সাম্য রাইয়ান: কবিতায় জঙ্গম বাসনার মায়াবী রূপক
কবি সাম্য রাইয়ান। নিজস্ব ভাষার চুনসুরকি ছড়িয়ে পথের অন্বেষণে শব্দময়তায় নিমগ্ন এক কবি মানস সাম্য রাইয়ান। বিন্দু থেকে বিসর্গ হয়ে অনিকেত এক পরিব্রাজক সাম্য রাইয়ান যার অবধারিত গন্তব্য হয়ে ওঠে মানুষ ও মানবমন। মনমানচিত্রের প্রতিকৃতি’র আয়োজনে সাম্য রাইয়ানের কাব্য ভাবনা ও শব্দশিল্পের কারুকাজকে প্রথম উপস্থাপন করা হচ্ছে।
সূচীপত্র
পরিচিতি
মনমানচিত্র-এর সাথে কথোপকথন
একগুচ্ছ কবিতা
সাক্ষাৎকার: লাবণী মণ্ডল
প্রবন্ধ:
অমিতাভ অরণ্য/ শামীমফারুক
বিপুল বিশ্বাশ/ হোসাইন মাইকেল
ধীমান ব্রহ্মচারী/ শামীম সৈকত
তানজিন তামান্না/ ড. সুশান্ত চৌধুরী
সৈয়দ আহসান কবীর/ মাহাদী আনাম
ড. অমিতাভ রায়/ প্রবাল চক্রবর্তী
ড. মধুমঙ্গল ভট্টাচার্য/ ফেরদৌস লিপি
পরিচিতি:
সাম্য রাইয়ানের জন্ম নব্বই দশকে; ডিসেম্বরের ৩০ তারিখ, বাঙলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলায়৷ স্কুলজীবনে কবিতা লেখার হাতেখড়ি৷ প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় ‘মঞ্চ’ পত্রিকায়৷ ২০০৬ থেকে লিটল ম্যাগাজিন ‘বিন্দু’ (www.bindumag.com) সম্পাদনা করছেন৷ কবিতা, মুক্তগদ্য ও প্রবন্ধ লেখেন৷ প্রকাশিত পুস্তিকা:বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা (কবিতা)সুবিমল মিশ্র প্রসঙ্গে কতিপয় নোট (গদ্য)মার্কস যদি জানতেন (কবিতা)হলুদ পাহাড় (কবিতা) প্রকাশিত বই:চোখের ভেতরে হামিং বার্ড (কবিতা)লোকাল ট্রেনের জার্নাল (মুক্তগদ্য)লিখিত রাত্রি (কবিতা)হালকা রোদের দুপুর (কবিতা) সম্পাদিত বই:উৎপলকুমার বসুজন্মশতবর্ষে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট: sammo.bangmoy.com
মনমানচিত্রের সাথে কথোপকথন
১। লিখিত রাত্রি ।। কবিতাগুলোর বুনন খুব সংহত, কিন্তু কবি’র অন্তর্লোক বড় ছত্রখান। কবি হিসাবে কী বলবেন?
উত্তর: ‘লিখিত রাত্রি’ অনেক মগ্নতার বই, অশেষ ভালোবাসারও। যা রচিত হয়েছিলো ২০১৫-র জুন ও জুলাই মাসে৷ এখন ভাবতে অবাক লাগে কী আশ্চর্য মগ্নতায় আমি রচনা করেছিলাম মাত্র এক/দেড় মাসে এই পঞ্চান্নটি কবিতা! অথচ ওই সময় আমি মানসিকভাবে খুবই ডিসটার্বড ছিলাম৷ চারদিক থেকে এত এত আঘাত— বারবার ভেঙে আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছিলাম৷ রচনার ছয় বছর বাদে ঘাসফুলের কল্যাণে পাণ্ডুলিপিখানা আলোর মুখ দেখেছিলো৷ এর মধ্যে কত সম্পাদনা, কত মাতামাতি এই সিরিজ নিয়ে!

