কল্পলোকে পাঠকক্ষ
মনজুরুল ইসলাম
আকস্মিক বন্যায় তৃষ্ণার্ত নদীর হাস্যোজ্জ্বল রূপ দেখে তৃপ্তি লাভের কোনো কারণ নেই। সেই স্বল্পায়ু হাসির অভ্যন্তরে দীর্ঘ সময়ের কষ্টকে গ্রহণের যন্ত্রণা ক্রিয়াশীল। এই যন্ত্রণা নদী যেমন অনুভব করতে পারে তেমনি তার প্রকৃত রূপটি প্রত্যক্ষ করতে পারে সবাই। সময়ের পরিক্রমায় তার পুরনো হতশ্রী রূপ দেখে প্রকৃতির পাশাপাশি কষ্ট পায় সাধারণ মানুষ। একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ জীবন হতে পারে শুকিয়ে যাওয়া নদীর মতোই যদি তার শিক্ষা গ্রহণের মূল উদ্দেশ্য হয় শুধুই জীবিকা নির্বাহ। যেহেতু এমন শিক্ষার্থী ব্যক্তিজীবনে নানাবিধ সমস্যার মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হন সেই অপরিপক্ব শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে। সেই শিক্ষার মাধ্যমে জীবনকে উপলব্ধি করা হয়ে ওঠে তার জন্য সীমাহীন কষ্টের।
তাহলে কীভাবে অর্জিত শিক্ষার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী প্রাত্যহিক জীবনের সংকটগুলো মোকাবেলা করতে সক্ষম হবে? পেশাগত জীবনে সকল সুবিধা নিশ্চিতির পরেও অস্থিতিশীল জীবনকে স্থিতিশীলতায় পরিণত করতে সক্ষম হবে? অবশ্যই সেই ধরনের শিক্ষা অর্জনে ব্রতী হওয়া যা শিক্ষার্থীর হৃদয়ে সৃষ্টি করবে অনুপম সরলতা, মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবার ক্ষেত্রে জোগাবে অকৃত্রিম অনুপ্রেরণা। সন্দেহ নেই- সীমাহীন প্রচেষ্টার দ্বারা প্রকৃত শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে অন্তর্নিহিত প্রতিভার সর্বোচ্চ বিকাশ, বিবেক এবং বোধের রশ্মিগুলোকে অতিমাত্রায় উদ্বোধিত করানো সম্ভব হলে আত্মজ তৃপ্তি অর্জিত হবে। পাশাপাশি স্বাভাবিক জীবনের সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর স্থিতিশীলতার প্রভাব পড়বে অনিবার্যভাবে। এক্ষেত্রে শিক্ষা গ্রহণ যে ব্যক্তিজীবনের সংকট মোকাবেলার মাধ্যম সেটি বিশ^াস করতে হবে। এটি করতে পারলে প্রাত্যহিক এবং জাতীয় জীবনে সকল সমস্যা মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়ে উঠা সহজ হবে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানে Prevention is better than cure কথাটি বহুলভাবে প্রচলিত। এই কথাটিকে একটু ঘুরিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর প্রয়োগ করা যায় এভাবে-একটি শ্রেণি থেকে আর একটি শ্রেণিতে শুধু উত্তীর্ণ হবার জন্য সার্টিফিকেট অর্জনের চাইতে জ্ঞানার্জনের লক্ষ্যে শিক্ষা গ্রহণ শ্রেয়তর। তাহলে একটু আগেই শিক্ষা গ্রহণের যে চিরন্তন উপযোগিতার কথা বলা হয়েছে সেটি অর্জন করা সম্ভব হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু কোনো শিক্ষার্থী যদি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হয় তাহলে তার জ্ঞান অর্জনের মাপকাঠিটি কী হবে? সেক্ষেত্রে জ্ঞান আহরণের বিষয়ে শিক্ষক কর্তৃক প্রদত্ত শিক্ষা যদি সে শিক্ষার্থী আত্মস্থ করে থাকে তাহলে তার অনুত্তীর্ণ হবার প্রশ্নটিই আসবে না। অর্থাৎ শিক্ষার্থী যদি জ্ঞান আহরণের পথটিকে নিজে রুদ্ধ না করে তাহলে সে যতদূর সম্ভব জ্ঞানার্জনে সফলতা লাভ করবে। এবং যদি সেই শিক্ষার্থী এই সফলতাটুকু লাভ করতে পারে তাহলে ব্যক্তিজীবনের সংকট কাটিয়ে ওঠার ক্ষমতা অর্জনে সক্ষম হবে। পরীক্ষায় ফেল করেও জ্ঞানার্জনের ধারাবাহিকতা অর্জনের মাধ্যমে জীবনে সুখ লাভে সক্ষম হবে।
