সমস্যা হল গল্প আমি লিখতে পারি না
অতীশ চক্রবর্তী
আমার অফিসের সামনে একটা ২৫০-৩০০ বছরের ওক গাছ আছে। আমাদের দেশের বট গাছের মত ঝুড়ি না থাকলেও গাছটির বিস্তার খুব বড়। কোনও এক সকালে এই গাছের তলায় দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, এই গাছ যদি কথা বলতে পারত, এর কাছে সেই ভ্যালি-ফোর্জের যুদ্ধের ইতিহাস সে অবলীলায় বলতে পারত। মানুষের তো ভাষা আছে। গাছের তো নেই!! প্রত্যেক মানুষের জীবন-ই আসলে এক একটা উপন্যাস। আমার কেন জানি তাই মনে হয়। ভাষা থাকলে কি হবে? আমার অফিসের সমস্যা হল গল্প আমি লিখতে পারি না – যদিও মনের ভেতরে গল্পের সম্ভারের অভাব যে আছে তাও নয়। গল্প আমি যখন লিখতে পার না, তাহলে আজ গল্পের ছলে এক বাঙালী লেখকের একটি মজার কাহিনী দিয়ে শুরু করি, যা সত্য বটে।।
সে অবশ্য অনেকদিন আগেকার কথা। তখন ব্রিটিশ আমল চলছে। আজকের এপার ওপার দুই বাংলা তখন একত্র ছিল – নাম ছিল বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি। যাই হোক তৎকালীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির পশ্চিমে, মানে আজকের পশ্চিমবাংলার একটা প্রত্যন্ত গ্রামের এক হত দরিদ্র চাষি সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে দেখেন, যে পিওন বাড়িতে একটি টেলিগ্রাম দিয়ে গেছেন। স্বাধীনতার ৭৮ বছর পরেও যখন আমরা বাংলাকে সরকারী-বেসরকারি কোনও মাধ্যমেই প্রশাসনের ভাষাতে যথার্থ ভাবে ব্যবহার করতে চাইলাম না, “বাংলাটা ঠিক আসে না” আর ইংরাজিতে সড়গড় বলে নিজেকে গর্বিত বলে মনে করি, সেখানে ব্রিটিশ আমলে বাংলায় টেলিগ্রাম আসবে তা তো হতে পারে না। কাজেই বুঝতে পারেন টেলিগ্রামটি ইংরাজিতে লেখা।
টেলিগ্রামটি ইংরাজিতে লেখা – এদিকে এই গ্রামের ধারে কাছে ইংরাজি তো দূরে কথা, বাংলা পড়তে পারে এমন কেউ নেই। সাধারণ জনমানসে এই ধারণা বিদ্যমান ছিল যে টেলিগ্রাম সচরাচর কারও দুর্ঘটনা বা মৃত্যু সংবাদ-ই নিয়ে আসে। এই ধারণা কিছুটা সত্যও বটে। সে রাতে সন্ধ্যায় বাংলা খেতে খেতে আর হুঁকো টানতে টানতে যে আড্ডা বসে তাতেও চাষিটির মন বসল না, সারারাত ঘুম এল না দুশ্চিন্তায়। খুব ভোরে উঠে চাষের মাঠে না গিয়ে বেরিয়ে পড়ল পোস্ট মাস্টারের কাছে যাবে বলে। তার কাছে গিয়ে তাঁকে দিয়ে টেলিগ্রামটা পড়িয়ে নিতে হবে। তখনকার দিনে তো আর এত কাছাকাছি পোস্টঅফিস ছিল না, বহু ক্রোশ দূরে দূরে পোস্টঅফিস থাকত। যেতে অনেক সময় লাগবে। কিন্তু চাষি ব্যক্তিটি একেবারে পোস্টঅফিস খোলার সময়ে উপস্থিত হতে চায়। টেলিগ্রাম বলে কথা, দেরি করা যায় না। যাইহোক দ্রুত পদচারণে, কোনও বিশ্রাম না নিয়ে সে উপস্থিত হল সেই পোস্টঅফিসের সামনে। পোস্টমাস্টার তখন সবে দরজার তালা খুলছেন। কিছুক্ষণ পরে তিনি তাঁর চেয়ারে বসতেই ঢিপ করে একটা পেন্নাম করে টেলিগ্রামটি