এইখানে এক নদী ছিল
জাকিয়া শিমু
ধীরেন মাঝি এককথার লোক, মরে গেলেও কথার বরখেলাপ করেন না। গাঁয়েরলোক অবশ্য তাঁর এই বিশেষ গুনকে হালকাভাবে জ্ঞান করে অর্থাৎ ঘাড়ের-রগ ত্যাড়া বলে জ্ঞাত করে। সে-যাই হউক তাতে অবশ্য ধীরেন মাঝির কিছু যায়-আসে না। এবং তাতে তার জবানেরও নড়চড় হয় না।
ওদিকে গাঁয়ে চলছে এক হুলস্থুল কাজ-কারবার। গাঁয়ে একদাগের উপর প্রায় বিঘা চল্লিশেক বসতবাড়ির জায়গাজমি সাধারন দরের চেয়ে কয়েকগুণ চড়াদরে উত্তরপাড়ার হাফিজুদ্দিন খরিদ করেছে। হাফিজউদ্দিনের মেয়ে, বিদেশের বাড়িতে লটারিতে একমিলিয়ন ডলার পেয়েছে এবং এর সাথে সাথে তার মাথায় বিশেষশ্রেনির ভূত ভর করছে। মেয়েমানুষ, স্বভাবতই বিষয়ভিত্তিক বিচার বিবেচনা ক্ষীণ। তা’ই যদি না হবে, তো-এই গণ্ডগাঁও-এ কেউ পাঠাগারের কথা মাথায় আনে ! ধিরেন মাঝির বসতভিটের দাগে, পুরোতল্লাটের একক স্বত্বাধিকা্রিণী এখন এই নির্বোধ মেয়েমানুষ। একমাত্র ধীরেন মাঝির ভিটেটা মধ্যিখানে, যা হাফিজুদ্দিনের গলার কাঁটা হয়ে আটকে আছে।
ধিরেন মাঝির বসতভিটে হালেরকালের নয়। সাতপুরুষের দাপুটে-জীবন কালের সাক্ষী এই ভিটেখানা। ভিটের অদূরে একসময়ে দুর্দান্ত দাপটে বয়ে চলা ইছামতী নদী। নদীরজল- তাঁর সাতপুরুষের হাসিকান্নার স্বয়ংদ্রষ্টা। বহুকাল আগের কথা। প্রকাণ্ড ইছামতীর বুকের ওপর চর জাগল। দিনকে দিন তা আয়তনে বেড়ে বিশাল বালুচরে রূপ নিল। বালুর উপর ধীরেধীরে পলিমাটির আস্তর জমা পড়ল। উর্বর-মাটির আকর্ষণে দূরদূরান্ত থেকে দলেদলে লোকের বহর এসে বসত গড়ল সেই চরায়।
ধিরেন মাঝির পূর্বপুরুষ সে-দলের লোক। দলের প্রায় সকলে চরের পলিমাটিতে চাষাবাদ শুরু করলেও ধিরেনমাঝির পূর্বপুরুষ গেল ভিনপথে। তারা নদীর সাথে সখ্যতা গড়ল। নদীতে কড়ইকাঠের কোষা নৌকা নামাল এবং খেয়া পারাপারের কাজের মাধ্যমে শুরু হল তাদের জীবনযুদ্ধ। এবং সেই থেকে তাদের নামের শেষে- মাঝি’ শব্দটি অনেকটা উড়ে এসে জুড়ে যেন বসে পড়ল। ধিরেন মাঝির সাতপুরুষের জাত ব্যবসা-খেয়া পারাপার। এতকাল পরে নদীকূলের জন্মভিটা লোভের পরে বেঁচে দেবার চিন্তা করাও ধীরেন মাঝির জন্যে মহাপাপ এর কাজ।
হাফিজুদ্দিনের মেয়ে শহুরেপড়াশুনা জানা মেয়ে। কৃষক বাবা বেশ কষ্টেসৃষ্টে মেয়েকে শহরের কলেজে পড়িয়ে শিক্ষিত করেন। মেয়ে একসময় উঁচু পড়াশুনা করতে বিদেশে পাড়ি জমায়। বিদেশে পড়াশুনার ফাঁকেফাঁকে দোকানে কাজ করে। সেই দোকানের এক খরিদদার উপহার হিসেবে তার হাতে এক লটারির টিকিট ধরিয়ে দিয়ে যান। কিছুদিন পড়ে সেই লটারির নামে এক মিলিয়ন ডলার মূল্যের জিত আসে।
