You are currently viewing ভালোবাসার আবর্তে: খ্রীষ্টফার পিউরীফিকেশন

ভালোবাসার আবর্তে: খ্রীষ্টফার পিউরীফিকেশন

ভালোবাসার আবর্তে
খ্রীষ্টফার পিউরীফিকেশন

এখন আমি একেবারেই একা। এক রকম নির্বাসিত, ছন্নছাড়া। আমার নিজের যেন কোন ঠিকানা নেই। অফিসে কাজের একাগ্রতা, ব্যস্ততা এসমস্ত কিছুই নেই। আমার ইমিডিয়েট বসের সদয় পরামর্শ, ‘বাইরে কোথাও কয়েকটা দিন কাটিয়ে আসুন। মনটা হালকা হবে। জীবনের গতি ফিরে পাবেন।’

সত্যই আমি স্থবির হয়ে আছি! এ সময়, আমি ঘর ও বাইরের মাঝে কোন ফারাক খুঁজে পাই না। যেখানে হাতড়ে চলি, এক ধরণের নিঃসীম শূন্যতা। আমার স্বাভাবিক জীবনে বড় ধরণের ছন্দপতন আমাকে, কেবলই কুঁড়ে কুঁড়ে তাড়া ক’রে ফিরে। আমি খাঁচার পাখি এক, ফিরে আসি আবার আমার নিজের ভাঙা খাঁচায়। বলতে গেলে, কোথাও সাংসারিক দায়িত্বের শিকল নেই। এখন যেখানে হাত রাখি, সেখানেই একরাশ স্মৃতি। চারিদিকে ধূলি; ঝুল জ’মে জ’মে সব যেন পুরু হয়ে উঠেছে। আমি দৈনন্দিন এই খ’সে পড়া ছাইভস্মের আগুনে তেঁতে উঠি! ঝুলবারান্দার রেলিঙয়ে বুক চেপে ধরে দূরে হাতছানি দেই, কোথায় তুমি লুকিয়ে রইলে আমার সাথে লুকোচুরি খেলতে যেয়ে! শুধু একটি বার ফিরে এসো, আমার এই ক্ষুধিতপাষাণের জরাজীর্ণ চিলেকোঠায়!

আমি আপ্রাণ খুঁজে ফিরি তাকে। এইতো আলনায় ঝুলছে তার শাড়ি, অন্তর্বাস! ড্রেসিং টেবিলে চিরুনি। তেল। নেইল পলিস। লিপস্টিক! আলমারি জুড়ে তার প্রিয় নানান রঙের শাড়ি। বাইরে জুতো-সেন্ডেল। রান্নাঘরে বাসনকোসন! তার প্রাত্যহিক জীবনযাপনের নানান অনুষঙ্গ। শিউলি রেখে গিয়েছে সব যেমন যেখানে, প’ড়ে আছে অবিকল তেমনই। সবই অবিন্যস্ত, প’ড়ে আছে একেবারেই অনাদর ও অবহেলায়! কী বিক্ষিপ্ত পরিবেশ আমার! এমন কি নবজাতকের জন্য ছোট্ট জামা। টাওয়েল। তেল। লোশন। ছোট্ট খেলনা। এমনকি তার আদরের ছোট্ট সোনামণির নামও ঠিক ক’রে রেখেছিল সে। আমার আবাসের যে দিকেই তাকাই, মনে হয় এখনও বিচরণ করছে সে তার প্রিয় আঙ্গিনায়। সর্বত্রই তার হৃদয়ের ও হাতের বাস্তবছোঁয়া অনুভব করি আমি।

তার সেই মলিন হাসি। কান্নাভেজা আকুতি। হাসপাতালের করিডোরে সেই দিনের তার সেই ছবি। সেদিনের মত এখনও, এই যেন শিউলি অনুরাগ নিয়ে আমাকে বলছে, ‘আমি ফিরে এসে তোমার সমস্ত কিছু ঠিক করে দেবো।’ আমার কষ্টের কথা ভেবে কান্নাসিক্ত চোখে তাকিয়ে বলছে, ‘আমার অবর্তমানে কী খাচ্ছ তুমি? তুমি তো রান্না করতে পার না। ইস! কতদিন হয়, তুমি আমার হাতে রান্না করা খাবার খাও না! তোমার জামাকাপড় ময়লা হয়ে আছে। আমার প্রিয় তোমার নীল শার্টের একটা বোতাম খু’লে গিয়েছে। টেবিলে বইপত্তর বিস্তর ছড়িয়ে আছে। ছবিগুলোর কাঁচে একরাশ ধূলি জমে রয়েছে। দেখো, আমি ফিরে আসলে সবই তোমার ঠিক হয়ে যাবে।’

