You are currently viewing দীলতাজ রহমান || কেড়াইল

দীলতাজ রহমান || কেড়াইল

দীলতাজ রহমান

কেড়াইল

রুবী বলল, একদিন আমার এক দাদা দুপুরবেলা পুকুর থেকে গোসল করে ভিজে গামছা ঘাড়ে করে বাড়ি উঠছিলে। মানে আমাদের হাওর এলাকা তো। বাড়ি ̧লো তাই বেশ উঁচু হয়। ঢাল বেয়ে উঠতে উঠতে বুকে হাঁফ ধরে যেত।

তো সে দাদা ওরকম হাঁফধরা বুক নিয়ে বাড়িতে উঠে তার ̄স্ত্রীকে দেখলো কেড়াইল দিয়ে উঠোনে নাড়া খড় উল্টে-পাল্টে দিচ্ছে…।
‘কেড়াইল কী?’
কে একজন কথার ভেতরে বাম হাত ঢুকিয়ে দিল। রুবী রাগ করে বলল, কেড়াইল চেনো না! কোনখানকার লাটসাহেব তুমি? গ্রামে উঠোনসহ বাড়ির নিচ পর্যন্ত ভিজে খড় নেড়ে যেটা দিয়ে আবার উল্টেপাল্টে দেয়, তাকে কেড়াইল বলে!
এর ভেতর আরেকজন বলে উঠল, কেড়াইল দেখতে কেমন? কী দিয়ে বানায়?
রুবী এবার সতি ̈ই রাগ করল। বলল, যারা কেড়াইল চেনে না, এই গল্প তাদের জন ̈ না! তারা একপাশে গিয়ে বসো!
আমি এত ভূমিকা করে গল্প বলব না।
এর ভেতর আরেকজন বলে উঠল, চিনি হয়ত, কিন্তু একেক এলাকায় একেক জিনিসের একেকরকম নাম হওয়ায় বুঝতে পারছি না। দেখলে নিশ্চয়ই চিনতে পারব!
ত্রিশ অতিক্রান্ত রুবী ঝামটা মেরে বলল, পাকা বাঁশের আগা, মানে চিকন অংশ থেকে পাঁচ/ছয় ফুটের মতো অংশ কেটে, তারপর আবার ছেঁটে-ছেঁচে সাইজ করা হয়। তবে ওই সাইজ করা বাঁশের মাথার অংশে কঞ্চির বিঘতখানেকের মতো রাখা হয়, যা আলের মতো। খড় উল্টেপাল্টে নাড়ার জন ̈ ওই আগার বিঘতখানেক কঞ্চিই কেড়াইলের মোক্ষম অংশ।
আবার কেউ বলল, তা কেড়াইল কি শুধু খড় উল্টাতে লাগে?
শহর-গ্রাম মিলিয়ে বেড়েওঠা রুবীর মুখের ভাষা বড় আলগা। সে দাঁত খিঁচিয়ে বলল, তুমি কোন জমিদারের নাতি হে,কেড়াইল আর কী কাজে লাগে, তোমাকে তাও আমার বুঝিয়ে বলতে হবে!
কাজল বলল, পুরান ঢাকার মানুষ আমরা। আমাদের কাজকর্ম যন্ত্র নিয়ে। ছেলেরা একটুবড় হতেই বাড়ির সামনে হোক আর সিঁড়ির নিচে হোক একটুক্ষুদধ মেশিন দিয়ে বসিয়ে দেয় ব্যবহার্য জিনিসপত্র উৎপাদন করতে। তারপর বিক্রি। অথবা বাপ-মা ঘাড় ধরে ঠেলে তুলে দিয়ে আসে মামা-চাচা গোছের কোনো উৎপাদকের সহকারী হতে! আমার প্রজন্মে এসেও আমাদের সবাই তাই করত।
জাহাঙ্গীর কাজলকে বলল, সেখান থেকে তুমি চার্টার্ড একাউন্ট হতে পারলে? তাও এক চান্সে পাস করে? যা খুব কম মানুষই পারে!
