You are currently viewing প্যারাবল: বিন্দুর ভেতরে সিন্ধু দর্শন-মাজহার জীবন

প্যারাবল: বিন্দুর ভেতরে সিন্ধু দর্শন-মাজহার জীবন

একদল অন্ধ মানুষ শুনতে পেল শহরে অদ্ভুত এক প্রাণি এসেছে। প্রাণিটার নাম হাতি। তারা কেউ-ই হাতির অবয়াবব আর চেহারা সম্পর্কে অবগত ছিল না। কৌতুহলের বসে তারা বলল, “আমরা সবাই হাতিটা স্পর্শ দেখবে এটি কেমন। কারণ অন্ধ হলেও কোনকিছু স্পর্শ করে পরখ করতে আমরা সক্ষম।” তারা সবাই তাই হাতির কাছে গেল। একেকজন হাতির একেক জায়গায় দাঁড়িয়ে স্পর্শ করা শুরু করলো। প্রথম জন হাতির শুঁড় স্পর্শ করে বলল, “হাতি মোটা সাপের মতন দেখতে”। যার হাত কান স্পর্শ করলো সে বলল, এটা দেখতে এক ধরনের হাতপাখার মত। আবার যে হাতির পা ধরতে পারলো সে জানালো, এটি দেখতে গাছের গুড়ির মতো এক ধরনের পিলার। আর যে হাতির একপাশ স্পর্শ করলো সে বলল, “এটি দেখতে প্রাচীরের মতন ”। অন্যদিকে যে লেজ ধরার সুযোগ পেল সে বললো, এটি দড়ির মতো। শেষ ব্যক্তি হাতির দাঁত ধরে বললো, এটি শক্ত মসৃণ বল্লমের মতো।
প্রিয় পাঠক উপরের গল্পটা সাহিত্যের ময়দানে প্যারাবলের একটা উৎকৃষ্ট উদাহরণ। আমরা এ প্রবন্ধে প্যারাবল নিয়ে সাধারণ আলোচনা করবো – দেখার চেষ্টা করবো প্যারাবল কি, এর বৈশিষ্ট, প্যারাবলের সাথে রূপক, উপমা, এলিগোরি ও ফেবলের পার্থক্য, দেশে দেশে প্যারাবলের চর্চা, প্যারাবল চর্চার ভবিষ্যৎ ইত্যাদি।