পঞ্চান্ন পর্বের এই সিরিজজুড়ে আছে রাত্রির গল্প— অনেক রাত— রাতের পর রাত যা লিখিত হয়েছে— এক রাত্রিতে এসে তা মিলিত হয়েছে৷ সেখানে বিস্তৃত হয়েছে রাত্রির নিজস্ব আসবাব— কুকুর, পতিতা, নাইটগার্ড, পাখি, কবি, প্রেম, বিবাহ, ট্রাক ড্রাইভার…!
২। লোকাল ট্রেনের জার্নাল।। একেবারে গৃহস্ত ঘরের প্রেমিক ছেলেটি বুঝি আকুতিগুলো বলে যাচ্ছে একের পর এক। আপনার কী মনে হয়?
উত্তর: ‘কবিতার দুর্বোধ্যতা’ শীর্ষক প্রবন্ধে বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন, “কবিতা সম্বন্ধে ‘বোঝা’ কথাটাই অপ্রাসঙ্গিক। কবিতা আমরা বুঝিনে; কবিতা আমরা অনুভব করি। কবিতা আমাদের কিছু ‘বোঝায়’ না; স্পর্শ করে, স্থাপন করে একটা সংযোগ। ভালো কবিতার প্রধান লক্ষণই এই যে তা ‘বোঝা’ যাবে না, ‘বোঝানো’ যাবে না।” আমি বুদ্ধদেবের এ বক্তব্যের সাথে সম্পূর্ণ একমত৷ কবিতা আমরা অনুভব করতে পারি৷ এমত ভাবনা থেকেই ২০১০ সালের দিকে শুরু করেছিলাম এক নতুন খেলা— কবিতা বনাম কবিতা কবিতা খেলা! এ হলো সিরিজ গদ্য৷ প্রথম গদ্যটি লিখেছিলাম, ‘সময়ের অসহায় দাস’, যা পরে বাতিল করেছি৷ এরপর লিখেছি, ‘হাঁটতে হাঁটতে পথ গ্যাছে ক্লান্ত হয়ে’৷ এরপর ক্রমান্বয়ে আরো প্রায় দশ-বারোটি গদ্য লিখেছি৷ এই গদ্যগুলোতে আমি বাঙলা ভাষার বিশেষত নতুন সময়ের নতুন কবিদের কবিতা পাঠপরবর্তী অনুভব ব্যক্ত করেছি৷ এগুলো মূল্যায়নধর্মী গদ্য নয়৷ কখনো কবিতা পড়তে পড়তে আমার মধ্যে যে ভাবের উদয় হয়েছে, তা বিবৃত করেছি৷ আবার কখনো কোন কবিতা পড়ে ব্যক্তিগত কোন স্মৃতি মনে পড়েছে, তা-ই উল্লেখ করেছি৷ হুবহু, অকপটে!
৩। চোখের ভেতরে হামিংবার্ড।। বইটিতে কেমন একটা শ্লোকের মত ব্যাপার আছে, আর আছে কেমন একটা স্বস্তির ভাবে। এমনটা কীভাবে হলো- আগের বইয়ের ছেঁড়াছেঁড়া ভাবটি কোথায় গেল?
