You are currently viewing ‘গ্রাম পাঠাগার আন্দোলন সবার সাথে সবাইকে সংযুক্ত করে গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাবে’- খান মাহবুব

‘গ্রাম পাঠাগার আন্দোলন সবার সাথে সবাইকে সংযুক্ত করে গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাবে’- খান মাহবুব

‘গ্রাম পাঠাগার আন্দোলন সবার সাথে সবাইকে সংযুক্ত করে গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাবে’– খান মাহবুব।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের রক্তঝরা সময়ে ৩ মে নানাবাড়ি টাঙ্গাইলের করাতিপাড়ায় প্রাবন্ধিক, গবেষক এবং শিক্ষক খান মাহবুবের জন্ম। স্বাধীনচেতা ও অনুসন্ধিৎসু মনের অধিকারী খান মাহবুব কিশোর বয়স থেকেই টাঙ্গাইলের সংস্কৃতি অঙ্গনের পরিচিত মুখ। বিতর্ক, কবিতা, বক্তৃতায় রয়েছে অসংখ্য পুরস্কারের স্বীকৃতি। তিনি টাঙ্গাইল শহরের সরকারি বিন্দুবাসিনী স্কুল থেকে এসএসসি ও সরকারি এম এম আলী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৯২ সালে কলেজ পর্যায়ে বিতর্কে অর্জন করেছেন জাতীয় পুরস্কার। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে অর্থনীতির প্রতিবেদন ও ফিচার লিখে জাতীয় পত্রিকায় পরিচিত অর্জন করেন। নিজেকে যুক্ত করেন বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিতর্ক প্রতিযোগিতার একজন সংগঠক হিসেবে। তিনি ১৯৯৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনায় মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে নিজ উদ্যোগে গড়ে তু্লেছেন পলল প্রকাশনী ও ছোঁয়া এ্যাড. নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। 

খান মাহবুব দেশের প্রকাশনা শিল্পের একজন সুপরিচিত ব্যক্তি। বহুমাত্রিক লেখালেখি থাকলেও তিনি প্রকাশনা ও আঞ্চলিক ইতিহাস বিষয়ক লেখালেখিতে অধিক আগ্রহী। এসময়ের অর্থনীতি খান মাহবুবের প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ। এ ছাড়া তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে একাধিক গ্রন্থ। রচিত গ্রন্থ- বইমেলা ও বই সংস্কৃতি, বই, বইমেলা ও প্রকাশনার কথকতা, গ্রন্থচিন্তন, টাঙ্গাইল জেলা পরিচিতি, টাঙ্গাইলের অজানা ইতিহাস, আটিয়ার ইতিহাস, জানা-অজানা মালয়েশিয়া, পথে দেখা বাংলাদেশরোহিঙ্গানামা ইত্যাদি পাঠক মহলে সমাদৃত। 

প্রকাশনা জগতে তিনি একজন নেতৃস্থানীয় সংগঠক। বই, বই প্রকাশনা ও বইমেলা সংক্রান্ত জাতীয় আয়োজনের বিভিন্ন দায়িত্বে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে খান মাহবুবের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন স্টাডিজ বিভাগ চালুর ক্ষেত্রে ছিল তাঁর বিশেষ ভূমিকা। বর্তমানে বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। লেখকদের সংগঠন লেখক সম্প্রীতির মহাসচিব তিনি। ২০০৮ সালে তিনি বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি পরিচালিত সাংস্কৃতিক সমীক্ষার টাঙ্গাইল জেলার গবেষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সমীক্ষামালার প্রবাদ-প্রবচন গ্রন্থে রয়েছে খান মাহবুবের সংগৃহীত টাঙ্গাইল জেলার প্রবাদমালা। সম্প্রতি খান মাহবুবের উদ্যোগে প্রকাশিত হয়েছে টাঙ্গাইল জেলার স্থাননাম বিচিত্রা। শিল্পমনা খান মাহবুব বাংলা একাডেমি, ইতিহাস পরিষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েটসহ অনেক প্রতিষ্ঠানের সদস্য। 

সম্প্রতি পাঠাগার আন্দোলন, বই ও প্রকাশনার নানা বিষয় নিয়ে সাহিত্য সমালোচক ও প্রাবন্ধিক লাবণী মণ্ডলের সঙ্গে কথোপকথনে নিজের মতামত তুলে ধরেছেন খান মাহবুব। নিচে সে কথোপকথনের প্রকাশ করা হলো- 

লাবণী মণ্ডল : পাঠাগার শব্দটিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

