You are currently viewing দয়াময়ীর কথা: নারীর চোখে দেশভাগ/ ড. নিলুফা আক্তার

দয়াময়ীর কথা: নারীর চোখে দেশভাগ/ ড. নিলুফা আক্তার

দয়াময়ীর কথা: নারীর চোখে দেশভাগ

ড. নিলুফা আক্তার

(সার সংক্ষেপ: মাতা-পিতা এবং মাতৃভ‚মি পরস্পর মানব অস্তিত্বের সম্পূরক। এই দুই সত্তাকে কেন্দ্র করে জীবন তথা মানুষের অন্তর্জগত ও বহির্জগত স্থিতি ও গতি পায়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ বাঙালির জীবনে ভয়ংকর মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনে। মানুষের জীবনে স্থিতি ও গতির সমন্বয় ও সামঞ্জস্য সমুলে ধ্বংস করে দেয়। এই ধ্বংসের শিকার হাজারও বাঙালির মতো সুনন্দা সিকদার অর্থাৎ দয়াময়ী। এক দিকে জন্মভ‚মি অন্যদিকে মাতাপিতা এবং মধ্যখানের শূন্যস্থানে ভালোবাসা আর অস্তিত্বের টানাপোড়ন নিয়ে বেড়ে ওঠা দশ বছরের বালিকা ‘দয়া’। প্রেম এবং অস্তিত্বের সংকটের অভিজ্ঞতা নিয়ে বেড়ে ওঠা দয়ার স্মৃতির মানচিত্র ‘দয়াময়ীর কথা’। শিশু দয়া থেকে নারী সুনন্দা সিকদারের উত্তরণের পথে দেশভাগকালীন সংগঠিত ঘটনা, বিচিত্র উপলব্ধিবোধ, গভীর বেদনা তথা একজন নারীর দৃষ্টিতে দেখা ‘দেশভাগ’ এর মর্মভেদী বয়ান আলোচ্য সেমিনার পেপারের মূল প্রতিপাদ্য। )

‘পূর্বপুরুষের ভিটা এমনি কেউ ছাড়ে না, বহু দু:খে পরানের অর্ধেকটা রাইখ্যা যাইতাছি।’ (সিকদার, ২০১২ : ৭০) দেশভাগের অন্তর্জ্বালার এই মর্মভেদী স্বীকারোক্তি শুধু কী লাহিড়ী কর্তার একার ছিল? না, বরং পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গের উদ্বাস্তু, শরণার্থী, বাস্তুহারা, ভূমি বিনিময়ী পরিবার, লতায়-পাতায় বিচিত্র অনুভূতি নিয়ে যাপিত পরিবার-পরিজন-প্রতিবেশী থেকে শুরু করে সকল স্তরের মানুষের অনুভূতি ঐ পরানের অর্ধেকটা রেখে যাওয়ার রক্তাক্ত স্মৃতিতে গুম হয়েছিল। যে স্মৃতির কথা বলাও যায় না; সহাও যায়না। দশ বছরের শিশু ‘দয়া’র ছোট জীবনের আনন্দ, দেশভাগের মর্মান্তিক দু:খভার হয়ে গেঁড়ে থাকে লেখক ‘সুনন্দা শিকদারে’র গোটা সত্তায়। দাদার ‘মৃত্যুচিঠি’ সুনন্দা সিকদারের স্মৃতির হীমঘরে বাঁধ ভাঙা প্লাবন আনে। সুনন্দা, কাঁকন, দয়াময়ী সব ছাপিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায় ‘দয়া আর দেশভাগ।’ লেখক ‘সুনন্দা সিকদারে’র নারী সত্তায় জোনাকী আলোর মত প্রজ্জ্বলিত তাঁর অস্তিত্বের খন্ডাংশ, ‘শিশু দয়া’ আর শিকড় ‘জন্মভূমি’ পূর্ববঙ্গ। দুই যুগেরও অধিক সময়  ধরে যক্ষের ধনের মত বুকে পুষে রাখা শিশু দয়ার স্মৃতির মূল আকর ‘দেশভাগ’। দেশভাগ এর জটিল কুটিল আবর্তে দিকভ্রান্ত মানুষের জীবন দেখেই পূর্ববঙ্গের দিঘাপাইত গ্রামে অতিবাহিত দয়ার দশ বছরের শৈশব জীবন। সেই ‘দয়া’ পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসী ‘সুনন্দা সিকদার’ আজ পরিণত নারী। ‘সুনন্দা সিকদারে’র স্মৃতিতে সদা-জাগ্রত ‘দয়া’র শৈশবে দেখা দেশভাগের সঙ্কটকালীন দিঘাপাইত ও আশেপাশের গ্রামের মানুষের স্মৃতি নিয়ে রচিত প্রবন্ধ ‘দয়াময়ীর কথা: নারীর চোখে দেশভাগ।’ সুনন্দা সিকদারের অতিবাহিত কালের অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ, রসে গন্ধময়, রূপ-চিত্রে দৃষ্টিগ্রাহ্য, স্পর্শে অনুভব যোগ্য স্মৃতি জাগানিয়া অতীত ‘দয়াময়ীর কথা’। দয়া থেকে সুনন্দা সিকদারে সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমণে মিশে আছে দিঘাপাইত গ্রাম থেকে পশ্চিম বঙ্গ পর্যন্ত দীর্ঘ ৪৭ বছরে জীবন পরিক্রমার গভীরবোধ ও প্রজ্ঞার নিবিড় রসায়ন।

