You are currently viewing কতিপয় আজব খোয়াব ও এক অনিশ্চিত ভ্রমণকাহিনি || প্রদীপ আচার্য

কতিপয় আজব খোয়াব ও এক অনিশ্চিত ভ্রমণকাহিনি || প্রদীপ আচার্য

কতিপয় আজব খোয়াব ও এক অনিশ্চিত ভ্রমণকাহিনি
প্রদীপ আচার্য

১.
জুন মাস শেষ হতে আর কদিন বাকি। আকাশে ঘনকালো মেঘেরা জটলা পাকাচ্ছে। ঘড়ির কাঁটায় রাত নয়টা ছুঁই ছুঁই। চট্টগ্রামের গরীবউল্লাহ শাহ্ মাজারের সামনে থেকে বিভিন্ন জেলায় দূরপাল্লার বাসগুলো ছাড়তে শুরু করেছে। বিসমিল্লাহ বাস কাউন্টার থেকে দূরপাল্লার একটি বাস কুষ্টিয়ার দিকে যাত্রা করবে বলে অপেক্ষারত। এই বাসের যাত্রীরা সব পদ্মার ওপারের। তাদের চোখে মুখে আনন্দ চিকচিক করছে। পদ্মা সেতু সাধারণ যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে কদিন আগে। বাসের যাত্রীরা এই প্রথম পদ্মাসেতু দেখবে, সেতু পার হয়ে ওপারে যাবে। সবাই অধীর অপেক্ষায় ক্ষণ গুনছে। পৌণে নয়টায় বাস ছাড়ার কথা। কিন্তু দেরি হচ্ছে। যাত্রীদের কেউ কেউ কাউন্টারে গিয়ে হম্বিতম্বি শুরু করে। বাস এই ছাড়ল বলে। বাসের ভেতর বেশ কয়েকটি সিট তখনো খালি। সামনের দুয়েকটা কাউন্টার থেকেও যাত্রী তোলা হবে। ড্রাইভার সিটে বসে গাড়ী স্টার্ট দিয়ে বসে আছে। সুপারভাইজার এলেই বাস ছাড়বে।
আরে, সুপারভাইজার কই? আর কত দেরি হবে?
এই মুহূর্তে বাসটিকে মনে হয় কিন্ডারগার্টেনের আগ্রহী কোনো শিশু। স্কুলে যাবার জন্য যে আগে থেকেই তৈরি হয়ে বসা। যে স্কুলে যায় বাবার হাত ধরে। বাবা তৈরি হলেই যার বের হওয়া। তারপর বাবার হাত ধরে লাফাতে লাফাতে স্কুল।
এমন সময় সুপারভাইজার ঝড়ের বেগে এসে বাসের ভেতরে এক চক্কর দিয়ে যাত্রী গুনে নেয়। ড্রাইভারকে উদ্দেশ্য করে বলে, ঠিক আছে উস্তাদ, চালান।
কথাটা ড্রাইভারের কানে যেতেই বাস চলতে শুরু করে।
কেউ একজন বলে ওঠে, যাক, বেশি নয়, পনেরো মিনিট দেরি হয়েছে!
মেঘেরাও যেন আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। বাস ছাড়ার সাথে সাথেই তারা ঝরতে থাকে অঝোর ধারায়। আষাঢ়ের প্রথম বৃষ্টি নামে আকাশ ভেঙে।
এই যে সুপারভাইজার, এদিকে আসুন। কাঁচটা টানা যাচ্ছে না। বৃষ্টি ভেতরে ঢুকছে।
ভাই সিটটা পেছনের দিকে যাচ্ছে না। ঠিক করে দেন!
ভাই পলিথিন দিয়েন তো।
যাত্রীদের এতসব টুকরো ফরমায়েশ শুনতে শুনতে বাসটি ফয়েজ লেক পেরিয়ে এ কে খাঁন গেটে এসে দাঁড়ায়। এখানকার কাউন্টার থেকে অপেক্ষমান যাত্রী তুলে শুভ্রবসনে দাঁড়িয়ে থাকা চট্টগ্রাম সিটি গেট পার হয়ে হর্নের শব্দ তুলে দ্রুত শহরের সীমানা অতিক্রম করে যায় বাসটি। নিয়ন বাতির ঘোলাটে হলুদ আলো ভেদ করে বৃষ্টির ফোঁটা বাসের শরীরে এসে আছড়ে পড়ে। গ্রীষ্মের প্রখর রোদে জ্বলে যাওয়া ধাতব শরীরে আষাঢ়ের বৃষ্টি যেন শান্তিবারি হয়ে ঝরে। তীব্রবেগে ছুটতে থাকে বাস। মনে হয় আর কোথাও সে থামবে না সহসা। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকায় ঢুকে বাসটিকে তবু হঠাৎ হঠাৎ থামতে হয়। রাস্তায় অগণিত ট্রাকের সারি। কোনোটা ফ্যাক্টরির ভেতরে ঢোকে, আবার কোনোটা বের হয়। পথরোধ করে দাঁড়ায় ঢিমেতালে চলন্ত ট্রাকের সারি। যাত্রীদের কেউ কেউ আয়েশী ভঙ্গি ছেড়ে সোজা হয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকিয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করে। ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের সামনে জ্যাম পড়ে খুব। এখানকার বাইপাস রাস্তা দক্ষিণে পোর্ট-এর দিকে চলে গেছে। চট্টগ্রামমুখী ট্রাকের সারি বাইপাস হয়ে পোর্ট-এর দিকে যাওয়ার সময় রাস্তা পারাপার বন্ধ থাকে।
চারলেনের রাস্তা হয়ে কী লাভ হল! সেই তো জ্যাম।
আরে এক রাস্তা থেকে অন্য রাস্তায় ট্রাক ক্রস করছে। এখন গাড়ি কীভাবে যাবে!
