মহামান্য পুলিশমন্ত্রী খাবার ঘরে বসে স্ত্রীর সাথে রাতের খাবার খাচ্ছেন, এবং স্ত্রীকে বলছেন, ‘ফুলেশ্বরীকে ডাকো, একসাথে খাই। শুনলাম মেয়েটি চলে যাচ্ছে।’
গুলশান আরা পুলিশমন্ত্রীর স্ত্রী। তাঁর চোখে মুখে সার্বক্ষণিক বিরক্তির ছাপ লেগেই থাকে। তিনি গম্ভীর ক্ষুধার্ত মুখে চিকেন ওরফে মুরগির ঠ্যাংয়ের টিকা কামড়াচ্ছেন। চিবোতে চিবোতে চাপা কণ্ঠে স্বামীকে বলেন, ‘তোমাকে আর আদিখ্যেতা দেখাতে হবে না। ওদের লাই দিতে নেই।’ লে ঠ্যালা, সে বা ওরা কি কুকুর যে লাই দেওয়ার কথা উঠছে।
পুলিশমন্ত্রীর মুখে কিঞ্চিত ভীতি প্রকাশিত। স্ত্রী না আবার ভেবে বসেন তিনি মেয়েটিকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। এমনিতেই স্ত্রী সন্দেহ বাতিক। সুন্দরী মেয়ে বা নারীকে সহ্য করতে পারেন না মোটেও। মন্ত্রী অস্ফুট স্বরে বলেন, ‘তুমি কী করে যে মানবাধিকার নেত্রী হয়েছিলে?’ ভাগ্যিস মন্ত্রীর কথা স্ত্রী গুলশান আরার কান অবধি পৌঁছায়নি।
‘দেখো, মেয়েটিকে আমিই আবিস্কার করেছি,’ গুলশান আরা গর্বিত মুখে ফোঁস করে ওঠে, ‘সে কাল চলে যাবে। যাক। আমাদের কাজ হাসিল। দেখলে কেমন হই চই ফেলে দিলাম। গত দু’মাস ধরে আমাদেরকে নিয়ে কাগজগুলোর কেমন মাতামাতি, পাতা ভরে বিপুল প্রসংশা। মেয়েটিকে আশ্রয় দিয়ে তোমাকে পুলিশের বড়ো মন্ত্রী বানালাম। আগে ছিলে পাতি, পরিচয় দিতে লজ্জা করতো, এখন ফুলমন্ত্রী, নিজেও কমিশনের সভানেত্রীর পদ বাগালাম। সবই আমার কৃতিত্ব। নেত্রী বলেছেন, আগামী ইলেকশনে তেঁতুলিয়া থেকে নমিনেশন দেবেন,’ কথাগুলো ঝট পট বলে, বুক ভরে লম্বা নিঃশ্বাস টেনে, শব্দ করে শ্বাস ছেড়ে, বিলম্বিতলয়ে বলেন, ‘মেয়েটি ভালোয় ভালোয় বিদায় হলেই বাঁচি।’
মন্ত্রী মহোদয় খাওয়া-দাওয়ার শেষ প্রান্তে এসে স্বীয় হাতের তালুর পর একে একে আঙুলগুলোয় তৃপ্তির শেষ চাটন দিতে দিতে বলেন, ‘ভাবছি, মেয়েটিকে আমার সহকারি করবো কি না। সহকারি একান্ত সচিবের পদটি খালিই আছে। সেখানে তাকে কাজে লাগানো যেতে পারে। এতে তোমার-আমার উভয়েরই ভাবমূর্তি আরো বাড়বে। কী বলো?’
