You are currently viewing করুণা খাতুন মঞ্জিল > মোস্তফা অভি

করুণা খাতুন মঞ্জিল > মোস্তফা অভি

করুণা খাতুন মঞ্জিল

মোস্তফা অভি

 

শহরের দুপ্রান্তে দুজন মানুষ থাকে। একজন ওষুধ কোম্পানির রি-প্রেজেন্টিটিভ আর অন্যজন সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করা এক নারী। তাদের মধ্যে ভার্চুয়াল আলাপ হয়, একসময় বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। আর একথা নির্দ্বিধায় বলা যেতে পারে, বন্ধুত্ব জীবনের সেরা সময়টি পার করে তারা।

সন্ধ্যায় মেঘাচ্ছন্ন আকাশের মতো ছিল মেহেরুন্নেছার জীবন। সে সতেরো বছর আগে বিধবা হয়েছে। তার কোনো মেয়ে ছিল না, আর তিনছেলে যে-যার মতো নিজেদের কর্মস্থলে চলে গেছে। মেহেরুন্নেছা করুণা খাতুন মঞ্জিলের একমাত্র পাহারাদার। তার সবসময় মনে হত, মানুষের জীবনে আরো একটি আলাদা জগৎ আছে। যেখানে অদৃশ্য আত্মার মতো তাকে একাকী বসবাস করতে হয় আর সেখানে দিন-রাত্রির আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্য থাকে না। সে সববসময় এমন বিষণ্নতায় ডুবে থাকে, তার বিচিত্র কল্পজগতে এক অনন্ত জগৎ ভর করে থাকে। তার ভার্চুয়াল জীবনের সঙ্গী হল পিনাক নামে ছাব্বিশ বছরের এক ওষুধ কোম্পানীর রি-প্রেজেন্টিটিভ।

শহরের প্রতিটি হাসপাতালে পিনাকের যাতায়াত। প্রতিদিন সকালে সে বাসা থেকে বের হয়। দুপুর থেকে বিকেল, তার পুরোটা সময় কাটে ওষুধের ডিসপেনসারি আর হাসপোতাল-ক্লিনিকে। পুরুষ ডাক্তারগুলো তাকে যথেষ্ট সময় দেয়। মন দিয়ে প্রোডাক্টের গুণাগুণ শোনে আর গিফট পেলে অভ্যাসবশত মুচকি হেসে তাকে ধন্যবাদ জানায়। তবে সুন্দরী লেডি ডাক্তারগুলো পিনাককে তেমন একটা পাত্তা দেয় না। পিনাকের মনে হয় লেডি ডাক্তারগুলো সবসময় বিমূর্তভাবনায় ডুবে থাকে। ওদের স্মিত হাসি রোগীর মন ভুলানো ছলনা আর গুনগুন করে গান গাওয়ার মানে নিজেকে ফুরফুরে রাখার ভেলকি। পিনাক নতুন কোনো প্রোডাক্টের গুণাগুণ নিয়ে লেডি ডাক্তারদের সঙ্গে আলাপ করতে চাইলে তারা যে কোনো অজুহাত দেখিয়ে বক্তব্য সংক্ষিপ্ত করতে বলে। অথচ পিনাকের মনে হয়, ডাক্তারনি যখন বাম হাতটা চিবুকে রেখে ব্যবস্থাপত্রের ওপর ঘচঘচ করে ওষুধের নাম লেখে সেটা আর যে-কোনো অভূতপূর্বদৃশ্যগুলির একটি। দুর্বোধ্য অক্ষরগুলোর নিচে স্বাক্ষর করে যখন কাগজটা রোগীর দিকে এগিয়ে ধরে, পিনাকের মনে হয় ডাক্তারনি এইমাত্র কারো স্বপ্ন থেকে বেরিয়ে এসেছে। পিনাকের ধারণা, প্রত্যেক সৃজনশীল সুন্দরী নারী নির্ধারিত পুরুষটির জন্য ঈশ্বরের আশীর্বাদ। তবে সে ডাক্তারনি যদি অসুন্দরী হয়, তাতে পিনাকের তেমনকিছু যায় আসে না।

পিনাক দেখতে সুদর্শন আর তার বাচনভঙ্গি সুন্দর। কথার জাদুতে যে-কাউকে মুগ্ধ করতে পারদর্শী অথচ তার জানা নেই, কোন্ অদৃশ্য কারণে সুন্দরী লেডি ডাক্তারগুলো তাকে দিনের পর দিন এড়িয়ে যায়!

