হারিয়ে আবার খুঁজি
বিচিত্রা সেন
প্রশিক্ষণ ক্লাস থেকে বেরিয়ে নিলয়কে দেখে থমকে দাঁড়ায় পৃথা। একদম আগের মতোই রয়ে গেছে সে। কতবছর পর দেখলো সে তাকে? মনে মনে হিসাব করে পৃথা। চব্বিশ বছর! এতটা সময় চলে গেছে? কখন গেলো এতটা সময়! আহা! কী একটা সময় ছিল ওদের। কখনো কি ভুল করেও ভেবেছিল একদিন ওরা দুই ভুবনের দুই বাসিন্দা হবে। কিন্তু এভাবে থমকে দাঁড়িয়ে এসব কথা ভাবলে লোকে কী ভাববে? একটু হেসে সে নিলয়ের দিকে এগিয়ে যায়। নিলয়ও একটু এগিয়ে আসে। পৃথাই প্রথমে কথা বলে। জানতে চায় কেমন আছে নিলয়। নিলয় হেসে বলে,
-এই মুহূর্তে খুব ভালো আছি।
পৃথা বুঝতে পারে ওর কথার ইঙ্গিত। বুকের ভেতর কেমন একটা ধাক্কাও খায়। হু হু করে মনে পড়ে চব্বিশ বছর আগের সেই উথালপাথাল দিনগুলি। একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস যেন চোরাপথে কোন ফাঁকে বেরিয়ে যায় বুকটাকে বিদীর্ণ করে। নিলয় খুব আন্তরিক স্বরে বলে,
-চলো,কোথাও বসি। তোমাকে একটু ভালো করে দেখি।
পৃথার কথা বাড়াতে ইচ্ছে করে না। ও এসেছে যখন কোথাও তো বসতে হবেই। কিছু কথা তো বলতে হবেই। এখন তো আর ছেলেমানুষি রাগের সময় নেই। পঞ্চাশোর্ধ রমণী সে। ছাব্বিশ বছরের তরুণীর মান অভিমান এখন আর তাকে মানায় না। তাই নিলয়ের কথার দ্বিমত না করে সে বলে,
-তোমার শহর,তোমার এলাকা। তুমিই ভালো জানো কোথায় বসবে। আমি তো এখানে কিছু চিনি না।
নিলয় হেসে বলে,
-হুম,আমার সাথে এসো। আমিই নিয়ে যাবো তোমাকে।
বলে নিলয় একটা মোটরবাইকের দিকে এগিয়ে যায়। এতক্ষণে পৃথা খেয়াল করে নিলয়ের ডানহাতের আঙ্গুলের ফাঁকে চাবি। বুকটা ধক করে ওঠে তার। সে কী! নিলয় কি ওকে মোটরবাইকে বসিয়ে নিয়ে যাবে নাকি? এইবয়সে ও নিলয়ের সাথে মোটরবাইকের পেছনে বসে ঘুরবে? কেউ দেখলেও তো একটা বিড়ম্বনা। তাছাড়া এখন মোবাইলের যুগ। কে কোনদিক থেকে ছবি তুলে সোশাল মিডিয়ায় দিয়ে দেবে তার ঠিক আছে? নিলয় খুব স্বাভাবিকভাবে বাইকে বসে পৃথাকে বলে,
-ওঠো ওঠো,সংকোচের কিছু নেই। তোমাকে নিয়ে আমি কোথাও পালিয়ে যাবো না। তোমাকে এক কাপ কফি খাইয়ে আবার তোমাকে তোমার হোস্টেলে দিয়ে যাবো।
পৃথা একবার চারপাশে চোখ বুলায়। আশেপাশের লোকজন কথা বলতে বলতে তাদের দিকে তাকাচ্ছে। এদের মধ্যে তার সাথে প্রশিক্ষণরত কয়েকজন শিক্ষকও আছেন। সে আর কথা না বাড়িয়ে নিলয়ের পেছনে উঠে বসে৷ শিক্ষকদের মধ্যে কয়েকজন খুব অবাক হয়ে তার দিকে তাকান। সে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ওদের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ে। এমন ভাব করে যেন সে তার কোনো আত্মীয়ের সাথে কোথাও যাচ্ছে। একটা চাইনিজ রেস্তোরাঁর সামনে নিলয় বাইক থামায়। ওর পিছু পিছু পৃথা দোতলায় উঠে জানালার পাশে একটা সিটে বসে৷ হঠাৎ করে পৃথা আবিষ্কার করে নিলয় আসার পর থেকে তার যেন সমস্ত সত্তা বিকল হয়ে গেছে৷ সে যেন নিলয়ের কথামতো সব কাজ করছে। ভাবনাটা মাথায় আসতেই সে নড়েচড়ে বসে। আত্মসম্মানটা যেন টন টন করে ওঠে। সে খুব গম্ভীর হয়ে নিলয়ের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়–
-তারপর,হঠাৎ আমার সাথে দেখা করতে চাওয়ার কারণ? আমার ফোননম্বরই বা পেলে কোত্থেকে?
