You are currently viewing মায়ারাক্ষুসী || নুসরাত সুলতানা

মায়ারাক্ষুসী || নুসরাত সুলতানা

মায়ারাক্ষুসী
নুসরাত সুলতানা

তিন-চার জন কালো লিকলিকে নাঙ্গা শিশু ঝুপ করে লাফ দিয়ে পড়ল নদীর রুপোলী বুকে । এই দৃশ্য দেখে সত্তুর বছর বয়স্ক জমিলা বলে ওঠে এউ মউন্টা বেশি দূরে যাইস না কোলোম। তুই কিন্তু হাতার শেখো নায়। গাঙ্গের যে ঢেউ তোরে ভাসাইয়া লইয়া যাইবে কোম্মে তুই কিন্তু হ্যা ট্যারও পাবি না! নান্টু বলে- ও দাদী মুই যাই? মুই কিন্তু হাতরাইতে পারি। মুই হিকছি। এর ভেতর শাহিনুর বলে ওঠে – অ কও কী মনু! পুহাইরে হাতরান আর গাঙ্গে হাতরান কী এক কতা অইলে! কত বড় বড় ব্যাডারা পুহাইর এমাতা-ওমাতা করে। আর গাঙ্গে নাইম্মা ভাডার কালে ডুইববা যায়। ও চাচীয়াম্মা আমনেহ না জানেন? জমিলা বলে হ জানি তো। আর এ গাঙ্গের যে সোরোতের টান হ্যার লগে কেও পারে? মোর দেওরের পোলায় ডুইববা গ্যালহে না এই গাঙ্গে। দুইদিন পর যাইয়া পাইছে মহাবাজ অই পোঞ্চাইড বাড়ির ধারে। এর ভেতর মায়া বলে – ও চাচী আম্মা মোর যেকালে বিয়া অইছে হেইকালেই তো মুই দেকছি গাঙ উই মাজখানে আলহে। মোরা এই গাঙ্গের মাজখান দিয়া আইট্টা বেলতলা গেছি। আর এহন এই গাঙ ভাঙতে ভাঙতে কতদূর আইতে আছে।

ছেলেপেলেগুলো আরেকটু তীরের কাছাকাছি চলে আসে। এরভেতর একটা বড় জাহাজ যায় নদীর বুক চিড়ে। তার অব্যবহিত পরেই আসে ঢাকাগামী লঞ্চ জলময়ূর। পরপর দুটি বড় জাহাজ আসার কারণে নদীর বুক ফুলে তৈরি হয় বড় বড় ঢেউ। আর তাতে ছেলেপুলেদের আনন্দ বাড়ে বাংলাদেশে বসবাসরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মতো। তখন বউ-ঝিয়েরা নিজেদের ভেতর চালাচালি করতে থাকে নদীর বেড়ে ওঠার গল্প। জমিলা বলে- কী কমু বউ তোমাগো! এই গাঁয়ে আইছি তো এই পোঞ্চাশ বচ্ছর। কতকিছু যে দ্যাকলাম এই পোড়া চউক দুইডা দিয়া! কত রূপ যে দ্যাকলাম এই গাঙ্গের। হেইসময় ফুলতলা নদীডা চ্যাতা আছেলে। মোরা তো মনে করছি ফুলতলা চ্যাইততা অই সোনাডাঙ্গা বাজারডা যাইবে গাঙ্গের প্যাডে। আর হেই দাপটে অই যে শায়েস্তাবাদের খালডা ঝুনাহার – অইডা পুরা নদী অইয়া যাইবে। কিন্তু হেই যে ৭১ সোনে ঝুনাহারে পাকিস্তানিরা জাহাজ ডুবাইয়া দেলে। আর হেডা একটা খাল অইয়াই রইলে।
আর ফুলতলা অইয়া গ্যালে মজানদী। আর নথডোবা চ্যাতলে জম্মের চ্যাতা। আর মোগো এই সোনাডাঙ্গা গেরামডা ভাঙতেই আছে। এমন সময় দুই বেনী দুলিয়ে আসে দুজন ষোড়শী মহুয়া ও মনি। ওরা দুবোন। দুই বোনের গায়েই গোলাপি জামা আর মেরুন সেলোয়ার। মহুয়া বলে- ও দাদী উই যে বটগাছ অহানে গ্যালে বোলে আর গাঙ ভাঙবে না। জমিলা বলে- উরি সোনা ববু। এসব গপ্পো তোমাগো কয় কেডা? কাশেম ওঝার পোলা ফসসা লিকলিক্কা জামাইললা? অর বাপে বটগাছের গোড়ায় সোনার নৌকা আর বৈঠা পুইত্তা থুইয়া গ্যাছে? অইসব কতা তো বহুবছর ধইরা হোনতে আছি। কাশেম ওঝা কইতে- অর বাপের কতা। তয় তোমরা এই ডাঙ্গোর ডোঙ্গোর মাগীরা গাঙ্গে নাইতে আইছ কী ভাতার ধরনের নেশায়? মহুয়া আর মনি হিহি করে হেসে উঠে বলে- ক্যা বুড়ি তুমি আইলে কোনো দোষ নাই। আর মোরা আইলে দোষ? বুড়ি বলে-
দোষই তো। মুই অইলাম গিয়া বুড়ি। মোর এই হুল্ডা আমের নাহান ঝোলা দুদ দেইককা কোনো ব্যাডার কিছু অয়! আর তোরা গাঙ্গে নাইয়া ভিজা কাফুরে যেসময় রাস্তায় উটপি তোগো অই ডাসা গইয়ার নাহান দুদ দেইককা ব্যাডাগো হোল খাড়াইয়া যাইবে। অমনি মনি বলে – ছি! বুড়ি কী খারাপ! দেক আফা! জমিলা মুখ টিপে হেসে বলে – ক্যা ভাতারে যেকালে ধইররা টেপপে হেকালে মনে হয় তোমরা সুক পাবা না? নাকি বিয়া ববা না মাগীরা? অমনি দুইবোন বলে- এই খচ্চর বুড়ি তুমি যাও। তুমি জানো না চোত্তির মাসে পুহাইরের পানি দই অইয়া যায়? তহেলে মোরা নামু কোমনে? আর পুহইরের পানিতে শরীল ঠান্ডা অয়? গাঙ্গে না নামলে মনে কয় শরীল জুড়ায় না। গায়ের আগুন কাডে না। তয় নাইয়া উইট্টা বড় একটা হুগনা গামছা পেঁচাইয়া বাড়ি যামু।