পিনাক সন্ধ্যায় বাসায় ফিরলে একাকিত্বতাকে চরমভাবে জাপটে ধরে। তার মনে হয় সিংকহোলের গভীর তলদেশে সে নিশ্চুপ পড়ে আছে। যেন হাজার ফুট গভীরে ক্ষয় হতে হতে মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে তার শরীর। সে মাথাটা উঁচু করে আকাশের দিকে তাকালে এক চিলতে আলোর রেখাও দেখতে পায় না।

পিনাকের এমন কোনো প্রেমিকাও নেই যে, তার সঙ্গে দু’দণ্ড আলাপ করে সময় কাটাতে পারে। ভার্চুয়াল আলাপের মেয়েগুলো প্রথমে চঞ্চলা হরিণীর মতো ছুটে আসে, তারপর সময় গড়াতে গড়াতে সম্পর্কটা ক্রমশ শিথিল হয়ে যায়। ফুরিয়ে যেতে থাকে ওদের ভেতরকার কথার ভাণ্ডার। পিনাক ধীরে ধীরে যুবতী মেয়েদের থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলল, তারপর সম্পর্ক স্থাপন করল মেহেরুন্নেছার সঙ্গে। পিনাক বিদেশি সিনেমা দেখত আর সেসব সিনেমার চুম্বক-দৃশ্যগুলি মেহেরুন্নেছার কাছে আকর্ষণীয় করে বলত। দৃশ্যগুলো কল্পনা করলে মেহরুন্নেছার মনে হত, মহাজাগতিক কোনো একটা পর্দা তার চোখের সামনে ঝুলে আছে আর মেহেরুন্নেছা সিনেমার দৃশ্যগুলি বিস্ময় নিয়ে দেখছে।

 

পিনাক একদিন মেহেরুন্নেছাকে আশ্চর্য এক সিনেমার কথা বলল। জনাকীর্ণ শহরের এক মাছ-বিক্রেতা নারী তীব্র ঘ্রাণশক্তিওয়ালা এক অদ্ভুত শিশুর জন্ম দেয়। শিশুটি যখন কিশোর হয়ে ওঠে, সে শহরের বিভিন্ন পেশার শ্রমিকের সাথে কাজ করে। প্রকৃতির অলৌকিক ক্ষমতাবলে শিশুটি বহুদূরের যে-কোনো ঘ্রাণ শুষে নিতে পারে। তবে তাকে ইন্দ্রজালের মতো মোহাবিষ্ট করে নারী-শরীরের গোপন ঘ্রাণ। সে একদিন কোনো এক কিশোরীর জামাকাপড় ছিন্ন করে। তার ময়লায় গিদগিদ করা নখ দিয়ে মেয়েটির নগ্ন স্তনে আঁচড় কাটে। সে মেয়েটির শরীরের প্রতিটি স্পর্শকাতর স্থানগুলোতে নাক ডুবিয়ে নেশাতুরের মতো আদিম ঘ্রাণ শুষে নেয়। যখন সে যুবক হয়ে ওঠে, শহরের প্রসিদ্ধ সুন্দরী মেয়েদের হত্যা করে। তারপর মেয়েগুলোর মুণ্ডুছেঁচে নগ্নদেহগুলি ইলেক্ট্রিক কাচের বয়ামে সিদ্ধ করে নেয়। সে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কাজটা সম্পন্ন করে। মেয়েগুলোর শরীর থেকে বের করে আনে অপাথির্ব সৌরভময় আতর।

