You are currently viewing সে কোন বনের হরিণ: বিচিত্রা সেন

সে কোন বনের হরিণ: বিচিত্রা সেন

সে কোন বনের হরিণ
বিচিত্রা সেন

বাসা থেকে বেরিয়ে মেজাজটা খারাপ হয়ে গেলো। ভুল বললাম। বাসা থেকে বেরিয়ে মেজাজ খারাপ হয়নি। মেজাজ খারাপ নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়েছি। শীলার সাথে ইদানিং আমার একদম মিলছে না। ভীষণ সন্দেহ করে আমাকে। আমার অফিসে রূপা নামে যে মেয়েটি আছে তাকে নিয়ে সন্দেহ । শত বুঝিয়েও কোনো কাজ হয়নি। আমারও জেদ চেপে গেছে। ইদানিং রূপাকে নিয়ে মাঝে মাঝে বাইরে খেতে যাই। কখনো কখনো খুব ঘনিষ্ঠও হই আমরা। সময়টা বেশ ভালো কাটে। শীলা আমার স্ত্রী হয়েছে বলে কি মাথা কিনে নিয়েছে নাকি? আমার জীবনটা আমার, একান্তই আমার। যাক সে প্রসঙ্গ। গাড়ি ড্রাইভ করার পাশাপাশি ভাবছিলাম কোথায় যাওয়া যায়। রঞ্জুর অফিসেই যাবো। ওখানে কিছু অফিসিয়াল দরকারও আছে। গুলশানের দিকে গাড়ি ঘোরালাম।

ওর অফিসে ঢুকতেই চোখটা জুড়িয়ে গেলো। আহা! দেখেও শান্তি। ফ্রন্ট ডেস্কে চারপাশ আলো করে বসে আছে এক পরমা সুন্দরী। নতুন জয়েন করেছে মনে হয়। এক পলক তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিলাম। এখানে ছ্যাঁচড়ামি করা ঠিক হবে না। পাশ কাটিয়ে রঞ্জুর রুমে ঢুকতেই রঞ্জু হৈ হৈ করে উঠলো।
–এতদিন পরে কোত্থেকে তুই? আয় আয়।
ওর আন্তরিক অভিবাদনে মন খারাপটা উড়ে গেলো। এ কথা সে কথার পর বললাম,
-ফ্রন্ট ডেস্কে বসা মেয়েটা কে?
রঞ্জু চোখ সরু করে বললো,
-কেন? মনে ধরেছে?
আমি হেসে বললাম,
-অন্তত পরিচয়টা করিয়ে দে।
রঞ্জু কাজের কথা বলে মেয়েটাকে রুমে ডেকে এক ফাঁকে পরিচয়টা করিয়ে দিলো। মেয়েটার নাম মৌমিতা। প্রথম দেখাতেই ও আমাকে বেশ ভালোভাবেই নাড়া দিলো।

সেদিন তেমন কোনো কথা হয়নি ওর সাথে। তবে এরপর থেকে রঞ্জুর অফিসে যেতে আমার মন টানতো। কারণে অকারণে ওদিকে ছুটতাম। দেখারও তো একটা সুখ আছে।কথা যে খুব একটা হতো তা কিন্তু নয়। বাসায় শীলার সাথে খিটিমিটি বেড়েই চলছিল৷ মাঝে মাঝে মনে হতো দুজন আলাদা হয়ে যাওয়াই ভালো। কিন্তু ছেলে দুটো এখনো ছোট। ওদের মায়া তীব্র মায়া। এদিকে রূপার সাথে কিছু উষ্ণ সময় কাটাতাম ঠিকই,কিন্তু তাতে আমার মন শান্তি পেতো না। মৌমিতার প্রতি কেমন একটা টান অনুভব করছিলাম। ওর সৌন্দর্য আমাকে মোহাবিষ্ট করে ফেলেছিল। কিন্তু হঠাৎ বিনা মেঘে বজ্রপাত। একদিন ওই অফিসে গিয়ে শুনি মৌমিতা পছন্দের ছেলেকে বিয়ে করে চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। এরপর রঞ্জুর অফিস আমাকে আর টানতো না।