০২.

সোনাডাঙ্গা, নথডোবা নদীর তীরবর্তী এক শ্যাম ররণ গা। গায়ের দুই দিকে দুই নদী। আছে স্কুল, মাদ্রাসা, বাজার। মাটির চওড়া রাস্তার দুই ধারে সারি সারি রেইনট্রি গাছ। এর ফাঁকে ফাঁকে আছে ভাঁটফুল। গায়ের অধিকাংশ লোক, কৃষক, দিনমজুর, গোয়াল। আছে কিছু শিক্ষিত লোকও। তারা বরিশাল শহরে চাকরি -বাকরি করে। আছে কিছু হাইস্কুল ও প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক -শিক্ষিকা, মসজিদের ইমাম ইত্যাকার বিভিন্ন পেশার লোকজন। নথডোবার অইপাড়ে চরহোগলা গ্রাম। আর এই পাড়ে সোনাডাঙ্গা। যেন দুটি গ্রাম নদীর তীরবর্তী দুন বোন। এক বোন আরেক বোনের দিকে নদীর ওপার থেকে তাকিয়ে থাকে।

অইপাড়ে চর পরছে। আর এই পাড়ে নদী ভেঙে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু নদীর তীরবর্তী গৃহস্তরা কী এক অমোঘ মায়ায় বাঁধা পড়ে আছে। নদী ভাঙতে থাকলেও বেশিদূর গিয়ে তারা ঘর-বাড়ি বাঁধে না।

এই সোনাডাঙ্গা গায়েরই এক কৃষক আ: রশিদ হাওলাদার। বেশ স্বচ্ছল কৃষক তিনি। বাপের কাছ থেকে জমি পেয়েছিলেন দশ বিঘা। কৃষি কাজ করে, গরু পুষে, নদীতে মাছ মেরে সংসারের সচ্ছলতা ধরে রাখার পাশাপাশি কিনেছে আরও কিছু জমি। কিন্তু নদীর গতিপথে বড়ই শঙ্কিত আ: রশিদ।

