You are currently viewing এক বৈশাখে দেখা হলো দুজনার/ আফসানা বেগম

এক বৈশাখে দেখা হলো দুজনার/ আফসানা বেগম

এক বৈশাখে দেখা হলো দুজনার

আফসানা বেগম

তুমি জানতে চাইলে ‘বৈশাখ’ শব্দটা শুনলে কিরণের মাথায় সবচেয়ে প্রথমে কী আসে। মাটির দিকে তাকিয়ে সে গম্ভীর স্বরে বলল, ‘রক্ত।’

‘রক্ত! কী আবোলতাবোল বকছ? আমি বলতে চাচ্ছি বৈশাখের একটা চেহারা আছে না? মানে, বৈশাখ বৈশাখ গন্ধ?’

‘হুম। রক্তের গন্ধ।’

তুমি কৌত‚হলী হয়ে কিরণের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলে। তাকে উদাস আর অন্যমনষ্ক দেখাল যেন যা বলার বলা হয়ে গেছে। রক্তের গন্ধের কোনো ব্যাখ্যা সে আর দেবে বলেও মনে হলো না। তোমারও আর জবরদস্তি জানতে চাইতে ইচ্ছে করল না। তোমার আশা ছিল যে কিরণ বলবে বৈশাখ বললে তোমার কথা মনে হয়, কারণ কোনো এক বৈশাখেই তোমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল। তা না, কোত্থেকে এল রক্ত। গন্ধের কথাই যদি বলবে তবে ইলিশ ভাজা আর পান্তাভাতের গন্ধের কথা তার মনে এল না? কিরণের উপরে একটু মেজাজ খারাপ হলো তোমার। মনে মনে ভাবলে, আমি বলি বৈশাখ আর সে কিনা বলে রক্ত! আরে বাবা, কোরবানি ঈদের কথা বললেও না হয় চলত, কিন্তু বৈশাখ আর রক্ত? এই কিরণটা মাঝেমধ্যে বড্ড আবোলতাবোল বকে। একরকম রাগ করেই তুমি বললে, ‘তোমার না খানিক মাথা খারাপ আছে, বুঝলা?’ কিরণ হেসে বলল, ‘ক্যান? কী করছি?’ তুমি বললে, ‘না, ঠিক খারাপ না, একটা স্ক্রু মিসিং আর কী।’ কিরণ মুচকি হাসল। বলল, ‘স্ক্রুটা কই গেল বলো তো? তুমি ঠোঁট উলটে জবাব দিলে, ‘গেছে আর কী, ওই যে, রক্তে ভেসে গেছে।’ তুমি ভেবেছিলে কিরণ হাসবে কিন্তু অবাক হয়ে দেখলে যে তার মুখটা খানিক গম্ভীর হয়ে গেল। ফরসা মুখের উপরে ভরদুপুরে যেন একটা গাঢ় ছায়া অযাচিত আসন গেড়ে বসল। তোমার মন্তব্যের শাস্তিস্বরূপ নীলক্ষেতের বইয়ের বাজারটা পেরোনোর পর থেকে হোম ইকনমিক্স কলেজের গেট পর্যন্ত কিরণ আর একটাও কথা বলল না। পায়ের গতিও খানিকটা বেড়ে গেল। রাস্তার উলটোদিক থেকে ¯্রােতের মতো আসা মানুষ, বাস আর রিকশাকে বাঁচিয়ে তাকে অনুসরণ করতে কষ্টই হচ্ছিল তোমার। তারপর কলেজের সামনে এসে কিরণ এমনভাবে গেট পেরিয়ে ঢুকে গেল যেন রাস্তায় বরাবর সে একাই ছিল, সঙ্গে যে ছিল সে অদৃশ্য। তুমি হা করে কিছুক্ষণ আধা খোলা গেটের ভিতরের দিকে তাকিয়ে থাকলে। কিরণ একবারও ফিরে তাকায়নি। লম্বা পথটা পেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সোজা সাদা করিডোরে মিলিয়ে গেছে। তারপর কী আর করা, বৈশাখ আর রক্তের মধ্যে সম্পর্ক কিংবা পার্থক্য ভাবতে ভাবতে তুমি নিজের হলের দিকে রওনা দিলে। আসলে তোমার মনে বৈশাখ নিয়ে অনেক মজার মজার স্মৃতি উঁকি দিচ্ছিল। তুমি ভেবেছিলে কিরণকে সেসব বলে খুব একচোট হাসাবে। কিন্তু সে তা হতে দিল না। অথচ ক্লাস শেষ হবার পরে বৈশাখের কথা উঠিয়েছিল কিরণই। তবে বছর দুয়েক ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে আর আশেপাশে কিরণকে দেখতে দেখতে তার সম্পর্কে তোমার যথেষ্ট জানা হয়ে গেছে। কী কারণে হুট করে রেগে যায় বলা যায় না। তারপর পেটে হাতুড়ি মারলেও আর কথা বলবে না। রাগ পড়লে নিজেই এসে বিস্তারিত বিবরণসহ রাগের কারণ আর স্যরি-টরি বলবে।