একদিন শহরের রাজ-এলানকারী তার ঐতিহ্যবাহী বাদ্যটি বাজিয়ে ছেলেটির মৃত্যুদণ্ডের কথা ঘোষণা করল। সেই বিচারটি ছিল ঐতিহাসিক আর সিদ্ধান্ত হয় স্পষ্ট দিবালকে ছেলেটির মস্তক বিচ্ছিন্ন করা হবে। ছেলেটির বীভৎস কর্মকাণ্ড শহরবাসীকে এতটাই বিচলিত করেছিল, তারা বিচার দেখতে দলে দলে এক উন্মুক্ত প্রান্তরে জড়ো হয়। ছেলেটি একটা সরু কাচের শিশি থেকে দুফোঁটা তরল রুমালে লাগিয়ে বাতাসে উড়িয়ে দেয়। এক অভূতপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয় সেখানে। উপস্থিত নারী-পুরুষ উন্মুক্ত প্রান্তরে অদ্ভুত চেতনায় ঢলে পড়ে আর তারা জোড়ায় জোড়ায় সঙ্গমে মিলিত হয়।

মেহেরুন্নেছার কাছে এসব গল্প যেন পৌরাণিক কোনো আখ্যান। সে পিনাকের প্রতিটি গল্পের দৃশ্যান্তরে নিজেকে সাক্ষী হিসেবে কল্পনা করে। তার প্রায়মৃত মনে নতুন করে প্রাণ সঞ্চার হয়। সে নিজেকে খোলসমুক্ত করে আর ধীরে ধীরে একাকিত্বের কথা ভুলে যায়। একদিন পিনাক বলল- আচ্ছা মেহের, ঢাকা শহরের সমস্ত সুখ বিসর্জন দিয়ে কোনো টানে তুমি এই মফস্বলে পড়ে আছ?

মেহেরুন্নেছা বলল, তোমার হয়তো জানা নেই পিনাক, পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আছে যারা প্রকতার্থে কখনোই সুখি নয়। যদি তুমি সেই অসুখি মানুষের তালিকা কর তাহলে গুনে শেষ করতে পারবে না। মনে করো আমি সেই তালিকারই একজন। তবে আমি জীবনে যেটুকু পেয়েছি সেটা অবলম্বন করে অনন্তকাল কাটিয়ে দিতে পারব। আমার ছেলের বউগুলো উচ্চশিক্ষিত আর অবুঝ। ওরা খেয়ে আর ঘুমিয়ে সময় পার করে। নিজেদের যা কিছু প্রয়োজন সেসব চাহিদা মেটানোর জন্য সবসময় মরিয়া হয়ে থাকে। ওরা এতটাই ফুর্তিবিলাসি যে, আমার কখনোই মনে হয়নি ওরা নিজ নিজ স্বামীকে ভালোবাসে। তোমার হয়তো জানা নেই, ছেলেদের এসব অসহায়ত্ব একজন মা-কে কতটা যন্ত্রণা দিতে পারে! বলা যেতে পারে এজন্যই আমি ঢাকা শহরের চাকচিক্যময় জীবনযাপন ছেড়ে এই মফস্বল শহরে নিভৃতচারী হয়েছি। তুমি কি বিষয়টা অনুধাবন করতে পেরেছ?

 তুমি কোনো সামাজিক কাজের সাথে জড়িত হতে পারতে, পিনাক বলল। এমন কোনো মহৎ কাজ, যার জন্য মৃত্যুর পরও মানুষ তোমাকে স্মরণ করতে পারে। মেহের, আমি তোমাকে যা কিছুবলি, সেটাকে তুমি জ্ঞান বিতরণ মনে কোরো না। কারণ তোমাকে উপদেশ দেওয়ার মতো আমি কোনো বিজ্ঞ মানুষ নই।

