You are currently viewing বদরুজ্জামান আলমগীরঃ ৩টি কবিতা

বদরুজ্জামান আলমগীরঃ ৩টি কবিতা

বদরুজ্জামান আলমগীরঃ ৩টি কবিতা

ব্যথালোকের বিজ্ঞান

মনে করার চেষ্টা করছি, মাঝেমধ্যেই যেমন তা করি
জন্মের আগে আমি যে শূন্য পিঞ্জরায় পাখি ছিলাম
আমাদের সংসার কেমন ছিল, কেমনই বা ছিল
আমার অন্য ভাইবোনেরা, পুতুল ঘুড্ডি, তাদেরও কী
ক্লান্ত লাগলে দিগন্তের এ-মাথা ও-মাথা উড়ে যেতে
ইচ্ছে করতো, আমাদের মা-বাবা কী স্নেহের নাম করে
ঝাউগাছের শোঁশোঁ হয়ে কাঁদতো রাতের সিন্দুকে?

জানি যে একটা বয়সে সব মানুষ হাওয়া হয়ে যায়
যেখানে পাহাড়ের মাথা নুয়ে এসে ভিক্ষু হয়ে বসে
মানুষ হাওয়া ওখানে পূর্বজন্মের মাকড়জালি পাতে
ধানদূর্বা ধুলাবালি আঙুলের মাথায় সোনামুখি সুইয়ের
নাম করে রক্তবিন্দু আঁকে আর বলে- দেখো, দেখো
ছানিপড়া চোখের ইজেলে আমার নকশিকাঁথাটি রাখো।

বুঝি না- আমরা যে বোঝে অবোঝে গ্যালাক্সির বুকে
কারো না কারো মৃতদেহবাহী একলা খাটিয়ার উপর
নিজের ভবিতব্য গুনে গুনে ভাসমান বাগান বানাই।
জন্মের আগেই সে উড়ে যাবে অতিদূর মার্সের খোঁজে
সে আর ফিরে আসবে না আমাদের সচকিত পাড়ায়
আর কোনদিন ফিরে আসবে না- সবার পক্ষ থেকে
হয়ে যাবে ব্যথালোকের বিজ্ঞান ও মায়ার ঊর্ধ্বালোক।

ছোট এই অবিমূর্ত কণা কী আদিঅন্তহীনে ঘন্টার ধ্বনি
ঈশ্বরের অধিক কালের ফোঁটা দেখা অদেখার সিম্ফনি!

কাঁদছে কেউ

কাঁদছে কেউ- গ্রীস্মের দাবদাহের সন্ত ভিতরে
অতি শীতের অন্তঃপুরে বরফ ছিঁড়ে ছিঁড়ে নামে
দূর বসন্তের ওরসে মুখ লুকিয়ে কাঁদছে কেউ।
রাত্রি কাতরায় একা, পায়ে পরে কালের শিকল
পাথর গড়িয়ে যায় অচিন কপালের নীল ভাঁজে
অনাগত শিশুজন্মের ধারাপাত ও শঙ্খের নীলে
কে এমন ধীরে তুলে নেয় মৃদু মুদ্রায় ব্যথার দানা
বৃষ্টির নিক্কন খুঁজে নাও হেমন্তের মেঘবতী ঝিলে।
তুমি কেঁপে ওঠো ছাইছাই বাতাসে নক্ষত্রের ঋণ
অসুখী গড়াগড়ি যায় পুরাণ, চনমনে নাচের সভা
আম্রকাননে তুমি নিয়েছো বুদ্ধের শরণ, শিমূলেও
মুছতে পারি না শত সন্তাপে কাঁদছে যে রুরু কেউ।

পবিত্র কথাদের ফণা

আমরা যারা প্রেমিক হই, হাতে তুড়ি মেরে চলি
লেখালেখি করি, কবিতা টবিতা লিখে
নৈঃশব্দ্যের ইজেলে ঝুলিয়ে রাখি
সাদা কাপড়ে দেয়া নীলের সঙ্গে ঘুমিয়ে থাকি।