আমার প্রথম সন্তানের মা হবে শিউলি। চোখে মুখে কী তার অহংকারী উচ্ছ্বাস! একজন গর্বিতানারীর মতো স্কুটারে চ’ড়ে বসলো সে। সেই যে তাকে হাসপাতালে রেখে এলাম! আমার দু’হাতে তার দু’হাত রেখে বলেছিলে, ‘শিমুল, মা হতে চলেছি আমি! আমার জীবনের বড় পাওয়া! প্রার্থনা কর তুমি! আমাদের নবজাত ছোট্ট সোনামণিকে কোলে নিয়ে তুমি আর আমি আমাদের ঘরে ফিরে যাবো!’

না! তা হয়নি আর। শিউলিকে, নবজাত সন্তান সহ ঘরে নিয়ে যেতে পারিনি আমি! আমার মন বলে, চেষ্টা করলে ডাক্তাররা অন্ততঃ শিউলিকে বাঁচাতে পারতো। আমি জানি না। আমার কোন অভিযোগ নেই। শুধু জানি ইচ্ছা ক’রে আমি ওকে দূরে সরিয়ে দেইনি। ছন্নছাড়া আমার এ জীবনের ধূসর বালুকাবেলায় দাঁড়িয়ে তাকে বলি, ‘না গো! তোমার কল্পিত সেই প্রেমিকা বলতে আর কেউ নেই। তুমি শিউলি! আমার স্ত্রী। তুমিই আমার প্রেমিকা!’
অফিসে ইদানীং জুঁই খুব ঘনিষ্ঠ হতে চেষ্টা করছে। কাজের ভান করে একটু কাছাকাছি আসা। একান্ত ব্যক্তিগত পর্যায় খোলা আলাপচারিতা। মনে হয় সারাক্ষণ সে উন্মুখ হয়ে থাকে আমাকে কাছে পাওয়ার জন্য।

‘শিমুল! আপনি আবার বিয়ে করেন।’ সোজা প্রস্তাব। ‘নইলে বাঁচবেন কী ক’রে? আপনার সেই প্রেমিকা জবা কি জানে আপনার বর্তমান এই অবস্থার কথা? এ সময়, আপনার একটি আশ্রয় দরকার।’ ‘আপনার জন্য আমার কষ্ট হয়!’ এ ভাবে নানা প্রসঙ্গান্তরে তার ভাবনার জগতে কেবলমাত্র আমাকে নিয়েই ঘোরাফেরা। নিয়তই বিচরণ।
এবং আমি কতটুকু প্রশ্রয় দিয়েছি এই জুঁইকে? আর এই জুঁইয়ের চোখে চোখ রাখলেই মনে হয় শিউলির সেই করুণ চাহনির কথা। আমাকে স্বীকার করতেই হয়।

-আমি ম’রে গেলে তুমি বিয়ে করবে?
ওর প্রশ্নে আমি কিছুটা আহত হয়েছিলাম।

-ছি! ছি! এ কী কথা! তুমি মরবে কেন?

-আরে ধরই না বাবা! সবাই তো মরণশীল।

-না না! তা হতেই পারে না! আমার আগে তুমি মরতেই পারবে না। তুমি ঠিক দেখে নিও। আগে আমি। তারপর তুমি।

-আহা! কথার কথা।

-মোটেই না। সেই পুরুষ অন্ততঃ আমি নই।
-না।

-কী না?

-তোমাকে আমি চিনি না? আমি জানি বিয়ে তুমি করবেই।

-বিশ্বাস কর। সে পুরুষ আমি নই।

-আমি জানি তুমি করবে।

-ছি! ছি! সব পুরুষকে এক পাল্লায়… …!

-ও পুরুষ জাতটাকে এক পাল্লাতেই রেখে ওজন করে রেখেছি। সেই আদি থেকেই তো একই পুরুষ। তোমাকেও আমার জানা হয়ে গিয়েছে।
বিশ্বাস কর?