খান মাহবুব : শাব্দিক অর্থ তো এর ভেতরেই নিহিত। পাঠের আগার হচ্ছে পাঠাগার। যেখানে পাঠের ব্যবস্থা থাকে। আমরা যেটিকে লাইব্রেরি বলি, পাঠাগারের ইংরেজি প্রতিশব্দ। পাঠাগারের রকমফেরও আছে। এখনো পাঠাগারের যে সংস্কৃতি আছে, সেটি হচ্ছে- পাঠাগারে একটা বিশাল বইয়ের সমারোহ থাকে। তবে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে এ ধারা বদলে যাচ্ছে। এখন আর এত টাকা, এত জায়গাজুড়ে পাঠাগার হবে না। এখন পাঠাগার হবে অনেকটা এমন- লক্ষ লক্ষ বইয়ের দরকার নেই। বইগুলো আসলে ডিভাইসে চলে আসবে। দুইজন লোক থাকবে, তারা ডিভাইস নিয়ে বসে থাকেবে- সার্ভারে কানেক্ট করে দিবে আপনাকে। সেখান থেকে সব বই পড়ার সুযোগ থাকবে। যা-ই হোক, এখনো গতানুগতিক ধারার পাঠাগার থাকছে। তবে এসব পাঠাগারের গতানুগতিক ক্যাটালগ ও ইনডেক্সিং সিস্টেম কিন্তু উঠে গেছে বলা যায়। 

লাবণী মণ্ডল : আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে পাঠাগারের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু এবং সৃজনশীল মানুষ গঠনে পাঠাগারের ভূমিকা কতটুকু?

খান মাহবুব : যে কোনো জাতিরাষ্ট্র বিনির্মাণে পাঠাগার খুব দরকার। মানুষের দুই ধরনের ডেভলপমেন্ট আছে- একটি ভিজিবল, আরেকটা ইনভিজিবল, যেটাকে আমরা বেশি গুরত্ব দেয় না। যেমন- এই যে মানুষের মনোজাগতিক যেসব বিষয় আছে- মনের গঠন, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ইত্যাদি। মানুষের সঙ্গে মানুষের পার্থক্যটা হয় তাঁর আচরণ, রুচির মধ্য দিয়ে। সংস্কৃতির মধ্য দিয়েই মানুষকে অন্যদের থেকে আলাদা করা যায়। এর জন্য কিন্তু পাঠাগারটা দরকার এবং এটাকে বলা হয়- গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক অস্ত্রাগার, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, আরও অনেক কিছু বলা হয়। পাঠাগার সম্পর্কে বই-পুস্তকে অনেক স্তুতিবাক্য আছে- পাঠাগার অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করে। এ রকম অনেক স্তুতির কথা বলতে পারি। 

পাশ্চাত্য উল্লেখ করে আমরা যাদের কথা বলি দেই, তারা রুচিতে, মননে কতটা উৎকর্ষ। আমরা যত যা-ই বলি না কেন, আমাদের পূর্ববঙ্গে যে জাগরণের কথা আমরা বলি, সেটা কিন্তু হয়েছে অনেকের মাধ্যমে। আরবরা এসেছে, তার আগে সনাতনরা ছিল, পাল, মুঘল ছিল; কিন্তু রেনেসাঁসটা কিন্তু আসলে ঘটেছে উপনিবেশিক আমলে। উপনিবেশ যে অনেক খারাপ, এ নিয়ে অনেক কিছু বলা সম্ভব। ইউরোপীয় সাংস্কৃতিকেই আমরা আধুনিকতা বলি, সেইটা কিন্তু ইউরোপ থেকে এসেছ। তারা কিন্তু একটা ঋদ্ধ জনপদ ছিল এবং ঋদ্ধতার একটা মূল কারণ ছিল- তারা কেবল ম্যানুয়াল ফিডে আগাইনি; পাঠাগার আন্দোলনের মতো বিভিন্ন ইনস্ট্রুমেন্ট এবং শিল্পের উৎকর্ষতার সাথে যান্ত্রিক উৎকর্ষতার মিশ্রণে তারা ঋদ্ধ হয়েছে। ইউরোপে যে দুই ধরনের উৎকর্ষতা হয়েছে, তার একটি হলো শিল্পবিপ্লব, আরেকটি হলো সামাজিক বিপ্লব বা রেনেসাঁস। এরজন্য কিন্তু পাঠাগারটা খুব দরকার। একটা সময় ইউরোপে যখন পাঠাগার করা হলো, দেখবেন সেসব জায়গায় অনেক তুষারপাত হয়। সেখানকার জীবনটা কিন্তু আমাদের লো ল্যান্ডের মতো না। মানুষ খুব জড়থবু হয়ে থাকে। ইউরোপের পাঠাগারগুলোর ছাদ প্রায় পঞ্চাশ ফুট উঁচু। এর মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে একটা আর্দ্রতার ব্যাপার আছে এবং মানুষ রাস্তাঘাটের দিকে না যেয়ে পাঠাগারের দিকে এলো। ঝড়ের সময়ে আশ্রয়ণ এবং একটু একটু করে মানুষকে আকৃষ্ট করে পাঠক করার জন্য তারা বই পুস্তকের সঙ্গে পরিচয় করালো। যা-ই হোক আমাদের এই পাঠাগার কিন্তু ইউরোপের সেই রেনেসাঁসেরই উত্তরসূরী। 

