You are currently viewing দেশি খাদ্য আর বহুজাতিক চোয়াল || দেবাশিস  সরকার

দেশি খাদ্য আর বহুজাতিক চোয়াল || দেবাশিস  সরকার

দেশি খাদ্য আর বহুজাতিক চোয়াল
দেবাশিস  সরকার

।। এক ।।

আমাদের আজকের গল্পটি এভাবে শুরু করার কথা ছিল না

ভাষার সঙ্গে বর্ণমালার যে সম্পর্ক, বাড়ির সঙ্গে গৃহস্থের সেই সম্পর্ক । এইরকমই ভাবে অতীন। আর ‘বাড়ি ‘ শব্দটির যে ব্যাপ্তি, তাতে এক চিলতে উঠোন , একটা দুটো নারকেল গাছ ,আমগাছ,তুলসীমঞ্চ – এতো কিছু অনুসঙ্গের সঙ্গে ‘ফ্ল্যাট ‘ শব্দটা ঠিকঠাক খাপ খায় না। যদিও তুলসীমঞ্চ, ঠাকুর দেবতা নিয়ে অতীনের বিশেষ মাথাব্যথা নেই তবুও সন্ধ্যেবেলায় তুলসীমঞ্চের সামনে একটি পেতলের প্রদীপ জ্বালাবে গৃহস্থের কোনো একজন মহিলা , প্রেফারেবলি বাড়ির পুত্রবধূ , এ ভারী আকাঙ্খার বিষয় অতীনের কাছে। আসলে এও একরকমের আবহমানতা বা ঐতিহ্যর সঙ্গে লগ্ন থাকার অভিপ্রায় বা নিজস্বতা আর কি ! এটুকু বিসর্জন দিতে সে রাজি নয় । অতীনের স্ত্রী হাসির বরং ফ্ল্যাট পছন্দ । ঠাকুর দেবতাকে অগেরাহ্যি করার কথা সে ভাবেই না, শাশুড়ির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উপোস কাপাস সবই করে , তবে ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে সুন্দর টাইলস দিয়ে ঘিরে কি তুলসীমঞ্চ বানিয়ে রাখা যায় না ! মাসিদেরই তো রয়েছে ! ” শোন ! মাসিদের পাড়ায় মাত্র বাইশ লাখে তিন বেডরুমের দুখানা ফ্ল্যাট এখনও খালি পড়ে আছে ! আমাদের বাড়িটা বিক্রি করলে তিরিশ চল্লিশ লাখ পাবে সেদিনই বলছিলে না ? চলো ! এতো বড় বাড়ি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে সারাদিনে আমার কালঘাম ছুটে যায় বাপু ! তাড়াতাড়ি ডিসিশন নাও ! নাহলে আবার এই ফ্ল্যাটগুলো না হাতছাড়া হয়ে যায়!”অতীন বাঁকা হাসি হেসে স্ত্রীকে বলে , “একই ছাদের তলায় আমি আর একজন কোল মাফিয়া বাস করবো ? হাঃ! হয়তো দেখা গেল, ওই ফ্ল্যাটের যে কমিটি , তার প্রেসিডেন্ট ঘুষখোর একজন ইঞ্জিনিয়ার নয়তো নার্সিংহোমের দালাল একজন ডাক্তার ! ছো :! তাছাড়া তিনটে মাত্র শোবার ঘরে কেন যাবো ? আমাদের বাড়িতে ওপর নিচ মিলিয়ে পাঁচটা শোবার ঘর , বড় ডাইনিং, পায়খানা, বাথরুম দু খানা করে! আমি ওই খুপরি ঘরে কেন ঢুকতে যাবো ? সবচেয়ে বড় কথা , এখানে আমি স্বাধীন !”
– কি কাজে লাগে বলো তো ? আমরা, বাবা – মা আর বুবুন । তিনখানা ঘরই তো যথেষ্ট আমাদের ! এতো বড় বাড়িতে –
– হুঁ :! একেই বলে মেয়েদের বুদ্ধি! আমি মারা গেলে এ বাড়ির মালিক তো তুমিই হবে । তখন না হয় এ বাড়ি বিক্রি করে মাসিদের পাড়ায় চলে যেও ।
– তোমার মরণ পর্যন্ত এখানে পড়ে থাকতে আমার বয়েই গেছে ! মা-বাবা যদ্দিন আছেন তদ্দিন , ওদিকে বুবুনের কোনো একটা চাকরি বাকরি হওয়া অব্দি আমি আছি এ বাড়িতে । তারপর দেখবে তুমি আমি কোথায় যাই !
