আশরাফুল কবীরের কবিতা
প্রশ্নের উত্তরঃ কবিতা কিংবা যেকোন রকমের সাহিত্য কখনোই একলা চলো নীতিতে বিশ্বাসী হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সাহিত্য জিনিসটি সবসময় পার্টিসিপেটরি একটি বিষয়, একক কোন বিষয় হওয়ার কোনো সুযোগ বা অবকাশ নেই বলে আমার বিশ্বাস।
কাঠবিড়ালির আমন্ত্রণ
শেষ রাতের ট্রেনটিতেই ঠিক ফিরবো আমি।
কোনো অপেক্ষায় থেকো না। কারণ অপেক্ষার প্রহরের
রিক্ততা আমি বেশ ভালোভাবেই জানি। আমন্ত্রণটি
ছিল বসন্তের কাঠবিড়ালির, সখ্যতায় ছিল তার
ঝাড় লেজ আর অভ্যর্থনার বাধায় ছিল পৌষের হিমশীত।
স্টেশনটি শীত চাদরে ঢাকা, কুয়াশাময় আর
অনেকটাই রহস্যময়। ঠিক যেন এক নেভাডার মরুভূমি!
যেন প্রতিচ্ছবির ফ্ল্যাশব্যাক। সাথে জুড়ে আছে নিসর্গ শোভার
ডানা কাটা পাইন মাঝে জড়োয়া সাজে তুমি।
যদিও নও অপেক্ষায় তবুও আশা এসে ভিড় করে,
হয়তো বা তুমি অপেক্ষায়। শেষ রাতের ট্রেন, বড্ড ধীর,
টেনে টেনে চলা, হুইসেলের শব্দ পু-ঝিক-ঝিক!
আপন মনেই বলা তবুও ফিরবো জেনো ঠিক।
আমার নিচে ক্রমেই বিস্তৃত হয় অনন্ততার হাট।
ফিরতে দেয় না আমায় পিছু হলুদ ফুলের মাঠ;
ডুবি আমি ডুবে চলি ক্রমাগত ঘাট থেকে ঘাট
অন্তর্মুখী খাদে নিমজ্জিত আমার ঊষাকালের পাট।
নীরব পৃথিবীতে পারিনি ফিরতে ক্ষমা করে দিও,
হে প্রিয়, প্রিয় কাঠবিড়ালি, পরবর্তী ট্রেন সময়সূচি
তুমি ঠিকঠাক জেনে নিও।
অথৈ শ্রাবণে জল থৈ থৈ
এ শ্রাবণে তৃষ্ণা মিটেছে নাকি মিটেনি?
ও শ্রাবণ, তৃষ্ণা মিটিয়েছো নাকি মেটাওনি?
শেষপর্যন্ত জল ঝরাতে অনেক
ধারকর্জ করতে হয়েছে বৈকি।
প্রস্থানবেলায় জল উপচে পড়ছে
ধলাইয়ের দু’কোল ঘিরে।
বেলা ফুরোনোর আগে শাশ্বতরূপ উজাড়
না করেই কদমেরা মুখ লুকিয়েছে অভিমান ভরে।
লাল টকটকে রক্তজবার সিক্ততা বুঝি
স্বল্প সময়ের কিছুমাত্রার উপঢৌকন।
স্রোতের গতিময়তায় আজ দেখা মেলেনি
কোনো মুখ-ধোয়া শালিকের।
মাদার গাছের কোঠরে
আগেভাগেই ঢুকে পড়েছে মহাশয়;
ঝড়ঝঞ্ঝার রাতে কুঠরির খড়কুটোর সান্নিধ্যে
কি দারুন ওম!
সান্ধ্য-নীরবতায় তীব্র আর্তনাদ করে
দক্ষিণমুখো হয়েছে এক দশাসই ধানী নৌকা।
এ যেনো ছিড়েফুঁড়ে নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়া,
দিতেই হবে…ইচ্ছেরা ডানা মেলুক
আর নাইবা মেলুক।
ঢেউয়ের সাথে সঙ্গত করে চ্যাঁচিয়ে যেন বলে যাচ্ছে ─
আমি আছি, আমি আছি; আমাকেও তোমার
জমাখাতার হিসেবের মধ্যে এককোণে টুকে রেখো,
ফেলে দিও না যেন।
আহা মাঝি!
শুধুই দক্ষিণী পানে ছুটে চললে ─
দেখোনি, পিছু ফেলে চলে যাওয়া রাজ্যপাটের
সৌন্দর্যমণ্ডিত অবয়ব, নৌকার দুলুনীর ছন্দে
তীরে এলিয়ে পড়া ঢেউ, মাছরাঙাদের
গর্ত ভরাট করে দেয়া জলের স্ফূলিঙ্গ।
ঘাস-কলমিদের নীরবতায় বাঁধ দিয়ে চড়িয়েছো
এ কোন্ কর্কশ রাগিণী?
ডিঙ্গির বারকোষে তিতপুঁটিদের ঢুস
ছড়িয়ে রাখা ঝাকিজালে রাজ্যের বিরক্তি,
উষ্মা ঝরায় ─
শান্তিতে এক দন্ড থাকতে দাওনা বাপু,
এ কোন্ বিচার?