ঢাকায় এসে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার সঙ্গে সঙ্গে কিরণ ছায়ানটে ভর্তি হয়েছিল। তাই চারটা সেমেস্টার শেষ হতে হতে ছায়ানটে সে উঠে গেল দ্বিতীয় বর্ষে। কলাভবনের পাশে শিশু গাছের ছায়ায় বসে প্রায়ই কিরণ গান ধরত। তোমরা অনেকে বসে শুনতে। তুমি প্রায়ই বলতে, ‘ওই গানটা ধরো না কিরণ, ওই যে, আঁধার থাকুক দিকে দিকে আকাশ-অন্ধ-করা, তোমার পরশ থাকুক আমার-হৃদয়-ভরা।’ সে কপট রাগ দেখিয়ে বলত, ‘একই গান বারবার শুনতে চাও অথচ প্রথম লাইনটা কিছুতেই মনে রাখতে পার না, এটা কেমন ব্যাপার, হুম? গানটা হলো, আজি বিজনঘরে নিশিথ রাতে আসবে যদি শূন্যহাতে, বুঝেছ?’ তুমি হেসে বলতে, ‘কী করব, কিরণ, আমি যে দুই লাইন মনে রেখেছি তার কাছে ওই ভদ্রলোকের ওই গানের তো বটেই, অন্য অনেক গানের হাজার লাইনও যে মার খেয়ে যায়, যায় না?’ কিরণ হেসে বলত, ‘তা যায় বটে।’ তারপর বলত, ‘জানো, কত দিন কত রাত ওই দুটো লাইন আমাকে কত হতাশা আর কান্না থেকে মুক্তি দিয়েছে!’ বলে নিয়ে কিছুক্ষণ উদাস হয়ে থাকত। তারপর ভিতরে ভিতরে নিজের মধ্যে ফিরে এসে গুনগুন করে গাইতে শুরু করত। ওই সঞ্চারি থেকেই গানটা আরম্ভ হতো কিরণের ঠোঁটে, আঁধার থাকুক দিকে দিকে আকাশ-অন্ধ করা, তোমার পরশ থাকুক আমার-হৃদয়-ভরা।

কিরণের মুখে রক্ত শব্দটার গাম্ভীর্যতার কথা ভাবতে ভাবতে সেদিন তুমি হলে ফিরে এসেছিলে। এখনো তোমার স্পষ্ট মনে পড়ে সেদিন ক্লাস শেষ করে কিরণ খুশির চোটে বলতে গেলে উড়ে এসেছিল খবরটা দিতে, ‘শোনো, আমি না এবারে ছায়ানটের বৈশাখের অনুষ্ঠানে গাইব। মানে, আমাদের ক্লাস থেকে কয়েকজনের সঙ্গে আমাকেও সিলেক্ট করেছে!’ তুমি খুশি হয়েছিলে কিরণের উত্তেজনা দেখে। কিরণ এক নিশ্বাসে বলে যাচ্ছিল, ‘ছোটোবেলা থেকে টিভিতে আর নিউজ পেপারে যে অনুষ্ঠানের ছবি দেখেছি, এবারে আমি নিজেই সেই অনুষ্ঠানে গাইব, ভাবা যায়?’ তুমি হেসে বলেছিলে, ‘কেন ভাবা যাবে না, এত সুন্দর গাও তুমি! তোমাকে নেবে না তো কাকে নেবে?’ কিরণ নিজের প্রশংসায় আড়ষ্ট হয়েছিল। ঢোক গিলে বলেছিল, ‘না, মানে, আমি সত্যিই বিশ্বাস করতে পারছি না। যা হোক, তুমি আসবে তো?’ তুমি মাথা চুলকে বলেছিলে, ‘দেখি।’

‘দেখি মানে? তুমি বৈশাখের অনুষ্ঠান দেখতে রমনায় যাও না?’