এ প্রেক্ষিতে প্রকৃত শিক্ষা অর্জনে শৈশবের দিকে ফিরতে হয়। যেহেতু একজন শিক্ষার্থী পাঠের ভুবনে বিচরণ করা শুরু করে শৈশবেই। বিদ্যালয়ে প্রবেশের পরপরই সেই প্রক্রিয়াটি শুরু হয়ে যায়। বিদ্যালয় এবং পরিবার থেকে গৃহীত শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে তার মূল্যবোধীয় গুণ অর্জিত হয়। শিক্ষার্থীদের মননে প্রকৃত শিক্ষার বীজ বপনে পিতামাতা এবং শিক্ষকবৃন্দের ভূমিকা যে অপরিহার্য- সেটিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পাশাপাশি শিক্ষা প্রত্যয়টিকে সহজবোধ্য করে তুলবার ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যকীয় মাধ্যম হিসেবে পাঠদান এবং গ্রহণ প্রক্রিয়া যে অবশ্যম্ভাবী সেটিও স্বীকৃত হয়। তাই জ্ঞান অর্জনের নিমিত্তে পাঠদান ও গ্রহণের আদর্শ ক্ষেত্র প্রস্তুত করা যে কোনো সভ্য জাতি বিনির্মাণের ক্ষেত্রে অনিবার্য শর্ত বলে বিবেচিত হয়।
নির্দিষ্টভাবে জ্ঞানার্জনের নির্ধারিত কোনো সীমা নেই। মানুষ যে কোনো পরিস্থিতিতে তার মননের জানালাটি উন্মুক্ত করবার মাধ্যমে জ্ঞানার্জনের পথ সৃষ্টি করতে পারে। এটি করার কারণে জ্ঞান নামীয় বিশাল ব্রহ্মা-টি তার দৃষ্টিসীমায় আপনা থেকেই অফুটিত পাপড়ির মতো ডানা মেলতে থাকে। মনে রাখতে হবে, “জ্ঞান” নামের ধারণাটি কোনোভাবেই উচ্চ শ্রেণির নির্দিষ্ট কোনো পরিমন্ডল থেকে আহরিত হয় না। সব শ্রেণির মানুষই তাদের নৈমিত্তিক জীবন থেকে জ্ঞান অর্জন করে থাকেন। সহজ কথায়, প্রকৃতির মাঝেই সকল জ্ঞানের অঙ্কুর অদৃশ্যমান থাকে। এই অঙ্কুরকে পল্লবায়িত করবার জন্য যদি জল সি ন করা যায় তাহলে যে পল্লবটি জন্মাবে তার শিরা-উপশিরা থেকে বিভিন্ন মাপের, বিভিন্ন চরিত্রের জ্ঞান সেই ব্যক্তিটি অর্জন করতে সক্ষম হবেন।
তবে জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে আমরা যে সর্বাধিক প্রতিষ্ঠানের ওপর গুরুত্ব দেই- সেই বিষয়ে সবাই একমত। আর ঠিক এখান থেকেই একটি ছন্দোবদ্ধ পদ্ধতির মাধ্যমেই শিক্ষার্থীরা তাদের জ্ঞানার্জনের রুদ্ধ দরজাটি উন্মুক্ত করার সুযোগটি পেয়ে থাকে। তখনই শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর মাঝে সাধারণত যে দূরত্ব দেখা দেয় সেটির অন্তর্ধান ঘটে। শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী একে অপরের কাছাকাছি আসবার একটি সেতুবন্ধ রচনার দিকে অগ্রসর হতে থাকে। উভয় পক্ষের অগ্রগামিতায় এই ধারাবাহিকতা শুধু শিক্ষার্থীকে নয় বরং শিক্ষককেও তার পাঠদানের ক্ষেত্রটিকে প্রাঞ্জল করে তুলতে অনুপ্রাণিত করে।
শ্রেণিকক্ষে পাঠদান এবং গ্রহণ প্রক্রিয়ার আদর্শগত মানের ওপরই নির্ভর করে জাতীয় শিক্ষার মান। সেই মানের উৎকর্ষ নিশ্চিতে শিক্ষকবৃন্দই সর্বোচ্চ ভূমিকা পালন করবেন এটিই স্বাভাবিক। প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে কঠিন ও দুর্বোধ্য বিষয়গুলো আনন্দের মাধ্যমে পরিবেশনের দিকে মনোযোগী থাকবেন, সময়ের দিকে গুরুত্ব প্রদান করবেন বিশেষ সচেতনতায় সেটিও প্রত্যাশিত। যেহেতু একজন শিক্ষকের ০১ মিনিটের অবহেলায় নষ্ট হতে পারে ৫০, ১০০ কিম্বা ১৫০ শিক্ষার্থীর মূল্যবান সময় সেহেতু সময় ব্যবস্থাপনার ওপর সচেতন থেকে সময়ের পূর্ণ ব্যবহারে শিক্ষক উদ্যোগী হবেন সেটিই যৌক্তিক। সময়ের প্রতি শিক্ষকের পালিত সচেতনতা শিক্ষার্থীদের মননে অবচেতনভাবে সৃষ্টি করে সময়ের মূল্যের ওপর চিরন্তন উপযোগিতা। যেহেতু শ্রেণিকক্ষ একজন শিক্ষার্থীর কাছে অত্যন্ত মূল্যবান হিসেবে বিবেচিত হয় সেহেতু শিক্ষকেরও দায় হওয়া উচিত সেই সময়ের পূর্ণ ব্যবহার করা।
এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর মনোযোগ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেখা যায়, অনেক শিক্ষার্থী দেরিতে ক্লাসে আসে, কারো মুঠোফোন অকস্মাৎ বেজে ওঠে। ফলে শিক্ষক হয়ত কোনো একটা বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করেছেন, কাক্সিক্ষত কোনো বিষয়ের খুবই কাছাকাছি চলে গেছেন, ঠিক সেই মুহূর্তে এমন পরিস্থিতির অবতারণা শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর কাছে যন্ত্রণাদায়ক হিসেবে পরিগণিত হয়। উভয়েরই মনঃসংযোগকে ব্যাহত করে চরমভাবে। মোটের উপর, ক্লাসের পরিবেশ পুরোপুরি নষ্ট হয় এমন দু’একটি পরিস্থিতির কারণে। শিক্ষকের পক্ষে হয়ত কখনোই পূর্বোক্ত বিষয়ের আলোচনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। ফলে শ্রেণী আচরণ ও শিখন ফল সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সুস্পষ্ট ধারণা প্রদান প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকের জন্য অপরিহার্য।
প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মাঝেই সীমাহীন সম্ভাবনা অর্ধপ্রস্ফুটিত পুষ্পের মতো লুকিয়ে থাকে (Cognitive Knowledge)। শিক্ষকবৃন্দের এই উপলব্ধি জাতির ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক পর্যায় থেকে যথাযথ যত্নশীল হবার মাধ্যমে যে কোনো শিক্ষার্থীকে একটি অমূল্য রত্ন হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। সেক্ষেত্রে ধর্ম, বর্ণ, উচুঁ নিচু অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা যে পরিবেশ থেকেই আসুক না কেন, শ্রেণিকক্ষে তাদের প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন অনুচিত। এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে সকল শিক্ষার্থীর চেতনার বিনির্মাণে কাজ করবেন একজন শিক্ষক এটিই মুখ্য। এতে করে শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকের মাঝে দূরত্বটি হ্রাস পাবে। পাঠদান পদ্ধতিতে আসবে প্রাঞ্জলতা।
একটি ক্লাসে দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষার্থীদের মনোনিবেশ করতে হয়। সেক্ষেত্রে ক্লাস প্রাঞ্জল না হলে পাঠ কখনই ফলপ্রসূ হয় না। ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন মিডেনডর্ফ এবং অ্যালান ক্যালিকা তাদের গবেষণার ফলাফলে দেখতে পেয়েছেন-কোনো শিক্ষার্থীর পক্ষে একটানা ১০ মিনিট মনোসংযোগ ধরে রাখা সম্ভব হয় না। ১ সেক্ষেত্রে পাঠদানের ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১৫ মিনিট অন্তর অন্তর ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করলে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখতে সক্ষম হবেন (Teacher as Facilitator)। সেক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর পঠিত বিষয়ের ওপর শিক্ষার্থীদের ভাবনা এবং জিজ্ঞাসা আহ্বানের মাধ্যমে তাদের মনোযোগের নিষ্ক্রিয় অবস্থাকে সক্রিয় অবস্থায় পরিবর্তন করতে পারবেন।
