অবলম্বন
ইসরাত জাহান
আমি প্রেমকে কঠিন ভেবেছিলাম
এও দেখি সহজ, এখন কী করি!
– জন এলিয়া
আজ এই মুহূর্তে!
সন্ধ্যাটা তখনও কাঁচা। আব্দুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ডের আশেপাশে বিশৃঙ্খল কিছু মানুষ সবকিছু অগ্রাহ্য করে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করেছে। সবসময় এমনই থাকে। হয়তো কারো ঘরে ফেরার তাড়া। নয়তো কেউ প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষার করছে। টংয়ের দোকানে চায়ের ধোঁয়া গিলছে দিনময় ক্ষুধার্ত কেউ না কেউ। পেটের ভেতরে নাড়িভুড়ির চিনচিনে ব্যাথা সহ্য করছে দুই একজন। হয়তো কেউ আড়ালে দাঁড়িয়ে নিরবে খাবার গুঁজে। দু-একজন নিম্নতলের বাড়তি তরলটুকু নির্গমনের আশার আড়াল খোঁজে। ওদের সবার ভেতরে দুটো জিনিষের বড্ড মিল, সবাই ছোটে আর খোঁজে। এই যেমন এই মুহূর্তে গজনবী বাসটি ছুটে চলার আশায় যাত্রী খোঁজে। ওই যে, বাসের দরজায় দাঁড়িয়ে হ্যান্ডেল ধরে বিরতিহীনভাবে ডেকে যাচ্ছে কিশোর ছেলেটা। শুকনো মুখে এদিক ওদিক তাকায়। কারো সাথে চোখাচোখি হলেই হাত নাড়িয়ে ডাকে।ওর ডাকে কয়েকজন মানুষ বাসে উঠে। এক দুইজন তাড়ার কারণে নেমে যায়। কেউ কেউ একটু উঁকি দিয়ে বাসের ভেতরকার অবস্থা দেখে। এই উঁকি দিয়ে উঠা নামার মাঝে তাসলিমা গজনবী বাসটিতে উঠে পড়ে। মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসনে চোখ পড়তেই মেজাজটা তেলে পানি পড়ার মতো ছ্যাঁত করে ওঠে। মধ্যবয়স্ক এক পুরুষ পা দু’টো ছড়িয়ে আয়েশি ভঙ্গিতে সেই আসনে বসা আছে। রাগটা তরতর করে আরো বেড়ে যায়। মনে মনে কয়টা গালি দিয়ে মধ্যবয়স্ক পুরুষটাকে টপকে জানালার পাশ গিয়ে বসে। বাসে ওঠার সময় হাড্ডিসার হেলপার ছেলেটার সাথেও একটু খিটিরমিটির বেঁধে ছিল। আর বাঁধবেই না কেন?আজ ঘর থেকে বের হবার সময়ই মেজাজটা গরম ছিল। সেই রাগ এতোক্ষন শিরা উপশিরায় ছোটাছুটি করে। বাসে ওঠার সময় চুড়ান্ত রূপ পায়। তাইতো তাসলিমা হেলপার ছেলেটাকে ‘সইরা খাড়াইতে পাড়স না’ বলে বেশ রুক্ষ স্বরে।
হেলপার ছেলেটা অবশ্য সেই কথাটা গায়ে মাখায়নি, উদাস ভঙ্গিতে অন্যদিকে একবার তাকিয়ে সরে দাঁড়ায়েছিল, তারপরে চিরচেনা ভঙ্গি ও সুরে নতুন যাত্রীদের ডেকে যাচ্ছিল বাসের গায়ের মৃদু ও তীব্র চাপ আঘাত করতে করতে।
এই জসিমউদদীন, কুড়িল, কাকলী, এই জসিমউদদীন, কুড়িল ফার্মগেট, নিউমার্কেট। এই…
দরজায় দাঁড়িয়ে আবারও বিরতহীনভাবে ডেকে যায় মিশকালো রুগ্ন ছেলেটা।
আজ এই মুহূর্তে অন্য কোথাও…