ইংরেজি Partition শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ ‘ভাগ’ যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘দেশ’। বাঙালির ইতিহাসে ‘Partition’ শব্দটি আক্ষরিক অর্থের উর্ধ্বে নতুন একটি ভাবার্থ নিয়ে উপস্থিত তা হলো ‘দেশভাগ’। অর্থাৎ বাঙালি ‘Partition’ বলতে মূলত ‘দেশভাগ’কেই বোঝে। অর্থাৎ মানুষের জন্ম-কর্ম-ধর্ম তথা সম্পর্ণূ মানুষ সত্তা খন্ডিত হয়ে যাচ্ছে এই একটি শব্দের দ্বারা। যার সামনে-পিছনে আশে-পাশে কোন সহায়ক শব্দ নেই। সরাসরি ক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত এই ‘Partition’ শব্দটি। যার প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া মানুষের ভাগ। নির্মম মূলচ্ছেদ। অসহ্য শূন্যতা। গভীর ‘না’। স্বদেশী আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলনের মূল আঁকড়ে আছে অস্তিত্বকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যুদ্ধ অর্থাৎ ‘হা’ এর জন্য যুদ্ধ। এই Being এর জন্য যুদ্ধে মানুষ বিভাজিত হয় না বরং একত্রিত হয়। যুদ্ধ মানে হারানো প্রাপ্তির খেলা। তথাপি জয়ী হলে হারানো বোধটি মৌন হয়ে উচ্চকিত হয়ে উঠে প্রাপ্তি। কিন্তু দেশভাগ কী আদৌ মানুষের এই সর্বজনীন সত্তা অর্থাৎ Universal Being এর জন্য যুদ্ধ? শ্বাশত জনতার প্রাপ্তির জন্য যুদ্ধ না কি কেবল হারানোর যুদ্ধ? নিজের অস্তিত্বকে নিজের কাছ থেকে খন্ডিত করার জন্য যুদ্ধ? মানুষের মধ্যে যখন বিভাজন শব্দটি প্রয়োগ হয় তখন সেখানে আদৌ কি কোন ইতিবাচক ফল বাস্তবায়িত হয়? হয় না। ফলে যে অহংকার আত্মবিশ্বাস নিয়ে মানুষের কণ্ঠে মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস উচ্চারিত হয় ঠিক ততটাই বেদনা আর গ্লানি নিয়ে মানুষ উচ্চারণ করে ‘Partition’ বা ‘দেশভাগ’ শব্দটি। ভারতবর্ষ জয়ের গৌরবময় ইতিহাস দেশভাগের এই কলংকিত অধ্যায়ের অন্ধকারে বিবর্ণ ম্রিয়মান, ধূসর। অবিভক্ত ভারতের জয় চরম ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে দেশভাগের ধারালো অস্ত্রে বাঙলির সর্বজনিন সত্তাকে দ্বিখন্ডিত করে। ১৯৪৭ এর ১৫ অগাস্ট ভারত ভ‚-খন্ডের জয় এবং বাঙালির জাতীয় সত্তার পরাজয়, এই পরস্পর বিপরীতমুখী চেতনা নিয়ে ‘বাঙালি-অস্তিত্ব’ আজও প্রবহমান। আরো একটি নির্মম বাস্তবতা হলো দেশভাগ মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে মানচিত্র অর্থাৎ ঠিকানা, ভ‚গোল, ইতিহাস, জলবায়ু, আবহাওয়া, এমনকি খাদ্যাভাস সবকিছু ওলট-পালট করে দিয়েছে। কিন্তু সমাজ তার স্থিতিস্থাপকতা দিয়ে মানুষ বিনিময়ের মাধ্যমে উদ্ভ‚ত বস্তুগত শূন্যস্থান নিয়ত পূর্ণ করে দিয়েছে, ভাবগত শূন্যতা প্রেতাত্মা হয়ে আমৃত্যু মানুষকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