সঙ্গত কারণেই শিক্ষককে পাঠসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলি তার চিন্তাপ্রবাহে স্থান দেবার মাধ্যমেই প্রস্তুত থাকতে হবে। শিক্ষার্থীদের প্রকৃত দুর্বলতাটি চিহ্নিত করে যখন একজন শিক্ষক পাঠদানে বিরাজিত থাকবেন তখন সেই শিক্ষার্থীও নিজের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে আগ্রহী হবে। শিক্ষক তখন সহজেই উপলব্ধি করবেন-ঠিক কোন পরিস্থিতিতে পঠিত বিষয়ের বাইরে সময়ে সময়ে উপদেশাশ্রিত গল্প, বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের ইতিহাস এবং দেশ ও বহির্বিশ্বের পাঠদান সংক্রান্ত বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে। এবং অবশ্যই শিক্ষার্থীদের শখ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানবার মাধ্যমে তাদেরকে প্রতিশ্রুতিশীল হিসেবে গড়ে তুলবার ইচ্ছেটি জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হবেন (Scaffolding Teaching)। অতঃপর মূল পাঠে ফিরে গিয়ে গভীর থেকে গভীরতর আলোচনায় ব্যাপৃত থাকলেও তা শিক্ষার্থীদের কাছে হয়ে উঠবে অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক।
প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মাঝে অন্তর্নিহিত ইতিবাচক দিকগুলোকে ব্যাখ্যা করে যদি তার মধ্যে প্রবল উদ্দীপনা সৃষ্টি করা যায় তবে পেছনের সারির শিক্ষার্থী হলেও সে অবশ্যম্ভাবীভাবে প্রকৃত শিক্ষার্থী হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলবার ক্ষেত্রে আগ্রহী হবে। শিক্ষকের আকাশছোঁয়া অনুপ্রেরণা এবং অকৃত্রিম ভালোবাসা তাকে সবসময়ই শিক্ষকের বিষয়-সংশ্লিষ্ট নির্দেশাবলি পালনে মনোযোগী করে তুলবে (Teacher as Motivator)। ধরিত্রীর প্রত্যেক ব্যক্তিমানুষই নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ভেবে থাকেন, এক্ষেত্রে তিনি ক্লাসের প্রথম সারির শিক্ষার্থীই হোন অথবা পেছনের সারির। শিক্ষক যদি অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ত কথোপকথনের মাধ্যমে কাক্সিক্ষত স্বপ্নকে শিক্ষার্থীর মনোজগতে প্রবিষ্ট করাতে পারেন তবে অবশ্যই ওই ধরনের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃষ্টি হবে এক ধরনের দায়বদ্ধতা।
সেক্ষেত্রে শিক্ষার্থী যদি ব্যক্তিগত জীবনে কোনো সমস্যা বোধ করে তবে তার সমাধানে শিক্ষকের দরজা সবসময়ের জন্যই যে উন্মুক্ত-এ ধরনের একটি আত্মবিশ্বাস শিক্ষার্থীর ভেতরে আপনা আপনি জন্মলাভ করবে। তখন আক্রান্ত সমস্যাটি যেমনই হোক না কেন তার মননে সেই শিক্ষকের আদর্শ উজ্জ্বলতম হয়ে সেই সমস্যা মোকাবেলায় অগ্রগামী করে তুলবে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ ধরনের মানসিকতা সৃষ্টি করা একজন শিক্ষকের জন্য হবে অনেক বড় অর্জন। ডরষষরহমযধস মনে করেন, ‘A teacher can be considered as success, whenever his students will be able to hone their thinking skill exponentially and solve problem. 2২ কিন্তু যে কোনো ক্লাসে যদি শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না যায় তবে সেই ক্লাসটি কখনোই কার্যকরী ক্লাস বলে বিবেচিত হবে না। সম্পর্ক তো নয়ই।
