You are currently viewing সুখের অসুখ || পলি শাহীনা

সুখের অসুখ || পলি শাহীনা

সুখের অসুখ
পলি শাহীনা

লণ্ডভণ্ড অবস্থায় ট্রেনে উঠে স্বস্তির শ্বাস ফেলি। ভোরের শীত আর আমার হৃদপিন্ড সমান্তরালে লাফাচ্ছে। এই এক আশ্চর্য শহর, রাস্তায় কখন, কোথায় ভয়ানক জ্যাম বাঁধবে, আগে থেকে বলা যায় না। এত সকালে যে যানবাহনের এমন অস্বাভাবিক ভীড় হবে, একদম ভাবি নি। ট্রেনটা বোধহয় মিসই করে ফেলব, এই দুঃশ্চিন্তায় ঘড়ির কাঁটার মতো পুরো পথ আমার বুকটা ধুকপুক করছিল। ভাগ্য ভালো, ঝুঁকি নিয়ে চালক গাড়িটা সরু গলি ধরে নিয়ে এসেছে, নইলে আজ আর গ্রামের বাড়ি যাওয়া হতো না। স্টেশনে এসে পুনরায় বাসায় ফেরত যেতে হতো, এই ভাবনায় আবারও ছটফটানি বোধ করলে হ্যান্ডব্যাগটা কোলের উপর রেখে নির্ধারিত আসনে বসে স্থির হওয়ার চেষ্টা করি। সুমন পানির বোতল এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘পানি খাও, এবার শান্ত হও।’ ঢাউস লাগেজটা সীটের নিচে রাখতে রাখতে মেয়েটাও বাবার মতো করে বলল, ‘তুমি এবং বাবা, দু’জনেই টেনশনটা সবসময়, সবকিছুতে একটু বেশীই করো। নিজেরা দিশেহারা হও, সঙ্গে আমাকেও করো।’
বাবা-মেয়ে, ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে এবার আমি নীরব থাকি। কী যে ভালো লাগছে ওদের একই সুরে, একসঙ্গে কথা বলতে দেখে। পৃথিবীর সব আলো যেনো ফিরে পেয়েছি। আমার সুখের চাঁদ অসুখের ঢেউয়ে ডুবতে ডুবতে ভেসে উঠছে, কী যে সুখ লাগছে। সৃষ্টিকর্তাকে মনে মনে ধন্যবাদ দিই, তিনি আমাকে এমন আদুরে একটি কন্যাসন্তান, এবং গভীর প্রেমময় জীবন সঙ্গী উপহার দিয়েছেন। বাবা-মেয়ে গল্পে মজেছে, সেদিকে তাকিয়ে ভাবি, আমি মর্ত্যে আছি তো! গত বেশ কয়েকদিন এমন বিষন্ন সময় পার করেছি, এখন আর তা মনেও করতে চাই না। সেই দুঃস্বপ্নের মতো সময়টাকে চিরতরে বিদায় দেয়ার জন্যই তো এমন আয়োজন করে গ্রামের বাড়িতে, প্রকৃতির কোলে যাচ্ছি। সত্যি বলতে কী, আমার সুখের সংসারে, স্বস্তি আর শান্তির আবহে হঠাৎই না বলে না কয়ে যেনো এক অস্বাভাবিক অসুখ ঢুকে পড়েছে, কোনভাবেই আমি এর সমাধান খুঁজে পাই না।
আমার জীবন, কিংবা জীবনের গল্প অত্যন্ত মসৃণ, অল্প কয়েক কথায় সেরে ফেলা যায়। সুমনের হাতে আমার হাত রাখি তেইশ বছর আগে। তেইশ বছরের ছায়াকে বুকে জড়িয়ে আজো সেই প্রথম দিনের মতো বাসন্তিক কবিতা নিশ্চুপে আওড়াতে থাকি মনের অন্দরে। আমাদের ছায়ার মায়ায় চারদিক আলো করে ফুটে একমাত্র কন্যা, তিথি। সুমন ওকে আদর করে ডাকে, ফুল। এরপর, আমার সংসারে ফুলের সুবাসে এক আশ্চর্য সুখ দ্বিপ জেগে উঠে, যে দ্বিপে আমার সমস্ত আশা, ইচ্ছে নিবারণ হয়। আমি স্বর্গীয় দ্বিপে হাঁটি, আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠি। আমার জীবন গল্পের হাসিখুশি ইতি হতে পারতো এখানেই।