এ জায়গায় যখন সবসময় জ্যাম লেগে থাকে তখন একটা ফ্লাইওভার করে দিলেই তো হয়।
ঠিক বলেছ, সরকারকে এ পরামর্শটা তুমিই দিতে পার!
হাহাহা! -যাত্রীরা নিজেদের মধ্যে ঠাট্টা-তামাশায় সময় কাটায়।
মিনিট পাঁচেক পরেই যথারীতি বাস আবার চলতে শুরু করে। দিলু আর রাকিব পরস্পরের দিকে তাকায়। অন্ধকারে কেউ কারো মুখ ভালো করে দেখতে পায় না। মনে হয় যেন একেকটি ছায়া মুখ।
দিলু, ভালা গরি দরি রাক, নইলে পড়ি যাবিগুই।
অ্যাঁরে লইয়ারে তোরতে চিন্তা গরন পইত্ত ন। আঁই ঠিক আছি। তুই ভালা গরি দরি বয়।
দিলু তোর চোগোত তো গুম বেশি। চাইস গুম ন যাইস।
মিনিট চল্লিশেক চলার পর সীতাকুণ্ড বাইপাসে পৌঁছে বাস আরেকটি কাউন্টারে দাঁড়াতেই বাসের ভেতর থেকে উঁচু গলায় এক যাত্রী বলে ওঠে, কী রে ভাই, সারা রাস্তায় আপনাদের কাউন্টার আছে না কি? জায়গায় জায়গায় লোক নিচ্ছেন!
কবে যে আমরা এদের হাত থেতে মুক্তি পাব!
এই সুপারভাইজার, বাসে কি আর জায়গা আছে নাকি? লোক তুলে কোথায় বসাবেন?
জায়গা না থাকলে চাক্কার সঙ্গে বেঁধে নেন।
যাত্রীটির এমন রসিকতায় সকলেই হেসে উঠে।
সুপারভাইজার বলে না কিছুই। অন্ধকারে তার মুখ দেখা যায় না। মুখের অভিব্যক্তি বোঝার উপায়ও নেই কারো। হেলপার কী সব বিড়বিড় করে। বোঝে না কেউ। বাস আবার চলতে শুরু করে।
অই দিলু, তুই তো দেইজ্জি জুরর! গুম গেলে মরিবি। ভালা গরি দরি রাক।
রাকিব দিলুকে আলতো করে ধাক্কা দেয়। দিলু একটু নড়ে ওঠে। রাকিব বলে, আরে ব্যাডা তোর লাই মরিচর গুড়া আনন দরকার আছিল, চোগদ দিলে গুম যাইতুগুই। অই দিলু, সোদানিয়া পুয়া, কথা কিয়া ন গর!
রাকিবের গালমন্দ দিলুর কান পর্যন্ত পৌঁছায় না। হঠাৎ রাকিবের ভেতর আতঙ্ক ভর করে। দিলু ঘুমিয়ে পড়ে।

২.
দিলু আর রাকিব, দুই দুরন্ত কিশোর সরু রাজপথে খালি পায়ে হাঁটতে থাকে। তাদের মনে হয় যেন অনন্তকাল হাঁটছে তারা। পথ কখন শেষ হবে তারা কেউই জানে না। কেবল জানে সোজা এই পথেই পৌঁছাতে হবে তাদের। একটি সেতু। অনেক বড়। আশ্চর্য সুন্দর। রাতে হাজার বাতির নিয়ন আলো সেই সেতুর চারদিকের অন্ধকারে সোনারঙে ছড়িয়ে পড়ে। বহু দূর থেকে দৃশ্যমান সেই সেতু। তার নিচে উত্তাল জলরাশি। সেই জলরাশি নিজেদেরকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় নদী থেকে সাগরে। দুরন্ত দুই কিশোর জানে সেই নদীর কাছেই পৌঁছাতে হবে তাদের। সেই নদীর নাম পদ্মা। সেখানে পৌঁছাতে হাঁটতে হবে তাদের আরো বহু দূরের পথ। অনেকটা পথ হেঁটে তারা ক্লান্ত। তাদের পা ফুলতে শুরু করে। পায়ের তালুতে ফোসকা পড়ে।
আর তো আঁডিত ন পারির। এন্ডে এক্কানা বোই… বলতে বলতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে দিলু। দম বন্ধ হয়ে আসতে চায় তার। বলে, উহ্! পা দুইয়ান মনে অদ্দে চিঁড়ি যারগুই।
তুই অল্পত কাহিল অই যাস। আয় কষ্ট গরি আঁর পিডত ওঠ। আঁই কদ্দুর রাস্তা তোরে পিডত গরি লই যাই।
তুই আঁরে পিডত লই যাইতু পারিবি?