দিনগুলো একঘেঁয়ে কাটছিলো। শীলার সাথে সম্পর্ক দিনকে দিন অবনতির দিকে যাচ্ছিলো। আমাকে হাতেনাতে ধরার জন্য সে মাঝে মাঝে অফিসে হানা দিতো। রূপা এতে খুব ঘাবড়ে যেতো। আমি পাত্তা দিতাম না। এর মধ্যে আমার ব্যবসার পরিধি বাড়াতে আরেকটা বড় অফিস নিলাম। মৌমিতার সাথে চাকরি করতো আরেকটা মেয়ে, নাম রিনি। তাকে দিয়ে মৌমিতাকে অফার পাঠালাম আমার অফিসে জয়েন করতে। মৌমিতা ফিরিয়ে দিলো। সে নাকি মন দিয়ে সংসার করবে। করুক,আমার কী যায় আসে! দেখি,এই প্রেম কতদিন থাকে। কত দেখলাম এই পর্যন্ত। আমি আর শীলাও তো প্রেম করে বিয়ে করেছিলাম। সে কী তুমুল প্রেম আমাদের! এখন তো কেউ কাউকে সহ্যই করতে পারি না। আচ্ছা প্রেম মরে যায় কেন? একসময় যে শীলাকে একবেলা না দেখলে রাতে ঘুমাতে পারতাম না,সেই শীলার মুখ দেখতে এখন আমার অসহ্য লাগে। মনে মনে হাসলাম। মৌমিতা তোমার প্রেমও একসময় মরে যাবে। যাক,এসব ফালতু বিষয় নিয়ে ভাবার সময় আমার নেই। ব্যবসা নিয়ে এমন ব্যস্ত হয়ে গেলাম মৌমিতার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। হঠাৎ একদিন আমার অফিসে ওকে দেখে চমকে উঠলাম। ও একা আসেনি,সঙ্গে একটা ছেলেও আছে। পরে অবশ্য জানতে পারলাম ছেলেটা ওর হাজবেন্ড। ওদেরকে আমার রুমেই বসালাম। এ কথা সে কথার পর আচমকা মৌমিতা বললো,
-স্যার,আপনার কাছে খুব জরুরি একটা কাজে এসেছি। আপনি না করতে পারবেন না। আমাকে এ হেল্পটা আপনাকে করতেই হবে।
বাহ্! কী আহ্লাদী স্বর। যেন আমার সাথে কত গভীর সম্পর্ক। ওইদিকে আবার কার্টেসি করে স্যার ডাকছে! ভাবছিলাম ও কী হেল্প চাইতে পারে? তার মানে ও চাকরি চাইতে এসেছে? না,চাকরি নয়। ও এসেছে ব্যাংক থেকে লোন ম্যানেজ করে দিতে। ওরা ব্যবসা করবে। ওহ্! তার মানে প্রেম এখনো টগবগে। এমন সুন্দরী আমার করুণা চাচ্ছে! তাও আবার হাজবেন্ডসহ এসে। না করি কী করে? ব্যাংক তো আর ওদেরকে লোন দেবে না। আমিই লোন ম্যানেজ করে দিলাম। শর্ত থাকলো প্রতি মাসে মাসে ওরা আমার একাউন্টে টাকা ঢোকাবে। একটা এগ্রিমেন্টও করে নিলাম। যদিও দুশ্চিন্তা হচ্ছিল টাকাটা ঠিকমতো ঢোকাবে তো? নাকি টাকাটা মারই গেলো? ব্যবসায় মাঝে মাঝে বাজি ধরতে হয়। এটা নাহয় বাজিই ধরলাম। না,মৌ প্রতারণা করেনি। প্রতি মাসে মাসে ঠিকই টাকাটা আমার একাউন্টে ঢুকছিলো।

শীলার সাথে সম্পর্ক এখন চরম তিক্ততায় পৌঁছেছে। ও কথায় কথায় আমাকে ছেড়ে যাবার হুমকি দেয়। ও চলে গেলে আমি বাঁচি,কিন্তু ছেলেদের জন্য ভীষণ মায়া আমার। তাই ডিভোর্সটা আমি চাচ্ছিলাম না। রূপার সাথে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। আমরা প্রায়দিন দুপুরে একসাথে বাইরে লাঞ্চ করি। কিন্তু মানসিক একটা অপূর্ণতা আমাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিলো। ঠিক এসময়ে খেয়াল করলাম আমার একাউন্টে তিন মাস ধরে মৌমিতার টাকা ঢুকছে না। তার মানে বাটপারী শুরু করে দিয়েছে। মেজাজ উঠলো চরমে। ওকে ফোন করলাম। জানতে চাইলাম টাকা না ঢোকার কারণ। মৌ বললো,
-ইশ! আপনাকে তো বলাই হয়নি আমাদের ডিভোর্স হয়ে গেছে। টাকাটা ও দিতো। এখন ডিভোর্স হয়ে যাওয়াতে ও হয়তো আর দেবে না৷ অসুবিধা নেই,বাকি টাকাটা আমি আপনাকে শোধ করে দেবো।
আহ্! মনে যেন একটু শান্তি পেলাম। প্রেম শেষ হবে বুঝেছিলাম। তাই বলে এত অল্প সময়ে একেবারে ডিভোর্স পর্যন্ত! বাইরে সেটা প্রকাশ না করে কঠোরভাবে বললাম,
-কথার যেন হেরফের না হয়।

কয়েকদিন ধরে রূপা অফিসে আসছে না। ফোনেও পাওয়া যাচ্ছে না। কী হলো ওর?ভাবতে ভাবতেই দেখি ও কল করেছে। রিসিভ করতেই বললো,
-স্যার,আমি আজকেই অস্ট্রেলিয়া চলে যাচ্ছি।
বিনামেঘে বজ্রপাত মনে হয় একেই বলে। আমি অবাক হয়ে বললাম,
-তুমি আমার কাছ থেকে এভাবে সবকিছু লুকালে? আমি কি তোমাকে বাধা দিতাম?
রূপা কাঁদো কাঁদো গলায় বললো,
-না স্যার,আমি নিজেই নিজের সাথে যুদ্ধ করছিলাম। আপনি ভালো থাকবেন স্যার। আমার জন্য দোয়া করবেন।
দোয়া! ধেৎ,ফোনটা কেটে দিয়ে চুপ মেরে বসে রইলাম। শালার! সবকিছুতে কুফা লেগেছে। কাজ টাজ আর ভালো লাগছে না। তখনো আমি জানি না আমার জন্য আরও অনেক বড় ধাক্কা অপেক্ষা করছে। বাসায় ফিরে শীলার মুখোমুখি। শীলা ব্যাগে কাপড়চোপড় ঢুকাচ্ছিলো।আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
-আমার বাচ্চাদের নিয়ে আমি কালকেই কানাডা চলে যাচ্ছি।
আমি আকাশ থেকে পড়লাম। কানাডা কি চট্টগ্রামে নাকি? ও এতকিছু করলো কখন? আমি কিছুই জানলাম না! অবশ্য ওর ভাইবোন দুজন কানাডায় আছে। ওরাই হয়তো সব ব্যবস্থা করেছে। যাক,সবাই চলে যাক। একা একা আমি ভালোই থাকবো। ছেলেদের ছাড়া আমার খুব কষ্ট হবে। কিন্তু ওরা মায়ের কাছে থাকলেই ভালো থাকবে। আমি একেবারে স্বাধীন হয়ে যাবো।

