You are currently viewing হাংরি আন্দোলনের কবি প্রদীপ চৌধুরী সম্পর্কে প্রদীপ চক্রবর্তী || মলয় রায়চৌধুরী

হাংরি আন্দোলনের কবি প্রদীপ চৌধুরী সম্পর্কে প্রদীপ চক্রবর্তী || মলয় রায়চৌধুরী

হাংরি আন্দোলনের কবি প্রদীপ চৌধুরী সম্পর্কে প্রদীপ চক্রবর্তী

মলয় রায়চৌধুরী

এই গদ্য’র আজকের আলোচ্য মানুষটা হলেন , সদ্য প্রয়াত বিশিষ্ট কবি প্রদীপ চৌধুরী | হাংরি জেনারেশনের অন্যতম স্রষ্টা ও বিকল্প সাহিত্যের প্রবক্তা হলেন কবি প্রদীপ চৌধুরী | আমি কোনও পন্ডিত নই | এই লেখাগুলো আসলে , একজন রক্তমাংসের মানুষের ভেতরে প্রবেশ করে তাকে অনুভবের প্রয়াস | তার নৈঃশব্দ , আর্তি , যুগযন্ত্রণা , আকুল ব্যথিত সত্তার প্রেম ও মুক্তির পিপাসা যারা অন্বেষণ করেন , হয়তো তাদের জন্যই এই লেখা | বাংলার এলিট কবিতা জগতে ব্রাত্য , অথচ আবহমান বাংলা কবিতা ধারায় যে দাপুটে সম্রাটের আবির্ভাব ঘটেছিলো তিনিই প্রদীপ চৌধুরী | সম্রাট না হলে , মৃত্যুও তাকে পৃথক করতো না অন্য কবিদের চেয়ে | করোনা তাকে কেড়ে নিয়ে ধাপার মাঠে যে গণ চিতার আয়োজনে পুড়িয়ে দিয়েছিলো নিঃশব্দে , সেখানে কোনও কবি , কোনও প্রিয়জন ছিলো না | ছিলো মাথার ওপর উদার অনন্ত আকাশ , হয়তো নাগরিক সভ্যতার দূষণে সে আকাশ ঘোলাটে ছিল , কিন্তু আকাশ তো মহাশূন্য | তাকে কাঁটাতারে বাঁধবে কোন দেশ , কোন একবিংশ শতকের সভ্যতা !

লেখাটির নাম দিয়েছি ,

“প্রদীপ দা — ওরফে Nemo — or Mr No one বা কবি প্রদীপ চৌধুরী “

………………………………………………………………………………………

এক .