প্যারাবল কি?
সাহিত্যের ইতিহাসে প্যারাবলের উপস্থিতি প্রাচীন যদিও এটি কখনই একটি আলাদা শক্তিশালী স্বতন্ত্র শাখা হিসেবে দাঁড় হয়নি। এর অন্যতম কারণ হতে পারে প্যারাবলের সাথে ধর্মীয় শিক্ষার একটা সম্পর্ক মধ্যযুগ থেকে বিশেষ করে বাইবেলে। আধুনিককালে হোর্হে ল্ইু বোর্হেস, কাফকা, জন হোকস, ডোনাল্ড বার্থহেলম, রবার্ট কোভার, উইলিয়াম এইচ গাস প্রভৃতি শক্তিশালী সাহিত্যিকরা প্যারাবলের চর্চা করায় সাহিত্যের এ শাখাটি আলোচনায় ফিরে এসেছে। এখানে বলে রাখা ভাল, সাহিত্যে কাহিনি বা আখ্যানের জন্ম থেকেই প্যারাবলের চর্চা হয়ে আসছে। ফলে লিখিত সাহিত্য ইতিহাসে রোমান, গ্রিক, চীনা, জাপানী, আফ্রিকান এবং ল্যাতিন আমেরিকান প্রাচীন সাহিত্যে প্যারাবলের চর্চা হয়েছে। ফেবলের মতো প্যারাবলও এক সংস্কৃিত থেকে অন্য সংস্কৃতির মাঝে সেতু বন্ধনের কাজ করেছে। ভারতীয় অন্ধের হাতি দর্শন প্যারাবলটি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এ প্যারাবলটি ভারতীয়, জাপানী, পার্শিয়ান এবং ইউরোপীয় সাহিত্যে দেখা যায়।
প্যারাবল শব্দটি ইংরেজিতে এসেছে গ্রিক শব্দ parabolē; এখানে para অর্থ হলো পাশাপাশি বা নিকটবর্তী আর bolē অর্থ হলো ছোঁড়া বা নিক্ষেপ করা। বৃহত্তর অর্থে প্যারাবল মানে ‘তুলনা করা, ব্যাখ্যা করা, প্রতিতুলনা করা’। সংক্ষিপ্ত কল্পকাহিনি বোঝাতে গ্রিক অলঙ্কারশাস্ত্রবিদরা প্যারাবল শব্দটি ব্যবহার করেন। প্যারাবল আসলে এক ধরনের রূপকাশ্রয়ী প্রতিচিত্র (metaphorical analogy)
এ গ্লোসারি অব লিটারারি টার্মস গ্রন্থে প্যারাবলের আলোচনায় বলা হয়েছে, ‘প্যারাবল হলো মনুষ্য বিষয়ে খুব সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। এটি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যা অব্যক্ত প্রতিতুলনা (analogy) বা সাদৃশ্য, উপমা, তুলনা (parallel) এর মাধ্যমে একটি সাধারণ সূত্র (thesis) বা শিক্ষার সাথে যোগসুত্র তৈরি করে বর্ণনাকারী তার পাঠকের কাছে পৌঁছে দেয়।’
মার্ক টার্নার মনে করেন, প্যারাবল হলো একটি গল্পের মাধ্যমে আরেকটি গল্প এমনকি আরো অনেক গল্পের উপস্থাপন যা ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত দু’ভাবেই হতে পারে। তাঁর মতে প্যারাবল বৃহত্তর অর্থে কেবল সাহিত্য বা শিক্ষা/নীতিবিষয়ক একটি পদ্ধতি না বরং এটি হলো মৌলিক জ্ঞান বা ধারণা সংক্রান্ত নীতি (every level of our experience) যা আমাদের জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতা ব্যাখ্যায় ভূমিকা রাখে এবং যার উপস্থিতি সর্বত্র দেখা যায় – সময় বলা থেকে জটিল সাহিত্য সৃষ্টি পর্যন্ত।
সাহিত্য সমালোচক এক্স জে কেনেডি মনে করেন, প্যারাবল হলো সংক্ষিপ্ত গল্প যা কোনকিছু শিক্ষা দেয় এবং কিছু প্যারাবল হলো এলিগোরি তবে প্যারাবলই এলিগোরি না। আবার পেঙ্গুইন ডিকশনারি অব লিটারারি টার্মস এন্ড লিটারারি থিওরি গ্রন্থে বলা হয়েছে, প্যারাবল হলো ছোট ও সাধারণ গল্প যা নৈতিকতার নির্দেশনা দেয় আর যার রয়েছে এলিগোরি আর ফেবলের সাথে সম্পৃক্ততা।
জন রাইট মনে করেন, প্যারাবল আংশিক ব্যঙ্গত্মক (satiric), বিদ্রুপাত্মক-ইউটোপিয়ান বিজ্ঞান-ফিকশন (mock-utopian science-fiction) জাতীয় গল্পের মতন এবং নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতায় এটি ব্যঙ্গতাযুক্ত (sardonic), পান্ডিত্যপূর্ণ গল্প। বেন বেলিটের মনে করেন, প্যারাবল হলো হেঁয়ালীপূর্ণ প্রচারের (enigmatic preachment) সাধারণ প্রক্রিয়া।
প্যারাবল আর ফেবল মানুষ মুখে মুখে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহন করে নিয়ে এসেছে যা আসলে সাহিত্যের লিখিত রূপের আগ থেকে চলে এসেছে। ফলে এতে লোকজজ্ঞানের উপাদান পাওয়া যায়। প্যারাবল সমাজজীবন বিশ্লেষণে মনোযোগী নয় বরং পাঠক বা শ্রোতাকে তার বিশ^াস স্মরণ করিয়ে দেয়। প্যারাবলে গল্প বলার চেয়ে মানুষের আচরণের ঘটনাবলী তুলে ধরায় আগ্রহী। প্যারাবলের পাঠক বা শ্রোতা এটা শুনে মনে করে যে, এটা তো তাদের জনপদেরই গল্প, এটা তো জানাই ছিল, আবার তা মনে পড়ে গেল।
তাহলে বলা যায়, প্যারাবল হলো সংক্ষিপ্ত গদ্যে কিংবা পদ্যে লিখিত শিক্ষামূলক কল্পকাহিনি যার ভেতর এক বা একাধিক নির্দেশনামূলক শিক্ষা বা নীতি কিংবা তত্ত্বের সন্নিবেশ থাকে।