সন্ধ্যার পরে লাল চা খাওয়ার অভ্যাস আ: রশিদের।
একটা লাল মাঝারি সাইজের লাল মগে চা নিয়ে আসে মতিজান বিবি। বিবি সাহেবার গায়ের রঙ কালো। কিন্তু তার বড় ঢলঢ্লা চোখ, পুরু কমলা কোয়ার মতো ঠোঁট আর কালো কোঁকড়াচুলে লাবণ্য ঝরে পড়ে। মতি বিবি একটা প্লাস্টিকের বাটিতে মুড়ি নিয়ে এসে বলে- নেন উরুম ভাজছি আইজগো। চা আর উরুম খান। আ: রশিদ বলে- আর এই ইরি চাউলের উরুম ভাল্লাগে না। মায় গঞ্চি ধানের উরুম ভাজদে। খাইতে এককালে মিডা লাগদে। এক বাডি উরুম সইশ্যার তেইল দা মাইক্কা খাইয়া হালাইতাম। মতিজান বলে- আহারে সোনায় ময়না মাজেদার বাজান! গুঞ্চি ধান পাইবেন কোম্মে? যেইয়া আছে হেইয়াই খান।

মতিজান পান বানিয়ে স্বামীর হাতে দেয়। পান মুখে দেয়ার পর মতিবিবি স্বামীকে বলে- এট্টা কতা কই? আমনেহ রাগ অইবেন না তো? আ: রশিদ বউয়ের গায়ে হাত তোলেনা সহজে। এমনকি মন্দ কথাও খুব কমই বলেছেন। রেগে গেলে বে আক্কেল মেয়েছেলে বলে বলে বকা দেয়। আর কাছে নেয় না এক সপ্তাহ। মতিজানের যেমন পান ছাড়া চলে না। তেমনি স্বামী সোহাগ ছাড়াও চলে না। তাই রাশভারি স্বামীকে মতিজান সামলে চলে।

আস্তে করে বিবিজান বলে- কইছেলাম যে গাঙ্গের যে দশা হ্যাতে তো মনেকয় জমিজোমা সবই যাইবে অর প্যাডে। হেরচাইক্কা জমিজোমা বেইচ্চা মোর বাপের বাড়ির দিক যাইয়া বাড়ি উডাইলে অয় না? আ: রশিদ অট্টহাসি দিয়ে বলে- তোমার কী মনে লয়? বাপ-দাদার ভিডা ছাইড়রা আমি ঘর-জামাই থাকমু! গাঙ রইছে এহোনো দশ ক্রোশ দূরে। আর গাঙ্গের পাড়ের জমি কেনবেই বা কেডা? মতিবিবি বুজতে পারে- স্বামীর সাথে সে পারবে না বাহাসে। তাই চুপ করে কালবৈশাখী নামার আগের আকাশের মতো থমথমে মুখ নিয়ে নিজের কাজে মন দেয়।

০৩.

খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে ডাল আর গুড়া বেলে মাছের চর্চরী দিয়ে বেশ তৃপ্তি সহকারে ভাত খায় আ:রশিদ। নান্টু আর মন্টু এই দুই জমজ পুত্র ফিরেছে মসজিদ থেকে। সকাল ছয়টায় তারা মসজিদে যায় কোরান তেলাওয়াত শিখতে। সাজেদা আর মাজেদা যাচ্ছে স্কুলে। আ: রশিদ মাছ ধরার জাল হাতে নেয়। অমনি মন্টু বলে- আব্বা মাছ ধরতে যাবা গাঙ্গে? মুইও যামু। নান্টু বলে- তুই তো হাতরাইতে পারো না। তুই কি হরতে যাবি? আব্বা মুই যামু আমনেহর লগে মাছ ধরতে। নদীর তাজা মাছ না হলে আ: রশিদের জিহবায় তৃপ্তি আসে না। গত শুক্রবার জালে পড়েছিল শিলইন মাছ, রামছোচ মাছ, আর কেজি দুয়েকের একটা পাঙ্গাশ মাছ। মতি বিবি রেঁধেছেও শুকনো মরিচ বাটা আর বেশি করে পেঁয়াজ -রসুন দিয়ে। পেট পুরে খেয়েছে তিন ছেলে, দুই মেয়ে আর স্বামী-স্ত্রী। সন্ধ্যায় বেড়াতে আসার কথা আ: রশিদের বড় বোন কুলসুম বেগমের। ও মাজেদার বাপ বালটি কী বড়োডা দিমু না ছোডডা? হাঁক দিয়ে মতিবিবি জিজ্ঞেস করে। আ: রশিদ বলে- দেও বড়ডাই। কী আছা কপালে দেহা যাউক। বুজি আইবে এট্টু মাছ-মাংস, পিডা-পায়েস তো খাওয়াবা। হেই কবে আইছে আমার বুইনডা!