সুনন্দা সিকদার অর্থাৎ দয়াময়ীর জন্ম পূর্ববঙ্গের প্রত্যন্ত অ লের দিঘাপাইত নামক কোনো এক গাঁ-এ। পালিকা মায়ের মুখে শিশু দয়া তার জন্ম বৃত্তান্ত শুনে,

……দ্যাখ দয়া……তোমারে যে আজ আমি কোলে পাইচি, তাও নিয়তির খেলা। হিন্দুস্থান-পাকিস্তান হইল, তোমার মা বাপ হিন্দুস্তানে চাকরি পাইয়া চইলা গেল। তোমারে তখন দেখাশুনা করে তোমার বড়দা দুলু। এই দুলু আবার চাকরি পাইল হিন্দুস্তানের রূপনারায়নপুর। কেমুন কইরা সে আপিস যায়। তুমি তখন কয় মাসের শিশু। দুলু আমাদের কইলো, পিসিমা, এটারে তুমি নিয়া যাও। দুলুর কথায় তোমারে আইনলাম। বুড়ির দুধ খাইয়া আস্তে আস্তে বড়ো হইয়া গেলে।’ (সিকদার, ২০১২ : ৭২)

অর্থাৎ দয়ার জন্ম ’৪৬ এর দাঙ্গা, ’৪৭ এর দেশভাগের ক্রান্তিকাল ধরে ১৯৫১ সালে। দয়ার জন্ম ইতিহাস থেকে পাঠক জানতে পারে দেশভাগের কারণে একটি পরিবারের খন্ডিত হওয়ার, শিকড়চ্যুত হওয়া বেদনাময় কাহিনি, আটমাসের একটি শিশুর পিতা-মাতার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার মর্মান্তিক ইতিহাস। পরবর্তীতে দেখি দেশভাগের নীরব ব্যথা অন্তরে গোপন করে শিশু দয়ার বেড়ে ওঠা। ১০ বছর বয়সে পশ্চিমবঙ্গে মা-বাবার কাছে ফিরে যাওয়া। শিশু ‘দয়া’ই একসময় ‘সুনন্দা সিকদার’ হয়ে পশ্চিমবঙ্গের মৃত্তিকা আকাশ বাতাস জলে জড়িয়ে যায়। আদৌ কী জড়িয়ে যায়, জড়ানো কী যায়? সুনন্দা সিকদারের দয়াময়ীর কথা থেকেই তার মনোজগতের কথা জানা যাক, ‘যারা মনের গতিবিধি নিয়ে কাজ করেন, তাঁরাই বলতে পারবেন, আমি কেন শৈশবের দশটা বছর এমন যক্ষের মতো আগলে রেখেছি এত কাল।….চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় পশ্চিমবঙ্গের এক মফস্সল শহরের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থেকেও মনে হয় আমি অনধিকার প্রবেশকারী ’(সিকদার, ২০১২ : ৪২) এ শুধু দয়ারূপী সুনন্দার একার মনোকথা নয়, দেশভাগের কারণে ভিটেমাটি ছাড়া, হারা সকল মানুষেরই মনোকষ্টের কথা। দশ বছরের শিশু দয়া আজ পরিণত নারী সুনন্দা, কারো স্ত্রী, কারো মা। ভরাভারা সংসারের কর্ত্রী। জন্মক্ষণ থেকে শুরু করে জীবনের দশটা বছর সে অতিবাহিত করেছে পূর্ববঙ্গের দিঘাপাইত গ্রামে, আর চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তাঁর জীবন পশ্চিমবঙ্গে অথচ শৈশবের সেই দশটা বছর তাঁর কাছে যক্ষের ধন হয়ে আছে। পিতামাতা ভাই বোনের সান্নিধ্য, স্নেহ, ভালবাসা, স্বামীর প্রেম, সন্তানের ভালবাসাও তাঁর মাতৃভূমির টানের অভাব পূর্ণ করতে পারেনি। জীবনের এই গভীর উপলব্ধিবোধ দয়া কোথায় পেল? কেমন করে?

