বিষবৃক্ষ এবং উইলিয়াম ব্লেইক
ঋতো আহমেদ
I was angry with my friend:
I told my wrath, my wrath did end.
I was angry with my foe:
I told it not, my wrath did grow.
And I water’d it in fears,
Night and mornings with my tears;
And I sunned it my smiles,
And with soft deceitful wiles.
And it grew both day and night,
Till it bore and apple bright;
And my foe beheld it shine,
And he knew that it was mine.
And into my garden stole
When the night had veil’d the pole:
In the morning glad I see
My foe outstretch’d beneath the tree.
[A poison tree/William Blake]
কবিতাটি ফেসবুকে পোষ্ট করে পাঠকদের আহ্বান করা হয়েছিল সংক্ষেপে পাঠ প্রতিক্রিয়া লিখতে। কে কী লিখেছিলেন, আসুন পড়ে দেখি।
অর্থপূর্ণ যোগাযোগের মাধ্যমে সাধারণ ভিত্তি খুঁজে পাওয়ার অক্ষমতাই সাধারণত মানুষের পারস্পারিক সংঘাতের কারণ। তাই জীবনের প্রত্যেকটি ধাপে প্রত্যেকটি বিষয়কে পরিষ্কার করে নেয়াই উত্তম, নয়তো ওইসব অস্পষ্টতা জীবনের জতিলতাই বাড়ায় কেবল। [আব্দুল মাজিদ]
যেমন কর্ম তেমন ফল। অর্থাৎ ইতিবাচক আবেগ রোপণ করুন, আপনি ইতিবাচক ফসলই পাবেন; বিপরীতে… নেতিবাচক অনুভূতিগুলোকে তাড়াতাড়ি তুলে ফেলুন যাতে এটি কোনও বিষাক্ত উদ্ভিদের মতো বৃদ্ধি না পায়। [ক্লেওফি মুরিওল্লো-আমোর]
আটকানো এবং চাপা আবেগ আর দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি সম্পর্কে এই কবিতা এক শক্তিশালী ভিত্তি। মূলকথা হচ্ছে— ঘৃণাকে প্রশমিত হতে দিন; কারণ ঘৃণা এবং খারাপ অনুভূতিগুলো আপনাকে গ্রাস করে ফেলবে। ক্ষমা করুন, ত্যাগ করুন এবং ভুলে যান। [ডোরিস ভিঞ্চেন্টি]
অবদমিত রাগ অন্য অনেক উপায়ে বেরিয়ে আসতে পারে। এখানে ব্লেইকের প্রতিশোধ হচ্ছে ওই ‘ঠাণ্ডা খাবার পরিবেষণ’। [এন্ড্রু ফেরচায়েল্ড]
এখানে ইডেন উদ্যানের অন্তর্নিহিত রেফারেন্স বিবেচনা করা যেতে পারে, যেমন জেনেসিস, খ্রিস্টান ওল্ড টেস্টামেন্টের প্রথম যে বইটা। পরবর্তীতে, বিবেচনা করা যায় যে ব্লেইক একজন শান্তিপ্রিয় মানুষ ছিলেন। তৃতীয়ত, মনে রাখা যেতে পারে এই কবিতাটি অভিজ্ঞতার গান থেকে এসেছে, ইনোসেন্সের নয়। অনুগ্রহ করে কখনোই ব্লেইকের প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ করবেন না। [ক্লাইভ গুডহেড]
হ্যাঁ, সঙ্গে এটাও বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে যে ব্লেইক ইবনে আরাবির দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। [আলী কাশিম]
