You are currently viewing সুরজিৎ পোদ্দারের কবিতা

সুরজিৎ পোদ্দারের কবিতা

সুরজিৎ পোদ্দারের কবিতা

প্রশ্নের উত্তরঃ

কবিতা কি- এই প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই বোধহয়, আপনাদের প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যেতে পারে। বিগত একশো বছরে, গদ্য সাহিত্যের যে বিবর্তন ও ব্যাপ্তি হয়েছে, ভাষাগত ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে যে বাঁক এসেছে, তাতে কবিতা কি এই প্রশ্ন অতি জরুরি হয়ে উঠেছে। মনের কথা ছন্দে বা ছোটো ছোটো লাইনে পরপর লিখে দিলেই তাকে কবিতা বলব কিনা সেই কথা ভাবা এখন খুবই জরুরি হয়ে উঠেছে। মঞ্চে পাঠ করার থেকে সে এখন অনেক ব্যক্তিগত বিষয় হয়ে উঠেছে। সেখানে অর্থ বা বক্তব্য কতটা জরুরি তা নিয়ে নিরন্তর তর্ক চলছে। যদি কোনো কথা সহজে গদ্যে বলা যায়, তাহলে তাকে কবিতায় বলার প্রয়োজনীয়তা কি? কারণ গদ্যে সরাসরি সহজে মনের ভাব প্রকাশ করা যায়। কিন্তু যদি কোনো ভাব গদ্যে প্রকাশ করা না-যায়? গদ্যের লিমিটেশন যেখানে সেখানেই কবিতার জন্ম। সে এমন এক দ্যোতনা যা গুছিয়ে চাকরির ইন্টারভিউ-এর মতো দেওয়া যায় না। তা ভিড়কে উদ্বেল করবে কিনা সেই প্রশ্ন ভিড়ের কোয়ালিটির উপর নির্ভরশীল। কবিতার বোধ এইসব গাণিতিক চিন্তার সুযোগ পায় না।

চোখ বুজলেই বৃষ্টির স্বপ্ন

১.

গভীরতা যত, সব অতীতে নিমজ্জিত
যত জটিলতা সব যেন জন্মদাগে ঢাকা
যার লুকানো কিছু নেই, তার মতো বোকা কে?

উত্তর খুঁজতে খুঁজতে যে প্রশ্নের সামনে
আসতেই হয় ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে
তার উত্তর খোঁজা যায় না কিছুতেই

কিছুতেই ঈশ্বরের নামপদ দেখা যায় না
এত শব্দের আবিষ্কারের পরেও,
এত বছরের চেষ্টার শেষেও
কেউ ভাগ করে নিতে পারে না শূন্যতা

অতএব যূথতা অলীক এক অব্যয়:
আমাদের এক হয়ে যাওয়ার
মহাজাগতিক মুহূর্ত
শুধুমাত্র ক্লান্তির মতো পাশবিক কারণে
ফুরিয়ে যায়

আমরা এক নতুন মুহূর্তের জন্মের জন্য অপেক্ষা করি
খুঁজি তার মৃত্যুর কারণ, শব্দের পরে শব্দ সড়িয়ে
গভীর কালো দুপুরে

২.

একদিন দুপুরে, কালো আকাশ আর বৃষ্টির আশা
মাথায় করে প্রচণ্ড রেল লাইনে মাথা দিতে চেয়েছিল সে
তখনও মরে যাওয়া হাস্যকর ছিল না
তখনও মরে যাওয়ার অপরিচয় হয় নি
তখনও জন্মের মতো তার থেকে অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়নি
তখনও…

অতএব মৃত্যুর পরাধীনতা মাথায় নিয়ে সে
পাশ ফিরে ঘুমালো আবার
এই শান্তির কোনো তুলনা নেই ঈশ্বর

কালো আকাশ আর বৃষ্টি তাকে
ধোঁয়া ওঠা উনুনের দিনে নিয়ে যায়
তার যাবতীয় সরণ মাংসের দিকে
মৃত্যুর কথা তার স্মরণে আসে না আর

একটা বিরাট বক
সমস্ত পথ সাদা ধবধবে করে চলে যায়
সে অসহায় পড়ে থাকে এক সামান্য কোণে
পরাধীনতার কথা তার বারবার মনে পড়ে

তবু মাংসের কাছে তার শরণ
ফুল দেখলেই তার মৃত্যুর কথা মনে হয়

৩.

প্রচণ্ড রোদের দিনে বারবার মনে পড়ে তোমার কথা
ঠিক যেন কালো ঘন মেঘ
চোখ বুজলে‌ই বৃষ্টির স্বপ্ন

প্রচণ্ড শীতের দেশে এইসব কথা কেউ বোঝে না

ক্রমশ একা হতে হতে হারিয়ে যাই
অসহায় বরফের মতো

মৃত্যুর পরেও কেউ জানবে না আমার কথা
কাঁদবে না কেউ নিঃশব্দে,
এতটাই দূরে একটা গাছ—
বিরল সবুজ
নিঃসঙ্গ হলুদ মাঠ

ফিরে আসার কথা বলার আগে
পালাবার কথা আসে
তারও আগে তোমার

মাটি থেকে ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে
দু’টো চায়ের ভাঁড়
তার ভার নিতে পারবে এই পথ?

একটা অখণ্ড প্রশ্নচিহ্ন কাস্তের মতো
লাল-লাল করে দেয় সব

আমরা নতুন রং আবিষ্কার করি।

৪.

আকাশে মেঘ করে নেই আজ
তবু জমিতে জল আর জল
মনে হয় হাঁসের মতো ভেসে আছি, তবু ভূমিষ্ঠ
কী স্থির এই দৃশ্য—
যেন গজল গাইছে কেউ

অজস্র পাতা ঝরে গেছে বলে
এই পথ এতো সুন্দর

এমন বিকেল দেওয়ালে রোদ হয়ে থাকে
তার পাশে তোমার ছায়া, ঠিক তোমার আসার আগে

প্রতিটি গাছের ভিতর হাজারো পাতার ধারণা
তবু সময় হয় না কিছুতেই

আমাদের করণীয় কিছু নেই
শুধু অপেক্ষাটুকু ছাড়া

তবু একটা নদী
অবিরাম একটা বৃষ্টির কথা বলে।

৫.

সারাদিন বাতাস নেই কোনো
থম মেরে বসে থাকে কালো মেঘ, কাঠের টেবিল—
বৃষ্টি দূর গ্রহের কিছু
তার পরিচয় হয়নি এখনও, এই দেশে

অগত্যা প্রতিটি কথার একটাই মানে
তবু তার ভিতর কত কথা
কত রোদ, কত হাওয়া—

শুধু একটা দলা মেঘ টেবিলের সামনে
সে জানে না কিভাবে একটু একটু করে
বৃষ্টি আসে আমাদের জীবনে
নিঃশব্দে
ধীর

নতজানু হয়ে সে তোমার পায়ের দিকে দেখে
অগাধ বিশ্বাসে ভাবে
সারাজীবন মেঘ থেকে যাবে
বৃষ্টি হবে না এই দেশে।
*******************************

Leave a Reply