সে আছে হাওয়ায় মিশে
জাকিয়া শিমু
এভার গ্লেডস-এর বাঁধের ওপর চুপচাপ বসে আছি। এই এভার গ্লেডস’ ইকোপার্কটি আমার বাড়ির বাইরদুয়ারে! তাই সময়সুযোগ পেলে প্রায়দিন শেষ বিকেলে এসে বসি। হাতে থাকে বিকেলের ধুঁয়াওঠা কফিমগ। বাঁধের উপর দূর্বাঘাসের বিছানায় নির্ঝঞ্ঝাট বসা যায়। এখান থেকে সূর্যাস্ত বড়ো নিখুঁতসুন্দর দেখায়। আয়েশ করে কফির মগে মুখ রেখে প্রায় অস্তাচলে যাওয়া সূর্যের দিকে তাকিয়ে আছি। পড়ন্তবেলার এই সময়টা বড়ো বিষাদময়! বুকের ভেতর কেমন একটা অচিনব্যথা চিনচিন করে। যেন খুব কাছেরমানুষ হারিয়ে গেল-এমনতর অনুভূতি। এমন সময় সাইকেলের অবিরিত বেলে’র শব্দে নিজের মধ্যে ফিরি! কেউ একজন কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে! মুখ ঘুরিয়ে দেখি; একটি ছেলে, সাইকেলের হ্যান্ডল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আমি জিজ্ঞাসু চোখে ওর দিকে তাকাতে ছেলেটি হেসে হাত নাড়ে এবং দ্রুত সাইকেলে চড়ে চলে যায়!
বাঁধের পশ্চিমদিক পুরোটাই দিগন্ত ছোঁয়া বিল। বিলের মাঝবরাবর হেঁটেচলা একটি সরু মেটেপথ। দূর থেকে পথটিকে মনেহয় যেন কোন এক গ্রাম্যমেয়ে অপটুহাতে জলছাপা শাড়ির মাঝ বরাবর লম্বা একটি সেলাই দিয়েছে। সে পথে হেঁটে যাওয়া যায় মাইলের পর মাইল। পথটির শেষপ্রান্ত ছুঁয়েছে আটলান্টিক মহাসাগর! সূর্যাস্তের ঘোরলাগা সময়ে হেঁটে যেতে যেতে মনে হয় যেন পথের শেষে সূর্যটা অনড়ে দাঁড়িয়ে আছে আর একটু পা চালালে ছুঁয়ে আসা যাবে। ছেলেটি সেপথ ধরে সাইকেল চালিয়ে সূর্যের দিকে এগিয়ে যায়। আমি ওর যাবার পথে তাকিয়ে দেখি, দূরে যেতে যেতে একসময় সে কপালের টিপের মতো সূর্যটার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যায়!
ছেলেটি শূন্যে মিলিয়ে যেতে টের পেলাম সে আমার পরিচিত কেউ! পরিচিত কেনো বলি, সে আমার খুব কাছের মানুষ! কিন্তু ওর পরিচয় মনে পড়ছে না! আমি আগাগোড়া ভুলোমনের মানুষ! আমি চোখ বন্ধ করে ওর হাসিময় চেহারাটা পরখ করে দেখতে চেষ্টা করি যাতে তার পরিচয় মনে পড়ে। ছেলেটির সরু নাকের মাথায় দূর্বাঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরের মতো ঘাম জমে আছে। চোখের মণিদুটো মার্বেলের মতো নড়চড় করছে। সে যখন আমার দিকে তাকিয়ে যখন হেসে উঠল মনেহল যেন তার পুরোশরীরে সে হাসিরঢেউ ছড়িয়ে পড়ছে!
ঠিক এমন কেউ একজন আমার খুব কাছের মানুষ আছে! কিন্তু তাকে সঠিক মনে পড়ে না এইসময়ে! মাথাটা গোলমেলে ঠেকে! ছেলেটিকে নিয়ে ভাবি; সন্ধ্যা নামে,পশ্চিমাকাশের কমলারঙ মিলিয়ে যেয়ে আকাশে তারাদের জলসা বসে কিন্তু আমি ঠায় সেখানে বসে থাকি! ছেলেটিকে স্মৃতিরগহ্বরে হাতড়ে খুঁজি কিন্তু পাই না!