দিনগুলো কেমন স্থবির হয়ে গেছে আমার। মা বাবা ছাড়া ঘরে কেউ নেই। অফিসেও রূপা নেই। দিনগুলো যেন অনেক দীর্ঘ। রাত তো আরও বেশি। সত্যি কথা বলতে কি এসময় আমি ধীরে ধীরে পানাসক্ত হয়ে পড়লাম। হঠাৎ একদিন মৌমিতার ফোন। ওর কিছু টাকা দরকার। আমি ওকে আমার অফিসে চাকরির অফার দিলাম। এবার সে খুশিমনেই রাজি হয়ে গেলো। পরদিন থেকে ও আমার অফিসে জয়েন করলো। ওইসময় আমি ছিলাম চরম নিঃসঙ্গ। মৌ যেন এসময় ধু ধু মরুর বুকে বৃষ্টি হয়ে এলো। কথাটা কিন্তু আমি কাব্য করে বলিনি। শীলা এবং রূপা চলে যাওয়াতে আমার সময় কিছুতেই কাটতে চাইতো না। এসময় মৌকে পেয়ে আমি যেন বিপুল পিপাসায় এক গ্লাস পানির সন্ধান পেলাম। তবে আমি নিজের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন ছিলাম। কখনো লিমিট ক্রস করতাম না। ওই রুমে ডেকে এক আধটু গল্প করা কিংবা কোনো অফিসিয়াল কাজে যাওয়ায় সময় ওকেও সঙ্গে নিয়ে যাওয়া। আসলে ওর সৌন্দর্য, ওর বাচনভঙ্গি আমাকে ভীষণ টানতো। সময়ের সাথে সাথে আমার চাহিদাও বাড়তে লাগলো। কখনো কখনো সন্ধ্যার পরেও ওকে ফোন করতাম। গল্পে গল্পে একসময় জানতে পারলাম ও ডিভোর্স হওয়ার পর আবারও বিয়ে করেছিল। ছেলেটা নেশা করে এসে ওকে প্রচণ্ড মারতো। বাধ্য হয়ে ওকেও ডিভোর্স দিতে হয়েছিল৷ আমি তাজ্জব বনে গেলাম। এত অল্প সময়ে দুই দুইটা বিয়ে আবার টপাটপ ডিভোর্স! এখানেই শেষ নয়। দুইবার ঠকে যাওয়ার পরও আমার অফিসে জয়েন করার দুই/তিন মাস আগে আরেকজনের সাথে গভীর বন্ধুত্বে জড়িয়েছিল। তবে এবার আর বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়নি। এ অফিসে জয়েন করার পর ও ছেলের সাথে ব্রেকআপ হয়ে গেছে। এমন একজন সুন্দরী, স্মার্ট মেয়ে বার বার ভুল মানুষের হাতে পড়ছে দেখে আমার মনটা খারাপ হয়ে গেলো। ভাবলাম,আমি অন্তত মেয়েটাকে ঠকাবো না।

