আজিজ কাজল
মধু-ফুলের মা
মা—আমরা প্রতিদিন তার একটা একটা করে পালক
ছিঁড়েছি, অথচ-তিনি ফলভার, নত ও বিব্রত হয়েছেন।
মা—ফরশা ভাতের মুচা নিয়ে দরদ-চোখে চেয়ে আছেন;
তার লালাজল মাখা পান-খয়েরের মিঠা হাসি—
ওম-পালকে, সব ছানাপুনাদের আগলে রাখতেন।
দুর্বিসহ পৃথিবী ঠুলে-ওঠলেই, পুরো পরিবার চিৎকার
দিয়ে মায়ের বুকের কার্পাসে ঢুকে পড়ি আমাদের নিত্য
চুনকাম, ব্যর্থ-শ্রাবণের কোটি কোটি বাষ্প-মেঘ আরও ঘন
হয়ে ওঠে— এই রক্তঋণকে হেলা করে, ঘুণে ধরা পৃথিবীর
নিঠুরতাকেই জয় করেছি!
ডোরা ভাঙা পথে, চঞ্চল চিহ্ন ধরে তিনি চলে যাচ্ছেন,
তাকে ছুঁতে না পেরে, কত ফণি মনসার খোপ, বদল-শ্রাবণের গাঁথুনি মেখেছি পালকে।
পৃথিবীর লোভী-শর্করা পিঠে মায়ের মহাপ্রাণ দুলছে—
আস্তে আস্তে মহাজাগতিক ধুলোয় মিশে যাচ্ছেন তিনি।
******************
ইফতেখার হালিম
অসমাপ্ত স্বপ্নের পাতা ছিঁড়ে
ঘরদোর-বিছানা, প্রিয় বারান্দা এলোমেলো
চাদরে গোলাপ হাসি
শীতাতপ আয়োজন সবকিছু অর্থহীন
শুধু শূন্যতার ঢেউ আতঙ্ক বাড়ায়।
কতো পথ হাঁটা ছিলো বাকি
ছিলো কথা বলা বাকি
স্পর্শ করা বাকি সুখের অমৃত কাব্য।
তবুও বিষাদ বিষণ্ণতা ঘিরে ধরেছে
অনুপস্থিত শব্দটা গোয়েন্দা দপ্তরের কর্তা
আপ্যায়ন করে বিচ্ছেদের নির্যাতনে।
উর্বর স্মৃতিগুলো আজ শোক মিছিলে বোবা
ফেলে যাওয়া হাসি বেদনার সুর তুলে
পরিত্যক্ত শাড়ি, জুতো জোড়া
কুমারিকা তেলের কামুক ঘ্রাণ
চিরুনিতে জড়িয়ে থাকা চুল
ছায়ানটের উৎসবের মতো মাঝে মাঝে বিমর্ষ-বিরহ মনে আনন্দ প্রেরণা।
আচমকা নিভে গেলো আলো
আমার আকাশ বেদনার রঙে পূর্ণ।
না হয় আরো কিছু সময় পাশে থাকতে
বিশ্বাসে-অবিশ্বাসে
অবহেলা আগুনে পোড়াতে।
আজ ঘুমহীন চোখে সিনেমার পর্দার মতো
তুমি দূরে হেঁটে যাও মমতা বাড়িয়ে
আর বৈশাখের উন্মাদ বাতাসের মতো
বুকের অপূর্ণ সংসার প্রেম লণ্ডভণ্ড।
অসমাপ্ত স্বপ্নের পাতা ছিঁড়ে
দুঃখের পোড়া গন্ধ ছড়িয়ে
দু’চোখে দিয়ে গেলে শ্রাবণ।
***********************
জারিফ আলম
এখনো ফিরে পাওয়া হয়নি
যতটা আহ্লাদ নিয়ে একটি শিশু ঘুমিয়ে পড়ে চিরকাল
তার অধিক ইতিহাস জানা হয়নি আজও।
অনেক কিছুর আদ্যোপান্ত শেখা হয়নি তেমন
এখনো কথা বলতে গেলে ভাষা খুঁজে পাই না
এখনো তোমাকে বুঝতে পারি না ঠিকমতো।
এখনো একাই ঘুমিয়ে আছে সবুজ পাতার স্বপ্নেরা
একদিন সবরকম ইচ্ছের কাছে নিজেই জানাবে উপস্থিতি;
রোদ্দুর নেই, আছে কেবল দুটি সংলাপের মতো বাসনা।
আমি চাইলেই কোনোকিছু থামে না, চলে না কিছুই
আমার নিয়মে, এইসব ক্ষুদ্রতা ছুঁতেও পারবে না তোমাকে।
কিছু কথার টাল সামলাতে না পেরে
দূরের মেঘ হয়ে আবার ফিরে এসেছে;
এবার নিজেই ভিজিয়ে দেবে এইসব কথামালা।
*****************
তূয়া নূর
এবার এসেছিলে?