অতীন হাসে । তার পছন্দ করে কিনে রাখা সিডিগুলি যেমন মাসে একবার করে বাজিয়ে গান শোনা হয় , তেমনই এই দাম্পত্য নাটিকাটিও গড়ে মাসে একবার করেই বেজে ওঠে । তার নিজস্ব যৎসামান্য সঞ্চিত অর্থ ও প্রাপ্য সমস্ত রকম লোন নিয়ে এ বাড়ি অর্জিত । বাবার জমি ও ভিটে বিক্রির টাকায় ভাগ্যিস হাত পড়ে নি তখন , নাহলে বাবার চিকিৎসার এখন যে বিশাল খরচ সে টানতে পারত না। তৃপ্তি যেটা , তা হল প্রতিবেশীরা সহৃদয় , আলাপী। সন্ধ্যেয় বাড়ি ফিরে এক কাপ চা পান শেষে খালি গায়ে ব্যালকনিতে বসে আয়েশ করে একটি সিগারেটে সুখটান দেওয়ার সময়টায় এই তৃপ্তির চারাগাছটিতে তিরতির করে হাওয়া বয়ে যায় !
তো, সেদিন ঘটল অদ্ভুত ঘটনাটা ! চামচিকের মতো কি একটা তার কানের পাশ দিয়ে ভোঁ শব্দ করে উড়ে গেল ! হাতে মোবাইল নিয়ে সে কাকে যেন ফোন করতে বসেছিল । ‘ ব্যালকনির খোলা জানালা গলে চামচিকেটা ঘরে ঢুকেছে , পরে ঝাঁটা মেরে তাড়ালেই হবে ‘ , ভেবে গুরুত্ব দিল না সে । মোবাইলের বোতাম টিপল অতীন । কথা শুরু করেছে কি করেনি , ভোঁ শব্দে আর একটা উড়ে এসে তার বুকে থপাস করে ধাক্কা মারল এবং ওখানেই লেপ্টে রইল ! তড়াক করে চেয়ার থেকে উঠে পড়ল সে । ভয় না , বুকের ওপর কি একটা লেপ্টে রয়েছে তা পরিষ্কার আলোয় দেখবার জন্যে ব্যালকনি থেকে ঘরের ভেতরে এসে ঘাড় নিচু করতেই প্রাণীটিকে দেখতে পেয়ে শিউরে উঠল গা ! চারটে ছড়ানো ঠ্যাঙে বুকের লোমগুলিকে খামচে ধরে আছে একটা ছোট সাইজের ব্যাঙ ! ব্যাঙই কি ? অন্য কিছু না তো ? নীচের থেকে কিংবা আকাশ থেকে উড়েই তো এলো একটু আগে !কেমন অজানা আশঙ্কায় চিৎকার করেই হাসিকে ডাকল সে , ” হাসি ! তুমি কি রান্নাঘরে ? গ্যাসটা নিভিয়ে তাড়াতাড়ি ওপরে উঠে এসো একবার ! কুইক ! হাসি ? ” হাসির আগেই ব্যালকনি লাগোয়া ঘর থেকে টিভি বন্ধ করে মা এল ধড়ফড় করে , ” কি হয়েছে ? “অতীন ব্যাকুল ভঙ্গিতে মাকে বলল,” মা ! দ্যাখো তো আমার বুকে কি একটা লেপ্টে রয়েছে ? দেখলে ? এটা ব্যাঙ কি ? নাকি অন্য কিছু ? ” মা ভীষণ অবাক প্রাণীটিকে দেখতে পেয়ে ! ” একি! কি এটা ? তাড়াতাড়ি গা থেকে ঝেড়ে ফ্যাল ! কামড়ায় যদি !”
– দাঁড়াও ! হাসিও আসুক। ওকেও দেখাই ! ঝেড়ে ফেললেই তো উড়ে যাবে! কই হাসি? শুনতে পাও নি ?