কাজল বলল, হাঁ পারলাম তো! এখন থেকে আমার সাথে বুঝে কথা বলবে! আমরা যদি জানি ধানগাছে কাঠ হয়, তাতেও দোষ নেই! যদিও আমার দাদা ধানমন্ডিতে ধান ফলিয়েছেন। বাবারও তা মনে আছে। কিন্ত জানতে চাইনি কখনো, ধান গাছ কেমন। ছবিতে যা দেখেছি!
আলোচনা থিতিয়ে যেতে সুরভী বলল, হায় হায়, যা নিয়ে এত বচসা তাই তো থেমে গেল?
ফাহিম বলল, কী?
সুরভী বলল, ওই যে রুবীর দাদার গল্প! দাদা-দাদিকে নিয়ে যখন গল্প, তখন তা মজারই হবে। বলে রুবীর কাছাকাছি বয়সী সুরভী পাশে বসে থাকা রুবীকে ধাক্কা দিয়ে বলল, আবার শুরু কর!
রুবী জাহাঙ্গীরের দিকে তাকিয়ে বলল, শুরু করব, কিন্তু টগর, মানে তোমার বউ কই? বাড়িতে ডেকে এনে বউ লুকিয়ে রাখবে, তা হবে না ভাই!

জাহাঙ্গীর বলল, সে অনিবার্য কারণবশত অনুপস্থিত। কোথায় আছে তাও বলতে মানা। তবে তোমরা থাকতে থাকতে তিনি যেখানেই থাকুন, আবির্ভূত হবেন। তার সাথে আমার তেমনি কথা! তবে ভয় পেও না। আমি চায়ের পানি চুলোয় চাপিয়ে এসেছি। আর টগর তোমাদের জন ̈ টেবিল উপচে খাবার রেখেছে। বিকেল থেকে রাত অবধি যেন তোমাদের খিদে তেষ্টায় না ভুগতে হয়।
কাজল বলল, তাহলে এমন গুরুদশা অবস্থার ভেতর আমাদের ডাকলে কেন?
জাহাঙ্গীরে হেসে বলল, গুরুদশা মানে কী জানো তো? যা হোক, সেরকম না হলেও আমাদের শিষ্যদশা চলছে বলত পারো। আমরা দুজন জার্মানে যাচ্ছি। দুই বছরের জন ̈। ̄‹লারশিপ নিয়ে। বেশি বয়সে উচ্চতর শিক্ষা আর কি!
ফাহিম বলল, তোমাদের বাচ্চা দুটি?
জাহাঙ্গীর বলল, ওদের নিয়ে যেতে খুব ঝামেলা। আবার ওদের নিয়ে গেলে আমরা লেখাপড়া করব কখন! আমরা তো ফিরে আসার জন ̈ যাচ্ছি। তাই ওরা নানা-নানি, দাদা-দাদির কাছে থাকবে। এখন তো কিছুটা বড়ও হয়ে গেছে।
ঝামেলা হবে না। আর আমাদের দুজনের প্যারেন্টই শক্ত-সমর্থ আছে।
মারুফ বলল, মহারক্ষে। তবে তোমাদেরও মনের জোর আছে বলতে হবে। বেশিরভাগ মানুষই এই রিস্ক নেবে না।
জাহাঙ্গীরের ঘোষণা ও মারুফের মন্তব ̈ শেষ হলে সবাই বিলম্বে হাততালি দিল এবং সেই সূত্রে তারা জাহাঙ্গীরের পেছনে পেছনে টেবিলের দিকে আগাল বৈকালিক পর্বের চা-নাস্তা খেতে। অভ্যস্ত হাতে জাহাঙ্গীরই সবাইকে পরিবেশন করল চা। সারি সারি রাখা নাস্তা যে যার মতো খেয়ে চায়ের ভরা কাপ হাতে যে যার মতো আবার গিয়ে ড্রয়িংরুমে বসতে বসতে কাজল হিসেব করে বলল, আর কেউ আসতে বাকি নেই তো? বলে সে মাথা গোনা শুরু করে দিল।
ফার্মাসিস্ট ফাহিম বলল, রুবী, এবার শুরু করো তোমার দাদার কেড়াইলের গল্প!
