সাহিত্য আন্তর্জাতিকতা ও ঐতিহ্যিক উপাদান
খালেদ হামিদী
আন্তর্জাতিকতাবাদ (Internationalism) যেখানে এমন একটি ধারণা বা মতবাদ যা বিভিন্ন রাষ্ট্র বা জাতিকে একই বা বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সহযোগিতামূলক সম্পর্কের মধ্যে সক্রিয় রাখে, জাতীয়তাবাদ (Nationalism) সেখানে কাউকে কোনো জাতির অন্তর্ভুক্ত জ্ঞান করতে শেখায়। কেবল তা-ই নয়, সেই জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, বিকাশ, অগ্রগতি, ভৌগোলিক অবস্থান, আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক মুক্তির আকাক্সক্ষা ইত্যাদির সাথে একাত্মতাবোধ এবং সংশ্লিষ্ট জাতির ঐতিহ্য, মূল্যবোধ, স্বকীয়তা রক্ষা ও বিকাশে আস্থাশীল হতে উদ্বুদ্ধ করে। আন্তর্জাতিকতার সঙ্গে জাতীয়তার সম্পর্ক এবং জাতীয়তার অংশস্বরূপ ঐতিহ্যের অনিবার্যতা বিষয়ে আমরা কম-বেশি অবহিত। কিন্তু ঐতিহ্য অনড়। তবে জাতীয়তার ধারণাটি জঙ্গম, ইতিহাসের নানা বাঁকে। কেননা জাতীয়তা আর্থ-রাজনীতিক স্বাধীনতার প্রশ্নে একেকটি জনগোষ্ঠীকে আন্দোলিত, উদ্বোধিত এবং ঐক্যবদ্ধ করে।
কিন্তু ঐতিহ্যের স্বরূপ কি? ইয়োরোপ ও ভারতবর্ষের ইতিহাস যেমন ভিন্ন তেমনি ভারত ও বাংলার ইতিহাসে বিদ্যমান সাংস্কৃতিক পার্থক্যও বিভিন্নতা সৃষ্টি করে এবং তা একেকটি জনপদকে কেন্দ্র করে এক একটি অঞ্চলে দিনে দিনে গড়ে ওঠে। একেক এলাকার মানুষের জীবনশৈলী, মানসিকতা ইত্যাদি তার মূল্যবোধের দিগন্তে একটি আঞ্চলিক সংস্কৃতির জন্ম দেয় আর তা-ই মূলত কালক্রমে সেই অঞ্চলের ঐতিহ্য হয়ে দাঁড়ায়। এই যে দিনে দিনে ঐতিহ্যের গড়ে ওঠা, এটি সম্ভব হয় উত্তরাধিকার সূত্রে বংশপরম্পরায় বিশেষ একটি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলভুক্ত দৈনন্দিন চর্চার গণ্ডিতেই। আর, সংস্কৃতি তখনই কোনো না কোনো উত্তরাধিকারের সামগ্রী হয়ে ওঠে, যখন তা কোনো না কোনো সম্প্রদায়ের নিজের হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ বিশেষ সম্প্রদায়, বিশেষ কোনো একটি সাংস্কৃতিক জীবনশৈলীকে যখন বংশপরম্পরায় বহন করতে থাকে, তখনই তাকে ঐতিহ্য বলে অভিহিত করা হয়। যে উত্তরাধিকারের মাধ্যমে ঐতিহ্যের প্রবহমাণতা অটুট থাকে, সেই উত্তরাধিকার প্রকৃতিগতভাবে সাম্প্রদায়িক। তাই ঐতিহ্য যেমন আঞ্চলিক, কথিত উত্তরাধিকারও তেমনই সাম্প্রদায়িক। এ জন্যেই কি আবদুল মান্নান সৈয়দ তিরিশের কবিতায়, বিশেষত, বিষ্ণু দে এবং সুধীন্দ্রনাধ দত্তর কাব্যে, মিথের ব্যবহারকে ‘হিন্দু পুরাণের অবিরলতা’ বলে উল্লেখ করেন? মান্নান সৈয়দের