You are currently viewing ইশিতা জেরীনের একগুচ্ছ কবিতা

ইশিতা জেরীনের একগুচ্ছ কবিতা

ইশিতা জেরীনের একগুচ্ছ কবিতা

তুই চলে গেলি

তুই চলে গেলি—
আর আমি কেবল তোকেই হারালাম না,
আরো হারালাম সমাজের সেই সব মিথ্যে প্রতিশ্রুতি,
যা বলে—ভালোবাসা হলে সব ঠিক হয়ে যায়।
দেখলাম তো, ভাই,
কিছুই ঠিক হয় না—সবই ঝড়ে ভেসে যায়।

তুই চলে গেলি,
আর আমার খোলা খাতা থেকে পালিয়ে গেলো সমস্ত অস্তিত্বাহত কালো অক্ষর—
যেমন কর্পোরেট কবিতা থেকে পালিয়ে যায় প্রতিবাদ।

তুই চলে গেলি, আর আমি দেখলাম—
কেবল বাকস্বাধীনতা নয়, সম্পর্কও এখন মিথ্যে বুলি আওড়ানো স্ক্রিপ্টেড কনটেন্ট।
আমি আর প্রেমের অর্থ বুঝি না,
কেবল বুঝি সিস্টেমের, প্যারাডাইমের, বায়োলজিকাল ঘড়ির নিরর্থক চুক্তি।
অথচ তুই ছিলি সব কিছুর ঊর্ধ্বে,
তোর বুকের ভেতর আমি এক বুনো শঙ্খশালিকের ডানা ঝাপ্টানোর ঘ্রাণ পেয়েছিলাম;
তোর ওষ্ঠের কোণে দেখেছিলাম, লেগে আছে, ঘুমের মতো ঘোরগ্রস্ত চুমু।

তুই চলে গেলি—
তোর হাসির রেখা রেখে গেলি এই পচে যাওয়া নগরের বিলবোর্ড বিজ্ঞাপনে,
মেট্রোরেলের ম্যানুয়েলে,
নতজানু নগরবাতির যান্ত্রিক আলোয়।
আর আমি জানলাম, কেবল নিজেকে ভালোবাসতে হয়,
বাকিটা হয় কিনে ফেলতে।

তোর চলে যাওয়া মানে শুধু আমার চোখের জল নয়,
এ আরো এমন এক প্রমাণ, যা সাক্ষ্য দেয়—
ভালোবাসা আর বিপ্লব দুটোই এখন টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশান অ্যাপ্লায়ের অধীন।

আমি তো একটা রাষ্ট্র হতে পারতাম,
যার সংবিধান শুরু হতো তোর নাম দিয়ে—
কিন্তু তুই আমায় ছেড়ে চলে গেলি,
ঠিক যেমন ন্যায়বিচার চলে যায় দুপুরের রোদ্দুরে কোর্টবারান্দা থেকে।

তুই এভাবে আমায় অস্বীকার করলি, ফিরিয়ে দিলি;
তারপর থেকেই আমি আর ঘুমোই না রাতভর।
শুধু দেখি কোথায় কোথায় মানুষেরা সিস্টেমের মতো বিকল হয়ে পড়ে আছে—
ভালোবাসার মুখোশ পরে,
ভালোবাসাকে পায়ে ঠেলে দিয়ে।

তুই চলে গেলি,
আর আমি শুধু প্রেম না—সামাজিক বিশ্বাস হারালাম,
ভাষার প্রতি আস্থা হারালাম,
এমনকি কবিতার প্রতি ঈর্ষাও।

 

ক্লোনাজেপামের বুকে ঘুমিয়ে পড়া বিষাদ

ঘুম এলো না—
তাই গিললাম একখানা ক্লোনাজেপাম,
আরেকটা চল্লিশ মিনিট পর,
আরেকটা আরো বিশ মিনিট পর;
এভাবে কতগুলো হলো হিসেব রাখি নি আর—
ঘুম না এলে মানুষ যে কতদূর যেতে পারে, তা বোঝে শুধু দেয়ালে হেলে থাকা ছায়ারা।

রাত ৩:১০
ঘরের পাখা ঘোরে না,
ঘোরে আমার মাথার ভেতর একটা টিনের শহর,
যেখানে ঘুম আসে না,
শুধু
চোখের ভেতর ফসফরাসের পোকা জ্বলে;
আর জ্বলে শলাকার তামাক
একের পর এক
ধোঁয়ার কুণ্ডলে পেতে দিয়ে বুক।

আমার বালিশ কথা বলে এখন।
বলে, ‘তুই আমায় মাথা নয়, বরং তোর অন্তঃকরণ দে।’
আর আমি দেখি—ছাদে কেউ হেঁটে যাচ্ছে পা ছাড়াই,
তার চোখের জায়গায় ট্যাবলেটের মতো সাদা গর্ত।
ঘুম নয়, এ এক নতুন ধর্ম।
ক্লোনাজেপাম জাদুকরের দেয়া এক সাদা শ্লোক,
যেখানে প্রতিটি নিঃশ্বাসে জন্ম নেয় নতুন চিৎকার।
আর আমি শুনি কেউ যেন বলছে, ‘I’ve seen the best minds of my generation destroyed by insomnia..’