কবিতা হল আবেগের একটি অভিব্যক্তি যাকে মূল্যবান মনে করা উচিত। প্রায়শই কবিতা, লেখকের জন্য বিভিন্ন সমস্যার মধ্য দিয়ে কাজ করার একটি উপায় হিসেবে উদ্ভূত হয়। রাগে আঘাত করা দুঃখ বা ইত্যাদি যা-ই হোক। আমি কবিতাটি উপভোগ করেছি, বিশেষ করে উইলিয়াম ব্লেইকের এই কবিতাটি অত ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। কারণ এটা তাঁর অভিব্যক্তি। [ক্লেয়ার টেন্যান্ট]
রাগ অবদমনের বিরুদ্ধে শক্তিময় যুক্তির উপস্থাপন ব্লেইকের এই কবিতা। তিনি চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন রাগ ঝেড়ে ফেলার সুবিধা আর অবদমনের বিপদকে। নৈতিকভাবেই ক্রোধের অবদমন হয়ে ওঠে বিপজ্জনক, যা কেবলমাত্র আরও ক্রোধ, এমনকি সহিংসতার দিকেও পরিচালিত করতে পারে। রাগ দমন করার বিপদ বোঝাতে ব্লেইক দুটি স্বতন্ত্র পরিস্থিতি উপস্থাপন করেছেন। কবিতার প্রথম দুই লাইনে, তিনি তার বন্ধুর কাছে তার ‘ক্রোধ’ স্বীকার করার বর্ণনা দিয়েছেন; আর তা করার সঙ্গে সঙ্গে এই ক্রোধও শেষ হয়ে যায়। সততা এবং অকপটতাকে স্পষ্ট করে তোলায় রাগ অদৃশ্য হয়ে যায়। অন্যদিকে, কবিতার দু’নম্বর লাইন থেকে ১৬ তম লাইন পর্যন্ত দেখা যায় একরকম চাপা ক্রোধের নেতিবাচক পরিণতির বিবরণ দেয়া। এই লাইনগুলিতে, ব্লেইক, রাগান্বিত হওয়ার বিষয়ে একদমই মুখ খোলেন না। বরং, সক্রিয়ভাবে তার বা তার ক্রোধের দিকে ঝোঁকেন যেন এটি একটি বাগান, একে ‘ভয়’ এবং ‘অশ্রু’ দিয়ে জল দেয়ার মতো পরিচর্যা করেন; এবং ‘হাসি’ আর ধূর্ত প্রতারণা দিয়ে একে ‘রোদ’ দেন, যা এক ধরনের অসুস্থ আনন্দের ইঙ্গিত বহন করে। এই রাগ-বাগানে যত্নশীল চাষের অর্থ হচ্ছে প্রথমে যা কিছু আমাকে রাগান্বিত করেছে তার পরিচর্যা; আর, সেইসাথে নেতিবাচক আবেগের স্ব-চিরস্থায়ী প্রকৃতির থেকে এগিয়ে যেতে অক্ষমতাও বোঝায়; ভয়, হতাশা এবং প্রতারণাকে উত্সাহিত করে, যা, পরিবর্তে, কেবল আরও ক্রোধকেই বাড়িয়ে তোলে। এইভাবে আবেগের অবদমন নেতিবাচকতার একটি চক্র শুরু করে যা শেষ পর্যন্ত আমাদের পুরো জীবনটাকেই গ্রাস করে ফ্যালে। ক্রোধের দমনকে গাছের বৃদ্ধি আর এর বিষাক্ত আপেলের মাধ্যমে একটি চক্রাকার প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে দেখানো হয়েছে। যা সমস্যাটিকে আরও খারাপ করে তোলে। অথচ আমাদের আর আমাদের ‘শত্রু’র মধ্যকার সমস্যাগুলি নিয়ে আগেই কথা বললে হয়তো এতোটা খারাপ পরিস্থিতি নাও হতে পারতো। কবিতাটি একটি নৈতিক পছন্দকে স্পষ্ট করে তোলে: হয় কথা বলুন আর সমাধান খুঁজুন, অথবা চুপ করে থাকুন এবং সুদূরপ্রসারী, বিষাক্ত প্রভাবগুলিকে কার্যকর করে তুলুন। আর সেটা হয় তখনই, মানুষ যখন তার রাগান্বিত আবেগগুলিকে বুকের খুব কাছে ধরে রাখে।