পোস্টমাস্টারের হাতে দিয়ে সেটা পড়ে বাংলা করে দিতে বললেন। পোষ্টমাস্টার তাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন – শরৎবাবু কাল তোদের আড্ডায় যান নি? চাষিটি বললে – হ্যাঁ বাবু গেছিলেন তো। পোস্টমাস্টার বললেন তাহলে এতদূর আসা কেন – ওকে দেখালেই তো ল্যাটা চুকে যেত। সে কথা শুনে চাষিটি বলল – না বাবু, উনি তো লেখাপড়া জানেন না, আমাদের সঙ্গে বাংলা খান, হুঁকোয় তামুকটামুক টানেন, আড্ডা মারেন, তারপর চলে যান। পোস্টমাস্টার মহাশয় আর কথা বাড়ালেন না। টেলিগ্রামটি পড়ে দিলেন, দুঃসংবাদ তো নয়ই, কোনও এক আত্মীয় কিছু সুখবর দিয়েছেন তা জানিয়ে দিতে চাষিটি চলে গেল।
প্রতিদিনের মত দুপুরের দিকে শরৎবাবু পোস্টঅফিসে এলে তাঁকে এই কথা জানাতেই তিনি হো হো করে হেসে উঠলেন। তারপরে বললেন, ওরা সত্যি সত্যি জানে না যে তিনি শিক্ষিত এবং একজন লেখক। তিনি আরও বললেন, চাষিটি যা যা বলেছে তা একেবারে সত্যি। গায়ে আধ ছেঁড়া ফতুয়া, হাঁটুর ওপরে তোলা ধুতি পড়ে তিনি প্রায় সন্ধ্যায় ওখানে তামুক খেতে খেতে আড্ডা দেন। তিনি বললেন সেই আড্ডায় ওরা ওদের প্রাণের কথা, মনের কথা, সুখ দুঃখের কথা কত কিছু বলে। ওরা যদি তাঁর আসল পরিচয় জানত তাহলে তিনি সম্ভ্রম হয়তো পেতেন কিন্তু তারা খোলামনে তাঁর সাথে মিশতে পারত কি? এই খোলামনে মেশার মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর গল্পের কত রসদ যে পান তাঁর ইয়ত্তা নেই। এতক্ষণে নিশ্চয় বুঝেই গেছেন ইনি হলেন বাংলাসাহিত্যের প্রবাদপ্রতিম লেখক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
তিনি শুধু গরীব চাশভুষোদের সঙ্গেই যে মিশেছেন তা নয়। তিনি পুরুষতান্ত্রিক সমাজে অবহেলিত, বঞ্চিত মহিলাদের সঙ্গেও সমান ভাবে মিশতে পারতেন। তাঁর গল্পে নারীদের নানা কষ্টকাহিনী ধরা পড়েছে। তবে আমি আজ বলব বহুযুগ আগে নবম শ্রেণীতে পড়া একটি গল্প ‘মহেশ’ নিয়ে। ঐ উঠতি বয়েসে যখন করুণাবোধ বিবেকের কাণায় কাণায় ভরা থাকে, একটু এদিক ওদিক হলেই তা অশ্রুধারা হয়ে ঝরে পড়তে থাকে, এই গল্পটি সেই সময়ে আমার কোমল মনে সত্যি দাগ কেটে গিয়েছিল।
জানলাম যে আমি এই ‘মহেশ’ গল্পটি বিদ্যালয়ের পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত নেই – বেশ দুঃখ হল। আমি এটাও অবশ্য জানি না যেন আজকের প্রজন্ম গল্পটি পড়লেও তা অনুধাবন করতে পারে কিনা। সামাজিক মাধ্যমের এই ফেসবুক রীল, বা টিকটক দেখার যুগে ধৈর্য, স্থৈর্য মাপার মাপকাঠি হল মাত্র তিন সেকেন্ড। কোনও রীল, বা টিকটক তিন সেকেন্ড দেখলে তাকে একটি view হিসাবে গণ্য করা হয়, মানে আপনি ধৈর্য ও স্থৈর্য সহকারে এটি দেখেছেন। এহেন যুগে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একটি গল্প এখন আর কি কেউ পড়ে? জানি না। অথচ এই একটি ছোট্ট একটা গল্পের মধ্যে সমাজের কত দিককে যে তুলে লেখক তুলে ধরেছেন সেটা ভাবলেই তাঁর লেখনীশক্তির ব্যাপ্তির প্রশংসা করতে হয়। শুরুটা কি অসাধারণ – “এখানকার গ্রামের নাম কাশীপুর। গ্রাম ছোট, জমিদার আরও ছোট’। ছোট বটে কিন্তু সমাজের শত সমস্যার অন্ত নেই।