কষ্ট যেত্তে অর তকন আরেক্কানা কষ্ট গরি। আয় আঁর পিডত উঠ। রাজপথে পড়ে থাকা নিজের শ্রান্ত দেহটি রাকিবের পিঠে এলিয়ে দিয়ে পেছন থেকে রাকিবের গলা জড়িয়ে ধরে দিলু। দুটো পা চারটি পায়ের ভার বহন করে এগিয়ে যেতে থাকে সামনের দিকে।
আরো কিছুটা পথ যাবার পর তারা দেখে দূরে আলোর ফোয়ারা। এই তো তাদের গন্তব্য! সেই সেতু! আর সেতুটিকে ঘিরে আলো আর আলো। রাকিব বলে, আঁরা তো সেতুর কাছাকাছি চলি আইজ্জি। টের পরনা সেতুর বাত্তি আইয়ারে পরেদ্দে আঁরার মুখত!…
বলতে বলতেই তাদের মুখে হঠাৎ এসে পড়ে আলোর ঝলকানি। কীসের এত আলো! সেতুর না কি অন্য কিছুর! কড়া সুরে বাঁশির শব্দ বাজে। পুলিশ নয় তো? ঘুমজড়িত গলায় চিৎকার করে ওঠে দিলু, পদ্মা সেতু! পদ্মা সেতু।
অই! কী রে, খোয়াব দেইক্কুইস না? -প্রায় ফিসফিসিয়ে বলে রাকিব।
অ্যাঁরা একন হন্ডে। দিলুর প্রশ্ন।
চুপ হর। পুলিশ গাড়িরে আটগাইয়ে দিয়ের! তল্লাশি গরের। নিচু গলায় বলে রাকিব।
দিলুর কণ্ঠে ভয়, অ্যাঁরারে যদি দেখি ফালায়?
পা উর মিক্কা তুলি ফালা। এত নিচত পুলিশ টর্চ মাইত্তো ন। চুপ গরি থাক। আল্লাহ আল্লাহ গর।
তারা দু’জন গাড়ির যেখানে বসে আছে সেখান থেকে পায়ের নিচের অংশ ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। পুলিশের কথা অস্পষ্টভাবে কানে আসে। পুলিশ লাগেজ বক্স খুলতে বলে। কয়েকটা ব্যাগ বের করে। ব্যাগের মালিকদের ডেকে ব্যাগ খোলায়। এসব করতে করতে দশ মিনিটের মতো গড়িয়ে যায়। সন্দেহজনক কিছুই পাওয়া যায় না। পুলিশ সুপারভাইজারকে ইশারা করলে বাসটি ফেণীর পথে চলতে শুরু করে। বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া রাজপথে বাসটি গর্তের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা সাপের সর্তকতায় ঢুকে পড়ে লোকালয়ে। যেন আবার কোথাও জটলা দেখলেই নেমে পড়বে ঝোপেঝাড়ে বা জলাভূমিতে। দক্ষিণের বাতাসের আঁচড় এসে লাগে বাসের শরীরে। ড্রাইভারের শরীর শিরশির করে ওঠে। হেলপারকে বলে, অই বদি, পানের খিলিডা খুইলে দে, খানিকক্ষুণ পান চাবাই। বদি বলে, উস্তাদ, গত দুইদিন ধইরে তো টানা টিপ মারতেছেন। ইবার ক্ষ্যেমা দেন।
বাসের মুদু দুলুনী, আষাঢ়ের বৃষ্টি, তার সঙ্গে শীতল হাওয়া যাত্রীদের চোখে ঘুমঘোর এনে দেয়। হঠাৎ একটি ভরাট কণ্ঠস্বরে তাদের ঘোর কেটে যায়।
সম্মানিত যাত্রীবৃন্দ, আপনাদের মনোযোগ আকর্ষণ করছি। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের বাস কুমিল্লায় নির্ধারিত যাত্রা-বিরতির জন্য হোটেল থ্রি স্টার-এ অবস্থান করবে। যাত্রা-বিরতিকালে আপনাদের ব্যক্তিগত ব্যাগ, লাগেজ ইত্যাদি নিজের সঙ্গেই রাখবেন। হারিয়ে গেলে বা চুরি হলে বাস কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। আমাদের যাত্রা-বিরতির সময় মাত্র বিশ মিনিট। আমাদের গাড়ির নম্বর, ঢাকা-মেট্রো-গ ৪৮৩৪। আবারো বলছি, আমাদের গাড়ির নম্বর, ঢাকা-মেট্রো-গ ৪৮৩৪।
সুপারভাইজারের কথা বলা শেষ হতেই গাড়িটি বাম দিকে ঘুরে হোটেল থ্রি ষ্টার-এ ঢোকার মুখে হঠাৎ বিকট শব্দ হয়। ব্যাপার কী, যাত্রীদের বুঝে উঠতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগে।
আরে কী হল! এত শব্দ কেন?