” এই জীবন লইয়া কী করিবো ? ” বঙ্কিমচন্দ্রের এই প্রশ্ন চেতনাসম্পন্ন যেকোনো মানুষের | এই চেতনা ব্যাপারটা গোলমেলে | জীবনের যে যে ডিগ্রির মধ্যে দিয়ে মানুষ জীবিকার সন্ধান পান , সেই শিক্ষার সঙ্গে জীবিকাজনিত সফলতা থাকতে পারে নাও পারে , কিন্তু চেতনার কোনও আদৌ সম্পর্ক আছে কিনা তা নিয়ে দৃঢ় সংশয় ছিল কবি প্রদীপ চৌধুরীর | যাপনে কবিকে খুঁজে দেখো না , এই আপ্ত বাক্যে ঘোর অবিশ্বাস ছিল তাঁর | কারণ প্রদীপ চৌধুরী কোনোদিনও কোনও জেনারেশন বা দলীয় অভিধায় বিশ্বাসী ছিলেন না | তিরিশ দশকের পরে অনেক সমালোচক , কবিদের দশক দিয়ে বা গোষ্ঠী দিয়ে চেনার চেষ্টা করে গেছেন | প্রদীপ চৌধুরী এর ঘোর বিরোধী ছিলেন | পাঠকের আশ্চর্য লাগতে পারে এজন্যই যে প্রদীপ চৌধুরীকে আমরা হাংরি আন্দোলনের একজন নেতৃ স্থানীয় হিসেবে চিহ্নিত করি | কিন্তু বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত ” হাংরির ” বুলেটিনগুলো অনেকেই নিজের মতো করে লিখতেন | শৈলেশ্বর ঘোষ , সুভাষ ঘোষ ,অরুণ বণিক , রত্নময় দে , দেবী রায়চৌধুরী , সাধন সাহা ,সুবো আচার্য , অবনী ধর , মলয় রায়চৌধুরী বা প্রদীপ চৌধুরী তাঁদের স্বকীয় ভাবনা ও দৃষ্টিকোন থেকে এসব লিখেছেন | এমনকি ” হাংরি আন্দোলন , সামার ম্যানিফেস্টো – ১৯৭০ ” এই শিরোনামে প্রদীপ চৌধুরী যে দীর্ঘ গদ্যটি লিখেছিলেন তা পড়ে এবং পরবর্তীকালে এ নিয়ে তাঁর সঙ্গে বিষদ আলোচনা করে যেটুকু বুঝেছি , তা হলো , তিনি বিশ্বাস করতেন না গোষ্ঠীগত বা দলগত ভাবে কবিতা লেখা যায় | কবির প্রতিমুহূর্তে বদলে যাওয়া অভিজ্ঞতার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের সমস্ত ধ্বংস পাপ পুনর্নির্মাণ সাদা কালো বহুরৈখিক দিক যা তাঁর আত্মার ক্রম ও বিকাশ , সেই স্ফূর্ত সমগ্রতা থেকে যাবতীয় শিক্ষা ও সংস্কারমুক্ত ভাবনার লিখিত নির্মাণ হলো ভাষা | কবি টু কবি তাঁর সেই ভাবনার ভাষা সৃষ্টি করতে পারে | তাঁর সেই তীব্র ধ্বনিসংকেত ও ভাষার কোনও শব্দ আরোপিত নয় | যা কবির হাতে আন্তর্জাতিক কোড ল্যাঙ্গুয়েজের মতো | যে ভাষা ব্যাকরণবিদ বা ভাষাতাত্বিকের নয় | যা অচলায়তনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা থেকে আলাদা | একমাত্র কবি’ ই তাঁর কবিতার জন্য যে ভাষার আশ্রয় নেন তা কোনও সাহিত্যের ইতিহাসের ভাষা নয় | প্রতিমুহূর্তের ভগ্নাংশে যেহেতু বদলে বদলে যায় মানুষের অভিজ্ঞতা | তাই পূর্বে নির্মিত কবিতা থেকেও নতুন লেখা কবিতায় কবির পরিবর্তন অবসম্ভাবী | এর জন্য জেমস জয়েসের শব্দ তাঁর লেখা আস্বাদনের অন্তরায় বলে মনে করতেন | অনেক পরিশ্রম করে ulysses উপভোগ্য হয়ে উঠলেও তিনি মনে করতেন , জয়েস নয় , ডি ۔ এইচ ۔লরেন্স তাঁর লেখকসত্তার অনেক কাছের | এরফলে সাহিত্য হিসেবে তাঁর সমকালীন বন্ধুদের লেখাকে শ্রদ্ধা করতেন কিন্তু তা কেবল হাংরি আন্দোলনের ফলশ্রুতি বলে মনে করতেন না |

দুই .