-না বিশ্বাস করি না! এমন কাপুরুষ অন্ততঃ আমি নই। তুমি ভুল বিশ্বাস পুষে রাখছ বুকের ভেতর। আজ তোমার হাত ধরে বলছি, এই তোমার স্বামী হয়েই থাকবো চিরদিন।
-দেখ, আমি সবই বুঝি। তোমাকে চিনি আমি। কোন কিছু লুকাতে পারবে না অন্ততঃ এই শিউলির কাছে। আমি তো বুঝি। যে স্ত্রী, সেই প্রেমিকা! এটি কি কথার কথা মাত্র? নাকি বাস্তবেও তা হয়? তবে তোমার বেলায় তা বাস্তব হবে না কেন?

আমি বলেছিলাম, ‘ঠিক তাই। তুমি শিউলি, তুমি আমার স্ত্রী। তুমিই প্রেমিকা! সে দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে বলেছিল, ‘তাই তো চাই আমি! কিন্তু তুমি তো তা চাও না …!’ শিউলির মৃত্যুর এতদিন পরও আমি শিমুল সেই এক প্রশ্নের দোলায় দোল খাচ্ছি। ‘স্ত্রী কেন ‘প্রেমিকা’ হ’তে পারে না?’ আমি এর সদুত্তর বা সমাধান পাইনি। আজ অবধি তার অভাব, আমার যত কষ্ট অনবরতই বিদ্ধ করে যাচ্ছে আমাকে। তাই বার বারই তাকে বলি, ‘শিউলি! লক্ষ্মিটি! তোমাকে যদি আবার ফিরে পেতাম, তবে আর হারাতে দিতাম না! প্রেমিকার মর্যাদায় ও দামেই আমার হৃদয়ে তু’লে নিতাম তোমাকে নতুন ক’রে। বুকে আঁকড়ে রাখতাম সারাটি জীবন! তুমি তো কেবল আমারই। আমারই অতি প্রিয়জন!’

জুঁই আর আমি পাশাপাশি ব’সে আছি সবুজ উদ্যানের আমাদের নির্দিষ্ট বেঞ্চিটাতে। জবা ও আমি এখানেই বসেছি! কলেজ জীবনে এখানেই আমাদের প্রেমনিবেদন হতো। তারপর সে মা-বাবা- ভাইবোন সহ চ’লে গিয়েছে সুদূর কানাডায়। এদিকে পারিবারিক প্রয়োজনে, আমার মা-বাবার পছন্দেই বিয়ে করলাম। তারপরও ভুলতে পারিনি জবাকে। আমাদের বিয়ের পর শিউলিকে নিয়ে প্রায়ই এখানে আসতাম। স্মৃতির সৈকতে বালুকা হাতড়ে যদি কিছু রঙিন অনুভূতির ঝিনুক মিলে! কিন্তু যে একবার যায়, সে কি আর কখনও পিছন ফিরে আসে?

আবার, জুঁই আর আমি এখন খুবই কাছাকাছি। আমি জানি বিগত কয়েকদিন থেকেই জুঁই ইনিয়ে বিনিয়ে আমাকে কিছু বলতে চাইছে। আমি বলি, ‘মানুষ হিসেবে আমি কিন্তু উত্তম-পুরুষ নই। প্রেমিকাকে পাইনি। স্ত্রীকেও হারালাম। আমার পৌরুষের আর কী বাকী আছে বল? জীবনে বারবার হেরে যাওয়াই বুঝি আমার ভূমিকা। কোন কোন অভিনেতা নাট্যমঞ্চে সারাজীবন শুধু মৃত সৈনিকের চরিত্রে অভিনয় করেই যায়। এই আমিও সেই তাদের দলের একজন!’