উইলিয়াম ব্লেইক। ইংরেজি ভাষার এক আশ্চর্য কবি। প্রায় তিন শতাব্দী পর এখনও তিনি সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এখনও তিনি সমানভাবেই হয়ে উঠতে পারেন ইঙ্গিতময়, দুর্বোধ্য ও বিবেচ্য। কখনওবা তাঁর স্বর অদ্ভুত প্রোফেটিক। কখনও রোম্যান্টিক। মোরাল। কখনওবা পৌঁছান আধুনিকতাকে ছাপিয়ে আধুনিকোত্তর ভুবনে। ১৭৫৭ সালের ২৮শে নভেম্বর লন্ডনে জন্মেছিলেন এই কবি। তাঁর বাবা জেমস ছিলেন হোসিয়ারি বিক্রেতা। থাকতেন লন্ডনের ২৮ নং ব্রড স্ট্রিটের নজিরবিহীন কিন্তু সম্মানজনক এক পাড়ায়। সব মিলে সাত সন্তান জন্মেছিল জেমস আর ক্যাথরিন দম্পতির। কিন্তু শৈশবেই দু’সন্তান মারা যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকে পাঁচ জন। তাঁদের মধ্যে উইলিয়াম ব্লেইক ছিলেন একাধারে কবি, চিত্রকর, খোদাইকারী এবং স্বপ্নদর্শী। তিনি তাঁর সমাজ ব্যবস্থা এবং মানুষের হৃদয়, উভয় ক্ষেত্রেই পরিবর্তন আনতে কাজ করে গেছেন।
এই ব্লেইকের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটে আজ থেকে কুড়ি বছর আগে যখন পলাশ দত্ত হঠাৎ করেই একটা মোটা বই নিয়ে ঢাকা থেকে সাস্টে এসে হাজির হলেন। এমদাদের মদিনা মার্কেটের বাসায় তখন নিয়মিতই আড্ডা বসতো আমাদের। সেইখানে অনুবাদ করতে বসে গেলেন তিনি ব্লেইক। তখনও অবশ্য সেইভাবে তাকে আবিষ্কার করতে পারিনি সবাই। অন্তত আমার কিছুটা সময় আরও লেগে গিয়েছিল। কারণ সেই বয়সে ব্লেইক আমার জন্য অতটা সহজ ছিলেন না। যতদূর জানতে পারা যায়, ব্লেইকের শৈশব ছিল শান্তিপূর্ণ। তেমন কোনও প্রাতিষ্ঠানিক স্কুলে যেতে হয় নি তাঁকে, তাই আর বাল্যকাল হয়ে ওঠে আরও আনন্দময়। অল্প বয়সে তিনি লন্ডনের রাস্তায় আপন মনে ঘুরে বেড়াতে পারতেন এবং সহজেই পার্শ্ববর্তী গ্রামাঞ্চলে পালিয়ে যেতেন। তাঁর কৈশরের ঘটনাগুলোয় আলোকপাত করলে দেখতে পাব তাঁর সে সময়ের অনন্য মানসিক ক্ষমতা তাঁর জন্য কিছুটা কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কারণ, তাঁকে বুঝতে পারবেন এমন কেউ তখন তাঁর পাশে ছিলেন না। হয়তো এইজন্য সবার কাছেই তিনি বিরক্তিকর হয়ে উঠেছিলেন। ওভাবে উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরি করতে যেয়ে একবার তিনি খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি দেখলেন, ‘দেবদূতে ভরা একটি বৃক্ষ, উজ্জ্বল সে’সব দেবদূতের ডানাগুলো নক্ষত্রের মতো গাছের প্রতিটি শাখায় দুলছে।’ কিন্তু এই কথা যখন বাড়িতে এসে বললেন, সবাই তাঁকে পাগল বলল। কেউ বিশ্বাস করলো না। মজাও পেল না। কেবলমাত্র তাঁর মায়ের অনুরোধে সে যাত্রায় বাবার পিটুনির হাত থেকে রেহাই পেয়েছিলেন। তাঁর বাবা-মা অবশ্য তাঁর শৈল্পিক প্রতিভাকে উত্সাহিত করেছিলেন এবং তরুণ ব্লেইক ১০ বছর বয়সেই পার্সের ড্রয়িং স্কুলে ভর্তি হন। শিল্পে ক্রমাগত আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের ব্যয় বহন করা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না, তাই তাঁর পরিবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ১৪ বছর বয়সে উইলিয়ামকে একজন মাস্টার খোদাইকারীর কাছে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রথমে তার বাবা তাকে অত্যন্ত সম্মানিত খোদাইকারী উইলিয়াম রাইল্যান্ডের কাছে নিয়ে যান। কিন্তু ব্লেইকের লোকটিকে পছন্দ হয়নি। তাই তার বাবাকে বলে এই ব্যবস্থাকে প্রতিরোধ করতে পেরেছিলেন, বলেছিলেন, “লোকটির মুখ আমার পছন্দ না: দেখে মনে হয় যেন সে ফাঁসিতে ঝুলতে পারলে বেঁচে যাবে!” কিন্ত কে জানতো এই ভবিষ্যৎবাণীটিই ১২ বছর পর সত্য হয়ে যাবে! পরে রাইল্যান্ডের বদলে তাঁকে অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত খোদাইকারী জেমস বাসিরের কাছে পাঠানো হয়। হয়তো বাসির তাঁর জন্য ভালো মাষ্টার ছিলেন আর তিনিও তাঁর শিল্প নৈপুণ্যের একজন ভালো ছাত্র হয়ে ওঠেন।
তবে ২১ বছর বয়সে বাসিরের শিক্ষা শেষ করে তিনি রয়্যাল একাডেমিতে ভর্তি হন। পরবর্তীতে একজন ভ্রাম্যমান খোদাইকারী হিসেবে তাঁর জীবিকা অর্জন শুরু করেন। সেই সময়ের বই বিক্রেতারা তাকে ডন কুইক্সোটের মতো উপন্যাস থেকে শুরু করে লেডিস ম্যাগাজিনের মতো সিরিয়াল পর্যন্ত প্রকাশনার চিত্র খোদাই করার জন্য নিযুক্ত করেছিলেন।
ওই সময়ের একটি ঘটনা ব্লেইকের উপর গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল। তখন ১৭৮০ সালের জুন মাসে লর্ড জর্জ গর্ডনের ক্যাথলিক বিরোধী প্রচার এবং আমেরিকান ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে অব্যাহত যুদ্ধের প্রতিরোধের কারণে লন্ডনে দাঙ্গা শুরু হয়। ধ্বংসের দিকে ঝুঁকে থাকা বাড়িঘর, গীর্জা এবং কারাগার সমস্ত কিছু কতিপয় অনিয়ন্ত্রিত জনতা একে একে পুড়িয়ে দিচ্ছিল। দুর্ঘটনাক্রমে এক সন্ধ্যায়, ব্লেইক নিজেকে নিউগেট কারাগার পুড়িয়ে ফেলা ভিড়ের সামনে দেখতে পান। হয়তো ওইসব সহিংস ধ্বংস এবং লাগামহীন বিপ্লবের চাক্ষুষ ঘটনাচিত্র ব্লেইককে ‘ইউরোপ’ (১৭৯৪) এবং ‘আমেরিকা’ (১৭৯৩) এর মতো কাজের জন্য শক্তিশালী উপাদান সরবরাহ করেছে।
হ্যাঁ, যুবক বয়সে তাঁর সমস্ত অগ্রহ কেবল শিল্প আর রাজনিতিতেই আবদ্ধ ছিল না। প্রথম প্রেমটি তাঁর জন্য দুর্ভাগ্যজনক হলেও, পরে তাঁর দেখা মেলে ক্যাথরিন বাউচারের সঙ্গে। প্রায় এক বছরের এই প্রেমের পরিণতি ঘটে ১৮ আগস্ট ১৯৮২ সালে তাদের বিয়ের মাধ্যমে। প্যারিশ রেজিস্ট্রি ঘাঁটলে দেখা যায় সেখানে ক্যাথরিনের কোনও স্বাক্ষর নেই। অন্য অনেক মহিলার মতো তিনিও প্রথমে অক্ষরজ্ঞানহীন ছিলেন। পরে ব্লেইক তাঁকে লেখা পড়া শেখান। যদিও তাদের বিয়েটি ছিল সফল, কিন্তু তাদের কোনও সন্তান ছিল না।