স্বামীর পরিকল্পনাটি গুলশান আরা লুফে নেন। সন্দেহ, অবিশ্বাস পরেও করা যাবে স্বামীকে। মেয়েটি তাদের জন্য ভাগ্যফুল। ওর জন্যই তাঁদের এত উন্নতি। স্বামী ঠিকই বলেছেন। মাঝে মধ্যে মন্ত্রীর মাথাটা বেশ খোলে। এই মুহূর্তে স্বামীকে ধন্যবাদ দেন মনে মনে। এখন ফুলেশ্বরীকে পুনর্বাসন করা গেলে ভবিষ্যতে আরো উন্নতি হবে বলে মনে হয় তাঁর। এসব ভেবে তিনি খুশিতে চিৎকার করে ফুলেশ্বরীকে ডাকেন। তিনিই ফুলেশ্বরীকে আবিস্কার করেছেন। কে বা কারা অচেতন অবস্থায় ধর্ষিত ফুলেশ্বরীকে উত্তরার একটি হাসপাতালে ফেলে গিয়েছিলো। টেলিভিশনের প্রতিবেদন দেখে মিসেস গুলশান আরা ফুলেশ্বরীকে তুলে এনেছিলেন নিজেদের সরকারি বাড়িতে। এতে তাঁদের লাভ যশ সবই বেড়েছে ষোলো আনার চেয়ে আঠার আনা। আগে স্বামী ছিলেন প্রতিমন্ত্রী, ফুলেশ্বরী ঘটনার পর, এখন তিনি পুলিশের পূর্ণমন্ত্রী, এতদিন মিসেস গুলশান আরার কোনো সরকারি বা দলীয় পদবি ছিলো না, মাঝে মধ্যে বাচাল কথা বলে টেলিভিশন গরম করে বেড়াতেন, ফুলেশ্বরী উদ্ধারের পর, এখন তিনি তারকা হয়ে উঠেছেন বলেই-না নেত্রী খুশি হয়ে মানবাধিকারের সভানেত্রী করেছেন। ফুলেশ্বরী পুনর্বাসিত হলে তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনে নিশ্চিত উন্নতি ঘটবে, যা কেবল ধারনা নয়, সেটা অংক বা বিজ্ঞানের সূত্রের মতো খাপের খাপ মিলে যাওয়ার মতো মনে হয় তাঁর। এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, অথবা সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশ, কথাগুলো মিথ্যা বলার সাধ্য আছে কার। হন্তদন্ত হয়ে ফুলেশ্বরী মহামান্যের ভোজন টেবিলের কাছে এলে, মিসেস গুলশান আরা শাশ্বত জননীর স্নেহে বলেন, ‘মা ফুলেশ্বরী, কাল যাচ্ছো, যাও। কিন্তু কী করবে ভাবলে? অফিসের একান্ত সচিবের কাজ তোমার পছন্দ কি?’ মিসেস গুলশান আরা জানেন, যে কোনো কাজই ফুলেশ্বরী লুফে নেবে। কেনোনা, দাঁড়ানোর জন্য যেমন পায়ের নিচের মাটি শক্ত হওয়া চাই, চাকরি হলো তেমনি বেঁচে থাকার জন্য ঝুঁকিহীন নিশ্চিত নিরাপত্তা, পায়ের তলার সেই শক্ত মাটি।
ফুলেশ্বরীর মরু প্রান্তরে খানিকটা জলের ঝাপটা লাগে। তার চোখ মুখে গভীর আত্মপ্রত্যয়ের ছাপ।
পুলিশমন্ত্রী বলেন, ‘কিন্তু কাজটি সহজ নয়, বেশ রাত পর্যন্ত অফিসে থাকতে হবে। ঝামেলাও কম নয়। আমার নির্বাচনী এলাকা থেকে আগত মানুষজনের সাথে ডিলিং করতে হবে। সেটাই শুধু না, অফিসে নানান কিসিমের মানুষজনের সাথে ওঠবোস করা বা তাদের সাথে আমার মিটিংয়ের অ্যারাঞ্জমেন্টও করতে হবে, অতিথিদের আপ্যায়ন তো আছেই। ইউজুয়্যালি সকাল এগারো-বারোটা থেকে মধ্যরাত নাগাদ কাজের ব্যাপ্তিকাল। কাজ তেমন কঠিন কিছুই না, সময়টা পার করাই হলো আসল কাজ। বেতন মাসে চল্লিশ হাজার, থাকা-খাওয়ার ভাতা আলাদা। চাকরিটা স্থায়ী নয়, আমাদের সরকারের মেয়াদকাল পর্যন্ত। অর্থাৎ আর মাত্র এক বছর’, বলেই তিনি ফুলেশ্বীর ঝলসে ওঠা চোখের দিকে তাকিয়ে বলেন, কী পারবে?’