‘নাহ্, মানে, অ্যাত্ত সকালে উঠে খামোখা এত ভীড় ঠেলে… পরে তো টিভিতেই দেখা যায়।’

‘আশ্চর্য, ঢাকার মানুষ হয়েও ওই অনুষ্ঠান মিস কর কী করে? আমি তো ছোটোকাল থেকে টিভিতে দেখতাম আর ভাবতাম কবে ঢাকায় পড়তে আসব আর সামনে বসে ওই অনুষ্ঠানটা দেখব।’

‘দূরে ছিলে তো তাই এমন মনে হতো। ধীরে ধীরে দেখবে তুমিও আর যাবে না, ঘাপটি মেরে ঘুমিয়ে থাকবে।’

‘কখনো না। অসম্ভব!’

‘অসম্ভব না, কিরণ। কক্সবাজারে থাকে এরকম বহু মানুষ আছে যারা হয়ত গত দশ বছরে একবারও সমুদ্রের তীরে যায়নি। আবার ধরো বৃষ্টিতে গোসলের বাতিকঅলা কিছু মানুষও কোনো একসময় ঘরে শুয়ে-বসে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ শুনতে পায়, বাতাসে জলীয় বাষ্পের উপস্থিতি টের পায় কিন্তু উঠে গিয়ে জানালার পরদা সরিয়ে বৃষ্টি দেখে না।’

কিরণের সঙ্গে বলা প্রায় পনেরো বছর আগের এই সমস্ত কথা তোমার হয়ত মনেই পড়ত না যদি আজ ভোর রাতে ঝড়ের শব্দে ঘুম না ভাঙত। পাশ ফিরতে গিয়ে চোখটা হালকা খুলে গেল। আর সরু করে চোখ মেলতেই তোমার মস্তিষ্ক হালকামতো কাজ করতে শুরু করল। তোমার মনে হলো তেপান্তরের মাঠের এক প্রান্তে তুমি ঘুমিয়ে আছ আর তোমার শরীরের উপর দিয়ে বাতাসের প্রলয় বয়ে যাচ্ছে। চোখটা ভালোমতো খুলতেই দেখলে হাজার ক্যামেরার ফ্ল্যাশের মতো তীব্র আলো আর পরমুহূর্তে ঘরঘুটি অন্ধকার হয়ে যাওয়ার পালা। বুঝতে পারলে, কোনো মাঠ-ঘাট নয়, তুমি আছ তোমার ঘরে। ইলেকট্রিসিটি চলে গেছে। বিজলির উজ্ঝ¦ল আলোয় নিজের মাথার উপরে আর চারপাশে ফিনফিনে পরদাগুলোকে উড়তে দেখলে; যেন কেউ উড়ে চলেছে, দেখা যাচ্ছে কেবল উড়ন্ত পাখা। মনে পড়ল, কাল রাতে বসন্তের ঝিরিঝিরি বাতাস ছিল। শরীর জুড়িয়ে দেয়া বাতাসটাকে তুমি উপেক্ষা করতে পারনি, তাই শোয়ার আগে জানালাগুলো খুলে কেবল নেটের কপাটগুলো লাগিয়ে রেখেছিলে। বিছানায় উঠে বসলে তুমি। পায়ের দিকের তোষকটা ভিজে গেছে প্রায়। বৃষ্টির এলোমেলো ছাঁট আসছে, কোনদিক থেকে আসছে আর কোনদিক থেকে আসছে না তা বুঝতে বুঝতে তোমার ঘুম পুরোপুরি ছুটেই গেল। জানালার কাচগুলো টেনে লাগাতে ঘরে বাতাসের প্রলয় বন্ধ হলো ঠিকই কিন্তু বাইরের শোঁ শোঁ শব্দ চলতে থাকল। শব্দের তালে তালে হাজার স্মৃতির ঢেউ তোমাকে ধাক্কা দিতে লাগল। কিছুতেই আর ঘুমাতে দিল না। বৈশাখের আগে আগে আসা এই ঝড়কে বলে কালবৈশাখিÑ প্রাইমারি স্কুলে অর্জিত জ্ঞান থেকে আরম্ভ করে স্মৃতির পরত একে একে খুলে যেতে লাগল। খুলতে খুলতে এসে ঠেকল কিরণের মুখের উপরে। সেই কিরণ যে কোনোদিন তোমার সবসময়ের সঙ্গী ছিল অথচ যাকে তুমি প্রায় দশ বছর দেখনি। হঠাৎ করেই ব্যাপারটা তোমার কাছে এত অস্বাভাবিক লাগল! একই শহরে থেকে কী করে তুমি কিরণের সঙ্গে এতদিন যোগাযোগ করনি? বন্ধুরা কতবার এর-ওর বাড়িতে দাওয়াত দিয়েছে, নানান ব্যস্ততার অজুহাতে তুমি যাওনি। চাকরিতে ঢোকার পর থেকে অফিস আর বিয়ের পর থেকে বিয়ের সম্পর্কের আত্মীয়-স্বজনের বাইরে গত বছর দশেক তুমি আর কারো কথাই ভাবোনি। অফিস আর বাসা, বাসা আর অফিস, এই চক্রে কে জানে কত কাল তুমি আটকে আছ! উথালপাতাল ঝড়ের শব্দ আর ভেজা ভেজা তোষকের স্পর্শে হঠাৎ তোমার অসহায় লাগল। বাচ্চা হবে বলে বউ মায়ের বাড়িতে চলে গেছে মাস দুয়েক আগে, আর আজ এতদিন পরে ভোর রাতে কালবৈশাখির ঝড়ের টানে তুমি আবিষ্কার করলে যে তুমি কত একা! তোমার কোথাও কোনো শূন্যতা ছিল না, যদি থেকেও থাকে তবে বলতে গেলে এতটুকু একাকিত্ব ছিল না যে তুমি তোমার শূন্যতা নিয়ে ভাববে। ভরপুর বাড়ি আর অফিসের মাঝখানে ঘণ্টা দুয়েকের ট্র্যাফিক জ্যামপূর্ণ রাস্তায় তুমি বসে বসে অজানা আর অচেনা মানুষের জীবন আর যাপন নিয়ে ব্যস্ত থাকো। কে কী খায়, কার কী দর্শন, কে কোথায় বেড়াতে যায়, কে কোথায় প্রতারিত হয়Ñ হাতের ফোনের উপরে এই সমস্ত গালগল্পের আড্ডা দেখতে দেখতে হয় তোমার অফিস এসে পড়ে নয়তো বাসা। কিন্তু অন্ধকার ঘনিয়ে আসা ভোরে বিছানার উপরে একাকী বসে তোমার মনে হলো, কতদিন যেন তুমি সত্যিকারের মানুষের সংস্পর্শ পাওনি!