প্যারাবলের বৈশিষ্ট্য
আগেই আমরা ধারনা পেয়েছি যে, প্যারাবল হলো ছোট পরিসরে একটা গল্প যা সার্বজনীন কোন সত্যকে প্রকাশ করে। ফলে বর্ণিত আখ্যানে সার্বজনীনতা থাকে। আর এ গল্পের বর্ণনা হয় অতি সাদাসিধে। এর একটা ঘটনা থাকে, ঘটনায় একশন আর তার ফলাফল থাকে। প্যারাবলে অনেক সময় বর্ণিত চরিত্র এক ধরনের নৈতিক দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে আবার কখন চরিত্র বাজে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে এবং তার জন্য তাকে অনভিপ্রেত পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। যদিও প্যারাবলে বর্ণিত গল্পের অর্থ সরাসরি বোঝা যায় না। তবে তা আবার ইচ্ছে করে গোপনও রাখে না বরং সহজেই তা বোঝা যায়।
প্যারাবলের অন্যতম বৈশিষ্ট হলো এটি পাঠ করে একজন পাঠক বুঝতে পারে, ব্যক্তির কী ধরনের আচরণ করা উচিত বা আচরণ কী হওয়া উচিত। ব্যক্তির জীবনে সঠিক আচরণের নিদের্শনা ও পরামর্শের পাশাপাশি প্যারাবলে সাধারণভাবে রূপক ভাষায় কঠিন ও জটিল ধারনা/তত্ত্বের উপস্থাপন করা হয়, যাতে মানুষ তা সহজে বুঝতে পারে। তাই প্যারাবল সুনির্দিষ্ট মূর্ত ঘটনা বর্ণনা করে যার মাধ্যমে বিমূর্ত যুক্তি পাঠক সহজে বুঝতে পারে। এতে একটা নীতি এবং একটা নৈতিকতায় কেন্দ্রীভূত থাকে এবং পাঠক তা নিজের জীবনে উপলব্ধি করতে পারে।
উইলিয়াম জি ডোটি প্যারাবলের নয়টি বৈশিষ্টের কথা বলেছেন। এগুলো হলো: ইহজাগতিকতা (এমনকি ধর্মীয় প্যারাবলেও), বিপরীতমুখী পরিবর্তন, রসবোধ, ঐতিহ্যের পুনমূল্যায়ন, সার্বজনীনতা, প্রায়োগিকতা, বর্ণনার জগত যেখানে রহস্য – প্যারাডক্স ও ধাঁধাঁ এবং চরিত্র, চরিত্রায়ন ও তার ভূমিকা।
বাইবেল অনেকগুলো প্যারাবল রয়েছে। এ সকল প্যারাবলের সাধারণ বৈশিষ্ট্য যেগুলোর অনেকটাই অন্যান্য প্যারাবলেও দেখা যায়:

– এগুলো সংক্ষিপ্ত। অপ্রয়োজনীয় কোন শব্দের ব্যবহার নাই এগুলোতে। যতটা সম্ভব সরাসরি বক্তব্য।
– এর অন্যতম বৈশিষ্ট সরলতা এবং বিষয় উপস্থাপনে এককেন্দ্রীকতা (symmetry)। কোন প্যারাবলেই কোন পরিস্থিতি বর্ণনায় দুই গ্রুপ বা ব্যক্তির ব্যক্তির অধিক উপস্থিতি দেখা যায় না।
– প্যারাবলগুলোর মূল ফোকাস বা বিষয়বন্তু মানুষ। এখানে প্রকৃতি, প্রাণি বা ঈশ্বর বিষয় বর্ণনা নাই।
– প্যারাবলগুলোতে প্রতিদিনের জীবনের ঘটনার কল্পকাহিনির বর্ণনা। ফলে পাঠক/ শ্রোতা সহজে নিজের জীবনোর সাথে তা সম্পৃক্ত করতে পারে।
– প্যারাবলগুলো পাঠককে ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত করে তুলতে পারে। পাঠক প্যারাবলের সাথে একাত্ম বোধ করে।
– গল্পের শেষে চমক থাকে যাকে পাঞ্চ লাইন বলা যেতে পারে।
– প্যাবাবলে সুনির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট থাকে।
– প্যারাবলগুলো মানুষের আচরণ পরিবর্তন ও শৃঙ্খলা আনতে ভূমিকা রাখে।