উত্তর: কবিকে আমার কেবলই মনে হয়- জীবনব্যাপী সম্পর্কশাস্ত্র বিষয়ে গবেষণা করে চলা ব্যক্তি৷ সে নানান সম্পর্ক- প্রাণের সাথের প্রাণের, প্রাণের সাথে প্রাণহীনের, ক্ষুদ্রপ্রাণের সাথে মহাপ্রাণের- সকল সম্পর্ক। এই প্রকারের সম্পর্ক স্থাপন-রক্ষা-চ্ছেদ-বিকাশ বিষয়েই মনে হয় জীবনের সকল গবেষণা৷ সেই সম্পর্কশাস্ত্রেরই এক রূপ ‘চোখের ভেতরে হামিংবার্ড’৷ এর উৎসর্গে লেখা আছে- ‘সোনামুখী সুঁই থেকে তুমি/ চুইয়ে পড়ো সুতো হয়ে/ নিচেই বিদ্ধ আমি/ সেলাই হই, তোমার সুতোয়।’
‘চোখের ভেতরে হামিংবার্ড’ বইয়ে আমি একই ফর্মের কবিতাগুলো রেখেছি৷ যেমনটা আমি প্রতিটি পাণ্ডুলিপি তৈরির ক্ষেত্রে করি৷
৪। বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা।। কাব্যগ্রন্থের নামটি দেখে মনেহয়, এটি একজন মাওবাদী গেরিলা কবি’র কবিতা হয়ে উঠতে পারতো৷ কিন্তু তা হয়নি, যদিও পোড়খাওয়া রাজনৈতিক স্বপ্নের একটি আঁচড় আছে এখানে। বইটি সম্পর্কে কিছু বলুন।
উত্তর: এ পুস্তিকাটি আমার লেখালিখির শুরুর দিকের কয়েকটি কবিতা নিয়ে প্রকাশিত৷ তখন ছাত্র আন্দোলন করতাম৷ আর বাঙলাদেশের রাজনীতি নিয়ে আমি শুরু থেকেই হতাশাবাদী ঘরানার৷ ফলে কবিতায় এর প্রভাব দেখতে পাচ্ছেন বোধ করি৷ আর আমি এক সময়ে একরৈখিক কবিতাই লিখেছি তা নয়৷ একই সময়ে আমি বহুরৈখিক কবিতা লিখেছি৷ কিন্তু পাণ্ডুলিপি তৈরির ক্ষেত্রে আমি সময় নিয়েছি অনেক৷ এর প্রধান কারন হলো, আমি চেয়েছি কনসেপচুয়াল পাণ্ডুলিপি হোক প্রতিটি৷ ফলে একই সময়ে ‘বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’ ও ‘চোখের ভেতরে হামিংবার্ড’ বইয়ের কিছু কবিতা লিখলেও পাণ্ডুলিপি তৈরির ক্ষেত্রে কবিতাগুলোকে আমি আলাদা করে ফেলেছি৷
৫। মার্কস যদি জানতেন।। এই বইয়ের কবিতাগুলো আরও বেশি তির্যক ও সরাসরি হবে বলে ধারণা করেছিলাম, কিন্তু বাস্তবত সরাসরি না হয়ে কবিতাগুলো যথেষ্ট পরিমাণেই রূপকাশ্রয়ী- আপনার বিশ্বাস এবং অভিজ্ঞান কী এমন যে, কবিতায় প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতি, বা শ্রেণীসংগ্রামের জঙ্গমতা আসলে এর শৈল্পিক ভারসাম্য বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে?