এক বিকেলে ওকে নিয়ে এক ফাইভ স্টার হোটেলে বসলাম। আমার তো ড্রিংক করার অভ্যাস ছিলই,সেদিন ওকেও রাজি করালাম। সামান্য খেয়েই ওর নেশা ধরে গেলো। দেখলাম, আবোলতাবোল বলছে আর অঝোরে কাঁদছে। এক পর্যায়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরে বললো,”
স্যার,আপনি আমাকে ভালোবাসতে পারেন না?” আপনি কি পারেন না আমার সব কষ্ট ভুলিয়ে দিতে? আমি কি এতটাই ফ্যালনা? নেশা আমাকেও পেয়ে বসেছিল ততক্ষণে। আমি ওকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বললাম,
-আজ থেকে তোমার সব দায়িত্ব আমার। আমি তোমাকে এত ভালোবাসা দেবো যে,তুমি তোমার তিক্ত অতীত ভুলে যাবে।
এরপর আমরা গভীর চুম্বনে ডুবে গেলাম। যদিও আমরা নেশার ঘোরে কথাগুলো বলেছিলাম, তবুও আমরা নেশা কেটে গেলেও নিজেদের কমিটমেন্ট থেকে সরে আসিনি। এরপর প্রতিটি দিন ছিল অফুরান আনন্দের দিন। আমরা দুজন দুজনকে সত্যিকারভাবেই ভালোবাসলাম। আমি ভেবে নিলাম ওকে আমি বিয়ে করবো। কিন্তু তার আগে শীলাকে ডিভোর্স দিতে হবে। কিন্তু বাচ্চাদুটোর মায়া আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। মনে হলো শীলার সাথে ডিভোর্স হওয়া মানে বাচ্চাগুলোর কাছ থেকে অনেক দূরে সরে যাওয়া। এভাবে ডিভোর্স দেওয়া ঠিক হবে না। বরং কানাডা থেকে ঘুরে আসি। ছেলেদেরকেও দেখা হবে,আর শীলার সাথেও ডিভোর্স নিয়ে আলাপ করা যাবে। ততদিনে আমি আর মৌ পরস্পরের প্রেমে অন্ধ। ও একটা লেডিস হোস্টেলে থাকতো। ভাবলাম, কানাডা থেকে এসে ওকে একটা বাসা নিয়ে দেবো। আমার বাড়িতে এ মুহূর্তে তোলা ঠিক হবে না। এর মধ্যে মৌকে প্রমোশন দিয়ে আমার পিএস বানলাম। আমাদের সম্পর্ক নিয়ে অফিসে কানাঘুষো হতো। মৌয়ের কাছ থেকেই কথাটা শুনেছিলাম। আমি অবশ্য এসবকে পাত্তা দিতাম না। কারণ আমি তো জানি আমি ওকে বিয়ে করবো। জাস্ট সময়ের অপেক্ষা মাত্র।

কিম্তু আমি কানাডা যাবো শুনেই মৌ বেঁকে বসলো।বললো,
-তুমি আমার সাথে এতদূর এগিয়ে আবার বৌয়ের কাছে যাচ্ছো? এটা তো হতে পারে না।
আমি ওর হাত ধরে বললাম,
-প্লিজ লক্ষ্মীটি, এভাবে বলো না। আমি শীলার কাছে যাচ্ছি না। ছেলেদের দেখতে যাচ্ছি।
মৌ বললো,
-এসব আমাকে বলে লাভ নেই। আমি সব বুঝি। শীলাকে অনেকদিন না দেখে তোমার পুরানো প্রেম আবার জেগে উঠেছে। তাহলে আমাকে এতটা স্বপ্ন দেখালে কেন?
বলেই অঝোরে কাঁদতে লাগলো। আমি বোঝাতে গেলেই ও ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছিল। শেষে উপায় না দেখে ওকে জোর করে বুকের মধ্যে চেপে ধরলাম। ও আমাকে আঁকড়ে ধরে হাঁউমাঁউ করে কাঁদছিলো। অনেক বুঝিয়ে সুজিয়ে ওকে শেষপর্যন্ত শান্ত করতে পারলাম। পরদিন আমি কানাডাতে চলে গেলাম। ছেলেরা তো আমাকে দেখে দারুণ উচ্ছ্বসিত। সারাক্ষণ পাপা পাপা করে আমাকে জড়িয়ে থাকে। শীলাকে নিয়ে আতংকে ছিলাম কেমন ব্যবহার করে। দেখলাম অনেক সংযত হয়েছে। ছেলেদের সামনে নরমাল ব্যবহারই করছে। ওর ভাইবোনরাও আসলো। সবাই আমার সাথে আন্তরিক ব্যবহারই করলো। অবশ্য করবে না কেন? আমি তো প্রতি মাসে মাসে ওদের জন্য মোটা অংকের টাকা পাঠাই। আমি জানি আমার ছেলেদের জন্য আমার কী করা উচিত? আসার সময় ভেবেছিলাম শীলার সাথে ডিভোর্সের ব্যাপারটা চূড়ান্ত করে ফেলবো। কিন্তু আসার পর থেকে সবকিছু এত নরমাল যে ওই বিষয়টা তুলতে আমার খুব সংকোচ হচ্ছিল। ভাবলাম, দেশে গিয়ে এ ব্যাপারে কথা বলবো। পনেরো দিন কানাডায় কাটিয়ে আমি দেশে ফিরলাম। দেশে ফিরেই মনে হলো সর্বনাশ আমি তো এ কয়দিনে মৌয়ের সাথে কোনো যোগাযোগই করিনি। শুধু প্রথম তিন চার দিন ফোন করেছিলাম। সাথে সাথে ওকে ফোন করলাম। প্রস্তুতি নিলাম একটা ঝড়ের জন্য। কিন্তু না,ও স্বাভাবিক গলায় কথা বললো। বললো,পারলে এখুনি একবার অফিসে আসতে জরুরি কথা আছে। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। যাক বাবা,মৌ তাহলে আমার ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছে। তাই কোনো গণ্ডগোল করেনি।