জুঁই আরও কাছাকাছি আসে। ঠিক এমনটি সে কোনদিন করেনি। আজ বুঝি তার প্রত্যাশিত সেই চরম লগ্ন! আমি তাকে নানাভাবে বুঝাতে চাইলাম। আমাকে নিয়ে নয়। তার নিজের চাকুরি, তার ভবিষ্যৎ নিয়েই যেন সে ভাবে। সে বলল, ‘এসব আমি বুঝি না, শিমুল। আমি চাই, তুমি নিজেকে গুছিয়ে নাও। তোমার এই ছন্নছাড়া জীবন আমার বুকে যন্ত্রণা দেয়! তোমার এ ছবি, আমাকে রক্তাক্ত করে! আমি কি তোমার এই শূন্যবৃত্তে, সম্ভাবনাময় এক ক্ষুদ্রবিন্দু হতে পারি না? তুমি তাকিয়ে দেখ, তোমার কত কাছে আমি! তোমার সেই হারিয়ে যাওয়া জবা! তোমার শিউলি! তোমার এখনকার নষ্ট এবং ভোতা অনুভূতিতে আমি জুঁই, আবার প্রাণ দিতে চাই! তোমাকে সজীব ক’রে তুলতে চাই!’ আমি বললাম, ‘না না জুঁই! তা হয় না! আমার জবা, আমার শিউলি এসব নিয়েই থাকতে দাও আমাকে। কেন তুমি অবাঞ্চিত পরগাছার মত নিজেকে জড়াতে চাও আমার সাথে? তোমাকে নিয়ে এ সময়, কোন ভাবে ভাবতে চাই না আমি!’

হাঁটতে হাঁটতে শেষ বিকেলের স্নিগ্ধ সবুজ গালিচার উপর আমরা দু’জন দাঁড়িয়ে আছি। আমি বললাম, ‘তোমার এমন কী যোগ্যতা আছে, যার জন্য তুমি নিজে এতটা অহংকারী, সর্বোপরি এতটা উদ্ধত হয়েছ? আমার কাছে ‘অধিকার’ নিয়ে দাঁড়াবার এমন কী আছে তোমার?’

আমার কানের কাছে একান্তে ফিশ্ ফিশ্ শব্দ তোলে জুঁই, ‘তুমি চোখ তু’লে ভালো ক’রে তাকিয়ে দেখ, শিমুল! কী আছে আমার! আর কী নেই? দেখ আমাকে! তোমার অতৃপ্ত কামনা …! তোমার কাছে সেই ‘অধিকার’ চাই!’
আমার অন্তর্গত ব্যক্তিত্বের মুলে সে প্রবল নাড়া দিয়ে বসে! আমার অস্তিত্বে শর্ট-সার্কিটে প্রবল আলোড়ন শুরু হয়েছে, অনুভব করি আমি!

আমার কাছে আমার প্রয়াত বিদেহী শিউলি যেন, এ মুহূর্তে তার সমূহ অস্তিত্ব নিয়ে জীবন্ত হয়ে ওঠে বিরহ বেদনায় কাতর এই আমার সামনে! না! না! তার বিশ্বাসে কোন মতেই, আমি একজন উত্তমপুরুষ নই! আমি নিশ্চিত, জুঁইয়ের গ্রাসের সামনে অবলীলায় নিজেকে ছেড়ে দিয়েছি! পুরুষের একটা সহজাত দুর্বলতা আছে। আমি সেটার অস্তিত্ব আমার ভিতরে স্পষ্টতই টের পাচ্ছি এখন! মনে হচ্ছে, নিজের কাছে নিজেই যেন ধরা পড়ে গিয়েছি! বোধ করি, আমি এবার হেরে যেতে শুরু করেছি! আর এ সময় স্পষ্টই বুঝতে পারছি, আমার শিউলি তার জীবন্ত সমূহ অস্তিত্ব সমেত আমার কাছে ক্রমেই মিথ্যা হয়ে যাচ্ছে! আবছা হয়ে যাচ্ছে আমার জীবনের পট থেকে। এ সময় আমার নিজের মাঝে, কোথাও কোন রকমেই তাকে খুঁজে পাচ্ছি না আর তাকে! একেবারেই না! সে কি সত্যি আমার পর হয়ে গিয়েছে? কেবলই একজন অনাত্মীয়? যার সাথে আমার আত্মার, অস্তিত্বের, সংস্পর্শের বেবাক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে! সব মুছে গিয়েছে! কী আশ্চর্য! এই অল্প সময়েই এতটা বদলে গিয়েছি এই আমি? আমাকে বিশ্বাস করতে বেগ পেতে হচ্ছে! আমি তো অজানা এক ঘোরের গভীরে ডুবে যাচ্ছি …!