গাঁয়ে এই উটকো-সংকটের শুরুটা হয়, হাফিজুদ্দিনের মেয়ের লটারি-টাকা লাভের পর থেকে।
হঠাৎ পাহাড়িঢলে নিচু লোকালয় জলেরতলে তলিয়ে গেলে যেমন হয়, গাঁয়ের শান্তশিষ্ট মানুষগুলোর বহুকালের জীবনযাপনের ধারায় তেমন একটা টালমাটাল দশা চলে আসে। তারা অগাধ অর্থের টোপে পড়ে- সাতপুরুষের ভিটেমাটি বিক্রি করে দিয়ে ভিনগাঁয়ে গিয়ে ঘর বাঁধে। সারাদিনের ব্যস্ততার পর কুড়েঘরের সুখ কী আর ইটবালুর বাসাবাড়ি দিতে পারে! কর্মহীন জীবনে এরা চরম অস্থিরতায় এখন দিন কাটায়। হাতে টাকা আছে কিন্তু কাজকর্ম নেই, কোনোরকম কর্মব্যস্ততা নেই। অসার সময়ক্ষেপণ !
হাফিজুদ্দিনের মনেও যে স্থিরতা আছে তা কিন্তু নয়। তার এখন দিন-রাত কাটে চরম উৎকণ্ঠায়। মেয়ে জেদ ধরে বসে আছে-দেশবিখ্যাত পাঠাগার তার গাঁয়ের পরে সে দেখতে চায়। কিন্তু এমন ঘন বসতিস্থলে এক দাগে জায়গা একত্রে জুটানো চাট্টিখানা কথা নয়। “টাকায় সব হয়’ এমন আপ্তবাক্য আদতে অন্তঃসারশূন্য। হাফিজুদ্দিন এই জমাজমি ক্রয় করতে যেয়ে তা কড়ায়গণ্ডায় টের পান। সোনাদানায় মোড়ানো টাকাকড়িতেও ধিরেন মাঝিকে সম্মত করা যায় নাই। তাঁর মাত্র নয় কাঠার ভিটেখানা,তাও পড়ল হাফিজুদ্দিনের কেনা-তল্লাটের মধ্যিখানে। হাফিজুদ্দিনের ঘুম কেড়ে নেয় ধীরেন মাঝির জমিটুকু।
ধিরেন মাঝি আধপাগলা, স্বপ্নবাজ এবং আশাবাদি মানুষ। এখনকার দিনে তাঁর মতো দৃঢ়চেতা মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। একসময়ের প্রকাণ্ড ইছামতী এখন শুকিয়ে মরাখাল হয়ে পড়ে আছে। বর্ষাকালে যার পরে হাঁটুজল থাকে। উন্নাকালে ছেলেরা নদীর খড়খড়ে বুকে ফুটবল খেলে বেড়ায়। নদীর উপর গুইসাপের পিঠের মতো শহুরেপুল, দখল করেছে বাঁশের সাকোঁর স্থান, সেও বহুকাল হয়ে এল। তারপরও ধিরেন মাঝি প্রতিবছর উন্নাকালে বাপ-দাদার শালতিটাকে গাবের কষে মেখেজুকে রোদে পুড়িয়ে খেয়া পারাপারের উপযুক্ত করে তোলে। নদী দখলবাজরা নদীর দু’পাড়ে অবৈধ বসতি গড়ে পুরো নদী গিলে প্রায় নিঃশেষ করে দিয়েছে। কিন্তু আজও ধিরেন মাঝি স্বপ্ন দেখে-, একদিন নদীভরে উঠবে থইথই জলে। খেয়াঘাটে জমায়েত হবে ইছামতীর এপার-ওপারের লোক। ধিরেনমাঝি’ নাম ধরে উচ্চস্বরে হাঁক আসবে, বৈঠা হাতে সে ছুটে যাবে নদীরপাড়ে।