নিলয় হাসে। হাসতেই থাকে । হাসলে ওকে এত সুন্দর লাগে পৃথার সবকিছু আউলা হয়ে যায়। আগেও এমন হতো ওর। নিলয়ের হাসি ওকে পাগল করে দিতো। ইচ্ছে করতো নিলয়কে বুকে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু সেই দিন তো কবেই গত হয়েছে। এখন ওসব ভেবে কী আর হবে! সে খুব রাগত স্বরে বলে,
-আরে, এভাবে হাসছো কেন? আমি তোমাকে একটা প্রশ্ন করেছি না?
নিলয় হাসতে হাসতে বলে,
-তুমি কিন্তু ঠিক আগের মতোই রেগে যাচ্ছো। তবে সত্যি বলছি,রাগলে তোমাকে ঠিক আগের মতোই সুন্দর লাগে। আর শোনো,তুমি কিন্তু একটুও বুড়ো হওনি। তোমাকে দেখে যে কেউ তিরিশ/পঁয়ত্রিশ ভাববে।
প্রশংসা শুনতে ক্লান্ত অবস্থায় ভালোই লাগে পৃথার। কিন্তু উপরে সেটা বুঝতে দিতে চায় না৷ কথা ঘোরাতে বলে,
-কই,বয় বেয়ারাকে ডাকো। অর্ডার দিই। খেতে তো হবে কিছু একটা।
নিলয় ওয়েটারকে ডেকে দুটো থাইস্যুপ আর চিকেন ফ্রাইয়ের অর্ডার দিয়ে বলে,
-এখন দুই গ্লাস অরেঞ্জ জুস দিন। খাওয়ার পরে দুটো কফি দেবেন।
ওয়েটার চলে গেলে পৃথা বললো,
-তুমি কী করে জানলে আমি তোমার শহরে এসেছি?
নিলয় হো হো করে হেসে বললো,
-তোমার তো দেখি বয়সের মতো বুদ্ধিও বাড়েনি। নেটের দুনিয়ায় কারো কোনো খবর অজানা থাকে?
পৃথা ভ্রু কুঁচকে বললো,
-কিন্তু তুমি তো আমার সাথে এফবিতে এড নেই।
নিলয় চোখ গোল গোল করে কৌতুকমিশ্রিত স্বরে বললো,
-কিন্তু আমার বন্ধুরা তো তোমার সাথে এড আছে। ওদের কাছ থেকে আমি তোমার সব খবরই পাই। ওদের কাছ থেকে জানলাম তুমি চৌদ্দ দিনের প্রশিক্ষণে এসেছো আমার শহরে। ওরাই ফোননম্বর দিলো। ভাবলাম একবার তোমার সাথে দেখা করি। তাছাড়া….
নিলয়ের তাছাড়া বলার ভঙ্গিতে বুকটা কেমন কেঁপে ওঠে পৃথার। মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে যায়৷ গলার স্বরও একটু কেঁপে ওঠে। বলে,
-তাছাড়া কী?