তুমি কি দাঁড়িয়েছিলে এবার এসে—
বাড়ি ছেড়ে আসার সময়,
যেমন তুমি অনেক বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে,
আমি যাচ্ছি দূরে, যাচ্ছি সাত সাগর তেরো নদী পার হয়ে কল্পকথার দেশে
পুকুরের গা ঘেঁষে সোজা রাস্তাটা যতক্ষণ না হারায় বড় রাস্তায়?
এখন তুমি লাঠিতে ভর দিয়ে আসো
বাড়ির গেটটার সামনে কারো শরীরের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকো।
আমি যতবার পিছন ফিরি—দেখি তুমি ঠাই দাঁড়িয়ে আছো।
মনে হতো তুমি অনন্ত কাল দাঁড়িয়ে থাকতে জানো
সময়ের কাঁধে ভর রেখে
স্থির হয়ে চশমা চোখে চেয়ে আছো।
তোমার চোখ কি ভিজে যায়?
ঝাপসা হয়ে আসে?
খিল আটা বুকে হাজার শব্দ আছড়ে পড়ে ?
এবার কি তুমি এসেছিলে?
********************
রিজোয়ান মাহমুদ
অঝোর সুরম্যমীড়ে
তোমার দেওয়া ছবিতে মুখ ও নাক ঘষি
একবার মুছি অন্যবার সংকোচহীন ছুঁই
যেন সবখানে করুণাদ্র ব্যথা উড়ে ছাই
মাংসের শরীরে নার্স শক্তি দিয়ে ফুঁড়ে সুঁই।
দূরের নদীতে যদি না দ্যাখো পাড়ের উন্মাদ
জলে বসেনা কখনো সহস্র বিনিদ্র রতি
হ্রদের গভীরে মাছরাঙা উড়ে আসে তীরে
বালি ও কাদায় মাখামাখি, তাকে বলি প্রীতি।
কোথাও প্রচ্ছায়া পাহাড়ি ধানের শীষ শিশিরের
খুব ছোট ছোট কুঁড়ে ঘর পংক্তির মাচান
লালনেরে পাই উঁচু পথে ইশারায় রুহ ডাকে
সবকিছু ছেড়ে আসা তবু কেন থাকে পিছুটান।
অকস্মাৎ ছবিটি গড়িয়ে নিচে কুপোকাত
ঘাসের শিশিরে ভিজে ডাকছে আমাকে
কাকে নেব, মাথা ভীষণ রকম অগোছালো
হাঁটু জলে গাজার মেয়েটি কাঁদে শূন্য বাঁকে।
কীভাবে রচিব প্রচ্ছদ গ্রন্থের মন শেষ হোক ছিঁড়ে
কান্নারা সংগীত হলে বাঁধি অঝোর সুরম্যমীড়ে।
******************
সৃশর্মিষ্ঠা
ক্ষরণ
ফুল ঝরার শোক ভুলে
গাছ যেভাবে নতুন কুঁড়ির জন্ম দেয়
আমাকে সে সুর শিখিয়ে দাও
যে প্রেম নেই, তা প্রত্যাখ্যান
সরিয়ে দিতেই শুধরে নিই ভুল
ঘুমের ভেতর
পিপাসা তরল
যাতনায় মোড়া, চুপ
রক্তক্ষরণ নেই
আগু পিছু মধ্যিখানে
কেবল সূর্যোদয় হয় না…
***********************
তৌফিকুল ইসলাম চৌধুরী
তুৃমিহীন আমি
আমার হাত হাতড়ে বেড়ায় একাকীর বৈভব,
উচ্চতর তুঙ্গতায় নেমে আসি নির্জন ভূবনে।
চাঁদ ফুটো করা রুপালি বন্যায় স্নানরতা
নগ্ন ফুলেরও আছে পাপের অতীত,
আমার মাদকতা নেশা তুমি শুষে নিয়েছ,
সেই ব্রাম্ম মুহুর্ত আমি পেরিয়ে এসেছি।
তুমি কি আজও আগের সেই মোনালিসা হাসি,
জমে থাকা রহস্যের বর্ণপ্রভা !