আসলে ব্যক্তি প্রদীপ চৌধুরী ও কবি প্রদীপ চৌধুরী কোনও আলাদা ব্যক্তি ছিলেন না | তাঁর যাপন ও কবিতা সমার্থক | আমার সঙ্গে কবি প্রদীপ চৌধুরীর আলাপ নয় – দশ বছরের | তাঁর জীবনের শেষের দিকে তিনি আমার ও কবি সব্যসাচী হাজরার খুব কাছের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন | বলিষ্ঠ , মৃদুভাষী , রসিক ও বন্ধুবৎসল এই মানুষটির সঙ্গে বেশ কিছু স্মরণীয় মুহূর্ত কাটাতে গিয়ে বুঝেছি , দুঃসাহসিক এক অভিযাত্রীর মতো তিনি ছিলেন বাহ্য পাওয়া না পাওয়ার অনেক উপরে | জীবনকে প্রতি মুহূর্তে নিজের শর্তে উপভোগ করাই ছিল তাঁর জীবনদর্শন | আন্তর্জাতিক এক মনন ও মেধা নিয়ে বিশ্বের অনেক জায়গায় ভ্রমণ , তাঁকে বহুস্তরীয় দৃষ্টিকোণ তৈরী করতে সাহায্য করেছিল | প্রিয় দেশ ছিল ফ্রান্স | ফরাসিদের নিজের ভাষায় রবীন্দ্রনাথ পড়াতে তিনি বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন | অনেক কটা ভাষার মধ্যে ফরাসি ভাষাও তিনি অনর্গল বলতে ও লিখতে পারতেন | নিজের ও অন্য প্রিয় কবিদের লেখা তিনি যেমন ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করেছেন , ঠিক তেমনি , ফরাসি ভাষা থেকে বহু মূল্যবান লেখা অনুবাদ করেছিলেন বাংলায় ও ইংরেজিতে | সভ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক মানুষের ভয় যে তাঁদের কাজের প্রধান অন্তরায় , মনে করতেন তিনি | কবিতা অমোঘ একথা জানার পরও তার প্রতি মানুষের যে ভীতি , আসলে তা এক বহু – ব্যবহৃত , অনেকাংশে ব্যর্থ জীবন পদ্ধতি ছেড়ে আরেক জীবনে যাবার ভয় বলে মনে করতেন তিনি | একজন খুনী পরিশুদ্ধ হবার আগে জীবনকে যতটা ভয় করে , আজন্ম লোভী , আচ্ছন্ন মানুষও নিজের কাছে নিজের স্বরূপ পরিষ্কার না হওয়া অব্দি কবিতাকে ততটা ভয় করে | খুনীর পরিশুদ্ধি ও মানুষের আত্মস্বরূপ ফুটে ওঠে দীর্ঘ যন্ত্রণাভোগ ও অনুতাপের সাদা আগুনে — আধুনিক ও পৃথিবীতে সাধারণত অবসাদ , অপারগতা , ম্যালএডজাস্টমেন্ট , যৌন – অবসেশন , দারিদ্র – ভোগ ও দুঃখের আকারে আমাদের আত্মাকে পরিষ্কার করে দিয়ে যায় |

সব পেয়েও যাঁদের প্রকৃতপক্ষে নিজের কিছুই নয় , ‘ সর্বহারা ‘ মানুষের চূড়ান্ত আশ্রয়স্থল কবিতা | কবিতাই আদিম ও আধুনিক মানুষের যাবতীয় জিজ্ঞাসা এবং অন্তর্ঘাতের , শিক্ষিত ও ভুল শিক্ষিত মানুষের চেতনা ও অবচেতনার যাবতীয় সংঘাতলুপ্তির একমাত্র উপায় | কবিতা ‘ আল্টিমেট সিন্থেসিস ‘ |

এই প্রত্যয় ও বিশ্বাসের নাম কবি প্রদীপ চৌধুরী | তাঁর লেখা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে থাকলেও তিনি মাছি ওড়ানোর ভঙ্গিমায় তাকে উপেক্ষা করতেন | কোনও সদন , মঞ্চ , পুরস্কার কমিটি বা একাডেমির শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্বদের নজরে আসার জন্য তাঁর কোনও প্রয়াস ছিল না | কোনও কবিতা পাঠের আসরে তিনি প্রায় যেতেন না | কোনও বুধচক্র বা প্রথিতযশা কবির রবিবারের আড্ডায় তাকে দেখা যেত না | এক পরাক্রমী বালকের কৌতুক ও ক্রীড়া নিয়ে তিনি খেলে যেতেন জীবনের সঙ্গে | বিশ্বাস করতেন , জীবনই জীবনের একমাত্র আদর্শ — স্বাধীনতাই কবিতা | প্রথম কবিতার বই ” অন্যান্য তৎপরতা ও আমি ” থেকে শুরু করে , চর্মরোগ , কবিতা ধর্ম , ৬৪ ভূতের খেয়া , বা শেষ স্বপ্রকাশিত কবিতা সংগ্রহ ” মত্ততা ও তারপর ” ۔۔۔ পর্যন্ত সমস্ত গ্রন্থে এই অটুট এক পরাক্রমী জীবনপর্যটককে আমরা পাই | যিনি সুস্পষ্ট ভাবে কলার উঁচিয়ে বলতে পারতেন , তাঁর ত্রিভাষায় প্রকাশিত ও সম্পাদিত পত্রিকা ‘ ফু: ‘ নামটির সার্থকতা যা তাঁর জীবনধর্ম , সেই ফু: দিয়ে ۔۔۔۔” পৃথিবীতে দেবার মতো কোন বাণী বা ম্যাসেজ , কোন লেখকেরই নেই — যীশু – বুদ্ধ – রামকৃষ্ণ , কোন মহাপুরুষই পৃথিবীর ত্রাণকর্তা নন | ‘ ত্রাণ ‘ জিনিসটাই অসম্ভব | ত্রাণ সৃষ্টিবিরোধী | পৃথিবীর কনসেপ্টের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ — এবং মৃতদেহ ছাড়া এর স্বরূপ কারুর কাছেই পরিষ্কার নয় |

