সাদিয়া নাজিবের গুচ্ছকবিতা
আমার ‘ললিত’, আমার পুনশ্চঃ
তখন শেষ প্রহরে যামিনী
ভিজে গেছে ললিত রাগ
চোখের পাতায়।
চৌরাশিয়া মূর্ছনায়
শেষ বেলা।
তুমি এলে অনাহুত
বেদনা ঢেলে
আবার কে কাঁদায়
এই অবেলায়!
দীর্ঘ সন্ন্যাসে কেটে গেছে কতো জল-জোছনা
ডেকে গেছে কুহু
ফেলে মায়া মরিচীকা
তবু ‘প্রেম’,তুমি কেনো কড়া নাড়ো
কেনো ঝড় তোলো একলা শয্যায়
চোখের পাতায়
ললিত রাগে
শেষ মধু বসন্তে!
ডুবে থাকা নিঃসঙ্গ নিমজ্জনে!
আমার শেষ প্রহরের ‘ললিত’
আমার পুনশ্চঃ

একটি লাল উল্কি
গণেশ পাইন যে চাঁদটিকে
ছুঁয়ে ছিলেন তুলিতে
সে টি ছিলো আকাশের ও অধিক উচ্চতায়
রমণীর ভ্রুযুগলের মধ্যভাগে
প্রজ্জ্বলিত এক আশ্চর্য প্রদীপ।
পাললিক সভ্যতার নীলখামে
এক ধূসর চিঠি উড়ে এলো যখন
সাঁইজী অন্বেষণে নামলেন মনের মানুষের।
হাত রাখলেন একতারায়
চাইলেন অন্তরাকাশে।
যুগ পরাহত চাঁদ কখনো কোনঠাসা
কখনো নজরবন্দী।
আট কুঠুরি নয় দরোজা বিভ্রান্ত
আয়নামহলে
স্রষ্টা দর্শনে।
আমি লক্ষণ রেখা টেনে দিয়েছি
শিল্পের অবকাঠামোতে, ভাষার লালিত্যে এবং আবহমান জনপদে।
তবুও অহর্নিশি ঘাসে মৃত্তিকায় সঞ্চারিত হয় ধূপগন্ধ
গাঙ্গেয় বদ্বীপের ঢাকের আওয়াজ
পৃথিবীর অতল থেকে ধ্বনিত হতে হতে
আকাশের ও অধিক উচ্চতা স্পর্শ করে
ভ্রুযুগলের মধ্যভূমে অংকিত হয়
একটি লাল উল্কি।
নিনাদ
এবার শব্দ হয়ে ওঠো
দ্ব্যর্থবোধক নয়; পরিপূর্ণ
একটিই শব্দ প্রকম্পন,
যেন পিনাক টংকার।
কাল দংশনে লুপ্ত পুরাণের
পাতায় পাতায় শব্দ হয়ে ওঠো।
অমরাবতীর মায়া প্রাচীর ভেদ করে
আরশ কাঁপিয়ে দশদিক
মর্ত্যলোকে সশব্দ গর্জনে
একটি ই শব্দ হয়ে ওঠো।

সর্বহারা
তুমি নারীর জন্য কাঁদছো
ঘৃণায়, বঞ্চনায় এবং আক্ষেপে
তোমার দুটো চোখ দু’রকম
একটি তে গভীর প্রেম সন্তরণ
অন্যটিতে সম্মোহনী কাম।
বৈঠা টানো দুই নদীতে
দহন জ্বালো কৃষ্ণবর্ণ ঠোঁটে।
তোমার দুটি চোখ দু’রকম
একটি তে জ্বলে অজস্র নক্ষত্র
অন্যটিতে বিষণ্ণ মহাকাশ।
সমাজতন্ত্র, বিপ্লব আর কাস্তে কোদালে তুমি প্রলেতারিয়েত
গোর্কি এবং লোরকা বুকে চেপে আছে পাষাণ।
প্রাচীর তুলেছো আকাশচুম্বী একটি লৌহবর্মে।
মধ্যরাতে ভ্লাদিমির গমগম করে নিউরনে।
কখনো মাও সে তুং , কখনো চে
চায়না থেকে বলিভিয়া, পেত্রগ্রাদ থেকে কালুরঘাট
১৯১৭ থেকে ১৯৭১
তোমার ওষ্ঠ মৃত্যুশীতল লেলিনগ্রাদ।
দু’রকমের দুচোখে বিপ্লব এবং নারী
বুকের ক্যানভাসে কান্নার গ্রাফিতি
বুর্জোয়া! বুর্জোয়া বলে চিৎকার করতে করতে
মধ্যরাতে নি:সঙ্গ শয্যায় একটি নারীকেই অন্বেষণ করো
যেন সদ্য ভেঙে যাওয়া চশমাটি কে-ই খুঁজছো আকুল।
শিশুর ও অধিক একটি শিশু হাত বাড়িয়ে অধরা স্বপ্নে!
তোমার দু’রকম দুচোখ একটি বিন্দুতে
মিলিত হয়ে খুলে দিলো অপঠিত একটি শূন্য উপন্যাস।
একটু মমতা স্পর্শের আকুলতায়
ভেসে গেল শ্লোগানের সব দাবী
হৃদয়ের কাছে লুটিয়ে পড়লে চিরকালীন সফল পুরুষ
কোমলতার কাছে নতজানু মহান প্রলেতারিয়েত,
তুমি প্রেমে পড়েছো!
ভালোবেসেছো এক “অসম্ভব “
রিক্সাওয়ালা
রিক্সা ছাড়া আজ ও আমি
একটা রিক্সাওয়ালাকেও শনাক্ত করতে পারলাম না
অথচ,রিক্সাওয়ালা বলেই আমি
মতি কে ডাকি।
ও যখন নগ্নপায় পান বিড়ির দোকানে
হেঁটে যায়,বিড়ি ধরায়,
আশ্চর্য হয়ে দেখি
হাত টা ওর একটু ও কাঁপে না।
ফস্ করে আগুন জ্বালে বিড়িতে
ওকে তখন একদম ই চেনা যায় না।
কি মজবুত পেশী!
দৃষ্টির কি প্রখরতা!
করোটির আগুন ম্লান করে দেয় সূর্য।
রিক্সা ছাড়া কেন আমি আজ ও পারি না
একজন রিক্সাওয়ালাকে ও শনাক্ত করতে!
মতি আমাকে শাপলা চত্বর, হাইকোর্ট, রমনা থেকে
শুরু করে গলি তস্যগলি ঘুরে ঘুরে
ঠিকই পৌছে দেয় গন্তব্যে।
রোদে জলে ভিজে ভিজে সেই খাঁটি সোনা
যখন ভাড়ার টাকা চায়
আমি মানিব্যাগের সবচাইতে ন্যাতানো নোটগুলো
আর খুচরো পয়সা বের করি,
দুই টাকা কম বেশির জন্য
ইহকাল পরকালের বিষোদগার করি।
রিক্সা রেখে মতি ওর জীর্ণ লুঙ্গির খুঁট খুলে
সারাদিনের রোজগারের টাকায় কিছু আধাপচা ফল আর নাপা সিরাপ কিনে ডেরায় ফিরে যায়।
দৃপ্ত পায়ে হেঁটে যাওয়া ক্লান্ত এই পিতাকে
রিক্সা ছাড়া আজ ও আমি শনাক্ত করতে পারলাম না!

