You are currently viewing দেয়াল: দীলতাজ রহমান

দেয়াল: দীলতাজ রহমান

দেয়াল
দীলতাজ রহমান

ছোট্ট একটা দেয়াল ভাঙতে হবে। দামিনী হেলাল একটা ভালো মিস্ত্রি খুঁজছেন, যে নিজের তত্ত্বাবধানে দেয়ালটি ভাঙার কাজ করে আবার নিপুণভাবে প্লাস্টার করে, রংমিস্ত্রিকে ডেকে দাগটি ঢেকে দেবে। দামিনী এই ক’দিনে জেনে গেছেন কোনো দেয়াল ভাঙার পর তা নিপুণভাবে প্লাষ্টার না হলে কোনোভাবে রংও তা ঢাকতে পারে না। নিজের ফ্ল্যাটের প্রধান দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পার্শ্ববর্তী এক বয়স্ক প্রতিবেশীনীর সঙ্গে দামিনীর এই বিষয়ে আলাপ চলছিলো। আর ওই ভবনেরই অন্য ফ্লোরের এক ভদ্রলোক ঠিক ওই সময় সেখান দিয়ে যেতে দাঁড়িয়ে গায়ে পড়ে দামিনীকে পরামর্শ দিয়ে গেলেন, ‘এখন দেয়াল কাটা মেশিন বেরিয়েছে ম্যাডাম। ওই মেশিন যাদের কাছে আছে, তাদের দিয়ে কাজটি করান। আর হাতুরি দিয়ে ভাঙালে প্রতিটি ইটে কয়েকটা করে বাড়ি লাগবে। তাতে পুরো ভবন কেঁপে কেঁপে উঠবে। আপনাকে তার জন্য কমিটির কাছে দরখাস্ত করতে হবে। আর সবখানে সবকাজে ভেটো দেয়া কিছু মানুষ থাকে। এখানকার কমিটিতেও সেরকম কিছু মানুষ আছে। ফ্ল্যাট মালিকদের ভেতরও আছে, আমি কিছু কাজ করাতে গিয়ে তা বুঝেছি! তাই তাদের সবার মত এক করে কমিটি সময় দিলে তবে আপনি কাজটি শুরু করতে পারবেন! আর এটাও তো বোধহয় জানেন না, তাদের কোনো উপকার হোক না হোক, আপনার কাজটি আটকে তারা আনন্দ পাবে। তাই সেই অনুমতি খালাস করাতেই আপনার কমিটির এতটা দিন খরচ হবে, তারা মত দিতে দিতে আপনার দেয়াল ভাঙার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েও যেতে পারে!
দামিনী অবাক চোখে আগন্তুকের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেন, কারণ কি?
: কারণ? তারা যে একটা ভূমিকা নিয়ে বসে আছে আমাদের মাথার ওপর, এটা আপনি না ঠেকলে বুঝবেন কী করে, যে তারা কিছু একটা করছে! অবশ্য এতে অনেকের যখন তখন দুড়ুম দামুমের কাজ নিয়ন্ত্রিতও হয়, আমাদের কান বাঁচে!
দামিনী হেলাল বেশ হিমসিম খান আগন্তুকের উত্তরে। তিনি বলেন, আপনি তো এই ভবনেরই কেউ! প্রায়ই দেখি। আপনি পারবেন আমাকে দেয়াল কাটার মেশিন আছে এমন রাজমিস্ত্রি জোগাড় করে দিতে?
: মাঝে মাঝে তো এদের কারো কারো সাথে দেখা হয়ে যায়। আমি আছি তো এখানে অনেকদিন। আপনাদেরও অনেক বছর হলো। কিন্তু আমি এই ভবনের কাজ চলাকালেই এসে ঢুকেছি। তাই দেখি এই ভবন তৈরির কাজ করে যাওয়া মিস্ত্রিরাই আবার অনেকের ফ্ল্যাটের ভেতর তাদের মালিকের ইচ্ছে মতো রদবদল করতে আসা যাওয়া করে। আর হ্যাঁ, মেশিন দিয়ে কাটলে যেটা আরো উপকার পাবেন, বাড়ির চোটে আশেপাশের অন্য দেয়ালগুলোর ভেতর যে চিড় তৈরি হয়ে থাকে। এতে তা হবে না!
: দেখেন সারাজীবন সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরে চাকরি করেছি। অথচ এগুলো জানা ছিলো না! বাড়ি করার ঝামেলা থেকে বাঁচতেই ফ্ল্যাট কেনা উদ্দেশ্য ছিলো। তা না হলে জমি বিক্রি করে কেউ ফ্ল্যাট কেনে? আপনার সাথে দাঁড়িয়েই কথা বলে গেলাম! বসবেন ভেতরে গিয়ে?
: না, একটা কাজে বাইরে যাচ্ছি। আমি আপনার ওপরের ফ্লোরে ডানপাশের ‘এফ’ ফ্ল্যাটে থাকি। একটা লিফট বন্ধ। তাই একফ্লোর নিচে নেমে আরেকটা ধরতে হচ্ছে। আপনারা দুজন দেয়াল ভাঙা নিয়ে আলাপ করছিলেন, তাই আমি উপযাচক হয়ে পরামর্শ দিলাম, গ্রাম্যস্বভাব যায়নি আরকি!
: কী যে বলেন! খুব ভালো করেছেন পরামর্শ দিয়ে। তবে আমি কিন্তু আপনার ওপর ভরসা করে থাকলাম, আপনি মিস্ত্রি জোগাড় করে, মানে তাদের কারো সাথে দেখা হলে আমার সাথে দেখা করতে বলবেন, তাতেও হবে!