অফিসে গিয়ে নিজের চেয়ারে বসতেই মৌ এসে দাঁড়ালো। বললাম,
-সরি জানপাখি,এ কয়দিন এত ব্যস্ত ছিলাম তোমাকে আর ফোন করতে পারিনি।
কথাটাকে পাত্তা না দিয়ে মৌ আমার গা ঘেঁষে দাঁড়ালো। তারপর আহ্লাদী গলায় বললো,
-তুৃমি কালকেই আমাদের বিয়ের ব্যবস্থা করো। আমি আর একা থাকতে পারবো না।
ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠলাম। সর্বনাশ! বলে কী? এমন হুট করে ওকে বিয়ে করা তো সম্ভব না। শীলাকে ডিভোর্স না দিয়ে ওকে বিয়ে করলে অনেক ঝামেলা হবে। আমার মা বাবা আত্মীয়স্বজন কেউ এটা মেনে নেবে না। আমাকে চুপ দেখে মৌ বললো,
-কী হলো? আমাকে বিয়ে করবে না?
আমি মৌ এর হাত দুটো আমার বুকে চেপে ধরে বললাম,
-বিয়ে অবশ্যই করবো,তবে কালকে নয় সোনা।
মৌ এক ঝটকায় হাত দুটো সরিয়ে নিয়ে বললো,
-কালকে নয় কেন? শীলার লোভ বুঝি ছাড়তে পারছো না? আমাকে কালকেই বিয়ে করতে হবে। নাহলে আমার অন্য জায়গায় বিয়ে হয়ে যাবে।
আমি হেসে দিলাম। ভাবলাম ও বুঝি আমার সাথে মজা করছে। বললাম,
-তাই নাকি? তাহলে তুমি অন্য ছেলেকেই বিয়ে করো।
মৌ সাপিনীর মতো ফুঁসে উঠে বললো,
-তুমি কি ভাবছো আমি মজা করছি? সত্যি মা আমার জন্য ছেলে ঠিক করেছে। ছেলে অস্ট্রেলিয়া থাকে। ছয়মাসের মধ্যে আমাকেও নিয়ে যাবে। আমি আর কাউকে বিয়ে করতে পারবো না। প্লিজ,তুমি আমাকে বিয়ে করো।
মৌকে কীভাবে বোঝাই আমি তো ওকে বিয়ে করবোই,কিন্তু এভাবে হুট করে সেটা সম্ভব নয়।
মৌ আমার পাশে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদতে লাগলো। আমি উঠে ওর মাথায় হাত রেখে বললাম,
-শান্ত হও মৌ। এ মুহূর্তে তোমাকে বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব না।
তারপর মজা করে বললাম,
তুমি চাইলে ছেলেটাকে বিয়ে করতে পারো।
অপার বিস্ময়ে মৌ আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
-তুমি বলছো এ কথা?
তারপর দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
-ঠিক আছে,তাই হবে।
বলেই ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে গেলো।
আমি জানতাম কখনো ও এটা করতে পারবে না। ও আমাকে নিজের চেয়ে বেশি ভালোবাসে। ও জাস্ট আমাকে হুমকি দিয়ে গেলো। কিন্তু না,হুমকি নয়,পরদিন থেকে মৌ অফিসে আসা বন্ধ করে দিলো এবং চারদিনের মাথায় ওর বিয়ে হয়ে গেলো। আমি এতটা তাজ্জব বনে গেলাম যে কিছুই করতে পারলাম না,শুধু ওর বিয়ের রাতটা মদ খেয়েই কাটিয়ে দিলাম। শেষ রাতে চোখটা জড়িয়ে এসেছিল,হঠাৎ মোবাইলের রিংটোনে ঘুম ভেঙে গেলো। ঘুমের ঘোরে দেখলাম মৌ এর কল। জড়ানো কণ্ঠে বললাম,
-হ্যালো।
ওপাশ থেকে মৌ কাঁদতে কাঁদতে বললো,
-আমি তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারবো না। আমি তোমার কাছে চলে আসবো আজকে।
এই মেয়ে বলে কী? আমাকে মহা কেলেংকারীতে ফাঁসাবে নাকি? ঘুম টুম চোখ ছেড়ে পালালো। আমি আঁতকে উঠে বললাম,
-খবরদার,এসব করবে না। অফিসে মহা কেলেংকারী হবে। তুমি আপাতত ওখানে থাকো। আমি সব গুছিয়ে নিয়ে তোমাকে বলবো।
মৌ হাঁউমাঁউ করে কাঁদতে লাগলো। সত্যি কথা বলতে কি আমি পড়লাম দুমুখো জ্বালায়। মৌকে আমি হারাতে চাই না এটা ঠিক,কিন্তু ওকে নিয়ে সবাই আমার দিকে আঙ্গুল তুলুক এটাও চাই না। আমি কি তাহলে স্বার্থপর? মৌকে ঘরেও তুলবো না,আবার অন্য কারও হতে দেবো না,এটা কি স্বার্থপরতা নয়? ওইপাশে মৌ কেঁদেই চলেছে। আমি মোলায়েম স্বরে ওকে বললাম,
-জানপাখি, তুমি এখন রাখো। আমি দেখি কী করা যায়।
মৌ কল কেটে দিলো। একটা পরিতৃপ্তিতে মনটা ভরে গেলো। তার মানে মৌ আমাকে সত্যি ভালোবাসে। নাহলে কখনো বাসরঘর থেকে বেরিয়ে আমাকে ফোন করতো না। পরক্ষণে ভাবলাম,আমি যা ভাবছি তা কি ঠিক? মৌ তো এটা নিয়ে তিনটা বিয়ে করলো। আরেকজনের সাথেও ডিপ রিলেশনে ছিল। ও কি সত্যি আমাকে ভালোবাসে? নাকি আমার ধনসম্পদ, ক্ষমতা প্রতিপত্তিকে? কেমন যেন গোলমাল লাগছে সব।