প্যারাবল, ফেবল ও এলিগরি, রূপক ও উপমা
আগেই বলা হয়েছে, প্যারাবলের প্লটে মানুষ হলো উপজীব্য আর ঠিক তার উল্টো হলো ফিবল। ফেবলের সাথে এর মূল পার্থক্য হলো, ফেবলের চরিত্ররা বস্তু, প্রাণি, প্রকৃতিক শক্তি কিংবা জীব জগত। এই পার্থক্যটুকু বাদে ফেবলের সাথে প্যারাবলের সাযুজ্জ্বই বেশি।
এলিগরি হলো রূপকাশ্রয়ী কল্পিত ন্যারেটিভ যার ভেতর বর্ণনা করা ঘটনার বাইরে অর্থ বিদ্যমান থাকে। এলিগরির প্রচলিত সাধারণ ফর্ম হলো ফেবল, প্যারাবল এবং এপিলগ যার মধ্যে দুই বা তার অধিক অর্থ লুকানো থাকে যা পাঠককে ব্যাখ্যা প্রক্রিয়ার (interpretive process) মাধ্যমে তার অর্থ বুঝতে হয়। এলিগরি ছোট বড় নানা রকমের হতে পারে। ফলে অধিকাংশ ফেবল ও প্যারাবলই আসলে সেই অর্থে একেকটা এলিগোরি।
প্যারাবলের সাথে ভাষালঙ্কারের সম্পর্ক রয়েছে বিশেষ করে রূপক (metaphor) এবং উপমা (simile) কিন্তু এ দুটোর সাথে প্যারাবলকে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। প্যারাবল রূপকের মতো যা বিমূর্ত ধারণা মূর্ত করে প্রকাশ করার জন্য বাস্তব এবং উপলব্ধি করা যায় এমন বিষয়ের ব্যবহার করা হয়। তাই বলা যেতে পারে যে, প্যারাবল হলো এমন এক রূপক যা বর্ধিত হয় এক সংক্ষিপ্ত এবং সুসংগত ন্যারেটিভের মাধ্যমে। আবার প্যারাবল উপমার সাথেও সাদৃশ্য যা রূপকের মাধ্যমে তুলনা করে। তবে, প্যারাবলের অর্থ অন্তর্নিহিতি থাকে যদিও তা বোধগম্যের বাইরে না।
বাংলা সাহিত্যে প্যারাবল
সংস্কৃতে লেখা ভারতীয় সাহিত্যে পঞ্চতন্ত্র একটি উল্লেখযোগ্য ফেবল। পঞ্চতন্ত্র আর ঈশপের ফেবল বাংলায় অনেক আগেই অনূদিত হয়েছে। এবং এ গ্রন্থ দুটোর গল্পগুলো বাংলা সাহিত্যের সাথে এতটাই সম্পৃক্ত যে, এগুলোকে আর অনূদিত সাহিত্য বলে মনে হয় না। আবার মহাভারত যেহেতু প্যারাবলের আদি উৎসের একটি, তাই বাংলা সাহিত্যে এর উপস্থিতি প্রাচীনকাল থেকেই বলা যায়। তবে এটা বলা যায়, বাংলা সাহিত্যে ফেবল বা প্যারাবলের তেমন বিকাশ হয়নি। গ্রামে মা, দাদী, নানীরা যে জীবজন্তু বা মানুষের গল্প শিশুদের শোনাতেন সেগুলোই আসলে এ অঞ্চলের ফেবল আর প্যারাবল। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যেগুলোর চরিত্র মানবকূল সেগুলোই প্যারাবল। ফলে দেখা যাচ্ছে, বাংলা ভাষার ফেবল ও প্যারাবলের আদি উৎস লোকমুখে প্রচলিত কল্পকাহিনি। এগুলোই যুগে যুগে ওরাল ট্রাডিশনের মাধ্যমে মানুষ প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বহন করে এনেছে। ৮০০- ১২০০ সালের মধ্যে কোন এক সময় জন্মানো খনা বাংলা সাহিত্যে এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। খনার অনেকগুলো বচন এখনো প্রচলিত আছে। এই খনার বচনের অনেকগুলোর মধ্যে ফেবল ও প্যাবাবলের উপাদান দেখা যায়। আধিুনককালে বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী, সুকুমার রায়ের লেখায় প্যারাবল ও ফেবলের দেখা পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাখের কনিকা কাব্যের অধিকাংশ কবিতাই ফেবল পর্যায়ে পড়ে। আর দুই বিঘা জমি কিংবা সোনার তরী কবিতাকে কেউ যদি প্যারাবল বলে দাবী করে তবে তা অস্ব^ীকার করা কঠিন হয়ে যাবে।
প্যারাবলের সকল বৈশিষ্ট হাজির না থাকলেও আমরা চর্যাপদের অনেকগুলো পদে দেখি গল্পের ছলে নৈতিক শিক্ষার দেয়া হয়েছে। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ সংকলিত ৫০টি চর্যাপদে অন্তত গোটা দশেক পদের বর্ণনায় এক ধরনের ন্যারেটিভের আভাস পাওয়া যায়। এছাড়া, কয়েকটিতে ফেবলেরও উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। আমরা জানি, চর্যাপদ হলো বাংলাভাষার অন্যতম প্রাচীন সাহিত্য যা বৌদ্ধতান্ত্রিকদের রহস্যময় গান ও দোহা যেগুলো অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতকে রচিত হয়েছিল। এখানে বিরুবাপাদানামের একটি পদের ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ কৃত আধুনিক রূপ পাঠকের জন্য দেয়া হলো। বিরুয়ার জন্ম ত্রিপুরায়। সম্ভবত দেবপালের রাজত্বকালে (৮১০-৮৫০ খ্রীষ্টাব্দ) তিনি জীবিত ছিলেন। তিনি কিছুদিন পাহাড়পুরের সোমপুর বিহারে কাটিয়েছিলেন।

