পুচ্ছ-ধারী ময়ূরেরা|| শিল্পী নাজনীন
৪
মায়ের মৃত্যুর পর দাদাবাড়ির সঙ্গে সব সম্পর্ক একরকম প্রায় চুকেবুকেই গেছে মেঘার। বারিষও ও পথ মাড়ায় না আর। সেই কোন ছোটবেলায় বাবা মারা গেছিলেন, মেঘা তখন সবে দশে পড়েছিল, আর বারিষ তখনও ছিল মায়ের পেটে। ছয় মাস চলছিল তখন তনির। দিনটা এখনো স্পষ্ট মনে আছে মেঘার। কিছু স্মৃতি থাকে, যা ভীষণভাবে গেঁথে যায় মনের শার্শিতে, মোছে না কোনোদিন। সেদিনটাও তেমনই ছিল। প্রতিদিনের মতই স্কুলে গেছিল মেঘা। টিফিনের বিরতিতে স্কুলের মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে গোল্লাছুট খেলছিল অন্যদিনের মতোই। হঠাৎ স্কুলমাঠ লাগোয়া রাস্তা দিয়ে ধুলো উড়িয়ে একটা ট্রাক যেতে দেখল তারা। গাঁয়ের মেঠো পথে ট্রাক বড় স্বাভাবিক বস্তু ছিল না তখন। গাঁয়ের এবড়োথেবড়ো মাটির পথ ধরে ট্রাকটা চলছিল মন্থর গতিতে হেলে-দুলে, ধুলো উড়ছিল ধূ ধূ। তুমুল কৌতূহলে খেলা ছেড়ে তারা ট্রাকের পেছন পেছন ছুটছিল কিছুটা, ট্রাকের ড্রাইভারের পাশে অপরিচিত দুজন লোক গম্ভীর মুখে বসা। পথচলতি লোকজনকে তারা কোনো ঠিকানা জিগ্যেস করতে করতে এগোচ্ছিল, পেছন থেকে এটুকু শুধু বুঝতে পারছিল তারা। আরো হয়ত এগোত মেঘা আর তার বন্ধুরা, কিন্তু তখনই টিফিন শেষের ঘণ্টা বাজল ঢং ঢং। ট্রাক ছেড়ে পড়িমরি তারা ক্লাসে ছুট দিল তারা অতঃপর। বিজ্ঞান ক্লাস চলছিল তখন। বিভূতি স্যার পড়াচ্ছিলেন পদার্থের প্রকারভেদ আর আকার সম্পর্কে। স্যারকে ভীষণ ভালো লাগত মেঘার। স্যারের ক্লাসে অখণ্ড মনোযোগ থাকত তার বরাবর।
পঞ্চম শ্রেণিতে তখন মেঘা, আর কিছুদিন বাদেই শুরু হবে তার প্রথম সাময়িক পরীক্ষা। পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করলে বাবা এবার তাকে সাইকেল কিনে দেবেন বলেছেন, মেঘা তাই খুব মন দিয়ে পড়ছে তখন। গাঁয়ের মধ্যে মেয়েরা সাইকেল চালাবে, ও তল্লাটে তেমনটা কেউ ভাবতেই পারে না তখন, কিন্তু তার বাবাটা অন্য সব বাবাদের মত নন মোটেই। ‘মনে রাখবে, ছেলে আর মেয়েতে কোনো তফাৎ নেই। এসব বাজে ভাবনা কখনো মাথায় আনবে না তুমি’- মেঘাকে সাফ বলে দিয়েছিলেন বাবা। আর কদিন পর থেকেই সাইকেল চালিয়ে স্কুলে আসতে পারবে মেঘা, এমন স্বপ্নে বিভোর তখন মেয়ে। হঠাৎ ছন্দপতন ঘটল ক্লাসে। দারোয়ান এসে চুপিসারে কী একটা বলল বিভূতি স্যারকে। শুনে কেমন চুপ হয়ে গেলেন স্যার। চোখ থেকে জল গড়াল ক ফোঁটা। কী হল? ক্লাসের ছোট্ট ছেলে-মেয়েরা থমকে পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল শুধু। ধীরে ধীরে স্যার উঠে এলেন চেয়ার ছেড়ে। মেঘার সামনে এসে দাঁড়ালেন কয়েক সেকেন্ড। অতঃপর আস্তে মেঘার ছো্ট্ট শরীরটা কোলে নিয়ে হাউমাউ কেঁদে উঠলেন মেঘার অতিপ্রিয় বিভূতি স্যার। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে মেঘাও কেঁদে উঠল কিছু না বুঝেই।