রুবী বলল, ভুলে গেছি, কোন পর্যন্ত এসেছিলাম।
সুরভী বলল, মাত্র তোর দাদা ঢাল বেয়ে বাড়ি উঠছিল। উঠে দেখল তো দাদি খড় ওল্টাচ্ছে।
এবার গল্পকথক রুবীর নিজের হাসির জন্যই শ্রোতাদের বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল। রুবীর হাসি দেখে তারাও তেমনি না
বুঝে হাসতে থাকে, আর বলতে থাকে, রুবী, ভাই তুই পারিসও। ভুলেই গিয়েছিলাম, আমরাও হাসতে পারি!’
হাস্যরত রুবীর চা ছলকে শাড়িতে পড়ল খানিকটা। এতে অনে ̈রা ভয়ে তার থেকে সরে বসল। রুবী নিজেকে অনে কষ্টে দমিয়ে আবার শুরু করল, দাদা, মানে আমাদের সেই পাড়াত দাদা বাড়িতে উঠে…।
কাজল বলল, তুমি তো বলেছ, তোমাদের বাড়ির ওপরের ঘটনা। তাহলে বাড়িত দাদা হবে!
আরমান বলল, বলতে দাও ওকে। পাড়াত থেকে বাড়িত-তে এসে ঠেকেছে। আর বাড়ির ওপরে যারা থাকে তারা সব রক্তের সম্পর্কের মানুষ থাকে। সেই হিসাবে ওর দাদার আপন ভাই না হোক, চাচাত ভাই হবে!
কাজল বলল, রুবী এবার নিজেই ধরা খাবে!
রুবী বলল, খেলে খাব! গল্প তো শেষ করি! শোনো তোমরা, দাদা তার স্ত্রীর হাতের সেই খড় নাড়া কেড়াইলটা নিয়ে কেড়ে নিয়ে, সেই মধ ̈ উঠোনেই তাকে সেই কেড়াইল দিয়ে এলোপাতাড়িভাবে পেটাতে পেটাতে বলতে লাগল,
হারামজাদি মাগী, তোরে কয়দিন ধরে কী কচ্ছি তা শুনিস না ক্যান!
পাশাপাশি বসা ক’জন একসাথে রুবীর মুখের দিকে তাকাল। একজন বলল, কেন ওইভাবে পিটাচ্ছিল?
রুবি রসাল মুখে আবার শুরু করল, সেই দাদা-দাদির চার ছেলে, দুই মেয়ে। সব ছোট ছেলেরও তখন বিয়ে হয়েছে।
ক’মাস মাত্র আগে। দাদা দাদিকে বেধড়ক মারছে, আর ছেলের বউয়েরা যে যেখানে ছিল, আড়াল থেকে ইশ্ইশ্ করছে। শ্বশুর মারছে শাশুড়িকে এমন বুড়ো মানুষের মার কে যাবে ঠেকাতে! ছেলেরা কেউ বাড়ি থাকলেও তো আর এগিয়ে আসতে পারে না। বরং তাদেরও তখন বাড়ি ছেড়ে পালানোর কথা! এই অব ̄’ায় হাড্ডিসার বুড়ির কী দশা বোঝো!
জাহাঙ্গীর বলল, তুমি তখন কোথায় ছিলে?
রুবী বলল, একেবারে ওই উঠোনেই ছিলাম! আমরা এককোনায় চড়ুইভাতি খেলছিলাম। তারপর শোনো…।
কাজল বলল, তোমার বয়স তখন কত?
সাত-আট হবে! তারপর শোনোই না, শেষে সেই দাদা-দাদির ছোট ছেলের নতুন বউ একহাত ঘোমটা টেনে এগিয়ে গেল শ্বশুরের হাত থেকে কেড়াইল টেনে ধরতে। তাও কি শ্বশুর ছাড়ে! শেষে শ্বশুরকে আশ্ব ̄Í করতে নতুন বউ মন্ত্র পড়ার মতো শ্বশুরকে শুনিয়ে শাশুড়িকে কপট ভর্ৎসনা করতে লাগল, তয় আম্মা, আব্বা যা কয় আপনি তা শোনেন না ক্যান? য়্যা, শোনেন না ক্যান…! বিটা মানষির মর্জি বুইজে চলতি অয় না? আমরা বউ অইয়ে তা কি শাশুড়ি রে শিখাইয়া দিয়া লাগবে নাকি?