এক সে শুঁড়িনী (নারী মদবিক্রেতা) দুই ঘরে সেঁধয় (প্রবেশ করে)
চিকন বাকলে বারুণী (মদ) বাঁধে।।

সহজ দ্বারা স্থির করিয়া বারুণী চোলাই র্ক
যাহাতে অজরামর (মৃত্যু ও জরা) দৃঢ় হয় কাঁধ (দেহ)।।

দশম দোরে চিহ্ন দেখিয়া
এল গ্রাহক আপনি (কিংবা হাটে) (পথ) বহিয়া।।

চৌষট্রি ঘটীতে (সাজাইয়া) দিউক পসার
পশিল গ্রাহক, নাহি নিঃসরণ।।

এক ছোট ঘটী, সরু নল,
ভণেন বিরুয়া থির করিয়া চাল্ ।।
নিচে বনফুলের নিমগাছ গল্পটি দেয়ার লোভ সামলানো গেল না। পাঠকই বিচার করবেন এটি প্যারাবল কি না।
কেউ ছালটা ছাড়িয়ে নিয়ে সিদ্ধ করছে।
পাতাগুলো ছিঁড়ে শিলে পিষছে কেউ।
কেউ বা ভাজছে গরম তেলে।
খোস দাদ হাজা চুলকুনিতে লাগাবে।
চর্মরোগের অব্যর্থ মহৌষধ।
কচি পাতাগুলো খায়ও অনেকে।
এমনি কাঁচাই…..