ফিশ্ ফিশ্ শব্দ তু’লে জুঁই আমাকে সচকিত ক’রে তোলে। তার দু’হাতে আমার দু’হাত নিয়ে প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে বলে, ‘তোমার প্রেমিকা জবার মত সেই ভালোবাসা আমাকে দাও! যার গুণে একজন নারী আমি সারা জীবন পারি, শুধুই একজন পুরুষ তোমাকে ভালোবেসে যেতে। দাও শিমুল! তোমার শিউলির মত স্ত্রী হওয়ার অধিকার! তোমার সন্তানের মা হতে চাই আমি!’

কী বলবো আমি? জুঁইয়ের মুখের উপর প্রতিবাদ করতে পারছি না। ইতোমধ্যেই অস্তাচলে সূর্যটা ঢ’লে পড়েছে। এখন জুঁইকে অনেকটা রঙিন ও কাব্যিক মনে হচ্ছে। অনেকটা অভূতপূর্ব! মনে হচ্ছে, এ অন্য আরেক জুঁই!
সে বলে, ‘তো দেখ আমি কে? তোমার প্রবাসী প্রেমিকা? নাকি তোমার প্রয়াত স্ত্রী? দেখ। আমি কি তোমার জবা? নাকি তোমার শিউলি? বল।’

আমি কোনোক্রমেই প্রেমিকা জবাকে এই জুঁইয়ের মাঝে দেখতে পেলাম না। এমনকি, নিজের প্রিয়তমা স্ত্রী শিউলিকেও জুঁইয়ের অবয়বে আবিষ্কার করতে পারলাম না। অনেক চেষ্টা ক’রেও তার মুখখানা স্মরণ করতে পারলাম না। তার সেই হাসি। আমার সান্নিধ্যে এ জুঁই, না সে জবা! না সে শিউলি! আমি স্তম্ভিত! বিপর্যস্ত!

অথচ কী আশ্চর্য! কোথায় আমার অতীত? আর কোথায় এই আমি এখন? বাস্তবিক, আমি আমার অতীত এবং বর্তমান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি! আমার ভবিষ্যৎ বলতেও সামনে কিছুই নেই ব’লে প্রতিভাত হচ্ছে! এখন প্রশ্ন, এই আমি আসোলে কী?

দেখি, আমি যাকে ভুলে যেতে চেয়েছিলাম, সেই মায়াবনবিহারিণী জবা সে, আবারও আমার সামনাসামনি দাঁড়িয়েছে! আমার সমস্ত প্রেম আমার শ্রদ্ধেয়া স্ত্রী শিউলির কাছে সোপর্দ করেছি ব’লে, এতদিন যাকে ফিরিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছি, আমার স্ত্রীর ভাষায় সেই ‘কালনাগিনী’ তার সুন্দর মোহনীয় ফনা তু’লে আমার সামনে দাঁড়ায় এসে, তার ‘অমর ভালোবাসা’র দাবি নিয়ে। সুযোগ বুঝেই সে তার উদ্যত ছোবল বসিয়ে দেবে! তখন আমার কী হবে?

আমার স্ত্রীকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আচ্ছা সেই অতীতের তোমার প্রেমিক মানুষটি কি ভালোবাসার চেরাগ জ্বেলে পিছনে ফিরে যেতে ফের হাতছানি দেয় না?’ আমার পতিপ্রাণা স্ত্রীর দৃঢ়কন্ঠ, ‘তুমিই এখন, আমার স্বপ্নের সেই প্রেমিকমানুষ, শিমুল!’

অথচ কী আশ্চর্য! আমি ওর কথায় সেদিন বিন্দুমাত্র বিশ্বাস রাখতে পারিনি। বোধকরি আমার মত, কোনদিনই সে সত্যিকার ভালোবাসা দিতে পারেনি তার সাংসারিক জগতে। হায় কী মিথ্যা! ডাহা অলীক নড়বড়ে ঘর! সাজানো সংসার! একেবারেই মিথ্যা, পারস্পরিক আত্মার সম্পর্ক! দেখি জীবনযাপনের মঞ্চ জুড়ে ক্লাইম্যাক্স সমৃদ্ধ এ এক ভিন্নতর নাটক! যার পরতে পরতে শুধুই নিখুঁত অভিনয়! এর চেয়ে বেশী কিছু নয়!

