্পর্ক করতে চায়। তনুজা ভয় দেখায় চিৎকার করে লোক ডাকার। উদ্দীপক বলে- আমি তোরে ভালোবাসি। এহন আর ব্যাতা পাবি না। মজা পাবি। আমি বিয়া করমু তোরে। এই বলে জড়িয়ে ধরতে গেলে জ্যামিতি বক্সের কম্পাস ঢুকিয়ে দেয় উদ্দীপকের চোখে। উদ্দীপক যখন গোঙাতে থাকে তনুজা দৌড়ে যেতে থাকে মায়ের স্কুলের দিকে।
***************************