আমার ইনসোমনিয়া রোগ আছে। মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে যায় এবং বাকিরাত জেগে থাকতে হয়। যদিও তা আমার এখন ভারি অভ্যাস হয়ে গেছে। প্রথম প্রথম উদ্বিগ্ন হয়ে ডা কবিরাজের পেছনে ঘুরেছি। তারা দুনিয়ার ওষুধপত্র দিয়েছে এবং তাতে শরীরে নিদেনপক্ষে নতুন নতুন রোগের সংযোগ ঘটেছে! একসময় বিরক্ত হয়ে ওষুধপানি ছেড়েছুঁড়ে নিজের মতো করে মানিয়ে নিয়েছি। এখন ঘুম ভেঙ্গে গেলে বরং খুশি হই। বিছানায় শুয়ে তাবৎ দুনিয়ার বিষয়আশয় নিয়ে ভাবতে বসি। নিশুতিরাতে নিজের সাথে একান্ত নৈকট্যে সময় কাটানো মন্দ নয়। আজ ঘুম ভাঙ্গতে বিকেলের সেই ছেলেটির কথা মনে পড়ে। চোখ বন্ধ মস্তিস্কের স্মৃতিগহ্বরে জমে থাকা স্মৃতির অতলে ছেলেটির সন্ধান করি! তাতে কাজ হয় তার কথা স্পষ্ট মনে পড়ে!
প্রায় ষোল বছর আগেকার ঘটনা। অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়ি। ছোট বোনের স্কুল ফাইনাল-এর পরীক্ষাকেন্দ্র আমাদের গ্রাম ছেড়ে প্রায় সাত আট মাইল দূরের এক স্কুলে। আমি সাতসকালে তাকে নিয়ে রওনা হই এবং কেন্দ্রে পৌঁছে দিয়ে তিনচার ঘণ্টা বাইরে অপেক্ষা করি।
তখন গ্রামদেশে এমন যান্ত্রিকযুগ শুরু হয়নি। আমি শহরে পড়ি কিন্তু আমার হাতে আজকের মতো তথ্যযন্ত্র তখনো আসেনি। অপিরিচিত জায়গায় একা লম্বা সময় পার করা ক্লান্তিকর তো বটেই! নিদেনপক্ষে আমার কাঁধে বইখাতাসমেত একখানা চটের ব্যাগ ঝুলানো থাকতো বলে রক্ষা। পরীক্ষা শুরু হতে কেন্দ্রের সীমানায় থাকার জো নেই। তো কেন্দ্র থেকে কিছুটা দূরত্বে একটি শিমুল গাছের তলায় যেয়ে দাঁড়াই। তখন শীতকাল প্রায় শেষ শেষ অবস্থা। প্রকৃতি সহনশীল। না গরম না ঠাণ্ডা এমন একটা অবস্থা। থেকে থেমে ফাগুনের হাওয়া বইছে। শিমুল গাছের পাতা ঝড়ে গাছ প্রায় ন্যাড়া হয়ে গেছে। পাতাহীন গাছে অজস্র রক্তরঙা শিমুল ফুল ফুটে আছে। গাছের ডালে কাক কোকিল একত্রে বসে বিশ্রাম নিচ্ছে। এমন সুন্দর এক গাছেরতলে আমি বিছিয়ে থাকা পাতার চাদরে হাত পা মেলে বসে পড়ি।
অপেক্ষাসময় সহজে কাটে না। হাতঘড়িতে সময় বলে আরো পাক্কা দুই ঘণ্টা বাকি! সময় কাটানোর অবশ্য বিশেষ একটি উপায় আমার জানা আছে। আমার চিঠি লেখার বাতিক আছে। সে এক অদ্ভুত বিষয়! চিঠি লেখাতে একাগ্র হয়ে দিনদুনিয়া ভুলে যাই এবং নিজের জগতের সাথে একান্ত নিভৃত এবং চমৎকার সময় পেরিয়ে যায়। এমন ধ্যানধরা সময়ে অনায়াসে প্রায় বিশপচিশ পৃষ্টা লিখে ফেলতে পারি। তবে সে চিঠি কখনো পোষ্ট করা হয় না। হবে কী করে! প্রাপকের ঠিকানা যে জানা নেই। প্রাপক সেও ঠিকানাবিহীন- গাছপালা,ফুল, পাখি, নদী, প্রিয় কোন মানুষ যাকে বলতে পারিনি সে আমার মনে বাস করে! এমন কি সৃষ্টিকর্তার কাছেও চিঠি লিখি। চিঠি শেষ করে বারকয়েক মনোযোগে পড়ি এরপর ভুলত্রুটি ঠিকঠাক করি। যেন বাংলা পরীক্ষায় বিশেষ প্রশ্নের কোন উত্তর লিখতে বসেছি। এরপর ছিঁড়ে কুটিকুটি করে হাওয়ায় ভাসিয়ে দিই!