চারপাশে বিষণ্ণ বিকেলের নরম হলদে আলোটুকু দশ তলা ভবনের আটতলার ২২০০ স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটে হ্যাংলার মতো রোজ দুপুরে হানা দেয়, চারপাশটা তাতিয়ে তপ্ত রোদটা নরম মিহি একটা সুখের সুরাঙম তোলে ধীরে ধীরে , এই বসার ঘরটা সুন্দর সব আসবাবে সাজানো, মাঝেমধ্যে ইনডোর প্ল্যান্টগুলোতে, পলিশ ফার্নিচারে টুকরো টুকরো রোদ হেসে খেলে গড়িয়ে পড়ে। চারপাশটা তখন তুলির আঁচড় টানা ছবির মতো সুন্দর হয়ে ওঠে। এই বসার ঘরটার একটা দেয়ালে জুড়ে বিশাল আয়না, অন্য দেয়ালটায় ছোট বড় নানারকম পেইন্টিং, মাঝে মাঝে সবুজাভ-হলদে রংয়ের ঝিলিক দেয় দেয়ালটা সবুজ রং হওয়ার কারণে, অন্য দু’পাশে জানালা ও বারান্দার থাইয়ে ফিনফিনে শ্বেত শুভ্র পর্দা ঝোলানো, সেই আবহে প্রায় মাঝবয়সী এক পুরুষ ঠোঁটে জলন্ত শলাকা রেখে নিবিষ্ট মনে তাকায়ে থাকে মুখোমুখি দৃষ্টি ঘোলা দুরত্বের অন্য এক ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে। আটতলা ব্যালকনিতে ঝুলে ঝুলে হাওয়ায় ভেসে থাকে একটা সহনীয় নীল শাড়ি, শাড়িই মনে হয় দূর থেকে, আবার চাদরও হতে পারে, মাঝে তার কিছু হলুদে ফুল, তারই পাশে ছোট ছোট দুটো গেঞ্জি, আর লম্বা চিকন এক টুকরো কাপড়, হঠাৎ এক ঝটকায় সেই কাপড়গুলো তুলে নিয়ে ফ্ল্যাটের ভেতরে অদৃশ্য হয়ে যায় অস্পষ্ট একটি নারী। লোকটা তাকিয়ে থাকে, তার কালচে জিভটা সুরুৎ করে একটু চেখে নেয় সেই অস্পষ্ট অবয়বটাকে , মনে মনে কল্পনা করে ছায়া সঙ্গী রূপে, মনের ভাবনায় সে ঘুরে বেড়ায়, তখন জলন্ত শলাকাটাকে ঝেরে নেয় ক্রিষ্টালের বাটিতে। ভাবনায় ছেদ পড়ে, দৃষ্টি গুটিয়ে ফেলে, এত দূর থেকে হলেও কায়ারূপি ছায়াটার চোখের দৃষ্টি, ভ্রুকুটি দেখতে পায় সে তার কল্পে। লোকটা খেয়াল করে ছায়াটার আজ কাজের ভীষণ তাড়া।
ব্যালকনিতে বসে এটাই এখন লোকটার প্রতিদিনকার চর্চা, কিছুসময় পরে সন্ধ্যটা নেমে আসার পরে এক ঝটকায় উঠে যাবেন, কফি বানিয়ে আবারও বসবেন। ও ঘরটায় একবার উঁকি দেবেন, ওখানে তার অর্ধ-চেতন প্রিয়জন। পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে প্রায় একবছর বিছানায় শুয়ে আছেন, একমাত্র সন্তান পড়াশোনার তাড়ায় এখন কানাডায় থাকে, ইউনিভার্সিটি অব ওয়াটারলুতে পড়ছে একাউন্টিং এন্ড ফাইন্যান্স নিয়ে। দুই একদিন পর পর ফোন করে মায়ের খবর জানতে চায়, বাবার সাথে ইনোস্টোগ্রামে ছবি শেয়ার করে জানিয়ে দেয় কখন কোথায় কি করে৷ ও বলা হয়নি লোকটার নাম ফয়সাল শাহরিয়ার।
