You are currently viewing রওশন রুবী’র কবিতা

রওশন রুবী’র কবিতা

রওশন রুবী’র কবিতা

উত্তর :
আমি চাই আমার কবিতা একলা পথও চিনুক, আবার ভিড়ের ভেতর দিয়েও হাঁটুক। শুধু নিঃসঙ্গতার ভেতর থাকলে তা নিজের কাছেই সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, আর শুধু ভিড়ের মধ্যে থাকলে কখনো নিজের গভীরতা হারায়। কবিতা আগে জন্মায় ভেতরের নীরবতায়—
তারপর সে বেরিয়ে পড়ে মানুষের মধ্যে, অলিগলি ঘুরে, ধুলো মেখে, শব্দে ভিজে—
তবেই তা পূর্ণ হয়।
অর্থাৎ,
কবিতা একলা শুরু হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষের মধ্যেই তার ঠিকানা খুঁজে নেয়।

শান্তি এক দীর্ঘশ্বাস

একদিন হঠাৎ
একটি অচেনা গলির সামনে দাঁড়িয়ে ভাবলাম—
কীভাবে এত সহজে সে রঙ ধারণ করে,
আমি কেন প্রতিদিনই রং হারাই?
সে আমাকে কিছুই বলেনি,
শুধু বাতাসে ছড়িয়ে দিল একরকম গন্ধ—
যেন উত্তাপের শব্দে পোড়া ধোঁয়া।
আমি শহরের দিকে গেলাম,
দেয়ালের গায়ে ইতিহাস,
রাস্তায় ছড়িয়ে থাকা মানুষের ভিড়—
সেখানে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
শান্তি আসলে কোথায় থাকে?
কেউ বলল ধর্মে,
কেউ বলল নিয়মে,
কেউ বলল ক্ষমতার ভেতর।
কিন্তু এক বৃদ্ধা চুপচাপ হাত মুছতে মুছতে বলল—
শান্তি থাকে তখন,
যখন কেউ না দেখলেও তুমি সৎ থাকতে চাও।
তারপর খুঁজতে গেলাম উন্নয়নে—
দালান উঠছে, সাইনবোর্ড বদলাচ্ছে,
সংখ্যাগুলো লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে—
সবাই খুব ব্যস্ত, কিন্তু শান্তি- সে কোথায়?
এক কোণের মানুষ হেসে ফেলল হঠাৎ—বলল,
পেট খালি থাকলে উন্নয়ন শব্দটা শুধুই বাতাসের মতো।
আমি চুপ করে গেলাম।
ফিরে এসে নিজেকেই জিজ্ঞেস করলাম—
তাহলে সব কী মরচিকা?
দেখলাম—
দু’টি প্রাণী নিজেদের মতো লড়ে যাচ্ছে
টিকে থাকার অদ্ভুত তাড়নায়।
তখন বুঝলাম—
শান্তি আসলে সমাধান নয়,
সে শুধু প্রশ্নের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা
একটি দীর্ঘশ্বাস।

অদেখা

ওটা দেহ না—
শুধু একটু নীরবতা জমে ছিল মাটির ওপর।
ছেলেটা জানত না কাকে নিয়ে যাচ্ছে,
শুধু জানত—এখানে রাখা যাবে না।
পা টেনে টেনে সে এগোচ্ছিল,
মনে হচ্ছিল মাটি নিজেই সরে যাচ্ছে নিচ থেকে।
কেউ ডাকেনি,
কেউ থামায়নি—
এই শহর এমন ঘটনাকে চেনে না।
হঠাৎ সে থামল,
হাত ছেড়ে দিল—
কিছুই পড়ল না, শুধু একটা ভার কমে গেল।
তারপর সে হাঁটতে শুরু করল,
যেন কিছুই ঘটেনি।

চিহ্ন

সে বলল—
এটা কাউকে দেখাবো না।
মাটিতে রাখল,
আবার তুলে নিল—
কোথাও ঠিক জায়গা হলো না।
চারদিকে মানুষ ছিল,
কেউ তাকায়নি।
শেষে সে চোখ বন্ধ করল—
আর হাত ছেড়ে দিল।
পড়ে গেল না কিছু,
শুধু নীরবতা আরেকটু ভারী হলো।

অর্ধেক উচ্চারণ

রাস্তায় পড়ে আছে ক্লান্ত প্রাণীর শ্বাস,
শাওয়ার শেষে ফেনায়িত জল গড়িয়ে যায়,
পাতার আড়ালে ডানার প্রস্তুতি—
কোকিল অপেক্ষায় থাকে,
তবু ভোর নামে না আর।
মানুষও কেমন সাঁতরায়
লোডিং বারের মতো ধীরে।
আবহাওয়ার সিগন্যাল দুর্বল—
বার্তাবাহক পথ হারায়,
প্রার্থনা মাঝপথে থেমে যায়।
কেউ রিস্টার্ট দেয় না
মুছে যাওয়া সম্পর্কগুলোকে।
একজন দরবেশ হাঁটে
পুরোনো ডেটার ভেতর দিয়ে—
তার হাতে জপমালা নেই,
সে বলে—
“মানুষ হারায় না,
শুধু অফলাইন হয়ে যায়।”
আমার ধমনিতে বাজে
তার অর্ধেক উচ্চারণ—
অন্য অর্ধেক সার্ভারে জমা।

অন্ধকার দেখার জন্য

আকাশের বুকে আজ দাগ,
কোনো নক্ষত্র আর আগের মতো জ্বলে না।
দূর মহাকাশে ভেসে যায় ধ্বংসের ধুলো—
যেন অসমাপ্ত ইচ্ছে ছড়িয়ে আছে সবদিকে।
গ্রহগুলো নীরবে সরে যায় একে অপরের থেকে,
ভালোবাসাও কক্ষচ্যুত।
কেউ বলে—প্রমিথিউস আবার আগুন চুরি করছে,
কেউ বলে—ইন্দ্রের বজ্র ভাঙছে আকাশের নীল শিরা।
আর আমি ভাবি—
দেবতারা কি এখনও মানুষের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে,
যারা মাঝে মাঝে আলো ভেঙে দেয়
নিজেদের অন্ধকার দেখার জন্য?
**************************

Leave a Reply