দীর্ঘ দু’ঘণ্টা সময় কাটাতে চিঠি খেলা শুরু করি। প্রায় ঘণ্টাখানেক লিখে মনোযোগে ভুলভাল সঠিক করি। এরপর ছিঁড়ে শূন্যে ভাসিয়ে দিই! এতক্ষণ দিনদুনিয়া ভুলে নিজমনে ডুবে ছিলাম! কান সজাগ হতে শুকনোপাতার খসখস আওয়াজ কানে আসে। পেছন ফিরে ছেলেটিকে দেখতে পাই। সেও এতক্ষণ গাছতলায় বসে আমাকে দেখছিল! এবার সে একগাল হেসে এগিয়ে আমার কাছে এসে দাঁড়ায় এবং বেশ পরিচিত ভানে বলে, ‘এতক্ষণে লেখা চিঠি ছিঁড়লে কেনো’! আমি সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন সমবয়সী মানুষের এমনতর প্রশ্নে বিব্রত হই।
ছেলেটি বোধহয় আমাকে সহজ করতে তার পরিচয় দেয়। ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। সেও আমার মতো ছোট ভাইকে নিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে অপেক্ষা করছে। তার বাড়ি এখান থেকে মাইল চারেক দূরে কোন এক গ্রামে। ছেলেটির নাক খাড়া এবং নাকের ডগায় ভাঙ্গা কাঁচের টুকরোর মতো দানা দানা ঘাম জমে আছে। চোখের মণি হালকা বাদামী এবং তা মার্বেলের আদলে অবিরত নড়চড় করছে।
পরদিন সেই শিমুলতলায় আবার আমাদের দেখা হয়। ও বয়সটা যে বন্ধুবয়স, আমরা বেশ স্বচ্ছন্দে একবেলার পরিচয়ে কাছেরবন্ধু বনে যাই। ছেলেটি বলল,”আজ চিঠি খেলা বাদ দাও, চল কোথায়ও ঘুরে আসি।” আমি রাজী হয়ে গেলাম। এগাঁয়ের সীমানা ঘেঁষে সুন্দর একটি নদী আছে। নদীর নাম ইছামতী। আমরা নদীপার ধরে হেঁটে যাই বহুদূর। নদীর ওপারে মাঠের পর মাঠ সবুজ পাতায়মোড়া আলুক্ষেত। বাঁশেরসাঁকো ধরে নদী পার হয়ে আলুরমাঠ ধরে হেঁটে চলে যাই বহুদূর দিগন্তের কাছাকাছি। আমি ছেলেটির নাম জানি না। গতকাল সে আমার নাম জানতে চাইতে আমি বলি, আমি শিমুল! আদতে আমার নাম শিমুল নয়! গাছভরা শিমুল ফুল দেখে এমন নামটি হুট করে আমার মুখে চলে আসে!
চিঠিখেলার মতো আমি নাম’ নিয়েও খেলতাম! একবার এই নাম-খেলা নিয়ে মহাবপদে পড়ি! ঢাকা শহরের এক শিক্ষকের কাছে রসায়ন বিষয়ে প্রাইভেট পড়তে গেছি। আমার সেই রসায়ন শিক্ষকের হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন আমার বাবা। আমি পারতপক্ষে বাবার পরিচয় দিতে চাইনি কিন্তু শিক্ষক হয়তো কোনভাবে আমার পরিচয় জেনে যান! এবং স্বাভাবিকভাবে তিনি আমার নাম জিজ্ঞেস করেন।
তখন বর্ষাকাল চলছে এবং বাইরে তুমুল হারে বৃষ্টি পড়ছে। আমি হুট করে বলি, ‘আমার নাম বর্ষা!’ কেনো নিজের নাম গোপন করি তার ব্যাখ্যা আমার নিজের কাছেও নেই! তিনি তার স্যারের মেয়ে হিসেবে আমাকে বেশ খাতিরযত্ন করেন এবং মাস শেষে প্রাইভেট ফি’ পুরো পাঁচশত টাকার একটি কড়কড়ে নোট তার স্যারকে সন্মান করে আমার কাছে ফিরিয়ে দেন।
আমি বাবাকে না জানিয়ে সে টাকা নির্দ্বিধায় হজম করে ফেলি! পরের মাসে এবং প্রায় তিন চার মাস এমন অবস্থা চলতে থাকে। শিক্ষক প্রতিমাসে বাবার দেওয়া নোটটা আমাকে ফিরিয়ে দেয় আর আমি মনেরসুখে ফালতু খরচে টা উড়িয়ে দিই। এরপর
শিক্ষক ছুটিতে গ্রামেরবাড়ি গেলে আমার বাবার সাথে দেখা হয়। অনেক কথার ভিড়ে, বাবা কেনো তাকে আমার প্রাইভেট পড়ার টাকা সেধে লজ্জা দেন সে প্রসঙ্গ তুলেন! বাবা দ্বিধায় পড়ে যান কারন বর্ষা নামে বাবার কোন মেয়ে নেই আর কোন টাকাও বাবা ফেরত পায় নাই! আমি ধরা পড়ে যাই! সেই ঝামেলার কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে ছেলেটিকে আবারও বানানো নাম বলে ফেলি আমি!