পরে ঘটনাটা অনেক ভেবেছে মেঘা। স্যারের কান্নার শব্দে ভীষণ অপ্রস্তুত মেঘার অবচেতন মন তখন ঠিক বুঝে গেছিল ভয়ংকর কিছু একটা ঘটে গেছে কোথাও। নইলে বিভূতি স্যারের মত গম্ভীর কোনো মানুষ কেন অমন হাউমাউ কাঁদবেন আচমকা? বিভূতি স্যারসহ আরো সব স্যারেরা মিলে মেঘাকে বাড়ি নিয়ে এসেছিলেন সেদিনের মতন স্কুল ছুটি ঘোষণা করে। বাড়ি ফিরে হতচকিত মেঘা দেখেছিল তাদের বাড়িভর্তি শুধু মানুষ আর মানুষ। উঠোনের একপাশের খাটিয়ায় বাবা সটান শোয়া। সাদা কাপড়ে শরীর ঢাকা, নাকে-মুখে সফেদ তুলোর দলা। পাশে হাত-পা ছড়িয়ে ডুকরে কাঁদছেন মেঘার সন্তানসম্ভবা অল্পবয়সী মা তনি। তাকে জোর করে সেখান থেকে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছেন বয়সী নারীগণ। সেই দশ বছরেই মেঘা বুঝে গেছিল যা বোঝার। হঠাৎই সেদিন বড় হয়ে উঠেছিল সে। চোখে রাজ্যের অবিশ্বাস নিয়ে সে তাকিয়ে ছিল বাবার ভীষণ ফ্যাকাসে ফোলা মুখটার দিকে। বাবাকে খুব অচেনা লাগছিল মেঘার। মনে হচ্ছিল অন্য কোনো গ্রহ থেকে এসে বাবাকে ছুঁয়ে দিয়েছে কেউ। এই বাবার শরীরে তার সেই চেনা বাবাটার ঘ্রাণ নেই, মুখে সেই চিরপরিচিত হাসি নেই, নেই পরম নির্ভরতার সেই হৃদয় শীতল করা আশ্বাসবাণী। পায়ের নিচে থেকে মাটি সরে যাওয়ার অর্থটা সেই বয়সেই বুঝেছিল সেদিন মেঘা।
বাবার মৃত্যুর পর মায়ের পথচলাটা সহজ ছিল না মোটেই। যদিও ছোটকাকা হযরত আলী ছায়া হয়ে আগলে রেখেছিলেন তাদের, তবু অল্পবয়সী বিধবার সব বিড়ম্বনা কি কারো পক্ষেই দূর করা সম্ভব আদৌ! বস্তুত কেউই পারে না সেটা। তবু সাধ্যমত পাশে ছিলেন কাকা। নিজের ক্ষুদ্র সামর্থ্য দিয়ে তিনি মেঘা আর বারিষকে সন্তানজ্ঞানে আগলে রেখেছিলেন যতদিন গ্রামে ছিল মেঘা আর তার পরিবার। বাবা ছোট চাকরি করতেন এক প্রাইভেট কোম্পানিতে, চাকরির প্রয়োজনে ঢাকায় থাকতে হত বাবাকে। অল্প বেতনে পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকার সাধ্য ছিল না বাবার। প্রতিমাসে একবার তাই পরিবারের সঙ্গে মিলিত হতে গ্রামে আসতেন তিনি। কিন্তু এত অল্প আয়ু নিয়ে যে পৃথিবীতে এসেছিলেন বাবা, সে-কথা সম্ভবত তিনি নিজেও কখনো বুঝতে পারেননি। কিছুই তেমন গুছিয়ে যেতে পারেননি বাবা মৃত্যুকালে। মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়স ছিল তখন বাবার। সেই বয়সে মৃত্যু নিয়ে কে-ই-বা ভাবে অত! বাবার মৃত্যুর পর তাই দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন তনি। বারিষ তখনো পেটে থাকায় শারীরিকভাবেও ছিলেন ভীষণ নাজুক অবস্থায়। সে সময় ছোটকাকা ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন পাশে। বাবা আর কাকার অল্পকিছু ধানি জমি ছিল পৈতৃকসূত্রে পাওয়া। কাকা সেসব দেখভাল করে সেখান থেকে প্রাপ্ত ফসল সমান ভাগে ভাগ করে একভাগ নিজে নিতেন, অন্যভাগ মেঘাদের দিতেন। মামারাও কমবেশি সাহায্য করত তখন মাকে। সেসবেই কষ্টেসৃষ্টে চলে যেত তাদের। পড়াশোনা শেষে চাকরি পেয়ে মা আর বারিষকে নিজের কাছে নিয়ে এসেছিল মেঘা। বারিষকে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিল ঢাকার নামীদামি এক কলেজে। কিন্তু শহর সহ্য হল না তনির। অল্পকিছুদিন পরেই ক্যান্সার ধরা পড়ল, লাস্ট স্টেজ, জানিয়ে দিলেন ডাক্তার। সবকিছু