আমি সত্যিই কিছু একটা করতে চাইতাম। আমার মনে হত, এমন কোনো একটা কাজ করি যার মধ্যে ডুবে থাকা যায়। তবে কোনো কাজে হাত দিয়ে আমি বুঝতে পারতাম, জগতের সকল কাজ সবার জন্য উপযুক্ত নয়। প্রকৃতি সেসব কাজের জন্য নির্দিষ্ট কিছু মানুষ তৈরি করে রাখে। উপযুক্ত সময় মনে করে প্রকৃতি তাকে সেখানে বসিয়ে দেয়। পিনাক তুমি জানো না, আমি বহুদিন ধরে একটা দগদগে ঘা বুকের ভেতর বয়ে বেড়াচ্ছি। আমি এমন একজন মা, যে নিজ পেটের সন্তানের থেকে চরিত্রহীনতার পেরেক নিয়ে ঘুরছি। সেই অপরাধের ক্ষতটা এমন, যেন একটা আধুলি পয়সা আগুনে ঝলসে আমার হৃৎপিণ্ডের ওপর বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি ঠিক জানি না কতদিন পর্যন্ত এই দুঃসহনীয় ব্যথাটা বয়ে বেড়াতে হবে! আমি যতটা দ্রুত সম্ভব এর থেকে মুক্তি চাই।

পিনাক বলল, আমি তোমার সেই ব্যথাটার কথা জানতে চাই। মেহেরুন্নেছা খুব শান্ত আর ধীরকণ্ঠে বলল, তোমাকে এখনই সেসব বলে ইলেক্ট্রিক শকের মতো ধাক্কা দিতে চাইনা। তবে তুমি নিশ্চিত থাকো, আমার একান্ত বেদনাগুলো প্রকাশ করার মতো তুমি ছাড়া আর দ্বিতীয়জন নেই। একদিন সত্যিই আমি তোমাকে সবকিছু খুলে বলব।

বহুদিন ধরে করুণা খাতুন মঞ্জিলে আমি আমার বোনের মেয়েটিকে নিয়ে থাকতাম। ওর যখন বিয়ে হয়ে গেল আমি অথৈ সমুদ্র্রে হাবুডুবু খেতে লাগলাম। তখন আমার হাতে এমন কোনো কাজও ছিল না। প্রতিদিন সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত বলার মতো বহু কথা আমার মনের ভেতর জমা হয়ে থাকত। আমি সেসব কথার ভার বইতে পারতাম না।

 

আমার ঠিক দিন-তারিখ মনে নেই, কবে, কখন এসব অব্যক্ত কথাগুলো ছোট ছোট করে ফেইসবুকে পোস্ট দিতে থাকলাম। ধীরে ধীরে আমার বন্ধুতালিকা বড় হতে লাগল আর আমি বন্ধুদের থেকে প্রচুর লাইক, কমেন্টস পেতে লাগলাম। তখনো আমার কাছে তোমার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। একদিন হঠাৎ কোথা থেকে এসে তুমি আমাকে কবি সম্বোধনে ‘হাই, হ্যালো’ করলে।

 পিনাক বলল, সম্ভবত আমার সেই দিনের সম্বোধন মোটেও মিথ্যা ছিল না। হতে পারে ছন্দের ভাষায় তোমার লেখাগুলো জীবনের কোনো অতীত। আমি এটাও বিশ্বাস করি, একজন দক্ষ সুরকার তোমার রচিত প্রতিটি ছন্দে যদি সুর তুলে দিতেন, তবে সেটা পৃথিবীর সেরা শোকগীতি হতে পারত। আমি যা কিছু বলেছি সেটা একান্তই আমার কথা। তুমি হয়তো সেটা বিশ্বাস করতে পারছ না। মেহেরুন্নেছা চোখেমুখে দ্বিধা নিয়ে বলল, লেখাগুলো এতটাই অগোছালো ছিল, ঠিক যেন জঞ্জালে ভরা কোনো ডোবার মতন। আমি শুধু আমার বক্তব্যটাই বলতে চাইতাম। তবে আমার এটাই সৌভাগ্য যে, কথোপকথনের সূত্র ধরে তোমার মতো সুদর্শন একজন বন্ধু পেয়ে গেলাম।

আচ্ছা মেহের, তুমি কি জানো, মাঝেমধ্যে আমার কাছে তুমি অচেনা হয়ে যাও? তখন আমার কাছে মনে হয়, যেন তুমি দূরদেশের অচেনা কোনো মানুষ। তুমি বিজ্ঞদের মতো এত যৌক্তিক আর গুরুত্বপূর্ণ কথা বলো, মাঝেমাঝে ভাবি- এ আমি কার সঙ্গে কথা বলছি! আমি তোমার অতীতে বলা সরল সাধারণ কথাবার্তাগুলো ভুলে যাই।