পাঠদানের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রশ্ন জাগিয়ে তুলবার প্রবণতা সৃষ্টি করা বাধ্যতামূলক। সেই উত্থিত প্রশ্নের সমাধানের ক্ষেত্রে আন্তরিকতার দরজা প্রতি মুহূর্তে খোলা রাখতে হবে। এমনকি সে প্রশ্নগুলো হতে পারে জীবন সম্পর্কিত, যার সঙ্গে পাঠ্যবইয়ের কোন সম্পর্ক নেই। যদি কোনো ক্ষেত্রে কোনো বিষয়ে দোদুল্যমানতার সৃষ্টি হয় তাহলে শিক্ষার্থী পাঠ্যবই থেকে সাহায্য নিয়ে সমাধান করতে পারবে। অথবা বিষয়টি নিয়ে তার শিক্ষকের সাথে আলোচনা করতে পারবে (Teacher as Collaborator)। অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীদেরকে সহজ প্রশ্ন করবার মাধ্যমে তাদের ভেতর ইতিবাচকতা সৃষ্টি কৌশলী পদক্ষেপ হিসেবে গ্রহণীয় হবে। একইভাবে মাঝারি এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের অনুসন্ধানী প্রশ্নের (Probing question) মাধ্যমে যে কোনো বিষয়ের গভীরে প্রবেশের ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকাকে অগ্রাধিকার প্রদান করতে হবে। এক্ষেত্রে যে প্রশ্নটিকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থী বার বার উত্তর প্রদান করতে সক্ষম হচ্ছে, সেই প্রশ্নটির সঠিক উত্তর অনুসন্ধানের বিষয়টিকে সকল শিক্ষার্থীদেরকেও পরোক্ষভাবে অনুপ্রাণিত করবে -যার অর্থ দাঁড়াবে নিগূঢ় জ্ঞান অর্জনের সুযোগ লাভ।
এ প্রসঙ্গে সময়ের প্রশ্নটি একটি অনিবার্যতা। এটি শুধু শিক্ষার্থীদের জন্য নয় বরং সকল প্রাণসমৃদ্ধ বস্তুর ক্ষেত্রে। একটি নির্দিষ্ট বয়সে ‘স্ন্দুর’ এবং ‘অসুন্দর’ উভয়ই সেই শিক্ষার্থীর মননকে তার অনুকূলে নেবার জন্যে সর্বোচ্চ প্রলোভনে প্রলোভিত করবার চেষ্টা করতে থাকে। এ সময়টিতে যদি শিক্ষার্থী সুন্দরের আহ্বানকে অগ্রাহ্য করে অসুন্দরকে আহ্বান জানায় তাহলে সেই অসুন্দরের আহ্বানে সাড়া দিয়ে শিক্ষার্থীটি নিজের পরিণতিটিকে মর্মান্তিক করুণ অবস্থানে স্থাপন করবে। এখানে শিক্ষকের বিচক্ষণতা এবং দায়বদ্ধতা যদি সেই শিক্ষার্থীটিকে অসুন্দরের আহ্বানকে উপেক্ষা করে সুন্দরের বৃত্তে স্থাপিত করতে ব্যর্থ হয় তাহলে সেটি হবে সেই শিক্ষকের সর্বোচ্চ দুর্বলতা। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে শিক্ষার্থীটি আর সুন্দরের প্রতি কখনোই আকৃষ্ট হবে না, যার ফল হিসেবে দেখা যাবে শুধু সেই শিক্ষার্থীটিই নয় বরং অন্যান্য শিক্ষার্থীও তাকে অব্যাহতভাবে অনুসরণ করছে। কারণ অসুন্দরের প্রভাব যে মাত্রায় একজন তরুণের ভেতরে ভাবাবেগের সৃষ্টি করতে পারে সেদিক বিবেচনায় “সুন্দর” এত উগ্র হতে পারে না। এর অর্থটি দাঁড়াবে, ধীরে ধীরে একটি সমাজ, একটি শ্রেণি চূড়ান্ত অর্থে চরম ব্যর্থতার ঘন অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।
