আলাঁ বাদিউ-এর ‘ইতিহাসের পুনর্জন্ম’: গণ-অভ্যুত্থান, লড়াই ও আমাদের সময়
আলী সিদ্দিকী
ফরাসি দার্শনিক আলাঁ বাদিউ (Alain Badiou) আধুনিক রাজনৈতিক দর্শন ও বিপ্লবচিন্তার অন্যতম প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর। তাঁর আলোচিত রচনা The Rebirth of History: Times of Riots and Uprisings (মূল ফরাসি: La Résurrection de l’Histoire, 2011), একবিংশ শতকের রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে গণ-অভ্যুত্থান এবং ইতিহাসের সম্ভাব্য পুনর্জন্ম নিয়ে এক বিশ্লেষণাত্মক ও তাত্ত্বিক ঘোষণা। তিউনিসিয়া থেকে শুরু হওয়া আরব বসন্ত, গ্রিস ও স্পেনের আন্দোলন এবং ওয়াল স্ট্রিট দখলের মতো গণ-প্রতিরোধের ঘটনাগুলিকে বাদিউ ‘ঐতিহাসিক সত্যের প্রত্যাবর্তন’ হিসেবে অভিহিত করেন। এই প্রবন্ধে আমরা আলোচ্য গ্রন্থটির মূল তত্ত্ব, তার প্রাসঙ্গিকতা, এবং বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতা ও ইতিহাসবিরোধী প্রবণতার আলোকে এর ব্যাখ্যা উপস্থাপন করব।
বাদিউ ‘ইতিহাস’ বলতে বোঝেন এমন এক ক্রান্তিকাল, যেখানে জনগণ সক্রিয়ভাবে বিদ্যমান শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং এক নতুন রাজনৈতিক বিষয়বস্তুর জন্ম হয়। এই মুহূর্তগুলোকে তিনি বলেন “Event” বা এভেন্টল মুহূর্ত, যা বিদ্যমান ধারাবাহিকতার মধ্যে ফাটল সৃষ্টি করে। তিনি বলেন, ইতিহাস তখনই পুনর্জন্ম লাভ করে যখন ‘গণজাগরণ’ শাসকশ্রেণির প্রতিনিধিত্বমূলক কাঠামোকে অতিক্রম করে এক নতুন সত্যকে রূপ দিতে সক্ষম হয়।
বিপ্লব আজ আর কেবল বলশেভিক মডেলে সম্ভব নয়—বরং তা ছড়িয়ে পড়ে ছোট ছোট গণজমায়েত, বিক্ষিপ্ত প্রতিরোধ, তাত্ত্বিক পুনর্চিন্তা এবং রাস্তায় আত্মপ্রকাশ করা রাজনৈতিক বিষয়বস্তুর মধ্য দিয়ে। এই প্রেক্ষাপটে, ২০১১-১২ সালের আরব বসন্ত, স্পেনের ইন্ডিগনাডোস আন্দোলন কিংবা ওয়াল স্ট্রিট দখল—সবই ইতিহাসের এক সম্ভাব্য পুনরুত্থানের ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু বাদিউ প্রশ্ন রাখেন: এই উত্থান কি শেষ পর্যন্ত নব্য-উদারনীতিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় না?