গাড়ির সামনের বাম দিকের চাকা বার্স্ট করেছে।
যাত্রীদের ভেতর কেউ একজন বলে ওঠে, সুপারভাইজার, যাত্রা-বিরতি আর দিতে হবে না। অটো যাত্রা-বিরতি হয়ে গেছে।
অতঃপর বাসটি ধীরেসুস্থে হোটেলে পার্কিং করে। যাত্রীদের নামার তাড়া নেই। চাকা পাল্টে নতুন চাকা লাগাতে সময় লাগবে। ড্রাইভার, সুপারভাইজার আর হেলপার নিজেদের মধ্যে শলা-পরামর্শ করে নেয়। গাড়ীর পেছনে রাখা অতিরিক্ত চাকাটি খুলে এনে লাগাতে হবে। হেলপার টুলবক্স থেকে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে অতিরিক্ত চাকাটা খুলতে গিয়েই থমকে যায়। হইচই লাগে। হেলপারের চোখে যেন ঘোর লেগে যায়। সে কিছু একটা দেখে। অবিশ্বাস্য! বাপের জন্মে এমন কিছু দেখে নাই সে। সে চোখ বড় বড় করে দেখে। ঘোর কাটাতে দুহাতে চোখ ডলে নিয়ে আবার দেখে। না। ভুল দেখছে না সে। দুই কিশোর গুটিসুটি মেরে বসে আছে চাকার ভেতর। রাকিব আর দিলু।

৩.
গাড়ির পেছনে চাকা রাখার জন্য লোহার একটি ফ্রেম থাকে। সেই ফ্রেমের সঙ্গে চাকা রাখা হয়। রাকিব আর দিলু ফ্রেমে রাখা চাকার ভেতর জড়োসড়ো হয়ে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে। তাদের পা জোড়া নিচের দিকে ঝুলছে আর দুজনই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মুখে পড়া টর্চের আলোর ঝলকানি আর চিৎকারের শব্দে তাদের ঘুম ভাঙে। হতচকিত হয়ে তারা ভয়ার্ত চোখে তাকায়।
এই, তুরা কারা রে? চাকার মইদ্যে কহন ঢুকিচিস রে তুরা? বারা, বারা আয় কচ্চি শিগগির ওখেনতে!
গাড়ির হেলপার, সুপারভাইজারের মুহুর্মুহু প্রশ্নের কোনো উত্তরই দেয় না তারা। ঘাড় গোঁজ করে বসে থাকে নির্বাক। দুজনেরই মাথা ভর্তি চুল, পরনে ফুল হাতা গেঞ্জি, আর জিন্স প্যান্ট। কাপড়গুলো এতই নোংরা যে আসল রঙটাই প্রায় হারিয়ে গেছে। গেঞ্জির কলার আর প্যান্টের হাটুর নিচে ছেঁড়া।
তুরা কতা কইসনে না ক্যারে? চাকার মইদ্যি কহন ঢুকিচিস? আর যাবি কোনে তুরা? জবাব দে কচ্চি! না হলি পরে পুলিশ ডাকপনে কলাম। আশেপাশেই পুলিশ আছে।
রাকিব প্রশ্নকর্তাদের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। সে কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করে। দিলু সত্যি ভয় পায়। হাতে থাকা পলিথিনের প্যাকেটটা নিয়ে সে মোচড়ামুচড়ি করে।
রাকিব বলে, আঁরা গরীবউল্লাহ শাহ্ মাজারোত থাগি। গাড়ি ইয়ান মাজারোর ইয়ততুন ছাড়োনোর আগে দুজনে পিছদি ঢুকি চাক্কার ভেতর বই গেই।
জানিস কত বড় বিপদ হয়া যাইত? আর তুরা এম্মা ক্যা গাড়িত উটলি? যাবি কোনে?
ততক্ষণে তাদের ঘিরে যাত্রীর ভিড় বাড়তে শুরু করে। হোটেলের সব জায়গায় মুহূর্তে সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে বিসমিল্লাহ গাড়ির চাকার ভেতর আবিষ্কৃত দুই কিশোরের গল্প। চারপাশে মানুষের জটলা দেখে রাকিবের ভয় বাড়ে। দিলুর মুখটা বিবর্ণ থেকে বিবর্ণতর হয়। রাকিব আবার বলে, আঁরা খবর লই গাড়ি ইয়ার পদ্মা সেতুর উদ্দি যাইব। আঁরাত্তে গাড়ি ভাড়া নাই। আঁরা পদ্মা সেতু চাইবারলাই নিয়ত গইজ্জি। সেতু চাইবারলাই আঁরা গাড়ির চাক্কার ভিতরে ডুক্কিগুই।
জটলার ভেতর থেকে শোনা যায়, অ বাজিরে! তোঁরার তো সাহস কম ন। জীবন বাজি লইয়ারে পদ্মা সেতু চাইবারলার যরগুই। এই তোঁরার বাড়ি হন্ডে রে?
রাকিব বলে, আঁর বাড়ি কুতুবদিয়া!
জটলা দিলুকে উদ্দেশ্য করে বলে, অই, তোর বাড়ি হন্ডে?
রাকিব এবার দিলুকে হালকা করে ধাক্কা দেয়। দিলু এমন ঘটনায় পুরোপুরি বাকহারা ছিল এতক্ষণ। এবার সে কথা বলে, আঁর বাড়ি টেকনাফ।
বাহবা! ডাইরেক্ট ইয়াবার জায়গার!