প্রথম জাল ফেলেই একটা বড় বক থরিনা আর একটা ট্যাংরা মাছ পায়। নান্টু বাপের সাথে মাল কাছা দিয়ে মাছ ধরে বালতিতে ভরছে। মন্টুকে নিষেধ করেছে দূরে যেতে। কিন্তু নদীর ভেতর সেও খুব যেতে চায়। দ্বিতীয় বার জাল ফেললে পাঁচটা রামছোচ মাছ, তিনটা ভাটা মাছ পড়ে। আ: রশিদ মনে করে আর দুই ক্ষেপ জাল মেরে চলে যাবে। যা মাছ পেয়েছে একেবারে কম নয়।
হাটবার এলে মাঝারি সাইজের দুইটা ইলিশ কিনবে। তৃতীয় বারে একটা দুই কেজি ওজনের আইড় মাছ পড়ে। সেই মাছ নিয়ে খুব আনন্দ করে কালো লিকলিকে নান্টু। নদীতে যারা গোসল করতে এসেছে সকালে তারা বলে- ও মেয়া এলহা এলহা খাবা ক্যা? মোগো দেবা না? মোরাও তো দেকছি। আ: রশিদ বলে- আবা বাড়তে। হগলডি মিইল্লা খাইলে স্বাদ বেশি। হ্যাতে কী ভাগে কোম পড়ে? মাছ নিয়ে যখন বাড়ি যাবে তখন খোঁজ পড়ে মন্টুর। প্রথমে খেয়াল করে নান্টু। নান্টু একটু নাদুসনুদুস, পেট মোটা। দুই ভাই খুব বিচ্ছিন্ন থাকে না। মন্টুকে না দেখেই নান্টু বলে আব্বা ভাই কই! আ: রশিদ বলে- বাড়তে গ্যাছে নাহি? তুই দৌড় দিয়া বাড়তে যা। হন্যে হয়ে ছোটে নান্টু। বাড়িতে প্রবেশ করেই মতিবিবিকে জিজ্ঞেস করে – ও মা ভাই বাড়তে আইছে? মতিবিবি আর কুলসুম বেগম তখন বাড়ির দাওয়ায় বসে পান চিবাচ্ছে। ছেলের কথা শুনে মা বলে- ক্যা বাড়তে আইবে ক্যা? গ্যালে দেহি তোগো লগে। নান্টু কেঁদে বলে- ওমা ভাইরে পাই না! মতিবিবি চিৎকার অ কী সব্বনেশে কতা কও তুই নাউন্টা? ক্যা মন্টু গাঙ্গে নামছেলে? এর ভেতর দৌড়াতে থাকে মতি বিবি আর কুলুসুম। বিলাপ করতে থাকে- আমার পুতেরে কই পামু? এই রাক্কুইসসা গাঙ্গের প্যাডে কী যাইবে আমার পুত! কুলসুম বেগম বলে- চুপ কর। মার মোহে অলক্কী কতা কইস না।

নদীতে গোসল করতে আসা সকল মানুষ খুঁজতে নেমে যায় জলে। আ: রশিদ নদীর তীর ধরে বহুদূর অব্দি খুঁজতে শুরু করেছে। কিন্তু কোথাও কোনো চিহ্ন পাওয়া যায় না। এতিম খানায় মতি বিবি পঞ্চাশ জন এতিমের খাবার পাঠায়। সোনাডাঙ্গা জামে মসজিদে মিলাদ পড়ায় আ: রশিদ। তিনদিন পর সকল আশা ছেড়ে দেয় মতিবিবি এবং আ: রশিদ।

০৪.

পটুয়াখালী তালবাড়িয়া গ্রামের লোহালিয়া নদীর তীরে বসে আছে মতিবিবি, কুলসুম বেগম আর নান্টু। সোম্য, শান্ত স্রোতধারার নদী লোহালিয়া। কুলসুম নিয়ে এসেছে সাথে করে ওদের। চুপচাপ বসে দেখছে মতিববি আর নান্টু। ছোট -বড় নৌকা আসা-যাওয়া করে। এপাড় থেকে ওপাড় দেখা যায়। কোনো পাড়ই তেমন ভাঙছে না। বইছে ঝিরিঝিরি বাতাস, যা শরীর – মন সবকিছু ঠান্ডা করে দেয়। মতিজান বলে- দ্যাহো বুজান তোমাগো গাঙডা কত্ত ঠান্ডা। তোমাগো জমিজমা কিচ্ছু ভাঙ্গে না। মানুষ ডোবে না। আর মোগো নথডোবা! কত্ত মাইনসের বাপ-দাদার ভিডা যে নেলে! শ্যাষে নেলে মোর কইলজার টুকরাডারে। তোমার ভাই হেরপরও বুজি অই গাঙ্গের পাড় থুইয়া কোনোহানে যাইবে না! ওনার পরাণডা মোনে কয় গাঙ্গের মইদ্দে পোঁতা আছে। চারদিন পর ভাঙা মন আর শরীরে মতিজান ফেরে। ফেরার সময় নথপডোবা নদীর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে বলে- তুই খুনি, তুই রাক্ষুসী! তুই আমার পুতেরে খাইছস!