ফুলেশ্বরী আনন্দমুখর হয়ে বলে, ‘কবে নাগাদ যোগদান করা যাবে?’
মন্ত্রী বলেন, ‘কালই জয়েন করতে পারো। মনে রাখবা, ওনেস্টি ইজ দ্য বেস্ট পলিসি। প্রয়োজন হলে আমাকে বলো, কিন্তু ডিজওনেস্ট হয়ো না। এন্ড রিমেম্বার, ডু নট ডিসিভ, ডন্ট বি ডিসিভ্ড।’
ফুলেশ্বরী বলে, ‘ইউ কুড বিলিভ ইন মি। আই উড কিপ মাই ওনেস্টি বাই ডিন্ট অব মাই ভারচু।’
ফুলেশ্বরীর মুখে ইংরেজি কথা শুনে মহামান্যরা বিস্মিত ও চমকিত হন। তাঁদের জানা ছিলো না মেয়েটির মেরুদন্ড এতখানি শক্ত। ভালোই হবে। মেয়েটি যেমন সুদর্শনা, তেমনি ইংরেজিতে পারঙ্গম। পরদিন ফুলেশ্বরী শেরেবাংলা নগরের কাঁটাবনের পাশে মধুবন নামক বাড়ির পুলিশমন্ত্রীর ব্যক্তিগত অফিসে যোগদান করে। ভারী কাজ বলতে তেমন কিছুই না। সময়টাই খালি লম্বা। সারাদিন ব্যস্ত থাকতে হয়। তার প্রধান কাজ মন্ত্রী মহোদয়ের নির্বাচনী এলাকা থেকে আগত মানুষজন তথা পার্টির হোমরা-চোমরাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করা, তাদের খবরাখবর রাখা, আর টেলিফোনে অফিসের প্রতিদিনের হালচাল মন্ত্রী মহোদয়কে অবহিত করা। ঠিকাদার, ব্যবসায়ী, চাকরিপ্রার্থী, হোমরাচোমরা, দলীয় মস্তান-ক্যাডার বা সমাজ বিরোধীদের সাথে মন্ত্রী মহোদয়ের সাক্ষাৎ বা আলোচনার ব্যবস্থা করাও তার কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। ফুলেশ্বরীর আবাসিক ব্যবস্থাও মধুবনেরই বেসমেন্টে। স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট। কিন্তু সুন্দর। সাজানো গোছানো। বাড়িটি ন্যামফ্লাট সংলগ্ন হওয়ায় এই এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুব জোরালো। ফুলেশ্বরী একজন ব্যস্ত ব্যাচেলর এখন। তার অফিসে আগত মনুষ্যপালের অধিকাংশই পুরুষ প্রজাতির। যারা সকলেই ব্যক্তিগত চাওয়া পাওয়ার হিসেব মেলাতে আসে এখানে, এবং কাকতালীয়ভাবে আগতদের উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন। তদবিরের ফেরি করা। অতিথিরা এখানে ভারমুখে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা নিয়ে আসে। দিনের পর দিন। মাসের পর মাস। কেউবা তারও বেশি। কাজ হয়ে গেলে তারা হাসিমুখে ফিরে যায়। কী অব্যর্থ মহৌষধি মন্ত্রী বাহাদুর স্বয়ং! আজ পর্যন্ত কাউকে বিপন্ন মুখে ফিরে যেতে দেখা যায় নি। দর্শনার্থীরা চাতকের মতো মন্ত্রীর সাক্ষাতের অপেক্ষায় প্রহর গোনে। কারা আসে এখানে? আসে শিক্ষিত, অশিক্ষিত, ভদ্র, অভদ্র, ব্যবসায়ী, কন্ট্রাক্টর, শিক্ষক, ছাত্র, আমলা, চাকুরীজীবী, অবসরপ্রাপ্ত, সন্ডা