শাহরিয়ার সাহেবও নিশ্চিন্তে আছেন ছেলেকে নিয়ে। অপেক্ষা করছেন ছেলে কবে দেশে আসবে। এখন অবশ্য অপেক্ষা করছেন সেই মেয়েটার জন্য। কিছুক্ষন পরেই কলিংবেলটা বেজে উঠবে, স্ত্রীকে দেখাশোনা করার জন্য প্রতি সন্ধ্যায় এই মেয়েটা আসে। তার কাছে স্ত্রীকে রেখে তিনি বের হবেন। আরো দুজন লোক আছে রোজকার ঘর দেখাশোনার জন্য কিন্ত তার ভরসা হয় না ওদের। কিছুক্ষন বনানী ক্লাবে আড্ডা দেবেন, দুই এক পেগ ভদকা খেয়ে মাথা নুয়ে ফ্ল্যাটে ফিরে আসবেন। তারপরে ঘুম। অপেক্ষা করবেন নতুন এক সকালের। এটাই ফয়সাল শাহরিয়ার রোজকার রুটিন,
সকালটা অবশ্য অন্যরকম, অফিসে যায়, সারাদিনের ব্যস্ততা এক ঝটকায় ঝেরে ফেলে বিকেলের আগেই বাসায় ফেরেন স্ত্রীর কারণে । ইদানীং উড়ুক্কু মনটা সারাক্ষণ বিভ্রান্তের এক গহীন চুম্বন খোঁজে। স্ত্রীর প্রতি প্রবল ভালেবাসা তাকে দমিয়ে রাখে, তারপরও মাঝেমধ্যে শরীরটার ক্ষুধা লাগে, প্রকট বিষণ্নতা ঠোঁটের কাছাকাছি নেমে আসে। খোঁজে আশ্রয়, কান্নারহিত জীবন এখন তার, কাউকে বোঝাতে পারেন না ভেতরকার অভাবটা । শূন্যতা তার প্রতিটি মুহূর্তকে গ্রাস করে। মাঝেমধ্যে ভাবে বিপন্ন কোনদিনে কবিতার ভেতর চুপচাপ তলিয়ে যাবো। ইদানীং প্রতিসন্ধ্যায় কলিংবেলে আঙুল রাখা নারীটাকে তার কবিতার মতো সুন্দর মনে হয়। কোঁকড়া চুল, শক্ত গাঁথুনের অবয়ব, নাকটা টিকল, রংটা একটু চাপা, তারপরও একটা মায়া আছে সারামুখটা জুড়ে। মেয়েটার টাকার অভাব আছে, পুরো পরিবারের দায়িত্ব মেয়েটার কাঁধে, কিন্তু ওর চোখের ভেতরে অন্য এক হাহাকার দেখে শাহরিয়ার, যেন শুষ্ক মরুভূমি। মেয়েটাকে নিয়ে ভাবনার জাল ছিঁড়ে যায় মোবাইলের রিংটোনটা শুনে…
একটা ফোনটা আসে পরিচিত নম্বর থেকে, নম্বরটা তারই এক বন্ধুর, বন্ধু না বলে ব্যাবসায়ীক পার্টনারও বলা যায়, তিনি কোনরকম রাখঢাক না করে সরাসরি জানায় সেই দুঃসংবাদটি। ফয়সাল শাহরিয়ারের চারপাশটা অন্ধকার হয়ে আসে,
আমরা জানি কিছু কিছু খবরের গায়ে অনেকগুলো জামা পরিয়ে দিতে হয়, তারপরে ধীরে ধীরে একটা একটা করে সেই জামাগুলো খুলে নিতে হয়, তখন সেই কঠিন খবরটাও সহনীয় হয় আমাদের কাছে, হঠাৎ জামাহীন খবরটা অসহায় করে প্রিয়জনের সান্নিধ্যহীন
ফয়সাল শাহরিয়ারকে। মাথায় ঘোরে স্ত্রীকে তিনি কার কাছে রেখে যাবে, তাকে যে এখন নিজেকে বাঁচাতে হবে সাথে নিজের এতোদিনের কষ্টে গড়ে তোলা ব্যাবসা।
ফোনটা হাতে নেয় ফয়সাল শাহরিয়ার
হ্যালো…