দামিনীর ওপরের ফ্লোর ‘এফ’ ফ্ল্যাটের ভদ্রলোকের নাম ইব্রাহীম মুন্সী। উপকারী মানুষই বটেন। তিনিই মুশকিল আসানের মতো এক বিকেলে আরেক ভদ্রলোক গোছের একজনকে নিয়ে দামিনীর ফ্ল্যাটের দরজার বেল টিপলেন। দামিনী দরজা খুলেই বললেন, কই ভাই, আপনার মিস্ত্রির আশায় দিন গুণছি। কাজটা আমাকে দ্রুত করতে হবে।
: ইব্রাহীম মুন্সী আজ প্রায় দামিনী হেলালকে ঠেলে দরজার ভেতর ঢুকতে ঢুকতে বললেন, এই তো আপনার মিস্ত্রি নিয়েই এলাম। মানে লিফটে দেখা হয়ে গেলো, তাই টেনে ধরে আনা!
একই স্ট্যাটাসসম্পন্ন প্রতিবেশী ইব্রাহীম মুন্সীর সাথে তারই মতো বেশধারী আরেকজনকে দেখে দামিনী মনে করেছিলেন, তারই মতো আরো একজন কেউ। কিন্তু সে রাজমিস্ত্রি শুনে তাকে পাশে কখানা পাতা টুল দেখিয়ে সেদিকে নির্দেশ দিতে আঙ্গুল তোলার আগেই সে মুন্সির পাশাপাশি সোফায় বসে পড়লো এবং দামিনীকে বললো, কী করাইবেন সেইডা দেখান ম্যাডাম!
দামিনী বুঝলেন, ইস্ত্রি করা পোশাক পরলে যে কারো মনোবল বেড়ে যায়। না হলে প্রায় ধুলো বসে যাওয়া হাত-পা নিয়ে ইব্রাহীম মুন্সির পাশে একজন রাজমিস্ত্রি বসে কী করে! দেয়ালটি সামনেই ছিলো, ছাদ সমান উচ্চতার মাত্র চারফুট একখানা দেয়াল! দেয়ালটি সরিয়ে দিলে একটি করিডোর তৈরি হবে। আর তাতেই পনেরো শো পনেরো শো স্কয়ার ফুটের দু’দিকের দুটি ফ্ল্যাটকে বত্রিশশো স্কয়ার ফুটের একটি ফ্ল্যাটে পরিণত করে দেবে!
কাজের ধরন শুনে এবং নিজের মতো বুঝে রাজমিস্ত্রিকে ইব্রহীম মুন্সি বললেন, হোসেন মিয়া বিষয়টি শুনলেন এবং বুঝলেন, এবার বলেন, আপনি নিখুঁত ভাবে আপনার কাজ সব তো করবেনই, পারলে আপনার দায়িত্বে একজন রংমিস্ত্রিও এনে রং ম্যাচিং করিয়ে দেবেন। কারণ নতুন কাজের থেকে পুরনো কাজ অনেক ঝামেলার। আগের রংয়ের সাথে মিলিয়ে নতুন রং কেনা, তারপর সেভাবে লাগানো, কাজে হাত দিয়ে গোলমাল পাকানো যাবে না কিন্তু। সে হ্যাপা সামলানোর মানুষ ওনার নেই। ওনার হাজবেণ্ড নেই, একা মানুষ। তারওপর চাকরি করেনৃ।’
আমি বছরখানেক হয় রিটায়ার করেছি মুন্সি ভাই, নতুন কিছু করার মতো এখনো খুঁজে পাইনি! তাই গোলমাল করার সময় আমার যথেষ্ট আছে, মিস্ত্রির কাছে আমাকে অতো না লায়েক প্রমাণ করে দেবেন না প্লিজ!’ বলতে বলতে দামিনী হেলাল ইলেট্রিক কেতলিতে পানি গরম করে সেখানেই চা তৈরি করে বিস্কুটসহ দুজনকে বললেন, নিন, আপনারা চা খেতে খেতে কথা বলুন!
হোসেন মিয়া প্রয়োজনের থেকে হাতখানা বেশিই বাড়িয়ে চায়ের কাপ তুলে তাতে বিস্কুট ভেজাতে ভেজাতে বললো, ম্যাডাম আগে বলেন তো দেয়ালখানা ভাঙবেন ক্যান?
দামিনী হেলাল হোসেন মিয়ার এই প্রশ্নকে অকারণ মনে করে তাচ্ছিল্যের স্বরে বললেন, ভাঙার দরকার পড়েছে, তাই ভাঙবো! এটা আপনার জানার দরকার কি? আপনি বরং কত কি নেবেন সেই বিষয়ে কথা বলেন!’ বলে দামিনী এমন ভাব করলেন, যেন ইব্রাহীম মুন্সির দেখাদেখি তাকে তিনি আপনি বলছেন, এটাই বেশি! তারওপর তাকে আবার ভাঙার কৈফিয়ত!
কিন্তু ইব্রাহীম মুন্সি যখন প্রশ্ন করলেন, হোসেন ভাই ঠিকই বলেছেন ম্যাডাম। আমারও সেই প্রশ্ন। কারণ, বলেছিলেন আপনার একটি মাত্র মেয়ে। তাও থাকে কানাডায়। আর কানাডার মতো দেশে যারা স্থায়ি হওয়ার সুযোগ পায়, তারা আর দেশে এসে সেটেল হবে না, অতিথি পাখির মতো আসবে যাবে!
