কবি চিন্ময় গুহর কবিতায় অন্য অনন্য প্রেমভাবনা
পারমিতা ভৌমিক
চিন্ময় এক চিন্ময় কবি। চিন্ময় গুহ প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত কিম্বা বলা ভালো আপাদমস্তক কবি। একজন born poet….। তাঁর কবিতা পড়লে সহজেই দেখতে পাব তাঁর ব্যক্তিক প্রেম ধারণাটিকে তিনি mystic ওড়নায় মুড়ে দিয়েছেন। এই “ধারণা”শব্দ টির বিদেশি প্রতিশব্দ যদি concept হয় তবে বলতে হয় তা চিন্ময়ের মনোভূমিতে সর্বতোভাবে objectless object দিয়ে প্রেমের নতুন কিম্বা চিরনতুন তাৎপর্যে ব্যাখ্যাত হতে পারে। প্রেমের ক্ষেত্রে কোনো “বিশেষ ব্যক্তিক আবেগ” অসাধ্যসাধনের প্রাবল্য নিয়ে আসেনি চিন্ময়ের কবিতায়। উদ্দীপনাও যেন স্তিমিত এক অলৌকিক সস্মিত স্পৃহায়।
চিন্ময়ের প্রেম যেন গুহাহিত কোনো অজানা দ্বীপের সম্পদ দুয়ারটি খুলে দিয়েছিল পাঠকদের কাছে, কোনো গোপন ব্রাহ্মমুহুর্তে। স্মৃতিকে অবলম্বন করেই সেখানে কবির সুষম-আবেগ মূর্ত হয়েছে। চিন্ময় তাঁর নায়িকাকে বুদ্ধদেব বসু কিম্বা জীবনানন্দের মতো কোনো নামের বাঁধনে বাঁধেন নি।কেবলমাত্র সংকেতিত পরিচয়েই তাঁর সহচরী আপন লীলায় স্বাতন্ত্র্যময়ী হয়ে উঠেছে। চিন্ময় গুহর ক্ষেত্রে যে প্রেমের উন্মীলন বিদেশী লতায় ফুল ফোটানোর কথা ছিল সেটি কিন্তু রোপিত হয়েছে তাঁর নিজস্ব মানস-ভূগোলে। এ বড় আশ্চর্য কথা।
ফরাসি প্রেমের কবিতা সম্পর্কিত একটি নিবন্ধে জেনেছি প্রেম সম্পর্কে একটা পূর্ণতর দেহ-বিদেহ-ময় মেশামেশি-ধারণা তাঁর ছিল। তিনি কিন্তু তাকে প্রতিস্থাপিত করেছেন সুসংস্কৃত একটা পরিপূর্ণতায়। প্রেম সেখানে পারিজাত হয়ে ফুটেছে।
আসলে চিন্ময় সেই প্রতিআত্মাকে প্রতিপলে অনুসন্ধান করেছেন যার মাঝে ভেদ নেই ,দ্বন্দ্ব নেই, নেই দেশ অথবা কালিক স্বতন্ত্রতা, যা আছে তা হল মনন মণীষা, দেহে ও বুদ্ধিকে ছাড়িয়ে নিরালম্ব অবিনশ্বরতায় আত্মলীন এক ভাবময় আপ্যায়নধর্মী আর্ষ-অনুভব।
আমি নিশ্চিত যে চিন্ময়কে চিনতে আমার একটুকুও অসুবিধা হয়নি। আগেই তাঁর কাব্যিক গদ্য পড়ে মনে হয়েছিল এমন একজন প্রাতিভশক্তি কবিতা লিখবেন না,এও কি হয়!!?
এইমতো ভাবছিলাম। হঠাৎ…..
হঠাৎ একদিন তাঁরই ওয়ালে আবিস্কার করলাম তাঁর কয়েকটি কবিতা।
অবাক হয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম―”স্যার আপনার কবিতা!!আপনি কবিতাও লেখেন!!?”