কিন্তু, আয়নার মতো স্বচ্ছ, সুন্দর, শান্ত সুমন খিটমিটে, একরোখা হয়ে ওঠে। আমার চিন্তাহীন, ভয়হীন, ভাবনাহীন সুখ দ্বিপে আচমকা অন্ধকার নেমে আসে। ওর অনমনীয় আচরণে আমি মুহর্মূহ দুলে উঠি। কী হয়েছে বলি! গত কয়েকমাস ধরে ধর্ষণ, নারী ও শিশু নিপীড়নের হার বেড়েই চলছে ক্রমাগতভাবে। ধর্ষণের হাত থেকে প্রতিবন্ধী শিশু, গর্ভবতী নারী কেউই বাদ যাচ্ছে না। এছাড়াও নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতা ও শারীরিক নির্যাতনের ঘটনাতো আছেই। আইন পরিবর্তন করেও ধর্ষণ ও নারী নিপীড়ন ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। এতো ধর্ষণ, এতো রক্ত, এতো বীভৎসতা, এতো অকাল মৃত্যু কোনো মানুষ সহজে নিতে পারার কথা নয়। খবরের কাজগ পড়ে, টেলিভিশনে সংবাদ দেখে আমি মুখে যান্ত্রিক হাসির রেখা টেনে শান্ত থাকার চেষ্টা করলেও নরম স্বভাবের সুমন ভীষণ ভেঙে পড়ে। ও হাসে না, আমি এমনকি মেয়েটার সঙ্গেও কথা বলে না। অফিস থেকে বাসায় এসে রুমের আলো না জ্বালিয়েই চুপচাপ শুয়ে থাকে। ওর শরীর, মনের উপর চলমান সময়ের আঁচড় পড়েছে মারাত্মকভাবে, বুঝতে পারি। এই সময় আমার চোখের সামনে ভেসে উঠে, সুমনের মন ছুঁয়ে যাওয়া হাসিভরা মুখটা, যে হাসি আমাকে উতলা করে দিতো। মনে পড়ে, সুমন বরাবরই ছিলো প্রত্যুপন্ন মস্তিষ্কের অধিকারী। ওর ক্ষুরধার উপস্থিত বুদ্ধি, রসবোধ এমন টইটম্বুর ছিলো যে, ঘন্টার পর ঘন্টা ওর সঙ্গে কথা বলেও বোর হতাম না। উচ্চস্বরে কথা না বলেও হাসিতে, মজায় মাতিয়ে রাখতে ওর জুড়ি ছিল না।
অন্ধকারে পাশে বসে আমি ওর কপালে হাত রাখলে ও হাউমাউ কেঁদে ওঠে। আমার ভেতরের ক্ষরণও সেই কান্নায় নীরবে যোগ হয়। সুমন আমার হাত চেপে ধরে বলে, ‘আমরা আসলে মানুষ নই, অন্যকিছু! আমার ফুল কার কাছে নিরাপদ, বলতে পারো? আত্মীয়ের কাছে? প্রেমিকের কাছে? মুরব্বির কাছে? শিক্ষকের কাছে? বাবার কাছে বলেই ও হড়হড় বমি উগড়ে দেয়। ওর বেগতিক অবস্থা দেখে আমি দ্রুত বাথরুম থেকে ভেজা গামছা এনে চোখমুখ, মাথা মুছে ঠান্ডা পানি খেতে দিই। প্রতিটি ধর্ষণই হৃদয়বিদারক, কিন্তু সম্প্রতি ধর্ষণের ফলে মৃত্যুবরণ করা আছিয়ার ঘটনাটি শুধু সুমন নয়, যে কোনো সচেতন মানুষকেই বিশাল এক ট্রমায় ফেলে দিবে, নিঃসন্দেহে। রাতের খাবার না খেয়েই সুমন ঘুমিয়ে পড়ে।