ব্লেইকের বন্ধু জন ফ্ল্যাক্সম্যান, রেভের স্ত্রী সুশিক্ষিতা হ্যারিয়েট ম্যাথিউর সাথে ব্লেইকের পরিচয় করিয়ে দেন। হেনরি ম্যাথিউ এর ড্রয়িং রুম প্রায়শই শিল্পী এবং সঙ্গীতজ্ঞদের মিলনস্থল ছিল। সেই আসরে ব্লেইক প্রায়শ তাঁর প্রথম দিককার কবিতা আবৃত্তি আর গান গেয়ে পরিচিতি লাভ করেন। ফ্ল্যাক্সম্যান এবং মিসেস ম্যাথুর সমর্থনের জন্য তিনি কৃতজ্ঞ ছিলেন। কারণ, তাদের সহযোগিতায় ব্লেইকের কবিতার একটি পাতলা সংকলন ‘পোয়েটিকাল স্কেচ’ (১৭৮৩) শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল। এই কবিতাগুলির অনেকগুলিই ছিল ধ্রুপদী মডেলের অনুকরণ, পড়লে মনে হতে পারে অনেকটা প্রাচীনকালের মডেলের স্কেচের মতো যা তরুণ শিল্পী তার ব্যবসা শেখার জন্য তৈরি করেছিলেন। এমনকি, এইসব কবিতাতেও অবশ্য যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং রাজাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দেখতে পাওয়া যায়। পোয়েটিকাল স্কেচের মাত্র ৫০ কপি মুদ্রিত হতে পেরেছিল বলে জানা যায়। ব্লেইকের অর্থ উপার্জনের ভালো কোনও উদ্যোগ ছিল না। ১৭৮৪ সালে বাবার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সূত্রে যে অর্থ ক’টা পান তা দিয়ে বন্ধু জেমস পার্কারের সঙ্গে প্রিন্টসেলার হিসেবে দোকান খোলেন। ভাইদের পাশাপাশি, পারিবারিক বাড়ির কাছে, ২৭ ব্রড স্ট্রিটে চলে যান। কিন্তু ব্যবসায় ভালো করতে পারেন না। আর দ্রুতই সরে আসেন সেখান থেকে।
ব্লেইক সর্বদা অনুভব করতেন মৃত ছোট ভাই রবার্টের আত্মা তার সাথেই আছে। এমনকি তিনি ঘোষণাও করেছিলেন, রবার্টই তাকে জানিয়েছিলেন কীভাবে তার কবিতাগুলিকে ‘আলোকিত লেখায়’ চিত্রিত করতে হবে। ব্লেইকের কৌশলটি ছিল একটি দুর্ভেদ্য তরল দিয়ে একটি তামার প্লেটে তার পাঠ্য এবং নকশা তৈরি করা। প্লেটটিকে অ্যাসিডে ডুবানো হয় যাতে পাঠ্য এবং নকশা স্বস্তিতে থাকতে পারে। যেন সেই প্লেটটি কাগজে মুদ্রণ করতে ব্যবহার করা যেতে পারে এবং চূড়ান্ত অনুলিপিটি তখন রঙিন হয়ে ওঠে। ‘প্রাকৃতিক কোনও ধর্ম হয় না, সমস্ত ধর্মই এক’ (১৭৮৮) শিরোনামে এক নীতিবচন সিরিজে এই পদ্ধতিতে নিরীক্ষা করার পর, ব্লেইক যে সিরিজটির প্লেট তৈরি করেন তা হচ্ছে ‘দ্য সং অব ইনোসেন্স’ (যার শিরোনাম পৃষ্ঠায় দিনক্ষণ লিখা ছিল ১৭৮৯এর)। এইভাবে ব্লেইক আলোকিত লেখার প্রক্রিয়া নিয়ে পরীক্ষা চালিয়ে যেতে থাকেন এবং ১৭৯৪ সালে ‘অভিজ্ঞতার গান’ শিরোনামের কবিতাগুলির সাথে প্রাথমিক কবিতাগুলিকে একত্রিত করেন। তাতে যে সম্মিলিত সেট তৈরি হয়, তার শিরোনাম দেন ‘মানব আত্মার দুই বিপরীত অবস্থা’ [দ্য টু কন্ট্র্যারি স্টেটস অব দ্য হিউম্যান সোল]। প্রতিটি সিরিজের সূচনা কবিতাগুলি ‘পাইপার [বাঁশি