নাকি অন্ধকার মর্গের ভেতর শরীরবিহীন
ভূতের মতো মাংসবিহীন কঙ্কাল ছায়া,
খরস্রোতা নদী জলতলে বহুবর্ণা নুড়ি,
যে আমায় অহর্নিশ ভাবায়- কাঁদায়।
মাঝে মাঝে শোঁ শোঁ কান্নার শব্দ আসে,
গুমোট হাওয়ায় বেদনার গাঢ় রসে
একটা স্রোত আমাকে নিরবে বয়ে নিয়ে যায়,
আলোক বৃত্তের বাইরে অন্ধকার মর্গে।
তুমিহীন আমি তোমাতেই একাকার,
নৈঃশব্দ্যেও বাজে বিষন্ন একাকী নূপুর।
আমার হাত হাতড়ে বেড়ায় একাকীর বৈভব,
উচ্চতর তুঙ্গতায় নেমে আসি নির্জন ভুবনে।
********************
রোখসানা ইয়াসমিন মণি
জখমপুরাণ
এসো, জখম
আমার শূন্য হৃদয়ের জখম,
তোমাকে নিয়ে হামাগুড়ি দেই
বহু শতাব্দীর পর শতাব্দী
পেরিয়ে আসা হাহাকারের জলাশয়ে,
কসম! এখানেই হোক—
আমাদের নোনাজলের শেষ ও চূড়ান্ত বিসর্জন।
যেখানে আকাশ নুয়ে পড়ে পৃথিবীর জীর্ণ পাঁজরে,
সেখানে আমরা ধুলো হয়ে মিশে যাই কোনো এক প্রাচীন শিলালিপিতে।
রক্তাক্ত আঙুল খুঁড়ে বের করি সেইসব না-বলা প্রলাপ,
যা কোনোদিন আলোর মুখ দেখেনি,
যা কেবল গুমরে মরেছে অন্ধকারের কোনো এক স্যাঁতসেঁতে কুঠুরিতে।
এসো জখম, আমার যমজ সত্তা হয়ে বাঁচো—
অস্থিমজ্জার ভেতর বয়ে চলা এক অবাধ্য নদীর মতো।
সবুজ ঘাস কিংবা নীল দিগন্তের মায়া আজ থাক,
আমরা বরং ডুবে যাই সেই অতল গহ্বরে,
যেখানে হাহাকার আর পাথর একই ভাষায় কথা বলে।
সময়ের ঘড়ি থেমে যাক এই বিবর্ণ মোহনায়,
শতাব্দীর ক্লান্তি ধুয়ে যাক এই বিষাদ-জলাশয়ে।
জেনে রেখো, এই ধ্বংসস্তূপের মাঝেই আমার ঈশ্বর বাস করে।
**********************
সু শা ন্ত হা ল দা র
তোমাকে চেয়েছি যতবার
তোমাকে চেয়েছি যতবার
মনে হয়েছে শান্ত নদী ব্যাকুল ঝড়ে উত্তাল ততবার,
এ আমারই ভুল
পিকাসো আঁচড়ে মোনালিসা এঁকেছি জীবনানন্দ ভবনে
এখন দেখি
বাঁকা ঠোঁট বাঁকা হাসি আমারই প্রাণ কেড়েছে মরীচিকা প্রণয়ে
যতবার তোমাকে চেয়েছি
দক্ষিণ জানালায় উদাসী বাতাস কালোমেঘ ডেকে এনেছে,
এ আমারই ভুল
চৈত্র ছাড়াই বসন্ত চেয়েছি অবগুণ্ঠিত ফাল্গুনে
এখন দেখি
নিনাদিত সকালেই শ্রাবণের মেঘ ঝড় তুলেছে বৈশাখ ছাড়াই আশ্বিনে
তোমাকে চেয়েছি যতবার
দুর্দান্ত প্রতাপে হেঁটে গেছি সাত কোটি গোলাপের কবরোস্থান,
এ আমারই ভুল
সবুজ পতাকায় লাল বৃত্ত এঁকেছি একাত্তর মাশুলে
এখন দেখি
বদ্ধ উন্মাদ সব মেলিটাস ভাবনায় সক্রেটিস বিচারে!