যাই হোক,দুদিন পর থেকে ও আবার অফিসে আসা শুরু করলো। পনেরো দিন পর ওর হাজবেন্ড চলে গেলো। আমরা আবার আমাদের মতো করে মেতে উঠলাম। আমি বুঝে ফেললাম মৌকে ছাড়া আমার চলবে না। তবে স্বস্তির কথা হচ্ছে মৌ এর মাথা থেকে বিয়ের পোকাটা নেমেছে। ও বুঝে গেছে আজ হোক,কাল হোক বিয়ে আমাদের হবেই। এদিকে শীলাকে ডিভোর্স দেবো বলাতে মা বাবা আমার ওপর খেপে গেলেন। বললেন,উনারা বেঁচে থাকতে এমন কাণ্ড করলে আমার সাথে উনারা আর সম্পর্ক রাখবেন না। আমি বাবা মার একমাত্র ছেলে। উনাদের ছাড়া তো আমি বাঁচতেই পারবো না। সবকিছু যত সহজ ভেবেছিলাম বাস্তবে দেখলাম তা অত সহজ নয়। এর মধ্যে আরেক সর্বনাশ হলো। মৌ এর হাজবেন্ড সব কাগজপত্র পাঠিয়ে দিলেন মৌকে অস্ট্রেলিয়া চলে যাওয়ার জন্য। মৌ বললো,
-ভালোই হয়েছে। ওখানে গিয়ে ওর কাছ থেকে ডিভোর্সটা নিয়ে নেবো। মাকে বলতে পারবো ওই আমাকে ডিভোর্স দিয়েছে।
আমিও সম্মতি দিলাম এতে। পরের সপ্তাহে মৌ অস্ট্রেলিয়া উড়াল দিলো। আমার বন্ধুরা মৌ এর কথা জানতো। ওরা বললো মৌ আর আসবে না। ওকে যেতে দিয়ে আমি ভুল করেছি। ভাবলাম,সত্যিই কি তাই? মৌ কি সত্যি আমায় ছেড়ে গেলো।

মৌ যাওয়ার পর থেকে আমার সময় যেন স্থির হয়ে গেলো। ও যে আমার জীবনটা কতটা ভরিয়ে দিয়েছিল তিলে তিলে তা টের পাচ্ছিলাম। সেই সাথে টের পাচ্ছিলাম আমি ওর ওপর কতটা নির্ভরশীল হয়ে গেছি সেটা। অফিসে আসতাম,কাজ করতাম,কিন্তু প্রতি মুহূর্তে মনে হতো কী যেন আমি হারিয়ে ফেলেছি। ও মাঝে মাঝে ফোন করতো,কিন্তু তাতে আমার পিপাসিত মন মোটেও তৃপ্ত হতো না। মনে হতো ও যদি আর না আসে। না, মৌ প্রতারণা করেনি। একদিন মৌ এর কল এলো। ওর সব কাজ শেষ। ও এবার ফিরে আসবে। খুশিতে আমার ডানা মেলতে ইচ্ছে করছিল। আমি ব্যবসার কাজে মালয়েশিয়া যাচ্ছিলাম। ওকে বললাম মালয়েশিয়া চলে আসতে। আমরা এই প্রথম একসাথে দেশের বাইরে গেলাম। সাতদিন ছিলাম আমরা। কী যে আনন্দে কেটেছিল আমাদের প্রতিটি মুহূর্ত! সেখানে এক শিখ মন্দিরে আমি ওকে সিঁদুর পরিয়ে দিলাম। দেশে এসে ওকে আমি আলাদা বাসায় তুললাম। ও শাঁখা সিঁদুর পরা শুরু করলো।
অফিসের সবাই আমাদের সম্পর্কটাকে স্বাভাবিকভাবেই নিল। আমার ফ্ল্যাটে মা বাবা থাকলেও সপ্তাহে তিন চারদিন আমি ওর বাসায় থাকা শুরু করলাম। দিনগুলো চমৎকার কাটছিলো আমাদের। বাড়ি থেকে ওর মাকে এনে ওর সাথে রাখলো। ওর ছোট বোনটাও ওর সাথে থাকতো। প্রায় ছয়মাস পর ও জানালো ও কনসিভ করেছে। আমি তখন কানাডা যাবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম৷ এ মুহূর্তে বাচ্চা নেওয়ার মানসিক প্রস্তুতি আমার ছিল না। আমি বললাম,
-শোনো, এত তাড়াতাড়ি বাচ্চা আসলে আমাদের আনন্দটাই মরে যাবে। আপাতত এটা নষ্ট করে ফেলো।
ও বেদনাহত বিস্ময়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
-আমাদের প্রথম সন্তান পৃথিবীতে আসবে না?
আমি বললাম,
-আপাতত দরকার নেই।
ও চুপ হয়ে গেলো। পরদিন ওর গর্ভপাত ঘটিয়ে তার পরেরদিন আমি কানাডা চলে গেলাম। এবার আর ভুল করলাম না। গিয়েই ওকে ফোন করলাম। নাম্বার বন্ধ। কিছুটা চিন্তিত হলাম। তবে চিন্তাকে প্রশ্রয় দিলাম না। ভাবলাম,শরীর খারাপ,হয়তো এজন্যই ফোন বন্ধ রেখেছে। এরপর দিন আবার ফোন করলাম। বন্ধ পেয়ে ওর ছোট বোনকে ফোন করলাম। ওর ছোটবোনের কথা শুনে মনে হলো কিছু একটা এড়িয়ে যাচ্ছে। মনটা খুব অস্থির হয়ে উঠলো। বিশ দিনের জন্য গেলেও পনেরো দিনের মাথায় ফিরে আসলাম। তবে এবারও শীলাকে ডিভোর্সের কথাটা বলতে পারলাম না। কারণ শীলা ছেলেদের সামনে,ওর ভাইবোনদের সামনে এমন স্বাভাবিক আচরণ করছিলো যে মনে হচ্ছিল ও শুধু ছেলেদের ভালোমতো মানুষ করার জন্য কানাডা চলে এসেছে। তাছাড়া মনে হলো আমি তো মৌ এর সাথে সংসার করছিই,শুধু শুধু এ মুহূর্তে শীলাকে ডিভোর্স দিয়ে জটিলতা বাড়াবো কেন? যাই হোক,দেশে ফিরে সোজা চলে গেলাম মৌ এর বাসায়। গিয়ে যা শুনলাম,তা শোনার বিন্দুমাত্র মানসিক প্রস্তুতি আমার ছিল না। ওর মা বললো মৌ নাকি মালয়েশিয়া চলে গেছে। আর ফিরবে না।অনেকদিন ধরেই চেষ্টা করছিল। এইবার সফল হলো। মুহূর্তে পৃথিবীটা দুলে উঠলো। অনেকদিন ধরে মালয়েশিয়া যাবার চেষ্টা করছিল মানে? আমাকে তো কখনো কিছু বলেনি। ও আমার সাথে এমন বিশ্বাসঘাতকতা করলো! কিন্তু আমি যে ওকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না। কীভাবে আমি আবার ওকে খুঁজে পাবো? বুঝলাম, মাথা গরম করা যাবে না। খুব ঠাণ্ডা মাথায় কাজ করতে হবে।