কলকাতা থেকে রকেট বাসে মানে দ্রুতগামী বাসে শিলিগুড়ি যাবার সময়ে জাতীয় মহাসড়কের দুই পাশের গ্রামের খড়ের ছাউনি দেওয়া মাটির বাড়িগুলির ওপর ডিশ অ্যান্টেনা দেখে কেন জানি না মনে হয় এক বকচ্ছপ যুগে এসে পড়েছি। দারিদ্র আর কঞ্জিউমারিস্ম বা ভোগবাদ এখন হাতে হাত ধরে চলে, দেখে মনে হয় বুর্জোয়া আর প্রলেতারিয়েত এখন হাতে হাত দিয়ে চলে, পেটে ভাত নেই কিন্তু হাতে সেল ফোনটি থাকতে হবে, ঘরে ডিশ টিভি থাকতে হবে। শত বছরে বিবর্তিত এই সমাজের মধ্যে এক বিপুল বাহ্যিক পরিবর্তনের পরেও ‘মহেশ’ গল্পটি হয়তো এখনও যেন একই ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
‘মহেশ’ গল্পটির গভীরে লুকিয়ে রয়েছে দারিদ্র্য, আবেগ, পরিবার, এবং সমাজব্যবস্থার নির্মম বাস্তবতা। আমি তখন বেশ ছোট – পশ্চিমবঙ্গে ‘বর্গা’ আন্দোলন বা ‘অপারেশন বর্গা’ (Operation Barga) ১৯৭৮ সালে শুরু হয়েছিল এবং ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে তা সমাপ্ত হল। জমির মালিকদের (জোতেদার) অধীনে কাজ করা কৃষকদের (বর্গাদার) সরকারিভাবে নিবন্ধিকরণ প্রক্রিয়া শুরু হল। নিবন্ধিত বর্গাদারদের জমি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষা প্রদান করা হল। উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য অংশ পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হল। যে জমিতে বর্গাদাররা চাষ করেন, সেই জমির মালিকানা অর্জনের প্রক্রিয়া সহজতর করা হল। কিন্তু এরপরেও কি ‘মহেশ’ গল্পটির তাৎপর্য কিছু কমল?
‘মহেশ’ গল্পটি বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল রত্ন, যেখানে গরু একটি নিমিত্ত মাত্র। নিমিত্ত বললাম বটে, তবে সে গরুটিও অত্যাচারীকে একটা লাথি মারতে পারে সেটা বুঝিয়ে দিয়েছে। মহেশ শুধু একটি গৃহপালিত প্রাণী নয়, বরং একটি পরিবারের জীবিকার মূল ভিত্তি এবং আবেগের প্রতীক। সৌভাগ্যের ব্যাপার দুর্ভিক্ষ ও খরা হয়তো এখন হয় না। দরিদ্র কৃষক তো আছে, তাদের পরিবার যখন চরম সংকটে পড়ে, তখন যেন মহেশের মত তাদের গবাদিপশুর খাদ্যাভাব, অসুস্থতাতো নেই তা বলতে পারা যাবে না। সেখানে হয়তো আমরা এই গল্পটির করুণ বাস্তবতাকে হয়তো এখনও খুঁজে পাব। এই গল্পটি মনে করিয়ে দেয়, দেশ প্রভূত উন্নতি করলেও, সমাজে কৃষক এখনও অনেকটাই অবহেলিত ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। আগেই যা বলেছি, যেদিন কলকাতা থেকে রকেট বাসে শিলিগুড়ি যাবার সময়ে জাতীয় মহাসড়কের দুই পাশের গ্রামের খড়ের ছাউনি দেওয়া মাটির বাড়ির ওপর ডিশ অ্যান্টেনা দেখেছিলাম, সেদিন এটাই মনে হচ্ছিল, এই যাত্রাপথে এখনও কত গ্রাম পড়বে, যেখানে নামলে আমাকেও লেখকের মত বলতে হবে “এখানকার গ্রামের নাম কাশীপুর। গ্রাম ছোট, জমিদার আরও ছোট’। এই লেখায় কাশীপুর গ্রামটি সমাজ শোষণে জর্জরিত বহু গ্রামের একটি-ই নাম।