প্রসঙ্গত এখানে যে দুটি বিষয় উদ্ধৃতিযোগ্য তাহলো-কৈশোর এবং তারুণ্য। দুটিই একটির অপরটির বিপরীত। আরও স্পষ্ট করে বললে -কৈশোরের শেষ এবং তারুণ্যের শুরু। অর্থাৎ কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যে পদার্পণের মুহূর্তটি একটি চরম ক্রান্তিকাল। এখন এই ক্রান্তিকালটিকে একজন কিশোর অথবা তরুণ শিক্ষার্থী কীভাবে গ্রহণ করবে-সে বিষয়টিই বিবেচিত হবে মৌলিক প্রশ্ন হিসেবে। আর এখানেই ঐ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এ প্রশ্নটির যথাযথ উত্তর শিক্ষককেই প্রদান করতে হবে। যেহেতু অন্তঃসারশূন্য অসুন্দর সবসময়ের জন্যই বহিরঙ্গে চাকচিক্যময়-যা সুন্দরের ক্ষেত্রে পরিত্যাজ্য। যে কারণে স্বাভাবিক নিয়মেই উদ্ধৃত শিক্ষার্থীরা চাকচিক্যের দিকে সাময়িকভাবে হলেও প্রলোভিত হবে ঐ ক্রান্তিকালে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আর এই প্রলোভনের বৃত্ত থেকে সেই সব শিক্ষার্থীকে অসুন্দরের মোহাচ্ছন্নতা থেকে বের করে এনে সুন্দরের বেদীমূলে প্রতিষ্ঠা করবার দায়িত্বটি আপনা আপনি শিক্ষকের ওপর এসে বর্তায় ( Motivation for Transitional Crisis)।
পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অভিভাবকবৃন্দের বিষয়টিও আপনা আপনি চলে আসে। একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদেরকে শিক্ষাদান করবেন একটি নির্ধারিত শ্রেণিকক্ষের ভেতর থেকে। কিন্তু অভিভাবকবৃন্দ সেটি করতে পারবেন জীবনব্যাপী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। এ বিষয়ে শিক্ষক এবং অভিভাবকের মধ্যে সুসম্পর্কের সেতুবন্ধ রচিত হতে পারে ঐ শিক্ষার সূত্রটি ধরে-যা শুধু শিক্ষার্থীদেরকেই নয় বরং একই সঙ্গে শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থীদের জন্যে অবশ্যই একটি ত্রিমাত্রিক মঙ্গলের বার্তা নিয়ে আসবে (Co-ordinating Method)।
এ বিষয়টিকে নির্মোহ ভাবনায় স্থাপিত করলে ‘অনুষঙ্গ’-এর বিষয়টিকে বিবেচনা করতে হবে। শিক্ষাদানের প্রয়োজনে শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষার্থীদের সংখ্যা, সেই সংখ্যানুপাতে দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষকের সহজ প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা হবে অবশ্য কর্তব্য। পাশাপাশি শীত, গ্রীষ্ম এবং বর্ষায় শ্রেণিকক্ষের ভেতরে উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি না করলে শিক্ষাদান এবং শিক্ষাগ্রহণের বিষয়টিই দুর্বল হয়ে পড়বে। আনুষ্ঠানিক শিক্ষার প্রশ্নটি যেহেতু দ্বিমাত্রিক সেহেতু শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীকে একে অপরের কাছাকাছি আসবার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয় (Reciprocal Teaching)। সেহেতু একজন শিক্ষক নিঃসংকোচে একজন শিক্ষার্থীকে অনুসন্ধিৎসু (Inquisitive) হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হবেন। এটি করলে শিক্ষার্থী নিশ্চিতভাবেই বিষয়ভুক্ত শিক্ষাকার্যক্রমের বাইরেও অন্যান্য বিষয়ের ওপরে জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে পারঙ্গম হয়ে উঠবে ( Co-curricular Learning)।