বাসটা আজমপুরে ওভারব্রীজটা ছেড়ে জসিমউদদীনের আরো একটু সামনে এগোনোর পরেই, নিরব স্রোতের আর্দ্রতাটুকু টের পায় তাসলিমা, সাথে ব্যাথার মিহি শিরশিরে অনুভূতিটা ওর কপালে চিন্তা ছাপ ফেলে দেয়, একটু পরে ব্যাথাটা কমে আসে, আবার একটু পরে পেটের ভেতরে ব্যাথাটা মোচার দেয়। পা দুটো আরো একটু চেপে নারী জন্মের সময় অসময়ের স্রোতটা থামানোর চেষ্টা করে তাসলিমা। চেষ্টা করে কি আর লাভ হবে, গ্রামে রেখে আসা মুখগুলো প্রতিচ্ছবি চোখে ভেসে ওঠার সাথে সাথে নিজেকে মনে মনে গালিগালাজ করে, সাথে ভাগ্যের সাথে বোঝাপড়া। অস্বস্তিটা কপালে ভাঁজ ভাঁজে দৃশ্যমান হয়, পাশে বসা লোকটার গা থেকে উৎকট একটা গন্ধ নাকে শিরশির করে ঢোকে, গা ওর ঘিনঘিন করে , তারউপর অসময়ে বৃষ্টি, শীত নামছে যেন, শীতটাকে কাবু করার জন্য আরো গরম কাপড়ে জপটে ধরে চায় নরম মাংসল শরীরটায়। মিহি স্রোতটা কি সিটে এসে পৌঁছাল, সেই অস্থির ভাবনা ওকে আরো শীতল করে দেয়। তখনি পিছন থেকে অল্পবয়সী ছেলেটা এসে কষকষে ভাষায় বলে,
দিদি মনি ভাড়াটা! ভাড়াটা দিন।
তাসলিমা ব্যাগটা হাতড়ে একশ টাকার একটা নোট দেয় ছেলেটার হাতে।
আফা একটু ছোট্টো দেন, ভাংতি হইবে না।
তাসলিমা করুণ চাহনি দিয়ে একগাল হাসি ছড়িয়ে দেয় ছেলেটার দিকে৷ হেলপার ছেলেটা সে দৃষ্টি আমলে না নিয়ে একশ টাকার নোটটা হাতে নিয়ে এক সিট আগে এগিয়ে যায়, তাসলিমা আবারও ব্যাগ হাতড়ায়, ছোট নোটের আশায়। ও জানে ওর এই ব্যাগে আর কোন টাকা নেই, বের হবারও সম্ভাবনা নেই, তারপরও হাতড়ায়, ঘর থেকে বের হবার সময় পাশের ঘরের উজমার মায়ের কাছ থেকে এই একশ টাকা নিয়ে বের হয়েছিল, মাসের শেষ দিনগুলোতে এই মলিন ব্যাগের ভেতরে অবস্থা বাহিরে অবস্থা থেকেও নাজুক হয়ে যায়। ধরা- কর্য করে সাত আটটা দিন কোনরকমে কাটিয়ে দিতে পারলেই হলো, মাসের এক তারিখে কড়কড়ে ষাটটি নোট পায় প্যারালাইজড চল্লিশ উর্ধ্ব নারীকে সেবা করার জন্য , প্রথম প্রথম বিরক্ত লাগলেও এখন ভালো লাগে ওর কাজটা, তাছাড়া কিছুসময় একটু ঠান্ডা হওয়ায় শরীরটা জুড়িয়ে নেয়া যায়। সাবলেট বাসায় ওর একটা মাত্র ফ্যান, তাও তিনদিন ধরে নষ্ট।
বাসটা রেডিসন গ্র্যান্ড ক্রস করে বেশ সানন্দে।
এইভাবেই কাজ করছে প্রায় দুইমাস, টাকার হিসেবে বেশ ভালো, এই দূর্মূল্যের বাজারে এতো টাকা আজকাল কেউ দেয় না, প্রতিদিন বারো ঘন্টা হিসেবে, কেয়ারগিফার। গার্মেন্টসের চাকরিটা চলে যাবার পরে চোখে মুখে অন্ধকার দেখছিল তাসলিমা, এই কাজেই এখন ওর আশ্রয় ,ধনী এই নারীর বাঁ-পাশের পুরোটাই অচল, বিছানায় এলিয়ে থাকেন, নিজের থেকে নড়াচড়া করতে পারেন, সকল কাজে এখন অক্ষম, সারাক্ষণ বাঁকানো মুখে অস্পষ্ট কিছু কথা বলার চেষ্টা করে, সেই কথার কিছু বোঝা যায় কিছু কথা বাতাসে গায়ে ভেসে বেড়ায়, আকার