এসব বলে শাশুড়িকে শ্বশুরের কবল থেকে আগলে ঠেলে সে ছোট বউ রান্নাঘরে অন্য জা-দের ভেতর নিয়ে তুলল। যেন শ্বশুর আর তাকে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে যেতে না পারে। তারপর নতুন-পুরাতন চার জা মিলে ঠোঁট টিপে হাসতে লাগল! আর বাকি সারাদিন ঢেঁকির পাশে বসে চিকন-চাকন গড়নের বুড়ির নাকি সুরে কান্না আর থামে না!
ফাহিম বলল, বুড়ির কান্না কি অভিমানের না অপমানের?
রুবী বলল, আগে তো এভাবে বুঝিনি। অভিমান, অপমান পরের পর্ব। এখন তো মনে হচ্ছে ওই যে হাড্ডিতে ঠনঠন বাড়ি লেগেছে, সেটা সেই কান্নাই!
কাজল বলল, চার জা মিলে ঠোঁট টিপে হাসার কারণ কী?
রুবী বলল, শোনোই না, চার বউয়ের এই শ্বশুর-শাশুড়ি এই দুজনের কারও সাথেই কারও রাত-দিন কখনো তেমন দেখা হওয়ার অবকাশ নেই। ওই বয়সেও বুড়ি খুব পরিশ্রমী ছিল। তাই তাদের দেখা হয় বুড়ি যদি বাড়ির নিচে সেই বিরাট জলাধারের এতটুকুবাঁধা কাঁচাঘাটে কোটা আনাজ-পাতি খালুইতে করে ধুতে বা কলস নিয়ে পানি আনতে যায়। আর বউদের শ্বশুর যদি সেখানে গামছা দিয়ে ঢলে-ঘষে সেই তখন গোসল করতে থাকে। বা পরে যায়। আর তাও যদি অই সময় সে ঘাটে আর কেউ না থাকে, তখনি বুড়ো বলতে পারে, ‘এই আজ রাতি বারান্দায় আসিস কিন্তুক…!’
আবার কোনোদিন দুজনের এমন মোক্ষম দেখা হলে বউদের শাশুড়িকে একা পেয়ে শ্বশুরের গলায় আবার, ঝাঁজ, ‘এই তোরে কী কইছিলাম? হারামজাদি মাগি তোর মাজা কলাম বাড়ৈ ভাইঙ্গা দিবানি!’
নিজের স্বামীকে ষন্ডা মনে করে, তার প্রস্তাবকে কুপ্রস্তাব মনে করে বউদের শাশুড়ি, মানে আমার সেই দাদি গাঁই ̧গুঁই করে দধুতই ঢাল বেয়ে বাড়িতে চলে আসে। ছাগল পালা বুড়ির ভয় হয়। কারণ পাঁঠার তেজ তো সে হরহামেশা দেখে। তাই সে মনে করে, বুড়ো ওখানেই না তাকে ওরকম করে ধরে ফেলে কাদার ভেতর শুইয়ে দেয়! বাড়িভরা বউ-ঝি, নাতিপুতি।
খুঁটোর দড়ি ছেঁড়া পাঁঠার মতো বুড়োর ওরকম ঘোঁত ঘোঁত আলাপের অংশবিশেষ একদুপুরে কেউ পেছন থেকে শুনে ফেলে সমবয়সী নতুন চাচি ওই বাড়ির ওই ছোট বউকে সে তা বলে দেয়। আর ছোট বউ তা বাকি তিন বউয়ের কাছে বলে মজা করেছে। আর এভাবে তা রটে গেছে পাড়ার সব জা’য়ের পাতে!