নিলয় আবারও হাসে। তারপর চোখটা পৃথার ওপর থেকে সরিয়ে কাঁচের দেয়াল দিয়ে বাইরের আকাশের দিকে রাখে। বাইরের প্রকৃতিতে তখন সন্ধ্যার আঁচল বিছানো হচ্ছে। কেমন উদাস হয়ে সে প্রকৃতি দেখে। পৃথার বুকের কাঁপুনি কিন্তু থামে না। নিলয় এতক্ষণ হাসছিল,তা অনেকটা ঠিক ছিল। কিন্তু ও যে উদাস হয়ে গেলো,এটাকে পৃথা ভয় পায়। কারণ পৃথা তো জানে,নিলয়ের জীবনের কঠিন সিদ্ধান্তগুলো সে উদাস হয়েই নেয়। যেমনটা নিয়েছিল চব্বিশ বছর আগেও। এসময় ওয়েটার এসে খাবার টেবিলে রেখে যায়। সেদিকে নিলয়ের কোনো খেয়াল নেই। পৃথার তো ফিরতে হবে হোস্টেলে। তাই সে আস্তে করে ডাকে,
-নিলয়..নিলয়…
নিলয় ঘাড় ফিরিয়ে তাকায় পৃথার দিকে। চোখে একরাশ বিষণ্ণতা। আস্তে করে বলে,
-জানো পৃথা,বিয়ে করেছি বিশ বছর। কিন্তু বাবা ডাক শোনা হলো না। হয়তো নিয়তির প্রতিশোধ।
পৃথা ঢোঁক গেলে। এরপর কী বলবে নিলয়? কেন সে এতবছর পর পৃথার মুখোমুখি? হঠাৎ করেই নিলয় পৃথার দুটো হাত চেপে ধরে,তারপর কাতর স্বরে বলে,
-আমার বাচ্চাটা আমাকে দিয়ে দাও পৃথা। তুমি তো জানো নিপুণের আসল বাবা আমি। আমি সেদিন ভুল করেছিলাম। তার দায়িত্ব না নিয়ে পালিয়ে এসেছিলাম। আসলে ওইসময় আমি বেকার ছিলাম। তাই সাহস করে কিছুই করতে পারিনি। তার প্রায়শ্চিত্ত বিশ বছর ধরে করছি। আমি আমার বাচ্চাটার মুখে বাবা ডাক শুনতে চাই। আমার স্ত্রীও বাচ্চা বাচ্চা করে আধাপাগল। ওকে আমি সব বুঝিয়ে বলবো। ও মানলে মানবে,না মানলে না মানবে। আমি তো অন্তত আমার মেয়েটার মুখে বাবা ডাক শুনতে পাবো।
পৃথা ছিটকে উঠে দাঁড়ায়। দুচোখে আগুন ঢেলে বলে,
-তুমি পাগল হয়ে গেছো। তাই কী বলছো নিজেই জানো না। নিপুণ তোমার মেয়ে হতে যাবে কেন? ও আমার মেয়ে। আমার আর আমার হাজবেন্ডের মেয়ে। তুমি নিঃসন্তান তো তাই পাগল হয়ে উল্টাপাল্টা বলছো। তোমার সাথে বসা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি চললাম।
বলেই ব্যাগটা নিয়ে পৃথা ছুটে বেরিয়ে যায়। রাস্তায় নেমেই সে একটা অটো পেয়ে যায়। তাতে উঠে বসতেই শুনতে পায় নিলয় তাকে চিৎকার করে ডাকছে। সে ড্রাইভারকে বলে,
-প্লিজ ভাই,একটু দ্রুত চালান। আমার দেরি হয়ে গেছে।
নিলয় নেমে এসেই দেখে পৃথার অটোটা ভিড়ের ভেতর মিশে গেছে। ওর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মনে পড়ে চব্বিশ বছর আগে একদিন এভাবে নিলয়ের মতোই আকুতি করে পৃথা জানিয়েছিল সে দুইমাসের অন্তঃসত্ত্বা৷ নিলয় যেন তাকে বিয়ে করে এ সন্তানের স্বীকৃতি দেয়। সেই রাতেই পৃথার শহর ছেড়েছিল নিলয়। অথচ প্রকৃতির কী অদ্ভুত প্রতিশোধ! আজ তার ভিক্ষার হাতকে কতটা ঔদ্ধত্যে ফিরিয়ে দিয়ে রাণীর বেশে চলে যাচ্ছে তার কন্যার মা, তার জীবনের প্রথম ভালোবাসা পৃথা। আর কাঙালের মতো দুহাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে।
***************************************