মাঝরাতে গোঙানির শব্দে ঘুম ভেঙে রীতিমতো অপ্রস্তুত হয়ে পড়ি। দেখি, নামাজের সিজদার মতো করে দুই হাঁটুতে মাথা গুঁজে সুমন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বাচ্চার মতো কাঁদছে। পুরো শরীরটা বিশেষ কায়দায় এমনভাবে বাঁকিয়ে রেখেছে আধো আলো আধো অন্ধকারে, আমি যেনো এক বিকলাঙ্গ, নিরুপায় মানুষ দেখছি। চোখের মণিতে তখন ঝড়ের বেগে ভেসে উঠে সুমনের ছাঁচে গড়া নিখুঁত মুখের গড়ন, টানা উজ্জ্বল চোখজোড়া, চওড়া কাঁধ, ছ’ফুট লম্বা সুপুরুষটা। ওকে জড়িয়ে ধরে কাছে টেনে নিতে চাইলে এক ঝটকায় আমাকে সরিয়ে দিয়ে ও মেয়ের রুমের দিকে হনহন ছুটতে থাকে। গভীর ঘুমে নিমজ্জিত মেয়ের কপালে আদর করে ও কিছুটা শান্ত হয়ে শুয়ে পড়লে জানতে চাই, কী হয়েছে? ও বলে, ‘আমি কিছুদিন যাবত বীভৎস স্বপ্ন দেখছি। দেখি, পুরো শহর কাঁপছে, শহরের প্রতিটি ঘরে মানুষজন ভয়ে হাউমাউ কাঁদছে। কান পেতে শুনি, চারদিকে নারী কন্ঠের আর্তনাদ, সঙ্গে পিতামাতার কান্নার আওয়াজ। পাশের বাসায় সীমার বাবা-মাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে শুনি আমার বাসা হতে তিথির কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। দৌড়ে বাসায় ঢুকতেই আমার মেয়েটা আমাকে জড়িয়ে কাঁদতে থাকে। আমার শ্বাসরোধ হয়ে আসে। ছটফট করতে করতে ঘুম ভেঙে যায়। স্বপ্নে দেখা মানুষের আহাজারি আমাকে এমন ভয়ংকরভাবে প্রভাবিত করে, মনে হয় ঠিক যেনো জাহান্নাম থেকে ফিরে এসেছি। কোনোমতে স্বাভাবিক হতে পারছি না। তিথির কান্নার শব্দ অনবরত কানে বাজছে। শুধু তিথি নয়, মনে হচ্ছে স্বপ্নের প্রতিটি সেকেন্ড ওইটাই আমার আসল পৃথিবী। ঘুম ভেঙে যা দেখছি সেটা আসলে সাময়িক, আমি এই পাহাড়সম ভার আর নিতে পারছি না। মনের ভেতর একটা অজানা আতংক আমাকে অমানুষিক কষ্ট দিচ্ছে।
ওর কথা শুনে আমি পাথর হয়ে থাকি, কী বলবো, ভেবে পাই না।
প্রতিদিন ভোরে নিয়ম করে হাঁটা, হাঁটা শেষে আমার সঙ্গে বসে চা খাওয়া সুমনের শৌখিন অভ্যাস। পরেরদিন ভোরে ও হাঁটতে বের হয় নি, চা খায় নি। বারান্দায় বসে স্থির চোখে রোজকার শহরের গহ্বরে হনহন হাঁটা মানুষের দিকে নিঃসাড় তাকিয়ে থাকে। ওর আপাদমস্তকে সেঁদিয়ে থাকা স্তব্ধতায় আমি অন্ধকার দেখি। আমাদের চায়ের কাপ থেকে জোরসে উঠা ধোঁয়া একসময় উধাও হয়ে চা হিম হয়ে যায়। এদিকে সবেগে ছুটতে থাকে ঘড়ির কাঁটা। অবসন্ন দেহে টলতে টলতে সুমন অফিসে চলে যায়।