আমরা আলুক্ষেতের আল ধরে বহুদূর চলে আসি। একসময় ক্লান্ত হয়ে উঁচু ডিবির মতো জায়গা দেখে পাশাপাশি দুজনে বসে পড়ি। মনেপড়ে ওর নাম জানা হয়নি। ছেলেটির নাম জিজ্ঞেস করতে মার্বেল চোখজোড়া নাচিয়ে হেসে উঠে। বলে, “ আমার কোন নাম নেই। তুমি একটি নাম দিয়ে দাও’। আমি নাম খুঁজি। চারদিকে সবুজ আলুর মাঠ আর মাথার উপর ঝকঝকে নীল আকাশ। নীল-সাদা বাটিক শাড়ির জমিনের মতো আকাশে ছোপ ছোপ সাদামেঘ উড়ছে। সেদিকে তাকিয়ে ওর নাম দিই, মেঘ!
সেদিন থেকে আমি শিমুল আর ছেলেটি মেঘ। প্রতিদিন আমরা ওদের পরীক্ষা কেন্দ্রে ঢুকিয়ে, হেঁটে চলে যাই গাঁয়ের বাজারে। টঙ্গ দোকানে চা-সিঙ্গারায় ডুবে কোন দিকে বেড়াতে যাবো ঠিক করে নিই। নদীর তীরে একটি একটি বটগাছ। বসন্তকাল। বটের পাতা ঝিরঝির বাতাসে নড়ে। বটের ডালায় পাখিদের হাট বসে। আমরা গাছের তলে দাঁড়িয়ে গল্প করি। বটগাছটি পেছন রেখে একটু এগিয়ে গেলে বাঁশের সাকোঁ। সাঁকোটির শেষমাথা ভাঙ্গা-ফাঁকা। আমরা সাঁকো পেরিয়ে শেষমাথায় হাঁটু পানি ভেঙ্গে ওপারে যাই। ওপারে দিগন্ত জোড়া আলুর ক্ষেত, পানের বুরুজ, আকাশ উন্মুক্ত, বাতাসে বসন্তের ঘ্রাণ।
মেঘ চমৎকার ছবি আঁকে। ওর কাঁধেে শান্তি নিকেতনী ব্যাগে ছবি আঁকার নিজিসপাতি। ছবি আঁকার বড্ড তেষ্টা আমার! এই বিদ্যা আয়ত্ত করতে চেষ্টার কমতি করিনি। দস্তুরমতো বাড়ির উঠোন খড়ি দিয়ে এঁকেঝুঁকে বালু তুলে ফেলেছি কিন্তু একটি ফুল কিংবা পাখির অবয়ব তুলতে পারিনি! আমি ওর পাশে বসে একমনে ছবি আঁকা দেখি। একটানে তুলির আঁচড়ে খাতার মাঝে হুবহু প্রকৃতি তুলে আনে! আমাদের দু’বন্ধুর মুহূর্তগুলো খুব সুন্দর কেটে যায়।
আমার পড়ার নেশা। মেঘ বুঝতে পেরে ‘সুনীলের কেউ কথা রাখেনি’ কবিতার বইটি আমাকে উপহার দেয়। তখনকার সময়ে এই বইটি’ উপহার দেওয়ায় বোধহয় একটি রেওয়াজ ছিল। আমাদের বয়সী সাহিত্যবিমুখ বন্ধুটিও এ বই’য়ের কবিতা নিয়মিত আওরাত। পরীক্ষা শেষ হয়ে আসে। প্রায় দু’সপ্তাহ আমাদের স্বপ্নের মতো সময় কেটে যায়। শেষদিনে মেঘ ওর আঁকা একটি ছবি আমাকে উপহার দেয়। ফুলেভরা শিমুলগাছে একটি কাক উদাস হয়ে বসে আছে। এই শিমুল গাছটির নিচে আমাদের প্রথম দেখা হয়।