জীবৎকালীন রাজনীতিক অবস্থান বা সমর্থনের বিষয়টি এক্ষেত্রে স্মর্তব্য। কিন্তু সম্প্রদায়, উপনিবেশের সংস্কৃতি গ্রন্থে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যেমন বলেন, শ্রেণীবৈষম্যকে বৈধতা দেয় এবং শ্রেণীশোষণকে আড়াল করে। মনে রাখা দরকার, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা উল্লিখিত আঞ্চলিক সাম্প্রদায়িকতাপ্রধান ঐতিহ্য মোটেও নয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসামান্য আহ্বানে এ দেশের মানুষ পাকিস্তানি উপনিবেশের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয় অবশ্যই অসাম্প্রদায়িক জীবনচেতনার প্রতিভাস ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের প্রেরণায়। প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নীচে বইয়ে হুমায়ুন আজাদ প্রায় এমনই বলেন যে, সম্প্রদায় মানুষকে মেলায় না, মানুষকে মেলায় অভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতি। যদিও, এ বক্তব্যে শ্রেণীবাস্তবতার বিষয়টি উপেক্ষিত।
সংক্ষেপে হলেও কবিতায় ঐতিহ্যিক উপাদানের প্রসঙ্গটি দেখার আগে উল্লেখ্য যে, ইউরোপের শিল্পবিপ্লবের আগে, একেক অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উপর অন্য অঞ্চলের প্রভাব এসে পড়ে সামান্যই। সেই প্রভাবের আওতাও সীমাবদ্ধ থাকে মূলত পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মধ্যেই। কিন্তু তার মধ্যেও ব্যতিক্রম ছিল না তা নয়। আদি ভারতবর্ষে আর্যদের পদার্পণে ভারতীয় ঐতিহ্য নতুন এক সংস্কৃতির জন্ম দেয় যাকে আর্যসংস্কৃতি বা বর্তমান কালের পরিভাষায় হিন্দুত্ব বলতেই মূলত পছন্দ করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অনেকেই। অনেকে একে আবার সনাতন ভারতীয় সংস্কৃতি বলেও অভিহিত করেন। কিন্তু এই সনাতন ভারতীয় আর্যসংস্কৃতি আদি ভারতীয় সংস্কৃতি নয়। আবার পরবর্তী কালে ভারতবর্ষে মোঘল পাঠানদের হাত ধরে ইসলামী সংস্কৃতির অনুপ্রবেশে ভারতীয় সংস্কৃতি কালক্রমে আরও এক নতুন রূপ পরিগ্রহ করে। এভাবে একেক ঔপনিবেশিক শক্তির প্রতাপে-প্রভাবে আঞ্চলিক সাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও ধরন বদলাতে থাকে। ঠিক যেমন দুই শত বছর বৃটিশ শাসনাধীন থাকার ফলে বঙ্গীয় সংস্কৃতির মধ্যেও কিছু পরিবর্তন ঘটে যায়। ইয়োরোপের শিল্পবিপ্লবের হাত ধরে যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্রমোন্নতি এবং ঔপনিবেশিকতার বিস্তার এক অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর অন্যান্য অঞ্চলের প্রভাবকে এক প্রকার গুরুত্বপূর্ণই করে তোলে। ফলে বিভিন্ন অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ক্রমাগত অপরাপর সংস্কৃতির প্রভাবে আবর্তিত হতে থাকে যুগে যুগে। আর, এটিই হয়ে ওঠে উপনিবেশকালীন আন্তর্জাতিকতা। এ জন্যেই ইংল্যান্ডের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর বঙ্গীয় সংস্কৃতির কোনো প্রভাবই মুদ্রিত হয় না। এই আন্তর্জাতিকতার প্রসঙ্গে অপেক্ষাকৃত বিশদরূপে যাবার আগে বলে রাখতে হয়, আন্তর্জালে প্রকাশিত ওপার বাংলার অখ্যাত বা নবীন লেখকের গদ্যেও ঐতিহ্যের সাম্প্রদায়িকতার বিষয়টির উল্লেখ মেলে। কিন্তু তা ভারতে হিন্দু মৌলবাদের উত্থানের প্রতি সূক্ষ পক্ষপাতদুষ্ট বলেই প্রতীয়মান হয়।
এ-গদ্যের শুরুতেই ঐতিহ্যের সাম্প্রদায়িকতার প্রসঙ্গ আসে গেলো শতকের নব্বইয়ের দশকে দেশের অনেক কবিতা-পদ্য লোককথা ও পৌরাণিক অনুষঙ্গে প্লাবিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে। পুরাণ ঐতিহ্যের সাম্প্রদায়িকতারই একটি প্রপঞ্চ, তা স্থানিক বিশিষ্টতার স্মারক হলেও। পশ্চিমের পোস্ট মডার্নিজম এবং স্থানীয় উত্তর আধুনিকতার প্রভাবে-প্রেরণায় সৃষ্ট ওই জলোচ্ছ্বাসে বাংলাদেশের কবিতাঙ্গনে তেমন কোনো পলি জমে বলে মনে হয় না। দ্য পাওয়ার অফ মিথ (The Power of Myth; Publisher: Knopf Doubleday Publishing Group; Publication Date: 06/01/1991) গ্রন্থে জোসেফ ক্যাম্পবেল যদিও বলেন: ÔPeople say that what we’re all seeking is a meaning for life. I don’t think that’s what we’re really seeking. I think that what we’re seeking is an experience of being alive, so that our life experiences on the purely physical plane will have resonances with our own innermost being and reality, so that we actually feel the rapture of being alive.Õ অন্যত্র তিনি বলেন: ০১. ÔMyths are public dreams, dreams are private myths.Õ
০২. ÔAs you proceed through life, following your own path, birds will shit on you. Don’t bother to brush it off. Getting a comedic view of your situation gives you spiritual distance. Having a sense of humor saves you.