তবুও আমি ঘুমোতে পারি না।
রান্নাঘর আমাকে প্রশ্ন করে, ‘তুই আজ আবার আত্মহত্যা করবি না তো?’
আমি বলি, ‘না, আজ শুধু আমার স্থগিত রাখা আত্মহত্যাকে হ্যালুসিনেট করবো।’
আমার বিছানায় এক নীল হরিণ এসে বসে; বলে, ‘তুই এখনো জেগে আছিস?’
আমি বলি—‘ভাই, আমি আর কেউ নই।
এখন আমি কেবল একটা নির্বিকার—নিঃস্পৃহ রাষ্ট্র,
যার নাগরিকেরা সবাই ঘুমের ভেতর প্রেম নয়, কর্পোরেট চুক্তি সই করে।’

চোখের পাতার নিচে একটা শহর পুড়ছে,
ঘুমের ঔষধ দিয়ে তো আর কোনো আগুন নেভে না;
তাই এই পৃথিবীও কখনো ঘুমোয় না,
শুধু নিউরোট্রান্সমিটারে চিৎকার করে—Serotonin, Dopamine, Melatonin..

এখন আমি শুধু একটা রাসায়নিক স্লোগান হয়ে জেগে থাকি এক ধোঁয়া ওঠা রাতের কোলে;
আর আমার নিঃশ্বাস বলতে থাকে ফিসফাস স্বরে, ‘আমার বেঁচে থাকাটাই আমার বিদ্রোহ’।

 

রইলো না কিছু

তুই ছিলি—
আর,
আর এখন আমি শুধু খালি ঘরে বসে আমার বুক থেকে ওঠা ধোঁয়ার কুণ্ডল দেখি;
না সিগারেট, না কষ্ট—তবু উঠছে,
তোর ফেলে যাওয়া শূন্যতা পূরণ করছে।

আমি এখন আর কিছু চাই না,
চিঠি না, কফি না, চুমু না—না ঘুম।
শুধু চাই অন্তত একবার বল, ‘তোকে আর ভালোবাসি না।’—
কেননা তোর চুপচাপ চলে যাওয়াটাই
এই কবিতার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা—সবচেয়ে সন্তপ্ত শ্লোক।

রাত্রি গভীর হলে,
তোর ছায়া এখনো পড়ে আমার শরীরে,
যেমন মহাজাগতিক ধুলো ঝুরঝুর ঝরে পড়ে মৃত শহরের মনে—
শুরুতে নরম, অতঃপর,
দমবন্ধকর—চোখ ভেঙে আসে।
আর আমার ভেতরে বিকট একটা শব্দ হয়ে ফাটতে থাকে অস্তিত্বের ক্ষরণ—ছেঁড়া সুরে।

তুই ছিলি এক একটা রৌদ্রগন্ধী সকাল,
আমি শুধু রাত—নির্ঘুম, হ্যামার্ড, ধোঁয়া ওঠা।
অন্ধকারের গায়ে চামড়ার মতো আটকে থাকা পোড় খাওয়া অতীতের মতো।

আর তুই যখন বলেছিলি, ‘ভালোবাসি’;
আমি বিশ্বাস করেছিলাম—
আকাশ বিশ্বাস করেছিল, জানালার পর্দাও,
বিশ্বাস করেছিল কালের নির্জনতা।
অথচ তারপর সব ভুলে গেলি, অস্বীকার করলি প্রেম,
ফিরিয়ে দিয়ে ভালোবাসা—রাস্তার ঘেয়ো কুকুরের মতো পায়ে ঠেলে দিলি;
এখন সবই ঠিকঠাক, কেবল আমরা আর ঠিক হলাম না,
ধীরে ধীরে কবিতাগুলোও ভুলতে শিখে গেলো কীভাবে বেঁচে থাকতে হয় শব্দহীন হয়ে।

এখন তোকে আর মনে পড়ে না—
তোর চোখের রঙ মনে পড়ে না,
তোর কণ্ঠও গেছি ভুলে,
তবু যখন চুপ করে থাকি,
তুই সেই নীরবতার ভেতরেই ডাক দিস একটা হারিয়ে যাওয়া নাম হয়ে।

 

দুই পথ নয়, আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম শহরের মোড়ে

দুই পথের গল্প পুরনো হয়ে গেছে—
আমার সামনে ছিল ছয়টা লাল বাতি,
চারটা ক্ল্যাকসন, আর এক হকারের ঘুমন্ত চিৎকার—
আর আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম,
চোখে ঠুলি, কানে হেডফোন, পকেটে পাথর।