…. আমাদের সমগ্র বর্তমান বদলে গেছে , আমাদের ভবিষ্যৎ ওই একই রকম রয়ে গেছে , এক শূন্য গোঙানির দিকে আমাদের সৃষ্টি কল্পনা ঝুঁকে আছে | এই মুহূর্তের যাবতীয় ঘটনা আমাদের চোখের সামনে একই সঙ্গে জেগে উঠে এবং মুছে যায় — এই অপ্রমাণিত ভালোবাসার সূত্রেই আমরা সারা জীবন সবকিছুর সঙ্গে ঝুলে থাকি | আমাদের অস্থিরতা , আমাদের ধ্বংস , আমাদের বিশ্বাস , আমাদের উদাসীনতা — এ সবকিছুর ভেতর দিয়েই আমরা পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি | কোন বিচার বা বিশ্লেষণ নেই অথবা কোন স্থূল আশাবাদ — কোন নৈরাশ্য নেই — এই মুহূর্তের যাবতীয় মুখ ও মুখোশ , আমাদের ঘিরে রেখেছে যা — মনে হয় যেন এই তরল ঘটনাপ্রবাহকে অনুসরণ করাই একজন শিল্পীর কাজ , তাদের নিহিত অবয়ব , তাদের আগমন ও মুছে যাবার আলোছায়া — সময়ের এই নামহীন যাত্রাকে লক্ষ্য করে যাওয়া শুধু …”

” কিছুক্ষণ ভৌতিক নেশার মধ্যে শরীরের

জল জমে যাচ্ছে , দেখ তোর চুরমার পৃথিবী

কিভাবে সেঁধিয়ে যাচ্ছে ,

সাতটা পাইপের মুখ একসঙ্গে ফাটে , তার ধোঁয়ার ঘ্রাণ

সর্বশেষ বোমারুকে

‘ টিট ‘ দিচ্ছে , ঠোঁট ও পাঁপড়িগুলো ধারালো দাঁত বের করে

হেসে খুন হয় ডা: সুজুকি , বুদ্ধ , মলয় ও শৈলেশের কবরের পাশে

আমার

এই কবিতা পড়া হলে মৃত গণিকার পাশে পড়া হলে আমার এই

নেশা —- ZEN

( ডা: সুজুকি , বুদ্ধ , মলয় ও শৈলেশের কবরের পাশে / ৬৪ ভূতের খেয়া )

তিন .

বসে ছিলাম কলকাতা শহরের বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় একটি রেস্তোরাঁয় |

Oak smith gold নামক প্রিয় পানীয় কয়েক পেগ আত্মস্থ করার পর হঠাৎ দেখি প্রদীপ দা এসে উপস্থিত |

