You are currently viewing একগুচ্ছ কবিতা || হিমাদ্রি মৈত্র

একগুচ্ছ কবিতা || হিমাদ্রি মৈত্র

একগুচ্ছ কবিতা || হিমাদ্রি মৈত্র

ভালবাসার নির্মাণ

আমার কোনো দুঃখ দিবস নেই।
দুঃখকে বিরহের সাথে মিলিয়ে
এক ভালবাসার নির্মাণ করেছি।
তাকে বাজারে বিকোব না,
তাকে পণ্য করবো না!
যদি তোর কোনোদিন কাজে আসে,
দিয়ে দেব। আমি নিঃস্ব হয়ে যাব।
তোর কাছে বিনিময় নেই, মন্দিরা!

ডেইলি লেবার

ভোরবেলা কাজ থেকে ফিরে এসে
মা-মরা ডাগর মেয়ে সোজা স্নানঘরে
আব্রু বাঁচাতে দোকানের বিজ্ঞাপনের
ফেলে দেয়া বোর্ড দিয়ে ঘেরা
ভিতরের রঙচটা আয়নায় দেখে
বৃন্তসভায় শ্বাপদের দাঁতের ক্ষত
আদরে হাত বুলিয়ে, বিষহরি তরলে
বিষ ধুয়ে ধুয়ে, এবং অন্যান্য স্থান
ও অস্থান ধুয়ে মাথায় গায়ে
জল ঢালতে জল ঢালতে তার
প্রত্যহের রোজগারের উপায়গুলো
সযত্নে শান্ত ও সমাহিত করে
ধ্যান থেকে উঠে আসা এক
সন্ন্যাসীর মত সংসারে মন দিল।

মাকে কবেই তুলে নিয়ে গেছে
লম্পট ঈশ্বর। বাবাটা ছিল
ডেইলি লেবার ইমারতের কাজে
পড়ে গিয়ে ভেঙেছে কোমর
প্রাণটুকু রেখে ফেলে গেছে
লেবার-মালিক বাড়ির কোনায়।
স্নান সেরে বাপটার দেখভাল
খাওয়া-মোতা সারা হলে

চলে আসে মেডিকেল স্টোরে।
স্টোরওয়ালা জানে তার কি ওষুধ
প্রতিদিন ভোরবেলা কাজ সেরে
ফিরে এসে কি বড়ির প্রয়োজন!
অসুখ তো হয়নি তার।
হতে পারে যে সুখ, অবাঞ্ছিত,
সে সুখ শিকেয় তুলে খেতে হয়
মাসের কয়দিন বাদে প্রতিদিন।

জেগে থাকে বিপন্ন বিস্ময়

তার সাথে দেখা হলে বলিব কি
চাঁদ ডুবে গেছে হেমন্তের নিশীথে
কুড়ি কুড়ি বছরের শেষে।
মেঠো ইঁদুরেরা শেষ ক্ষুদটুকু
নিয়ে চলে গেছে গর্তে তাদের।
অথবা প্যাঁচাদের হিমেল চোখ
খুঁজে ফেরে বিষন্ন মূষিক।

বলিব কি চড়াইয়েরা চলে গেছে
বিষময় বাতাস ছেড়ে অন্য কোথাও
প্রকৃত বাতাস খুঁজে নিতে।
পাখীদের গৃহশান্তি নষ্ট করে
শহরের কুৎসিত হ্যালোজেন।
ডিমগুলো নষ্ট হয় অবসাদে,
ভ্রান্ত সময়ের কালে নষ্টভ্রুণ।

তার সাথে বিষন্ন সময়ের কথা
বলিব কি! কুড়ি কুড়ি বছরের
ক্লান্তিহীন ভাললাগা অপার,
তারপর ভালবাসা থেকে যায়,
সময়ের গোধূলিতে বলিব কি
জেগে থাকে বিপন্ন বিস্ময়!
ভালবেসে আমার হৃদয়!