শেষ উদ্ধৃতিতে নিজস্ব পথে চলা কারও ওপর মলত্যাগী পাখি কি ঔপনিবেশিক শক্তির প্রতীক? আমরা জানি, বিশ্বসাম্রাজ্যবাদের মোকাবেলায় উত্তর আধুনিকগণ স্থানীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ক্যাম্পবেল শিমুল মাহমুদকেও বেশ উদ্বুদ্ধ করেন। আদিম মানুষ মিথের সাহায্যেই জীবন ও জগতের রহস্য বুঝতে সচেষ্ট হয় বলে শিমুল উল্লেখ করেন এবং পুরাণভাবনা বলতে মানবজীবনের অনন্ত সম্ভাবনার জাগরণই বোঝেন। কিন্তু মনে পড়ে, লোককথা বা মিথকে ফ্রান্সিস বেকন মিথ্যা অভিহিত করেন। পুরাণ কি আসলেই অসত্য এবং দুঃখের অবিরলতার গল্প? ঔপনিবেশিক যুগের অবসানের পরে এই প্রশ্ন নবতর গুরুত্ববাহী হয়ে ওঠে। ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ আফ্রিকায়, এমেরিকায় অনেক ভাষা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে শুধু নয়, সংশ্লিষ্ট জাতি-গোষ্ঠীকেও ধ্বংস করে দেয়। তাই পুরাণের নতুনতর পাঠ খোদ পশ্চিমেই অনিবার্য হয়ে ওঠে প্রায়। ক্লদ লেভি-স্ত্রসের কাঠামোবাদ অতীতকে বুঝতে সহায়ক হয়ে ওঠে অনেকটা। ক্লদ লেভি-স্ত্রস তাঁর মিথ এন্ড মিনিং ( অনুবাদ: প্রিসিলা রাজ) গ্রন্থে যেমন বলেন: ‘বিজ্ঞান যেখানে সতের শতক থেকে উনিশ শতক পর্যন্ত শুধুমাত্র পরিমাণগত বিষয়ে আগ্রহী ছিল, সেখানে এখন এটি বাস্তবের গুণগত দিকগুলিও বিবেচনায় নিয়ে আসছে।’ এমনটি হয়ে উঠছে মিথ পর্যালোচনার মাধ্যমেই। কিন্তু স্বয়ং লেভি-স্ত্রসই প্রশ্ন তোলেন: ‘কোথায় মিথলজির শেষ এবং ইতিহাসের শুরুই বা কোথায়?’ (প্রাগুক্ত) আর, উত্তর ও দক্ষিণ এমেরিকার মৌখিক ভাষাসম্পন্ন প্রাগৈতিহাসিক-প্রাচীন জনপদসমূহের পরবর্তীতে লিপিবদ্ধ নানা কাহিনি বা ‘বইগুলো পড়ে আমরা মিথলজি ও ইতিহাসের মধ্যেকার বৈপরীত্যের আরেকটি স্তর আবিষ্কার করি। এমনিতে আমরা ইতিহাস ও মিথলজিকে আলাদা করে দেখতে অভ্যস্ত। [..] মিথলজি ও ইতিহাসের মধ্যে কোনো স্পষ্ট বিভাজন রেখা নেই। এবং, এ দুয়ের মাঝামাঝি আবার আরেকটি স্তর আছে। মিথলজি স্থির, আমরা মিথের উপাদানগুলোকে উপর্যুপরি ফিরে আসতে দেখি একটা বদ্ধ প্রক্রিয়ার মধ্যে। এর বিপরীতে ইতিহাস একটি মুক্ত প্রক্রিয়া।’ জানান ফরাসী এই নৃতত্ত্ববিদ উল্লিখিত গ্রন্থে। আমাদের এও ভুলে গেলে চলে না যে, প্রাচীন মিথ সামন্তীয় শাসকদেরই শুধু অনড়তা দেয় না, অধুনাতন ধনতন্ত্র-সৃষ্ট মিথ জনবিরোধী (সেইসঙ্গে প্রকৃত অর্থে জনবিমুখ) চরিত্র ও বিষয়গুলোকেও, নানান মিডিয়ার মাধ্যমে, অমর করে তোলার প্রয়াস পায়। আর, পৌরাণিক চরিত্রগুলোর ডিকনস্ট্রাকশন বা অবিনির্মাণও শেষ অব্দি আসলে হয় না। কেননা, দৃষ্টান্তস্বরূপ, স্বদেশকে দ্রৌপদী বললে আপাত রূপকের ব্যঞ্জনা মেলে বটে, কিন্তু দ্রৌপদীর মহাভারতীয় ইমেজ বদলায় না। কেননা হৃতাবস্থা থেকে স্বদেশকে রক্ষা করবে কি দ্রৌপদীরই সম্ভ্রমরক্ষক শ্রীকৃষ্ণ (নিজেকে অদৃশ্য রেখে) প্রতিম