কিংবা ভেজে বেগুন- সহযোগে।
যকৃতের পক্ষে ভারী উপকার।
কচি ডালগুলো ভেঙে চিবোয় কত লোক…। দাঁত ভালো থাকে। কবিরাজরা প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
বাড়ির পাশে গজালে বিজ্ঞরা খুশি হন।
বলেন- নিমের হাওয়া ভাল, থাক, কেটো না।
কাটে না, কিন্তু যত্নও করে না।
আবর্জনা জমে এসে চারিদিকে।
শান দিয়ে বাঁধিয়েও দেয় কেউ- সে আর এক আবর্জনা।
হঠাৎ একদিন একটা নূতন ধরনের লোক এলো।
মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইল নিমগাছের দিকে। ছাল তুললে না, পাতা ছিঁড়লে না, ডাল ভাঙ্গলে না। মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইল শুধু।
বলে উঠলো, বাঃ কি সুন্দর পাতাগুলো…..কি রূপ। থোকা থোকা ফুলেরই বা কি বাহার….এক ঝাঁক নক্ষত্র নেমে এসেছে যেন নীল আকাশ থেকে সবুজ সায়রে। বাঃ!
খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে চলে গেল।
কবিরাজ নয়, কবি।
নিমগাছটার ইচ্ছে করতে লাগল লোকটার সঙ্গে চলে যায়। কিন্তু পারলে না। মাটির ভেতর শিকড় অনেক দূরে চলে গেছে। বাড়ির পিছনে আবর্জনার স্তুপের মধ্যেই দাঁড়িয়ে রইল সে।
ওদের বাড়ীর গৃহকর্ম-নিপুণা লক্ষ্মী বউটার ঠিক এই দশা।
রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব (১৮৩৬-৮৬) তাঁর ভক্তদের প্যারাবলের মাধ্যমে নৈতিক শিক্ষা দিতেন। ভক্তদের বলা তাঁর একটা বিখ্যাত প্যারাবল এরকম:
আকবর আর ফকির
সম্রাট আকবরের শাসনামলে দিল্লির নিকটে এক বনে এক ফকির (মুসলিম সাধু) বাস করতেন। এই ফকিরের কাছে অনেকে আসতেন। তবে তাদের খেদমত করার মতো তার কিছুই ছিল না। এ জন্য তার অর্থের প্রয়োজন হয়ে পড়লো। এবং তিনি তা পেতে দয়ালুখ্যাত আকবর বাদশার কাছে গেলেন।
আকবর যখন মোনাজাত করছিলেন সেই ফকির তখন সেখানে ছিলেন। ফকির আকবরের মোনাজাত শুনতে পেলেন, “ হে আল্লাহ, আমাকে আরো সম্পদ দাও, আরো ক্ষমতা দাও, আরো রাজ্য দাও।”
এ মোনাজাত শুনে ফকির প্রস্থান করার জন্য উদ্যত হলেন কিন্তু আকবর তাকে বসতে বললেন। আকবর বললেন, “ জনাব আপনি আমার সাথে সাক্ষাত করতে এসেছেন। এটা কেমন কথা যে আপনি কিছু না বলেই চলে যাচ্ছেন।”
তখন ফকির বললো, “ আলমপানা, আমি যে উদ্দেশ্যে আপনার কাছে এসেছি তার আর আপনাকে বলার দরকার নাই। ”
তখন আকবর বারবার জানতে চাইলেন তিনি কি চান, ফকির অবশেষে বললেন, “ আলমপানা, অনেকে আমার কাছে শিখতে আসে। কিন্তু অর্থের অভাবে আমি তাদের আতিথেয়তা করতে পারি না। আমার ধারনা ছিল এ সমস্যার সমাধান আপনি করতে পারবেন।”
এরপর আকবর জানতে চাইলেন তাহলে তিনি এটা না জানিয়ে চলে যেতে চাচ্ছিলেন কেন।
এর উত্তরে ফকির বললেন, “ যে নিজে একজন ভিক্ষুক তার কাছে আমি কীভাবে ভিক্ষা চাই? তার চেয়ে আমি সরাসরি আল্লার কাছেই ভিক্ষা চাইবো। অবশ্য আমার ভিক্ষা না চেয়ে যদি আর কোন উপায় না থাকে।”

