You are currently viewing বেনজির শিকদারের কবিতা

বেনজির শিকদারের কবিতা

বেনজির শিকদারের কবিতা

নোট:
কবিতা একদিকে খুব ব্যক্তিগত, অন্যদিকে গভীরভাবে মানবিক। লেখককে ভিড়ের ভেতর গিয়ে জীবন সংগ্রহ করতে হয় অপরদিকে একা থেকে সেই জীবনকে ভাষা দিতে হয়। আর সেই ভাষাই কবিতা। অতএব লেখকের কাজ মূলত— দুটো জগতের মাঝখানে একটি সেতু তৈরি করা। আর মানুষ যেমন একা, তেমনি সমষ্টিরও অংশ—কবিতাও তাই। কাজেই আমার কবিতা পথ বেছে নিয়ে নয়; সে পথ তৈরি করবে এমনটাই চাই।

১.
ধরা যাক—
কোনো এক দুপুরে খাঁখাঁ রোদের তপ্তবেলায়
মহিষের বাথান, এলোকেশী মেঘ, বাঁশির সুর ছাপিয়ে
আশ্চর্য এক অমোঘ সঞ্জীবনী শক্তির ছোঁয়ায়
আকাশ নুয়ে এলো মৃত্তিকায়;
দূর চলে এলো কাছে,
সকল কয়েদী মুক্তি পেয়ে গেলো!
অতঃপর কঙ্কাবতীকে উদ্ধারের শপথে
প্রত্যেকেই হয়ে উঠলো একেকজন রূপকথার রাজার কুমার!

ধরা যাক—
এক বিকেলে বেদনারা দলবেঁধে এসে বললো
না— না— আর নয়; চেয়ে দেখো
মুদ্রার উল্টোপিঠের মতো আমাদেরও আছে সরল-মুখশ্রী;
বুকের সানুদেশজুড়ে আছে ঘন প্রেইরীর মানবিক প্রেম!
নব পরিণীতার মতো আনকোরা-অসার-জুবুথুবু নয়;
চাইলেই কলরোলে খুলে দিতে পারি বন্ধ-অন্ধ মস্তিষ্ক;
বিশ্ববাউলগীত কিংবা অষ্টপ্রহর শোনাতে পারি—
ভাটিয়ালি-ভাওয়াইয়া-জারি-সারি- সুমধুর রবি-নজরুল।

ধরা যাক—
কোনো এক রাতে বাবুই মুখের কারুকার্য
আর হার্দ্য রঙে পৃথিবী রাঙাতে—
মাদার তেরেসা, মহাত্মা গান্ধী, কার্ল মার্কস,
আব্রাহাম লিংকন, নেলসন ম্যান্ডেলা,
ফিদেল কাস্ত্রো, কমরেড লেনিন
ও শেখ মুজিবের মতো—
প্রাঞ্জল মুখগুলোয় সেজে উঠলো ধরিত্রীর দুয়ার!

ধরা যাক—
হলুদ খঞ্জনাপাখির ঠোঁটে চেপে একদিন ভোর এলো;
রুপোলিইলিশ আর কিশোরীর গালে পড়া টোলের মতো
হৃদয় উথলে ওঠা ভোর!
সাথে নিয়ে এলো ভালোবাসার মহামন্ত্র!
জগতের সমুদয় সম্প্রচারের নবে আঙ্গুল ছোঁয়াতেই
প্রবাহিত হলো স্বাস্থ্যকর সংবাদের সু-বাতাস।
অষ্টমীর পুণ্যস্নানে মেতে—
ইথারে ইথারে ধ্বনিত হলো বিজয়োল্লাস!

দৌড়ে পালালো—
আহাজারির দিন; বিবর্ণ মুখচ্ছবির ক্ষুধা-জরা-মৃত্যু!
নদীর কল্লোল-পাখিদের বিলাপ-আত্মার ক্রন্দনধ্বনি—
থেমে গেলো অন্যমনস্ক পাথর-সময়।
বিগত কটাক্ষ বন্ধ রেখে অহংকারী ছুঁলো অসহায়ের মন;
বকুল ছড়ালো সুবাস, কোকিল গান ধরলো!
দোয়েলের শীষে সয়লাভ স্বর্গ-মর্ত্য!
দেশদ্রোহী মেতে উঠলো দেশপ্রেমের উৎস ধারায়।
একটা দু’টো নয়—
পৃথিবীর প্রতিটি মানচিত্র হতে
ব্যালিস্টিক মিসাইল ধ্বংস করে দিলো শোষণের বীভৎস মুখ!

ক্যামন হবে তবে! পৃথিবীর রূপ?

২.
পালকের শোক

তোমাকে নিয়ে যাবো মেঘেদের গ্রামে
যেখানে দিন নেই রাত চুয়ে নামে!
যেখানে আলোর তিয়াস জেগে থাকে আঁখি;
পাহাড়ের ঘ্রাণ শোঁকে অচেনা এক পাখি!

যেখানে জলের তলে অতলের টান
ভুলসুরে ভুলস্বর গেয়ে যায় গান!
যেখানে মানুষ নেই মানুষের কাছে
অচেনা ফুলে-ফলে গাছ ছেয়ে আছে!