ইঙ্গিতে বুঝে নিতে হয় তাসলিমাকে। খাওয়া, ঘুমসহ জীবনধারনের সবকিছু ওখানেই শেষ করেন তিনি। মায়া হয় ওর ম্যাডামের জন্য, আগে সেইজন আর বিছানায় এলিয়ে থাকা এইজন একই মানুষ, কিন্তু কতটা আলাদা। দেয়ালে ঝোলানো ছবিগুলো সাক্ষী হয়ে দাঁড়ায় তাসলিমার সামনে, বোঝ যায় অতীতে ম্যাডামের জীবনযাপন কতটা ঝা-চকচকে ছিল। আজ যা সবই তার স্মৃতি।
তাসলিমারও আছে স্মৃতিময় অতীত। বারো- চৌদ্দ মাস আগেও প্রতিদিন ভোরে উঠে ছুটতে ছুটতে বাস ধরে আশুলিয়া পৌঁছতে যেত, সাথে তখন স্বামী ছিল। পাশাপাশি গার্মেন্টসই কাজ করত দুজন, সেখানে পরিচয়, প্রেম, বিয়ে, বিয়ে বয়স এক বছর পেরিয়ে আরো দুইমাস হয়েছিল, এরই মাঝে বিচ্ছেদ। খাতা-কলমের বিচ্ছেদ নয়, চিরবিচ্ছেদ।
হঠাৎ একদিন মজুরি বাড়ানো দাবী-দাওয়াগুলো আদায়ের জন্য মাঠে নেমে আসে অসংখ্য শ্রমিক, শ্রমিকদের অগ্রভাগে কয়জন দাঁড়ায় কান্ডারী হয়ে, সেই কান্ডারী একজন ছিল ওর স্বামী, সেইসময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে অনেকে আহত হয়, দুইজন নিহত হয়। সেই দুজনের একজন ছিল তাসলিমার স্বামী, বর্ষপূতীর আনন্দ যাপন শেষে স্বামীকে হারিয়ে পাগলপ্রায় দশা হয়েছিল ওর, পনেরো বিশদিন অনেক অবশ্য সাহায্য সহযোগিতার বুলি আর ঝুড়ি নিয়ে এসেছিল, কিন্তু লাভের ভেতরে একটাই লাভ হয়েছে, তিনমাস আগে নিজের চাকরিটা হারিয়েছে তাসলিমা, আশেপাশে সবার নিরবতা দেখে বুঝেছিল উপর মহলের অসন্তোষের কারণে , বিদ্রোহীর স্ত্রীকে কেউ ভালো চোখে দেখে না, সবাই না বাহানায় কাছ ঘেঁষতে চায়। তাই আর অপেক্ষা না করে চাকরি পাওয়া আশা ছেড়ে অন্য কাজ খোঁজা শুরু করে। তখনই পরিচিত এক আপার মাধ্যমে এই চাকরিটা পেয়ে যায় তাসলিমা। একজন পক্ষাঘাতগ্রস্ত নারীকে সেবা করতে হবে, সারাদিনের জন্য অনেক লোকজন পাওয়া যায় আজকাল,তাছাড়া ফিজিওথেরাপি দেয়ার জন্য একজন থাকে দিনের বেলায় কিন্তু রাতেরবেলায় কেউ এগিয়ে আসে না। তখন শোকেবির্মষ তাসলিমা এই চাকরিটা লুফে নেয়, রাতে স্বামীর সান্নিধ্যকাতর মনটাকে দমিয়ে রাখার জন্য বনানীর এই ফ্ল্যাটে আসে প্রতিদিন সন্ধ্যা সাতটায়, সারারাত ম্যাডামের পাশে বসে থাকে, রাতজাগা পাখি হয়ে। অর্ধচেতন নারীর সকল নিয়ম অনিয়মের দায়িত্ব পালন করে সকাল অব্দি।