ওয়ালা]’ এবং ‘বার্ড [চারণ কবি]’ উভয় হিসাবে কবি ব্লেইকের দ্বৈত চিত্র প্রকাশ করে। কবিতায় মানুষ যেমন পবিত্রতা আর অভিজ্ঞতার বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে যায়, কবিও তেমনি পবিত্রতা আর অভিজ্ঞতার বিভিন্ন পর্যায়ে থাকেন। কবিতার মনোরম গীতিমূলক দিকটি ফুটে উঠেছে ‘পাইপার [বাঁশি ওয়ালা]’ এ। আর কবিতার অস্পষ্ট প্রোফেটিক প্রকৃতিকে তুলে ধরা হয়েছে দারুণ চারণকাব্যধর্মীতার ভিতর দিয়ে। কবি যে দ্বৈত ভূমিকা পালন করেছেন তা হল ব্লেইকের প্রাচীন অনুশাসনের ব্যাখ্যা। অর্থাৎ, কবিতার আনন্দ এবং নির্দেশ উভয়ই হওয়া উচিত। ব্লেইকের এই কবিতাগুলোয় আরও গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আর উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত প্রাচীন চারণ কবি এবং নবীদের পবিত্র কথন যা বিভিন্ন জাতির কাছে বারবার পৌঁছে দিয়েছিলেন তাঁরা। অবশ্য অভিজ্ঞতা আর পবিত্রতার দুটো অবস্থাই সবসময় কবিতায় প্রতিভাত হয়ে ওঠে না। কখনও কখনও দুটো অবস্থাকে যুগপৎ উপস্থিত থাকতেও দেখা যায়। যেমন ‘পবিত্র বৃহস্পতিবার’ শিরোনামের কবিতাগুলোয় দেখতে পাই লন্ডনের সেন্ট পলস ক্যাথেড্রালে দরিদ্র শিশুদের জোরপূর্বক মার্চ করানো হচ্ছে। নিষ্পাপ অবস্থায় বক্তা শিশুদের ওই অগ্রগতি উষ্ণতার সঙ্গে অনুমোদনও করছেন:
’Twas on a Holy Thursday their innocent faces clean
The children walking two & two in red & blue & green
Grey headed beadles walkd before with wands as white as snow
Till into the high dome of Pauls they like Thames waters flow[.]
নির্মম পরিহাস হল এই যে সত্যিকারের ‘নিরীহ’ শিশুদের, এই পৃথিবীতে এমন কিছু দুষ্ট লোক আছে যারা দমন করতে পছন্দ করে। গবাদি পশুর পালের মতো ঘিরে রাখে এবং ধার্মিকতা দেখাতে বাধ্য করে। কবিতার এই নির্দোষ অবস্থায়, অভিজ্ঞতা অনেক বেশি বর্তমান। অর্থাৎ অভিজ্ঞতার যদি নির্দোষতার জগতে হামাগুড়ি দেওয়ার উপায় থাকে, তবে নির্দোষতারও অভিজ্ঞতায় লতানোর উপায় রয়েছে এখানে। সোনালি সেই দেশ যেখানে ‘সূর্য ওঠে’ আর ‘বৃষ্টি পড়ে’, সেই দেশে রয়েছে প্রচুর ধার্মিকতা, রয়েছে নির্দোষতাও। কিন্তু এইখানে, এই বরকতময় দেশে শিশুরা রয়েছে অনাহারে। দুটি অবস্থার মধ্যে তীব্র এই বৈসাদৃশ্য সামাজিক ভাষ্যকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে এবং কবিতাটিকেও শক্তিশালী করেছে।