উত্তর: আপনার প্রশ্নের শেষাংশে আমার উত্তর আছে৷ আমি এমনটাই মনে করি, কবিতা আড়াল দাবি করে৷ আর এ প্রসঙ্গে আরেকটু বলি, আমার ধারনা রাজনৈতিক পরিস্থিতি একটা বড় ফ্যাক্ট৷ বাঙলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সরাসরি কথা বলার কোন সুযোগ নেই৷ একসময় রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ইস্যুতে কার্টুন অনেক জনপ্রিয় ছিলো৷ কিন্তু আজ সেসব কার্টুন বিলুপ্ত! এর কারন বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা৷ কিন্তু এই ফর্মটি পরিবর্তিত হয়ে ‘মিমস’ রূপে প্রকাশিত হচ্ছে৷ দুঃখের কথা হাসির ছলে বলছে৷ মানুষের বেদনা ঘনীভূত হতে হতে এমন রূপ ধারণ করেছে যে, তা নিয়ে নিজেই মশকরা করছে৷ কারন তার প্রতিবাদ করার শক্তিও আর নেই৷
তবুও এসময়ের কবিতায় এর প্রতিফলন লক্ষ করা যায়৷ সময়ে সময়ে কবিতার ফর্ম বদলে যায়৷ প্রতিবাদের কথা, রাজনৈতিক চিত্র— সেসব থাকে নতুন সময়ের ফর্মে৷ ষাট, সত্তর কিংবা নব্বই দশকে যে ফর্মে রাজনৈতিক কবিতা রচিত হয়েছে, আজ নতুন শতকে এসে সেই ফর্মে কবিতা লেখা হবে না, এটাই স্বাভাবিক৷ তারই প্রতিফল হয়তো পাচ্ছেন ‘মার্কস যদি জানতেন’-এ৷
৬। হলুদ পাহাড়।। বইটিতে আবছা কোথায় যেন খানিক পরাবস্তবতার পোঁচ আছে। হলুদ পাহাড় নিয়ে আপনার অনুভব কী?
উত্তর: ‘হলুদ পাহাড়’ এর কবিতাগুলো আমি এক মাসে লিখে ফেলেছিলাম৷ যেন হঠাৎ করেই এই সবগুলো কবিতা আমার কলমের ডগায় উপচে পড়ছিলো৷ অন্তর্গত অনুভূতিমালা আর দৃশ্যের বিবরণ লিখেছি; আমি যা দেখি— যেভাবে আমার চোখে ধরা পড়ে, তা-ই… হয়তো আমার ‘দেখা’ ‘স্বাভাবিক’ নয়… পরাবাস্তব হতে পারে…
৬। আপনার প্রত্যেকটি বই ভাবে ও ভঙ্গিমায় আলাদা আলাদা। আপনি কী থিমেটিক্যালি বইগুলো করেছেন?
উত্তর: একটি বইয়ের পাণ্ডুলিপি তৈরি হবার পর আমি সময় নিই; মাসের পর মাস কিছু লিখি না৷ পূর্বের ফর্ম থেকে বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করি৷ নতুন কিছু লিখতে চাই৷ নতুন চিন্তা— নতুন ফর্মে৷
আমার এমন হয়; দেখা যায়, মাসের পর মাস আমি কবিতা লিখিনি, লিখতে পারিনি; শুধুই ভেবেছি— চিন্তিত হয়েছি৷ কখনো বছর পেরিয়ে গেছে— কবিতা আসেনি! আগে মনে করতাম আর বুঝি লিখতে পারবো না, আমার বোধয় লেখা শেষ৷ কিন্তু না৷ তার পরই হঠাৎ করে কবিতা লিখতে শুরু করি; মনে হয় সাইক্লোনের মতো সবকিছু ভেঙেচুড়ে আসছে৷ দুর্বার গতি— যাকে রোধ করা অসম্ভব৷ এমন অবস্থা থাকে এক থেকে দেড় মাস৷ সেই সময় প্রচুর কবিতা লিখে ফেলি৷ এভাবেই লেখা হয়েছে ‘হলুদ পাহাড়’, ‘লিখিত রাত্রি’, ‘হালকা রোদের দুপুর’…
৭। একদম সাম্প্রতিক কালে অনেকের কবিতায় কেমন ধাঁধার মত একটা ব্যাপার থাকে। মনে হয়, পাঠকের যেন একটি ধাঁধার উত্তর খুঁজে বের করতে হবে। ধরুন আপনার এই কবিতাটি-
হেমন্তে
উঠোনের সমস্ত ব্যর্থতা খুবলে আনা হৃৎপিণ্ডের
মতো প্রকাশ করা দরকার আজ। উনুনের গভীরতম
ক্যানভাস থেকে বের করে আনা দরকার সমস্ত অমুদ্রিত
জলের ইতিহাস। ডুবন্ত চাঁদের যাত্রী কীভাবে,
সেইসব তীব্র বিরল ছবি অলক্ষ্যে রোদের বাগানে
ফুটাতে দিয়ে কোনদিন, সূর্যবেলায় খুব নির্ভার হবো।
আপনার কী মনে হয়, এই কবিতাটি পাঠকের প্রাণের কাছে আরও অনায়াস হয়ে উঠতে পারতো?