গুন্ডা, খুনি, ধর্ষক, সমাজবিরোধি, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, উঠতি ছাত্র-নেতা, চাকরি সন্ধানী বেকার আকার সাকার। সারাদিনের অপেক্ষার পর মন্ত্রীর দর্শন পেলে দর্শনার্থীদের ভারনত ক্লান্ত মুখ দোয়েল বুলবুলির মতো খুশিতে নেচে ওঠে। অদর্শনে হতাশ হয় না কেউ। পরের দিন আবার তারা ধর্ণা দেয়, এবং কোনো এক সময়ে মন্ত্রীর সাথে তাদের সাক্ষাৎ হয়ই হয়। বাঙালি যে প্রচন্ড আশাবাদী তা কি কারো অজানা। ফুলেশ্বরীর টেবিলে মাত্র দু’টি ফাইল। আর সাদা, কালো ও লাল রঙের তিনটি বাচাল টেলিফোন। বেশির ভাগ সময় তাকে টেলিফোনেই কাটাতে হয়। প্রতিদিনই তাকে জী, হ্যাঁ, না, আচ্ছা ইত্যাদি শব্দ হাজার বার উচ্চারণ করতে হয়। গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা নোট বইয়ে টুকে রাখা, আগতদের অলস অথবা ফালতু প্রশ্নের উত্তর দেয়া, নয়তোবা মন্ত্রীর নির্দেশ মতো বিভিন্ন অফিস বা মহলে ফোন লাগানো তার কাজের অন্যতম বাধ্যতামূলক অংশ। ফুলেশ্বরীর মধুবনে মহামান্য পুলিশমন্ত্রী দৈনিক বার দুয়েক পদধুলি দেন, যদি তিনি ঢাকায় থাকেন। তবে রাত দশটার দিকে মন্ত্রী প্রায়ই আসেন সেখানে। মন্ত্রী মহোদয় মধুবনে এলে অফিস ঘর বর্ষার জলোচ্ছ্বাসের মতো চ ল হয়ে ওঠে। তখন ফুলেশ্বরীকে মহামান্যের পাশে বসা ছাড়া তেমন কিছুই করার থাকে না। মহামান্যের নিরাপত্তা বিষয়ক ব্যাপার স্যাপার যন্ত্রসজ্জিত খাঁকি পোশাকধারীরাই সামাল দেন। কিন্তু এত লম্বা সময় টানা কাজ করা ফুলেশ্বরীর ভালো লাগে না। অল্প দিনেই চাকরির প্রতি বিতৃষ্ণা জন্মে। সবাই কেমন ড্যাব ড্যাব চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। অনেকে ফিসফিস করে, ‘সেই মেয়েটি’ বলে। ফুলেশ্বরী কান পেতে শোনে না শোনার ভঙ্গিতে।
মহামান্য মন্ত্রী মধুবনে আজ কাঁটায় কাঁটায় রাত দশটায় উপস্থিত হলেন। প্রতিদিনের মতো অর্থহীন ক্লান্তির সাথে বিজয়ের আনন্দ তাঁর চোখে মুখে পোশাকে লেগে আছে। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়ে পরিবেষ্ঠিত হয়ে তিনি দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছেন হল ঘরের দিকে। পিছু পিছু ছুটে চলেছেন নাছোড় ক’জন টেলিভিশন সাংবাদিক। তিনি শীততাপ নিয়ন্ত্রিত বাড়িটির নির্দিষ্ট ঘরের রাজকীয় রিভলভিং আরাম কেদারায় ধপাস করে বসে গা এলিয়ে দিলেন, এবং অতঃপর হাত নেড়ে সবাইকে শুভেচ্ছা জানালেন। ফুলেশ্বরী হলুদ রঙের ফাইলের পাতা উল্টিয়ে মহামান্যের সামনে মেলে ধরে। মন্ত্রী মহোদয় আনমনে তাতে অলস দু’চোখ বুলিয়ে ঘস ঘস করে আট-দশটিতে সই করলেন। আর এতেই আগন্তুকদের ক্লান্ত শুষ্ক ঠোঁটে এক চিলতে হাসির আভা ঝিলিক খেলে যায়। মন্ত্রী মহোদয় মধুবনের অফিসে আধ ঘণ্টাকাল ব্যয় করার পর সকলের উদ্দেশে গম্ভীরমুখে বললেন, ‘আজকে আমার অধিক জনগুরুত্বপূর্ণ বৈঠক আছে, আপনাদের আর সময় দিতে পারবো না বলে দুঃখিত। আপনারা কাল ছয়টার পরে আসবেন।’ নেতা-কর্মীদের কাউকে ফিসফিসিয়ে বলতে শোনা যায়, ‘এই গুমারে ছুইটার পামু কনে?’ আমরাও বুঝতে পারি না, মন্ত্রী সাহেব অতিথিদের পরের দিন সন্ধে ছ’টার পর, নাকি ভাদ্র মাসের গরমের মধ্যেও সকলকে সোয়েটার গায়ে দিয়ে আসতে বলেছেন। অন্যরা টু শব্দটি করে না। বাধ্য গৃহপালিত পোষা প্রাণীর মতো ফিরে যায়। তবুও মধুবনে থেকে গেলেন জনাদশেক হোমরা-চোমরা, যাদের আসা যাওয়া কখনো শেষ হয় না। এরা কারণে অকারণে প্রতিদিন আসে মন্ত্রীসমীপে। সরকারের শেষদিন পর্যন্ত এরা আসতেই থাকবে। এমনকি ভিন্ন মতাদর্শের সরকার ক্ষমতাসীন হলেও তারা লেবাস বদল করে আসতেই থাকবে। মন্ত্রী মহোদয় আসা-যাওয়াঅলাদের বিদায় বেলায় প্রত্যেককে একটি করে হলুদ খাম হাতে ধরে দিলেন। ফুলেশ্বরী জানে, খামের মধ্যে কি আছে।
দৈবাৎ মন্ত্রীর ব্যক্তিগত মোবাইল বেজে ওঠে। তিনি পুলকিত মনে ফোনটি ধরলেন, এবং বলেন, ‘নিশ্চয়, নিশ্চয়। চলে আসুন। আপনারা ক’জন? নো প্রবলেম। আমিই তো সমাধান করি সব সমস্যা। অনলি মাই কিউট এপিএস উইথ মী। বাকিরা চলে যাচ্ছে।’ কথা শেষে তিনি মোবাইলের সুইচ বন্ধ করে সবাইকে বলেন, ‘তোমরা আজকের মতো যাও। আমার জরুরি মিটিং আছে। ওরা আসছে। আই মিন দে আর অন দ্য ওয়ে। সো ইউ গায়িস মাস্ট লিভ দিস প্লেস ইমিডিয়েট।’ হোমরাচোমরারা হাসিমুখে চলে যায় আগামীকাল আসবে বলে। ফুলেশ্বরী ক্লান্ত। নিজের জন্য বরাদ্দকৃত ফ্লাটে চলে যাওয়ার জন্য বসের অনুমতি প্রার্থনা করলে, ‘মন্ত্রী বলেন, তোমার তো এখানেই বাস। তোমার আবার চলে যাওয়া কীসের? থাকো প্লিজ। পুষিয়ে দেবো।’
ফুলেশ্বরী কথা বাড়ায় না। কিছু বলতে ইচ্ছাও হয় না। পোষা কুকুরের মতো মনিবের পাশে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে।
মন্ত্রী ফুলেশ্বরীর দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘দাঁড়িয়ে কেনো? বসো।’
ফুলেশ্বরী বসে।
মন্ত্রী বলেন, ‘আমার কয়েকজন ভি আই পি গেষ্ট আসছেন। দে আর অন দ্য ওয়ে। এ্যানি মোমেন্ট দে উইল বি হিয়ার। দু’জন সাবেক কেবিনেট মন্ত্রী, একজন আমলা, একজন সাবেক জেনারেল, দু’জন শিল্পপতি রাজনীতিক ও একজন বিরোধী দলের প্রভাবশালী বিপ্লবী রয়েছেন সেই টিমে। ওদের সঙ্গে বিশেষ বৈঠকে বসতে হবে। তুমি না থাকলে চলে কেমনে। অ্যাট লিস্ট তুমি ওদের অভ্যর্থনা বা আপ্যায়নটা করতে পারো। প্লি জ হেল্প এন্ড সেফ মী আউট।’
