জাতের নামে
হিমাদ্রি মৈত্র
রোদটা পুরো উঠলে সাইকেল চালানো যাবে না। সোরেনের সাইকেলটা ম্যানেজ করে তাই ভোর ভোর বেরিয়ে পড়েছিল সান্যাল। এসময় এখানে সবাই সকাল সকাল কাজ সারে। প্রায় কুড়ি বাইশ কিলোমিটার যেতে হবে, তারপর কাজ সেরে ফেলা। খুব তাড়াতাড়ি হলেও ফেরার সময় রোদ চড়ে যাবে, তবুও যাহোক করে ঘরে তো ফিরে আসবে। তারপর যাহোক আরাম করা যাবে। কংসাবতীর ক্যানেলের ধার দিয়ে দিয়ে যাওয়া। অল্প জল, তবু জল তো!
আগে নাকি সকাল সকাল অফিসের কাজ সারা হত, এখন সেই দশটা-পাঁচটা। তখন তো ক্যানেলও ছিল না। টিনের ছাদওয়ালা পুরোন কালের আপিসঘর, যতই ফলস্ সিলিং থাকনা, গরম তো গরমই। যাহোক, কাজ তো সারতেই হবে। এই মাটিতে ভোররাতে বাতাস একটু ঠান্ডা হয়ে পড়ে। সেই সুযোগে গাছের পাতারা একটু জিরিয়ে নেয়, নাহলে তো সারাদিনই রোদে, তাপে ঝামসে যায় পাতাগুলো।
পীচরাস্তা গরমে ঘেমে ওঠার আগেই যতদূর পেরিয়ে যাওয়া যায়, নয়তো সাইকেলের চাকা গরম পীচের টানে চড়চড় করে আওয়াজ দেয়। দুপাশে সারিসারি আকাশমনি আর ইউক্যালিপটাস, পাণিবাবুর মা বলে উকিলপটাস, এগুলোর ছায়ায় যতদূর সম্ভব যাওয়া যায়। পীচরাস্তা ছেড়ে বাঁদিকে ঘুরতেই রোদটা বাঁদিকে চলে এল। এখনো প্রায় পাঁচ মাইল মেতে হবে। একটা বাস চলে বটে, তবে সে তার সময়ে চলে। তাতে কি না যায়! মোরামের রাস্তা, একটূ পরেই ধুলোয় জামাকাপড় লালচে হয়ে যাবে। গাঁয়ের লোকেরা সাইকেলেই যাতায়াত করে। মেয়ে-বৌরা হেঁটে বা সম্ভব হলে গরুর গাড়িতে। ক্যানেলটা আর এদিকে নেই। এই রাস্তা ধরার সময়েই ক্যানেল ছেড়েছে। তারপর আর জলের দেখা নেই। ছোটখাট পুকুরের মত যেগুলো আছে, সেগুলোর জল তলানিতে, লালমাটির রঙ।
লোকটার অবস্থা এতটা খারাপ না যে সরকারি সাহায্য পেতে হবে। আসলে এরা ঘরে ফলানো সবজি, তরকারিকে আয় ধরে না, তাই এদের আয় সবসময় গরীবিসীমার নীচে। তুমি যদি ঐ সবজি বাজার থেকে কেনো, তোমার আয়ের অনেকটাই খরচ। যেটুকু টাকাতে আদান-প্রদান হয়, সেটুকুই আয়। যত বড় পরিবার হোকনা কেন, যেটুকু বাজারে বিক্রি করে টাকা আসে, সেটুকুই আয়।
সান্যাল এটাই মানতে চায় না। তোমার যদি আয় না থাকে তবে এতবড় পরিবার চলছে কি করে! এইসব চাক্ষুস করে তবেই সে সাহায্য মঞ্জুর করবে, তাতে এই গরমে যদি কুড়ি কুড়ি চল্লিশ মাইল সাইকেল চালাতে হয় তাও চলবে।