০৫.

আঠারো বছর পর এক বিকেলে নথডোবার পাড়ে বসে আছে নান্টু। শরীর -মন জুড়ানো বাতাস নদীর পাড়ে। তীর ছাপিয়ে ঢেউ এসেছে। একেবারে ভর-ভরন্ত যৌবন। দেখলে মনে হয় সাত মাসের পোয়াতি নারী। চেহারার উপচে পড়েছে লাবন্য। বুক যেন সাইজে একেবারে চুয়াল্লিশ। প্রকৃতির এই বিশালতা মানুষকে যেমন সব দু:খ ভুলিয়ে দেয় তেমনি মানুষের অসহায়ত্ব যেন ধরা পড়ে পলে পলে। নান্টুর বাবা মারা গিয়েছিল সেই যখন সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে তখনই। কেবল বড় বোনের বিয়ে হয়েছে তখন। তারপর সংসারের হাল ধরেছে নান্টু। লালু, মাজেদা, মা সবাইকে দেখেছে কৃষি কাজ করেই। এখন নিজেরও সংসার হয়েছে। নান্টু নদী আর নিজের সাথে কথা বলাতেই যেন ব্যস্ত ছিল। হঠাৎ পেছন থেকে ডাক নান্টু? কিন্তু সেইদিকে তাকিয়ে নান্টু চিনে উঠতে পারে না। চেনতে পারোনায় না? আমি তোর বন্ধু কবীর। একসাথে সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত পড়লাম। আর তুই আমারে চেনো না? তারপর দুই বন্ধুর রাজ্যের গল্প। কথায় কথায় কবীর জানতে পারে নান্টুর অন্য ভাইবোনরা বাপের ভাগের জমি বিক্রি করে যার যার পাওনা বুঝে নিয়ে চলে গেছে নান্টুরকাছ থেকে। নান্টুই রয়ে গেছে নদীর তীর আঁকড়ে ধরে। এর কারণ জিজ্ঞেস করলে নান্টু জানায় -এই গ্রাম, প্রতিবেশী আর এই নদী ছেড়ে তার পৃথিবীর কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না। কবীর যেতে যেতে ভাবে- নদীর তীরবর্তী মানুষগুলো এত আবেগপ্রবণ আর বোকা কেন হয়! কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা হওয়ার সুবাদে অনেক মানুষকেই সে এমন দেখেছে। নদী ভাঙতে থাকে কিন্তু সেই নদী ছেড়ে খুব বেশি দূরে এরা যায় না। একেকজন সাত-আটবার ভাঙনের শিকার হয় এরা। কবীর নিজের মনে বলে- বড়ই বোকা, অদ্ভুত আর অসহায় এরা!

০৬.