ক’জন বন্ধু-বান্ধব একত্র হয়ে গল্প করতে করতে রুবী তার ছোটবেলার এই স্মৃতি এভাবেই রসিয়ে ঝেড়ে দিল সবার ভেতরে। রুবী এও বলল, কিন্তু আমি আশ্চর্য হচ্ছি কেন জানো তোমরা?
হেসে গড়াগড়ি খাওয়া ক’জন বলল, কেন?
: আমার বয়স তখন সাত-আটের বেশি না। কিন্তু আমি এই ঘটনার ভাবার্থটা তখনি বুঝলাম কী করে? কেউ তো আমাকে খোলাসা করে বুঝিয়ে দেয়নি!
কিছুটা কম কথা বলা আরমান বলল, শোনো প্রতিটি মা-বাবা বিছানায় কী করে প্রতে ̈কটি শিশুই তা বুঝতে পারে। অথচ আমরা জানি যে আমাদের শিশুরা জানে তাদের মা-বাবা পাশাপাশি শুয়ে নাক ডেকে শুধু ঘুমায় আর সব ভালো চিন্তা করে!
কাজল বলল, বিষয়টা নিয়ে আমরা হাসাহাসি করছি, কিন্তু বিষয়টা কত করুণ, এই ঘটনার ভেতর নিজেরা ঢুকে আবার কল্পনা করো!
সুরভী বলল, সেটা আবার নিজের ওপর এনে কল্পনা করব কী করে?
মারুফ বলল, যেভাবে কোনো কোনো গল্প পড়ে বুক ভাসাও! ভেবে দেখো, ওই লোক বিয়ে করেছিল হয়ত উনিশ/বিশ বছর বয়সে। তারপর তার ছেলে-মেয়ে বড় হতে হতে মানে আবার তার ছেলেকে ওই বিশ/বাইশ বছর বয়সে বিয়ে দিয়েছে। তারপর একে একে অন্যগুলোর পালা। একখানা ঘরে সবার জন ̈ খোপ খোপ করে স্বেচ্ছায়-আনন্দে সে নিজে জায়গা বেছে নিয়েছে বারান্দার খোলা জায়গায়। আর বউ ঘরের ভেতর হাঁড়ি-পাতিলের কাছে একটা পাটি বিছিয়ে হয়ত পড়ে থাকত। তারপর নাতিপুতির সংখ্যা বাড়লে মায়ের দুধছাড়া ̧লো নিজের কাছে টেনে আনা। তখন কিন্তু সে বীর্যবান পুরুষটি বুঝতে পারেনি, বাড়িতে আরেকখানা ঘর না তুলে ছেলে বিয়ে দেওয়া মানে এ তার নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা! আমি গ্রামে সাধারণ পরিবারে জন্মেছি বলে জানি, তারপর কী হয়, শীত আসি আসি করলে পাটখড়ির বেড়া দিয়ে সে, মানে বাড়ির কর্তা বারান্দার দু’দিক ঘিরে নিল। আরেক দিক তো ঘর দিয়ে ঘেরা। অবস্থা মোটামুটি হলে হয়ত সে তিনদিকের আড়ালে একখান নড়বড়ে উদ্বৃত্ত চৌকিও ভাগে পেয়ে তাও সেখানে বেঁধে-ছেদে জুড়ে নিল। শীত বাড়তে থাকলে সে চৌকির খোলা দিকে বাড়ির কারও একখানা পুরনো শাড়ি টাঙিয়ে নিল। তাতে পর্দা হলেও শীত আর কতটা মানে! তার ভেতর যদি মাঝে মাঝেই স্ত্রীর অভাবটা প্রবল হয়ে ওঠে…।
রুবী মারুফকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ঠিক বলেছ! আর এরা কিন্তু খুব গরিব ছিল না! এ গল্প অন্তত সারাবছর নিজের জমির ধানের ভাত খাওয়াদেরই গল্প। একখানা ঘর করতে যে উদ্ব…ত্ত অর্থের দরকার, তা অনেকেই ওই দাদার মতো গুছিয়ে উঠতে পারত না! তাই একেক ছেলে বিয়ে দিত আর ঘরের খোপের ভেতর আরেকটা খোপ তৈরি হত।