হাসি ধড়ফড় করে উঠছিলই , ওপরে উঠে এসে নির্দেশিত জায়গায় তাকিয়েই হতভম্ব ! চিৎকার করে উঠলো সে , ” ম্যাগো ! কি ওটা? কামড়ে ধরে আছে না কি? ঝেড়ে ফেলতে পারছো না ? মারো ওটাকে । “
– কামড়ায় নি। তবে কিভাবে মারা যায় একটা বুদ্ধি দিতে পারো ? আরো একটা ঢুকেছে এ ঘরে। ওটাও নিশ্চয় ঝুলছে কিছু থেকে ।ওটাকেও মারতে হবে।
– তোমার গা থেকে ঝুলছে , ঝাঁটা বা কোনো কিছু দিয়ে তো জোরে মারা যাবে না , আগে ওটাকে ঝেড়ে মেঝেতে ফেলতে হবে , তিনটে ঝাঁটা আনি , ঝেড়ে ফেলার পর তিনজনেই ঝাঁটা চালাবো ।
ডান হাতে ঝাঁটা নিয়ে বাঁ হাতের চেটো দিয়ে ব্যাঙটাকে ঝেড়ে ফেলতেই ব্যাঙটা ছিটকে মেঝেতে পড়তে পড়তে হঠাৎ ভোঁ শব্দে ছাদের দিকে উঠতে লাগল , সিলিংয়ে ধাক্কা খেল এবং কি আশ্চর্য! মাথা নীচের দিকে করে সিলিংয়েই লেপ্টে রইল ! এখন উপায় ! ব্যাঙটাকে দেখার জন্যে ওপরের দিকে ভালো করে তাকাতেই সিলিং ফ্যানের ব্লেডে এবং টিউব লাইটের ওপরে অন্য দুটি ব্যাঙকে লেপ্টে থাকতে দেখল ওরা । এরা ব্যাঙই তো ? পোকার মতো উড়তে পারে ? ডানা কই ? বিস্ময়ের ঘোর কাটতে না কাটতেই ওদের চোখের সামনে দিয়ে উড়ে আর একটা এসে ক্যালেন্ডারের গায়ে বসতেই হুঁশ হোল অতীনের । “তাড়াতাড়ি ব্যালকনির দরজা আর ঘরের জানালাগুলো বন্ধ কর ! আমি ততক্ষণে হাতের নাগালের ক্যালেন্ডারের এটাকে মারি !” অতীন ঝাঁটা চালাতে উদ্যত হলে মা আর্ত চিৎকারে জানায় ,” ওটা মা কালীর ক্যালেন্ডার রে তুতুল ! ঝাঁটা চালাবি না । ” থমকে গেল অতীন , একটু ভেবে নিয়ে ঝুলঝাড়ুর পেছনটা দিয়ে প্রাণীটাকে খোঁচা মারল সে । ওটা উড়ে গিয়ে দরজার গায়ে বসল । ব্যস ! এবার আর পরোয়া কি ! গায়ের জোরে ঝাঁটা চালাতেই চিৎপটাং হয়ে চার পা ছড়িয়ে পড়ে গেল প্রাণীটা! অন্য তিনটিকে ঝাঁটার নাগালে আনতে বিছানার ওপর উঠে ঝুলঝাড়ু দিয়ে খোঁচানো , ঝাঁটা চালানো, ফস্কে যাওয়া –বাঁচার জন্যে দু পক্ষের লড়াই শুরু হোল ! আধঘন্টা বাদে অবসন্ন হয়ে বিছানায় বসে পড়ল ওরা । তিনটিকে খতম করা গেছে , একটি এখনও সিলিংয়ের সামান্য নীচের দেওয়ালে লেপ্টে আছে । চব্বিশ ঘন্টার জন্যে দরজা জানালা বন্ধ করে রাখার সিদ্ধান্ত হল সর্বসম্মত । হাসি ছুটল রান্নাঘরে , মা নীচের ঘরে । রক্ষা , নীচের তলায় এমনকি মাঝের ঘরেও প্রাণীগুলো আসে নি । মৃত প্রাণী তিনটিকে ঝাঁটা দিয়ে উল্টে পাল্টে দেখে নিশ্চিত হওয়া গেল ওগুলো ব্যাঙই ! কোথা থেকে আসছে ! দেওয়ালি পোকার মতো লাইট দেখলেই কি এসে কিলবিল করে ! তারা তো এ বাড়িতে এসেছে সাত মাসের মতন ! এতদিন তো কই আসেনি !এখন তো বর্ষাকালও নয় , গ্রীষ্মকাল। অন্য বাড়িগুলোতেও আসে নিশ্চয় । এইসব ভাবনার মাঝে অতীন বললো , ” আমি একবার পাড়ার প্রত্যেকের বাড়িতে গিয়ে জেনে আসি । ওরা কি করে তাড়ায়! দিনের বেলাতেও আসে কি ! সবসময় কি দরজা জানালা বন্ধ করে থাকা যায় নাকি ? জেনে আসি । একটা দুটো যদি এরকম এখানে সেখানে ঢুকে পড়েছে আজকের মতো থাক ! কাল সকালে ওগুলোর ব্যবস্থা হবে । “
আশেপাশের সাতটা বাড়িতে খোঁজ নিয়ে জানা গেল , তারাও বেশ ক’বছর আগে একটা দুটো দেখেছেন বটে তবে হালফিলে কিছু দেখেননি বা শোনেন নি । চড়ুই পাখির মতোই এগুলোও বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে বলেই ধারণা হয়েছিল । তাদের বাড়িতেও যদি এ উপদ্রব শুরু হয় তাহলে দরজা জানালা বন্ধ করে রাখা ছাড়া উপায় কি !