শামসুর রাহমান প্যারাবল নামেই একটি কবিতা লিখেছেন:

নাড়েন সবল হাত ছুটে আসে নফরের দল
তড়িঘড়ি চতুঃসীমা থেকে। তাঁর প্রবল নির্দেশে
সমুদ্রে জাহাজ ভাসে, অবিরাম চাকা ঘোরে কল-
কারখানায়, তৈরি হয় সেতু দিকে দিকে; দেশে দেশে
নিমেষে জমান পাড়ি রাষ্ট্রদুতগণ, কারাগারে
জমে ভিড়, সৈন্য বাড়ে রাতারাতি, কানায় কানায়
ভ’রে ওঠে অস্ত্রাগার, এমন কি আগাড়ে ভাগাড়ে
শকুনের বসে ভোজ। কিন্তু ছোট কোমল ডানায়।

ভর ক’রে পাখি আসে ডালে তাঁর নির্দেশ ছাড়াই-
বিখ্যাত কোকিল। ডাকে অন্তরালে, নির্ভীক স্বাধীন।
হঠাৎ বলেন তিনি, ‘পাখিটাকে কী ক’রে তাড়াই?
থামা তোর গান, নইলে দেবো শাস্তি ওরে অর্বাচীন।
তবু সুর আসে ভেসে। কোকিল নয়কো কারো দাস,
কখনো পারে না তাকে স্তব্ধ করতে কোনো সর্বনাশ।

ইহুদি ধর্মশাস্ত্রে প্যারাবল
প্যারাবলের মাধ্যমে যেহেতু মানুষকে সহজে কঠিন ও জটিল বিষয়ে সম্পর্কে বোঝানো সম্ভব হয় তাই এক্ষেত্রে ইহুদি ধর্মের টেক্সটেও এর ব্যবহার দেখা যায়। শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে রাব্বিরা (ইহুদি ধর্মপ্রচারক) প্যারাবলকে একটা উৎকৃষ্ট মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করতেন এবং ঈশ্বরের আইনের সঠিক অর্থ বোঝাতে তারা এর ব্যবহার করেছেন। তাদের ধর্মশান্ত্র তালমুদ এবং মিডরাশ এ অনেক প্যারাবল রয়েছে। পাঠকদের জন্য এর মধ্যে থেকে একটি প্যারাবল তুলে দেয়া হলো:
পৌত্তলিক ধর্মে বিশ্বাসী এক দার্শনিক একবার আর. গামালিয়েলকে জিজ্ঞাসা করলো, ঈশ্বর কেন মূর্তির উপর না রেগে মূর্তি পূজারীর উপর রাগান্বিত হন। গামালিয়েল দার্শনিকের এ প্রশ্নের উত্তর করলেন এই প্যারাবলটা বলে। এক রাজার এক ছেলে ছিল। ছেলেটা একটা কুকুর পুষলো এবং কুকুরটার নাম তার রাজকীয় পিতার নামেই রাখলো। যখনই সে কসম করে তখনই সে বলে, “কুকুরের জীবনের কসম, পিতা।” রাজা এটা যখন শুনলেন, তখন তার রাগ কার প্রতি হবে, সন্তানের প্রতি না কুকুরের প্রতি? অবশ্যই সন্তানের প্রতি। (আব জারাহ ৫৪বি)

বাইবেলে প্যারাবল
বাইবেলে প্যারাবলের ব্যবহারের কারণে ইউরোপের ধর্ম ও সাহিত্য জগতে প্যারাবল অতি পরিচিত নাম। ধর্মযাজকেরা এর প্রচারের ফলে ব্যাপারটা এমন হয়ে যায় যে, প্যারাবল যেন কেবল বাইবেলেরই ব্যাপারস্যাপার। বাইবেলের নিউটেস্টামেন্টে লুকের গসপেলে ২৪টি যার মধ্যে ১৮টি স্বতন্ত্র, ম্যাথু এর গসপেলে ২৩টি যার মধ্যে ১১টি স্বতন্ত্র আর মার্কের গসপেলে ৮টি যার মধ্যে দুটি স্বতন্ত্র প্যারাবল। যিশু মূলত তার বাণী সহজভাবে জনতাকে বোঝাতে এসব প্যারাবল ব্যবহার করতেন। নিচে বাইবেল থেকে একটি প্যারাবল:

ভালো শমরীয়ের কাহিনী

একদিন, ইহুদি ব্যবস্থার নিপুণ এক গুরু এলেন যীশুকে পরীক্ষা করতে, বললেন, “গুরু, অনন্ত জীবন পাওয়ার জন্য আমাকে কি করতে হবে?” যীশু উত্তর দিলেন, “ঈশ্বরের বাক্যে কি লেখা আছে?”