অভীক মজুমদার এর আলোচনা থেকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায় :

ধর্ম-ভাষা-বর্ণ গাত্রবর্ণ প্রভৃতি বহুলাংশ মানব অস্তিত্বের তথা মানুষের আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু, এসবের পাশাপাশি মানুষের একটা বড় পরিচয় তার ভূখন্ড, তার মানচিত্রগত অ লবৈশিষ্ট্য, অধ্যাপক হিতেশরঞ্জন সান্যালের কথা ধার করে বলা চলে, মানুষের স্থানিক মাত্রা। যে বিশেষ জল মাটি পরিবেশ এবং জন-মানুষ, জীবিকা জীবনচর্যার সান্নিধ্যে কোনও ব্যক্তির জন্ম, সে নিতান্ত সংকীর্ণ তল্লাটের ছোট ছোট বৈশিষ্ট্যও অজান্তে ধারণ করতে থাকে মানুষ, বড় হওয়ার সঙ্গে সেসব অনু-পরমানু মিশে যেতে থাকে তার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে-হয়ে ওঠে ব্যক্তিত্বের একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ( ঘোষ, ২০১৪ : ১৪৯)

এই বক্তব্যের সত্যতা মেলে ‘দয়া’র স্মৃতিচারণে ‘পরবর্তী জীবনে আমার আরও দুটি নাম হয়েছিল, বাবার আর আমার জন্মদার্ত্রী মায়ের দেয়া-কাঁকন আর সুনন্দা। এই দুই নামের আড়ালে গাঁয়ের সেই দয়াময়ী তার কিছু গ্রাম্য সংস্কার নিয়ে আজও বেঁচে আছে আমার মধ্যে। (সিকদার, ২০১২ : ৭৪)

কিংবা,

‘যদি বর্ষে মাষের শেষ

ধন্য রাজা পুণ্য দেশ।’