এর ফলে সেই শিক্ষার্থীটিও সেই শিক্ষকের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়বে। সময়ের অনিবার্যতাকে অস্বীকার না করেই শিক্ষার্থীটি তখন নির্ধারিত বিষয়ভিত্তিক কোনো আলোচনা, বিষয়ের বাইরেও কোনো বক্তব্য প্রদান, কোনো অনুষ্ঠানে শিক্ষকবৃন্দের সারগর্ভ বক্তব্য, উপদেশাত্মক পরামর্শ শুনতে সার্বক্ষণিকভাবে উপস্থিতিকে নিশ্চিত করে তুলবে (Scaffolding Learning)। মূলত এখানেই শিক্ষার্থীটির ‘‘ধৈর্য”-এর বিষয়টি একটি বিশেষ ইতিবাচক মাত্রা হিসেবে শিক্ষার্থীটির মননে স্থায়ী আসন গড়ে তুলবে যা শিক্ষার্থীটির ভবিষ্যৎ জীবন নির্মাণের ক্ষেত্রে একটি অসামান্য উপাদান হিসেবে কাজ করবে। তবে যে কোনো পর্যায়ের শিক্ষার্থী যদি মনে করে ভালো ফল অর্জনের ক্ষেত্রে প্রকৃত জীবনবোধ গঠনের নিমিত্তে উপদেশমূলক বক্তৃতা শ্রবণ অপ্রয়োজনীয়। এবং সেই উপলব্ধিকে যদি তারা প্রথম শর্তেই বাঞ্ছনীয় মনে করে বক্তৃতা প্রদানকালীন মুঠোফোনের বাটন টিপতেই ব্যস্ত থাকে অথবা বন্ধুরা মিলে অপ্রয়োজনীয় কথোপকথনে ব্যস্ত রয়ে যায় তবে তা হবে তাদের জন্য বড় ভুল । এবং এই ভুলের নেতিবাচক প্রভাব হবে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী।
শিক্ষার্থীরা যে-কোনো বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা না পেলে কিংবা নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে দুর্বলতা অনুভব করলে শিক্ষকবৃন্দের পাশ কাটিয়ে যাবার কোনো সুযোগ নেই। বরং যতক্ষণ কোনো শিক্ষার্থীর উক্ত বিষয়ে বোঝার আগ্রহ থাকবে ততক্ষণ তিনি বোঝানোর চেষ্টাটি অব্যাহত রাখবেন। অথবা শিক্ষার্থীদের সঠিকভাবে বুঝাবার পরও যদি তারা বুঝতে না পারে, তবে কেন বুঝছে না নাকি তিনি বোঝাতে ব্যর্থ হচ্ছেন এমন চিন্তায় আবৃত থাকবেন। শিক্ষকের এমন প্রতিক্রিয়া দেখে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃষ্টি হবে শিক্ষকের প্রতি অনুপম শ্রদ্ধাবোধ। সংস্কৃতের পাঠ অপেক্ষাকৃত কঠিন মনে হওয়ায় ক্লাস ফাঁকি দিয়ে মহাত্মা গান্ধী যখন ফারসি ক্লাস শুরু করেছিলেন তখন তার স্কুল শিক্ষক কৃষ্ণশংকর ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলেন। সংস্কৃত বিষয়টি পড়ানোর জন্য গান্ধীকে শিক্ষক হয়েও অনুরোধ করেছিলেন। এবং যথাযথভাবে বোঝাতে সাধ্যের সবটুকু উৎসর্গের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। কিশোর গান্ধী লজ্জা পেয়ে পুনরায় সংস্কৃত অধ্যয়ন শুরু করেছিলেন। শিক্ষক কৃষ্ণশংকরের অকুণ্ঠ সহযোগিতায় সংস্কৃত ভাষায় পারঙ্গম হয়ে উঠেছিলেন, যা তাঁর ভবিষ্যত জীবনে অধীত বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে বিশাল প্রভাব ফেলেছিল।৩
অর্থাৎ এক প্রান্তে শিক্ষা প্রদান এবং অন্যপ্রান্তে শিক্ষা গ্রহণ। এ দু’য়ের মধ্যে সমন্বয় সাধিত হলে প্রকৃত শিক্ষা অর্জন সম্ভব (Reciprocal Learning)। লক্ষণীয় হলো, সুষ্ঠু পাঠদানের মাধ্যমে একজন শিক্ষকের আত্মবিশ্বাসের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষার্থীর মধ্যে পাঠভীতি দূরীকরণের অকৃত্রিম প্রচেষ্টা। পাশাপাশি ওই শিক্ষার্থীর ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা নিজের জীবনের সাথে জড়িয়ে নেয়া। সেক্ষেত্রে একটি বিষয়ে সবাই একমত হবেন-প্রকৃত শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি হবে তখনই যখন প্রশ্ন উত্থাপন, সমস্যা বিশ্লেষণ এবং সমাধানের অভিপ্রায়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী একই ভাবনায় মগ্ন থাকবেন,তাদের মধ্যে চিন্তার বিনিময় করবেন। এক্ষেত্রে তখনই constructivist learning environments তৈরি হবে যেখানে নতুন নতুন চিন্তার উদ্ভব ঘটবে।
এখন শ