ভাঙা সাঁকো

নদীতীরে বসে আছি ভাঙা সাঁকো নিয়ে
চলে সে গিয়েছে ঐপাড়ে, ধীরপায়ে।
চলে আসে, ফিরে আসে, যায় জুড়ে
স্মৃতিরা নীড়ে। যেমন পাখীরা ফেরে।

মোবাইলে আঙুল চাপে শব্দ বোনা
বিস্তৃত জালিকা বেয়ে ঠিকানা চেনা
পান্ডুলিপি থেকে যায় নাবিকের ঘরে।
ফিরে এলে আয়োজন তখন আঁধারে।

মুখোমুখি বসে থাকা অনয়বয়ব,
স্ক্রীনজুড়ে, কথা শেষ, শেষ সব
চাওয়া, ভাঙা সাঁকো যায় থেকে
ঐ তীরে, ঐখানে প্রতীক্ষায় থাকে।

কবুলনামা, একটি গদ্য কাহিনি

আমি কিরকম ছন্নছাড়া হয়ে গেছি,
তোমার জন্য! মাথা খারাপ!
একথা শুনলে তোমার নিজেকে
প্রচন্ড অহঙ্কারী মনে হবে না?

তার চেয়ে বলা যাক –
একটা বিশাল পাহাড় বা
সমুদ্রের মৌনতার কাছে
একাকী বসে থেকে যে আরাম পেয়েছি,
যা কিনা জ্বরের মধ্যে
মায়ের চুলে বিলি কাটার মতো আকাঙ্খিত,
অথবা সুন্দর শরীরের মধ্যে
আরাম খোঁজার অসম্ভব আকাঙ্খা,
অথবা খুব ডেলিকেট ভেবে
সাবধানে খরচ করার মতো বন্ধুত্ব,
– যা কিনা বন্ধুত্বের দুপাড়ে
কে কোথায় দাঁড়িয়ে আছি
তা নির্ণয়ে সন্দিহান হবার মতো
কিছু অস্বাভাবিকতা;
কিংবা তোমার কাছে
চুপচাপ বসে চিন্তা করা
তোমায় চাই কেন এতো ?
তোমাকে এরকম সম্পর্কে
জড়াতে চাই কেন এতো!

এসব প্রশ্ন
আমাকে ছন্নছাড়া করেছে।

আসলে তোমার জন্য;
মন, তোমাকে খুঁজে পাচ্ছি না।
খুব চেনা ফুলের গন্ধের মতো
হঠাৎ হারিয়ে যায় খোঁজার সময়!
সময় মতো ধরাও যায় না,
ছোঁয়াও যায় না,
অথচ আমি চিনি সেই প্রিয় গন্ধ।

মন! তোমাকে খুঁজে পাচ্ছি না,
প্রিয় নারীর মুখ যেমন হারিয়ে যায়
কল্পনায় খুঁজতে গেলে।

তোমাকে যদি মডেল পেতাম –
তবে আমার প্রগাঢ় তুলিতে
রমণীয় নমনীয়তায় রেখা টেনে টেনে
আমার ক্যানভাসে ফোটাতাম তোমাকে;
মোনালিসা নারীর মতো বিশ্বজয়ী।
মন, তোমাকে মডেল পেলে
ছবি আঁকতাম অনেক দিন ধরে,
অনেক নাড়াচাড়া করে।
অথবা সৌন্দর্যের নিষ্ঠুর তীব্রতায়,
–যা মানুষের বোধের বাইরে,
বিভ্রান্ত হয়ে তোমাকে নষ্ট করতাম।

তাই আমি ছন্নছাড়া হয়ে আছি।

চাঁদের প্রহর

হেমন্তের রাতের কুয়াশার মত
ম্লান হয়ে পড়ে আছে তোর স্মৃতি।
ধান কাটা মাঠে শেষ খুদকুঁড়ো
খুঁটে নিতে মেঠো ইঁদুরের ছোটাছুটি।
পড়ে থাকা স্মৃতিটুকু খুঁটে নিতে
মেঠো ইঁদুরের মত স্বাদ পেতে,
তাই করি চাঁদের এত আয়োজন।
তারপর কোনো এক উজ্জ্বল প্যাঁচা
শেষ করে স্মৃতির অভিযান।
পড়ে থাকে হেমন্তের মাঠ,
রিক্ততার সৌন্দর্য জেগে ওঠে
***********************

Leave a Reply