” আরে প্রদীপ দা , মাঝখানে অনেকদিন আপনার সঙ্গে দেখা হয় নি | এই গড়িয়াহাটের ব্রিজের নীচে কতদিন আমি সব্যসাচী আর প্রদীপ দা মন খুলে আড্ডা দিয়েছি | গোলপার্ক , বেঙ্গল ল্যাম্প , রবীন্দ্র সদন , দুর্গাপুরে টেগর হাউসের রুমে কত কত বার আমরা আড্ডা দিয়েছি | মনে পরে প্রথমবার রবীন্দ্রসদনে একটি স্পার্ক লাইটার হাতে তুলে দিয়েছিলেন আমার | সেই বিদ্যুত্স্পৃশ্য হয়ে চমকে ওঠার মুহূর্তে তাঁর কী ছেলেমানুষের মতো হাসি | বলেছিলেন , দীক্ষিত হলে তুমি | একবার গড়িয়াহাটের কাছাকাছি ” ইন্ডথ্যালিয়াতে ” গিয়ে জুস আর কফির অর্ডার দিতে গিয়ে রেস্তোরাঁর কাউন্টারে সিগ্রেট ধরানো নিয়ে সেখানকার এক কর্মচারীর সঙ্গে সে কী বচসা ! মনে পড়লে হাসি পেয়ে যায় | একবার তো টেগোর হাউসে , আমরা আড্ডা দিচ্ছিলাম | ঘরে ছিলেন কবি রঞ্জিত সিংহ , সুধীর দত্ত , অনিন্দ্য রায় , সব্যসাচী হাজরা ও আমি | হঠাৎ প্রদীপ দা , তাঁর ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বন্ধ দরজা খুলে ঢুকে বলে উঠলেন একটা নতুন কবিতা লিখেছি শোনো | বুকের বোতাম খোলা শার্ট | অন্যমনস্ক প্রদীপ চৌধুরী কে কী করছে বলছে , সেসব পরোয়া না করে , দরাজ কণ্ঠে তাঁর কবিতা গড়গড় করে পড়ে সটান উঠে চলে গেলেন , যেভাবে ঝোড়ো হাওয়ার মতো ঢুকে এসেছিলেন , সেভাবেই | কার কী প্রতিক্রিয়া সে নিয়ে কোনোদিনও মাথা ঘামানো তাঁর স্বভাব বিরুদ্ধ | অতএব এই রাজকীয় দাপট আমাদের , বিশেষ করে আমার খুবই জানা | তাই আজ এই রেস্তোরাঁতে হঠাৎ দেখে আমার নতুন কোনও ভাবান্তর হলো না |

” আরে প্রদীপ তুমি ! এসে বুকে জড়িয়ে ধরে একটি দীর্ঘ চুমু গালে দিয়ে বলে উঠলেন , তুমি নাকি আমার লেখালেখি নিয়ে কিছু লিখছো “?

হ্যাঁ প্রদীপ দা … | বলে আমি এই গদ্যটা পড়তে শুরু করলাম আমার স্মার্ট ফোন থেকে | ওপরের অংশগুলো শোনার পর , মৃদু হেসে বললেন , ” শুরু করেছো ঠিকঠাক , কিন্তু এভাবে প্রবন্ধে আমার সম্পর্কে কিছু বলা যায় ? আমি কী কেতাসর্বস্ব টুলো পন্ডিতের বিষয় ? “

সে ঠিক | আমি বললাম | তাহলে চলুন আপনার সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে লেখাটা চলুক |

আচ্ছা প্রদীপ দা , Lawrence Ferlinghetti আপনার কবিতা পড়ে লিখেছিলেন , ” Pradip choudhuri’ s poetry proves that poetry is the desiring machine of all our dreams , the hungry beast that still devours us all “

আমি জানতে চাই , আজ যদি পেছনদিকে তাকান তাহলে আপনার লেখালিখি নিয়ে কী বলবেন ?

প্রদীপ চৌধুরী — ‘ নতুন করে কী বলার আছে | আমার চিন্তন প্রথম থেকেই আমার কাছে স্পষ্ট , স্বচ্ছ | আমার লেখালিখিতে , আমার কবিতায় , প্রচুর আত্মজৈবনিক উপাদান রয়েছে | কিন্তু কী এই আত্মজীবনী যার একমাত্র কেন্দ্রীয় চরিত্র আমি নিজে , আমি বহু বছর ধরে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করেছি | ফলশ্রুতি ‘ কবিতাধর্ম ‘ — আমি ‘র একটি অসম্ভব সংজ্ঞা দিয়ে যার শুরু : ‘ আমি কোনও জেনারেশন নই – আধুনিক পৃথিবী এবং পৃথিবীর যাবতীয় জেনারেশন – প্রকৃতপক্ষে অধঃপতিত নষ্ট সর্বহারা ভীরু উন্মাদ নির্বাক চোর অন্ধ সন্ন্যাসী কমরেড অভিযাত্রী নষ্টদেহ গলিত অন্তঃকরণহীন যক্ষ্মাক্রান্ত শুধুই – লাশ , স্থাবর অস্থাবর প্রাণিজগতের সকলের শিরা – উপশিরার চেতন – অচেতন অবসেসড আত্মার এক অলৌকিক সামগ্রিকতার আমি এক খুবই ছোট অথবা অতিশয় বিশাল প্রতিবিম্ব মাত্র |’