“জানালাগুলোতে তারের জাল লাগান! কোনো ঘরে ঢুকতে আর বেরোতেই খালি দরজা খুলুন ,নাহলে সবসময়ই বন্ধ রাখুন !”
– কেবল আমার বাড়িতেই ঢুকছে কেন ? আপনাদের জানালায় তো কই তারের জাল লাগানো নেই !
– বাঃ মশাই ! আমাদের বাড়িতে ঢুকছে না বলে আপনি দুঃখ পাচ্ছেন ! একি ! কেমন প্রতিবেশী আপনি ? বাঃ!

পরদিন সকালেই অতীন ঝাঁটা হাতে ব্যাঙের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমে পড়ল । বুবুনকে স্কুলে রওনা করিয়ে দিয়ে হাসি ব্যস্ত রান্নাঘরে । অতীনকে বলল , ” আমি তোমার কোনো কাজে হাত লাগাতে পারবো না । চারজনের রান্না , তোমাকে অফিস পাঠানোর জোগাড় তো আমাকে করতে হবে ।” হাসির অসহযোগকে পাত্তা না দিয়ে অতীন ব্যাঙগুলোকে ফুলঝাড়ু দিয়ে খোঁচা মারতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল , অফিস রওনা দেওয়ার আগে যে ক’টাকে খতম করা যায় ! শালাদের কি ব্রেণ আছে ? ফুলঝাড়ুর খোঁচা খেলেও উড়ে গিয়ে অন্য দেওয়ালে বসছে কিন্তু ঝাঁটার নাগালে নয় ! খাট , ড্রেসিং টেবিল , আলমারি , পড়ার টেবিল এসবের ফাঁক ফোকরে তো দৌড়ানোও যায় না ! আধঘন্টাটাক হ্যাঁচোড় প্যাঁচোড় করার পর কোনোরকমে একটা মাত্র ব্যাঙকে মারতে সক্ষম হল সে ।
ঝাঁটা দিয়ে দরজার কাছে টেনে এনে বাঁ হাত দিয়ে তুলে প্রাণীটিকে ভালো করে লক্ষ করল অতীন । ব্যাঙ -ই ! তবে ছোট্ট সাইজের । চোখদুটো বেশ বড় বড় ! সামনের পা দুটো ছোট তবে পেছনের পা দুটো বেশ লম্বা । ছড়ালে দুপায়ের সঙ্গে লেপ্টে থাকা চামড়া বিস্তার পেয়ে একটা ঝিল্লির মতন ডানা হয় বটে তবে মাঝখানটা তো ফাঁকা ! পাখির পাখনার মতন একটানা তো নয় ! এতে ওড়া যায় ! চারটে পায়ের ডগায় স্পঞ্জের মতন বাটি যা দিয়ে কোনো কিছুর গায়ে লেপ্টে থাকা যায় ।
কাজের মেয়েটি এসে ঘর ঝাঁট দেওয়ার সময় ওটাকে ডাস্টবিনের অন্য আবর্জনার সঙ্গে ফেলে আসবে এরকম ভেবে অফিস যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু করল সে ।

সকাল এগারোটা নাগাদ অতীনের মোবাইলে হাসির ফোন ! অফিসে কাজকম্ম করার সময়ে সিরিয়াস ব্যাপার ছাড়া ফোনাফুনি পছন্দ করে না অতীন-হাসি দুজনেই । তাই বেশ ঘাবড়ে গিয়েই কল রিসিভ করে অতীন । “কি হয়েছে ? বুবুন কোনো বিপদ ঘটিয়েছে নাকি ? তাড়াতাড়ি বলো !” হাসি বলে, ” না না অত সিরিয়াস কিছু নয় । তুমি কি এখন খুবই ব্যস্ত ? “
– তাড়াতাড়ি বলো তো কি ঘটেছে?