দুজনের বাড়িই তো কক্সবাজার! ওরা কোনো ড্রাগস পাচারের সাথে যুক্ত কি না কে জানে! কথাটা কেউ একজন বলতে না বলতেই গাড়ির হেলপার দিলুর হাতের পলিথিনটা ছোঁ মেরে নিয়ে দেখতে থাকে ভেতরে কী আছে।
রাকিব বলে, গাড়িত উডোনোর আগে মাজারোত্তুন কদুগগুন তবুরুক লইলাম। দুজনে অল্প খাই আর অল্প রই গেইয়ে।
ভিড়ের ভেতর অতি উৎসাহী লোকজন তাদের শরীরের বিভিন্ন অংশে হাতড়ানো শুরু করে। দুজনের প্যান্টের পকেট থেকে পাওয়া যায় সর্বসাকুল্যে তিনশত পঁয়ত্রিশ টাকা। এবার হোটেল কর্তৃপক্ষ এসে মানুষের জটলা কমানোর চেষ্টা করে। রাকিব আর দিলুকে তারা হোটেলের ভেতরে নিয়ে যায়। হোটেলের একজন, গাড়ির ড্রাইভার আর যাত্রীদের মধ্যে কয়েকজন একটি টেবিলে রাকিব আর দিলুকে নিয়ে বসে। সুপারভাইজার আর হেলপার গাড়ির চাকা লাগানোর কাজে হাত দেয়।
রাকিব আর দিলুর ভয় কিছুটা কমে। রাকিব কানে কানে দিলুকে সাহস দেয়। নানান প্রশ্নের জবাবে জানা যায়, রাকিবের মা মারা যাবার পর তার বাবা আবার বিয়ে করায় সৎ-মায়ের সংসারে আর ঠাঁই হয়নি তার। অবশেষে চার বছর আগে একদিন ট্রাকে চেপে সে চলে আসে চট্টগ্রাম শহরে। তার ঠাঁই হয় গরীবউল্লাহ শাহ্ মাজারের সিঁড়ির আনাচে-কানাচে। এখানে আসার পর তার দেখা হয় দিলুর সঙ্গে। দিলুর মা-বাবা কেউই নেই। দিলু কোলে থাকতেই তারা মারা যায়। নানীর কাছে বড় হয়েছে দিলু। নানী মারা গেলে সে-ও নদীর জলে ভেসে আসা কচুরিপানার মতো এসে ঠাঁই নেয় চট্টগ্রাম শহরে। এখন তারা দুজনই দিনের বেলা ভাঙারির কাজ করে। গরীবউল্লাহ শাহ সোসাইটিতে ঢোকার মুখের একটি ভাঙারি দোকানে তারা সারাদিনে সংগ্রহকৃত সব ভাঙারি জমা দেয়। যেদিন ভালো জিনিসপত্র কুড়াতে পারে সেদিন সর্বোচ্চ সত্তর টাকা পায়। কোনো কোনো দিন তারা কাজ করে না। মাজারে খাবার জুটলে খায়, নইলে না খেয়ে থাকে।
তো তুরা পদ্মা সেতু দেখার জন্যি পাগল হলি ক্যারে?
দিলু বলে, সেতু চালু অইয়ে দে এ কথার লাই দুই-তিন দিন আগে মানুষ কদুগগুন মাজারোত ফাতেয়া দিইয়ে। চাইরো মিক্কা পদ্মা সেতু লইয়ারে কথা আর কথা। আঁরাত্তে লাই শখ অইয়ে পদ্মা সেতু চাইবার লাই।
টেবিলে জড়ো হওয়া লোকেরা একে অন্যের চোখের দিকে তাকায়। আশেপাশের টেবিলে বসা যাত্রীরা খাবার খেতে খেতে বার বার তাকায় রাকিব আর দিলুর দিকে। হোটেলের লোকটি ওয়েটারকে ডেকে রাকিব আর দিলুকে খাবার দিতে বলে। টেবিল থেকে উঠে ড্রাইভার, হোটেলের লোকটি আর কয়েকজন যাত্রী নানা হিসেব-নিকেশ করে একটি সিদ্ধান্তে আসে। এমন কাণ্ড, যাত্রা-বিরতি, বাসে নতুন চাকা, এসব শেষ হতে একঘণ্টা পেরিয়ে যায়। ততক্ষণে গাড়ির চাকার মধ্যে কিশোর আবিষ্কারের ঘটনার উত্তেজনা কমে হোটেলের পরিবেশ অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে আসে। রাকিব আর দিলুকে গাড়িতে তোলা হয়। দুজনে ড্রাইভারের পাশে ইঞ্জিন কভারের ওপরে বসার জায়গা পায়। মনে মনে দারুণ খুশি হয়ে যায় তারা। সুপারভাইজার জানায়, বাস পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে যাবে। তাদের সেতুর কাছাকাছি কোথাও নামিয়ে দেওয়া হবে। হাতে থাকা মাজারের খাবারের পলিথিনটা শুধু ফেরত দিয়ে সুপারভাইজার বলে, টাকাগুনো কিন্তুক আর পাবি নানে তুরা, উডা তোগের গাড়িভাড়া, বুচ্চিস?
-কথাটা লোকটা এমনভাবে বলে যেন ভীষণ কোনো গোপনীয় কোনো কথা বলছে, পাছে আর কেউ শুনে ফেলে সে কথা। দিলু বা রাকিব কারো মুখেই কোনো কথা ফোটে না আর। তারা একে অন্যের দিকে বার বার তাকায়। তাদের মুখে হাসি। অমন কত টাকা ভবিষ্যতে আসবে হাতে! ফু! তারা স্বপ্নের পদ্মা সেতুর পথে। এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী আছে জীবনে!