এই সব প্রবাদ প্রবচন-বচন আমাকে আলাদা করে রেখেছে আমার শহুরে বন্ধুদের থেকে।’ (সিকদার, ২০১২ : ৪৩) প্রায় সত্তর বছর পরে দেশবিভাগের স্মৃতিচারণে এই একই বোধে আবদ্ধ ‘ছবি দাস’−⎯‘তবু রাতে শুইয়া মাঝে মাঝে মনে হয়। তুলসী গাছ করছিলাম, বুড়িগঙ্গা থিক্যা মাটি আইন্যা……। কত কাঁচের চুড়ি পরতাম হাত ভইরা……এ দেশে তো ও চলে না।’ ( ঘোষ, ২০১৪ : ৯৭)। এই স্মৃতিতে ট্রমাগ্রস্ত দেশভাগের নির্মম শিকার সকল শ্রেণির সকল ধর্মের মানুষ। আর এই ট্রমার উৎস দেশভাগজনিত নিষ্ঠুরতা। হারানো ভিটে, হারানো মানুষগুলোর সঙ্গে মানুষের গোপন অনুভূতি, অভ্যস্ততা স্মৃতিকাতরতা জড়িয়ে থাকে। চল্লিশোর্ধ দয়াময়ীর স্বীকারোক্তি⎯‘এই শহরের জীবন যাপনের সবগুলো অভ্যেস আমার মধ্যে ঢুকে গেছে। তবু সমস্ত কিছুর মধ্যেই দাদার এক অনিবার্য উত্তরাধিকার আমি বহন করে চলেছি।’ (সিকদার, ২০১২ : ১১) কিংবা, ‘তিনি আমার পালিকা মায়ের ননদ ভুলিপিসিমা। আমার জীবনের ওপর আমার এই পিসিমা স্থায়ী প্রভাব রেখে গেছেন।’ (সিকদার, ২০১২ : ৩৪) ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ, দাঙ্গায় অস্থির উভয় বঙ্গ, হিন্দু মুসলমানের বংশ পরস্পরা সম্প্রীতির বন্ধন বিপর্যস্ত। দয়ার বেড়ে ওঠা দিঘাপাইত গ্রামেও উচুঁ-নীচু, জাত-পাত নিয়ে বড় অশান্তি। ‘দয়াময়ীর কথা’য় বার বার এই বিড়ম্বনার কথা, বেদনার কথা উঠে এসেছে। দয়া রক্ষণশীল হিন্দু পরিবারের সন্তান আর দাদা (মাজম শেখ) ধর্মপ্রাণ দরিদ্র মুসলমান। এই সাম্প্রদায়িক সমাজে সেই দাদার উত্তরাধিকার দয়া কী করে বহন করে? এই ছোট শিশু দয়ার মধ্যে উদার মানবতাবোধ তৈরী হলো কী করে? মাত্র দশ বছর বয়সে অর্থাৎ শিশুর জীবনের শুরু বলা হয় সেই সময়টুকুতে পশ্চিমবঙ্গে মাতা-পিতা, পরিবারের কাছে এলেও পূর্ববঙ্গের মাটি ও মানুষের কথা কেন সে ভুলতে পারে না? সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে সম্প্রীতির এই হাওয়া এলো কোথা থেকে? এই প্রশ্নগুলো স্বাভাবিক ভাবেই পাঠক কে বিচলিত করে। দয়ার শৈশব স্মৃতিকে প্রত্যক্ষ করলে তার উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়।

শিশু ‘দয়া’ মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসার প্রথম পাঠ নেয় মুসলমান হতদরিদ্র; তাদের বাড়ির দিনমজুর দাদা মাজম শেখের কাছ থেকে। আর মাতৃভূমির মাটির মানুষের গভীর টান ‘দয়া’ প্রথম পরম বিস্ময় নিয়ে অনুভর করে পশ্চিমবঙ্গ থেকে আগত রহিমা দাদির আঁচলে বেঁধে নিয়ে আসা ‘তিন মুষ্টি মাটির’ অস্তিত্বে। রহিমা দাদি ওদের বাড়ির ‘তিন মুষ্টি মাটির’ গোপন ইতিহাস শিশু দয়াকে শুনিয়েছিলেন। সেই বোধকে লালন করেই দয়ার জন্মভূমির মাটি আর মানুষের প্রতি প্রগাঢ় ভালবাসার বন্ধন জাগ্রত হয়। অধ্যাপক দীপেশ চক্রবর্তীর প্রবন্ধে ‘এ তিনমুষ্টি মাটির’ টান এর স্মৃতিই যেন ফিরে আসে-

‘শেষ পর্যন্ত সবাইকে বিস্মিত করে দিয়ে বন্ধুটি তুলে দিল আমার হাতে এক কৌটো মাটি। আমার পিতৃ-পিতামহের  আশিস-পূত বসতবাটি ‘বসু বাড়ির ভিটের’ মাটি। এ মাটি আমার মা। এ মাটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে পূর্ব-পুরুষের পুণ্যস্মৃতি…মাথায় ঠেকালাম সে মাটি……এ মাটি বাঙলার হৃদয়-নিঙ্ড়ানো রক্তে সিক্ত আজ।’ (ঘোষ, ২০১৪ : ১৬৭)

‘হারানো দিন হারানো মানুষ’ স্মৃতি গ্রন্থের রচয়িতা সুজিৎ চৌধুরী তাঁর ভূগোলের শিক্ষক বীরেন বাবুর স্মৃতিচারণ করেন ‘ছেড়ে আসা ভূমির প্রতি যে মমতোবোধ থেকে এই আত্মকথনের সূচনা তার আদিম শিখাটি বীরেন বাবুই জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন’  (চৌধুরী, ২০০৮, ১০৭) লেখক সুনন্দা সিকদারের ‘দয়ামীর কথা’ রচনার নেপথ্যের কাহিনীও প্রায় একই ধরণের অনুভ‚তি ও অভিজ্ঞতা সঞ্জাত।

ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয়, ক্ষমতার নীতিনির্ধারক মুষ্টিমেয় ক্ষমতাধর ব্যক্তিই থাকে। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক পরিবর্তনে তাদের কল-কাঠি সঞ্চালন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ এই তথাকথিত নীতি-নির্ধারকদের চিন্তার ফসল। এর ভয়ংকর বিরূপ প্রভাব ভোগ করে পূর্ব-পশ্চিম বঙ্গের হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে সাধারণ জনগন। এ প্রসঙ্গে আনিসুজ্জামানের বক্তব্য স্মর্তব্য-‘জনসাধারণ যে আন্দোলনের নায়ক নয় তার সাফল্যে সীমাবদ্ধতা থাকে।’ (ঘোষ, ২০১৪ : ৩৯) এই বাস্তবতা দেশভাগের ইতিহাসে প্রত্যক্ষ হয়। সাম্প্রদায়িকতার যে বীজ বৃটিশ শাসক আর ক্ষমতাবান রাজনৈতিক নেতারা, সাধারণ মানুষের ভেতরে সংক্রামিত করে দিয়েছে, সেই সংক্রমনের প্রতিষেধক মানবতাকে সর্বস্তরের জনগন নানাবিধ কারণে ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়, ফলে ভাঙ্গনের ভেতরেও নতুন করে গড়ার যে লক্ষ্য নিয়ে মানুষ এগিয়েছিল, তা চরমভাবে ব্যর্থ হয়। ক্ষমতালোভীদের ছড়ানো বিষাক্ত জীবানুর সংক্রমণে সহস্র বছরের প্রীতিতে লালিত বাঙালির জাতিসত্তায় গ্যাংগ্রিনের মতো পচন ধরে। হিন্দু-মুসলমানের মিলিত সত্তা সন্দেহের বিষবাষ্পে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ঐ নির্মম বাস্তবতার স্মৃতি প্রত্যক্ষ হয় রমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণে-

‘১৯৪৬ সালে কলকাতায় হিন্দু মুসলমানের দাঙ্গা খুব প্রবল হয়ে উঠল, তারপর দেশ বিভাগ হয়ে গেল। প্রায় মুসলমানেই চলে যেতে লাগল ভারত ছেড়ে বাংলাদেশে। আমরা তখন বলতাম হিন্দুস্থান আর পাকিস্তান। সে সময়ে চারিদিকে হৈ হৈ রৈ রৈ কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না হিন্দু মুসলমান। দু’দলেই মুখে যদিও সবাই সবাইকে বলছে ভাই ভাই কিন্তু সকলের মুখেই যেন কেমন অবিশ্বাসের ছাপ, হিন্দুরা বলছে কোথায় যাবে বাপ পিতামহের দেশ ছেড়ে, মুসলমানরা যদিও বলছে সেতো ন্যায্য কথা, তবুও তাদের চোখে ভয় চকতি চাহনি- কোথায় যেন গলদ আটকে গেছে। হিন্দুরা তাকায় মুসলমানের দিকে সন্দেহের চাহনিতে, মুসলমানেরা তেমনি করেই তাকায় হিন্দুর দিকে। ( ঘোষ, ১৯৯০ : ১৪৬)