বাদিউর দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু হলো “Truth Procedure”। তার মতে, সত্য একটি নির্দিষ্ট ‘Event’ থেকে জন্ম নেয়, যেখানে জনগণ এক নতুন রাজনৈতিক চেতনার পথে প্রতিশ্রুতি দেয়। এই প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিকতাই ইতিহাসের নতুন অধ্যায় রচনা করে। গণ-অভ্যুত্থান তখনই ইতিহাসের জন্ম দেয়, যখন জনগণ নিজেই হয়ে ওঠে রাজনৈতিক সত্যের বাহক।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা—বিশেষত ২০২৪ সালের নির্বাচন-পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ধরনের মব ভায়োলেন্স, সংখ্যালঘুদের উপর হামলা, এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করার রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি উদ্যোগ—একটি বিপজ্জনক প্রবণতার দিকে নির্দেশ করে। এখানে রাষ্ট্রক্ষমতা ও জনগণের সম্পর্ক চরম বিচ্ছিন্নতায় উপনীত হয়েছে। বাদিউ’র ভাষায়, এটি এমন এক সময়, যেখানে শাসনব্যবস্থা রাজনৈতিক বিষয়কে প্রতিস্থাপন করে নিছক প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে পরিণত হয়েছে। ইতিহাস এখানে নীরব, জনগণ বিভক্ত, এবং প্রতিরোধের ভাষা আংশিক অথবা দলীয় কাঠামোয় বন্দি।
তবে প্রশ্ন উঠতে পারে: এই মুহূর্তে কোনো ‘Event’ কি জন্ম নিচ্ছে? কি এমন সত্যের জন্ম, যা রাজনৈতিক বিশ্বাসে পরিণত হতে পারে?
বর্তমান সময়ে দেখা যাচ্ছে, ইতিহাসকে পুনর্লিখনের এক সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা চলছে—যেখানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সংবিধানের মৌলিক নীতি ও রাজনৈতিক বুদ্ধিজীবীদের কণ্ঠকে নিশ্চুপ করার প্রবণতা প্রবল হয়ে উঠছে। বাদিউ এই পরিস্থিতিকে বলতেন “management of consensus”: যেখানে শাসকগোষ্ঠী বিরুদ্ধ কণ্ঠস্বরকে “anomaly” বা বিচ্যুতি হিসেবে বিবেচনা করে দমন করে। রাজনৈতিক সত্যের অভাবে সমাজ পরিণত হয় এক প্রকার ঐতিহাসিক শূন্যতায়।
তবুও, বাদিউ আমাদের আশা রাখতে বলেন সেই সম্ভাবনার উপর, যেখানে ইতিহাস আবার জন্ম নিতে পারে। যখন তরুণ প্রজন্ম, শ্রমজীবী মানুষ, নিপীড়িত গোষ্ঠী মিলিত হয়ে এক নতুন প্রতিশ্রুতি দেয়—তখনই এক নতুন ইতিহাসের সূচনা হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এই প্রতিশ্রুতি নিহিত থাকতে পারে—একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র, সত্যনিষ্ঠ ইতিহাসচর্চা, এবং সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের মধ্যে।
আলাঁ বাদিউর ‘The Rebirth of History’ কেবল এক তাত্ত্বিক রচনা নয়—এটি একটি রাজনৈতিক সাহসিকতার আহ্বান। তিনি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে ইতিহাস কেবল পেছনের দিকে নয়, বরং প্রতিবার নতুন করে জন্ম নেয় একজোট মানুষের চেতনার বিস্ফোরণে। আজকের বাংলাদেশে, যখন সত্য ইতিহাসকে মুছে ফেলার স্পর্ধা ও জনগণকে নিঃসত্তা করার প্রক্রিয়া চলমান, তখন বাদিউ আমাদের আহ্বান জানান ইতিহাসকে আবার জীবিত করার।
তথ্যসূত্র:
1. Badiou, Alain. The Rebirth of History: Times of Riots and Uprisings. Verso Books, 2012.
2. Hallward, Peter. “The Will of the People: Notes on Badiou’s ‘Rebirth of History’.” Radical Philosophy, 2013.
3. Dean, Jodi. Crowds and Party. Verso, 2016.
4. Mouffe, Chantal. Agonistics: Thinking the World Politically. Verso, 2013.
5. বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা, ২০২৩-২৪ সালের নির্বাচনী সহিংসতা সংক্রান্ত প্রতিবেদন।
6. হাসান আজিজুল হক, “আত্মপরিচয়ের সংকট ও ইতিহাসচর্চা,” বিচিত্রা, ২০২৪।
*********************************