৪.
আবার শুরু ঝুম বৃষ্টি। গাড়ির সামনের আয়নার উইপার দারুণ নাচের ছন্দে বৃষ্টিতে ঝাপসা হয়ে আসা কাঁচ পরিষ্কার করে পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়। সামনে বসা রাকিব আর দিলুর চোখ আটকে যায় আলো-আঁধারে গাড়ির সামনের কাঁচে বৃষ্টিজলের তৈরি করা অসামান্য কারুকাজে। বাস গৌরিপুর এলে লম্বা জ্যামে পড়ে। গভীর রাতে বৃষ্টির দাপটে রাজপথ জ্যামমুক্ত হতে দীর্ঘ সময় লাগে। রাত তিনটার দিকে রাস্তা ফাঁকা হলে বাসটি আবারো দাউদকান্দির বুকের ওপর দিয়ে ছুটতে থাকে। রাকিব আর দিলু যাত্রা-বিরতিতে ভরপেট খাওয়ায় তাদের চোখে ঘুমের নেশা লাগে। মাথা নিচের দিকে ঝুলে পড়ে ঘুমে। শরীর দুলতে থাকে বাসের গতির সাথে তাল মিলিয়ে। ড্রাইভার বলে, অই পোলারা, ঘুমায়া পড়লি হবি? ঘুমালি আর পদ্মা সেতু দেখা লাগবি নানে, সুজা সাঁইজীর মাজার!
বাস কি কেবল রক্ত-মাংসের কিছু মানুষকেই বহন করে নিয়ে যায় এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়? না কি সাথে বহন করে নিয়ে যায় সেসব মানুষগুলোর জীবনের ছোট ছোট স্বপ্নও? বুকের মধ্যে স্বপ্ন বহন করে ছুটে চলা এই মানুষগুলোর কত বিচিত্ররকম চরিত্র! কেউ সৎ, কেউ অসৎ। কেউ সাধু, কেউ ভণ্ড। কারো জন্য একান্ত আপনজন অপেক্ষা করে, পথ চেয়ে থাকে, আবার কারো বা অপেক্ষা করার মতো কেউ-ই থাকে না। তবু সবাই ছোটে। ছুটতে ছুটতে কেউ-বা আলোর দেখা পায়। কেউ-বা তলিয়ে যায় অন্ধকারে। এতকিছুর মাঝেও প্রতিটি মানুষেরই নিজস্ব এক পথ থাকে। এ পথ একাধারে আনন্দ বা বেদনার নয়। তবুও জীবনের পথ পাড়ি দিতে মানুষ সংকল্পবদ্ধ হয়। রাকিব আর দিলুর চোখে-মুখে ফুটে ওঠা সংকল্পরেখা গভীর রাতে ঝাপসা হয়ে আসে। দিলু ক্লান্ত মাথা এলিয়ে দেয় রাকিবের কাঁধে। গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় সে।

৫.
রাকিব আর দিলুর চোখে ধরা দেয় অগণিত নিয়ত বাতির আলো। তারা পরিষ্কার বুঝতে পারে অনেক বড় একটি সেতুর কাছাকাছি তারা চলে এসেছে। তাদের ঝিমিয়ে পড়া শরীর সহসা সজাগ হয়ে ওঠে।
দিলু জিজ্ঞ্যেস করে, ইবা কি পদ্মা সেতু না?
জবাব আসে, হ, ইডাই পদ্মা সেতু!
রাকির সাথে সাথে বলে, এত তাড়াতাড়ি চলি আইচ্চি না পদ্মা সেতুত?
আমরা তো সর্টকার্টে চইলে আইছি। তুরা তো আর রাস্তা চিনিস নে।
বাস এসে ব্রীজের কাছে থেমে যায়। ড্রাইভার বলে ওঠে, ঘুমালি আর পদ্মা সেতু দেখা লাগবি নানে, সুজা সাঁইজীর মাজার।
হেলপার বাসের দরজা খোলে, এই ছেড়ারা নাইমে পড় তাড়াতাড়ি। ডাইন হাতে দরজার হ্যান্ডেল ধর, নামার সুময় বাম পা আগে দিস।
সুপারভাইজার বলে, নাম, নাম তাড়াতাড়ি। আইসে পড়ছি পদ্মা সেতুত।
হেলপার একরকম ধাক্কা দিয়েই তাদের বাস থেকে নামিয়ে দেয়।
মুহূর্তে দু’জনে নেমে কোথায় দাঁড়িয়েছে সেটা বুঝে ওঠার আগেই বাসটি দ্রুতবেগে চলে যায় তাদের পাশ কাটিয়ে। গভীর রাতের অন্ধকারে দুজোড়া নবীন চোখ সামনে দণ্ডায়মান সুদীর্ঘ সেতু দেখে অভিভূত হয়। রাকিব দিলুর হাত ধরে। ছোট ছোট পায়ে পা বাড়ায় সেতুর দিকে। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়। তাদের শরীর ভিজে চুপসে যায়, সেদিকে খেয়াল থাকে না কারো। বিম্ময় আর উত্তেজনায় তাদের শরীর-মন উদ্বেলিত। তাদের কচি পা সেতুর বুক স্পর্শ করতেই শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ জাগে। মনে হয় সেতু যেন নিবিড় মমতায় তাদের বুকে তুলে নেয়। বৃষ্টির বেগ বাড়তে থাকে। দিলু বলে, বৃষ্টি তো বেশি পড়ের, চল লোয়ার পিলারোর নিচে যাই। বৃষ্টি ন কমন লত এন্ডে বোই থাগি।
দিলুর কথায় সায় দেয় রাকিব। দুজন পিলারের নিচে গিয়ে দাঁড়ায়। তাদের চোখ যায় নদীর জলে। নদীর জলে স্থির ভেসে থাকে ছোট বড় লঞ্চ। সেগুলোর আলো নদীর পানিতে পড়ে। সেখানে আলো আর অন্ধকারে তৈরি হওয়া অদ্ভুত রহস্যময় আবহে তাদের চোখ আটকে যায়। তারা প্রথম বিমোহিত হয়েছিল সেদিন, যেদিন সন্ধ্যায় দুই বন্ধু মিলে দেখতে গিয়েছিল কর্ণফুলী নদী। সেদিন, বিমুগ্ধ, অস্থির হয়ে উঠেছিল তাদের চোখ। সেদিনের কথা হঠাৎই এখন মনে পড়ে তাদের। রাকিব গুনগুন করে গান ধরে, মধু হই হই বিষ হাওয়াইলা, হন হারণে বালোবাসার দাম ন দিলা…
হঠাৎ গান থামিয়ে বলে, বৃষ্টি কইম্যে, ল চল। দুজনে দৌড়াতে থাকে। এ যেন দুই কিশোরের স্বপ্ন ছোঁয়ার প্রতিযোগিতা। এখানে হার-জিত দুজনের কাছেই সমান। তারা দৌড়ায়, ব্রীজের রেলিং ধরে নদীর দিকে তাকায়, নদীর পাড়ে চোখ যায়। বড় বড় ফ্যাক্টরি তাদের চোখে পড়ে। ব্রীজ দিয়ে শ’য়ে শ’য়ে বাস, ট্রাক, লরি, নানান যান দুপাশে দ্রুত বেগে চলে। যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, সেদিকে কারোর-ই কোনো হুঁশ থাকে না তাদের। তারা আবার দৌড়ায়। এক সময় তারা ব্রীজ পেরিয়ে যায়। দিলু বলে, আল্লাহ রে, কত্তবড় সেতু!
হঠাৎ তেড়ে আসা বাঁশির শব্দে তারা সচকিত হয়। ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রকের পোষাক পরা একজন তাদের থামায়।
কই যাও তোমরা?
রাকিব বীরের মতো উত্তর দেয়, আঁরা পদ্মা সেতু চাইবারলাই আইচ্ছি দি!
তো এখানে কী করছ? এটা তো পদ্মা সেতু না।
রাকিব আর দিলু চমকে একজন অন্যজনের দিকে তাকায়!
রাকিব বলে, ইয়ান পদ্মা সেতু ন?
আরে না। পদ্মা সেতু তো ঢাকা পার হয়ে মাওনা গিয়ে তারপর! কথাগুলো বলতে বলতে লোকটি হাতের ইশারায় পথ দেখিয়ে দেয়।
তইলে ইয়ান কন সেতু?
এইটা তো মেঘনা সেতু!
মেঘনা সেতু! -রাকিব আর দিলু একসঙ্গে বলে ওঠে।
সামনের টোল ব্রীজের পরে বাস থামে, যাত্রী ওঠা-নামা করে। পদ্মা সেতু গেলে তোমরা সেখান থেকে বাস পাবে। জিজ্ঞাসা করে সেগুলোর কোনো একটাতে উঠে যাও।
কথাগুলো বলেই লোকটি আবার তার কাজে লেগে যায়। দিলু কান্না শুরু করে। দিলুকে শুনিয়ে রাকিব বলে, দেইককুইস না, সোদানির পোয়া অক্কল আঁরার লগে চিটিংগিরি গরি ফালাইয়ে! তুই সোদানিরপুয়া আবার কান্দর ক্যা? পদ্মা সেতু চাইবারলাই এদ্দুর যেত্তে আইচ্ছি সেতু ন চাইয়ারে ফেরত ন যাইউম।
দিলু কান্নার স্বরে বলে, অ্যাঁরার টিইয়াফয়সা তো লই গেইয়েগুই। যাবি ক্যানে?