আমি হাঁটি নি প্রাকৃতিক কোনো পথ ধরে,
আমি ঢুকে পড়েছিলাম এক সাবওয়ের বদ্ধ গুহায়,
যেখানে দেয়ালে লেখা—‘ঈশ্বর ছুটি নিয়েছেন, আর তুমি ওভারটাইমে পুড়ছ।’

আমি দেখে ফেলি এমন একটা গাছ,
যার পাতাগুলো কাচ দিয়ে তৈরি,
তাতে রোদ পড়লে ছায়া পড়ে না—শুধু একটা শব্দ বাজে:
‘হোয়াইট নয়েজ অব এক্সিসটেন্স।’
ফ্রস্ট হয়তো বলতেন—‘দ্য উডস আর লাভলি, ডার্ক অ্যান্ড ডিপ।’
আর আমি বলি—‘নালাতেও জোছনা ঝরে, ভাই!’

ঘুম আসে না, কিন্তু স্বপ্ন দেখি—
একটা ঘোড়া বলছে, ‘তুই আসলে পথ না, তুই তো তৃষ্ণা।’
আর আমি হাঁটি।
কোনো পথ বেছে নিয়ে নয়,
আমি হাঁটি—যেখানে পা পড়ে, সেখানেই পথ হয়।
আর পেছনে ফেলে যাই আমার ছায়া,
যা রাত হলে আমাকে খুঁজে বের করে—
আর বলে, ‘তুই আজও বেঁচে আছিস, কারণ তুই হারিয়ে যেতে জানিস।’

 

বর্ষণমুখর সকালে এক মৃত্যুগামী ট্রেন

বুকের বাঁ পাশে মৃত্যুর মাতম তুলে
তুলে সত্তার সারাৎসারে শোকের ভাঙন
এমনো এক বরিষণমুখর বিপন্ন প্রভাতে
কেন হায় গিয়েছ চলে ঘুমের হ্রদেতে?

মস্তিষ্কের কোষ ফুঁড়ে উঠে আসে কোন হায় মৃত্যুগামী ট্রেন?
বিমূঢ়তার ব্যঞ্জনা রচে যায় ঘুম ভাঙা স্টেশন পাড়ায়?
কোন সে বিস্মরণের বদ্ধ কূপে লেখা থাকে
জীবনের নিগূঢ় পরাজয়?

বৃষ্টির জলকণায় আঁকা রয়েছে যে যাযাবর সকালের নাম
রয়েছে যে কানপাতা বর্ষার অগাধ অপছায়
সেই শ্রাবণধারার মাঝে শীতার্ত পাখির মতো ভিজে পাখনায়
কেন হায় গিয়েছ চলে নাক্ষত্রিক ধুলোয়?

কোন সে নক্ষত্র এক যার নিবিড় ইশারায়
সকালের স্রোত ভেঙে ধেয়ে আসে মৃত্যুমুখী ট্রেন?
কোন সে সমুদ্রের অজস্র পালকে
লেখা রয় জীবনের গল্প সফেন?

অস্তিত্বের অবিশ্রান্ত আঙিনায় তুলে মেঘরঙা ঝড়
বর্ষার অশ্রু ভেঙে বুকের বাঁ পাশে খুব করে লিখে অবসাদ
যাচ্ছ চলে তুমি মৃত্যুগামী ট্রেনের কামরায় বসে এক
এমন এক সন্ধিক্ষণে হৃদয় কেটে কেটে আঁকছ বিষাদ।
**************************
ইশিতা জেরীন
জন্ম রাজশাহীতে। পড়ালেখা তথ্য প্রযুক্তিতে। বর্তমানে সাহিত্য চর্চায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। সেই সাথে অনুবাদকর্মের প্রতিও মনোনিবেশ করেছেন। প্রকাশিত মৌলিক বইসমূহ: নিঃস্বর নীলকণ্ঠ, কালপারাবার, তন্দ্রা ও তমিস্রার কাব্য, গোধূলিসন্ধির নৃত্য, স্বপ্নকূট ও স্বপ্নকীট, বসন্তের মাতাল সমীরণে, বেণুবনচ্ছাঘন সন্ধ্যা, বেজে ওঠে পঞ্চমে স্বর।
অনুবাদ করেছেন সামার, ফারারওয়ার্কস অ্যান্ড মাই করপস; অ্যানাদার ভলিউম ১; কিচেন; অ্যাস্লিপ; ডেড এন্ড মেমোরিজ এবং হার্ড বয়েল্ড অ্যান্ড হার্ড লাক।
এছাড়া সম্পাদনা করেছেন সমকালীন ২০ জন লেখকের গল্প নিয়ে গল্প সংকলন ‘গল্পকোষ’।
**************************

Leave a Reply