কিরণ কিরণ… কিরণের নামটা হঠাৎ তোমার মাথার মধ্যে কিরকির করে উঠল। ঘড়িতে জ্বলজ্বলে রেডিয়ামে সময় দেখলে সাড়ে ছয়। ফোনে দেখে নিলে, হ্যাঁ, কিরণের একটা ফোন নম্বর তোমার কাছে আছে বটে। কবে, কার কাছে নেয়া হয়েছিল মনে পড়ল না। কোনোদিন ফোন করা হয়েছিল কি না তা মনে করতেও মাথা সায় দিল না। সে যাই হোক, এই সাত সকালে হুট করে কাউকে ফোন করে ফেলা যায় না। তাই বেলা বাড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলে তুমি। কেন যেন কিরণকে লাগেইনি এত বছর যাকে ছাড়া কোনো একসময় একটা দিনও চলত না তোমার। কিরণের সঙ্গে শেষ দেখার দিন বা ক্ষণ মনে করার চেষ্টা করলে তুমি। কিন্তু মাথার ভিতরে কালবৈশাখীর মতো ঝড় বইয়ে দিয়েও মনে করতে পারলে না। হয়ত যোগাযোগ কমতে কমতে কোনোদিন সুমধুর গান ধীর লয়ে ফুরিয়ে যাবার মতো তার সঙ্গে সম্পর্কটা কোথাও মিলিয়ে গেছে, তোমরা কেউই তা মনে রাখনি।