অলৌকিক কোনো ক্ষমতা? মোটেও নয়। দেশকে বিদেশি লুটেরাদের হাত থেকে বাঁচাতে পারে দলিত জনমণ্ডলির জাগরণসম্ভব সম্মিলিত শক্তি, অন্য কিছু নয়। এদিকে আরো বিশেষভাবে লক্ষযোগ্য, ক্লদ লেভি-স্ত্রস তাম্র ও লৌহযুগ পর্যন্ত কল্লোলিত প্রধান ধর্মগুলোর পুরাণ ও ইতিহাস বিষয়ে কিছুই বলেননি উপর্যুক্ত গ্রন্থে। তিনি কাজ করেন মানুষের লিখন-পদ্ধতি আবিষ্কারের পূর্বেকার পরস্পর দূরবর্তী স্বতন্ত্র নানা মানবগোষ্ঠীর মিথ নিয়ে, যাতে ক্লদ, কাঠামোবাদের সুবাদে, ভৌগলিক ও সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও মনুষ্যগোত্রগুলোর জাগতিক বোধ ও দৃষ্টির মধ্যে, বিস্ময়কর সামঞ্জস্য আবিষ্কার করেন। অবশ্য প্রধান ধর্মগুলির মূল নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেও ঘোরতর অমিল নেই।
তবে বলে রাখতে হয়, সব ঐতিহ্যই সাম্প্রদায়িক নয়। যতোটা গভীর ও ততোটাই প্রসারিত রবীন্দ্রসাহিত্য ও সঙ্গীত যেমন আমাদের ঐতিহ্য, তেমনি, এদিকে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ এবং পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রাও তা-ই। এ ক্ষেত্রে জাজ্বল্যমানরূপে যুক্ত হন জীবনানন্দ দাশও। বলে রাখা দরকার, রবীন্দ্রনাথ উপনিষদনির্ভরতা, রোমান্টিসিজম ও মিস্টিসিজম থেকে শেষাবধি ইনফাইডালিটিতে নিজেকে উত্তীর্ণ করেন। এর আগে বলাকা কাব্যে ঈশ্বরকে গৌণ অভিহিত ক’রে জীবন ও জগতের গতিশীলতার কাব্যানুবাদ সম্পন্ন করেন। কবিতায় ঐতিহ্যিক উপাদান প্রসঙ্গে, উদ্ধৃতির বাহুল্য এড়িয়ে শুধু এটুকু বলে রাখতে হয়, মহাকাব্য ও লোককাব্যের অনুষঙ্গের প্রাধান্যের পাশাপাশি, বুঝিবা এনকাউন্টার হিসেবে, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের দিনযাপনের বিশেষ ভাষা ও শব্দরাশি এবং কতিপয় পীরের নাম ও মাজারকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গও ভিড় জমায় প্রাগুক্ত নব্বইয়ের পদ্যে। আরেকটি অংশে প্রমিত ভাষায় অনুপ্রবেশ ঘটানো হয় কথ্য ও আঞ্চলিক শব্দ এবং ক্রিয়াপদের। কিন্তু এই মিশ্রভাষা উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত জনমণ্ডলির নয় বিধায় তা বিপ্লবী চেতনার স্মারক হয়ে ওঠে না। এমনিতেই, লিখিত ভাষা আবিষ্কারের আগেই কবিতা মুখে মুখে রচিত ও শ্রুত হলেও পুঁজিবাদের আবির্ভাবের পর থেকে তা মধ্যবিত্তেরই হয়ে ওঠে। নব্বইয়ের উল্লিখিত সদর্থক রাজনীতিশূন্য প্রবণতাগুলোর বাইরে, সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশের প্রেক্ষাপটে প্রাগ্রসর জীবনচেতনার প্রতি উন্মুখ নানা মাত্রিক