হাসি বলে, ” না না! বললাম না অত সিরিয়াস কিছু নয় ! শোনো তাহলে ! আমাদের বাতাসীকে তো তুমি জানো । দেমাকি। একদিন বাসন মাজতে মাজতে ‘ বিড়ি জ্বালাইলে’ গান ধরেছিল বলে তুমি ধমকেছিলে মনে আছে ? “
–ওঃ! মাইরি ! তোমাদের নিয়ে আর পারা হায় না ! সামারি করে বল !
– ও তো সেই থেকে পারতপক্ষে আমার সঙ্গে কোনো কথাই বলে না । ঘরে ঢুকে প্রথমে ওপরে ঝাড়পোঁছ করে নিচে বাসন মাজতে শুরু করে । কি কারণে জানি না , আমার মনে হয়েছিল ঘরের দরজা জানালা যে খোলা চলবে না সেটা ও জানে । মানে আমারই ভুল আর কি !আমি ওকে কিছুই বলি নি । মা বাথরুমে তাই মা -ও ওকে কিছু বলার সুযোগ পান নি ! মেয়েটা ওপরে কাজ করে l নিচে এসে বলল, ” তোমরা ওপরের সমস্ত দরজা জানালা বন্ধ করে রেখেছিলে কেন ? বেলা করে ঘুম থেকে উঠেছো নাকি ? ” আমি আঁতকে উঠে ওকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম , ও ওপরের সমস্ত দরজা জানালা খুলে কাজ করেছে! দৌড়ে ওপরে গিয়ে দেখি যা সর্বনাশ হওয়ার হয়ে গেছে ! আমাদের ঘরটাতে চার- পাঁচটা, মায়ের ঘরটাতেও দুটো , এমনকি রান্নাঘর আর বাথরুমের সামনের ফাঁকা জায়গাটার সিলিংয়েও একটা ঢুকে পড়েছে ! বাড়িতে ফিরে তো আমাকে উস্তুম কুস্তুম করে ছাড়বে ! তাই অসময়ে ফোন করলাম । ” প্রচন্ড রেগে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে বউকে গালাগালি দিতে গিয়ে থমকে যায় অতীন। লোকহাসি করে লাভ নেই । সে অফিসে বসে আছে । অনুচ্চ স্বরে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে , ” গর্দভ ! রান্নাবান্না বন্ধ করে ব্যাঙ মারো! আমি বাড়িতে গিয়ে একটাকেও যেন না দেখি !” ফোন কেটে দিল সে তারপর ।
বাড়িতে ফিরে শুধু হাসি নয় , বুবুন এবং মায়েরও ভয়ার্ত মুখ দেখে তার রাগ উবে যায় । প্রশ্রয়ের হাসি হেসে বলে, ” একটাকেও মারতে পেরেছো কি ? “
হাসি গোমড়া মুখে জানায় , সে তিনটেকে মারতে পেরেছে সারা দুপুরের চেষ্টায় ।
” ঠিক আছে । দেখছি আমি। বুবুন , তুই নিচে তোর পড়ার ঘরে গিয়ে পড়তে বোস ! কাল সন্ধ্যে থেকে তোর পড়া হয় নি । ব্যাঙের জন্যে তো আর দিনের পর দিন পড়াশোনা বন্ধ করে বসে থাকা চলে না । ঠিক আছে , চা – ফা খেয়ে তারের জাল আর মিস্ত্রি খুঁজতে যাবো । নাঃ ! এভাবে তো বাস করা যায় না । ধূর! খবরের কাগজ , বই পত্তর , টিভি নেই , আড্ডা দিতে যাওয়া নেই , দিনরাত শুধু ব্যাঙ , ব্যাঙ , আর ব্যাঙ ! ছ্যাঃ ! ভাবা যায় ! নাঃ! বাড়ি বিক্রি করে ফ্ল্যাটেই চলে যেতে হবে দেখছি ! “অতীন ভেবেছিল , তার কথা শুনে হাসির মুখের কাঠিন্য উবে যাবে । তার বদলে তার নিরাসক্ত কণ্ঠস্বর শোনা গেল ,” তোমার চা করছি ।”
হাসি রান্নাঘরে ঢুকতেই কলিং বেল বেজে ওঠে । পাড়ার কোন মাল মজা দেখতে এল নাকি ? উঠে গিয়ে দরজা খুলে দাঁত বের করার মতন মনের অবস্থা নেই অতীনের। বুবুন তো আছেই ফাই ফরমাশ খাটার জন্যে । তাকেই অর্ডার দিল সে , “একটু ফাঁক করে আগে দেখে নিবি । পুরোটা খুলবি না ! ব্যাঙ ঢুকে পড়বে। ” খানিক পরেই বুবুন এসে ফিসফিস করে বলে , ” বাবা! ঠাম্মা তোমায় ‘ তুতুল ‘ বলে ডাকে তো ? ” অতীন অবাক ! হ্যাঁ ! তুই তো দিনরাতই শুনছিস ! কেন ? কি হোল ?”