স্বভাব সুলভ সলজ্জতায় উত্তর এসেছিল―” ও সব গতজন্মে লেখা কবিতা। তখন আমি সতের ।”
কেমন যেন মায়া ছড়ালো আর মনে হয় এমন সব কবিতারা কেন আলগোছে একধারে রয়ে গেছে। চাপা পড়ে গেছে চিন্ময় গুহের বলিষ্ঠ গদ্যের নীচে। পাঠক দেখেও দেখেনি। কীইই আশ্চর্য !আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো সেই তারাই!!! মনে হল এদেরই আমি খুঁজছিলাম কি ! ? আমার মনে হল এরা সব কি তবে আমার দিকেই তাকিয়ে আছে?আমার জন্যেই অপেক্ষায় ছিল? আমি যত্ন করে সংগ্রহ করে রাখলাম। ওদের না-বলা কথা লিখলাম। এত সুন্দর সেসব কবিতা , পাঠককে টেনে রাখার মতো।
চিন্ময় গুহর একটি কবিতা দিলাম।
কবিতা-পাঠক , পড়ুন―――
বিভাস//চিন্ময় গুহ
“নারী, তুমি মুখ তোলো,
তোমায় দেখব।
জলে ডুবছে চাঁদ,
তার ঠোঁটে ঝরছে মধু।
নারী, একবার মুখ তোলো,
তোমায় দেখব।
সুদূর জলে নদীর খয়েরি বাঁকে
কে তুমি যাও, উদাস, আকাশ কাঁখে
দোহাই, একটু দাঁড়াও।
নারী, তুমি মুখ তোলো,
তোমায় দেখব।”
কবিতা টি ১৯৭৬ সালে লেখা।(সম্ভবত সন্দীপদার [সন্দীপ দত্ত] কাছে পাওয়া। কোনো একটি ম্যাগাজিন থেকে। )
আরো কত ছিল হয়তো। চিন্ময় গুহর গদ্যের জমকে পথ হারিয়েছে তারা। হয়তোবা অভিমানে !
কবি চিন্ময়ের যে কটি কবিতা পড়লাম তাতে দেখেছি কবিতার চাবিকাঠি তাঁর কবিতার শিরোনামেই লুকোনো থাকে।
এ কবিতার নাম —“বিভাস”…।
প্রথমেই জানবো বিভাস শব্দের প্রসারণ কতখানি।
বিভাস রাত্রিকালীন একটি রাগিনী।সেই সূত্রেই কি চাঁদের কথা এল? উজ্জ্বল দীপ্তির প্রকাশ রূপে। মতান্তরে ভোরের রাগিনী। (বি+√ভাস্+অ)
এখানে তবে কোন্ অর্থ বহন করছে “বিভাস”…খুঁজতে হবে।
ধরি বিভাস যদি প্রাতঃরাগিনী (রাগিনী কিন্তু স্ত্রীবাচক) হয় তবে কবি কি ঝলমলে কোনো নারীর সঙ্গে তাকে এক করে দেখছেন? অথবা কোনো রক্তমাংসের নারীই হয়েছে বিভাসরাগিনী !!?
সেই নারীকেই কবি বলছেন—–
নারী, তুমি মুখ তোলো,
তোমায় দেখব। —– কি অদ্ভুত আবেদন ! এই নারীই কি মুখ ডুবিয়ে রেখেছে জলে? একান্ত আত্মমগ্নতায়? সকালের ঝলমলে বিভাস কি সন্ধ্যায় ধরেছে অন্যসুর? রাতের রাগিনী হয়ে? চিন্ময়ের গদ্যে ও কবিতাতেও প্রায়শঃই দেখেছি সময়ের ইম্প্রেশন ক্রিয়াশীল, বিশেষতঃ রাত্রি কিম্বা সন্ধ্যা। অথবা যদি ভোরও হয়, তাহলেও তা পাঠকের মনে প্রকৃতিকে পরম্পরা সূত্রে এনে হাজির করেছে। চিন্ময়কে কি ইম্প্রেশনিস্ট কবি বলবো না???এরপরেই এসেছে অলৌকিক
আবছায়ার কথা, কুহকের মত !
আবার এই নারীই কি পরে রূপান্তরিত হল ব্যক্তিগত চাঁদে? তবে যে কবি বললেন—
“জলে ডুবছে চাঁদ,
তার ঠোঁটে ঝরছে মধু। —-“–এই জলজ চাঁদেই কি চন্দ্রাহত কবি খুঁজছেন মধুপর্ণা রাতের আলো কিম্বা অলৌকিক প্রসন্নতা!? কবির গোপন কি একান্ত প্রার্থনায় রত!—-এ রাত মধুপর্ণা হোক !!
কি তীব্র আকুলতা তরঙ্গে তরঙ্গে ছুঁতে চাইছে রাতের প্রতিটি বিভঙ্গকে।
একটা সুগোপন synesthesia image যেন উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে শরীরী আচ্ছন্নতায়। চাঁদের ঠোঁটে ঝরছে মধু। চাঁদ ডুবছে জলের প্রসন্ন গভীরতায়।
যার ঠোঁটে মধু ঝরছিল , সেই কি লেহনের প্রসন্নতায় ডুবেছিল কোনো জলের গভীরে??