উত্তর: আমি আসলেই চাই অনায়াস করে তুলতে৷ এমন একটি প্রচেষ্টা আমার মধ্যে কাজ করে৷ হয়তো পারি না, পেরে উঠি না ঠিকমতো৷ কিন্তু সহজ করে বলতে চাই৷ স্বাভাবিকভাবেই লিখি, বাড়তি কসরত আমি করি না কবিতায়৷ কিন্তু তা যে রূপ ধারণ করে তা কতোটা ‘স্বাভাবিক’ মনে হয় পাঠকের কাছে সে সম্বন্ধে আমার ধারণা নেই৷
৮। সব কবিরই জানায় অজানায় একটি দর্শন থাকে- আপনার দর্শন কী?
উত্তর: আমার দর্শন, সে তো কবিতায়ই প্রকাশিত৷ সেই দরশনের কথাই লিখি কবিতায়৷ আমার কবিতাই আমার দর্শন৷
৯। আপনি বাংলা কবিতার পরম্পরায় নিজেকে কীভাবে যুক্ত করেন? আবার বাংলা কবিতার পরম্পরা থেকে নিজেকে কোথায় বিযুক্ত করে প্রাতিস্বিক হয়ে ওঠেন?
উত্তর: আমার কথা, আমার বক্তব্য, যে কোনো বিষয় নিয়ে আমার যা চিন্তা তা আমি লিখি; লিখে বলি; এছাড়া আমার আর কোনো মাধ্যম নেই; বিকল্প নেই৷ আমি তা-ই লিখতে চেষ্টা করি কবিতায়— যে কথা আমার, যা কেউ বলছে না৷ বলার ভঙ্গিতে নতুন কিছু করবার প্রয়াস আমার মধ্যে থাকেই৷ এতে কতটুকু সফল আর কতটুকু ব্যর্থ তা পাঠকই বলতে পারবেন৷

একগুচ্ছ কবিতা
বিবাহবার্ষিকী
বিবাহবার্ষিকীতে নিষ্পত্র ছিলাম। অঘোষিত
ভঙ্গিতে নেমে এলো প্রেম, যেভাবে সন্ধ্যে নামে
ব্রহ্মপুত্র তীরে। সম্মোহনী সংগীতে জাগে
কুয়াশার সমূহ কম্পন। নিয়তিবৃক্ষ ছিঁড়ে যায়
চাঁদ নেমে আসে জলের মোহনা আর ফসলের ক্ষেতে
নিউট্রাল বিউগলে জাগে দিনের সকল রাত
জগতে সকলই রাজনীতি আর আর্থিক আলোচনা
তবুও তখন দুমদাম লাল আমার নিটোল বুকে।
নিউটন
নিরাকার-জলের সাইরেন
এলো আমফান-সাফোর
কলোনীতে। বৃষ্টিবৈভবে
জেগে উঠি
শব্দ হয়
নিউটন, আপেলতলায় থাকো
বাড়িতে যেও না
বাড়িতে হৃদয় নেই
মানুষভর্তি বেদনা
জলের অপেরা
ডানা আঁকো-সশব্দে ঝাপটাও
ডাকছে ব্যাকুল নদী
শিহরিত
হেঁটে হেঁটে আমি পৌঁছলাম
নদীর কাছে। অনেক মানুষ-
যারা হৃদয় ফেলে এসেছে
ধরলার জলে; সকলে
একত্রিত আজ। হারানো
হৃদয়ের গান শুনছে মেয়েটি-
ছেলেটিও।
হাঁটু মুড়ে ওর পাশে বসি
আমি তো যাবো না কারো সাথে
তোমার উপশিরা
যেদিকে এঁকেছে পথ
শুধু সেই দিকে যাবো।
অন্য কোনো জলে
যাবো না।
বসন্তের সনেট
অহেতুক বসন্তের রোদ-অসময়ে ঝড়
বিরক্ত শিশুর কান্না… এরকম টুকরো-টাকরা
শীত-মিশ্রিত সময়ের প্রবচন!