এক অর্থে তুমি এটাকে বয়সের অভিজ্ঞতা মনে করতে পারো, মেহেরুন্নেছা বলল। একজন নিরক্ষর মানুষও জীবনের শেষপ্রান্তে অভিজ্ঞতার কারণে শিক্ষিত হয়ে ওঠে। তবে তার শিক্ষার উপকরণ কোনো প্রসিদ্ধ বইপত্র নয়, বরং তাকে দীর্ঘজীবনের উত্থান-পতন এমনভাবে অভিজ্ঞ করে তোলে, কোনোভাবেই তাকে আর অশিক্ষিত বলা চলে না। তবে একথাও সত্য, দিনশেষে যখন আমি সত্যিকারের ভাবনার অতলে ডুবে যাই, মনে হয় বিরতিহীনভাবে জীবনের অন্তিম মুহূর্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। আমার সেই চলার পথটা এতটাই নিঃসঙ্গ আর বেদনাময়, মনে হয় জগতে আমার মতো অপাঙ্ক্তেয় আর কেউ নাই।

মেহের, আমি তোমার সাথে সামনাসামনি দেখা করতে চাই। পিনাক অনুরোধ করল। ভিডিও কলে তোমাকে দেখে মনে হয়েছে, আর যে কোনো যুবতী মেয়ের চেয়ে তুমি কম কিছু নও। তোমার শৈল্পিক হাসির সাথে ঠোঁটের কোণে যে অভূতপূর্ণ রেখাটা ফুটে ওঠে, আমি সেটা মুখোমুখি বসে দেখতে চাই।

-পিনাক, মধ্যবয়সের চেয়েও আরো বেশি বিধ্বস্ত মহিলা আমি, যে তোমাকে ভালোবেসে যা কিছু করতে পারে। জীবনের ফেলে আসা সময়গুলোতে দু’তিনবার ধ্বংস হয়েছি আমি। নিশ্চয়ই একইরকমভাবে আর তুমি আমাকে ধ্বংস করতে চাও না। না-কি চাও? আমি চাই না সামনাসামনি দেখে তুমি আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও। আমি তোমার সঙ্গে বহুদিন ধরে সম্পর্কটা বজায় রাখতে চাই।

 -দেখা হওয়ার পর যদি আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই তবে আর যা-ই হোক সেটা ভালোবাসা নয়। তুমি আমার ওপর বিশ্বাস রাখতে পারো, পিনাক বলল।

 

জ্যৈষ্ঠের এক বিকেলে পিনাক মেহেরুন্নেছার সঙ্গে দেখা করল। মফস্বল শহরটিতে এমন কোনো রেস্টুরেন্টও নেই, যেখানে কফি খেতে খেতে জীবনের পূর্বাপর কথাগুলো বলা যেতে পারে। তবে শহরের পুবপ্রান্তে তুলাতলী নদীর পাড়টা অন্য যে-কোনো জায়গার চেয়ে সুন্দর। উঁচুভেড়ির পর দীর্ঘচর, গলাডোবা জলের ভেতর ইরিধানের বিছানা। দূরে দু’নদীর সঙ্গমস্থলের দিকে তাকালে মনে হয় অচেনা কোনো বন্দর। মেহেরুন্নেছা পিনাককে নিয়ে নদীপাড়ের সেই নির্জন জায়গাটিতে বসল। চারিদিক আঁধারে ঢেকে যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্ত পর্যন্ত তারা নীরব সময় কাটাল। মেহেরুন্নেছার মনের ভেতর বাতাসের ঝটকার মতো এমন এক শূন্যতা খেলা করল, সেই শূন্যতার প্রান্ত ছুঁয়ে পিনাক হেঁটে যেতে লাগল। পিনাক মেহেরুন্নেছাকে ভদ্রোচিতভাবে যতটুকু দেখা সম্ভব সেটুকু দেখে নিশ্চিত হল, মহিলা তার ভাবনার চেয়ে আরো বেশি সতেজ। তার নৃত্যের গতির মতো চলনভঙ্গি আর শরীরের কাঠামো দেখে বোঝার উপায় নেই কতটা বয়স পার করেছে সে। তার হাসিটা এত অপূর্ব, কোনো কিশোরীর পক্ষেও ওরকম হাসি আয়ত্ত করা সম্ভব নয়। মেহেরুন্নেছা একসময় কণ্ঠের জড়তা কাটিয়ে কথা বলতে শুরু করল। পুরো সময়টুকুতে একবারের জন্যও চোখতুলে তাকালো না পিনাকের দিকে। সন্ধ্যায় মফস্বল শহরটিকে স্বাগত ভেঁপু বাজিয়ে ঘাটে যাত্রীবোঝাই লঞ্চ ভিড়ল। মানুষের সমাগমে ভেঙে গেল যৌথশান্তির নীরবতা। পিনাক আর মেহেরুন্নেছার প্রথমদিনের কথাবার্তা অসমাপ্তই রয়ে যায়।