সমগ্র প্রকৃতিই যেন সেই মুহুর্তে মধুপর্ণা হল—নিভৃত প্রণয়োচ্চারণে—ওঁ মধু!! ওঁ মধু !! সব মধুময়!!
একি প্রাকৃতিক চাঁদ নাকি চন্দ্রালস অথবা চন্দ্রাহত কবির আন্তর প্রেরণা বাক্ ??
অথবা
প্রতিবিম্বিত কোনো নারীরূপ যার
উপমা কেবলমাত্র চাঁদ।
কবিই জানেন, এ তো তাঁর কল্পনারী—অর্ধেক মানুষী আর অর্ধেক কল্পনা। তাকেই তাই কবি যেন “আপন মনের মাধুরী মিশায়ে”— রচনা করছেন, গড়ছেন, তিলোত্তমা করে। কিন্তু একবার তার মুখটি তো দেখা চাইইই, তা না হলে সমর্পণ কি আব্রহ্ম আকাশ হয়ে উঠবে?উঠতে পারে??
তাই কবির প্রার্থনা—-অপাবৃণু! অপাবৃণু !! অবগুন্ঠন খোলো।
মগ্নচেতন কবির সনির্বন্ধ আবেদন তাই কবিতাতে আলাপের মত বেজেছে—
“নারী, একবার মুখ তোলো,
তোমায় দেখব। ”
চাঁদ আর নারী কি সমার্থক?
কি গভীর তার আত্মরতি। আত্মপ্রেম। পৃথিবীর কোনো প্রেমিকের ছায়া পড়ে না সেখানে। কেবল জলের আয়নায় প্রতিবিম্ব দেখে সে, নিজের। জাগেনা কোনো মন্ময় বা তন্ময় অথবা তনুময় প্রেম সে বুকে। চাঁদ আর সরসীর প্রেমের কুহকে, পৃথিবীর কোনো পাগল প্রেমিকের আকুতি চাপা পড়ে যায়।
কি অসাধারণ কাব্যিক ডিসকোর্সগুলো পরপর সাজিয়েছেন চিন্ময়।মনে হয় এক এক করে কুড়িয়ে রাখি স্মৃতিমঞ্জুষায়——কী অনন্য উপমাকল্প—–“সুদূর জলে নদীর খয়েরি বাঁকে”
—- সুদূর জল…নদীর খয়েরি বাঁক —কবি চিন্ময়ের সংবেদনার রঙে খয়েরী। ক্ষরিত জমা রক্তের রঙ খয়েরি। একটা গোপন ব্যথার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন চিন্ময়। কি কালার ফিউশন !!—-কিছু বাস্তব দর্শন কিছুটা কল্পনার রঙে বাঁক নিয়েছে উপমাটি। এর রঙ খয়েরী।
কবি আপূর্যমান বিহ্বলতায় দেখেন—-
“কে তুমি যাও, উদাস, আকাশ কাঁখে” —নদীর বাঁক কবি কল্পনায় নারীর কাঁখ।আর উদাস আকাশ ? কাঁখে তো গাগরী থাকে। আকাশ গাগরী কার? তাহলে সেখানে উদাসীন নারীই কি কোনো প্রসারিত জগৎ-ভোলা আকাশ ব্যাপ্তিতে নিলীন?
কি অসাধারণ কল্পনা! কী এক্সপ্যানশন! উদাস আকাশ কাঁখে? সমস্ত প্রকৃতিই — কি নিসর্গ, কি মানব,
সবটুকুই যেন সূফীসাধনার ধন। প্রিয়া-অভিমুখী হয়ে গেছে। আকাশকে আপনার কাঁখে ধারণ করেছে কে? কবির কল্প নারী তবুও যার বাস্তব অস্তিত্ব আছেই এবং সন্দেহাতীত ভাবে আছে। থাকেই।
তাই তারই কাছে কবির আবেদন—-
“দোহাই, একটু দাঁড়াও।
নারী, তুমি মুখ তোলো,
তোমায় দেখব।”— দোহাই শব্দের ব্যবহার যেন বৈষ্ণবীয় আবহাওয়া তৈরী করে দিল মুহূর্তেই। কেবলমাত্র কবিই জানেন নারীই সেই মানবী আইডল যার কাছে আছে সার্বভৌম প্রেমের সম্পদ। নারীই সেই ট্রেজার আইল্যাণ্ড, যা নাকি, ইয়েট টু বি এক্সপ্লোরড্……!!!! কবির নারী তাই এক চিররহস্য। হেমন্তের আকাশে লুকোনো । কবি ও কবিপ্রিয়া শেষপর্যন্ত তাই হয়ে ওঠেন বিশিষ্ঠ ও অরুন্ধতি!!!!!
*****************************