তোমার চুলের ভাঁজে
এক তোড়া সনেট গুঁজে দাও
মরা নদী ভাষা ফিরে পাবে।
নামকরণের সার্থকতা
নামকরণের সার্থকতা নেই। একা
যেতে যেতে ভাবি, বুড়িগঙ্গায় প্রবাহিত
জীবনের সকল প্রণাম। শান্ত হয়ে
ভেসে যেতে থাকে বেকসুর কান্না।
দেখেছি কয়েকদিন, শহরতলীতে নেই বাণিজ্যবিশেষ
গীতবিতান সুদূর পরাহত, তুমিও নিরুদ্দেশ!
নৈশসঙ্গী
আলোগুলো লাল আর নীল
-টলমল করে
চারটে লোকের ভারে কেঁপে ওঠে
ইঞ্জিনের ঘোড়া।
টগবগিয়ে
কেঁপে কেঁপে ওঠে সমূহ পথের দিশা…
নেমে যাই
এই রাস্তা চলে গেছে
অধিকতর নিঃসঙ্গতার দিকে।
পুরনো শহরে বয়সী শামুক, হেঁটে যায়
অক্ষয়দাস লেন পেরিয়ে-
পকেটে মুদ্রা নাচে।
গলির মুখে নাচে পুলিশের গাড়ি।
বেদনাহত কোকের বোতল ছুঁয়ে
নৈশ বন্ধুর সাথে ট্রাফিক পেরিয়ে হাঁটি
অদেখা প্রতিবেশিনীর নিঃশ্বাস কাঁধে
টের পাই, আমরা তখন মেঘের ছায়ায়
অন্ধকার, বৃষ্টিহীন গ্র্যাণ্ড এরিয়ায়!
ভ্রমণ বিষয়ক
প্রথমে জঙ্গলে যেতে চেয়েছিলাম
ক্রমান্বয়ে পাহাড় আর সমুদ্রে।
জঙ্গলে গেলে না তুমি, পোকামাকড়ের ভয়!
তাহলে সমুদ্রেই চলো; পাহাড়ে
গণ্ডগোল খুব, বিষাক্ত সেনাদল আর
নিরাসক্ত প্রাণীদের ক্যাম্প।
ফাল্গুনের রোদে
সকালে মিষ্টি রোদের দিন-
কুম্ভ-সূর্য জাগে আদিবাভঙ্গিতে
বাড়ি ফিরে- নিস্তরঙ্গ তারা
ইশারাভাষায় ডাকে মাতৃভাষাবনে।
আচ্ছাদন পেরিয়ে যেদে চাই
দ্রুত!
চোখ বুজে শুনি- ডাকছে আকাশ
ছোট হচ্ছে আলো।
ফাল্গুনের বিকেলবেলায়
গতকালের বাতাশ- আজ খুব এলোমেলো।
মানতে চাই না তবু, কৈবল্য আঁকড়ে
ধরে হাত! স্বপ্নে চিৎকার করে উঠি
দেখেছি অবাক-পরিখা। এইমাত্র ডাকে
সাড়া দিলো যে- বলি, ব্যাগ গুছিয়ে দাও
দেরি হয়ে যাচ্ছে!
আত্মজীবনী
অর্ধেক জীবন গেল
তোমার দিকে চেয়ে।
বাকী অর্ধেক
তোমার কথা ভেবে।
বানানবিভ্রাট
এতো যে জোনাকি-আলো, পথ দেখায় না, আশা জাগায় না; ব্যথা ভোগায় না কিছুই!