শেষ পর্যন্ত ভালোমতো সকাল না হওয়া অব্দি মূর্তির মতো বিছানাতেই বসে থাকলে তুমি। কখনোবা একটু গড়িয়ে নিলে। কিন্তু কিরণের ভাবনা ছাড়ল না। অন্য কোনো বন্ধু বা জুনিয়র কারো কাছে কি কিরণের খোঁজ থাকতে পারে? তুমি ভাবতে থাকলে। ফ্যানের বাতাসে মাঝেমধ্যে পরদা সামান্য নড়ে উঠলে তুমি বাইরে আলো ফোটার আভাস দেখলে। ঝড়ের উত্তাল শব্দ আর নেই। ধীরে ধীরে পরদা সরাতেই বাইরের লÐভÐ দৃশ্য দেখতে পেলে। বাড়ির সামনের রাস্তায় পাতার বিছানা হয়ে গেছে। কিছু ডালপালাও পড়ে আছে। ডালগুলো এখানকার গাছের নয়। নিশ্চয় দূর থেকে ভাঙা ডাল উড়ে এসেছে। ভালো করে দেখার জন্য বাইরে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালে। আশ্চর্য! পুরো এলাকাটাই অন্যরকম লাগছে। রাস্তার মোড়ের দিকে তাকাতেই দুমড়ানো মোচড়ানো কতকগুলো জং ধরা টিন পড়ে থাকতে দেখা গেল। মনে হলো, শুধু ডাল নয়, কোনো বাড়ির চাল-ও উড়ে এসেছে। আর ওই পরিস্থিতি দেখে প্রথমেই মনে পড়ল তোমার বউয়ের কথা। ছুটে এসে ফোন করলে তাকে। নাহ্ সিলেটের দিকে তেমন কোনো ঝড়-টড় হয়নি। বউ বলল, ‘ছুটির দিনে বাড়িতে একা একা করবেটা কী? হাঁটতে হাঁটতে মেইন রোডে গিয়ে কফি শপে বসে নাস্তা সেরে আসো গে যাও।’ আসলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে তুমিও তেমনটাই ভাবছিলে, ওদিকের রাস্তাঘাটের অবস্থাটা কী দেখা দরকার। একবার গিয়ে ঘুরে আসলে হয়।

রাস্তায় তেমন লোকজন নেই। এত সকালে বলে নাকি রাস্তায় প্রচুর গাছের ডাল পড়ে আছে বলে তুমি ঠিক বুঝে উঠতে পারলে না। শীতকাল গেছে সেই কবে, অথচ বাতাসে শীত শীত গন্ধ। ফুলহাতা টি-শার্ট গলে তোমার চামড়ায় হুল ফোটানোর মতো ছুঁয়ে গেল কয়েকবার। শীতলতাটা তুমি ভালোই উপভোগ করলে। ভাবলে বউয়ের কথামতো কফিশপে গিয়ে নাস্তা করলেই ভালো। এই বাতাস গায়ে মেখে তারপর ধোঁয়া ওঠা কফি পেলে বেশ হয়। তোমার বাড়ির গলিটা ছাড়তেই মোড়ে দিকে একটা বাড়ির পাঁচিল পড়ে গেছে। পুরোনো ছিল অবশ্য। সেই আগেকার যুগের বাগানওলা দোতলা বাড়ি। এখনো রিয়েল এসটেটের লোকেরা হয়ত ওখানে সুবিধা করতে পারেনি। তবে পারবে। ঝড়ের যা ফল দেখা গেল, তার পরে আর বাড়িটা থাকবে বলে মনে হলো না। বাড়িটার শেষ মাথায় প্রাচীন এক কৃষ্ণচ‚ড়া গাছ। অফিস থেকে বাড়ি ফিরতে বরাবর তোমার চোখ ওই গাছটার দিকে যায়। বিশেষ করে ওটাতে যখন রঙ লাগে। আগের দিনেও তুমি লক্ষ করেছিলে কী ভীষণ আগুন লাগার মতো লালচে কমলা কৃষ্ণচ‚ড়ায় ভরে আছে গাছটা। ফুলগুলো এতটাই ঘন হয়ে ফুটেছে যে দূর থেকে দেখলে একটা আস্ত গোলাপের মতো দেখায়। আজ সেই ফুলের বেশিরভাগটা পড়ে আছে রাস্তায়; প্রচুর পাতাও। শীত শীত অনুভ‚তিটা ঠেকাতে তুমি পকেটের মধ্যে হাতদুটো গুটিয়ে নিলে। তারপর রাস্তায় পা ফেলতেই দেখলে নীলচে পিচের উপরে লাল বা কমলা পাপড়ি, কোথাও আবার আস্ত ফুল পড়ে আছে। একের পর এক ভেজা পাপড়ির উপরে কিংবা তাদের বাঁচিয়ে পা ফেলতে ফেলতে তুমি তোমারই অজান্তে অতীতের এক রাস্তা ধরে হাঁটা শুরু করলে।