ভেতর থেকে ঠেলে উঠা কান্না মটর দানার মতো গুঁড়িয়ে ঘরের জমে থাকা কাজে মন দিই। শিরদাঁড়া টানটান করে মনে মনে বলি, ভয়কে জয় করেই এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে হবে। এই কষ্টের সমুদ্রে নূহের নৌকা আসবে না আমাকে বাঁচাতে। ঠিক তখনই পাশের বাসায় পেপারওয়ালা দরজা নক করে চেঁচিয়ে ডাকার শব্দ শুনে আমি দরজা খুলে দাঁড়াই। পেপার দিয়ে ছেলেটা চলে যাওয়ার সময় বলি, আমার বাসার পেপার কই? ভাবলেশহীন চোখে ও উত্তর দেয়, ‘স্যার পেপার দিতে না করেছে।’ পেপার ওয়ালার কথা শুনে সজোরে একটা ধাক্কা খাই। আমাদের সুখময় দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা ও আন্তরিকতার বাইরেও আছে অসীম বন্ধুত্ব। সুমন আমার মতামত ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেয় না। হযবরল নানান ভাবনা ভাবতে ভাবতে ঘরের দরজা বন্ধ করে কিছু সময় দেয়ালে ঝুলানো আমাদের যৌথ ছবির দিকে অপলক চেয়ে থাকি। ভীষণ মাথা ব্যথা বোধ করলে পেইন কিলার খেয়ে শুয়ে থাকি। ঘুম আসে না, ঘামতে থাকি। কী একটা অজানা ভয় যেনো কণ্ঠনালী চেপে ধরে। উড়না দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে উঠে পড়ি। রোবটের মতো দৈনন্দিন কাজ নিয়মমতো করতে থাকি। কাজ শেষে স্নান ঘরে লম্বা সময় নিয়ে শাওয়ার হেডের নিচে দাঁড়িয়ে থাকি। ফ্রেশ হয়ে সুমনকে কল দিই, ও ফোন ধরে না। ভগ্ন মনে দুপুরের খাবার সেরে টেলিভিশন অন করে দেখি স্ক্রিন ঝিরঝির করছে। অর্থাৎ, বাসার ডিশ লাইনও সুমন বন্ধ করে দিয়েছে। চলমান বিষয়গুলোতে প্রথমে বিরক্ত হলেও পরে একটা ভয় কাজ করতে থাকে আমার মধ্যে।
মধ্যাহ্নের মিষ্টি রোদ আলপনা আঁকছে ঘরের ফাঁক ফোঁকরে। আলো ও ছায়ার জাফরি কাটা এমন আলপনা, এমন কাব্যিক মেলবন্ধন যেনো এই অস্থির পৃথিবীর বাইরের দৃশ্যপট। আমি মুগ্ধ হয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকি। বিকেল ঘনিয়ে এলে টবে দোল খাওয়া গাছগুলোর পরিচর্যায় মন দিই। ফুলের প্রাচুর্যে রঙিন হয়ে ওঠা গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হয়, নতুন বউয়ের মতো ওরা টকটকে লাল উড়না মাথায় জড়িয়েছে। যে দৃশ্য আমাকে তেইশ বছর আগের কথা মনে করিয়ে দেয়। ঘোর লাগে, এমন সময় সুমন ঘরে ফিরে। ওর ইতস্তত, বিঃধ্বস্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে কিছুই বলার সাহস পাই না।