রাকিব এবার আর কান্না চেপে রাখতে পারে না। ভারি হয়ে আসে তার কণ্ঠস্বর। বলে, পা দুইআন আছে কিঁল্ল্যাই। আঁরা আঁডি আঁডি যাইয়ুম।
বলতে বলতে তারা হেঁটে মেঘনার টোল ব্রীজ পেরিয়ে সামনের দিকে এগোয়। দিলু কান্না ছেড়ে অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে আসে ততক্ষণে। রাকিব জানে, দিলু বেশি হাঁটতে পারে না। সে বলে, তুই সোদানির পুয়া আঁর পরানোর দোস্ত। আঁডিত ন পাইল্যে তোরে কাঁধত লই ফালাইয়ুম। আল্লাহ বরসা।
কিছুক্ষণ হাঁটার পর তারা রাস্তায় জ্যাম দেখতে পায়। সড়কে গাড়ি স্থির দাঁড়িয়ে আছে। হেঁটে আরেকটু সামনে যায় তারা। শুনতে পায় লোকজনের চিৎকার আর দেখতে পায় ব্যস্ততা। আরেকটু কাছে গিয়ে দেখে বাম পাশে একটি বাস খাদে পড়ে আছে। লোকজন বলাবলি করে বৃষ্টির কারণে ড্রাইভার সামনের দিকে দেখতে না পেয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তা থেকে খাদে গিয়ে পড়েছে। আহা রে! কয়েকজন লোক মনে হয় মারা গেছে। বাসের যাত্রীদের উদ্ধারের কাজ চলছে। রাকিব আর দিলু একজন অন্যজনের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। নীরবে যেন একজন অন্যজনকে বলে, ইয়ান তো সেই বাস! যেক্কানা আঁরা উডিজ্জি!
তারা দেখে বাসের যাত্রীদের কারো মাথা ফেটে গেছে, কারো হাত কাটা পড়েছে। কেউ-বা জ্ঞান হারিয়েছে। তাদের দুজনকে এখানে কেউই চিনতে পারে না। অথচ ঘণ্টাখানেক আগে তারাই ছিল এই মানুষগুলোর কাছে বিস্ময়! দিলু রাকিবকে বলে, চল, আঁরাও কামত লাগি পরি। পদ্মা সেতু যাওনোর চিন্তা পরে গইজ্জুম। মানুষ উনোরে আগে বাঁচান পরিবু।
রাকিবের কথায় দিলু কোনো সাড়া দেয় না। রাকিব খাদের দিকে পা বাড়ায়; খেয়াল করে দিলু নেই। পেছনে ফিরে দিলুকে ডাকে, দিলু কোনো সাড়া দেয় না, স্থির দাঁড়িয়ে থাকে; কোনো এক ভাবনার রাজ্যে যেন ডুবে থাকে সে। রাকিব এসে দিলুকে মৃদু ধাক্কা দেয়। দিলু এবার সজাগ হয়। কী রে? আর কত গুমাবি? আঁরা পদ্মাসেতুর কাছাকাছি চলি আইজ্জি!
দিলু তখনও ঘোরে। ঘুমে দেখা স্বপ্ন আর বাস্তবতার ফারাক বুঝতে সে হিমশিম খায়। তার চোখে তখনো স্বপ্নের ঘোর। গাড়ি থেকে ভুল জায়গায় নামিয়ে দেওয়া আর পথে ঘটা এক্সিডেন্টের দৃশ্যটা স্পষ্ট চোখে ভাসে তখনো তার। সে থই হারিয়ে ফেলে। রাকিব এবার তাকে সজোরে ঝাঁকুনি দেয়। ড্রাইভার গাড়ির গতি কমিয়ে আনে। বাস পদ্মা সেতুর ওপর উঠে পড়ে। হেলপার সজোরে হাঁক দেয়, এই, তুমরা এইখেনেই নাইমে পড়। বাম পায়ে, সাবধানে নামবা কিন্তু!
গাড়ির ঘুমন্ত যাত্রীদের কেউ কেউ জেগে ওঠে। কেউ কেউ আবার পাশের যাত্রীটির ঘুম ভাঙিয়ে দেয়।
– এই আমরা এখন পদ্মা সেতুতে!
– ছেলেগুলো নেমেছে?
– এইতো নামল।
– বাহবা, সাহস আছে বলতে হয়।
– নতুন কিছু করতে হলে সাহসের দরকার হয় বইকি!
বাসটির এখন সেতুর বিশালতায় হারিয়ে যাওয়াতেই আনন্দ। রাকিব আর দিলুর চোখে বাসের ধাতব অবয়ব ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসে। দিলুর ঘোর তখনো কাটেনি। ভাবে, বাসের ভেতরে বসে ভোর রাতে দেখা স্বপ্নটা রাকিবকে বলতে হবে। রাকিব তার হাত ধরে টান মারে জোরে। বলে, দিলু দুরিত পারিবি না?
-পাইজ্জুম!
বলেই দুজনে দৌড়াতে শুরু করে। পূবের সদ্য উঁকি দেওয়া নবীন সূর্যের আলো তাদেরকে হাতছানিতে বরণ করে নেয়। তাদের চোখে-মুখে অপার বিস্ময়, বিজয়ের হাসি, চোখে চিকচিক করে জল। জীবনের সূচনালগ্নেই তার রুদ্ররূপের সঙ্গে সম্যক পরিচিত হতদরিদ্র দুই কিশোরের চোখে নামে অপার বিস্ময়, ঘোর। বিমুগ্ধ বিস্ময়ে তারা দেখে, তাদের সামনে ভোরের আলো-অন্ধকারে দারুণ ঋজুতায় রহস্যময় অবয়বে দাঁড়িয়ে একটি জাতির সোনালী স্বপ্ন, একটি সেতু, একটি যুদ্ধজয়ের অসামান্য ইতিহাস। নিজেদের অজান্তেই মুষ্টিবদ্ধ হয় দুই কিশোরের হাত। দৃঢ় হয় তাদের অপুষ্ট পেশি।
*************************************

Leave a Reply