সুরভী বলল, আরেকখানা ঘর যারা করতে পারত, দেখা যেত তারা আরেকটা বিয়েই করে নিয়েছে! আর করলে তো কেউ বুড়ি বা মাঝ বয়সীকে করত না! দেখা যেত এমন একজনকে শ্বশুর নিয়ে আসছে, সে ওই বউ ঝিদেরই বয়সী।
এমন ঘটনা আমিও কিছুটা দেখেছি। আর পুরনো বউকে দেখেছি পুরোই ভাঙাকুলোর ভূমিকায়। যা দিয়ে ছাই ফেলার মতো তুচ্ছ অথচ ভারি কাজ করা হয়। পেটেধরা ছেলে-মেয়ের কাছেও মা ওই ভাঙা কুলো…। বিষয়-আশয় নিয়ে বাবার সাথে যার কোনো যোগসূত্র থাকে না, তাতে সন্তানের অবহেলা-অগ্রাহে ̈ মাটিতে মিশে যেতে তার আর সময় লাগে না। বাবার পারিবারিক ব ̈বসা প্রতিষ্ঠানে অধিষ্ঠিত মারুফ রহমানকে ওরা বলে বিত্তবানের বেকার ছেলে। সেই বেকারের মুখের দিকে সবার কৌতূহলী চোখ, গল্পের মোড় কোনদিকে যায়, ভেবে। কিন্তু সুরভীর কথা আবার বানচাল করে দিল। কাজল বলে এই লোকটার, মানে রুবীর দাদার বয়স কিন্তু তখনো পঞ্চাশের বেশি না। অথচ দধুত তার স্ত্রীর সুখ তার কাছ থেকে শুধু অতীত হতে থাকে…।
রুবী কাজলের প্রতি ফুঁসে ওঠে। বলে, এই আবার তুমি আমার দাদা বললে কেন? এটা আমার দাদার ঘটনা হলে আমি তোমাদের বলব, এত বোকা তোমরা আমাকে ভেবেছ? তবে আমার দাদা চার-চারটে বিয়ে করেছিল হি হি হি…।
কাজল বলল, ‘তোমার দাদার যখন জ্ঞাতি ভাই, তো তোমার দাদাই তো বলব!’ কাজল রুবীকে তোয়াক্কা না করে পুরনো প্রসঙ্গে ফিরল। বলল, ওই রকম দাদাদের স্ত্রীদের তখন সংসারের টানাপড়েন সামাল আর ঘানি ঘোরাতে লবেজান অবস্থা। সারাদিনের খাটুনির পর দেখা যায়, খেয়েদেয়ে এশার নামাজ পড়তে জায়নামাজেই বেঘোর ঘুম চলে আসে তার। আর দিনে দিনে সরতে সরতে স্বামীর কাছে যাওয়া অনেক স্ত্রীরই স্বভাববিরুদ্ধ। তারা মনে করে ওটা, মানে যাওয়াটা পুরুষের একচেটিয়া কাজ। পুরুষই কাছে আসবে বা টেনে কাছে নেবে, যা করার পুরুষই করবে! তারপর আবার দরজা টপকে বারান্দায় নামা! খুঁট করে শব্দ হলে চোর এসেছে ভেবে একে একে সবাই জেগে সারাবাড়ি মাথায়! শরীরে শিহরণ যদি একটু খেলেও, সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে চালশে শরীর থেকে তা উবে যায়।
জাহাঙ্গীর বলল, এই তুমি যে তোমার আলোচনায় ধুয়ে-মুছে সব বুড়োবুড়ির আচরণকে এক করছ, তুমি জানো, আমি আমার বাবার দ্বিতীয় সন্তান। অথচ আমার সমান আমার চাচা আছে…! আমার বড়বোনের সমান আরেক চাচা আছে। তবে অজ-পাড়া গাঁ হলেও আমাদের পূর্বপুরুষের পাকা বাড়ি। ছেলে-মেয়ে উৎপাদনের জন্য তাদের কারও কোঠার অভাব ছিল না।