ব্যবস্থার নিপুণ গুরু উত্তর দিলেন, “ তোমার প্রভু ঈশ্বরকে তোমার সম্পূর্ণ হৃদয়, প্রাণ, শক্তি, আর মন দিয়ে প্রেম কর। আর তোমার প্রতিবেশীকে নিজের সমান প্রেম কর৷” যীশু উত্তর দিলেন, “তুমি সঠিক বলেছ! এমনটাই কর আর তুমি বাঁচবে।”

কিন্তু সেই ধর্মগুরু প্রমাণ করতে চাইলেন যে তিনি ধার্মিক, তাই তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “আমার প্রতিবেশী কে?”

ব্যবস্থার-গুরুকে যীশু এক দ্রষ্টান্ত দ্বারা উত্তর দিলেন। “এক ইহুদি ব্যক্তি ছিলেন যিনি জেরুজালেমের রাস্তা দিয়ে যিরীহোতে যাচ্ছিলেন।”

যখন সেই ব্যক্তি যাত্রা করছিলেন তখন একদল ডাকাত তাকে আক্রমণ করে। যা কিছু তার কাছে ছিল তারা তা লুট করল আর প্রায় আধমরা অবস্থা পর্যন্ত পেটালো। তারপর তারা সেখান থেকে চলে গেল।”

“তার পর পরই, এক ইহুদি যাজক সেই পথ দিয়ে আসছিলেন। যখন সেই ধার্মিক-নেতা সেই ডাকাত আক্রান্ত ও আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিটিকে দেখলেন, তখন তিনি রাস্তার অন্য ধার দিয়ে চলে গেলেন, সেই সাহায্যপ্রার্থী ব্যক্তিটিকে উপেক্ষা করলেন আর চলতেই থাকলেন৷

“আরও কিছু সময় পর, এক লেবীয় সেই পথ দিয়ে এলেন। (লেবীয়রা হলেন ইহুদিদের একটি গোত্র যারা মন্দিরে যাজকদের সাহায্য করতেন।) সেই লেবীয়টিও রাস্তার অন্য ধার দিয়ে চলে গেলেন, সেই ডাকাত আক্রান্ত ও আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিটিকে উপেক্ষা করে৷

“ এর পর যে ব্যক্তি সেই পথ দিয়ে এলেন সে হল একজন শমরীয়। (শমরীয় হল ইহুদিদেরই বংশের লোক যারা অন্য রাষ্ট্রের মানুষদের বিবাহ করেছিল। শমরীয়রা আর ইহুদিরা একে অপরকে ঘৃণা করত।) কিন্তু যখন সেই শমরীয় সেই ইহুদিকে দেখলেন তখন তিনি তার প্রতি খুবই সহানুভূতি অনুভব করলেন। তাই তিনি তার যত্ন নিলেন আর তার ক্ষত বেঁধে দিলেন। ”

“ শমরীয় সেই ব্যক্তিটিকে নিজের গাধার উপর চড়ালেন আর তাকে এক সরাই খানায় নিয়ে এলেন যেখানে তিনি তার যত্ন নিলেন।”

“ পরের দিন, সেই শমরীয়কে তার যাত্রা পুনরায় বহাল করতে হলো। তাই তিনি সরাইখানার মালিককে কিছু টাকা দিয়ে বললেন, ‘ইহুদি ব্যক্তিটির সেবা-যত্ন করবেন, আর যদি আপনি বেশি টাকা তার জন্য খরচা করে থাকেন তাহলে যখন আমি এই পথ দিয়ে ফিরব তখন আমি তা শোধ করে দেব।’”

তখন যীশু সেই ধর্