১৭৮৯ সালে বাস্তিলের ঝড় আর ফরাসি বিপ্লবের দ্বন্দ্বের সেই তরঙ্গ-ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছিল ইংল্যান্ডেও। যার অভিঘাতে কেউ কেউ ইংল্যান্ডের স্বাধীনতায় অনুরূপ প্রাদুর্ভাবের আশা করেছিলেন, আবার কেউ কেউ সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ারও আশঙ্কা করেছিলেন। ব্লেইক তার লেখার বেশিরভাগ অংশে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে যুক্তি দাঁড় করিয়েছিলেন। তাঁর প্রথম দিকের ‘তিরিয়েলে’ (আনুমানিক ১৭৮৯ সালে লিখিত) একজন অত্যাচারী রাজার পতনের উপায় সন্ধান করেছেন। তৎকালীন প্রকাশক জোসেফ জনসনের বাড়িতে রাজনীতি কথোপকথনের প্রধান বিষয় ছিল, সেখানে ব্লেইক প্রায়শই আমন্ত্রিত হতেন। ব্লেইক সেখানে উইলিয়াম গডউইন, জোসেফ প্রিস্টলি, মেরি ওলস্টোনক্রাফ্ট এবং টমাস পেইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে আলাপ করতে পারতেন। বলা হয়ে থাকে সে আসরে টমাস পেইনকে তার আসন্ন গ্রেফতার বিষয়ে সতর্ক করে তাঁকে বাঁচিয়ে ছিলেন ব্লেইক। এই ঘটনার সত্যতা কতোটুকু জানা নেই তবে, সেটা সত্য হোক বা না হোক, এটা স্পষ্ট যে ব্লেইক তার সময়ের কিছু নেতৃস্থানীয় উগ্র চিন্তাবিদদের সাথে পরিচিত ছিলেন। ফরাসি বিপ্লবে ব্লেইককে ফ্রান্সে গণতন্ত্রের উত্থান এবং রাজতন্ত্রের পতন উদযাপন করতে দেখা যায়। রাজা লুই যে রাজতন্ত্রের প্রতিনিধিত্ব করতেন তা ছিল পুরানো এবং মৃত। তিনি লিখেছেন, অসুস্থ রাজা অলস এবং কাজ করতে অক্ষম: “আমার জানালা থেকে ফ্রান্সের পুরানো পাহাড় দেখতে পাচ্ছি, বয়স্ক পুরুষদের মতো, বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে।” তাঁর ‘জনগণের কণ্ঠস্বর’ প্যারিস থেকে রাজার সৈন্যদের অপসারণের দাবি করে এবং প্রথম বইয়ের শেষে তাদের প্রস্থান গণতন্ত্রের বিজয়ের ইঙ্গিত দেয়।
‘দ্য ফ্রেঞ্চ রেভ্যুলিউশান’ বইয়ের শুরুতে লিখেছিলেন এরকম আরও সাতটি বই আছে তাঁর। কিন্তু বাস্তবে একটাও খুঁজে পাওয়া যায় না। জনসন তাঁর ওই কবিতাগুলো প্রকাশ করেন নি। কারণ তিনি ভয় পেতেন। বিচারের সম্মুখীন হওয়ার ভয়ে। কিংবা হয়তো ব্লেইক নিজেই প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। আমরা জানি না আসলেই কী ঘটেছিল। অবশ্য জনসনের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণও ছিল। এর্ডম্যান উল্লেখ করেছিলেন, একই বছরে টমাস পেইনের বই বিক্রি করার জন্য বই বিক্রেতাদের জেলে পাঠানো হয়েছিল। ‘অ্যামেরিকা’ (১৭৯৩) বইয়ে ব্লেইক তাঁর বিপ্লবের ধারনাকে কিছুটা ব্যাখ্যা করেছিলেন। অ্যামেরিকার প্রকৃত বৈপ্লবিক ঘটনা সমূহের বর্ণনার পাশাপাশি বিপ্লবের সার্বজনীন নীতির কথাও তুলেছেন।
The fiery joy, that Urizen perverted to ten commands,
What night he led the starry hosts thro’ the wide wilderness,
That stony law I stamp to dust; and scatter religion abroad
To the four winds as a torn book, & none shall gather the leaves.