কাজ সারতে সারতে দশটা সোওয়া দশটা বাজল। এরমধ্যেই রোদ চড়া হয়ে গেছে। নদীটার পাশ দিয়ে একটা মেঠো রাস্তা আছে। ফেরার সময় সেটাই ধরল। একটু তাড়াতাড়ি হবে, কিন্তু জনমানব শূন্য। কিছু কিছু গাছ আছে, নদীতে জল নেই। এসময় থাকেও না। মেঠো রাস্তা বটে, তবে রাস্তায় মাটি নেই, বালি আর পাথর। গ্ৰাম ছাড়িয়ে কিছুদূর এগোনোর পর শুরু হল নদী, তাতে শুধু বালি আর কোনোসময় জল বয়েছিল তার দাগ। ধীরে ধীরে লোকজন কমে আসছে, এমনিতেই এ অঞ্চল দিয়ে লোকজন কমই যায়, তারপর এই ঠা ঠা রোদে সেটুকুও কমে আসছে। গাছের পাতাগুলোও ঝিমিয়ে পড়েছে তাপে। মাঝে মাঝে ছোট ছোট হাওয়ার ঘূর্ণীতে শুকনো পাতাগুলো লাট খাচ্ছে। সান্যাল এ অঞ্চলের লোক না, সুখা এলাকায় কাজে এসে এখানকার প্রকৃতির অন্যরকম রূপকে যতটা পারে উপভোগ করছে।
এর মধ্যে হল আরেক বিপত্তি। গরমে, পাথরে সাইকেলের চাকা গেল পাংচার হয়ে। মাঝামাঝি পথ চলে এসেছে, গ্ৰামেও যে ফিরে যাবে তাতে লাভ নেই। অতঃপর চল সাইকেল হাঁটিহাঁটি। রোদে যখন পাথুরে মাটি গরম হয়ে যায়, বাতাসে কিরকম ঢেউ খেলা করতে শুরু করে। প্রায় মরীচিকার মতই। সান্যাল জানে এসব। এখনো অনেক পথ। তেষ্টায় ছাতি ফাটছে। এখন জল কোথায় পাওয়া যাবে!
ঐ যে দূরে বড় গাছটার নীচে একটা ঝুপরি দেখা যাচ্ছে। দেখা যাক! ওখানে জল পাওয়া যায় কিনা। সাইকেল ঠেলে ঠেলে ঝুপরিটার কাছে পৌঁছাল সান্যাল। একটা কমবয়সী মেয়ে বালতি থেকে জল ঢেলে থালা বাসন মাজচ্ছে। পাশে ছাই রাখা। মেয়েটার গায়ে একটা ফ্রক, এখানে ওখানে ছেঁড়া। নেহাৎ বাচ্চা মেয়ে।
“একটু জল খাওয়াতে পারিস”।
“বাবু, আমাদের হাতে জল খাবি! আমরা তো জাতে ছোট”।
পিছন ফিরে ঘুরে তাকাল সান্যাল, যেদিক থেকে আওয়াজটা এসেছিল।
“তন্বী শ্যামা শিখরদশনা পক্ববিম্বাধরোষ্ঠী
মধ্যে ক্ষামা চকিতহরিণীপ্রেক্ষণা নিম্ননাভিঃ
শ্রোণীভারাদলসগমনা স্তোকনম্রা স্তনাভ্যাং
যা তত্র স্যাদ্ যুবতিবিষযে সৃষ্টিরাদ্যেব ধাতুঃ”
এক বিদ্যুৎরেখা, কৃষ্ণশ্যাম। তরুণীর তরঙ্গসম তনুটি তখনো আগোছাল বসনের সযত্নকৃত অযত্নের আড়ালে। দেহের বিভিন্ন ব্যঞ্জন যেন সীমার মাঝে অসীম, ধারে ও ভারে বিপদসীমা লঙ্ঘন করেছে। সান্যাল নিজেকে সংযত করল। দৃষ্টিকে আবিলতা মুক্ত করল। মেয়েটি নিজের পদসেবা করে চলেছে, মিহি ছাই পাশে রাখা, ধীরে ধীরে তার সুগোল পায়ের উপর ঘষে যাচ্ছে। মন্তব্য করে দিয়েই যেন দায় শেষ। এবার তুমি বুঝে নাও, আমার জানানোর জানিয়ে দিলাম। নিলে নাও, ছুঁলে ছোঁও।
প্রকৃতির সৌন্দর্য যখন তোমায় ধরা দেবে, তখন তুমি অনাবিল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাক, তোমাকে কারো কিছু বলার নেই। সে তোমাকে ধরবেও না, ছাড়বেও না। সে রূপে তুমি আত্মহারা হয়ে পড় না কেন, কেউ তোমার দিকে ভ্রুকুটি তুলবে না। একমাত্র শুদ্ধ, পবিত্র সৌন্দর্যবোধই ক্রিয়া করবে। প্রকৃতির কোনো অভিযোগও নেই, কোনো আপ্যায়ণও নেই।