দেনিস এমোরিণকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি যা বলেছিলেন হুবহু তাই আমাকে বললেন দেখলাম |

যাই হোক ততক্ষণ প্রদীপ দা oak smith gold নামক উৎকৃষ্ট পানীয় শেষ করেছেন এক পাত্র |

আমি — আরেকটা অর্ডার দিই ?

প্রদীপ – দাও |

আবার নতুন করে পানীয় এসে যায় এবং আমার পরের

প্রশ্নগুলো ….

আমি — আচ্ছা শান্তিনিকেতন পর্বে আপনাকে কবিতা লেখার জন্য রাস্টিকেট করা হয়

প্রদীপ —- মৃদু হেসে , হ্যাঁ হ্যাঁ | আসলে কিছু ট্যাবু তো থেকেই যায় | কিছু নিয়মসর্বস্ব প্রথা | আমি তার মূলে আঘাত দিতে চেয়েছিলাম | আসলে কোনও ব্যাপারেই কোনও শান্তি পাচ্ছিলাম না | একমাত্র ওই লেখালিখি | নারকীয় সব ভোগ্যপণ্য হাজার এক বাসনা তাড়িত কায়েমী মধ্যবিত্ত সমাজের ” সফল ” নট নটীদের এই ছেদহীন আগমন , নির্গমন , এই লালা জড়িত স্রোতে , এই স্টুপিড মানুষী কামনা – প্রবাহে জীবনের মৌলিক গুণ গুলি হারিয়ে যায় , অর্থলিপ্সা , খাদ্যলিপ্সা , ক্ষমতালিপ্সা প্রায়শই গিলে খায় বন্ধুতা , যৌনতার বেদীমূলে অপ্রতিরোধ্যভাবে ভালোবাসার আহুতি ঘটে – এমনকি রোমোদ্গমের আগেই | কবিদের জাগ্রত চেতনার কাছে পৃথিবীর এই অদ্ভুত পদ্ধতি , এটা কি সত্যি এক চূড়ান্ত হতাশা নয় ?

( প্রদীপ দা যেন প্রশ্নটা আমাকেই ছুঁড়ে দিলেন এমন তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে | আজ অন্যদিনের চেয়ে প্রদীপ দা র চোখদুটো আরও বেশি জ্বলজ্বল করছে | যেন রয়েল বেঙ্গল টাইগার ! )

কিছুক্ষণ থেমে ….

সেই সত্যের চাবুক নিয়ে চলতে গিয়েই শেষে ওখান থেকে ۔۔۔۔

আমি — প্রশ্নগুলো গুছিয়ে করতে পারবো না , নানারকম ভাবে কিছু কৌতূহল | আচ্ছা প্রদীপ দা , মলয় রায়চৌধুরী সম্পর্কে আপনার মতামত …

প্রদীপ দা — আমাদের হাংরি জেনারেশনের উত্তম কুমার | ( প্রদীপ দা র মুখে কৌতুকের হাসি ) আমাদের শৈলেশ্বর ঘোষ তো একটা সাক্ষাৎকারে বলেইছে , আমি নাকি মলয়কে ” ড্রইংরুমের বিপ্লবী ” বলেছিলাম | হা হা হা হা হা ….

আমি — বলেন নি ?