কবিতা রচনা করেন ওবায়েদ আকাশ, শোয়াইব জিবরান, সরকার আমিন, ভাগ্যধন বড়ুয়া প্রমুখ। কবি ওবায়েদ আকাশ তাঁর আবির্ভাবকালের উল্লিখিত কলরবে সাড়া না দিয়েই নিজের দেশীয় ও বৈশ্বিক জীবনবোধের কাব্যানুবাদে ব্রতী হন এক সূক্ষ্ম পৃথকতাযোগে। তাঁর ‘লৌকিক বাংলায় প্রত্ন-অনুসন্ধিৎসু অভিযাত্রা (দ্র: শামসুজ্জামান খান লিখিত ভূমিকা; উদ্ধারকৃত মুখমণ্ডল বইয়ে)’র কথা বলা হলেও, তিনি বাংলায় বিচরণ কেবল করেন না, যে কোনো জৈবনিক অবস্থানে গ্রাম-বাংলাকে গ্রথিত করে নেন নিজ সমগ্র সত্তায়। এদিকে শূন্য দশকেও পুরাণনির্ভরতা এড়িয়ে কবিতা লেখেন ইমতিয়াজ মাহমুদ, নওশাদ জামিল, মুয়িন পার্ভেজ (প্রথম কাব্য পর্যন্ত), ফুয়াদ হাসান এবং আরও কয়েকজন।
এবার আমরা সাহিত্যে আন্তর্জাতিকতার বিষয়টি, বক্ষ্যমাণ গদ্যের নির্ধারিত কলেবরে, উপলব্ধির বা পুনঃঅনুধাবনের প্রয়াস পেতে পারি। বলা বাহুল্য, সাহিত্যে আন্তর্জাতিকতা আর আন্তর্জাতিক সাহিত্য এক নয়। আর, সাহিত্যে আন্তর্জাতিকতার ধরনও একাধিক। তবে এর প্রধান তিনটি ক্ষেত্র অবশ্যউল্লেখ্য: (১) ঔপনিবেশিক বা উপনিবেশের প্রতিষ্ঠাতা দেশের সাহিত্য; (২) উপনিবেশিত দেশসমূহের উপনিবেশকালীন ও উত্তর ঔপনিবেশিক সাহিত্য এবং (৩) মানুষের মৌলিক অনুভূতি কিংবা বিশ্বমানবমণ্ডলির অভিন্ন অনুভূতির কবিতা ও কথাসাহিত্য। এই ক্ষেত্রগুলোর আলোচনা-পর্যালোচনা বুঝিবা শেষ হবার নয়। সাহিত্যে আন্তর্জাতিকতা বিষয়ে সিরিজ গদ্যই বরং অনিবার্য। এই রচনায় কেবল এর সূত্রপাতই সম্ভব।
উপর্যুক্ত প্রথম ক্ষেত্র বা ধরনে দৃষ্টিপাত মাত্রই সামনে চলে আসে টি. এস. এলিয়টের জগদ্বিখ্যাত কবিতা The Waste Land । কেননা তিনি এতে ভারতীয় দর্শন, উপনিষদ ও বৌদ্ধ দর্শন, বলা যায়, অংশত আত্তীকৃত করেন। কিন্তু এই কবিতায় কবি পুঁজিবাদ যে পণ্যে ও মানুষে কোনো ভেদ রাখে না এবং এগিয়ে রাখে শুধু যন্ত্রসভ্যতা তারই চমৎকার কাব্যিক উপস্থাপনা নিশ্চিত করেন। ধনতন্ত্রসৃষ্ট ভয়াবহ অহল্যাভূমির হেতু এবং মানুষের প্রাগ্রসরতার কোনো উপলক্ষ নির্দেশে ব্যর্থ হন। যদিও কবিতাটি শেষ হয় ÔShantih shantih shantihÕ ব’লে। এ-পর্যায়ের সাহিত্যের নমুনা যে আর নেই তা নয়। এদিকে এই ইতিহাস প্রায় সুবিদিত যে, এলিয়টের আগে, সমকালে ও পরবর্তী সময়ে ক্লাসিক ইংরেজি সাহিত্য ও রোমান্টিসিজম যথাক্রমে মধুসূদন, বিহারী লাল ও রবীন্দ্রনাথকে, যুক্তরাষ্ট্রের হুইটম্যান ও অংশত মার্কসবাদ নজরুলকে, ইংরেজি ও ফরাসী আধুনিক কাব্য তিরিশের পঞ্চকবিকে এবং মার্কসবাদ ও রুশ বিপ্লব চল্লিশের সমর সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য, অরুণ মিত্র, মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ কবিকে আমূল আন্দোলিত করে। তবে, বাংলা কবিতায় আন্তর্জাতিকতা প্রসঙ্গে বিশ্বজিৎ ঘোষও যেমন বলেন, এলিয়ট কিংবা হুগোর কবিতায় ভারতবর্ষের প্রসঙ্গ আসে বটে, কিন্তু তা কবিতা নয়, দর্শনের আশ্রয়ে। ইউরোপ-এমেরিকায়ও রবীন্দ্রনাথ কবি নয়, দার্শনিক, ঋষি এসব পরিচয়েই বরণীয় হয়ে আছেন। সেই সঙ্গে স্মরণীয় যে, তিরিশের কবিদের কবিতায় ভারতীয় পুরাণের সমান্তরালে গ্রিক পৌরাণিক অনুষঙ্গও যেভাবে অঙ্গীকৃত হয় তা প্রাগুক্ত সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে প্রশ্নাতীত উৎকর্ষে ভাস্বর। এই মার্গীয় ধারা পরবর্তী কালের কবিতায়ও কম-বেশি প্রবহমাণ থাকে। শামসুর রাহমানের কাব্য ইকারুসের আকাশ কিংবা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা অজরামর কবিতা আগামেমনন সচেতন পাঠকের স্মৃতিতে ঝিলিক দিয়ে ওঠে। একটি কবিতায় তিনি নারী-পুরুষের মিলনকে ঘড়ির কাঁটার রূপকে উপস্থাপন করেন অনেকটা এভাবে: এদিকে ঘণ্টা ও মিনিটের কাঁটা যখন এক হয়, ওদিকে, ঠিক তখন, ভিয়েতনামে বোমা পড়ে। আবুল হাসান বলেন: ‘মৃত্যু আমাকে নেবে, জাতিসংঘ আমাকে নেবে না।’ তাছাড়া শহীদ কাদরীসহ গেলো শতকের পঞ্চাশের দশক থেকে শূন্য দশক পর্যন্ত রচিত কিছু কবিতায় আন্তর্জাতিক অনুষঙ্গ বাঙময়তা লাভ করে।
তবে দ্বিতীয় ঘরানার সাহিত্যের, বিশেষত কথাসাহিত্যের, অসামান্য বিস্তৃতি অনেক বেশি চিত্তাকর্ষক। এই উত্তর ঔপনিবেশিক সাহিত্য আবার দুই প্রকার: (ক) যুদ্ধবিগ্রহের শিকার দেশান্তরিত আর (খ) স্বেচ্ছায় অভিবাসীদের সাহিত্য। এই সাহিত্যের সংক্ষিপ্ত পাঠ নেয়ার আগে আরো একটি বিষয়ের উল্লেখ অনস্বীকার্য হয়ে ওঠে। উপনিবেশের প্রবক্তা দেশগুলোর চিন্তাবিশ্ব উপনিবেশিত দেশগুলোর উপনিবেশকালীন ও উপনিবেশ-উত্তর সাহিত্য-সংস্কৃতিকে কিভাবে দেখছে সে-প্রসঙ্গ। দ্য আর্কিটাইপস্ অ্যান্ড দ্য কালেক্টিভ আনকনশাসনেস (The Archetypes and the Collective Unconscious/Series: Collected Works of C.G. Jung/Author: C.G. Jung/Imprint: Routledge) বইয়ে কার্ল জি. জাঙ যে মা ও সন্তানের সম্পর্ক মায়ের আর্কিটাইপ বা স্থিরিকৃত-রক্তবাহিত-চিরপরিচিত আদর্শ কিংবা মনস্তত্ত্ব দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় বলে জানান, মরমী চেতনাও এর অনুরূপ। তাছাড়া সমস্ত পুরাণও যৌথ অবচেতনের সম্মিলিত বিচিত্র প্রকাশ বলে জাঙ অভিহিত করেন। যৌথ অবচেতনের বিশ্লেষণে চিন্তার ইতিহাসও অন