কাকাশুরা বাজারে লালু মিয়ার কাপড়ের দোকান। সাথেই রয়েছে ছোট একটা চায়ের দোকান। এই দোকানটির মালিকও লালু মিয়া। লোকজন যারা আসে কাপড় কিনতে তারা চা আর বিস্কিট ও খেয়ে যায়। দোকানে লালু আর তার শ্বশুর দুজনেই বসে। আ: সালাম বেপারি আসে মেয়ের থ্রিপিস আর বৌয়ের শাড়ি কিনতে। এসে বলে ও জব্বার ভাই তা লালু মেয়ারে দোহান তো এট্টা কইররা দেছ জব্বর। তা এই দোহান কী মাইয়া জামাইরেই দেবা নাকি পোলারও ভাগ আছে? সালাম মিয়া বলে- না এ দোহান তো জামাইরই। জামাই বাপের সম্পত্তি থেইকা সবচাইক্কা ভালো তিনডা জমি বেইচ্চা সাত লাক টেকা আনছে আর আমি দিছি তিনলাখ। এই দিয়া ব্যবসা শুরু। তয় লালু বাবাজি ব্যাবসা বোঝে বেশ ভালো। অই চায়ের দোহানেই মাসে ওডে পনেরো আজার। কাফুরের দোহানে তো কোনো কোনো মাসে তিরিশ আজার টাহাও ওডে। জামাই জমি বেইচ্চা আইননা বড় বুদ্দিমানের কাম করছে। জামাইর ভাই নান্টু বাবাজিরেও কইছেলাম – জমিজোমা বেইচ্চা কাগাশুরার সাইডে আইয়া একটা বাড়ি কর। অল্প-বিস্তর পুঁজি লইয়া একটা মুদি দোহান দেও। কার কতা কেডা হোনে। একফির তো বাড়ি ভাঙছে। ভালো দুইডা জমি ধরছে। এফিরের বাড়িই মনে লয় ভাঙবে। তিনডা মাইয়াপোলা দেছে আল্লায়। মানুষ করন লাগবেনা? আমি তো অগো দূরের কেও না। আমার ইস্ত্রি অগো চাচাতো ফুবু। লালু বলে- থাউক আব্বা এসব কতা বাদ দেন। এসব কতা ভাইজানরে বহু কইছি। হে আমারে কয়- তুই চালাক-চতুর মানুষ। তুই আয়-উন্নতি কর। মোর কতা বাদ দে। নসীবে য্যা আছে হেইয়াই অইবে। মুইও আর কিছু কই না।

০৭.

সোনাডাঙ্গা জামে মসজিদে আসরের নামাজ আদায় করে নান্টু মিয়া নদীর তীরে যায়। বসে থাকে অপলক দৃষ্টিতে বেশ কিছুক্ষণ। আগে যেখানে বাড়ি ছিল- সেটা পুরোপুরি নদীর প্রায় মধ্যিখানে। ধরেছে সরিষা খেত এবং তিশি খেত। হয়তো বা এই মৌসুমটাই এই জমি দুটোর ফসল পাবে। এই নদী যেন তারে সর্বহারা করতে পূর্ব পুরুষের কসম খেয়েছে। নদীর তীরে একান্তে নিরিবিলি কিছুক্ষণ বসে। মানস চোক্ষে দেখতে পায়- বিলীন হয়ে যাওয়া বাড়ি-ঘর, শৈশব। চোখে ভেসে ওঠে একের পর এক দৃশ্যপট। অই তো অহানে মুই আর নান্টু ডাঙ্গুলি খেলাইতাম, অহানে মায় ধান সেদ্দ কইররা হুগাইতে। উই উই পাশে আব্বায় মাছ ধইররা আনলে মায় হাজিতে কইররা মাছ বাছতে। সব এহন গাঙ্গের প্যাডে। এসব ভাবনা ভাবতে ভাবতেও কখন যে নথডোবার তীরবর্তী বাতাস নান্টুর শরীর মনকে জুড়িয়ে পরম প্রশান্তি এনে দিয়েছে নান্টু টেরও পায়নি।
সুখ-দুঃখের এক ক্লান্তিকর অনুভূতি নিয়ে ধীরে ধীরে নান্টু বাড়ির পথ ধরে। বাড়ি এসে শোনে -বড় পুত্র রফিকের ডাইরিয়া।

রফিক এবার ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছে। খুব লম্বা নয় সে। কিন্তু মায়ের মতো ফর্সা রঙ আর তার দাদার মতো সুঠাম দেহের অধিকারী। নম্র, ভদ্র এবং খুব ভালো ফুটবল খেলোয়াড় হিসেবে এলাকায় নাম আছে। সেদিন সন্ধ্যায়ও রফিক ফুটবল খেলেই ফিরেছে। প্রথমে স্যালাইন দেয় রফিকের মা রামিছা খাতুন। তারপর থানকুঁড়ি পাতার রসও ছেচে দিয়েছে। কিন্তু এরপর শুরু হয় বমি। রামিছা নান্টুকে বলে-শিগগির সোনাডাঙ্গা বাজারে যাইয়া হানিফ ডাক্তাররে ভোলাইয়া লইয়া আয়েন। তখন রাত আটটা বাজে। নান্টু যায় ডাক্তারের চেম্বারে। হানিফ একজন এম.এল. এ ডাক্তার। গ্রামের মানুষের বাতের ব্যামো থেকে শুরু করে জ্বর -কাশি আর ফোঁড়া ওঠায় সেই ভরসা। ছোটখাটো এই ডাক্তার পরিদর্শন ফিও খুব বেশি নেয় না। আসতে আসতে রাত নটা বেজে যায়। ব্যবস্থাপত্র আর ঔষধ দিয়ে ডাক্তার চলে যায়। স্যালাইন চালু রাখতে বলে যায়।