এমনি একটি বাড়ির সামনে খুঁটিতে বাঁধা একটি গরুকে বিচালী খেতে দেখে গল্পটি যেন আবার আমার মনের মধ্যে চিত্রায়িত হতে শুরু করল। “সকালে যাবার সময়ে দেখে গেছি বাঁধা, দুপুরে ফেরবার পথে দেখচি তেমনি ঠায় বাঁধা, গোহত্যা হলে যে কর্তা তোকে জ্যান্ত কবর দেবে। সে যে-সে বামুন নয়”। ‘মহেশ’ গল্পটি ‘হরিলক্ষী’ নামক গল্প সংকলনে বাংলা ১৩২৯ সালে বঙ্গবাণী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। মনে হল, হক কথা, সময় বদলেছে বিস্তর, তখনকার সমাজ আর আজকের সমাজের মধ্যে ব্যবধান বেড়েছে বিস্তর – কিন্তু এখন আমরা সকলেই “যে-সে বামুন” নই – এটাই বাস্তব। তথাকথিত জমিদার বলে এখন আর কিছু নেই, তবে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যাবস্থার বিভিন্ন স্তরে ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের কাছ থেকে আজকের ‘গফুর’দের কিন্তু আজও শুনতে হয় – “তোরা তো রামরাজত্বে বাস করিস – ছোটলোক কিনা – তাই তাঁর নিন্দে করে মরিস”। এটাতো মানতে হবে “সদরে ভদ্র অভদ্র অনেকগুলি ব্যক্তি”-র সংখ্যা বহুগুণ বেড়েছে। এই “ধর্মজ্ঞানহীন ম্লেচ্ছজাতিকে গ্রামের ত্রিসীমানায় বসবাস করিতে দেওয়া নিষিদ্ধ” করা উচিত বলিয়া তখন যারা মাতব্বরি করিত, তার বিপরীতে আজ একদল ‘মালাউন’দের উৎখাত করিবার খেলায় মেতে উঠেছে – কোনও পক্ষই মহেশ গল্পটি থেকে কোনও শিক্ষাই যে পায় নি তা সহজেই বোঝা যায়।
আমি বিশ্বাস করি যে আজও ‘আমিনা’র মত বহু নারী চরিত্র তাদের বলিষ্ঠ রূপ নিয়ে প্রতীয়মান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে – সমাজের সমস্ত বাধা-বন্ধকতাকে অগ্রাহ্য করে। আজও সে তার বাবার সাথে দুঃখ ভাগ করে নেয়। বয়েস বছর দশেক হলে কি হবে? মহেশের প্রতি ভালোবাসা ও যত্নে সে যেন একজন পরিপূর্ণ মা, যে দারিদ্র্য, অবহেলা, এবং কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও নিজের মানবিক অবস্থান অটুট রাখে। “পিতা ও কন্যার মাঝখানে এই যে একটুখানি ছলনার অভিনয় হইয়া গেল, তাহা এই দুই প্রাণী ছাড়া আরও একজন বোধকরি অন্তরীক্ষে থাকিয়া লক্ষ্য করিলেন” – এও আজও বাস্তব। ভেবেছিলাম তখন সালটা ছিল বাংলা ১৩২৯, তখন না হয় বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে মেয়েদের শিক্ষার আলো ঢোকে নি, স্বাবলম্বী হবার সুযোগ আসে নি। কিন্তু আজ এত বছর পরে যখন দেখি একদল ধর্মান্ধ নারী দৃশ্যশ্রাব্য মধ্যমে সাংবাদিকের সামনে এসে বলছে নারীদের একমাত্র দায়িত্ব হচ্ছে স্বামী সেবা করা আর