জলস্রোতের সখ্যতায়
আমাদের ও রয়েছে কিছু নিজস্বতা,
কালাকানুন; দূর সাম্রাজ্যে গিয়ে বসত করো।
দূর দিগন্তে মিশেছে হরিখোলার অশ্বত্থটি
সুহাস্যে উড়িয়েছে পত্রপল্লব।
বেতালি ভিজে হাওয়ায় ধুয়ে মুছে
সাফ-সুতরো হয়ে যেতে চায়
পুনর্জন্মে অজস্র প্রজন্ম নিয়ে
মাথাচাড়া দিতে চাওয়া এই আদিম।
কাঁচা ডেউয়া সিঞ্চনে
শিরশির করে বিগড়ায় শাদা দন্ত,
ভৌতিক ছটা আরো বাড়িয়ে দিয়ে
পথ আগলে রাখে গাবগাছের ঝোপ।
ঢোঁড়াটি দুরন্তপনায় পার হতে চায়
অথৈ যৌবনার জলরাশি।
চৌকোণো বিলের পানকৌড়িটি
হাপুস নয়নে উড়াউড়ি জুড়েছে।
এ বেলা ইস্তফা ঘোষণা করতে
বেজায় অনিচ্ছা তার।
গ্রাসকার্পেরা ঘাই দিয়ে দিয়ে হয়রান;
মেঘেদের ঈষৎ ঝংকারে প্রলয় শুরু হওয়ার
অদম্য প্রস্তুতি। হিসেব কষায় যারপরনাই
ব্যস্ত এরিয়েলরাজ।
একটুখানি ঘাড় উঁচু করে
অবাক বিষ্ময় প্রকাশ করে হুতুমের দল।
ধেয়ে আসা প্রলয়ংকরী ঝড়ের আশঙ্কায়
কিছুটা দিকভ্রান্ত বাদুড়ের পাল।
ঈষৎ কাঠবিড়ালিটি নেমে যায়
আড়ালে ঝুলোনো লটকন রাজ্যে।
ব্যগ্র চোখে ইতিউতি খুঁজে ফিরে।
অবশেষে দেখা মেলে।
আহ! কি শোভা থরে থরে সাজানো,
সীমাহীন প্রশান্তিতে ভরে তনু ও মন।
কোত্থেকে তেড়ে আসে গন্ধরাজের ঘ্রাণ;
শুধোয় :
দেখা দিয়ে যাও এবার-
ক্বচিৎ থেমো তুমি, যদিও সময় হয়েছে যাবার,
সিক্ত হয়েছে কিছু জলকমল শ্রাবণ প্রতীক্ষায়
না-হয়-না-হোক কিছু পাবার,
এবারে যদি দেখা না দাও সখা ─
ভিড়িয়ো তরী আবার।
ঝপ-ঝপ-ঝপাৎ! ভুরিভোজন লীলায়
শাপলাপাতার আড়ালে লাফালো
ব্যাঙেদের দল।
কে জানে পানিফল-রাজ্যে
শেষবেলাকার ঢুঁ মারা হয়তো।
ক্রৌঞ্চমিথুনের ঘরে ফেরার সম্মেলন;
মেতে ওঠার একটুখানি অপেক্ষায়
ঝিঁঝিদের দল।
বৃষ্টির মৌতাতে ছন্দের আভাস ফেরায়
হুহু হাওয়া, উড়িয়ে নিয়ে যায়
রেইনট্রির ঝুরঝুরে পাতাগুলো।
শেষ হয়ে যেতে চায় শ্রাবণের অঝোর বর্ষণ ─
শেষ হয়ে যায় ভাবনার ঝাপটা,
উজ্জল হয়ে ওঠে আবারো অনাগত দিন প্রতীক্ষা।
ভৌতবিজ্ঞান
ইদানীং কবিতা লিখতে গেলে কবিতার লাইনগুলো কেমন যেন ভূতুড়ে বাঁশঝাড়ের রূপ নেয়। শোঁ-শো বাতাসে ভেসে আসে শুধুমাত্র অরণির ভৌতবিজ্ঞান। আমি বিজ্ঞান বুঝি না, তবে ভাদুরে উত্তাপ বুঝি। তাই রাজা-উজির মেরে প্রচণ্ড রসায়নে গলে যেতে চাই। অতএব, শাস্ত্রানুমতে একটি পিটিশন জমা দেই চরণকমলে।
কিন্তু আমার জানা ছিল না ─ ধাপধারা-গোবিন্দপুর, আসলে অনেক দূর! সে তালুকে অনেক লড়াই সেয়ানে-সেয়ানে। আবেদন খারিজ হয়ে যায়। হাতেকলমে ভৌতবিজ্ঞান শেখার সুযোগ হয় না। সমস্যা নেই, আমি ভালোভাবেই জানি ‘বাঁশবনে ডোম কানা’।
অন্য একদিন অরণির বদলে অপর্ণার ভৌতবিজ্ঞান শেখার চেষ্টা করবো।
****************************