হাঁ শিউলি! তাকে দাম্পত্য আবহে সারা জীবন আঁকড়ে ধ’রে রাখতেই চেয়েছিলাম। সেই প্রিয়তমা স্ত্রী এসে, আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে! আমি তার চোখে চোখ রাখতে পারছি না। একরাশ ভয় আমাকে ঘিরে ফেলেছে! আজ সেও তার অমর ভালোবাসার দাবি নিয়ে, আমার সান্নিধ্যে, অবস্থান ধর্মঘটে সামিল হয়েছে! বুঝতে পারছি, সে আমার শেষ পরিণাম দেখেই ছাড়বে! আর তখন এই আমার কী হবে? একরাশ সন্দেহ ও ভয় অবলীলায় আমাকে আড়ষ্ট করে রাখে।

জুঁইয়ের সান্নিধ্যের ঘোর কেটে যায় আমার! নির্ঘাত, জবা এবং শিউলি জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় আমাকে দাঁড় করিয়ে ছাড়বে! তখন আমি কী সাক্ষ্য দেব! আমি নিশ্চিত, তাদের দু’জনের রায়ে, নির্ঘাত আমার যাবজ্জীবন হয়ে যাবে। আমি মুক্তি পাবো না কোন কালেই!

এ সময় টের পাচ্ছি, আমার ভগ্ন-হৃদয়ে প্রচন্ড ক্ষরণ হচ্ছে! এই ক্ষরণ মিলনের নয়, বিচ্ছেদের! আনন্দের নয়, বিষাদের! তার উষ্ণ প্রভা আমাকে একেবারেই স্তব্ধ করে রাখে।

অনেকক্ষণ পর সম্বিৎ ফিরে আসে আমার। ঠিক এ সময় এখানে, আমি জুঁইকে হাতড়ে আর খুঁজে পাই না! কোথাও না! আমি দেখি কী এক ভালোবাসার তিমিরে হেঁটে চলছি আমি। তার আবর্তে নিমজ্জিত হয়ে, আরও গভীরে তলিয়ে যাচ্ছি আমি! না! সব অনিশ্চয়তা কাটিয়ে এবার দেখি বাস্তবিক, আমার জবার সাথে আমি দিব্যি লুটোপুটি খাচ্ছি! আর খাচ্ছি!

আবার দেখি, না! জবা নয়। আমি তাকেও চাই না! সব কিছু পিছনে ফেলে, সামনের ঘনায়মান ফুলের স্তরের দিকে দ্রুত হেঁটে যাচ্ছি আমি। ওই তো, সামনেই আমার প্রিয়তমা স্বর্গীয় স্ত্রী শিউলি! সেও হেঁটে চলেছে আমার আগে আগে।

এখানে জবা নেই! জুঁইও নেই! এবার দেখি শিউলি দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে আছে। উদ্যম বাতাসে উড়ছে তার চুল, আকাশী নীল শাড়ির আঁচল! আহা কী নান্দনিক! কী মোহনীয়! সে আমাকে আহ্বান করছে তার সান্নিধ্যে মিশে যেতে। আবার দেখি হ্যাঁ! বাস্তবিকই, আমার শিউলির সাথে উদাম খুনসুটিতে মেতে আছি আমি! এখানে জুঁই নেই! আহা কী আনন্দ …!

এ সময় জুঁইকে আমার কাছে, একান্তই অস্তিত্ব বিহীন ‘প্রবাসী’ এবং ‘প্রয়াত’ এক নারী ব’লেই মনে হচ্ছে! পিছন দিকে তাকিয়ে দেখি, ক্রমেই সে অন্ধকারের বলয়ে মিশে যাচ্ছে। আমার সামনে জবাকে অতিক্রম ক’রে ছুটে চলেছি আরও সামনের দিকে! শিউলি তার দু’বাহু বাড়িয়ে আমাকে আহ্বান করছে। আমি চিৎকার ক’রে বলি, ‘দাঁড়াও শিউলি! এই আমি আসছি! তুমি বিশ্বাস কর, আমি এখনও কেবল তোমারই আছি! তোমারই ভালোবাসার আবর্তে ডুবে আছি আমি! বিশ্বাস কর। চিরদিন তোমারই থাকব আমি!’
***************************

Leave a Reply