সেদিন আমি বাসায় ফিরে আসলাম। কয়েকদিনের মধ্যে ওর বোনের কাছ থেকে মালয়েশিয়ার ঠিকানাটা সংগ্রহ করলাম। তারপর সোজা ওর ঠিকানায়। ছোট্ট একটা রুম। সেই রুমেই রান্নার ব্যবস্থা। ছোট্ট একটা ওয়াশরুম। বলতে গেলে মানবেতর। খুব ছোট একটা চাকরি নিয়ে এসেছে। আমাকে আড়াল করে এতসব কখন যে করলো! অবাক হয়ে গেলাম। ও ঢাকার এমন স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ জীবন ফেলে এমন জীবন বেছে নিলো! তবে কি ও আমার কাছ থেকে পালাতে চায়? জানতে চাইলাম ওর কাছে সে কথা। ও আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,
-আসলে আমি রক্ষিতার জীবন চাই না। তুমি আমাকে স্রেফ রক্ষিতা বানিয়ে রেখেছো। তোমার আসল সংসার ঠিকই আছে। অথচ আমার সন্তানকে তুমি পৃথিবী দেখতে দিলে না। আমি তোমার কাছ থেকে মুক্তি চাই।
আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম। মৌ আমার সাথে এভাবে কথা বলছে? মালয়েশিয়ার মাটি ওর পায়ের নিচে এতটা শক্ত ঘাঁটি তৈরি করেছে? কিন্তু আমি তো ওকে ছাড়া বাঁচবো না। আমি বললাম,
-এসব তুমি কী বলছো মৌ? আমি তোমাকে সিঁদুর পরিয়ে বিয়ে করেছি।
ও আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললো,
-চুপ করো। সিঁদুর পরালেই বিয়ে হয় না। বিয়েতে মন্ত্র লাগে। আমি সব জানি। তুমি চলে যাও। আমি আর যাবো না।
আমি ওকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। কান্নাভেজা কণ্ঠে বললাম,
-আমি তো তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না মৌ। তুমি আমাকে মেরে ফেলতে চাও? তাহলে আমাকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলো।
বলেই অঝোরে কাঁদতে লাগলাম। সত্যি বলছি,আমার বুকভাঙা কান্নায় আমি মুষড়ে পড়েছিলাম। শত হলেও নারীর মন। মৌ নরম হলো। বললো,
-তাহলে আমাকে ফেলে কেন চলে যাও বারবার? আমার কষ্ট হয় না? তুমি তো আমাকে তোমার বাবা মার কাছেও নিচ্ছো না। তোমার কোনো আত্মীয়স্বজন আমাকে চেনে না। এভাবে থাকা যায়?
আমি ওকে গভীর চুম্বন দিয়ে বললাম,
-এবার সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি আমার সাথে চলো।
সেবার আমি সাতদিন থাকলাম মালয়েশিয়া। আসার সময় ওকে নিয়ে ফিরলাম। ওর মা বোন খুব খুশি হলো। এরপর ওকে নিয়ে সংসারই শুরু করলাম। বাবা মাকে বলতাম,ব্যবসার কাজে বাইরে যেতে হচ্ছে। কিন্তু সংসার করতে গিয়ে প্রথম কয়েকমাস ভালো কাটলেও কয়েকমাস কর দেখলাম ওর সাথে আমার খিটমিট লেগেই যাচ্ছে। যেসব কারণে শীলার সাথে লাগতো,সেসব কারণে ওর সাথেও লেগে যাচ্ছে। আমি অবাক হয়ে গেলাম। এই মৌকে আমি চিনি না। একবছর আগেও তো ও কেমন প্রেমময়ী ছিল। রাতের বারোটায় কল করে আমার বাসার গেইটে এসে আমাকে ফুল দিয়ে গেছে। সেই মৌ এভাবে পাল্টে যাচ্ছে কেন? ওর বান্ধবী রিনির সাথে আবার খুব খাতির হয়েছে। রিনি এখন আমেরিকায় থাকে। একটু সময় পেলেই ওর সাথে কথা। অনেকসময় আমি বাসায় থাকলেও আমাকে উপেক্ষা করে। এর মধ্যে সে আবার কনসিভ করলো। এবার আমি না,সে নিজে গিয়েই এটা নষ্ট করে এলো। আমি রেগে গিয়ে বললাম,
-তুমি আমাকে না জানিয়ে এমনটা করলে কেন?
ও নির্লিপ্ত স্বরে বললো,
-জরায়ু আমার,ডিসিশনও আমার। তুমি কী বলবে?
আমি মেলাতে পারছিলাম না। এ কি সেই মৌ? দুইবছর হলো ওকে নিয়ে আলাদা আছি,এরই মধ্যে আমি ওর কাছে বিরক্তিকর হয়ে গেলাম? ভাবলাম,কয়দিন ওর কাছ থেকে দূরে থাকি। তাহলে হয়তো তিক্ততা কিছুটা কমবে। কয়েকদিন নিজের বাসাতেই রাত কাটালাম। দেখলাম,দুইদিন পর থেকে অফিসে আসা বন্ধ করে দিয়েছে। জেদ করে আমিও ফোন করলাম না। এভাবে কেটে গেলো দশ/বারোদিন। আশ্চর্য, ও একটিবারও আমাকে ফোন করলো না। এমনকি ওর মা বোনও না৷ খুব অবাক হলাম। এতটা অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেলাম মৌ এর কাছে আমি? একদিন ভাবলাম ওকে বাসায় গিয়ে চমকে দিই। কিন্তু কেমন সংকোচ হচ্ছিল। আজকে প্রায় বিশ /পঁচিশ দিন ওর সাথে যোগাযোগ নেই। ভাবলাম হোয়াটসঅ্যাপে একটা ফোন করি। দেখলাম,ব্লক করে রেখেছে আমাকে। এরপর একে একে সব জায়গায় চেক করলাম। সবখানে আমি ব্লকড। এতটা নিষ্ঠুর হয়ে গেলো মৌ? কী চায় ও? সোজা চলে গেলাম ওর বাসায়।