কিন্তু তুমি যদি নারীর রূপে নিজেকে হারাও! সমাজের ভ্রুকুটি তো পরের কথা! তোমার মগ্নতার সামনে নারী তার সহস্র কলা তুলে ধরবে। ব্রীড়া নারীর ভূষণ, সে যদি ভীরু হয় তবে নিজেকে তোমার দৃষ্টির আড়াল করবে। তবুও সে তোমাকে রূপে মজিয়েছে ভেবে কৌতুক অনুভব করবে। সে যদি ছলনাময়ী হয়, তবে তোমাকে ছলভরে বেঁধে দেবে। তোমার দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলিয়ে সে যদি প্রথম দর্শনেই কাবু হয়ে পড়ে, তবে সে মরেছে। পুরুষের তবু অনেক উপায় আছে।
কিন্তু এতো শুধু মনের ভাব। বাকি রইল শরীরের ভাব, প্রকৃতির সাথে সে রঙ্গের কোনো গল্প নেই। পুরুষ-রমণীর মধ্যে তো সে ভাবের অভাব হবে না! অসংস্কৃত পুরুষের নারীসঙ্গলিপ্সায় মনোজগতে মনবিকার ছাড়া আর কোনো ভাব থাকে না। সে প্রবৃত্তি পাশবিক। আবার উভয়ের ক্ষেত্রেই যৌনতাবোধ প্রবল হয়ে উঠলে সে সম্পর্ক সমাজ-সংস্কার সবকিছুর উর্দ্ধে চলে যায়। কোনো পুরুষের পক্ষে নারীর সৌন্দর্যকে প্রকৃতির মত নির্দ্বিধায় উপভোগ করা বড় কঠিন। সৌন্দর্যের বোধটা মন থেকে আসে, মনের চাহিদা। কিন্তু যৌনতা হল ক্ষিদে, তেষ্টার মতোই শরীরের মৌলিক চাহিদা। তবু শীলিত মন তাকে বাগে আনতে পারে। প্রাণে অপ্রাণে ঠোকাঠুকিতে আগুন জ্বলে না, জ্বলে প্রাণে প্রাণে ঠোকাঠুকিতে।
কিন্তু এ মেয়েটি তো সবে কিশোরীকাল ছাড়িয়ে যৌবনের হাতছানি দেখেছে। তবে এত কেন!
“জাত যাবে কেন? আমি উঁচু জাত কে বলল!”
“তুই যে আপিসটায় টেবিলচেয়ার নিয়ে বসে গটগট করে লিখিস, আমি দেখেছি। ওসব উঁচু জাতেরাই পারে।”
সান্যাল কৃষ্ণকালো রূপ দেখেছিল অপার্থিব দৃষ্টিতে, এক্ষণে পার্থিব দৃষ্টি দিল। ভাল করে দেখল। মেয়েটি সরকারের দান করা কাপড়েই নিজেকে ঢাকার চেষ্টা করেছে। যতটুকু ঢেকেছে তার চেয়ে বেশী এতে ঢাকা পড়ে না। পাত্র থেকে দুধ উপছালে তুমি যদি আঁচ না কমাও, তবে দুধ আগুনে পুড়বেই।
ছোটটিও সরকারি জামায় গা ঢেকেছে। সে একটা পরিস্কার করে মাজা গেলাসে জল এনে দিল। সেটা হাতে নিয়ে সান্যাল মজা করেই বলল, এই জলটার এখন কি জাত!
মেয়েটির কাছে শুনল, ওদের বাবা অনেক ছোটতেই মাকে ফেলে পালিয়ে গেছে। মা এদিক ওদিক করে ওদের পেলেছে। এখানে এসে ঠাঁই নিয়েছিল। তারপর একদিন মরে গেল। ছোট জাত বলে গাঁয়ের ভিতর থাকতে দেয় না। মেয়েটিও এখন এদিক ওদিক করে বোনকে নিয়ে বেঁচে আছে।
সান্যালের মনে পড়ল পাণিগ্ৰাহী মানে পাণিবাবুর সাথে একেই আপিসের সামনে ঝগড়া করতে দেখেছে।
“তোদের এই কাপড়, এই তেরপল কে দিল রে!”