ধিরেন মাঝির বাড়িটি এককালে নদীর মধ্যচরে ছিল। এখন নদী নেই, তো চর থাকার জো কোথায় ! একসময়ের খাঁখাঁ নদীরচর এখন ঘনবসতি, জনপদ। তার প্রতিবেশিরা চড়াদামে ভিটেমাটির স্বত্বত্যাগ করে ভিনগাঁয়ে সরে পড়েছে। তাদের ঘরদোরও সরে গেছে। মধ্যিখানে বয়োবৃদ্ধের ফাঁকামাড়িতে নড়বড়ে শেষদন্তটার মতো বেখাপ্পা হয়ে তাঁর দু’চালা বাঁশেরঠেকা দেওয়া ঘরখানা রয়ে গেছে! বাড়ির উঠান থেকে নদীরপাড় ঘেঁষা উঁচু পাহাড়ের মতো রাস্তাটা পষ্ট দেখা যায়। রাস্তাপাড় ভেঙ্গে আরও নিচে, জলকাদায় মাখামাখি করে ‘ইছামতীনদী’ নামে একখণ্ড সরু খাল! বহু কষ্টেসৃষ্টে আজও কালের সাক্ষী হয়ে টিকে রয়েছে। সকাল-বিকাল ধিরেন মাঝি ছুটে যায়- মরাখালে জোয়ারের খোঁজে। মাঝেমধ্যে বাদলা-দিনে রাস্তায় জমা পানি রাস্তার ঢাল বেঁয়ে নদীতলে জমে,ধিরেন মাঝি খুশিতে বৈঠা হাতে পাগলের মতো ছুটে! সারাগাঁয়ে সেখবর সে ছড়িয়ে বেড়ায়। ‘নদীতে জোয়ার এসেছে, জোয়ার এসেছে, নদী পারাবারের সময় হল’। তাঁর পাগলামিতে গ্রামসুদ্ধলোক হাসাহাসি করে।
হাফিজুদ্দিনের ত্বর সয় না। মেয়ে মাস দু’য়ের মধ্যে দেশে ফিরবে। বাদবাকি আয়োজনও প্রায় শেষের পথে। শহর থেকে প্রসিদ্ধ ডিজাইনার আসে। সকাল-বিকাল গজ ফিতায় জায়গা-জিরত মাপজোক করে। ধিরেন মাঝি, লোকমুখে শুনেছে- এখানে মস্তবড়ো দালানঘর উঠবে; দেশ-বিদেশের মোটা মোটা বই দালানঘরের চারপাশের দেওয়ালে থরে থরে সাজানো থাকবে। সারাদেশের জ্ঞানী লোক পড়াশুনা করতে ভিড় জমাবে এ-তল্লাটে। কিন্তু ধিরেন মাঝির মাথার খোঁড়লে একটা সহজ প্রশ্ন সারাক্ষণ ঘুরঘুর করে, “যে গাঁয়েরলোকেরা আস্ত-নদীটাকে গিলে সাবার করে দিল, সেইগাঁয়ের লোকের কাছে এসে মানুষ আদতে শিখবেটা কী! মোটা মোটা বইয়ে কী লেখা থাকে,নদী নিধনের গল্প থাকে ?” নিরক্ষর ধীরেন মাঝি লোক ধরে ধরে প্রশ্নটা করে বেড়ায় কিন্তু যুতমতো কারো কাছেই সঠিক উত্তর মিলে না।
অবশেষে উপায়ান্ত না পেয়ে ধিরেন মাঝি, খুব আশা নিয়ে হাফিজুদ্দিনের নিকটে যায়। একসময় তারা দুজনে বেশ ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন, খেয়াঘাটে বসে কতো গল্প করেছেন। নদীর কথা, গাঁয়ের কথা, নিজেদের সুখ-দুঃখের কথা- কতো কিছিমের গল্প হত দুজনের।