যেন চোখের পলকেই ঘটে গেল পরপর। মা মারা গেলেন ছয়মাসের মাথায়। করোনা হানা দিল পৃথিবীতে, চাকরি গেল চাচাত ভাই শফিকের, গ্রামে গিয়ে থিতু হল সে পরিবার নিয়ে, কাকী মারা গেলেন সপ্তাহ না পেরোতেই। আর তার কদিন বাদেই কাকা হযরত আলীকে ভিটেছাড়া করে মেয়ে শায়লার কাছে পাঠিয়ে দিল শফিকের বউ। দেখতে দেখতে কেমন ছন্নছাড়া, এলোমেলো হয়ে গেল সব। ফলে নাড়িপোঁতা ভিটের সঙ্গে সম্পর্কটা ভীষণই আলগা হয়ে গেল তাদের হঠাৎ। মন আর টানে না ওদিকে কারো। বারিষ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে এখন মাস্টার্সে। তার খরচ বড় কম নয়। বাবার জমির ফসল বিক্রি করে মাঝে মাঝে কিছু টাকা পাঠায় তাকে শফিক, বাকিটা মেঘা চালিয়ে নেয়। শফিকের সঙ্গে যোগাযোগটা বারিষই রাখে বরাবর। বউয়ের আঁচল ধরা ভেড়ুয়াটাইপ পুরুষ বরাবরের অপছন্দ মেঘার। শফিকের বর্তমান কর্মকাণ্ডের যা সব নমুনা শোনে সে কাকা আর শায়লার মুখে, তাতে ইচ্ছে করেই মেঘা এড়িয়ে চলে শফিককে। ভীষণ বিরক্ত মেঘা শফিকের এমন ব্যক্তিত্বহীন আচরণে। কিন্তু বারিষ সম্ভবত কিছু একটার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে ইদানীং। কিছুদিন হল সরকারি চাকরিতে কোটাবিরোধী আন্দোলন চলছে দেশে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা অংশ নিয়েছে এ আন্দোলনে। আন্দোলনটাকে শতভাগ যৌক্তিক মনে করছে দেশের সিংহভাগ জনগণ। কিন্তু সরকার নানা টাল-বাহানা করছে, ছাত্রদের যৌক্তিক দাবি উপেক্ষা করে তারা ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে জনবিরোধী বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। ফলে আরো ক্ষেপে উঠছে ছাত্রসমাজ। আন্দোলন জোরালো হচ্ছে আরো। দীর্ঘকাল টানা ক্ষমতায় থাকায়, নির্বাচনের নামে জনগণের সঙ্গে প্রহসন করে ক্ষমতা করায়ত্ত করায় সরকার সম্ভবত হিতাহিত জ্ঞান হারিয়েছে, ধরাকে সরা জ্ঞান করতে শুরু করেছে। বারিষ সম্ভবত এই আন্দোলনেই যোগ দিয়েছে। ইদানীং কোনো পাত্তা পাওয়া যাচ্ছে না তার, টিকিটিরও দেখা মিলছে না একদম। বোনের কাছে সে সম্ভবত ভয়ে গোপন রাখছে তার কর্মকাণ্ড, পাছে মেঘা তাকে বাধা দেয়, এই ভয়ে। কিন্তু মেঘা ঠিকই বুঝতে পারছে কোথাও একটা ঘাপলা আছে খুব। প্রশ্ন করেও কোনো সদুত্তর সে পায়নি ভাইয়ের কাছ থেকে। আজ হঠাৎ সে ফোন করে বলল শফিককে ফোন দেয়ার জন্য। টাকার দরকার, সেমিস্টার ফি দিতে হবে তার। ব্যস্ততার কারণে নাকি সে ফোন দিতে পারছে না শফিককে! বলেই ফোন কেটে দিল বারিষ। বিরক্ত মেঘা বুঝতে পারল না, যে ফোনটা তাকে দিল বারিষ সেই ফোনটা কেন শফিককেই দিল না সে? তবে কি আজকাল টাকা দিতে গড়িমসি করছে শফিক? তাই বারিষ মেঘাকে দিয়ে ফোন করাতে চাইছে শফিককে?
ভাবতে ভাবতে অগত্যা শফিককে ফোনটা দিয়েই বসল মেঘা। বহুকাল পর যদিও। কিন্তু আশ্চর্য! বহুবার ফোন বাজল কিন্তু ফোনটা রিসিভ করল না শফিক। অগত্যা গালে হাত দিয়ে ভাবতে বসল মেঘা। শফিককে আর যা-ই হোক, অন্তত লোভী মনে হয়নি কখনো তার। তাহলে? কে জানে!
***************************
