মঈনুস সুলতানের কবিতা
প্রশ্নের উত্তরঃ কবিতা রচনার প্রক্রিয়া নিয়ে মাঝেমধ্যে আমি স্মৃতিতাড়িত হই, আমার সৃষ্টিমুখর নিভৃত প্রহরগুলোর সাথে মিশেমিশে আছে কিছু চিত্র, দেখতে পাই নিজেকে— দাঁড়িয়ে আছি অন্ধকার এক রেলওয়ে অভারব্রিজের রেলিং ঘেঁষে, নিশিরাতের মেল-ট্রেনটি ভেঁপু বাজিয়ে চলে গেছে অনেকক্ষণ… আবছা দিগন্তরেখার দিকে, আঙ্গুরীয়ের পোখরাজ পাথরে প্রতিফলিত হচ্ছে নক্ষত্রের খন্ডাংশ, আর পাল্লা দিয়ে পুড়ছে ক্যাপস্ট্যান। এ ধরনের মহূর্তে আমি স্বরচিত কবিতাকে ভেবেছি নিজের সাথে কথা বলার বিকল্প হিসাবে; আবার নানাবাড়ির প্রঙ্গন-সংলগ্ন টিলার উপর থেকে একাকী দাঁড়িয়ে যখন প্রত্যক্ষ করেছি— বিলের জলে প্রতিবিম্ব এঁকে সূর্যাস্তের দিকে উড়ে যাচ্ছে এক ঝাঁক পরিযায়ী মরাল, কবিতার অপাত অধরা শব্দ, উপমা কিংবা চিত্রকল্প স্বতঃস্ফূর্ত প্রার্থনার মতো উৎসারিত হয়েছে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে।
এভাবে আমি কবিতা লিখেছি— কৈশর থেকে…ক্রমাগত…অনেক বছর। যদিও চলমান এ প্রক্রিয়ায় আমি দোসর বলে কাউকে দেখি না, তারপরও যাদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায় লিপ্ত হয়েছি জীবনভর, কিংবা যাদের প্রয়াণে কষ্ট পেয়েছি প্রবলভাবে; সর্ষের সোনালি খেতে উড়ে আসা এক ঝাঁক টিয়ার মতো হরেক দেশের রকমারি দৃশ্যপট ছাপচিত্র এঁকে গেছে আমার মনে, কোন না কোনভাবে অভিজ্ঞতা-সঞ্জাত এ সব অভিঘাত দিন-কে-দিন ঋদ্ধ করে চলেছে আমার পদাবলীর পৃষ্টাসমূহ। কখনো অবচেতনের জলতল থেকে শুশুকের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের মতো কোন সামাজিক অভিজ্ঞতা প্রতীক কিংবা রূপকের রূপ ধরে উদ্ভাসিত হয়েছে কবিতার পঙক্তিতে; আর কবিতার লেখার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন জেগেছে মনে, কিন্তু জবাব খুঁজে পাইনি, এবং জবাব পাওয়াটা জরুরিও মনে হয়নি কখনো।
থাকতো না কোন সংশয়
ডয়-ইনতানন পর্বত থেকে গড়িয়ে নামা উপত্যকায়
হেঁটে যেতে যেতে খেয়াল করি—
পেখমে স্বর্ণালী-সবুজ নক্ষত্র ঝলসিয়ে থমকে দাঁড়িয়েছে ময়ূর,
ভোরবিহান থেকে চলছি পদব্রজে সারা দিনমান
ভাবি—যেতে হবে আজ আর কতদূর;যার তালাশে পথচলা নিরন্তর—
সে কি কিংবদন্তীর সুদৃশ্য স্বরূপ— নাকি বাস্তবে সত্য,
বনানী বিছরিয়ে জড়ো করি অবহেলায় পেঁকে ওঠা ফলপাকুড়
জ্বালি অগ্নিকুন্ড— ভেষজ হয়ে ওঠে নিরাময়ের পথ্য,
পা বাড়াই ফের—
প্রগৈতিহাসিক জন্তুর প্রস্তরীভূত ডিমের মতো
কালচে ধূসর পাথরগুলো চলাচলে হয়ে ওঠে প্রতিবন্ধক,
দূর দিগন্তে মাঁচার উপর চারচালার আবছা আকৃতি
ডেকে আনে স্বপ্নের সুরভীত চন্দন—
খুঁজে পাই যেন জনপদের অনুঘটক;গোধূলির সুধা নিরঞ্জনী আলোয়
হাতিগুলো নীরবে পাড়ি দিচ্ছে নদী—
পরিশ্রান্ত দেহে ভাবি—
এ নিরজনে একটি পান্থশালা থাকতো যদি,
আর নিশিরাতে যদি-বা আকাশে দেখা যেত শনির বলয়,
ক্ষুদা… কাম ও অধীর যাত্রা যে অর্থহীন অকিঞ্চিতকর
এ নিয়ে থাকতো না কোন সংশয়।বালুচরের বাস্তবে