— একটা ভিখিরি বা সন্নাসী টাইপের লোক ! দরজা ফাঁক করতেই বলে উঠল ,’তুই তুতুলের ব্যাটা তো ? কাকীকে গিয়ে বল গাঁ থেকে ল্যাটা ভোঁদু এসেছে !’ অতীন যেন হেঁচকি তুলে বলল, ” অ্যা ? সেকি !”
অতীনের মায়ের চোখেও একঝুড়ি বিস্ময় ঝুলে রইল !

।। দুই ।।

আমাদের গল্পটা তো এখান থেকেও শুরু হতে পারে !

একটা গুবরে পোকার খুবই শখ হয়েছিল বড় হবার । সে দিনরাত ঠাকুরের কাছে গিয়ে ঘ্যানঘ্যান করতো এই বলে , ” ঠাকুর আমাকে বড় করে দাও ! আমাকে কতদিন এভাবে কষ্ট দেবে ঠাকুর ! ঠাকুর আমাকে বড় করে দাও ! ” ঘ্যানঘ্যানানিতে বিরক্ত হয়ে ঠাকুর একদিন তাকে ভোঁদড় বানিয়ে দিলেন ! পরে দেখা গেল সেও বড় হতে চায় । আবার ভোঁদড়ের ঘ্যানঘ্যানানিতে বিরক্ত ঠাকুর এবার তাকে ভালুক বানিয়ে দিলেন । তবু ভালুকও আরও বড় হতে চায় ! এবার ভালুকের ঘ্যানঘ্যানানিতে বিরক্ত ঠাকুর তাকে মানুষ বানিয়ে দিলেন ! ব্যস! ঠাকুর এবার নিশ্চিন্ত! মানুষ হবার পর সে আরও বড় হবার জন্যে আর ঘ্যান ঘ্যান করে না ! মানুষ আরও বড় হতে চায় না ।
ঠাকুরের গল্পের ‘বড় ‘ অর্থাৎ মহৎ না , বয়ঃপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে সে যাতে রোজগারের টাকায় নিজের ও পরিবারের গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থা করতে পারে সেরকম ‘বড় ‘ হতে চেয়েছিল তুতুল । তার বাবা -মাও তাই-ই চেয়েছিলেন । তুতুলের বাবা ছিলেন মাঝারি মাপের চাষী ও ইস্কুল শিক্ষক । ডাইনে আনতে বাঁয়ে কুলানো যেত , তাই বলে ফেলে ছড়িয়ে খাওয়ার মানসিকতা শোভা পেত না এমন অর্থনৈতিক অবস্থানের মানুষ । একমাত্র পুত্রের মঙ্গল কামনার আশা আকাঙ্খার সোনালী ডিমে তা দিতে দিতে দিনাতিপাত করতেন ।
ছেলের মুখে ‘তুতুলের ‘ সাক্ষাৎপ্রার্থী এক আগন্তুক আগত, এই সংবাদ শোনামাত্র অতীনের শরীর থেকে ‘তুতুল ‘ নামক এক বালকের সত্তা নির্গত হয়ে জাগরুক হতে থাকল । তুতুল তার মাকে সঙ্গে নিয়ে এসে দরজা খোলে । পিছন পিছন হাসি আর বুবুনও আসে কৌতূহলে । দরজার ওপারে যে রোগা , লম্বা লোকটি দাঁড়িয়ে আছে তার কাঁধে লম্বাটে এবং তাপ্পিমারা অথচ জিনিসপত্রে ঠাসা একটা কাপড়ের ব্যাগ । লোকটি অচেনা । তাদের কুঞ্চিত ভুরু পাত্তা না দিয়ে আগন্তুক বলে ওঠে , ” অ! তুই -ই তুতুল ? ম’টা গোঁফ , চুলে পাক ধরেছে! ই বাবা ! অকালে বুড়া হঁই গেলি ৱ্যা ! অ কাকী ! তবে তুমি দেখছি বিশেষ বদলাও নাই ! দাও , পায়ের ধুলা দাও !”