ঘরের হালহকিকত এতটা পাল্টে ফেলেছে সুমন, কিন্তু ওর মধ্যে কোনো হেলদোল নেই। ফ্রেশ হয়েই, ‘আমার মেয়ে আমার মেয়ে’ করছে। তিথি তখন তার রুমে পূর্ণ মনোযোগে প্লেকার্ড লিখছে, ছবি আঁকছে। নারী ও শিশু ধর্ষণ, এবং নিপীড়নের প্রতিবাদে ওর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ধর্ষকের সর্বোচ্চ বিচার ও দাবী সহ ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ মিছিল ও মানববন্ধন করবে। তিথি বিষয়টা আগেই আমাদের জানিয়েছে। অস্বাভাবিক স্বরে তিথি… তিথি… ডাকতে ডাকতে সুমন মেয়ের রুমের দরজায় গিয়ে দাঁড়ায়। End Rape Culture, Stop Justifying Rape সহ রুমে গুছিয়ে রাখা অন্য প্লেকার্ড, ছবিগুলো দেখে সারসের মতো গলা বাড়িয়ে বাবার আদর চাওয়া মেয়েটার গালে সুমন থাপ্পড় মারে। প্লেকার্ডগুলো ছিড়তে ছিড়তে ‘প্রতিবাদ, মানববন্ধন’ বলে উম্মাদের মতো হাসতে থাকে। তিথি বাবার কম্পিত দেহ চেপে ধরে বলে,’বাবা তুমি পড়ে যাচ্ছ, তোমার শরীর দূর্বল, এসো, বিছানায় শুয়ে পড়ো।’ মেয়ের কাঁধে ভর করে সুমন শুয়ে পড়ে। তিথি বাবার অসহায় মুখের দিকে চেয়ে থাকে।
বাকরুদ্ধ আমি তখন কাঁপছি। মেয়ের চিবুক বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে বাবার বুকে। সুমন চোখ বুঁজে আছে। আমার মনের আয়নায় ভেসে উঠে অফিস থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়েই মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ওর কপালে সুমনের পরপর চুম্বন করার দৃশ্য। চাঁদের আলো তখন ঢেউ খেলতো ওদের মুখে। ঘোড়া, তেপান্তর, ফুলের বনে, ফসলের ক্ষেতে আকাশ থেকে নেমে আসা পরি, কতো রুপকথার গল্প শোনাতো বাবা মেয়েকে। আমার সুখের ঘরের সুন্দর দৃশ্যগুলো মনে করে নীরবে অশ্রুবিসর্জন ছাড়া আর কিছুই করতে পারি না আমি।
হাসি নেই, আনন্দ নেই। হতাশার মহোৎসবে আমরা চুপচাপ রাতের খাবার খাই। খেতে খেতে আমি ভাবি, এ কি শুধুই অদ্ভুত আঁধার, নাকি আরও গাঢ় কোনোও অমানিশা? খাওয়া শেষে তিথি নিজের রুমে না গিয়ে বাবার বুকের সঙ্গে বেঁধে থাকতে দেখে অনেকদিন পর আমি যেনো একটা পূর্ণ চাঁদের মায়াভরা আলো দেখতে পাই। তিথি আমাদের একটা আস্ত পৃথিবী। ওর ইচ্ছেতে রাজি হয়েই আজ আমরা ইঁটকাঠের ঘরের দরজা বন্ধ করে ধুলো খেলা সবুজ গ্রামে যাচ্ছি।
বাবা-মেয়ের মুখে নরম রোদ খেলছে। ওরা খিলখিল হাসছে, গল্প করছে। আমার সুখের সংসারে আর কোনো অসুখের ঢেউ না উঠুক, ওদের দিকে তাকিয়ে মনে মনে প্রার্থনা করি। সুমনের চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ নেই, অস্থিরতা নেই। ওদের সুখ আমার শিরা ধমনীতেও ছড়িয়ে পড়েছে।