ইব্রাহীম মুন্সি এটুকু বলতেই দামিনী হেলালের গলগল গল্প শুরু হয়ে গেলো। কারণ যে কথা তিনি সমকক্ষ ইব্রাহীম মুন্সির কাছে বলে তৃপ্তি পাবেন, তা কোনখানকার মূর্খ মিস্ত্রি তা বুঝবে কেন? তাই তিনি যেন জীবনের সেই মধুময় দিনগুলোতে এবার অনায়াসে ফিরে গেলেন। দামিনী বলতে শুরু করলেন- মেয়ে লেখাপড়া করতে করতেই তার এক ক্লাসমেটকে পছন্দ করে ফেলে। সে ছেলেও তার মা বাবার একটিমাত্র সন্তান। কিন্তু তখন তার বাবা ছিলেন না। মা একটি কলেজের সহকারী অধ্যাপক পদে ছিলেন, পরে অবশ্য তিনি প্রিন্সিপাল হয়েছিলেন।
দামিনী বলতে থাকেন, মেয়ের বিয়ের বছর কয়েক পর মেয়ের বাবাও হটাৎ স্ট্রোক করেন। বেশ কবছর ভুগে মারা গেলেন। অবশ্য এই ফ্ল্যাট হেলাল সাহেবেরই কেনা। মানে তিনি পছন্দ করে কিনেছিলেন। তিনি এখানেই মারা গেছেন। যা হোক, আমরা দুই পরিবার মিলে একটা পরিকল্পনা করেছিলাম, আমরা যেখানেই ফ্ল্যাট কিনি একসাথে এভাবেই কিনবো। যেন একটা সময় এরকম একটি দেয়াল ভাঙলে দুটি ফ্ল্যাট এক হয়ে যায়, জামাইয়েরও কোনো ভাইবোন নেই, আমাদের মেয়েরও নেই। তাই দুটি ফ্ল্যাট সহজে এক করার এই দুটি ফ্ল্যাটই আমরা এখানে পেয়েছিলাম। সপ্তাহ দুয়েক আগে আমার বেয়াইন মারা গেছেন। তার ছেলে, মানে আমার মেয়ে-জামাই তখন আসতে চেয়ে আসতে পারেনি। তাই সময় নিয়ে আসবে তার চল্লিশা করতে। তারা আসার আগে আমাকে জামাই এটা করে রাখতে বললো। কারণ গ্রামের আত্মীয়-স্বজনকেও দাওয়াত দিতে হবে, শহরের আত্মীয়রা চলে গেলেও গ্রামের মানুষ তো একদিনে যাবে না। তাই দুটো ফ্ল্যাট এক হলে সুবিধা হবে…!
হোসেন মিয়া বললো, ম্যাডাম, আমি আপনেরে প্রশ্ন করায় আপনে রাগ করছিলেন। দেহেন, আমার কোনো ওস্তাদ নাই। তয় কাজ শিখছি মেলা মাইনষেরতন। এই কাজ শিখতে শিখতে বুঝছি, আমি যাগো আণ্ডারে কাজ করছি, তারা কেউ মালিকেরে ভালো বুদ্ধি দেয়নাই! এইরকম অর্ডার পাইলেই হাতুরি-শাবলসহ আমাগো মতো লেবারগো ওস্তাদেরা লাগাইয়া দিছে, আমরা পিডাইয়া-পাডাইয়া ভাইঙ্গা থুইয়া আইছি। আবার অন্য কেউরে লাগাইয়া আরেক ওস্তাদ গইড়া দিয়াইছে! কিন্তু আমি কাজ বুঝতে বুঝতে এইডা মাইন্যা লইছি, আমারে দিয়া কোনো বাড়ির কিছু ভাঙতে অইলে আমি আগে তাগোতন জানমু, এইটা করবেন ক্যান? ম্যাডাম বেশি কথা বলার জন্য মাফ কইরা দিয়েন। কিন্তু আমার এই কথাডা তো মানবেন, আপনারা বাড়ি বা ফ্ল্যাট করেন একটা দুইটা। আর আমরা করি শতশত। তাই এ বিষয়ে আপনাগোতন আমাগো বুদ্ধি বেশি!
হোসেন মিস্ত্রির এই কথায় ইব্রাহীম মুন্সি স্মিত হেসে বললেন, ঠিকই! আপনারা অনেক বিশেষজ্ঞের ধারনা বাস্তবে রূপায়িত করতে করতে আপনাদের নিজেদের ধারণা পাকা হয়।
হোসেন মিয়া চোখেমুখে এরি ভেতর আত্মবিশ্বাসের ঝিলিক খেলে। সে বলতেই থাকে- এতবছর জোগালি দিলাম, মিস্ত্রিগিরি করলাম। এহন কন্ট্রাক্টরি করলেও কাজ কন্ট্রাক নিয়া আমি নিজেই লেবার-মিস্ত্রিগো লগে করার চেষ্টা করি। আর যা আমি আপনাগো বললাম, তাগোরেও তা শেখাইতে চেষ্টা করি! কারণ যারা আমারে ওস্তাদ ডাকে, আমি য্যান ডাকের মানডা রাখতে পারি!
ইব্রাহীম মুন্সি বললেন, হোসেন মিয়া, ম্যাডাম চাইতেছেন তার দেয়াল ভাঙতে, আপনার মত তার ওপরে চাপাইতেছেন ক্যান? উনি বিরক্ত হচ্ছেন, খেয়াল করেন!