“ঐ যে, ঐ গেরামে থাকে, আপিসের স্টোরবাবু।”
আঙুল দিয়ে দূরের গ্ৰামটা দেখিয়ে ছোটটা বলল। পাণিবাবুকে এদিকে সবাই স্টোরবাবুই বলে।
“তো, সেই স্টোরবাবুর সাথে সেদিন ঝগড়া করছিলি কেন?” বড়র দিকে চেয়ে বলল সান্যাল।
“আমাকে একটা কাপড় দেবে বলেছিল, দিল না কেন? এই কাপড়ের কি আর কিছু আছে?” বলে সে কাপড়টা দেখাল, নাকি যেটুকু ঢাকতে পারছে না, সেটুকুও।
“বারে বারে দেওয়া যায় নাকি!”
“বারে বারে নিতে পারে, দেবে না কেন?”
ঝটিতে সান্যাল তাকাল। কি নিতে পারে এর কাছে! মেয়েটি বুঝল ভুল কথা বলা হয়ে গেছে। এসব কথা বলা যায় না এই বাবুটার কাছে। তার সহজাত প্রবৃত্তি তাকে বলে দিয়েছে, এ বাবু সে বাবু নয়। এর কাছে এরকম কথায় লজ্জা পেতে হয়। সেই একরাশ লজ্জায় সে কোনোরকমে আঁচলটাকে আঙুল দিয়ে ঠোঁটের উপর টেনে ত্রস্ত পায়ে ভিতরে চলে গেল। সান্যাল দেখল একটা ছন্দ যেন হঠাৎ মূর্ত হয়ে হারিয়ে গেল।
ছোটর দিকে সে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল। যেটুকু জানতে পারল, ঐ বাবুটা রাতে মাঝে মাঝেই আসে। দিদি তাকে তখন বাইরে যেতে বলে। ছোট তখন কি আর করে, চান করার জন্য যে ছোট্ট ঘেরাটা আছে, সেখানেই চুপটি করে বসে থাকে। আস্তে আস্তে সে সব বুঝে ফেলেছে। এরকম এ গ্ৰাম ও গ্ৰাম থেকে এ ও রাতে আসে দিদির কাছে। ওদের সংসার চলে। দিনের বেলা ওরা গ্ৰামের ভিতর কোনো কোনো বাড়িতে এটা, সেটা কাজ করে।
“ঐ যে স্টোরবাবু আসছে দেখ।”
সান্যাল দেখল আসছে পাণিবাবু। কাছাকাছি হতেই পাণিবাবু একটু হকচকিয়ে গেল।
” স্যর, আপনি এখানে! কি করছেন?” যেন একটা অবাক করা ব্যাপার।
“আরে, সাইকেলের চাকা পাংচার হয়ে গেল। ঠেলতে ঠেলতে জল তেষ্টায় ছাতি ফাটার জোগাড়। এদের কাছ থেকে জল খেলাম।”
“কি করেছেন, স্যর! এদের হাতে জল খেলেন! এরা তো ছোট জাত। আপনি বামুন মানুষ। এদের তো জাতের ঠিক নেই!”
“বুঝলেন পাণিবাবু, চাহিদা। শরীরের চাহিদা। একেবারে মৌলিক। আপনি জানেন তো। ক্ষিদে, তেষ্টা, তারপর এইসব আর কি। এগুলো চাগাড় দিয়ে উঠলে কি আর জাত মানে! কি বলেন। চলুন, আপনার সাইকেলেই আপিসের দিকে যাই। আমারটার ব্যবস্থা কাউকে বলে করে দেবেন।”
“আর হ্যাঁ, বড়টিকে একটা শাড়ি, তেরপল পারলে দেবেন স্টোর থেকে। ওতে জাত যাবে না। জাতটা এমন জিনিস, বুঝে শুনে যায়। আপনি যদি কাউকে না বলেন, তবে আমার জাতও যাবে না। আপনারও।”
***********************************