কাজল বলল, তাহলে তো কোনো কথাই নেই। তবে সেটা তোমার দাদার মতো ছেলের বিয়ে দিয়েও যাদের নিজেদের ওরকম আয়েশ করে বউ নিয়ে থাকার জায়গা আছে, তাদের মেয়ে-জামাই, ছেলে-বউয়ের সাথেও উৎপাদন অব্যাহত থেকেছে। নাহলে মাসে নারীদের ডিম ফোটে একটা। তাও বার থেকে চব্বিশ ঘণ্টা সক্রিয় থাকে। এর ভেতর তো তোমার দাদাকে তার বীর্যটা দাদির ডিম্ব পর্যন্তপৌঁছে দিতে হয়েছে। তাতেই না তোমরা নিজের বয়সী চাচা-ফুপু পেয়েছ! তাই যাদের জায়গা নেই, তার ওপর আবার জীবনের সব আয়োজনই অপরিকল্পিত। প্র ̄‘তি ছাড়াই অসময়ে শখ করে যারা ছেলের দাড়ি শক্ত হওয়ার আগেই বিয়ে দিয়েছে, সেই তারাই নিজের গড়া সংসারটা একসময় তাদের নিজেদের জন গ্যাঁড়াকল বানিয়ে ছেড়েছে!’
জাহাঙ্গীর বলল, তা শ্রোতারা না একপেশে করে ফেলে ভাবতে। তাই স্পষ্ট করে দেওয়া ভালো!
রুবী বলল, তোমরা যার যা বলার বলো, কিন্তুশ্রোতাদের বোঝার ক্ষমতার ওপর ভরসা রেখো। তাদের স্থান-কাল- পাত্রজ্ঞান আছে।
তুষার বলল, কিন্তু এটা কি জানো, এরকম করে আলাদা থাকতে থাকতে দুজন মানুষের ভেতর এমন দেয়াল সৃষ্টি হয়, মানে জড়তা সৃষ্টি হয়, যে পুরনো এই মানুষ দু’টি পরস্পর পরস্পরের কাছে উন্মোচিত হওয়ার থেকে অনে ̈র কাছে উন্মোচিত হওয়া তাদের আরও সহজ! এই কারণেও কিন্তু পুরুষরা সুযোগ পেলে আরেকবার বিয়ে করে। দুই-চারজন নারীও নাতি-নাতনিদের লজিং মাস্টারকে বাড়তি যত্ন আত্তি করে করে মনের মরকুট আবেগকে পরিতৃপ্ত করার চেষ্টা করে! তবে রুবীর সেই দাদা-দাদির মতো অধিকাংশেরই সীমাবদ্ধতা প্রকট। তাই স্বাভাবিকভাবেই ছেলের বউদেরভেতর তা জানাজানি হয়। বউয়েরা আবার যার যার খিকখিক করে হাসতে হাসতে তাদের শ্বশুর-শাশুড়ির কথা স্বামীদের কাছে বলছে। বিষয়টা হাসতে হাসতে পাড়া ভেসে যায়। কিন্তু ওই শ্রেণির জোয়ান শ্রোতা যারা, মানে ওইরকম সীমাবদ্ধতায় জর্জরিত জীবন যাদের, তারাও যদি আগের থেকে তাদের জায়গা ধরে না রেখে ছেলেদের ছেড়ে দেয়, তাদেরও কিন্তু কপালে ওই একই দশা ঘটবে, ওই কেড়াইল!
জাহাঙ্গীর বলল, শোনো তোমরা, স্বামী- স্ত্রীর যে দৈহিক সম্পর্ক এটাও কিন্তু চর্চার বিষয়। এর চর্চা ছেড়ে দিলে বিশেষ করে গ্রাম ̈ নারীরা। এদের তো অযত্নের শরীর। ঠিকমতো খাওয়া নেই তার ওপর আবার খাটুনি বেশি। এদের চল্লিশ না ছুঁতেই গিরায় গিরায় ব ̈থা শুরু হয়ে যায়। তারপর নড়েচড়ে শুতেও ভয়। সেখানে স্বামীর কাছে গিয়ে পা দুটো ফাঁক করে নিজেকে ক্ষুধার্ত স্বামীর কাছে শরীর মেলে দেওয়া কী ভয়ডর, তা তোমরা জানো…?