হোসেন মিয়া বললো ম্যাডাম বিরক্ত হইলে হোউক! আমি তো আগেই বলছি স্যার, আপনেরা বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনেন একটা-দুইটা। আমরা করি শতশত। সেইভাবে আমরা এইসব মাইনষের সমস্যারও মুখামুখি অইয়া জানি, একটা সমস্যা দূর করতে পরে আরেকটা সমস্যাকে আন্ডা-বাচ্চাসহ ইনারা ডাইক্কা আনেনৃ।
নিজে ডেকে আনা হোসেন মিয়ার গলগল কথার জন্য তাকে থামিয়ে দিয়ে ইব্রাহীম মুন্সি বিব্রত হয়ে দামিনী হেলালের দিকে চেয়ে বললেন, ম্যাডাম আপনি বলেন…।
হোসেন মিয়া ইব্রাহীম মুন্সির দিকে বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, স্যার, আমাকে আরেকটু সময় দেন। আরেকটু কথা বলি। শোনেন। তারপর দেয়াল ভাঙতে বললে অবশ্যই ভাঙবো! না ভাঙলে খাবো কি? ভাঙলেও টাকা দিবেন। গড়তেও টাকা দিবেন। মাল-সামানা কিনতেও টাকা দিবেন।’ বলে সে দুইপাশে বসা দুজনের কারোই অনুমতির তোয়াক্কা না করে বলে যেতে লাগলো- ম্যাডাম বললেন, বেয়াইনের চল্লিশা করবেন, তার মেয়ে মেয়ের জামাই আইসা গ্রামতন, শহরতন আত্মীয়-স্বজন সব্বাইকে দাওয়াত দিয়া এক করবো বুঝলাম। মেহমানেরা আইসা দেখবে এই ঢাকা শহরের মতো এমুন দামি জায়গায় তারা তিনহাজার স্কয়ার ফুটের একটা ফ্ল্যাটে থাকে। এগো স্ট্যাটাস মাইপ্যা কয়দিন সবাই খুব কোলাহল করবো। আপনার মেয়ে-জামাই সবাইকে খাওয়াইয়া দাওয়াইয়া, বিদেশতন আনা উপহার দিয়া সবার মধ্যমনি অইয়া থাকবো। তারপর তারা চইলা গেলে আপনে একা! এত্তবড় ফ্ল্যাটে আপনি একা থাকতে পারবেন? মনে অইবো কোনায় কোনায় ভৃত বইয়া আছে। তারওপর ওইপাশের মানুষটা ওই ফ্ল্যাটেই মইরা দুইদিন পইড়া আছিলো, আমার তো মনে লয় তার আত্মা এহনো বাসা ছাড়েনাই! তারপর আপনেও কি এই দ্যাশে একা একা বইয়া থাকবেন? আপনের বয়স আপনের বেয়াইনেরতন কম। আপনের শরীর সুস্থই আছে দেখতাছি। আপনি মাইয়া-জামাইয়ের কাছে গ্যালে একটা ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ কইরা গেলেও আরেকটা ভাড়া দিয়া যাইতে পারবেন। কয়দিনের জমজমাট দৃশ্য কল্পনা কইরা আপনে এবং আপনের মাইয়া-জামাই ভুল সিদ্ধান্ত নিছেন ম্যাডাম! দুইটা ফ্ল্যাট এককইরা বিদেশে গিয়া যখন দেখবেন ফ্ল্যাট থেকে কোনো ইনকাম নাই কিন্তুক দুই ফ্ল্যাটের সার্ভিস চার্জ দিতাছেন মাসে চৌদ্দহাজার টাকা! তারতন বেয়াইনের চল্লিশা কোনো কম্যুনিটি সেন্টারে করেন। যে কয়দিন তারা থাহে, মানে আপনেগো দুইপক্ষের গ্রামতন আসা আত্মীয়-স্বজনেরা, তারা দুই দিকের দুই দরজা দিয়া ডুকবে-বাইরাইবে। দরজা পাশাপাশি না অইয়া উল্টা দিকে, তাতেই বা ক্ষতি কি? মাত্র তো কয়দিন!
হোসেন মিয়ার কথা থামলে ইব্রাহীম মুন্সি দামিনী হেলালের দিকে তাকিয়ে বললেন, কথাগুলো কিন্তু যুক্তিসঙ্গতই বলছে হোসেন মিয়া! তারওপর সার্ভিসচার্জ ক্রমে বাড়বে ছাড়া কমবে না!
দামিনী হেলাল উত্তর দেয়ার আগে হোসেন মিয়া বলে উঠলো, মুন্সি ভাই, আপনের যেমুন পদবি আছে, তেমুন আমারও বাপ-দাদারতন পাওয়া একটা পদবি আছে। আমার পদবি হাওলাদার! মিয়াগো সম্মান হাওলাদারেরতন ভালো। কিন্তু ভালো অইলেই অন্যের পদ নিজের নামের সাথে জুড়তে শুনলে গায়ে হুলের মতো খোঁচা লাগে হা হা হা। এবার ম্যাডাম কন, আপনার মতামত…।
মিস্ত্রি লোকটার নিজের সিদ্ধান্ত অন্যের ওপর চাপানোর প্রবণতা দেখে দামিনী এতটাই রুষ্ট হয়ে ছিলেন, তিনি ধরেই রেখেছিলেন, এর একটা কথাও তিনি শুনবেন না এবং একে তিনি কাজও দেবেন না, অন্য কাউকে দিয়ে তিনি কাজটি করাবেন! কিন্তু দামিনীর যখন মনে পড়লো মাত্র সপ্তাহ দুয়েক আগে মরে পড়ে থাকা তার বেয়াইন আয়েশা খানমকে, তখন তার কী হলো, তিনি হোসেন হাওলাদারের সব কথা মেনে নিয়ে নিজের দুর্বল দিকগুলো ফাঁস করে দিচ্ছেন! ইব্রাহীম মুন্সির দিকে তাকিয়ে দামিনী বললেন, কী আশ্চর্য, একটুখানি এক দেয়াল ভাঙার আয়োজন নিয়ে সেদিন আপনার থেকে যা জেনেছি, আবার আজ যা এই হাওলাদার শোনালো, মনে হচ্ছে আমার ভেতর থেকে অজ্ঞানতার অনেকগুলো দেয়াল অপসারিত হয়ে গেছে! হোসেন মিস্ত্রিও ঠিককথাই বলছে। ঠিকই তো, আমারও মেয়ে-জামাইয়ের সাথে চলে যাওয়ার ইচ্ছে আছে ভিসা পেলে। এখন তো ঝাড়া হাত-পা! রিটায়ার করেছি। মাঝে মাঝেই একরাশ বিষন্নতা এসে গ্রাস করে রাখে। তারওপর এখন দেখি আত্মীয়-স্বজন কেউও বেড়াতে এলে এমন ভাব করে, যেন তারা আমার একাকিত্বের কথা ভেবে উদ্ধার করতে এসেছে। তারা এসে পরিবেশ আরো ভারি করে তোলে। তাই মাঝে মাঝে ভাবতে থাকি এই সময়টুকু নাতি-নাতনির সাথে কাটালে তাদেরও সাহায্য হবে, আমারও সময় কাটবে! সন্তান তো আমার একটাই! জামাইটাও এতিম হলো! তারও কেউ থাকলো না!