কাঁধের ভারী ঝোলাটি সিঁড়ির ধাপে নামিয়ে লোকটি মাকে প্রণাম করতে উদ্যত হয় । মা ‘থাক, থাক ‘ বলে পিছিয়ে যাওয়ার উপক্রম করতেই আগন্তুক একরকম দ্রুতগতিতেই মায়ের পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে করতেই বলে , ” উটি হব্যাক নাই কাকী! আমার দেশ গাঁয়ের শিক্ষা এটিই । ‘ মানুষ বুজে কইবে কথা , দ্যাবতা দেখে নুয়াবে মাথা !’ বলতে গেলে পেরাই দু -যুগ বাদে দ্যাখা কইরতে আলম আর গড় কইরব নাই ? উ শিক্ষা নাই আমার । মনে লিছে আমাকে চিনতে লারছ ! আমি ভোঁদু । জয়রামপুরের ল্যাটা ভোঁদু । চিনলে কি নাই চিনলে বল!” একগাল হেসে তাদের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায় সে ।
খানিক আগের দুর্ভাবনা উবে গিয়ে মায়ের চোখে যেন খুশির ঝিলিক উঁকি মারতে শুরু করে । নাগরিক অভ্যাস জনিত অর্জিত সংশয় তাঁকে নির্দ্বিধ হতে বাধা দেয় বোধহয় ! ব্যাপারটা উপলব্ধি করে নিঃসংশয় হতে অতীন এগিয়ে আসে , ” তোমার নামটা কি বললে যেন ? “
– দুবার বলেছি । আর বলতে লারবো। খুব ক্যাদ্দানি মারচিস লয় ?
–এরকম বিদঘুটে নাম কেন ?
– ই বাবা ! তু কি সবঅই ভুলে গেছু নাকি ? ইটা ত আমাদের দেশ গাঁয়ের চল রে খ্যাপা ! তেলিপাড়ায় একজন ভোঁদু , কায়েত পাড়ায় আমি । ভিন্ন কিভাবে বুজা যাবেক ? আমি ল্যাটা, ক্যানে কিনা বাঁ হাতে সবোই করি ! লেখা তককো ! তাথেই ই নামে ডাকতো লোকে । আমাদের পাড়ায় বেঁটে শ্যাম আর বামুন পাড়ার ঢ্যাঙা শ্যামকেও ভুলে গেছু নাকি ? ই বাবা ! আমি বকাসকা লোক, আমি কিন্তুক কিছু ভুলি নাই কাকী ! “
অতীনের চোখে মুখে স্বস্তি নেমে আসে । লোকটা জাল নয় । তবু তার একটা খটকা দূর হচ্ছে না লোকটার চেহারা দেখে ! ল্যাটা ভোঁদুর বয়েস তো কম করে পঞ্চাশ হওয়া উচিত । তিরিশ বছরেরও বেশি তার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়েছিল । এ লোকটার বয়েস তো কুড়িতেই থমকে আছে মনে হচ্ছে ! নাঃ! এ ল্যাটা ভোঁদু নয় । ওর ছেলে হতে পারে বড়জোর । অনেক ছেলেই তো হুবহু বাবার মতন দেখতে হয় । অতীন জেরা করার ভঙ্গিতে বলে , “তুমি জয়রামপুরে কি করতে ? আমাদের ফ্যামিলির সঙ্গে তোমার কিভাবে জানাশোনা ? মনে পড়ছে না । বলো তো দেখি ?” ল্যাটা ভোঁদু বেশ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে । কাঁধের ভারী বোঝাটি অথবা তাপ্পি মারা ঢাউস কাপড়ের ব্যাগটি কাঁধে তুলতে তুলতে বলে ,” অ কাকী ! তুতুলের যা মতিগতি বুজচি তাথে দুয়ার থেকেই বিদায় লিতে হ