তথাপি জন্মভূমিপ্রেম, ধর্ম নির্বিশিষে মানবিকপ্রেম মানুষ ত্যাগ করতে পারেনি। দাঙ্গার আগুন দিঘাপাইত গ্রামকে পোড়াতে পারেনি ফলে জাত-পাত, উচুঁ-নীচু ভেদের ভেতরেরও কোনো না কোনো ভাবে মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসা, মানবতাবোধ অটুট ছিল। এর গভীর প্রভাব দয়ার জীবনের খন্ড খন্ড স্মৃতি কথায় খুঁজে পাওয়া যায়। দাদা, সমসের চাচা, ইয়েদালি কাকা, পালিকা মা, ভুলি পিসি, আমুদা, আছর ভাই প্রমুখ এই স¤প্রীতির ধারক। দাদার সঙ্গে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে দয়ার মধুমাখা শৈশব। ধর্ম শ্রেণী নির্বিশেষে মানুষকে ভালোবাসা মানুষের পাশাপাশি এমন কী পৃথিবীর প্রতিটি জীব-জন্তু, ফুল বৃক্ষ লতা পাতার জন্য আর্শীবাদ চাওয়া অর্থাৎ মানবতার প্রথম পাঠ দয়া, দাদার কাজ থেকেই গ্রহণ করে। নিষ্ঠাবান, ধর্মপ্রাণ মুসলমান বৃদ্ধ দাদার কাজে দয়ার প্রশ্ন ছিল  ‘দাদা, যারা হিন্দু, দুগ্গা কালী লক্ষীপূজা করে, তাগরে আল্লাহ কী করব?’ জবাবে দাদা বলে, ও মা দয়া, তুই কি পাগুলনি। আল্লাহর সঙ্গে দুগ্গা ল²ীর কুন কাজিয়া নাই। ও সব মাইনষে করে।’ (সিকদার, ২০১২ : ১২) ‘দয়াময়ীর কথা’য় সুনন্দা সিকদারের স্বগোক্তি-‘আমার বড় আকাক্সক্ষা হয় দাদার ঐ ভালোবাসার ধর্মটি অর্জন করার। কিন্তু সব কি আর অর্জন করা যায়।’ (সিকদার, ২০১২ : ১২) তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে তিনি এখনও মুসলমান, হিন্দু, খ্রিস্টান কিছু হতে পারেন নি। সম্ভবত হতেও চান নি। ইয়েদালি কাকা দয়াকে শুনিয়েছে বুদ্ধদেবের বাণী, সবমানুষই সমান কিংবা, আগে মানুষ এসেছে, পরে ধর্ম এসেছে। ধর্ম জাত-পাত সব মানুষের তৈরী। সাদিকাকার বড়ছেলের কাছ থেকে দয়া জেনেছে যিশুখৃস্ট বারবার মানুষকে ভালোবাসার কথা বলে গেছেন। সোবহান দাদা বলেছেন, এই সব কথা যদি মানুষ শুনত তাহলে আর হিন্দুস্থান পাকিস্তান হত না। ভুলি পিসি তাকে বলেছে, ‘তবে বেশির ভাগ সময় ভগবানটাই মাইন্ষের মধ্যে জাইগা থাকে। দেখস না মানুষ মানুষেরে কত ভালবাসে।’ (সিকদার, ২০১২ : ৩৫) পালিকা মায়ের  জাতপাতের ছুৎমার্গ থাকলেও মানুষের প্রতি ছিল তার গভীর ভালোবাসা। একদিকে পালিকা মা আর গায়ের স্বচ্ছল, ক্ষমতাবান হিন্দু স¤প্রদায়ের জাত-পাতের লড়াই-বড়াই, মায়ের কঠোর রক্ষণশীল মানসিকতার ফল স্বরূপ দয়ার উপর সার্বক্ষণিক নিষেধাজ্ঞা ‘দয়া জলডা খাইয়ো না। মোসলমানের হাত জল খাইলে মহাপাপ। শুকনা জিনিসে দোষ নাই’। (সিকদার, ২০১২ : ৫০) শ্রেণিভাগ অর্থাৎ উচুঁ-নীচু ভেদাভেদের কথাও দয়া নিয়তির অমোঘ বানীর মতো তার পালিকা মায়ের মুখে শুনে-‘দয়া, ভুইল্যা যাইয়ো না মাজম আমাদের কামলা, মোসলমানের পোলা, গোরু বাছুর খ্যাত-খামার দ্যাখনের মানুষ, তোমার রক্তের সম্পর্কের কেউ না, মিলন- মিশনের কাম নাই’। (সিকদার, ২০১২ : ১১) কিন্তু দয়ার আমার এই গোড়া পালিকা মার-ই ধর্ম নির্বিশেষে মানুষকে ভালোবাসার একটা গভীর মানবিক দিক ছিল ‘ইস্কুলে সব ব্যাপারেই মা মাথা গলাত। ঠিক সময়ে কাইন্ছাদা ঘন্টা দিল কি না, যে ছাত্রেরা ঐ ইস্কুলে থেকে যায়, যাদের বাড়ি দূরে তাদের জন্যে কি ছালুন রান্না হল, ঈদে কিংবা সরস্বতী পূজায় কী খাবে, কি দিয়ে সরকাই (ভোররাত্রের খাওয়া, সূর্যোদয়ের আগে, রমজান মাসে) খাবে, এসব ব্যাপারে মায়ের মাথা ব্যথা ছিল’ (সিকদার, ২০১২, ৬৩) সুজিৎ চৌধুরী তাঁর রক্ষণশীল জাতপাত মানা ব্রাহ্মণ ‘দিদিমণি’র প্রসঙ্গে একই ধরণের অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেছেন ‘সেখানকার ছেলেদের অসুখ-বিসুখ হলে পথ্য জোগানোর দায়িত্ব দিদিমণি সমঝে নিয়েছিলেন।…আমাদের টিফিন দিতেন দিদিমণি। তখন থেকে সামসুলও আমাদের টিফিনের সঙ্গী হল। বাসনকোসন দিদিমণি তুলে নিয়ে যেতেন-কোনওদিন এই নিয়ে কোন অস্বস্তি করতে দেখিনি।  (চৌধুরী, ২০১৪, ৩০) অর্থাৎ এই দুই লেখকের স্মৃতিচারণ থেকে প্রতীয়মান হয়, যে খোড়া যুক্তি দাঁড় করিয়ে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ হয়, সাধারণ মানুষ সেই কূটজাল এর শিকার মাত্র।