‘ধরো, অনেকদিন আগে কোনো এপ্রিলে কৃষ্ণচ‚ড়ার কোনো পথ ধরে আমরা হেঁটে গিয়েছিলাম। কাল-বৈশাখির পরে ভেজা লাল-কমলা পাপড়িগুলো মাড়িয়ে, ধরো, বহুদূর হেঁটেছিলাম আমরা। মনে করো আমি নেই বসন্ত এসে গেছে, কৃষ্ণচ‚ড়ার বন্যায় চৈতালি ভেসে গেছে, গুনগুনিয়ে আপ্লুত হয়েছিলাম। জানো তো, কাছাকাছি না থাকাটা তখন ছিল কেবলই ফ্যান্টাসি। ধরো, আরো অনেকদিন পরে গাঢ় নীল পিচের ব্যাকগ্রাউন্ডে লালচে সে পাপড়িগুলো আবার আমাদের দলতে ইচ্ছে হলো। একটা-দুটো পাপড়িতে কেমন ছোপ দেখেছ? এমন ছবি দেখনি কচুরিপানার ফুলে কি ময়ূরের পালকে? ধরো, দুটো পাপড়ি তুমি কুড়িয়ে রাখলে; পকেটে নাকি মনে? স্যুভেনিয়র কি?

ধরো আরো বহুবছর পরে আরেক বৈশাখে একই রাস্তায় আমরা হেঁটে গেলাম। কৃষ্ণচ‚ড়ার ডালপালার ফাঁকে মেঘশূন্য আকাশে চোখ রেখে ভাবলাম, বহুবছর আগে এই পথ ধরে আমরা হেঁটে যেতে চেয়েছিলাম।’