রাত এগারোটায় শুরু হয় রফিকের বিরতিহীন বমি। দুই মিনিট পরপরই বমি করতে থাকে। আর সাথে চলতে থাকে পানির মতো মলত্যাগ। রাত চারটায় রফিক নিস্তেজ হয়ে পড়ে। নান্টু আর রামিসা দুহাত তুলে পরওয়ারদিগারের কাছে প্রাণ ভিক্ষা চায়। কিন্তু স্রষ্টা বুঝি তার ফায়সালা করেই রেখেছিলেন – ভোর সাড়ে পাঁচটায় রফিক চলে যায় পরপারে।

মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে নান্টু। চোখেও আর পানি নেই। সেদিন ছিল শুক্রবার। এলাকার মসজিদে মাইকিং হতে থাকে -বাদ জুমা স্কুলের মাঠে জানাযা। প্রতিবেশী যুবক এবং রফিকের বন্ধুরা এসে জিজ্ঞেস করে- চাচা কোনহানে থুইবেন রফিকরে? গাঙ তো আধা মাইল দূরে। বাড়ির দরোজায় দাদীর পাশে থুইবেন? দাদাজানের কবর তো গাঙ্গের প্যাডে। নান্টু একটা চিৎকার দিয়ে বলে- ওরে বাবারা আমারে কিছু জিগাইস না। তোরা যা পারো কর।

০৮.

বাটনা সরকারি প্রাথমিক স্কুলের পাশেই দুই শতাংশ জমির ওপর একটা কাঠের আর টিনের ঘর তুলে দিয়েছে রামিসার বাবা। সোনাডাঙ্গার তিন গ্রাম পরে বাটনার অবস্থান। এই গ্রামেও আছে স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদ। অনেকটাই সোনাডাঙ্গার মতোই। নাই কেবল রাক্ষুসী নদীর সন্ত্রাসী কার্যক্রম। নান্টু হাওলাদার সব হারিয়ে যখন নি:স্ব তখনই রামিসার বাবা এগিয়ে এসেছে। রামিসা বড় পুত্রের শোকে একেবারে নিস্তেজ হয়ে গেছে। তারপরও ভাঙা বুকে সে হরেক গাছ লাগায়। ঘরের সামনে যে ডোবার মতো পুকুরটা আছে তার চারিপাশে মেহগনি আর নারকেল গাছ লাগিয়ে দিয়েছে। বাকি দুই ছেলেমেয়ে রাজীব আর রাবেয়াকে মানুষ করতে চায় খুব ভালো করে। প্রতিদিন শেষ রাতে উঠে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে বড় পুত্রের জান্নাত প্রার্থনা করে চোখের জলে। নিজের গয়না বেঁচে কিনেছে একটা গাই গরু। আছে গোটা ছয়েক হাঁস আর আটটা মুরগী।
নান্টু হাওলাদারকে স্কুলের শেষ প্রান্তে একটা মুদি দোকান দিয়ে দিয়েছে। বই – খাতা, কলম-পেন্সিল, ফাইল এর সাথে সাথে বিস্কুট, চানাচুর, চাল-ডাল এসব পণ্যও আছে। কলিজায় একটা দাগ নিয়েও জীবন যেন কিছুটা সুখের পশরা সাজিয়েছে।

যখনই নান্টু হাওলাদার নিজের সাথে একা হয় মন কাঁদে সোনাডাঙ্গা গাঁয়ের জন্য। নথডোবার তীরবর্তী বাতাসের জন্য তার মন আকুপাকু করে। কিন্তু রামিসার জন্য সহজে ওমুখো হতে পারে না। লুকিয়ে দুইদিন গিয়েছে নথডোবার পাড়ে। সন্ধ্যা হলেও নদীতে নেমে গোসল করে শরীর জুড়িয়ে এসেছে। আর তীরে দাঁড়িয়ে মনে মনে আশার বীজ বপন করে ভেবেছে- চর জাগবে একদিন নদীর বুকে। তার জীবদ্দশায়ই সব জমি ফিরে পাবে। আবার পৈতৃক ভিটায় বাড়ি তুলবে সে। শ্বশুরের গ্রামে ঘরজামাই হয়ে থাকবে না।