সেসব সময়ের অধিকার নিয়ে একসন্ধ্যায় হাফিজুদ্দিনের বাড়ি গিয়ে হাজির হন তিনি। নদীটাকে যদি বাঁচানো যায়, যদি নদীর দুকূল ছাপিয়ে আবার জোয়ার আসে। হাফিজুদ্দিনের’তো এখন মেলা টাকা, টাকায় তো নাকি সবকিছুই হয়। হাফিজ উদ্দিন তাঁর কথা শুনে উচ্চস্বরে হাসে! শুধু হাফিজুদ্দিন না, গাঁয়েরলোকও তাঁকে পাগল বলেই জ্ঞান করে।
ধিরনে মাঝির এতকিছুর পরও ক্লান্তি আসে না। তিনি এলাকার মন্ত্রীর কাছে ছুটে যান। মাঝেমধ্যে মন্ত্রী ছুটিছাঁটায় এলাকায় আসেন। মনমর্জি ভালো থাকলে সাধারণ মানুষেরে সাক্ষাত দেন। তবে এও সে শুনেছে- ইদানিং নাকি মন্ত্রীর মনমেজাজ কড়া থাকে। এলাকায় এসে দলের লোকদের সাথে কীসব মিটিংসিটিং করে তারপর থানার অফিসারদের ডেকে এনে ধমকিধামকি দিয়ে শহরে চলে যায়। তবে লোকের সবকথা শুনতে নেই। ধিরেন মাঝি শোনাকথায় কান দেওয়ার লোক নন। তিনি স্বশরীরে মন্ত্রীর সাথে সাক্ষাত করতে মনস্থির করেন।
বর্তমান মন্ত্রীর বাবাও ছিলেন আগের আমলের নামকরা মন্ত্রী। তবে তিনি ছিলেন অতি ঠাণ্ডামানুষ। একবার খেয়াঘাটে এসে ধিরেনমাঝিকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। সে কথা আজও মনে পড়লে ধিরেন মাঝির বুকটা ফুলেফেঁপে একসার টানটান হয়ে যায়! বড়ো ভালো লোক ছিলেন। যদিও এমন ঘটনা নাকি ইলেকশনের পূর্বে অহরহ ঘটে। তারপরও ধিরেন মাঝির জীবনে সে-ঘটনা সেরা হয়ে স্মৃতিতে গেঁথে গেছে। তিনি লোকসমাজে গর্ব করে সে-গল্প বলে বেড়ান।
তবে ছেলেমন্ত্রী ইলেকশনের ধার ধারে না। ইলেকশনের আগে এলাকায় মোটর-সাইকেল/ গাড়ির বহরে চ্যালাচামচাদের নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। এলাকার ময়মুরব্বীর দোয়ার ধাঁর ধারেন না। অবশ্য তার দলের লোকেরা সেসব ঠিকঠাক করে দেয়। গত ইলেকশনে খুব শখ করে ধিরেনমাঝি ভোট দিতে কেন্দ্রে যান। মন্ত্রীর দলেরলোক তাঁকে কেন্দ্রের কাছে ঘেঁষতে লাঠি হাতে তেড়ে আসে। এরপর অবশ্য তাঁর আর ভোট দেওয়ার শখ জাগে নাই।
ধিরেনমাঝি যখন মন্ত্রীবাড়ি পৌঁছে তখন মধ্যদুপুর। ভাদ্র মাস। চটচটে, ভ্যাপসা গরম। আকাশে ধূসর ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ জমা হয়ে আছে। ধিরনমাঝি মাথার উপর আকাশটাকে তাকিয়ে দেখেন। মেঘ গলে বৃষ্টি নামার কোন লক্ষণ খোঁজে পান না। তিনি বহুপথ হেঁটে এসেছেন, শরীর থেকে দরদরিয়ে ঘাম নামছে। কাঁধের গামছাটা মন্ত্রীর বাইরবাড়ির চাপকলে ভিজিয়ে গা মুছে নেন। বাইরবাড়ির বৌঠকখানায় বহুলোক ঠাঁসাঠাসি করে বসে আছে। বেশিরভাগ চেংরা-বয়সী। ধিরেনমাঝি মন্ত্রীর অপেক্ষায় বাড়ির শেষসীমানার আমগাছ তলায় বসে থাকেন। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়, মন্ত্রীর দেখা মেলে না। শুনেছেন মন্ত্রী অতিশয় ব্যস্ত আছে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। মন্ত্রীর ব্যস্ততা কমে না। একসময় মন্ত্রীর কালো কাচের গাড়িটি, অশ্বদৌড়ে ধুলো উড়িয়ে ধিরনমাঝির সামনে দিয়ে শহরে যাওয়ার পথে অদৃশ্য হয়ে যায়।
হাফিজুদ্দিনের মেয়ের শখের পাঠাগার ডিজাইনার সময়মতো গাঁয়ে এসে পৌঁছে। সাদা চামড়ার চীনালোক; বেঁটেখাটো শরীর,সংকীর্ণ চোখজোড়ার মধ্যিখানে পাতিহাঁসের ঠোঁটের মতো চ্যাপ্টা একটা নাক। সাদা একখানা টুপি পরে,সঙ্গীদের নিয়ে মাঝেমধ্যে ধিরেন মাঝির বাড়ির চারপাশে ঘুরঘুর করে। শীতকালের ভোরসকালে চরাচর যেমন কুয়াশার সরে ঢেকে যায় সেরূপে ধীরেন মাঝির মনটা বিষণ্ণতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। বিরবিরিয়ে নিজের মনে আবুলতাবুল বলেন- শেষমেশ বুঝি শহুরেদালানটা এমন অজপাড়াগাঁয়ে বাসা বাঁধবেই ! তবে তিনি মনে মনে আরও দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হোন,জীবন গেলেও আপোস করবেন না। শরীরের শেষ রক্তবিন্দুটা দিয়ে হলেও রক্ষা করবেন সাতপুরুষের ভিটেমাটি।
ধিরেন মাঝি, প্রায়ই ঘরের কাড়ে যত্নকরে তোলে রাখা সেই দাদারকালের সবুজরঙা জংধরা টিনের ট্রাঙ্কটা, রাতদুপুরে কুপিবাতির আলোতে খুলে বসেন। বড়দাদা কিংবা তারও আগের আমলের নথিপত্র যত্ন করে এর ভেতরে রাখা আছে। কাগজ গুনেগুনে দেখেন, দলিলপত্র ঠিক আছে কিনা। নিজের অক্ষরজ্ঞান না থাকলেও এসব নথিপত্রের ব্যাপারে সে তাঁর বাবার মতো সতর্ক। বাবার কাছ থেকে দলিলপত্র দেখার জ্ঞান তাঁর শেখা আছে। অক্ষরগুলোর গায়ে যত্নেরহাত বুলান,অক্ষরের সংখ্যা গুণে দেখেন। এরপর শক্ত করে নথিপত্র বুকের কাছে ঝাঁপতে ধরে বাকিরাত পার করে দেন। নিজের ভিটেটা সে কিছুতেই হাতছাড়া করবেন না, শালতিটাও না। সুদিন আসছে। সেদিন উত্তরপাড়ার রহিমগাজীর রেডিও-সংবাদ সে নিজ কানে শুনে এসেছে। তবে আফসোস! সংবাদের শুরুতে সে উপস্থিত থাকতে পারেনি। বাকিটা যারা ওখানে শুরু থেকে উপস্থিত ছিল, সবিস্তারে আলোচনা করছিল।