আশ্চর্য, কথাগুলো তুমি স্পষ্ট কিরণের গলায় শুনতে পেলে। এ কী করে সম্ভব! এতদিনে একটা শব্দও ভোলোনি অথচ আস্ত কিরণটাকেই ভুলে ছিলে? কথাগুলো আরেকবার আওড়াবে নাকি ভাবতে ভাবতে তোমার পায়ের গতি ধীর হয়ে এল। দাঁড়িয়েই পড়লে শেষে। তারপর খানিকটা নীচু হয়ে রাস্তা থেকে একটা ফুল তুলে নিলে। একটা পাপড়িতে লাল-সাদা-কমলা ছোপ, বাকিগুলো লালচে। কিরণ ঠিক বলেছিল, ময়ূরের পালকে এমনটাই আছে। নিজের অজান্তেই কি না কে জানে, পাপড়ি উঠিয়ে তুমি পকেটে চালান করলে। পকেট আর হাতটা খানিক ভিজে গেল। তারপর কিরণের কণ্ঠস্বর ধাওয়া করতে করতে তুমি আবারো হাঁটতে শুরু করলে। সে বহু আগেকার কথা। ক্লাসের কয়েকজন মিলে তোমরা সাভারে বেড়াতে গিয়েছিলে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় তখন কৃষ্ণচ‚ড়ায় লাল। বিকেল নাগাদ সেখানে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলে তোমরা। তারপর প্রান্তিকের মোড় থেকে লম্বা রাস্তা ধরে হেঁটে গিয়েছিলে। ঝড়ের পরে ঠিক এমনই শান্ত আর শীতল পরিবেশ ঘিরে ছিল তোমাদের। ভেজা রাস্তায় চ্যাপটা হয়ে লেগে ছিল অসংখ্যা পাপড়ি আর ফুল আর পাতা। পরিবেশটাই ছিল আনন্দে পাগল হবার মতো, কিরণ ওড়না উড়িয়ে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছিল। তারপর হঠাৎ বলেছিল, ‘একটা গান শুনেছ কেউ? মনে করো আমি নেই, বসন্ত এসে গেছে, কৃষ্ণচ‚ড়ার বন্যায় চৈতালি ভেসে গেছে… শুনেছ?’ বেশিরভাগই ঠোঁট উলটেছিল। তাই দেখে কিরণ গানটা গাইতে শুরু করেছিল। তোমার তখন মনে হয়েছিল এর আগে এত সুন্দর গান তুমি কোনোদিন শোনোনি। কিরণকে বলাতে সে অবশ্য বলেছিল, ‘পরিবেশ, বুঝলে? পরিবেশ। এইখানটাতে এই সময়ে যদি না শুনতে তবে কি আর এত ভালো লাগত?’ তুমি চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলে। আসলেই কি তাই? কিরণ তখন হেসে বলেছিল, ‘আজকের পরে এ গানটা যদি কখনো শোনো, তোমার ঠিক আজকের এই বিকেলটার কথা মনে পড়বে। মানে, আজকের বিকেলের এই কৃষ্ণচ‚ড়ার রাস্তাটার সঙ্গে সুমন কল্যাণপুরের এই গানটাকে আচ্ছামতো বেঁধে দিলাম,’ বলে জোরে জোরে হেসেছিল কিরণ। তারপর ঢাকায় ফিরে পরেরদিন ক্লাস থেকে বেরিয়ে গাছের নীচে বসে বলেছিল, ‘কয়েকটা লাইন শুনবে?’ তুমি জানতে চেয়েছিলে, ‘কীসের লাইন? কার?’ সে লাজুক হেসে বলেছিল, ‘এই তো, আমারই। কাল রাতে লিখেছি।’ তারপর বইয়ের ভিতর থেকে ভাঁজ করা কাগজ খুলে পড়তে শুরু করেছিল, ‘ধরো অনেকদিন আগে কোনো এপ্রিলে কৃষ্ণচ‚ড়ার কোনো পথ ধরে আমরা হেঁটে গিয়েছিলাম। কাল-বৈশাখির পরে ভেজা লাল-কমলা পাপড়িগুলো মাড়িয়ে, ধরো, বহুদূর হেঁটেছিলাম আমরা…’ পড়া শেষ হলে তোমার মুগ্ধতা কাটতে সময় লেগেছিল। তারপর একসময় তুমি বলেছিলে, ‘কিরণ, তুমি তো কবি!’ কিরণ হেসেছিল। তার হাসি দেখে মনে হচ্ছিল কিছুটা লজ্জিত, আবার গর্বিতও। ওর হাত থেকে কাগজটা টেনে নিয়ে তুমি কয়েকবার পড়েছিলে লাইনগুলো। পড়তে পড়তে একসময় না দেখেই আবৃত্তি করতে শুরু করলে। কিরণ তখন সত্যিই লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু তারপর আর কোনোদিন সুমন কল্যাণপুরের ওই গানটা তুমি শোনোনি। এই ক’বছরে গানইবা শুনেছিলে কবে তেমন। কিন্তু কিরণ যে সময়টাকে ওই গানটার সঙ্গে বেঁধে দিয়েছিল, তা কি সেই গানটা শোনেনি বলেই ভুলে ছিলে? তবে তুমি নিশ্চিত যে তুমি কিছুই ভুলে যাওনি, ভুলে ছিলে কেবল।

ততক্ষণে ধীরে ধীরে বেশ কিছু মানুষ বেরিয়ে এল রাস্তায়। বড়ো রাস্তার দিকে বাসও দেখা গেল। চারদিকে ভরে উঠল হর্ন আর রিকশার বেলের শব্দে। কিছু লোক নিজেরাই উদ্যেগী হয়ে রাস্তা থেকে ডালপালা সরাতে লেগে গেল। কোথাও কোথাও তুমিও একটু হাত লাগালে। এই করতে করতে বড়ো রাস্তার নতুন কফিশপের সামনে চলে এলে। মাত্র দরজা খুলছে তারা তখন। কফি পেতে নিশ্চয় সময় লাগবে। একলা ছুটির দিনে তোমার সময়ের অভাব নেই। কোণের একটা টেবিলে বসে কাচের ঘেরাটোপের বাইরে রাস্তার চলাচলের দিকে চোখ রেখে বসে থাকলে তুমি। হঠাৎ মনে হলো, কেমন ছিল সেই গানটা? পকেট থেকে ফোন বের করে ইউটিউবে খুঁজতে লাগলে। বাহ্, খুবই জনপ্রিয় গান তো! পুরোনো ধাঁচের মিউজিক কম্পোজিশন অথচ একটানে সেদিনের সেই বিকেলে নিয়ে যেতে অব্যর্থ। ঠিক কিরণের প্রতিজ্ঞামতো, সে বলেছিল, গানটাকে আজকের বিকেলের সঙ্গে বেঁধে দিলাম। নাহ্, যত সকালই হোক, কিরণও নিশ্চয় ঝড় দেখেছে, এত বেলা করে ঘুমিয়েও নেই হয়ত। ভাবতে ভাবতে তার নম্বরে কল করে ফেললে তুমি। দু’এক সেকেন্ডের শ্বাসরুদ্ধকর প্রতীক্ষার পরে রেকর্ডেড মেসেজ শোনা গেল। এই ফোন নম্বর কিরণ হয়ত কবেই বদলে ফেলেছে। কিংবা এটা আদৌ কোনোদিন কিরণের ছিল কি না তা বেবে বের করতে তোমার স্মৃতি তোমাকে ধোঁকা দিয়ে চলল।