০৯.
প্রায় তিনমাস নানা ব্যস্ততায় সোনাডাঙ্গায় আসা হয় না নান্টু হাওলাদারের। সেদিন সে রামিসাকে বলেই বের হয় নান্টু। আর এও বলে আসে আজ সে নিজের গাঁয়ের কোনো স্বজন বা বন্ধুর বাসায় রাত কাটাবে। ফিরবে না বাড়িতে। গাঁয়ের প্রতিবেশীরা সকলেই নান্টু হাওলাদারকে দেখে খুব খুশি হয়। ঘরে নিয়ে বসায়। আদর-আপ্যায়ন করে। কেউ রঙ চা-মুড়ি খেতে দেয়। কেউ আবার আচার, আমসত্ত্ব দেয়। বুড়ী চাচীরা পান বানিয়ে হাতে দেয়। ফোরকান হাওলাদার বলে- নান্টু ভাই আইজগো রাত্তিরে মোগো ঘরে থাকপা। য্যা জোডে হেইয়াইদ্দা দুইডা ডাইল ভাত খাবা। তুমি এককালে মোগো ভুইল্লাই গ্যাছো। মোরা আপন ভাইর নাহান বড় অইছি এই গাঁয়ে। হে কতা ভোলো ক্যামনে? হউরের গেরামে যাইয়া সুক পাইয়া মোগো ভুইল্লা যাইও না। ফোরকানের মা বলে- না আইজগো নাউন্টা এহানে থাকপি। ও বউমা তোমার মুরহার পাড়া আন্ডা কয়ডা ভুনা কর আর ডাইল রান্দো ঘোনো কইররা। নান্টু সকলের আদরে-স্নেহে একেবারে প্লাবিত হয়ে যায়।

সেদিন ছিল জুলাই মাসের সতেরো তারিখ। বর্ষায় দুকূল ছেপে নদী যেন সমুদ্রের রূপ পরিগ্রহ করেছে। তখন নদীতে জোয়ার এসেছে। আকাশে ভরা পূর্ণিমার চাঁদ। প্রধান রাস্তা ধরতে আর তিনটা জমি বাকি আছে। গাঁয়ের লোকের আদর আর নদীর রূপের মিথষ্ক্রিয়ায় নান্টু হাওলাদারের মনও আবেগের জোয়ারে পরিপূর্ণ। সে নথডোবার তীরে দাঁড়িয়ে নদীর সাথে কথা বলতে শুরু করে – হুউ তোরে না দ্যাকলে প্রাণে মরি
দ্যাকলে পরে জ্বইললা মরি। তুই আমার ভাইডারে খাইলি। আমার ভিটা-মাটি, বাপ-মার কবর, পোলার কবর সব নিলি। আমারে গাঁও ছাড়া কললি। অথচ হেই ছোডকাল থেইকা তোর তীরে না আইলে আমার ভালো লাগে না। তোর বুকে ঝাঁপ না দেলে আমার শরীল ঠান্ডা অইতে না। একদিন নাইতে নাইতে মালা জেঠী হের বোহের লগে মোরে ঠাইসসা ধরছেলে। মোর নুনুতে আত দেছেলে। আসলে রঞ্জন চাচায় গ্যালহে ভারত। চাচী চাইতে খায়েশ মিডাইতে। মোর আইলে জ্বর। মায় কয় গাঙ্গের পাড়ের বদ বাও লাগছে মোর গায়। মুই তো জানি কোন বাও লাগছে। তোর বোহেই মোর জীবনের এই গোপন ঘটনা ঘইট্টা গ্যালে। মন্টু ডোবার পরও তোর তীরে না আইয়া থাকতে পারি না! মায় মোরে গাঙ্গে নামতে দেতে না। কিন্তু মুই চুরি হইররাই গাঙ্গে নাইতাম। বিয়ার পর মুই আর বউ বেইন্নারাইতে আইয়া তোর বোহে হাতরাইতাম। বউ ডরে মোরে প্যাচাইয়া ধরতে বারংবার। তুই একটা রাক্ষুসী গাঙ, কিন্তু এত সোন্দর আর এত মায়া ক্যান তোর? না তোর ধারে থাহন যায় আবার না তোরে ছাইড়রা থাহন যায়! এইসব বলতে থাকে যখন প্রকান্ড একটা ঢেউ আসে। নান্টু দাঁড়িয়েছিল একটা প্রকান্ড ফাটলের ওপর। হঠাৎ ও মা আ আ… একটা শব্দ মহাকালের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়।
**************************************

Leave a Reply