সেসব কথা তাঁর খুব মনে ধরেছে। সরকার নাকি দেশের নদীগুলোতে বিদেশি দৈত্যাকার কলের-মেশিন নামাবে। সেই মেশিন চারপাশের অবৈধ বসতবাড়ি ভেঙ্গেচুরে খুঁড়েপেড়ে নদীগুলোকে উদ্ধার করবে। এরপর নদীতে জোয়ার আসবে। নদীগুলো সেই আগেরমতো জলবতী হয়ে উঠবে। নদীর উপরের অজগরের মতো পুলগুলো জোয়ারের স্রোতে ভেসে যাবে দূরে কোথাও। তখন পুরোএলাকার মানুষ তাঁর খোঁজ করবে। শালতিটাকে সেই কবে থেকে সে গাবের-কষে প্রলেপ দিয়ে রোদের পোড় মাখছে। খুশিতে তাঁর চোখে জল আসে।
সাদা টুপির চীনালোক একদিন ধিরেনমাঝির বাড়ির পরে আসে। ধিরেনমাঝির বাড়ির চারপাশের পুরোটাই এখন খোলামেলা। প্রতিবেশীরা চলে গেছে ভিনগাঁয়ে। বসতবাড়িগুলো কলের মেশিনে ভেঙ্গেচূড়ে মাঠের মতো সমান করা হয়েছে। যতদূর চোখ যায় খাঁখাঁ শূন্যতারা ভেসে বেরায়। ধিরেন মাঝির প্রায়দিন ঘুম ভেঙ্গে যায় ভোর বিয়ানবেলায়। এরপর নানান ভাবনায় তাঁর চোখে আর ঘুম ফেরে না। সে ভোরের নীলচে আলো ফুটতে বাড়ির পূবকোণায় বাঁশের মাচায় চুপচাপ যেয়ে বসে থাকে। শিমুলফুলের মতো লাল টকটকে সূর্যটা,পূবের আকাশে আলসেমী ভঙ্গিতে জেগে উঠতে- বড়ো চিত্তাকর্ষক সে-দৃশ্য। ধিরেন মাঝি একদৃষ্টিতে সেদিকে চেয়ে থাকে। কখন এসে চীনালোক তাঁর কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে, কে জানে। পেছন ঘুরতে তাঁর হুঁশ ফেরে। একঝটকায় সে দূরে সরে পড়ে ! চীনালোক, দুর্বোধ্য ভাষায় এবং মুখে প্রশ্রয়ের হাসি মেখে তাঁকে আশ্বস্ত করে। ধিরেন মাঝি শান্ত হয়,ভয় কাটে। লোকটা মন্দলোক নয়। তার ভাষা না জানলেও,মুখের হাসি ধিরেন মাঝি ঠিকই পড়তে পারে। ও-নির্ভরতায় হাসি। পৃথিবীর সকলজাতের হাসির-ভাষা বোধহয় একই হয়।
একসময় হাফিজুদ্দিনের মেয়ে দেশে ফিরে আসে। গাঁয়েরলোক ভেঙ্গে পড়ে তার সাক্ষাত পেতে। শুধু ধিরেন মাঝি এ খবর শোনে সারাদিন একলাঘরে চুপচাপ বসে থাকে। তবে মেয়েটার ওপর তাঁর কোন রাগক্ষোভ নাই। ক্ষোভ যা হয়, তা সেই লটারি আর সে-দেশের সরকারের ওপর। এতটাকা যাদের কাছে আছে তারা কেনো তাঁর ইছামতী নদীটাকে ফিরিয়ে দিতে পারছে না! অথচ লটারির নাম করে মেয়েটাকে বিনা পরিশ্রমে এতগুলো টাকা দিয়ে দিল! এসবের কিছুই ধিরেন মাঝির মাথায় ঢুকে না।