বিবক্ষা
এখানে কি কিছু কথা বলা যাবে?
এই অন্ধকার বধিরতায়
আমি যে বলতে চাই,
পুরুষ তুমি আমার ই অংশ!
অঙ্গের ও আত্মার।
আমি তোমাকে জ্ঞানফলের স্বাদ দিয়েছি,
অথচ, তুমি মূর্খতার পরিচয় দিচ্ছো বারবার!
তোমার সুঠাম, আবৃত করছো জোব্বায়
হৃদয়ের বিনিময়ে কিনছো খঞ্জর,
প্রেমহীন দৃষ্টি করছো প্রখর
বিকৃত লোলুপতায়!
এই বধিরতম অন্ধকারে,
আমার কথারা হারিয়ে গেলে–
তুমি নিশ্চিহ্ন হবে নিজেরই অজান্তে।
ফুল কিংবা চাঁদ নয়,
পশুপ্রবৃত্তি ও আমার অন্ত:স্থিত।
আমার কিছু কথা ছিলো!
এখনো সময় আছে, ভুলে যেও না,
তুমি আমার থেকেই উদ্ভুত
আমার ই অংশ, অঙ্গের ও আত্মার।
জননী
এইযে, এখান থেকে ভোর হবে
চেয়ে দেখো, এইখান থেকে
ঠিক আমার নাভীমূল থেকে
এঁকেবেঁকে নদীর মতো, নদীর শাখার মতো
বৃক্ষশাখার মতো
শাখা প্রশাখা বিস্তারী সকল জীব অণুজীবের
ভোর হবে এইখান থেকে
এই মানবীনাভীর গোড়া থেকে।
শ্রাবণ ধারায় ক্ষয়ে ক্ষয়ে যদিও যাবে তার চোখ
মেঘ থেকে কাজল নিয়ে তবু্ও সে পরবে।
সূর্যকে করবে টিপ
হাওয়া নামের পুরনো অধ্যায় খুলে দেবে অনসূয়া অন্ধকারে
তুমি ফুটবে চিন্ময় নাভীর প্রকোষ্ঠে
জানি,
যদিও এই শিকড় তুমিই কাটবে
ঈর্ষা ও লোভের করাতে
এতদস্বত্তেও
স্থিতধী মৃত্তিকার গভীর অনন্তে ভোরের আলো চমকাবেই।

কবি পরিচিতি
সাদিয়া নাজিব
প্রাক্তন শিক্ষার্থী ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
পেশা : শিক্ষকতা
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ সাতটি
আভাস : শিখা প্রকাশনী
হয়তো তাকে: দ্বীপজ পাব্লিকেশন্স
ভাঙি অচলায়তন : মূর্ধন্য ণ প্রকাশনী
পিতার খোঁজে : চিরদিন প্রকাশনী
খুচরো পয়সার মতো কিছু প্রেম : শিকড় পাব্লিশার্স
শূন্য দেবালয়ের শঙ্খ : সৌম্য প্রকাশনী
জলপ্রদীপের আলোয় : সৌম্য প্রকাশনী
+++++++++++++++++++++++++++++++