ফুলেশ্বরী বসের অনুরোধকে আদেশ মনে করে থেকে যায়।
ভিআইপিদের গাড়ির অহেতুক ভেঁপু বা যান্ত্রিক শব্দ নীরব রাতের স্নিগ্ধতা ভেদ করে ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। হেডলাইটের ঝলসানো তীব্র সাদা আলো দৃষ্টিনন্দন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অলস কৃত্রিম হ্রদের স্থির জলে পড়ে জলকে আরো উজ্জল করে তোলে। হ্রদের কিনারা ঘেঁষে ঘাপটি মেরে বসে থাকা ভীরু চাইনিজ লাল কাঁকড়ার দল, কোরিয় ব্যাঙ ও বোস্তামি ঢাউস কচ্ছপগুলো জলের সাথে ঝিকমিক করে। মন্ত্রী মহোদয় ফুলেশ্বরীকে সাথে নিয়ে অতিথিদের সাদর সম্ভাষণ জানিয়ে ভেতরে নিয়ে এলেন। আগন্তুকেরা গোল টেবিলের চারদিকে ঘিরে বসলেন। ফুলেশ্বরীকে ‘হেড অব দ্য টেবিলে’ বসে থাকা পুলিশমন্ত্রীর বাঁ পাশে বসতে দেওয়া হলো। ফুলেশ্বরীকে খানিকটা সংকুচিত দেখায়। অতিথিরা পুলিশমন্ত্রীর সাথে ব্রিফকেস বদল করে উল্লাসে ফেটে পড়েন। মন্ত্রী একটি সুদৃশ লাল প্যাকেট ফুলেশ্বরীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, ‘এটা তোমার জন্য। দেশের প্রধান ভূস্বামী, খ্যাতিমান রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী ও বিশুদ্ধধারা গ্রুপ অব ইন্ডাষ্ট্রিজের সম্মানিত কর্ণধার, যিনি বিশিষ্ট সমাজ সেবক ও রাজনীতিক-আলহাজ্ব আলীমুদ্দিন গোখরো সাহেব ফ্রান্স থেকে এনেছেন তোমার জন্য।’
আলীমুদ্দিন গোখরো সাহেব সহাস্যে হাত বাড়িয়ে দিলেন ফুলেশ্বরীর দিকে।
পুলিশমন্ত্রী হাসতে হাসতে ফুলেশ্বরীকে ‘রাখো’ বলেন। ফুলেশ্বরী বিব্রত বোধ করলেও, উপহারটি যত্ন করে পার্সের ভেতরে ঢুকিয়ে রাখে। চুপসে যাওয়া বেলুনের মতো মনে হয় তাকে। সে বোধ হয় কিছুটা ভীত অথবা কিংকর্তব্যবিমূঢ়! স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। পুলিশমন্ত্রী বলেন, ‘কী হলো ফুলেশ্বরী, হাত মেলাও। ওনারা আমার কাছের মানুষ, খুব আপনজন।’
ফুলেশ্বরী আলীমুদ্দিন গোখরোর সাথে করমর্দন করে।
আলীমুদ্দিন গোখরো ফুলেশ্বরীর কোমল হাতে হাত রেখে মৃদু করে ঝাঁকিয়ে হাসতে হাসতে, ‘তোমার মতো সুন্দরী কমলার দরকার বাঙলার প্রতিটি অফিস আদালতে। তাহলে মেহমানদারি, জনসেবা আর ব্যবসা সবই হবে কড়াগন্ডায়। কী বলো,’-বলেই প্রবলভাবে হাসতে থাকেন। ফুলেশ্বরী কেঁপে ওঠে। ভেতরে তার নীরব চিৎকার, নিঃশব্দ রোদন। এমন সময় পুলিশমন্ত্রীর দু’জন খিলজি চারজন মাংসল বঙ্গ-সুন্দরীদেরকে সাথে নিয়ে ঘরে ঢোকে। মহামান্যরা করতালি ও হর্ষধ্বনিতে নতুনদের অভিবাদন জানায়। সুন্দরীগণ মহামান্যদের ফাঁকে ফাঁকে ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে বসে। স্বচ্ছ শাড়ি পরা সুন্দরীদের নাভি বা শরীর বা বুকের মাখনের মতো মসৃণ মাংস স্পষ্ট দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। নীল আলো জ্বলে উঠলে শুরু হয় পাশ্চাত্যের আদলে বঙ্গীয় ঝড়ো রক সঙ্গীত। বোতল বা গেলাশের টুং টাং শব্দে মুখরিত চারপাশ। এতে রাতের মসৃণ পরিবেশ ভেঙে গেলেও কার বাপের কি। এরূপ পরিবেশে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জেগে ওঠে মহামান্যদের শরীরের স্পর্শকাতর ইন্দ্রিয়সমূহ। সবাই পান করছেন, দেদারচে, আর চিবিয়ে চলেছেন দেশীয় মুরগির সুস্বাদু বারবিকিউ। রঙিন জলের কোমল বৈঠকি আড্ডায় মাংসের সাথে মাংসের সাদৃশ্য বড়ই চিত্তাকর্ষক, খুবই মোহনীয়। কিন্তু ফুলেশ্বরী সেসব পান করছে না, এমনকি স্পর্শও। কেউ খাবে কেউ খাবে না তা কি হয়? শক্তিধর সাবেক মহামান্য জেনারেল নিজের বোতল থেকে আধ গেলাশ ভদকা ফুলেশ্বরীর মুখে এক প্রকার জোর করেই ঢেলে দিলেন। বর্ষার নদীর স্রোতের মতো কলকল করে উঠলেন সবাই। অতিথিরা, পুলিশমন্ত্রী মহোদয় নিজে, কিংবা খিলজিরা সবাই বোতলের পর বোতল খালি করতে থাকেন। সবাই গিলছে পেগের পর পেগ, কেউ ডাউন হচ্ছে না। কিন্তু ফুলেশ্বরীর ভেতরটা ডাউন হয়ে আসে, বুকের গহীনে হাহাকার করে ওঠে বিস্তীর্ণ চরের বালুকারাশির মতো। যেহেতু আরও চারজন নারী রয়েছে সেখানে, সেহেতু কোনো রকম অঘটন ঘটার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয় মনে মনে সে। তাছাড়া উপস্থিত সবাই দেশ ও সমাজের দায়িত্বশীল, এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিত্ব। কিন্তু পেটে মাল পড়লে যে সবাই নিজেকে প্রতাপশালী সম্রাট ভাবে, আর অবশিষ্টদের মনে করে শূদ্রর প্রজা, সে কথাইবা ক’জনে জানে। যে জানে না সে বোধ হতভাগ্যের চেয়ে বেশি কিছু। মহামান্যরা চার উর্বশীর শরীর থেকে শাড়ি খুলে নিলেন। উর্বশীরা আনন্দে পুলকিত, উল্লাসে ঝরণাধারার মতো মাতোয়ারা। সুন্দরীরা তাদের উদোম বুক দোলাতে দোলাতে মহামান্যদের সাথে ডিসকো নাচ নাচতে থাকে। ঝড়ো সঙ্গীত এবার সুনামির মতো বেপরোয়া আরো। মধুবনে এখন শুধুই মাংসের তুফান বইতে থাকে। আলিমুদ্দিন গোখরো একে একে উর্বশীদের শরীর থেকে অন্তর্বাস খুলে নিচ্ছেন। মহানন্দে উর্বশীরা বুক উচিয়ে, কোমর দুলিয়ে, পাছা ফুলিয়ে, ময়ুরপঙ্খীর মতো ডানা মেলে আরো দুরন্ত বেগে নাচতে থাকে। আর মহামান্যরা উর্বশীদের মাংসের ভেতরে বিপুল বিক্রমে ঢুকতে, এবং বেরোতে থাকেন। ফুলেশ্বরীর চোখে মুখে