তারপর যে যার বাসায় ফিরে পরস্পরকে নিয়ে ভাবনায় ডুবে থাকে। সেদিনের পর পিনাক মেহেরুন্নেছার সঙ্গে দেখা হয়েছে বহুবার। প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার দেখা না হলে মেহেরুন্নেছার সবকিছুখালি খালি লাগে। তার স্নায়ুতন্ত্রে পিনাকের অস্তিত্ব এমনভাবে গেঁথে যেতে লাগল তাতে করে পিনাকের কাছে বইয়ের পৃষ্ঠার মতো নিজেকে মেলে ধরতে লাগল মেহেরুন্নেছা। তারা একে অপরের না-বলা কথাগুলো সহজেই পড়ে ফেলতে পারল। তাদের ভেতরকার কোনো কথাই আর গোপন থাকল না। একদিন পিনাক বলল- আচ্ছা মেহের, আমি কি তোমার বাসায় একরাতের অতিথি হতে পারি?

 তুমি এভাবে কেন বলছ পিনাক? মেহেরুন্নেছা বলল। তুমি আমাকে এতটা বৃদ্ধাও ভেব না যে আমি তোমার মনের ইচ্ছেগুলো বুঝতে পারি না। কথাটা এমন প্রশ্নবোধক করে বললে, সত্যিই আমি খুব ব্যথিত হয়েছি। আমি তোমার যে কোনো আগ্রহ কিংবা প্রস্তাবকে ফিরিয়ে দিতে পারি না।

প্রবাহমান সরু খালের ধারে মেহেরুন্নেছার বাড়ি। দেয়ালের চুনকাম ক্ষয়ে ক্ষয়ে ঝরে পড়েছে। দরজার পাশে একটা ছোট্ট জায়গায় প্রায় রঙজ্বলা অক্ষরে লেখা ‘করুণা খাতুন মঞ্জিল’। পিনাক যখন করুণা খাতুন মঞ্জিলের দরজায় আসে, ভেতর থেকে দরজার খিল খুলে বাইরের দিক মুখ করে দাঁড়াল মেহেরুন্নেছা। তাকে দেখে মনে হল, সান্ধ্যকালীন প্রাথর্না সেরে এইমাত্র সে আসন ছেড়ে উঠে এসেছে। তার কপোলে জ্বলজ্বল করছে একান্তবিশ্বাসের পবিত্র আলো। পিনাক ফলের ব্যাগ, এক কৌটো মধু আর একটা ডায়রি তুলে দিল মেহেরুন্নেছার হাতে। মেহেরুন্নেছা পিনাকের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে রইল, যেন কোনো ভবিষ্যৎদ্রষ্টা পিনাকের কপালের ভাঁজ গুনে গড়গড় করে তার ছায়েতনামা বলে দেবে।