*************************
রীনা তালুকদার
সমকোণী সম্পর্ক
একদিন ঝুমল বৃষ্টির প্রত্যাশায়
পরবাসী আকাশের ঠিকানায় মন্ত্র পাঠিয়েছি
মেঘ তার পোস্ট অফিস থেকে ইথারের ইশারায়
বাজিয়ে রিংটোন তুমুল বর্ষায় দিল ভিজিয়ে
বোনা ফসলের বিস্তীর্ণ মাঠ
তর তর বেয়ে ওঠলো ধান পাট
মুগ মুশুর ডাল কাউনের কচি ডগা
জীবনের জ্যামিতি থেকে ফসলে ফসলে
ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ, সমকোণী সম্পর্ক
ধীরে ধীরে টালি খাতার স্তুপ
আপেক্ষিক ফর্দ দীর্ঘতর
সুবাস, মাংস, মুড়মুড়ে হাড়
মাখনের সাথে আঙ্গুর রসের জৌলুস
অবস্থা সম্পন্ন গেরস্তের আভিজাত্য
বর্ষার ভাসান জলে ধুয়ে নিলো
ঘূর্ণির ঈশাণ কোণের মেঘ;
ঘরজামাই মেঘ এখন কানে তুলো নিরুত্তর।
**********************
মেহবুব গায়েন
সার্কাস মুখ
আমাদের জানালা ছিল না
বাটামের লম্বা দেহে শৈশবের খড় বৃষ্টি
আমাকে ভেজানো কাদার ভিন্নতায়
রেখে হেঁটে গেলে,
ছড়িয়ে ছিল আরতি গন্ধ আলো
মুখের সার্কাসে মঞ্চ করে
সে এখনো বসে আছে…
*********************
সোহম চক্রবর্তী
মামার বাড়ি, আমার বাড়ি
ছাদের উপর রোদ পড়েছে, শীতবিকেলের রোদ –
মামার পাশে দাঁড়িয়ে আমি, আমার পাশে মামা
গাঢ় সবুজ শালের নীচে শিথিল পায়জামা
রাস্তা দিয়ে সাইকেলে যায় আদর লাহা, মামাকে ডাকে দাদা;
মন্টা, রঙের মিস্তিরি, মামাকে ডাকে – মাস্টারমশাই,
ধর্মঘোষের ছেলে, বয়সে প্রবীণ, তবু
মামাকে ডাকে কাকা
ছাদের উপর রোদ পড়েছে, শীতবিকেলের রোদ –
মামার স্থির জায়গাখানি
ফাঁকা!
***********************
মোঃ আব্দুল রহমান
সময়ের বিষ দাঁত
তাচ্ছিল্যের দরজা জানালা খুলে
হো হো করে হাসতে হাসতে
লুটিয়ে পড়লে সময়ের বিছানায়।
অপমান ও অবমাননা তোমার ডালভাত
উপহাসের পোশাকে শরীর…
এক যুগ পার হতে না হতেই
হঠাৎ রাস্তায় দেখা—
তুমি মুখ ঢাকছ আজ
নিজেরই সেই পোশাকে— তাচ্ছিল্য অপমান
অবমাননা উপহাস
কারণ ঘড়ির কাঁটা পাল্টে গেছে
সময়ের বিষ দাঁত তোমার হৃদয়কে জব্দ করেছে।
সময়ের সাথে খেলতে নেই কখনো
আজ হোক কাল সময় ঠিক সুযোগ পেলেই
বদলা নেবে। শুধু এটুকুই…
***********************