ম্যাডাম, আপনার এই শেষের কথাটি নিয়ে আমারও বলার মতো একটা কথা আছে। আমি গ্রামের মানুষ তো! যদিও আমাদের সেই গ্রাম এখন আর নেই। নেই ততোটা অভাব। তাই পরিবারের ভেতর থেকেও যেন পরস্পরের প্রতি দায়ের বাধ্যবাধকতা সেখান থেকেও অনেকটাই উঠে গেছে। এখন এই যে সবাই বলে শেষ বয়সে একা থাকো। একা থাকার মতো উপায় রাখো, উপায় রাখা ভালো ম্যাডাম! কিন্তু আমি মনে করি আপনাকে ছাড়া আপনার নাতিপুতি ছেলেমেয়ে সবারই চলবে। কিন্তু আপনার চলবে না, ওরা জীবনের দিকে আগালেও, আপনি কিন্তু মৃত্যুর দিকে এগোচ্ছেন। তাই আপনার শেষবেলার নৈকট্যটুকু যদি পরবর্তী প্রজন্মকে দেন, তাদের কিন্তু সেটা গাছের গোড়ায় সারের মতো হবে! বলছি, যদি তা করার উপায় থাকে। আর তারা না চাইলে তো হওয়ারই নয়, ফিরে আসার উপায় রইলো । কিন্তু তাদের কাছে কিছুটা গায়েপড়ে হলেও নিজের নৈকট্যকে স্বাদু করে তুলতে হবে। তারপর আনতে হবে অভ্যস্ততা। না হলে এই শেষ সময়ের দামি সব অনুভূতি মাটি করে আমাদের চলে যেতে হবে! তাদেরও থাকবে না শেকড়ের স্মৃতি! যা প্রতিটি মানুষের অস্তিত্ব গঠিত হতে শক্তির উপাদানও বটে! আমার তিন ছেলেমেয়ে। আমি ওদের সাথে কেন জানি না কোন আশঙ্কা থেকে সুযোগ পেলেই আমার এইসব পরিকল্পনা শোনাতে থাকি, ওদের মগজে জায়গা রাখার জন্য। ইচ্ছে করেই শোনাই, যদি কাজ হয়ৃ।’ কথাগুলো বলে ইব্রাহীম মুন্সি এবার গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, তাহলে যাই ম্যাডাম। এক উছিলায় আপনার সাথে পরিচয় হলো। যাবেন আমাদের বাসায়। আমার গিন্নীও চাকরি করতেন। দু’কূল নিয়ে কুলিয়ে উঠতে পারেননি বলে চাকরি ছেড়েছিলেন। এখন আবার একটা বুটিক সপ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছেন। কোনো পরামর্শ থাকলে দিয়ে আসবেন। আর আমি এখনো একটা কলেজে আছি। রিটায়ার করে ভাবছি তার আণ্ডারেই চাকরি করবো, হা হা হাৃ।
ইব্রাহীম মুন্সি উঠে পড়লেও হোসেন হাওলাদার উঠলো না। সে ইব্রাহীম মুন্সির হাত টেনে বললেন, স্যার আরেকটু বসেন। ম্যাডামও তো রিটায়ার করছেন। তার আরো কিছুটা সময় নেবো! আর আপনের তো আজ ছুটির দিন স্যার।
ইব্রাহীম মুন্সি বললেন, আবার কী কথা বাকি হোসেন ভাই? বাইরে তাকিয়ে দেখেন, বিকেলে ঢুকেছি। এখন রাত নটা!
হোসেন হাওলাদার বললো, কথা তো কতোই আছে! এই যে বাড়ি বাড়ি ঘুরি, তাতে যে শুধু বাড়ি ভাঙা আর গড়ার বুদ্ধি বাড়ে, তা না কিন্তু স্যার! কত কত কাহিনিও পাত্থরের মতো বুকে তুইল্যা নিয়াসি! তা নামানোর জায়গা কই? কন? তাই আমি না, আমার মনডাই ডাইক্কা উঠলো সুযোগ যহন পাইছি এইহানে কয়ডা কথা কইয়া যাইতে…।
দামিনী হেলাল বললেন, তাহলে আমি আরেকটু চা করি?
হোসেন হাওলাদার বললো, চা একটু অইলে ভালোই অইতো ম্যাডাম। কিন্তু কথাগুলা তুললে এমনিই গলা শুকনা রাখতে পারবো কি না, না পারলে মাফ কইরা দিয়েন!
