এলিজা খাতুনঃ তিনটি কবিতা
ভিন্ন তুমি
তোমাকে ভাবতে গেলে তোমার ছায়া “তুমি” হয়ে আসে
বৃক্ষবিনাশী সাম্প্রতিককালে শিমুল গাছ বলতেই
পুকুরে স্নানমগ্ন বিগত শিমুল গাছের ছায়া;
জলনিবিড় শিমুলের ডালপাতায় মিশে থাকা সুবিশাল আকাশ
জলের অতলে নীলের বিস্তার
দুঃখের দৈঘ্যের মতো অধরা অসীম
অথচ জলে ধোয়া ছায়া থেকে সরে না শিমুলের রক্তিম রং
অব্যক্ত প্রেমে এমনই “তুমি”
হৃদয়ে ছায়ায় লেগে আছো রক্তক্ষত লাল
জীবনের বিধ্বস্ত ভিতে
এভাবে চলতে থাকলে সমস্ত সংসার অরণ্য হয়ে যায়
তপ্ত-রক্তে সিক্ত আমাদের শিমুলেরা ক্রমশ বিবর্ণ হয়
এভাবে চলতে চলতে
চিরচেনা তুমি ভালোবাসার মতো দুর্বোধ্য হয়ে ওঠো
একগোছা নিষ্পাপ ফুলে প্রহর ভেঙ্গে পড়ে
এভাবে চলতে চলতে
ভোরের রোদমাখা প্রশস্ত দিগন্ত ছোট হয়ে আসে
ঘাসমাটিতে শিশিরের মায়া রেখে যায় তীক্ষ্ম ফাঁকি
এভাবে চলতে থাকলে
মানুষ ভুলে যায়- ফুল দেবার মৌলিক অর্থ
চোখের কার্নিশে জমতে থাকে প্রতীক্ষার ধুলোবালি
নিস্প্রভ শোকের মতো, নির্জনতা যাপনের মতো
আর কত শব্দহীন হাঁটা ! আর কত নিভৃত আকুতি !
যন্ত্রণা তৃষ্ণায় অধীর হৃদয় অনর্থক বাঁচিয়ে
অজস্র মানুষ আজ বারুদমুক্ত বাতাসের সন্ধানে
হাত ধরো সরবতা
সন্তপ্ত
যখন বৃক্ষ-দঙ্গল কেটে-ছেঁটে নির্মাণ হচ্ছিল সুবিধাবাদী-সুড়ঙ্গ
আর কয়লা-দশায় ঠেলে দিতে থাকে
আমাদের যা কিছু জীবন্ত
তখন নির্ঝরিণীর সাথে মিশেছিল পাথরের বুকফাটা
নিঃশব্দ আর্তনাদ। চারপাশের বাতাসে নিরুপায়ের ঘনগন্ধ
যখন ধানের ঐশ্বর্যে ঢাকা সোনা-মাঠের ওধার থেকে
কানে আসছিলো শেয়ালের হল্লা
যখন ঝড়-বাদলে সবুজের গায়ে
আটকেছিলো ছিন্নভিন্ন শিশুর দেহাস্থি
আর সম্মানিত মাঠ থেকে বিদায় নিচ্ছিল জারি সারি
তখন রক্তের পরিধি জুড়ে ছিল নিদারুণ যন্ত্রণার ঘোরাঘুরি
সেই থেকে শোক নয়, বিলাপ নয় …
বুকের কোণে জড় হওয়া বহুদিনের বরফ-অশ্রু-জল
ক্রোধ অতিক্রম করে করে আমাদের বিচূর্ণ হৃদয় থেকে
তীব্র-দগ্ধ স্রোত হয়ে এসে বোধের ভেতর লাভা হতে চায়…
*****************************