এরপর আমাদের দু’বন্ধুর আর দেখা হয় না! আমি চলে আসি শহরে। চিকিৎসা বিদ্যা পড়তে মেঘ চলে যায় দূরের কোন শহরে। মোটেরওপর যোগাযোগের মাধ্যম এখনকারদিনের মতো সহজ ছিল না। অবশ্য যোগাযোগের তাগিদে মানুষ চিঠি কিংবা ল্যান্ডফোন ব্যবহার করত। পরের মাধ্যমটি আমাদের মতো ছাত্রদের জন্যে কঠিন হলেও নিদেনপক্ষে চিঠিপত্রে যোগাযোগ রাখা যেত। কিন্তু আমরা কেউ কারো ঠিকানা জানি না! এমনকি একে অপরের সঠিক নামটি আমাদের জানা নেই! নামঠিকানাবিহীন- মেঘকে মনে পড়ে আফসোস হত! একসময় নতুন স্মৃতিরভাঁজে পুরনো মেঘ’ নামটি চাপা পড়ে যায়!
পড়াশুনা শেষ করে আমেরিকা চলে আসি। ছাত্রকালে ডায়েরি লেখার অভ্যাস ছিল আমার। দেশ থেকে বয়ে আনা সেসব ডায়েরির ভেতর মেঘে’র দেওয়া সুনীলের কবিতার বইটিও চলে আসে। এক ছুটির বিকেলে ডায়েরি ঘাটতে বইটি চোখে পড়ে। কবিতার বইটির ভেতর চারকোণা ভাঁজের ‘শিমুল ডালে কাকের উদাস চাওয়া’ ছবিটি পাই! ছবিটিতে তাকিয়ে দেখি শিমুলগাছ,মৃদু কুয়াশায় আচ্ছাদিত ইছামতী নদী, বাঁশের সাঁকো, আলুক্ষেত, পানের বুরুজ, মেটেপথ আরো কতো খণ্ড খণ্ড মুহূর্তের ছবি। মেঘ’কে খুব করে মনে পড়ে! ওর ঘেমে ওঠা নাকেরডগা, মার্বেলের মতো ছটফট করা চোখের মণি,হেসে ওঠা শরীর। মাত্র ক’দিনের বন্ধুত্ব হলেও সম্পর্কটি ছিল বড়ো পোক্ত। বড্ড আফসোস হয় ওর খোঁজ নেয়া হয়নি বলে! সে অপরাধের উসুল দিতে বোধকরি ফ্রেমে ভরে বসারঘরে ঝুলিয়ে রাখি ছবিটি।
আমেরিকায় পড়াশুনা শেষে চাকুরী নিয়ে বিভিন্ন ষ্টেটে ছুটোছুটি করি। এবং মেঘে’র ছবিটি আমার হাতছাড়া হয়। এদেশে ভারি জিনিসপাতি এক ষ্টেট থেকে অন্য ষ্টেটে নিতে প্রচুর খরচ হয়। পুরনো জিনিসপত্র টেনে নিতে যে টাকা-ধকল যায় তার বিনিময়ে নতুন জিনিস অনায়াসে কেনা যায়। বাধ্য হয়ে শখের জিনিসপাতিও মানুষ পরিচিত কাউকে দান কিংবা অল্পমূল্যে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়। আমিও আমার সরঞ্জাম বাঙালি পরিচিতদের মধ্যে বিলিয়ে দিই। তবে মেঘে’র আঁকা ছবিটি কেউ নিতে চায় না! কুসংস্কারে আগাগোঁড়া মোড়া জাতি কাকের মতো উপকারী প্রাণীকে অমঙ্গলের ছুতুয় ঘরে ঠাই দেয় না! আমি কাঁচেরফ্রেমে বাঁধা ছবিটি স্থানীয় দানশালায় রেখে আসি। নিদেনপক্ষে কারো ঘরে মেঘে’র আঁকা ছবিটা যতনে থাকুক।
প্রায় পনের বছর পর এই ছেলেটি এসে আমার মস্তিস্কের ভাঁজ ভেঙ্গে মেঘ’কে উন্মুক্ত করে দিল। হুবহু মেঘ’ যেন। সেই নাকের ডগায় ফোঁটা ফোঁটা ঘাম, চোখ, শরীরদোলা হাসি। বিকেলটা শেষ হয় কূলকিনারাহীন ভাবনায়! আদতে এতদিন পর মেঘ’ একই বয়সে আটকে থাকবে না। তারপরও অবুঝ খুকির মতো মনে হয়, মেঘ’-ই হবে!