ওর মায়ের মুখে সব শুনে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। একটা কথাও আসছে না আমার মুখে। ওর মা জানালো, মৌ নাকি চিরতরে কানাডায় চলে গেছে। আমাকে বলে গেছে,আমি যেন ওর খোঁজ না করি। কী আশ্চর্য! এতসব ও করলো কখন? আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না? আমি জানতাম উপরমহলে ওর ভালো যোগাযোগ। অনেকসময় সেটা আমি কাজেও লাগিয়েছি। তাই বলে সে আমার সাথে এত জঘন্য খেলা খেললো! সবকিছু মৌ এর কাছে খেলা মনে হয়? তিন তিনটা হাজবেন্ডকে ডিভোর্স দিয়ে,একজনের সাথে ডিপ রিলেশন ব্রেকআপ করে ও আমার কাছে এসেছিল। শেষপর্যন্ত আমাকেও ছেড়ে গেলো? কী চায় ও? ওকে কানায় কানায় ভরিয়ে দেবার পরেও বেঁধে রাখতে পারলাম না? তবে কি ও সংসারবিমুখ? আমি ওকে সংসারী করতে চেয়েছিলাম বলেই কি ও উড়াল দিলো? অলীক সোনার হরিণের মতো সে শুধু পালিয়েই বেড়ালো।

ও বারণ করলেও আমি ওর খবর নিয়েছিলাম। ও মিথ্যে বলেছিল। কানাডায় না,ও নিউইয়র্ক গিয়েছিল। রিনিই নিয়ে গেছে। যদিও আমাকে সব জায়গায় ব্লক করে রেখেছে, তবুও ওর বোনের ফোন থেকে একবার কথা বলেছিলাম। ও কঠিনভাবে জানিয়ে দিয়েছিল আমি যেন ওর পথে বাধা হয়ে না দাঁড়াই। আমি ওর পাশে থাকলে ও জীবনে বিকশিত হতে পারবে না। আর আমি যদি ওকে সত্যিকারভাবে ভালোবাসি তবে যেন আমি আর কখনো ওর খোঁজ না করি। আমি ওর কথা রেখেছি,কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও ভুলতে পারিনি। ও যতদিন কাছে ছিল ততদিন হয়তো ওকে এতটা অনুভব করতে পারিনি,কিন্তু এখন বুঝি ও আমার কতটা জুড়ে ছিল। আজও আমি ওকে ভালোবাসি।
**************************

Leave a Reply