অন্যাদিকে পালিকা মায়ের প্রতিনিয়ত শাসনে ধর্ম ও মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার বোধ শিশু মনে টানাপোড়েন তৈরী করলেও শেষ পর্যন্ত মানবতারই জয় হয়। ‘দয়ামায়ীর কথা’য় স্মৃতিচারণ-‘ইয়েদালি কাকার কাছে গৌতম বুদ্ধের কথা শোনার পর আমি মায়ের সব কথা শুনি না,মা আমাকে জাইতখাউনি নাম তো দিয়েই রেখেছে।’ (সিকদার, ২০১২ : ৮৩)

ধর্মের টানা-হেঁচড়া,ধনী-গরীব ভেদাভেদ শিশু দয়ার মনে চেতনে-অবচেতনে ধর্ম সম্পর্কে নেতিবাচক মানসিকতার জন্ম দেয়। এই ধর্মকে কেন্দ্র করে দেশভাগ, মানুষের সীমাহীন দু:খ-দুর্দশা, চোখের জল, বিভাজন, ভিটেমাটি ত্যাগ এই বিষয় গুলো দয়ার মনে দাগ কেটে যায়। বোধ হওয়া পর থেকেই দয়া দেখেছে, দিঘাপাইত গ্রামের মানুষ গ্রাম ছাড়া হচ্ছে তার পিতৃপুরুষের ভিটার সামনে দিয়ে⎯

‘মা সারাদিন ধরে চোখের জল মুছত। যারাই গ্রাম ছাড়ত তারাই যেত আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে। চোখ মুছতে মুছতে কেউ যেতেন, কেউ আবার চিৎকার করে বলতে বলতে যেতেনÑ ‘ওগো চলি জন্মের মতো, যদি, কোন অপরাধ কইরা থাকি, মাপ কইরা দিয়ো’ (সিকদার, ২০১২ : ১৯)

গ্রামছাড়া মানুষগুলোর হৃদয় বিদারক আহাজারি শুনেই দিঘাপাইত এ দয়ার দশ বছরের শৈশব। অনেক আনন্দের ম্মৃতির সঙ্গে, এই বেদনার ম্মৃতি তাকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখেছে-‘ওরে বুড়ি, যাইতেছি সারাজীবনের মতো, গাঁয়ের কারুর সঙ্গে আর তো দেখা হইব না। হিন্দু স্থনে গেলে তুই দেখা করিস।’ (সিকদার, ২০১২ : ১৯)

কিংবা, মা বলে, ‘দয়া জমি আছিল মায়ের মতো, বছরের পর বছর খাওয়াইচে। আর তারে পরের হাতে দিয়া যাই।’ (সিকদার, ২০১২ : ২৫)

আসন্ন দেশত্যাগের