দামিনী বললেন, কী এমন কথা বলতে আমাকে জরুরী মনে হলো আপনার?
হোসেন মিয়া বললো, ম্যাডাম, আমরা ভুল দেয়ালেরও সাধারণ একখান ইটে যখন বাড়ি দিই, তখন সমান শব্দই অয়! প্রতিধ্বনিও তেমনি হয়, মনটা তাতেই যেন ক্যামন কইরা ওঠে। কিন্তু মানুষের বুকের ভেতর কত্ত বড় বড় আঘাত কেমন নীরবে সেই মানুষটার সাথে কবরে চইল্যা যায়! নাকি সে আঘাত মানুষটা মরার সময় বুক থেইকা নিজেই নাইমা পলাইয়া থাকে, তারপর অন্য কারু বুকে চাপতে কাউরে খোঁজে কি না, আমার মনে লয়, খোঁজে! না অইলে একই গটনা ক্যান বারবার গটে?
ইব্রাহীম মুন্সি বললো, নাহ্, আজ ইট-বালু-সিমেন্টের কথা ছেড়ে হোসেন হাওলাদার কী গল্প শোনায়, আপা, আপনি আমাকে একটু চা দেন! আর চিনিমুক্ত বিস্কুট যদি থাকে।
দামিনী উঠে যেতেই হোসেন হাওলাদার বললেন, স্যার দিলেন তো আমার গল্পের মুখে জোঁকের মুখের মতো নুনের ছিঁটা! এহন আমিই ভাবতেছি, গল্পটা বলবো কি না…!
ইব্রাহীম মুন্সি গণিতের শিক্ষক। তিনি নীরস কণ্ঠে বললেন, প্রয়োজন না থাকলে বলবেন কেন?
হোসেন হাওলাদার বললো, তাহলে স্যার বলতে হয় বলাটা অতি প্রয়োজনই! কিছু সত্য টিউমারের মতন চাইপ্যা থাকে আমাগো মতো সমাজবদ্ধ মানুষের মনে-মাথায়। টিউমার যেমন ওষুধ না পাইলে দ্রুতই শেকড় ছাড়ে, আমাগোও এই সত্যগুলা খোলসা না অইলে পরিবারগুলার ভেতর সেই টিউমারের মতোই দশা অয়!
দামিনী হাতে হাতে চা ধরিয়ে দিলে হোসেন হাওলাদার বললো, গল্পের গতিডা এই স্যার ঘুরাইয়া দিছেন। কোনখানতন শুরু করি এবার ভাবতে অইতেছে।
দামিনী বললেন, বলেন তো হোসেন, যা বলতে চান!
দামিনীর প্রশ্নে হোসেন হাওলাদার যেন প্রশ্রয় পেয়ে ঘটনার আরেকটু পিছনে গেলো! বলতে লাগলো, এই বিল্ডিংয়ের শুরুরতন আমি আছি। বারো বছরের বেশি সময় লাগছে এইটা উঠতে। যহন কাজ শুরু অইছিলো তহন আমি রাজমিস্ত্রির জোগালি হিসাবে আইছিলাম। যেহেতু বিক্রির জন্য করা ফ্ল্যাটের কাজ। যারা কিনবো তারা তো আর দেহে না, কীভাবে কী কাজ অইতেছে। আমাগো হাতেই কুন্নি ধরাইয়া কন্ট্রাক্টরেররা রাজমিস্ত্রির বিল লইতো। তারপর কাজ শিইখ্যা গেলে আমাগো সাহসও বাইড়া গেলো। আমরা আমাগো রোজের হিস্যা বুইজ্যা নিতেও শিখলাম। তহন বয়স আছিলো চল্লিশ। আর আইজ বয়স ষাইট। মনে লয় এ সেদিনের কতা! কিন্তু বেইল কিন্তক কম অইনাই। আপনেরাই তো দশ/বারো বছর কইরা এইহানে আইছেন, তাই না?
দামিনী হেলাল, ও ইব্রাহীম মুন্সির উসখুস উঠে গিয়েছিলো। এরি ভেতর হোসেন হাওলাদার বলে উঠলো। আপনার বেয়াইনের মেলা কাজ আমি করছি। দুইরুম এক করতে দেয়াল ভাঙার পর যখন কিছু টাইলসও তুলে নতুন লাগাতে হচ্ছিলো, তহন তিনি বুঝছেন, তিনি সামাল দিতে পারতেছেন না! আমারে তিনি খুবই ভালো জানতো। কাজের মানুষের বেতন বেশি বইলা মানুষ রাখতে পারতো না। আবার মিস্ত্রির কাজের দাম, জিনিসপত্রের দাম নিয়া খুব কষাকষি করতো। আমি তারে একদিন কইলাম, ম্যাডাম, আপনার একটাই মাত্র ছেলে। সে থাকে বিদেশে। সে আপনেরে টাকা দেয় না? উনি বলছিলেন, ও জানে মা চাকরি করতো, তাই চলার মতো টাকা তার মায়ের আছে!’ আমি তারে বললাম, ঠিকই তো ভাবছে আপনার ছেলে! আপনি চাকরি করতেন। আপনার স্বামী অকালে মারা গেলেও কিছু তো পাইছিলেন? তাহলে আপনি টানাটানিতে চলেন ক্যান? তারপর উনি জানালেন, যেখানে যা পেয়েছিলাম, কুড়িয়ে-কাছিয়ে এই যে ফ্ল্যাট কিনলাম। ছেলের বিয়ে দিলাম। তাকে বিদেশে পাঠালাম। ফ্ল্যাট কিনতে কিছু লোন নিতে হয়েছিলো। এখনো যে পেনশান পাই, তার থেকে বড় অংশ ফ্ল্যাটের লোন শোধ দিতে যায়। যদিও তা শেষ করে এনেছি, যেন আমার নেয়া লোনের জের আমার ছেলে আয়ানকে না টানতে হয়! আমি বললাম, টাকা সব খরচ কইরা ফালাইলেন, ছেলে জানে না তার মায়ের হাত খালি? কিন্তু আপনি তাকে জানাবেন না, আপনার হাতে চলার মতো টাকা নেই? আমি তো দেখতাম ছেলে প্রায়ই ফোন দিতো। কিন্তু অসুক্যা শরীর নিয়াও উনি কইতো বালো আছি। ফ্ল্যাটের ভিতরে যে রদবদল করছে, ছেলের মত নিছে জানি। ছেলে যেমনে কইছে তেমনে করছে। কিন্তু একবারও তিনি ছেলেরে বলে নাই, মিস্ত্রির বিল দিতে পারতেছি না! ফোন রাখনের পর আমি বলতাম, ম্যাডাম, ছেলের কাছে কিছু টাকা চাইতেন? তিনি উত্তর দিতেন, দেয়ার মতো থাকলে তো আয়ানই দেওয়ার কথা বলতো হোসেন। জানো না তো, বিদেশের জীবন কী কঠিন!