যে শক্তি ঔপনিবেশিক মানুষদের রাজা জর্জের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে বাধ্য করে সেই শক্তিই প্রতিষ্ঠিত ধর্মের বিকৃত নিয়ম ও বিধিনিষেধকে উৎখাত করে। অ্যামেরিকার ওই বিপ্লব ব্লেইককে ভাবতে উৎসাহিত করে যেন ইংল্যান্ডেও ওইরকম বিপ্লব শুরু হয়। তাঁর কবিতায় আমরা দেখতে পাই রাজা, মিশরের প্রাচীন ফারাওদের মতো, বিদ্রোহীদের শাস্তি দেওয়ার জন্য আমেরিকায় মহামারী পাঠান, কিন্তু উপনিবেশবাসীরা ধ্বংসের ওই শক্তিকে ইংল্যান্ডেরই দিকে ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হয়। ব্লেইক যুদ্ধের সময় ইংল্যান্ডে দাঙ্গা এবং ইংরেজ সৈন্যদের বিশৃঙ্খল অবস্থার কথা ভাবছিলেন, যাদের মধ্যে অনেকেই যুদ্ধ ত্যাগ করেছিল। ১৭৯০ এর দশকে এই কবিতাটি লেখার সময়, ব্লেইক অবশ্যই ইংল্যান্ডের উপর ফরাসি বিপ্লবের সম্ভাব্য প্রভাব কল্পনা করেছিলেন। ১৭৯০ এর আরেকটি কবিতা হল ‘স্বর্গ ও নরকের বিয়ে’। ১৭৯০ এবং ১৭৯৩ সালের মধ্যে লেখা এবং খোদাই করা, ব্লেইকের কবিতাটি চার্চ এবং রাজ্যের নিপীড়ক কর্তৃত্বকে নির্মমভাবে ব্যঙ্গ করে। কবিতাটির শক্তিশালী সূচনা এক অদ্ভুত সহিংস জগতের ইঙ্গিত দেয়: “রিন্ত্রাহ গর্জন করে এবং দায়-ভারাক্রান্ত বাতাসে তার আগুন কাঁপে / ক্ষুধার্ত মেঘ গভীরে দোল খায়।” আগুন আর ধোঁয়া যুদ্ধক্ষেত্র আর বিপ্লবের ইঙ্গিত দেয়। সংকেত দেয় বিশৃঙ্খলার। যেই বিশৃঙ্খলার কারণ কবিতার শুরুতেই বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পৃথিবী উলটপালট হয়ে যায়। সাধারণ মানুষ চার্চ এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান থেকে দূরে সরে গেছে, এবং তার জায়গায় মূর্খ এবং ভণ্ড যারা আইন-শৃঙ্খলা প্রচার করে কিন্তু বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। যারা বিধিনিষেধমূলক নৈতিক নিয়ম এবং নিপীড়নমূলক আইনকে ‘ভালো’ বলে ঘোষণা করে প্রকৃতপক্ষে তারা নিজেরাই মন্দ। তাই এই দমন-পীড়নকে মোকাবেলা করার জন্য, ব্লেইক ঘোষণা করেন তিনি ‘ডেভিলস পার্টির’ যিনি স্বাধীনতা, শক্তি এবং তৃপ্ত আকাঙ্ক্ষার পক্ষে থাকবেন। তাঁর ‘জাহান্নামের হিতোপদেশ’ স্পষ্টভাবে পাঠককে তার সাধারণ ধারণা থেকে ধাক্কা দেওয়ার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে, যেন পাঠক বুঝে নিতে পারেন কোনটি ভাল এবং কোনটি মন্দ:
Prisons are built with stones of Law,
Brothels with bricks of Religion.
The pride of the peacock is the glory of God.
The lust of the goat is the bounty of God.
The wrath of the lion is the wisdom of God.
The nakedness of woman is the work of God.
‘স্বর্গ ও নরকের বিয়ে’র প্রধান কবিতাগুলিতে বিকশিত মৌলিক ধর্মীয় ধারণাগুলোর অনেকগুলিই উপস্থিত রয়েছে। ব্লেইক আসলে প্রাচীন দৃষ্টিভঙ্গির বিকৃতি হিসাবে সংগঠিত ধর্মের বিকাশকে বিশ্লেষণ করেছেন: “প্রাচীন কবিরা ঈশ্বর বা ঐশ্বরিক প্রতিভা দিয়ে সমস্ত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুকে অ্যা