ঘড়ি দেখি, ট্রেন প্লাটফর্ম পেরিয়েছে দেড় ঘন্টা হয়েছে। জুতা খুলে আরাম করে বাইরের প্রকৃতির দিকে চোখ ফেরাই। গাছগাছালিতে ভরা আঁকাবাঁকা পথ, ফসলের ক্ষেত পেরিয়ে শনশন করে পূর্ণ গতি তুলে ছুটছে ট্রেন। একদম মসৃণ চলন। গত বেশ কয়েকদিনের টেনশন, সঙ্গে আজকে যাওয়ার প্রস্তুতি সব মিলিয়ে ট্রেনে উঠার আগ পর্যন্ত একটুও বিশ্রাম পাই নি। চোখ ভেঙে ঘুম নেমে এলে সঙ্গে আনা চা, বিস্কুট খেয়ে উপরের বার্থে চলে যাই। ট্রেনের এ.সি কম্পার্টমেন্টগুলো শুধু শব্দ নিরোধকই নয়, কম্পন নিরোধকও বটে। ওদের বাবা-মেয়ের সুখ সুখ আনন্দ বুকে জড়িয়ে শরীর এলিয়ে দিতেই কোনো কসরত ছাড়াই গভীর ঘুমে তলিয়ে যাই।
কী অদ্ভুত মায়াময় জায়গা, কী অপার শান্তি চারপাশে। চারদিক সবুজে ভরা। একটা সরু মেঠোপথ বাঁশঝাড়ের মাঝ দিয়ে কোথায় যেনো চলে গেছে। মনে হয়, ঐ আঁকাবাঁকা পথটায় যদি হেঁটে হেঁটে যেতে পারতাম। সুমনকে ইচ্ছের কথা জানালে প্রথমে রাজি না হলেও পরে রাজি হয়। আমরা হাঁটতে থাকি। আচমকা, এদিক-ওদিক মেঘ ঘিরে আসে, সঙ্গে ঝড়ের শোঁ শোঁ আওয়াজ। কোথা থেকে একটা পাখির বাসা উড়ে এলো, সঙ্গে ঝুম বৃষ্টি। আমরা একটা ঝাঁকড়া গাছের নিচে আশ্রয় নিই। এসময় দেখি, ভীত বিহঙ্গের মতো বুকের উপর বই খাতা চেপে একটা মেয়ে ভিজতে ভিজতে ছুটছে সম্মুখে, তার ভেজা উড়না উড়ছিল বাতাসে।
বৃষ্টি কখন থামবে, আমাদের চোখ আকাশের দিকে। ঠিক তখনই ‘আমি যাব না, কোথাও যাব না, বিদায় হোন’ নারী কন্ঠের এমন আর্তনাদ ভেসে আসে কানে। আর্তনাদের উৎস খুঁজতে খুঁজতে আমরা অচেনা জনপদ ধরে সামনে এগুতে থাকি। কিছুদূর যেতেই দেখি খানিক আগে আমাদের সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়া মেয়েটার পথ রোধ করে রেখেছে একটা মোটর বাইক। ‘এই জানোয়ার’ বলে সুমন তেড়ে গেলে মেয়েটার পথ ছেড়ে বাইকটা দ্রুত চলে যায়। মেয়েটা আমাকে জড়িয়ে ধরে ‘ভীষণ মাথা ধরেছে, মাংসখেকো লোকটা’ বলে পাক খেয়ে রাস্তায় উপুড় হয়ে পড়ে যায়। অচেনা মেয়েটার মুখের দিকে চেয়ে আমার রক্ত চলাচল যেনো রুদ্ধ হয়ে যায়। ওর অজ্ঞান শীতল মুখটা কোলে তুলে আমি কী করতে পারি, আমি কী করতে পারি, বলে চিৎকার পেড়ে আমার ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম ভেঙে সিঁড়ি ফেলে বার্থ থেকে লাফিয়ে নিচে পড়ে স্বপ্নে দেখা মেয়েটাকে হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকি, আর দরদর ঘামছি। তিথি আমাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে শান্ত হতে বলে। আমিও সুমনের মতো ‘আমার মেয়ে, আমার মেয়ে’ বলতে বলতে ছোট বাচ্চার মতো কাঁদতে থাকি। কম্পার্টমেন্টের হতবাক সকলের চোখ তখন আমার দিকে।
***************************************

Leave a Reply