মেয়েটাকে সে স্কুলে পড়াকালিন সময়ে দেখেছে। বড় লক্ষ্মীমেয়ে ছিল। সকাল- দুপুর স্কুলে যাওয়া-আসার পারাপার সে-ই করত। এক কানাকড়িও কখনো তার কাছ থেকে ধিরেন মাঝি নেয়নি। স্কুলের শিক্ষকরা যখন খেয়াঘাটে আসত, স্কুলের নানান বিষয়ে গল্পগুজব করত। ধিরেন মাঝি মনোযোগে সেসব শুনতেন। তখন সে এই মেয়েটার নামডাক তাদের মুখে খুব শুনেছেন। বিরাট পড়াশুনা জানা মেয়ে। এস্কুলে নাকি তাকে টপকিয়ে যাওয়ার সাধ্যি কারো নাই। ধিরেন মাঝি নিজে দারিদ্রতায় পড়াশুনা করতে পারেন নাই সেই আক্ষেপ তাঁর সারাজীবন ধরে আছে কিন্তু যারা স্কুলে ভালো পড়াশুনা করত বলে জানতেন তাদের তিনি বিনেপয়সায় খেয়া পারাপার করে দিয়ে নিজের ভেতর গভীর পরিতোষবোধ করতেন।
দু’দিন পর হাফিজুদ্দিনের মেয়ে ধিরেনমাঝির বাড়ি আসে। বাবার মতো করে তাঁকে জড়িয়ে ধরে কাছে টেনে নেয়। ধিরেনমাঝি অবুঝ বালকের মতো ফ্যালফ্যাল-চোখে চেয়ে থাকেন,কিছুই বুঝে উঠতে পারেন না। ভিটেটা বুঝি বাঁচানো গেল না ! মেয়েটা বুঝি তারই আবদার নিয়ে এসেছে। আতঙ্কে তাঁর পাঁজরের গহীনে একটা শীতলস্রোত বয়ে যায়।
চীনালোক ধিরেনের মনেরকথা বোধহয় পড়তে পারে। ধীরেন মাঝিকে পিঠ চাপরে নির্ভয় দেয়। এরপর হাফিজুদ্দিনের মেয়ের সাথে ইংরেজী ভাষায় কীসব কথা বলাবলি করে। মেয়ে তার কথা গভীর মনোযোগে শুনে এবং মেয়ের কপালে এতক্ষণ ধরে রাখা চিন্তার চিড়লভাঁজ মিলিয়ে যেতে শুরু করে। ধিরেনমাঝি বিষয়ের আগাগোড়া কিছুই উদ্ধার করতে পারেন না। মেয়ে ধীরেন মাঝির কাছ থেকে হাসিমুখে বিদায় নিয়ে চলে যায়। যাওয়ার আগে তাঁকে জড়িয়ে ধরে নির্ভরতার আভাস দেয়। ধীরেন মাঝির মনটা এতদিন পরে হলেও কেমন খুশির লহরে ভেসে ওঠে।
বহুকাল পরে দেশজুড়ে হাফিজুদ্দিনের মেয়ের ‘ইছামতী’ পাঠাগারের নাম ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিদিন দেশ বিদেশের নানান প্রান্ত থেকে বহুলোক ছুটে আসে-অনবদ্য পাঠাগারের সৌন্দর্য একনজর নিজচোখে দেখতে। দেশি-বিদেশি হাজারো বইয়ের দুর্লভ ভাণ্ডারে বই পড়ুয়াদের ভিড় জমে পাঠাগারে। এবং
দালানকোঠার ভিড়ে ইছামতী’ নদীর চিহ্ন একসময় পুরোদস্তুর নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। কিন্তু চীনালোকের পরামর্শে হাফিজুদ্দিনের মেয়ে,পাঠাগারের মাঝখানে ধিরেন মাঝির সেকেলের-বাড়িটি, অবিকল সেরকম করে এ-অঞ্চলের বিগত ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে যত্ন করে ধরে রাখে। বাড়িটি দেখে যে কেউ বুঝতে পারে- এককালে এইখানে একটি বড় নদী ছিল।
*****************************************