বাচ্চা পয়দা করা – তখন আফসোস হয় বই কি – গভীর আফসোস হয় – মনে হয় এই জন্য বোধহয় কথায় বলে অনেক ক্ষেত্রে নারীরাই নারীদের আসল শত্রু। প্রকৃত শিক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছাড়া নারীদের স্বাধিকার যে প্রতিষ্ঠিত হবার নয় সেকি এখনও আমরা বুঝব না? স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক শুধু দাসত্ব ও বাচ্চা পয়দা করার সম্পর্ক নয় – তা হলে সেটি একটি জান্তব সম্পর্ক বৈ কিছু নয়, তার মধ্যে না আছে প্রেম, না আছে প্রীতি, না আছে ভালোবাসা – এটা মনে হয় অনেক নারীও বোঝেন না।
এতটুকু গল্প – কিন্তু ধারণ করেছে সামাজিক বৈষম্য ও নিষ্ঠুরতার আখ্যানকে, ধারণ করেছে সমাজের উচ্চবিত্তদের নিষ্ঠুরতা এবং অসহযোগিতাকে। এই সামাজিক বাস্তবতা আজও ‘মহেশ’-এর প্রাসঙ্গিকতা আরও বাড়িয়ে তোলে। আবার অন্যদিকে এই গল্পটি সাম্প্রদায়িক বিভাজনের দিকটা তুলে ধরার সাথে সাথে সম্প্রীতির বার্তাকেও তুলে ধরেছে। এই গল্পে শরৎচন্দ্রের আধুনিকতা এবং সমাজসচেতন দৃষ্টিভঙ্গি প্রকটভাবে ধরা পড়েছে। আজকের দিনে যখন সাম্প্রদায়িক বিভাজন বাড়ছে, মানে রাজনৈতিক শবযাত্রার খইয়ের মত তা ছড়ানো হচ্ছে, তখন এই গল্প আমাদের শেখায়, মানুষের দুঃখ ও সহানুভূতির কোনও ধর্ম হয় না।
মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা ও অমানসিক চাপের কাছে হেরে যেতে হয়। মানুষ ধৈর্য হারায়, আজকের ‘গফুর’রাও ধৈর্য হারায়। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস এক অন্যভাবে আজ উপস্থিত যার গায়ে গণতন্ত্রের নামাবলী। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে জাতীয়তাবাদের বিরোধী করে তোলা হয়েছে, দেশদ্রোহী বানানো হয়েছে। তাই উপায়ন্তর না দেখে আজকের ‘গফুর’রা আজকের ‘মহেশ’দেরকে মেরে ফেলে। আমরা তাকে সেটিকে কেবল রাগের বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করি যদিও তা এক গভীর মানসিক যন্ত্রণা ও অসহায়তার বিস্ফোরণ। দারিদ্র্য, সামাজিক অবহেলা, এবং অক্ষমতার বোঝা কতটা চাপ সৃষ্টি করে তা আমরা এই গল্পটি থেকে বুঝতে পারি, এবং গফুরের মত সমাজবিরুদ্ধ কাজ করে ফেলি। পরক্ষণেই এ বোধ জাগে – “সংসারে অত ক্ষুদ্রের অত বড় দোহাই দেওয়া শুধু বিফল নয়, বিপদের কারণ” – শেষমেশ মেনে নিই মুখ বন্ধ করে, চোখে ঠুলি পরে।
বর্তমানে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একজন মানুষের মনে, ‘মহেশ’ তার এক অনুপম উদাহরণ। গফুরের কাজ সমাজবিরুদ্ধ হলেও পাঠকের মন সহানুভূতিতে ভরে ওঠে, কারণ সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। যেখানে গরু একটি নিমিত্ত মাত্র, কিন্তু নিমিত্ত মাত্র নয়।
ফিলাডেলফিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
২৫শে মে ২০২৫
*************************************