আমি শুধু জন্মকে মৃত্যুর প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতে ভালোবাসি। প্রতিবার জন্মের
ত্রুটি নিয়ে এতো যে প্রবণ-মাঝি!.. তোমার জন্য লাগে আমার কব্জি-জোরের থেকে
বেশি, পুরোনো ক্রোধের সুরে গর্জন। কেন প্রায়শ গোলাপের নামে প্রতারণা
মুদ্রণ করো! শীতার্ত ভয়ে কেঁপে ওঠা, দুলদুল এই পাতাগুলো অসহায়, কপর্দক
ছুঁতে পারছে না। সোডিয়াম বাতি থেকে মিনতিমিনার অব্দি, ভাসে অনঙ্গ বাতাশ
শুধু বাদামের পাতা থেকে যথার্থ মনীষা জাগাতে। আমার ঈশ্বর তুমি, ভেতরে
সবুজাভ পাট; অথচ আশ্চর্য, তোমারই হৃদয়ে ঘটে বানানবিভ্রাট!
*********************************
সাক্ষাৎক্ষার: লাবণী মণ্ডল
‘এদেশে বেশির ভাগ লিটলম্যাগ মানে বনসাই প্রকল্প’
সাম্য রাইয়ান- কবি, প্রাবন্ধিক, লিটল ম্যাগাজিন কর্মী, অ্যাকটিভিস্ট। সম্প্রতি তিনি কবিতা, কবিতার বিভিন্ন ধরন, লিটল ম্যাগাজিনসহ শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির নানাদিক, নিজের কাজ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন। সেখানে উঠে আসে কবিতা ভাবনা, জীবন ভাবনা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন নিয়ে স্বকীয় চিন্তার প্রতিফলন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন লাবণী মণ্ডল।
প্রশ্ন: আপনার কবিতার সূচনা ও যাত্রাপথ সম্পর্কে জানতে চাই।
উত্তর: শব্দখেলার আনন্দ থেকেই কবিতা লিখতে শুরু করেছিলাম। তখন প্রাইমারী স্কুলে পড়ি। শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে অন্তমিল তৈরি করতে, সুর তৈরি করতে আনন্দ হতো। সেই থেকে শুরু, এরপর তো চলছে। ছোটবেলা থেকে গল্পের বই পড়া নেশা হয়ে গিয়েছিলো। পিতৃপ্রজন্মের কল্যাণে আমি জন্মের পরই বাড়িতে বইয়ের সমারোহ পেয়েছিলাম। সেই থেকে বইয়ের সাম্রাজ্যে ঢুকে গেলাম!
প্রশ্ন: আপনার কাছে কবিতা মানে কী?
সাম্য রাইয়ান: কবিতা আমার কাছে জীবনদর্শন। সূর্যের এক হাত নিচে মেলে দেয়া শরীরের দগদগে ঘা।
প্রশ্ন: কবিতার বিভিন্ন ধরন বা ফর্ম আছে। আবার এ সময়ে আমরা দেখছি শিল্প-সাহিত্যের অন্যান্য অনেক ধারার মতো কবিতাও ফর্ম থেকে বেরিয়ে আসছে। কবিতার এ দীর্ঘ যাত্রাপথে আধুনিক-উত্তরাধুনিক কবিতার বিভাজন বা ছন্দের ধারা সবই ভেঙে পড়ছে। আবার নতুন ফর্ম গড়েও উঠছে। এ প্রসঙ্গে আপনার মতামত কী?
উত্তর: কবিতার ফর্ম নিয়তই পরিবর্তন হচ্ছে। এটাই স্বাভাবিক। ফর্ম মুক্ত হওয়া আসলে একটা ধাঁধা। কারণ তা কেবলই এক ফর্ম থেকে বেরিয়ে আর