পিনাক কিছুটা অপ্রকৃতস্থ। হাজার হোক, নিজের থেকে দ্বিগুণ বয়সি এক মহিলার সঙ্গে সে একান্তে রাত কাটাতে এসেছে। আর সে ভালো করেই জানে নির্ঝঞ্ঝাট রাত্রিকালে কী কী ঘটতে পারে। সে খাটে বসে একটা পুরনো পত্রিকার পাতা উল্টাতে লাগল। মেহেরুন্নেছা ফল কেটে একটা প্লেটের ওপর সুদৃশ্যভাবে সাজিয়ে আনল। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পিনাকের খাওয়ার দৃশ্যের দিকে মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে রইল।

মেহেরুন্নেছা বলল, আমি তোমার পরিবারের কথা শুনতে চাই। যদিও বহুবার আমি তাদের কথা শুনেছি আর বারবার মনে হয়েছে তারা আমার কাছে তোমার মতোই পরমাত্মীয়। আমি তোমার ছোটভাইটার পড়াশোনার দায়িত্ব নিতে চাই। পিনাক পারিবারিক আলাপের প্রসঙ্গ দ্রুত ইতি টানল, নতুন করে বলবার মতোও কিছু খুঁজেও পেল না। কারণ একজন মানুষের ভেতর কত আর কথা জমা থাকতে পারে! বিবিধ ভাণ্ডারে যা কিছু জমা ছিল ইতোমধ্যে তা একাধিকবার বলা হয়েছে। সে মেহেরুন্নেছার আড়ালের মানুষটিকে দেখতে চায়। সে তাকিয়ে দেখল, মেহেরুন্নেছার পাতলা শরীর, ভারী নিতম্ব আর বড় বড় দুটো চোখ। গলায় আর গালে বয়সের সামান্য ভাঁজ, কয়েকগাছি চুল দুপাশ থেকে ঝুলে পড়ছে। তবে একজন নিঃসঙ্গ নারীর চারদেয়ালের আড়ালের দৃষ্টি যে এত করুণ আর মায়াময় হয়, আগে তার জানা ছিল না। পিনাক অস্থির ভাবলুতায় কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার কাছে মেহেরুন্নেছাকে মনে হল কোনো এক নির্বাসিত দ্বীপের মানুষ।

 

মেহেরুন্নেছার ভেতর এমন এক আশ্চর্য ক্ষমতা, সে যে-কোনো বয়সি পুরুষের চোখের ভাষা সহজে অনুমান করতে পারে। দূর থেকে বলে দিতে পারে পুরুষলোকটির ভেতরে কী চলছে। এমনকি নিজ পেটে ধারণ করা পুরুষসন্তানটি, এমনকি নিজ পিতার কথাও। সে পিনাকের যতটা সম্ভব কাছাকাছি বসে বলল, তোমার বয়সি ছেলেদের নিয়ে চলাটা খুব কঠিন। কেননা, যৌবনে পুরুষগুলো অসভ্য, অমার্জিত আর স্বার্থপর। তারা মেয়েদের শরীর ছাড়া আর কিচ্ছু ভাবতে পারে না। তুমি ভেবো না আমি তোমাকে উদ্দেশ্য করেই এসব বলছি। আমি পুরুষের স্বভাবজাত আদিম কামনাকে কখনো অসম্মান করিনি। তবে হরিণ যেভাবে বাঘের থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলে, মেয়েদেরও সেভাবে রেসের যুদ্ধে উত্তীর্ণ হয়ে বাঁচতে হয়। আমার মনে হয় নারী সরল আর বোকা একথা যেমন সত্য, পুরুষকে ভুলিয়ে একজনম পার করানোর মতো পরিপক্বতাও তাদের থাকে। নারী পুরুষের খাঁচায় স্বেচ্ছায় বন্দি না হলে কেউ তাকে পোষ মানাবার ক্ষমতা রাখে না। পিনাক, তুমি চলতে চলতে যখন এতটা পথ এসেছ, আমি তোমাকে কোনোভাবেই নিরাশ করে ফিরিয়ে দেব না।