আমরা একটি বই কিনে প্রেমিকার কাছে নিয়ে যাই
এগুলো রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর বই হতো-
উপদ্রুত উপকূল, বা মানুষের মানচিত্র
হয়তো বা হতো মহাদেব সাহা, বা আবুল হাসান
নির্মলেন্দু গুণের বই, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, পুর্ণেন্দু পত্রী, বা জয় গোস্বামীর কবিতা।

প্রেমিকের বই শামসুর রাহমান, বা আল মাহমুদের বই হয় না,
যে এমিলি ডিকিনসনের কবিতা পছন্দ করে, ভালোবাসে আনা আখমাতোভা,
সে-ও দয়িতার জন্য কেনে সিলভিয়া প্লাথ, মায়া এঞ্জালো।

এগুলো তেমন কিছু আলাদা নয়, একই কথা- যাহা বায়ান্ন তাহাই তিপ্পান্ন, যাহা তাপসী তাহাই রামশুড়।
কিন্তু তারপরও তাঁদের কবিতার বইগুলো কোথায় যেন
খানিকটা নির্ভার- কিছুটা ঝুঁকিহীন

প্রেমপর্বে দায়িত্বহীন হতে হয়, রোমান্টিকতা তা-ই
যা বেহুদা, রোমান্টিকতা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কথা বলে
কিন্তু কিছু মিন করে বলে না- বলে, কেননা তা
শুনতে ভালো লাগে; বলে, কেননা তাদের এমন কিছু বলতে হয়, যা মাঝামাঝি তা রঙিন ও বিচ্ছুরণমুখী।

আশ্চর্য হয়ে দেখি আজকাল রোমান্টিক পরিস্থিতিটা
তিলে তিলে কেমন জানি বদলে গ্যাছে- আমরাও কেমন শুষ্ক হয়ে উঠেছি বৃষ্টি ও কাদামাটির বদলে পাথর হয়ে গ্যাছি।

আজ সকালে জীবনের যাদুকাঠি নাম একটি ওয়েবসাইটে ঢোকার সঙ্গেসঙ্গে মনটা কেমন ছলকে ওঠে
তারা বলছে- আমরা আপনার প্রেয়সীর কথা ভেবে অভূতপূর্ব একটি উপঢৌকনের ব্যবস্থা করেছি-
আপনি আপনার দয়িতাকে একটি কবর উপহার দিন

তার মৃত্যু থেকে দাফন অবধি সবকিছুর দায়িত্ব আমাদের উপর ছাড়ুন।
কবরের পাশে চেরি বা গোলাপের চারা লাগানোর দায়িত্বও আমাদের।
কতোকিছুই তোমাকে দিতে ইচ্ছা করে-
মনে হয়, আস্ত গ্র‍্যান্ড কেনিয়নটাই তোমাকে কিনে দিই!

তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে যদি মাইল কি মাইল গহীন গহবরে হারিয়ে যেতাম, আর কখনো ফিরে না আসতাম
সবার সামনে এসে মরবার লেটা চুকে যেতো।
কিভাবে তা কিনবো বলো- এ তো বিলিয়ন ডলারের মামলা,
আমার হাতে সাকুল্যে মাত্র সাড়ে তিন হাজার টাকা আছে।

ভাবছি এই কোম্পানির কাছে একটি অনুরোধ করবো-
আমার হাতের সাড়ে তিন হাজার টাকার সবটাই ডেপোজিট রাখবো
এমন ব্যবস্থা করে দাও- নিজের কবর আমি নিজেই খুঁড়ে ফেলবো
আর মৃত্যুর মুখে কবরে নেমে গেলে
কবর নিজেই নিজের হা-করা মুখে মাটি তুলবে, নিজেই মুখটি বন্ধ করে দেবে
কারো মুখাপেক্ষী হয়ে আমাকে মাটির উপর পড়ে থাকতে হবে না।

যা দিনকাল পড়েছে- একটি ছেঁড়া কবিতা লিখে ওঠার পাড়েই দেখি
বাতাসে ফিনকি দিয়ে চোখে লাল দাঁতে লাল পবিত্র কথারা হিসহিস করে।
******************************

Leave a Reply