তাসলিমার চোখ থেকে এখন পানি গড়িয়েছে পড়ে না। গড়িয়ে পড়তে দেয় না, সাবধানে সেটাকে লুকিয়ে রাখে। কষ্টটা বুকের ভেতরে রেখে দেয়, মাঝেমধ্যে টোকা দেয়, তখন জমাট বর্ষার মেঘের মতো জলকনা হয়ে নেমে আসে, রোদের আলোতে একটু ঝিলিক দেয়, তারপরে শুকিয়ে যায়। তাসলিমা নিজেকে শক্ত গাঁথনে গেঁথে রাখে, কি দরকার নিজের কথা অন্যকে জানিয়ে, সবাই কিছু সময় উুঁ আহ করবে, তারপরে কথার পিঠে কথা হবে, সেই কথা ডালপালা মেলে অন্য কারে ডালে এলিয়ে পড়বে, তারপরে সেই ডালের সাথে সখ্যতা হবে, সেই সখ্যতা যে হঠাৎ কখনো সংঘর্ষে মোড় নেবে না তা কে জানে। জীবন মানেই সংঘর্ষ, সংগ্রাম। তারচেয়ে এই ভালো, নিজের কথাগুলো নিজের ভেতরে রেখে দেয়া, কি দরকার আগুনের শিখাকে উসকে দেওয়ার। তারচেয়ে এই গাঙের পানির মতো বয়ে চলাই ঢের ভালো।
হঠাৎ বিকট শব্দের হর্নে তাসলিমার ভাবনা তার ছিঁড়ে যায়, সামনে তাকিয়ে দেখে দূরের সড়কসংকেতে সবুজ বাতি জ্বলজ্বল করছে, কিন্তু সমানে আটকে আছে বিস্তর যন্ত্রযান, ধীরে ধীরে সেগুলোর জট খোলা শুরু হয়, গাড়িগুলো পরপর সামনে এগোও, যেখানে সবাই আগে যেতে চায়, সামনে একটি পাজারো, সেটাকে পাশ কাটাতে চায় গজনবী বাসের চালক, তাই তো অস্থির হয়ে হর্ন দিয়ে যায় অসংখ্যবার। একটু ফাঁকা পেয়ে পাশের সিএনজিকে সুযোগ না দিয়ে শব্দের প্রয়োগ অব্যহত রেখে সামনে এগিয়ে যায় বাসটি ফুটপাতের কান ঘেঁষতে ঘেঁষতে। ডানপাশ থেকে আরো অস্থির কোন চালক একটি মাইক্রোবাসের কানটা ঢুকিয়ে বাসের সামনে চলে আসের চেষ্টা করে , বাসটা ব্রেক কষে, কিন্তু গতিজড়তার কারণে খানিক সামনে চলে আসাটা ঠেকাতে পারে না। বাসের বাম্পার মাইক্রোবাসের বনেটটায় অল্পস্বল্প ক্ষতের সৃষ্টি করে। ওদিকে বাসের ভেতরের দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীরা একজন আরেকজনের গায়ে লুটোপুটি খায়, তা দেখে দুই একজনের চোখ ঠিকরে বেরিয়া আসার জোগার হয়। এরই মাঝে মধ্যবয়ষ্ক পুরুষটার অশোভন আচরণ এক ঝটকায় চোখে মেপে নেয়, লোকটা সাবধান হওয়ায় জেগে ওঠা রাগটাকে আরো সংকুচিত করে তাসলিমা।
বাসটা আর্মি স্টিডিয়াম এসে পৌঁছায়। মাইক্রোবাসটা থেকে কয়েকজন বেরিয়ে আসে। বাসটা রাস্তায় দাঁড়িয়ে যায়, শুরু হয় আশপাশের মানুষের দৃশ্য দেখা।
তখন ফোন আসে। তাসলিমা ফোনটা হাতে নেয়, ফোনটা রিসিভ করতেই অপরপ্রান্তে ভরাট কন্ঠে থেকে ভেসে আসে,
হ্যালো…
তাসলিমা আপনি কতদূর?
স্যার, আর্মি স্টিডিয়ামে, আর একটু সময় লাগবে আমি আসতেছি ( তাসলিমা যতটা সম্ভব শুদ্ধস্বরে কথা বলার চেষ্টা করে)
আপনি তাড়াতাড়ি আসুন, প্লিজ একটু তাড়াতাড়ি আসুন। প্লিজ আসুনননন….
হঠাৎ সেই কন্ঠের তীব্রতায় তাসলিমা একটা আপনটোন টের পায়, স্যার সবসময় মেপে মেপে কথা বলে, ম্যাডামের কি কিছু হলো! বাসায় তো আরো লোক আছে, আজ কি এমন প্রয়োজন পড়লে, এমন কাতর স্বরে ডাকলেন!