ওনার ছেলে আর উনি অনেকক্ষণ ধরে কথা বলতো, কিন্তু ছেলে একবারও জিজ্ঞেস করতো না, যে মায়ের টাকার দরকার আছে কি না! বরং পরে উনি আমারে বলতো, আমি তো এটা ভেবেই কষ্ট পাই, আয়ানের কাছে তাদের চলার মতো পর্যাপ্ত টাকা হয়তো নেই। থাকলে নিশ্চয়ই দিতে চাইতো! আর এর ভেতর আবার আমার প্রয়োজন মনে করিয়ে তাকে কষ্ট দেবো? তার ওপর তার দুটো ছেলেমেয়ে হয়ে গেছে! যখন তারা আসবে, বাসাটা যেন তাদের বিদেশের বাসার থেকে কম কিছু মনে না হয়। তাই যা সঞ্চয় ছিলো সব খরচ করে এটুকু করলাম। পুরো বাসায় নতুন করে রং করাইছিলেন। শেষমেষ আমার সব টাকা তিনি দিতে পারেনাই। হাজার দুই টাকা কম ছিলো। অবস্থা বুইজ্যা আমি বলছিলাম, আপনের ওটা দিতে হবে না। বলছিলাম, এই যে কাজ করতে করতে আপনার থেইকা যা শিখ্যা গেলাম, তা আমি টাকা দিয়া কোনোহানে পাইতাম না। আপনেই বলছিলেন, তুমি খুব ভালো কাজ করো। তাই তোমার সাথে কাজ করা ছেলেগুলোও ভালো কাজ করে। কিন্তু ভালো কাজের সাথে তারা যদি সৎ হয় তাহলে তুমি তাদের আদর্শ ওস্তাদ। আর তা তাদেরকে দিয়ে করাতে হলে তোমার নিজেকে ভালো হতে হবে। সেই ম্যাডাম বলেছিলো, দেখবে, এতে লাভ কিছু কম হবে না। সারাজীবন শিক্ষকতা করে ছাত্র-ছাত্রীদের এগুলোই শিক্ষা দিতে চেষ্টা করেছি! ম্যাডাম সত্যিই আমার চোখ খুইল্যা দিয়া গেছে!
অশ্রুসিক্ত কোনো মানুষকে সান্তনা না দেয়া গেলেও কাঁদতে বাঁধা দেয়া যায় না। তাই কারো প্রশ্ন ছাড়াই হোসেন হাওলাদার বলে যেতে লাগলো- ওনার সাথে আমার এতো খাতির হইছিলো, যে একবার উনি অসুস্থ হইলে দুইদিনের জন্য আমার ওয়াইফেরে রাইখ্যা দিছিলাম ওনার কাছে। উনি তার দুইহাত ভইরা জিনিসপত্র দিছে। পুরানা অইলেও সেগুলা আমরা তো কোনোদিন চোউক্ষেও দেখিনাই। উনি বুঝছিলেন, উনি আর বেশিদিন নাই, তাই বুঝি পোটলা বাইন্দা অতো কিছু দিছেন। কিন্তু আমি আশ্চর্য অইতাছি, আপনি তার বেয়াইন। যার সাথে সম্পর্কটা আমি মনে করি বইনেরতন বেশি অওনের কথা! কারণ বইনেরা এক মায়ের পেটেরতন জন্মাইলেও ধীরে ধীরে তাগো স্বার্থ আলাদা অইয়া যায়। কিন্তু দুই বেয়াইনের স্বার্থ একত্র অইতে থাকে। এই যে আপনে যা কিনতেছেন, যা আগলাইতেছেন সব কার জন্য? আপনার বংশধরের জন্য! তিনি কার জন্য আগলাইয়া গেছেন? কার জন্য ফ্ল্যাটের ভিতর বিদেশীগো ফ্ল্যাটের মতো বানাইছে? তার বংশধরের জন্যই তো! আর এই দুইজনের বংশধর কিন্তু একই। অথচ উনি কোনোদিন বলেনাই, এই দেয়ালের ওইপাশে একই বংশধরের ভর রক্ষার আরেকটা স্তম্ভ আছে! মানে তার পোতা-পুত্নির নানি, তার বেয়াইন! আপনারেও আমি কোনোদিন দেখিনাই তার সুখ-দুঃখ-অসুখে একটু উঁকি দিয়া দেখতে! হয়তো এইডাই আপনেগো সম্পর্ক ভালো রাখনের কঠিন চেষ্টা। কম দেখা কম জানার আড়াল রাখা! আর সেইডাই আসলে বড় দেয়াল! আপনেগো সেই দেয়াল রক্ষা করতেই এই ইটের দেয়াল লাগে! এই যে দুইজনে একত্রে ফ্ল্যাট কিনলেন, জমাইয়া একসাথে থাইক্যা শেষ জীবনটা সুন্দর রাখতে পারতেন। তা অইলো না। এহন একজন মরার পর আরেকজন মাঝের দেয়াল ভাইঙা সব এক করবেন! আর কয়দিন, আপনে মরলে তো আপনের মাইয়াই সব বেইচ্চা যাইবো! জীবনের চাইয়া আসলে সম্পদেই আপনেগো মায়া ম্যাডাম! আহা কী করুণ মৃত্তু! মরতেকালে খালি বাসায় ছটফটাইয়া খাটেরতন নিচে পইড়া আছিলো। আমি অন্য একবাসায় কাজের বিল নিতে আইয়া খবরডা শুইনা দৌড়াইয়া ছুইট্টা আইছিলাম।