রুবী বলল, ’এই কথা হচ্ছিল কি নিয়ে, সেখানে জাহাঙ্গীর কী অসভ্য কথা শুরু করেছে। এই এ প্রসঙ্গ ক্লোজ…।’
কাজল বলল, জাহাঙ্গীর ডাক্তার। এই বিষয় সেই ভালো জানলে তার মুখ আটকানোর ক্ষমতা আমাদের কারও নেই!
জাহাঙ্গীর বলল, প্রসঙ্গ ক্লোজ করো। কিন্তু মেয়েমানুষ দু’পা ফাঁক করে না দিলে সব সৃষ্টি থেকে শিল্প-সাহিত্য থেমে যাবে। মানে মানুষই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তারপরও ফাঁক কথাটা শুনতে কানে লাগে!
আরমান বলল, যার যার কাজ ফেলে জাহাঙ্গীরের আমন্ত্রণে আমরা একত্র হলাম। এসে পেলাম বাসায় গিন্নিনেই। আর মাথায় করে নিয়ে যাচ্ছি রুবীর দাদা-দাদির কেড়াইলের কিচ্ছা!
জাহাঙ্গীর বলল, যা-ই শিখলাম না শিখলাম, রুবীকে আর ডাকা যাবে না। ও শুধু নিষিদ্ধ গল্প টেনে আনে। একদিন আরেক আড্ডায় সে এর থেকে ভয়ের গল্প টেনে এনেছিল! বিশ্বাস করো তোমরা, আমি বিবধত হয়েছিলাম সেখানে।
কাজল বলল, সে গল্পও কি ওর আরেক দাদার? নাকি নিজের নানার? যারই হোক ভুলে যেও না। আরেকদিন আজকের
মতো মজা করে শোনা যাবে!
রুবী জাহাঙ্গীরকে বলল, আমাকে আর না ডাকো, তবে আজকের আলোচনায় যে বিষয়টা পাড়া হল, বাড়ি গিয়ে যার যার হাজব্যান্ড এবং স্ত্রীকে বোলো কিন্তু! ‘রাতের সব তারাই আছে দিনের আলোর গভীরে’র মতো আমার দাদার অভিজ্ঞতা যত্ন করে রেখে দিও যারা দীর্ঘ যৌনজীবন চাও!
রুবীর কথায় আবার সবার একচোট হাসি হল। সুরভী রুবীকে বলল, তুই বলতে পারবি তামজিদ সাহেবকে!
রুবী বলল, আরে কবেই বলেছি। তবে দেরিতে বলেছি। প্রথমে তো আমার তার সাথে এতকথা হত না!
সুরভি বলল, কেন রে? তোর সাথে কি তার সম্পর্ক প্রথম দিকে ভালো ছিল না?
রুবী চোখ ট্যারা করে বলল, তত দিনে ওই দাদা আর দাদি তো আরও বুড়ো হয়ে গিয়েছিল, তাই।
আরমান বলল, তোরা একই বাড়িতে বড় হয়েছিস। বিয়ের আগে তোদের দেখা সাক্ষাৎ হত?
আরে, অনেকদিন ধরে বিয়ের কথা হয়নি। যখন তখন ধরে কলমা পড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।

কেউ ওঠার জন্য উশখুশ করছিল। রুবীর শেষের কথায় আবার সবাই গেঁড়ে বসল। প্রায় সবাই সমস্বরে বলল, ঘটনাটা দ্রুত বল!
রুবী শুরু করে। যেন নিজের নয়, অন্যের গল্প শুরু করেছে সে। বলল তামজিদ তখন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ত।
আমাদের অত বড় বাড়ি থেকে ও-ই একা ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ত। আমাদের আগের প্রজন্মের কেউ অত শিক্ষিত ছিল না। পরের প্রজন্মের ও-ই পালের গোদা। ওর সময়ে ও একাই ঢাকা থেকে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে এমএ পড়ত।
তখন তো যোগায