তাসলিমা ওঠে দাঁড়ায়, হেলপার ছেলেটার কাছে ওর একশ টাকা, বাকি টাকা ফেরত দেয়নি, আজ এই একশ টাকার অবশিষ্টটুকুই ওর ফিরে আসার সম্বল। তাসলিমা কাতর চোখে ছেলেটাকে খোঁজে, সামনে জটলা, মাইক্রোবাস থেকে বের হয়ে আসা সুঠাম দেহের লোকটা হাড্ডিজিরে হেলপারটার কলার ধরে রেখেছে, তাসলিমা অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকে সেই সুঠাম দেহের লোকটার দিকে, কখন ছাড়া পায় ছেলেটা তার হাত থেকে।
তাসলিমা রাস্তায় নামে আসে, তখন আবার ফোন আসে পাশের ঘরের উজমার মায়ের।
‘তাসলিমা হুনসোস, বর্নালী গার্মেন্টস আগুন লাগছে, আল্লাহ বিচার এক্কেরে সিদা, পাপের ফল প্রায়শ্চিত্ত করোনই লাগবো। ‘
তাসলিমা অপরপ্রান্তের কথাগুলো শুনে যায় শুধু, কি বলবে এর প্রতিউত্তরে, এখন তো সেই গার্মেন্টস ওর আপনজন আর নেই, তাই শুধু শুধু কথা বাড়িয়ে মোবাইলের মিনিট খোয়ানোর কি দরকার, তাসলিমা ফোনটা কেটে দিয়ে হেলপার ছেলেটার কাছে যায় ভীড় ঢেলে। ওকে যে তাড়াতাড়ি আজ পৌঁছতে হবে। তাসলিমা ফোনটা ব্যাগে ঢুকিয়ে সামনে এগিয়ে যায়, ওদিকে ফয়সাল শাহরিয়ার অস্থির হয়ে নানা জায়গায় ফোন করে, এই মুহূর্তে তার দরকার প্রশাসন ও সাংবাদিক ভাইদের, তারাই তো বিপদের বন্ধু, একবার যদি বেফাঁস একটা খবর প্রকাশিত হয় তাহলে আর দাঁড়ানো সম্ভব না তারপক্ষে আবারও। কয়েকমাস আগের ঘটনা ধামাচাপা দিতে তো কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি তাকে।
তাসলিমা অনেক কষ্ট বাকি টাকাটুকু নিয়ে বনানীর সেই নিদিষ্ট গন্তব্য এসে পৌঁছায়। ভয়ে ভয়ে কলিংবেলে আঙুল রাখে, আজ প্রায় একঘন্টা দেরি হয়েছে, তারউপরে স্যারের ফোন করেছিল, কি অঘটন হয়েছে? চাকরি আছে? অনেকগুলো প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাওয়ার মাঝে দরজাটা খুলে যায়, ঘরে ঢুকেই তাসলিমা দেখে স্যার ফ্লোরে পা দুটো ছড়িয়ে বসে আছেন, টিভিতে আশুলিয়া বর্নালী গার্মেন্টসের আগুনের দৃশ্য, পাশ থেকে রান্নার লোকটা বলে,
স্যার গার্মেন্টসে আগুন লাগছে, স্যারের সব শেষ, সব শেষ…
তাসলিমা ফ্যালফ্যাল করে টিভির পর্দায় দিকে তাকিয়ে থাকে, ওর বুকটা আজ আনন্দে ভেসে যায়, আজ উপরওয়ালা ওর স্বামীর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিলেন, আবার চোখ ভেসে যায় জলে, এই চাকরিটা যদি ওর আর না থাকে, তাহলে কিভাবে বাঁচবে, কে দেবে ওকে এতোগুলো টাকার কাজ । টাকা প্রয়োজন তো প্রতিশোধে মেটে না। স্বামীও ফিরে আসবে না।
আজ একই ঘরে দুজন মানুষ কাঁদছে, কান্না কখনো বিলাসীতা কখন অবলম্বন হয়ে যায়। কোনো একদিন ফয়সাল শাহরিয়ারের কাছে এই কান্না ছিল বিলাসিতা আজ অবলম্বন বেঁচে থাকার। যেমনটা তসলিমার।
তারিখ- ১৩.০৩.২০২৪
সময়- রাত ১.৩৩
****************************