কফিতে চুমুক দিয়ে পাশের টেবিলে তাকালে তুমি। উনিশ-বিশ বছর বয়সের তিনজন ছেলেমেয়ে এসে বসেছে। খাবারের অর্ডার দিয়েছে হয়ত, তারপর ডুবে গেছে নিজেদের জগতে। মনে পড়ল, এ বয়সে তিন বন্ধু একসঙ্গে হলে আশেপাশের মানুষ তোমাদের চিৎকার-হাসাহাসিতে চমকে তাকাত। অথচ তাদের টেবিলে ভয়ানক নীরবতা। একজনের কানে হেডফোন, তিনজনেরই চোখ ফোন বা ট্যাবে। সেদিন এক বন্ধু বলছিল, ‘দেখেছ, আজকালকার ছেলেমেয়েরা কত ভদ্র! মাথা সবসময় নীচে।’ পাশের টেবিলে তাকিয়ে মনে হলো, সময় করে একসাথে খেতে আসার তেমন দরকার পড়ে না এদের । তবু পুরোনো নিয়ম অন্ধের মতো পালন করে যাচ্ছে।

আর এদিকে, চলিশের কাছাকাছি এসে তোমার চোখ খুলে গেছে। তুমি আড্ডায় যাও না। সেসব পুরোনো প্যাটার্ন। এখন ভার্চুয়াল আড্ডা আছে। ‘তোমাকে খুব মিস করছি’ মন্তব্য দেখলে ভেতরে উত্তেজনা হয়। তবে জানো না কেন, ওই উত্তেজনাটা ধরে রাখতেই ভালো লাগে। একটা সাজানো দুঃখবোধ। ওরকম কিছু না থাকলে নিঃস্ব লাগে। ভয় হয়, হায় হায়, কেউ আমাকে চায় না! তবে পুরোনো বন্ধুর ফোন নম্বরটা চাইতে ইচ্ছে করে না। সব সম্পর্ক ওখানেই আটকে থাকুক, ভার্চুয়াল জগতের নির্ঝঞ্ঝাট আকাশে। কিন্তু বিপদ কি সেখানেও কম? সবসময় সম্পর্কের বাইরে থেকে তাকিয়ে দেখতে পার না। নিজেকে বহুবার প্রশ্ন করেছ, কেন এত মিলে যাই, মিশে যাই? মনে পড়ল, একবার তো বলতে গেলে মিশেই গিয়েছিলে। পুরোনো সম্পর্ক ভালো। চুপচাপ থাকে পুরোনো সম্পর্কের জায়গাতেই। কেবল মনে রাখা, বাড়া-কমার কোনো ব্যাপার নেই। নতুন সম্পর্ক ভাসিয়ে নিয়ে যায়। অথচ সেদিন পুরোনো সম্পর্কই ভাসাতে লাগল তোমাকে। কিরনকে এখন কোথায় পাবে সে নিয়ে চিন্তাটা বেশিদূর এগোলো না অথচ আগের ঝাপসা বা মুছে যাওয়া দিনের ছবিগুলো ক্রমশ স্পষ্ট হতে লাগল।

তখনকার সময়ে, পহেলা বৈশাখের ভোর বেলা কিরণ বটতলায় লম্বা সারিতে বসে গান গাইবে আর তুমি ঘরে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকবে, কিরণের অত্যাচারে তা হবার কোনো উপায় ছিল না। তারপর থেকে প্রতিবারই তোমাকে অনুষ্ঠানে আসতে হয়েছিল। বেশ আগেভাগেই আসতে হতো। সামনের দিকে বসতে হতো, কিরণ যেন তোমাকে দেখতে পায়। মঞ্চের উপরে কী স