ভীরুতা ও ক্ষোভের সংমিশ্রিত গভীর ছাপ। সহ্য করতে পারে না এসব। লজ্জায়, রাগে কাঁপতে কাঁপতে সে পাশের ঘরে ঢুকে ভেতর থেকে দরজার ছিটকিনি বন্ধ করে দেয়। সাবেক জেনারেল ও গোখরো সাহেব অলরাউন্ডার। বেশ ক’টি চার মারের পর ফুলেশ্বরীকে খুঁজতে থাকেন ছক্কা হাঁকার জন্য। আশপাশে ফুলেশ্বরীকে না পেয়ে তাঁরা বন্ধ ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন। ফুলেশ্বরী ভীত সন্ত্রস্ত। সম্ভ্রম বাঁচাতে সে খাটের নিচে লুকায়। শক্তিমানেরা সেখান থেকে তাকে ধরে এনে খাটের ওপর শোয়ায়, এবং তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। একাত্তরেও তাঁরা এভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে বহু ফুলেশ্বরীকে বিরঙ্গনার খেতাব এনে দিয়েছিলেন! মহামান্যরা দ্রৌপদীর মতোন করে ফুলেশ্বরীকে বস্ত্রহীন করে, এবং কামনার হিংস্র নিঃশ্বাস, ঠোঁট আর আঙুল দিয়ে তার শরীরের ওপর যেমন খুশি তেমন করে বিচরণের চেষ্টা চালায়। ফুলেশ্বরী নরকের যন্ত্রণায় দগ্ধ হতে থাকে। রোদন করে। ক্ষতবিক্ষত হয় দানবের নখের আঁচড়ে। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে প্রায়। তবুও বিদ্রোহ করতে থাকে। সে বসের সাহায্য কামনা করে। “বাঁচাও, বাঁচাও” বলে আর্তনাদে কাঁপতে থাকে। অবশেষে বিধাতার আশীর্বাদে মহামান্য পুলিশমন্ত্রী ফুলেশ্বরীকে হায়েনাদের হাত থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যায় ভেতরের একান্ত ঘরে। ফুলেশ্বরী তখনও বিবস্ত্র। মন্ত্রী ফুলেশ্বরীকে জড়িয়ে ধরে থাকেন। এ যেনো বিধাতার প্রেরিতজনের বুকে ফুলেশ্বরীর নিরাপদ আশ্রয়। ফুলেশ্বরীর ভয় কাটে, স্বস্তির নিশ্বাস ফেলবার চেষ্টা করে। সম্ভ্রমহানী থেকে বেঁচে যাওয়া ফুলেশ্বরী আনন্দে কাঁদে। মন্ত্রী ফুলেশ্বরীকে অভয় দেন। ফুলেশ্বরী দু’হাত দিয়ে লজ্জা স্থান ঢেকে আড়ষ্ট গলায় উচ্চারণ করে, ‘আমার শাড়ি!’
মন্ত্রী জড়িয়ে যাওয়া কণ্ঠে বলেন, ‘দরকার কী? আমি তো আছি। আমিই তোমার শাড়ি।’
ফুলেশ্বরী কেঁপে ওঠে। তার হৃৎযন্ত্র হিম-শীতল যেনো, বিকল হওয়ার উপক্রম। রক্ষকই কি তবে ভক্ষক! ঘরের শত্রু বিভীষণ!
মন্ত্রী বৃথা বাক্য ব্যয় না করে ফুলেশ্বরীর ভেতরে দোর্দন্ড প্রতাপে ঢুকতে থাকেন। ফুলেশ্বরী চিৎকার করে। সেই চিৎকারের ধ্বনি বেশি দূর এগোতে পারে না। সঙ্গীতের ঝড়ো পরিবেশে মুখ থুবড়ে পড়ে চার দেয়ালের শব্দ নিয়ন্ত্রিত বাড়িতে। ফুলেশ্বরী শরীরের সমস্ত শক্তি নিংড়ে মন্ত্রীর শরীরের তল থেকেই বিদ্রোহ করতে থাকে, কিন্তু পশুশক্তির সাথে পেরে ওঠে না। অবশেষে জীবন ও সম্ভ্