দুইদিন ধইরা কোন আত্মীয় তারে ফোনে না পাইয়া শ্যাষে বাসায় আইসা বাইরের থেইক্কা কেয়ারটেকারগো দিয়া দরজা ভাইঙ্গা ভিতরে ঢুকছেৃ। আর এই গটনা কিন্তুক এট্টাই আমার চোহের দেহা না! সন্তানের আচরণও খালি একবাড়ি এমন দেহিনাই, মেলা মেলা এমন গটনা। তয় খুইল্যা-মেইল্যা এতোডা জানা অয় নাই। প্রায় বাড়ির এমন গটনা আঁচে আঁচেও টের পাই!
মানুষের দুইরকমের বোধ এক হলে তা মিশ্র হয়ে যায়। কিন্তু দামিনী হেলালের মুখে অপরাধবোধের চিহ্ন ফুটে উঠলেও চোখ ভেজানোর জল হয়তো তিনি খুঁজে পাননি! কিন্তু ইব্রাহীম মুন্সি টি টেবিল থেকে টিস্যুপেপার নিয়ে তা মাঝে মাঝে চোখে চেপে ধরছিলেন। হোসেন হাওলাদারের অশ্রু তার কড়পড়া হাতের তালু ছাপিয়ে মাঝে মাঝে নিচে পড়েছে। তাই নিয়ে সে উঠতে উঠতে তার বুক পকেট থেকে একটি নোটবুক বের করলো। তারপর তার পাতা উল্টে একখানা চেক বের করে সে বললো, মরার কয়দিন আগে উনি আমারে ফোন দিয়া বাসায় আসতে বললো। তারপর আমারে বললো, আমার একাউন্টে এখন টাকা নেই। সব তুলে তোমার কাজ আর রঙের কাজে খরচ করে ফেলেছি। কিন্তু তুমি যে আমার কাছে দুই হাজার টাকা পাও, এটা আমি ভুলতে পারি না! তাই আমি এই ঋণ মনে রেখেই মরছি এটার প্রমাণ রাখতেই আমি এই চেকটা তোমাকে দিয়ে গেলাম। পেনশনের টাকা তো লোনে চলে যায়। তবু তুমি কয়েকমাস পর এতে তারিখ লিখে জমা দিও, যদি কিছু থাকে…।’ আমি কিছুতেই নিতে না চাইলে উনি বলছিলেন, এটা তাহলে তুমি স্মৃতি হিসাবে রেখো। কারণ একমাত্র তুমি আমার বাড়ি কাজ করতে এসে নিজের টাকায় আমার জন্য আনাজপাতি কিনে আনতে…।
একজন রাজমিস্ত্রির হাতে নিজের মেয়ের শাশুড়ির সিগনেচার করা চেক দেখে দামিনী হেলাল তাতে ছোঁ বসিয়েছিলেন প্রায়। কিন্তু হোসেন হাওলাদার দ্রুত হাত সরিয়ে চেকটি রক্ষা করে। দামিনী হেলাল ব্যর্থ হয়ে বড়ই দয়ালু কণ্ঠে বললেন, আমি আপনাকে পাঁচহাজার টাকা দিয়ে দিই হোসেন, আমাকে ওটা দিয়ে দিন!
হোসেন হাওলাদার বললো, জীবনে সবকিছু বেইচ্যা খাইতে নাই ম্যাডাম! এককোটি টাকা দিলেও হোসেন হাওলাদার এটা কাউকে দেবে না! এটাও আমি একটা উদ্দেশ্য নিয়ে আপনেরে দেখেইলাম, যে এরকম দেয়াল যদি ভাঙতে হয়, জীবন থাকতেই আপনেরা ভাঙবেন। কারু মরার পরে না…!’ হোসেন হাওলাদারের কথা শেষ না হতে চোখ থেকে টিস্যুপেপার না তুলেই ইব্রাহীম মুন্সি বেরোনোর পথে পা বাড়ালেন, যেন শেষমেশ শোনা ঘটনার পর আর কোনো ঘটনা বা মুখ থাকতে পারে না, যা শুনতে শুনতে দেখতে দেখতে উঠে যাওয়া যায়। আর ঠিক সেভাবেই মুন্সির পিছু পিছু বেরোলো হোসেন হাওলাদার, যে যাওয়া প্রমাণ করে, ও দেয়াল ভাঙাতে হয় অন্য কারো সাহায্যে ভাঙান, হোসেন হাওলাদারকে দিয়ে অন্তত এই দেয়াল ভাঙার কাজটি হবে না…।
*************************

Leave a Reply