তোমাকে নিয়ে যাবো পথহারা পথে
শুরু আর শেষ একই, যাপনের রথে।
থেমে থেমে দেখাবো অনাদরী ভুল
নদী নেই ঢেউ নেই থই থই কূল!

যেখানে আগুন ছুঁয়ে ঘুমে আছে শীত
বিস্ময়ে উকি দেবে সুরেলা অতীত।
সুর থেকে সরে যাবো লয় থেকে দূরে
গুটিশুটি ওমে হবো বেড়াল-আদুরে!

তোমাকে ছুঁয়ে যাবে দুপুরের রোদ
জোছনার চারুচোখে মিঠে প্রতিরোধ।
সবুজে অবুঝ সেজে হরিণের চোখে
আঙুলের মায়া হবো প্রজাপতি নখে!

যেখানে ফুলের শোকে ঝরে যায় ফল
মায়ামোহ ত্যাগ করে গৃহমুখী ছল!
সেখানে প্রেমের কথা ইতিহাস ঘেঁষা
জীবনের সঞ্চয় এই মেলামেশা!

তোমাকে দেখাবো এক আলোময়ী ভোর
প্রেমময় বাতায়নে খোলা রবে দোর।
আলোকের শিখা এসে দিয়ে যাবে ডাক
আদরের ঘ্রাণে ঘ্রাণে— যাতনা অবাক!

যেখানে কবিতারা প্রেম হয়ে বাঁচে
মিলনের গান গায় বিচ্ছেদের আঁচে।
সেখানে তুমি আমি আর সব পর
পাখিরাও ঘর পাবে— নয় যাযাবর।

তোমাকে বিলিয়ে দেবো কঠিনের মায়া
মিশে থেকো তনুমনে দর্পণে ছায়া।
তোমাকে শোনাবো আমার শেষ-কথাখানি
বাতাসের ফিসফাসে প্রেম-কানাকানি!

মিশে থেকো অশরীরী কথাহীন ভ্রমে
আহত আঁকর হয়েও বিরহ-জখমে!
দিতে দিতে সবটুকু, কিছু যেয়ো নিয়ে
আমাদের জুড়ে থাকা বোধ বিনিময়ে।

পাখা থেকে খুলে দিয়ো পালকের শোক
আমার যে আমিটা, সে তোমার হোক!

৩.
স্বাধীনতা

উদাস দুপুর ঢেউ খেলে যায়, কৃষ্ণচূড়া সাজে
রেবু তখন শ্যাম-বালিকা, জোছনা-মোহন লাজে;
ফুল তোলা তার চুলের বেণী, দুলছে সাপের মতো
অজান হাওয়ায় সময় গড়ায়, নেই বেদনা-ক্ষত।

বুকের মাঝে ভয়ভীতি নেই, প্রথায় তবু নত
হৃদয়জুড়ে সেই কিশোরীর মুক্ত পরমব্রত;
বইয়ের ভাঁজে লুকানো সুখ, পেখম মেলে নাচে!
রেবু তখন পাখির মতো, উড়াল পেলেই বাঁচে।

রেবু যেন গল্পগাথা, খাতার পাতায় আঁকা
সরলপথে সরলমনে, সরল হয়ে থাকা;
কোন গাছেতে পাখির ছানা, কোন বাগানে ফল
এসব দেখে এসব নিয়েই ভাবনা অবিরল।

নানারকম স্বপ্নপাখি রোজ উড়ে যায় চোখে
রেবু তখন ফুলকিশোরী, বিশ্ব মহালোকে।
রেবু তখন খুব সাধারণ, গ্রামের সরল মেয়ে
ঘাস-ফুলেরা মুগ্ধ-মাতাল, রেবুর ছোঁয়া পেয়ে।

রেবু কি আর জানে তখন, অস্থায়ী এই সুখ
ক’দিন পরেই আঁধার হবে, শিশিরগন্ধা মুখ!
ক’দিন পরেই মুছবে কাজল, হাসতে হবে মানা
ভেঙে যাবে ঘৃণ্যঝড়ে প্রজাপতির ডানা।

ভাবনা তাহার আকাশমুখী, পাতালছোঁয়া আশা
কাছেই থাকে পোষা-বেড়াল, খুব সাধারণ ভাষা।
হঠাৎ এলো যুদ্ধজাহাজ ভাঙলো ঘরের দ্বোর
নিভে গেল স্বপ্নপ্রদীপ– রাত হলো না ভোর।

একাত্তরের পাকসেনারা খুবলে খেলো তারে
আঁটকে গেল দেশ-ভাবনা ছিন্ন কাঁটাতারে!
রক্তস্রোতে ভাসলো রেবু- অলীক অধীনতা
যুদ্ধ-ভয়ে সম্ভ্রম-ক্ষয়ে এলো স্বাধীনতা।

এখনও রোজ সূর্য ওঠে, আকাশ-ভরা মেঘে
বাংলাদেশের লাল পতাকায় রেবু আছে জেগে।
************************************

Leave a Reply