স্বপ্নের স্রোতজলে বেঁহুশ হয়ে ভাসছিলাম
শনিবারের ভর সন্ধ্যাবেলা—
আছড়ে পড়ি অতঃপর তটে,
ডোরাকাটা বাঘ এক এসে শুঁকে শরীর
করোটি থেকে উপে যায় শব্দের সঙ্গে দৃশ্যকল্পের লীলাখেলা
মনে হয়—পড়েছি আজ বিষম সংকটে;জন্তুটি লেজ নাড়ে… ঘরঘর শব্দে ছড়ায় প্রসন্নতা
শার্দূলটি বেজায় খুশমেজাজী—
তবে পারি না বুঝতে তার কথকথা,
কাছে এসে প্রকান্ড এ প্রাণী বসে আমার গতর ঘেঁষে
খোয়াব সত্য হতে শুরু হলো কবে—
ডোরাকাটা বাঘটি বসে আছে বালুচরের বাস্তবে,
স্নেহভরে সে লকলকে জিভও ঠেকায় আমার গন্ডদেশে;উঠে পড়ে পশমি লোমে হাত বুলিয়ে জানাতে চাই আলবিদা
খুঁড়িয়ে হাঁটে সে পিছু পিছু… আকুতি জানায় জবানে-ইশারায়,
নিরপরাধ আমি… সঙ্গে নিতে তোমার কেন এত দ্বিধা—
দেখে-শুনে মনে তো হয় না… মানুষ তুমি বীতশোক ভন্ড…
থাবায় জখম দেখিয়ে ভিক্ষা করে সামান্য আশ্রয়—
এড়িয়ে এখন হনহনিয়ে হাঁটছো দাঁড়াতে পারো না দু’ দন্ড
শিকারও পারি না ধরতে…আমাকে খামোকা করছো কেন ভয়?মনে মনে যা ভাবছো— বনের পশু আমি
ঠিক বুঝতে পারি পাঠাবে চিড়িয়াখানায়,
খবর তো সবই পাই… তোমার সুহৃদরা নাকি—
বিলুপ্ত হওয়া প্রজাতির আহাজারিতে
হালফিল ডকুমেন্টারিও বানায়!বলি হে ব্র্যাঘ্র কুমার…বনস্থল নিবাস তোমার
ফিরে যাও ওখানে…দেখিয়ে দেই সোজা পথ,
খরখরিয়ে হাসে শার্দূল…কেটেছো গাছপালা খুঁড়েছো মাটি
রান্দায় ঘঁষেমেঝে তৈরী করেছে আসবাবপত্র পরিপাটি—
জংগলে বাস করার আছে কী আর কোন কুদরত?আরও একটি কথা বলি… শুন হে আদমসন্তান,
আমি কী আর আছি বাদাবনের সে শার্দূল পরাক্রান্ত প্রবল—
বন্যদের জবান বুঝতে না পারার করো না তো অযথা ভান,
দেখতে তো পাচ্ছো… রক্তপাতে হয়েছি হীনবল;
খুঁড়িয়ে পা কয়েক হেঁটে—
নেতিয়ে পড়ে হলুদে কালো ডোরাকাটা বাঘ,
পশমে রাখি হাত… বাড়ে নিশিরাত
ভাবি…অন্তরে আমার জাগবে কবে পশু-প্রিয় অনুরাগ?অনুপস্থিতিতে
শিশুটি তোমার বড় হবে আমার অনুপস্থিতিতে
কিছু দিন নিমগ্ন ছিলাম যুগলে—মনে আছে
ব্লু গ্রাসের বিদগ্ধ গীতে,
বাচ্চাটি বিছানায় ছোটাবে নীল-সবুজ রেসকার
মেঝেতে ছড়ানো থাকবে—
প্লাস্টিকের আণুবীক্ষণিক ডাইনোসর;
কথা হয়েছিলো— চিমনি-রকের কাছাকাছি
বনানীর ছোট্ট কটেজে আমরা বাঁধবো ঘর।শর্ট স্কার্ট পরেছিলে তুমি— ঝরাপাতার মোটিফে চিত্রিত
টপের ব্রোচে ঝলমল করছিলো রূপালি প্রজাপতি,
তোমার বুককেস থেকে নিরলে সরিয়ে নেব—
আমার বইপত্র— দিনপঞ্জিকাতে ধৃত ভাবনার নথি;
পার্সের ছোট্ট আয়নায় তুমি আঁখিতে বুলাবে
বনানীর সবুজ মাসকারা—
ড্যাফোল ব্যাগ গোছাতে গোছাতে
দেখবো কাউন্টারের আয়না থেকে ওঠে যাচ্ছে পারা।শেষবারের মতো আমরা বাজাবো টেইলার সুইফটের সিডি
নিকেস করে লেনদেন— স্মৃতি হবে তোমার সহিষ্ণুতা অপার,
‘ইউ নো, উই আর নেভার, এভার, গেটিং ব্যাক টুগেদার’
ভিন্ন সরনীতে হাঁটবো আমি …অজানা ভাষায় পড়বো বইপত্র,
দেখবো শিশিরে স্নাত হয়ে—
গোলাপের পাপড়িতে টলমল করছে জলসত্র।
***********************************