তারা পাশাপাশি বিছানায় শুয়ে পড়ল। কাউকে মুখফুটে কিছু বলতে হল না। পিনাকের প্রথম স্পর্শে মেহেরুন্নেছার মনে হল, এই বুঝি চলে এসেছে সুখের মৃত্যু। কোনো তাড়াহুড়ো নেই, স্রেফ একটা আনন্দের ফুঁ। যেন বাতাসের এক ঝটকায় আলোর শিখাটা জ্বলে উঠল। ঘড়ির কাঁটা মধ্যরাতের দাগ পেরুনোর আগেই দুজনের সঙ্গম হয়ে যায়।

পিনাক চুপ করে শুয়ে রইল। মেহেরুন্নেছা নিজেকে ঠিকঠাক করে বলল, আজ যা কিছুহল, কাল তা অতীত। তবে অতীতের স্মৃতি নিয়েই মানুষ বেঁচে থাকে। শোনো পিনাক, আমি যে-কোনো মূল্যে তোমার সাথে সম্পর্কটা টেনে নিয়ে যেতে চাই।

যখন আমি বিয়ে করব, তখন? পিনাক বলল।

শোনো, কোনো কিছু যখন চলতে শুরু করে, সেটা বস্তু হোক কিংবা মানুষ। একটা গতি তাকে পেছন থেকে তাড়িয়ে বেড়াতে থাকে। সেটাকে সহজে আর গতিরোধ করা যায় না। আমার মনে হয় তোমাকে আর কিছু খুলে বলতে হবে না।

পিনাক তারপরও চুপ করে রইল।

আমি কি তোমার নীরবতার কারণ জানতে পারি? মেহেরুন্নেছা বলল। হতে পারে, আমার অনুমান সত্যি নয় তবুও বলব, সুখটুকু ফুরিয়ে যাবার পর তুমি অনুতপ্ত হচ্ছ। আর বারবার তুমি নিজেকে এই বলে ধিক্কার দিচ্ছ যে, একজন বয়স্কা মহিলার সঙ্গে তুমি সঙ্গম করে ফেললে! তবে সত্যি বলতে কী, সমাজে যা কিছু অস্বাভাবিক আমরা সেটাকে আড়াল করতে পছন্দ করি। আর আমাদের সমাজে এটাও প্রচলিত সত্য, প্রতিটি অনভ্যস্ত প্রাথা ভাঙাকে মানুষ পাপের চোখে দেখে। হয়তো যে-কোনো পাপাচারকে তুমি ঘৃণা করতে পারো তবে সেই পাপের মাঝের প্রাপ্তিকে অস্বীকার করার মতো নির্লোভও তুমি নও। যে-কারণে এই মুহূর্তে তুমি অনুতপ্ত, আগামীকাল সেটা পাওয়ার জন্য আবার তুমি মরিয়া হয়ে উঠবে। তারচেয়ে বরং সবকিছু ভুলে যাও। যে সুখটুকু তুমি যাপন করেছ সেটাকে আনন্দে রূপান্তরিত করো। আমি তোমাকে আমার জীবনের একটা ঘটনা শোনাতে চাই।

পিনাক মাথাটা ওপরে তুলে বলল, এ মুহূর্তে আমার জন্য সেটা শোনাই উপযুক্ত।

 

তখন আমি ছিলাম যৌবনের বসন্তদিনে। তুমি বললে বিশ্বাস করবে কি-না জানি না, আয়নার সামনে নিজেকে নিজে অনেকক্ষণ ধরে দেখতাম। শুধু আমার বাহ্যিক অবয়ব নয়, মাঝেমধ্যে নিজের অঙ্গপ্রতঙ্গ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নিজেই নিজের প্রেমে পড়তাম। তখন সমাজ এতটাই রক্ষণশীল ছিল, ছেলে আর মেয়ে একসঙ্গে কথা বলাকে পাপ মনে করা হত। প্রতিটি মেয়ের একমাত্র বিনোদন ছিল অপরিণত বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়া আর মনে লাগুক কিংবা না লাগুক, স্বামীর কাঁধ ছুঁয়ে শুয়ে থাকা। তবে সংসারজীবন ছিল ভিন্ন এক জগৎ। নিজের চিন্