প্রদীপ — ছেড়ে দাও ওসবকথা | কতজন মলয়ের ইংরেজি ইস্তেহার নিয়ে কত কী ই তো বলেছে | ‘ পিজিন ‘ ইংরেজি | জ্যোতির্ময় দত্ত বলেছিলো বাংরিজী সাহিত্যে ক্ষুধিত বংশ | কবি জর্জ ডাউডেন , আমি যাকে kaviraj George Dowden বলি , বলেছে মলয়ের ইংরেজী Gibberish অর্থাৎ meaningless full high sound words | আমি তো ১৯৬৮ র ফু: পত্রিকার সম্পাদকীয়তে বলেছিলাম , ১৯৬৪ সালের পুলিশী আক্রমণের ফলে দুটি জিনিস খুবই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিলো , এক . শিল্পের নখ বড়ো হলে তা সভ্যতা এবং মানুষের নির্মিত আইন – আদালতকেও ছেড়ে দেয় না | দুই . প্রকৃত লেখালিখি ও এস্টাব্লিশমেন্ট সামলানো একসঙ্গে সম্ভব নয় | … হাংরি জেনারেশনের তকমা আঁটা সেই সব নিরীহ ভদ্রলোকের ছেলেরা বিপদের ঝুঁকি দেখে কেটে পড়েছে একে একে – ভীড় কমে গেছে – এমনকি মলয় রায়চৌধুরী অব্দি টিকতে পারলো না — তার গোটা এস্টাব্লিশমেন্ট হুড়মুড় করে ভেঙে পড়লো ( তা না হলে আমাদের সকলের নাম ভাঙ্গিয়ে অতিরিক্ত সহনাভূতি ও বিদেশী মুদ্রা আদায়ের প্রাণপণ চেষ্টা সে কেন করেছে ? এ দুটোই এস্টাব্লিশমেন্টের টোপ একথা জানাজানি হবার পরেও )

যাই হোক প্রদীপ , ওসব নিয়ে আর কথা বলতে ভালো লাগে না | ওসব থেকে অনেক অনেক দূরে চলে গেছি আমি …|

আমি — — তাহলে বলতে চান ( আমাকে থামিয়ে দিয়ে প্রদীপ দা )

প্রদীপ —শোনো শোনো আসলে শেষ পর্যন্ত নিজের লেখার কাছে সৎ দায়বদ্ধ থাকাই শেষ কথা | আমি লিখে চলেছি আমার কবিতা , যা ভালোবাসার কবিতা | কিন্তু সে কবিতা বিকল্প পথের সন্ধানী | আমি যেমন প্রকাশকদের কাছে অপ্রিয় তারাও আমার কাছে

তাই !

আমি — সারাজীবন দুটো পত্রিকা একটি স্বকাল , অন্যটি ফু: | দ্বিতীয়টি আবার তিনটে ভাষার | বাংলা , ইংরেজী , ফরাসি | এরম ত্রিভাষার কোনও পত্রিকা ভূভারতে বেরিয়েছে কিনা ,_আমি জানি না | সঙ্গে এতো গুলো বই এবং আপনার ( ১৯৬৪ থেকে ২০০৮, পর্যন্ত ) প্রকাশিত নির্বাচিত কবিতার বই ” মত্ততা ও তারপর ” | আমি যতদূর জানি এই ব্যায়ভার সম্পূর্ণ আপনার | অথচ কত কত প্রকাশনী এখন | বিকল্প , প্রথাময় , আবহমান , সবদিকের লেখালিখি নিয়ে কত প্রকাশক কত বই করছে অথচ আপনি ۔۔۔

প্রদীপ — ( মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে ) ধুর ধুর ওসব নিয়ে আমি ভাবি না | শোনো তাহলে , ফ্রান্সের সবচে বড়ো প্রকাশনী ওদের দেশের ডলারের মূল্যে আমার সমস্ত বই নিয়ে সমগ্র করার প্রস্তাব পাঠিয়েছিল | এবং যে অর্থমূল্য দেবে বলেছে তা চক্ষু চড়কগাছ করে দেবে এখানকার অনেক প্রতিষ্ঠিত লেখকের | ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় লাখ চল্লিশ – পঞ্চাশের মতো | কিন্তু আমিও সেরকম দেড়েল | ওদের বলেছি , ওদের যদি প্রয়োজন হয় , আমার যাদবপুরের ফ্ল্যাটে এসে কন্টাক্ট ফর্ম সই করিয়ে যাক , যদি চুক্তি আমার মনের মতো হয় | হ্যাঁ , ফ্রান্সে আমার অনেক শুভানুধ্যায়ী | সারা পৃথিবীতে নানান ভাষায় আমার লেখা অনূদিত | ফরাসি দেশে আমার লেখালিখি নিয়ে ওদের প্রচন্ড উৎসাহ | আমার লেখালিখি নি