প্রতিদিন অবেলায় এভার গ্লেডস’ এ যেয়ে বসে থাকি। মেঘে’র দেখা যদি পাই! দুপুর- বিকেল- সন্ধ্যা নামে। রাত ভারি হতে বাড়ি ফিরে আসি। মেঘ আসে না!
আমি ঘন ঘন দেশে যাই কিন্তু দেশে যেয়ে কখনো মেঘে’র কথা মনে পড়ে নাই! নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়। বিক্ষিপ্ত মন আমাকে নাজেহাল করে তোলে। ছেলেটি হয়তো ভুল নামে আমাকে খোঁজ করেছে কারন আমার গ্রামের নাম সে জানত। এসব এলোমেলো ভাবনা আমাকে ঘুমছাড়া করে রাখে। মেঘে’র ভাবনায় আমার অফিস ঘরসংসার সবকিছু অসাড় মনে হয়!
কিছুদিন বাদে জরুরি ছুটি নিয়ে দেশে যাই। এবং সেই কবেকার স্মৃতির উপর ভর করে মেঘ’কে খুঁজতে বের হই! স্কুল এবং নদীটির নাম ভুলিনি। কিন্তু স্কুলটি আগের মতো নেই! শিমুল গাছটিও নেই! একতলা স্কুলঘর তিনতলা হয়েছে! নদীটি নামে এখনো টিকে আছে বটে তবে বদলেছে ঢের! নদীর বুকে বালির পাহাড়! তবে বটগাছটি ডালপালা খুইয়ে হলেও বাসঘাট ঘেঁসে কোনমতে নিজের অস্তিত্ব ধরে রেখেছে! বটের কাছ ঘেঁষা সেই টঙ্গদোকানের স্থানে আড়াইতলা উঁচু দালানে শপিং সেন্টার!
আমি স্মৃতি হাতড়ে মেঘ’কে খুঁজি! সেই ইছামতী নদী যার বুকের উপর পাতা সাঁকো পেরিয়ে আমরা ওপারে গিয়েছি! এখন এর বুকে একবিন্দু জল নেই! নদীটি পায়ে হেঁটে পার হতে হয়! ওপারে আলুক্ষেত দেখতে অনেকটা আগের মতো আছে। তবে দিগন্তছুঁয়া ফসলীমাঠ লোকবসতির ভারে নিশ্চিহ্ন প্রায়! আমি পায়ে হেঁটে সেপথ ধরে অনেক দূর চলে যাই, মেঘ’কে খুঁজি কিন্তু মেঘে’র সন্ধানমেলে না!
দিন শেষে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে আসে! বিষণ্ণ মনে বাসঘাটে ফিরে আসি, বাড়ির পথ ধরব বলে। বাসঘাটের বটতলায় ততক্ষণে নানান লোকের জটলা জমেছে। বাউল ধাঁচের গ্রাম্য কোন গানের দল হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইছে। তাকে ঘিরে বসেছে বাহারি টং-দোকানপাট। আমি বটগাছের উল্টোপাশে বাসের টিকিট নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে যাই। সহসা বাস চলে আসতে সিটে যেয়ে বসি। বাসের ঝপসাকাঁচের ভেতর দিয়ে বটতলার জটলা আবছায়ে দেখা যায়। বাসে বসে বাইরের দৃশ্য দেখছি। সহসা চোখ আটকে যায়; বটেরজটে পা এলিয়ে আরামভঙ্গিতে বসে আছে মেঘ! সেই মেঘ; যাকে আমি এভার গ্লেডস-এর পথ ধরে সূর্যের সাথে মিলিয়ে যেতে দেখেছি, যার দেওয়া কবিতার বই বুকে চেপে আমার কাটে নির্ঘুম রাতের প্রহর!
*******************************