ইংল্যান্ডে যখন গণগ্রন্থাগার আইন হলো ১৮৫০ সালে, তারপর থেকেই কিন্তু এইখানে পাঠাগার আন্দোলনটা হলো এবং এখানকার এলিট শ্রেণিটা কিন্তু বুঝতে পারলো যে, এখানে যদি আমরা ব্যবসাও করতে চাই। টিকে থাকার মতো একটা শান্তি এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ দরকার। উপদেশ কিন্তু তাদেরই দেশ, তাদেরই শাসন; এলাকার জনগণকে তো খালি শোষণ করলে হবে না, নূন্যতম একটা শান্তি তো বজায় রাখতে হবে। এজন্যই নাগরিকত্ব সুবিধার জন্য পঞ্চাশ এর পরে চুয়ান্ন সালে যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়। তারপর ঢাকায় ভিক্টোরিয়া লাইব্রেরি, রাজা রাম মোহন রায় লাইব্রেরি, এ রকম ১২ থেকে ১৪টা লাইব্রেরি গড়ে উঠে। এগুলো শতবর্ষী লাইব্রেরি।

আমাদের দেশের পাঠচিত্রে এই লাইব্রেরি আরও বেশি দরকার। মানুষের প্রথম চাহিদাটা হলো জৈবিক চাহিদা। এরপর ধীরে ধীরে তার চাহিদা উচ্চমার্গের দিকে যায়। সভ্যতা-সংস্কৃতির সেই উচ্চপর্বে যেতে কিন্তু আমাদের পাঠাগার লাগবেই। বই-পুস্তক এর মাধ্যমে আর কিছু না হোক, একটা মানুষ তো হাজার মানুষ হয়ে যাওয়ার একটা সুযোগ পায়। অনেকের সাথে যোগসূত্র হয়, মানুষের গণ্ডিটা বড় হয়ে যায়। মানুষের রুচি-সংস্কৃতির একটা পরিবর্তন হয়। এই যে আমরা যান্ত্রিকভাবে যে উন্নয়নের কথা বলি- ইট-বালু-সিমেন্টের অবকাঠামো বুঝি। এইগুলো কিন্তু পরের বিষয়। মানুষের যে ভেদিমূল, তাঁর চিন্তা-সংস্কৃতি, এর উন্নয়নের জন্য আপনার পাঠাগার দরকার। মানুষকে তো থামতে জানতে হবে, না হয়লে এই যে মানুষের অস্থিরতা, নৈরাজ্য মানুষের ধনসম্পদ দখল করা। এই যে সামাজিক স্থিতির কথা বলি, মানবিকবোধ- ধর্মের দোহাই দিয়ে তো এগুলো হবে না। তাহলে তো প্রতিনিয়ত গজব পড়তে হবে, তাই না!

সৃজনশীল মানস গঠন ও মানুষের সৃজনশীলতা গড়তে পাঠাগার ভীষণ জরুরি। এভরি ম্যান হ্যাস আ গ্রেট পটেনশিয়ালিটি। প্রতিটা মানুষের কিন্তু একটা স্পেস লাগে। মানুষের সৃজনশীল হওয়ার জন্য অনেকগুলো বিষয় দরকার। আপনাকে যদি দিনভর খাদ্য সংস্থানে, বেঁচে থাকার সংস্থানেই চলে যায়; তাহলে আপনি কীভাবে সৃজনশীলতার চর্চা করবেন। আপনাকে বেড়াতে হবে, ঘুরতে হবে, তার জন্য পরিবেশ লাগবে। প্রকৃতির সাথে আপনি যদি নদী না দেখেন, নদী নিয়ে লিখবেন কীভাবে। আপনি যদি পাখি না দেখেন, পাখি নিয়ে কী লিখবেন। আমার বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছি। আমি যে পরিবেশ দেখেছি জেলা শহর থেকে, এই প্রজন্ম তার কিঞ্চিৎ পরিমাণ পাচ্ছে না। আমার বাবা-দাদা যেটা পেয়েছে, যেমনটা তাদের কাছে শুনেছি- নৌকা নিয়ে নদী থেকে নৌকা বোঝাই করে মাছ মেরে এনেছে। আমরা এমনভাবে না মারলেও বরশি দিয়ে মাছ ধরেছি। এটা এখন রূপকথার মতো! এই যে জুঁই, জবা, কামিনী, কেয়া- এই ফুলগুলোর নাম আমরা এখন আর জানিও না! বাড়ি বলতে কিছু লেখা নাই, একটা উঠান, ছোট একটা বাগান এইসব জিনিস কনসেপ্ট আছে। তাহলে যিনি সৃজনশীল মানুষ হবেন, তাঁর জন্য তো পাঠাগারটা আবশ্যক। এটা তো ভাত কাপড়ের মতোই দরকার। আমরা তো আসলে বড় একটা ভুল পথে পরিচালিত। কারণ আমাদের শিখানোই হয় পরিবার থেকে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে- বড় হওয়া মানে অনেক টাকার মালিক হওয়া, পুঁজির সঞ্চায়ন করা। কিন্তু আমাদের সমাজ-পরিবেশ শিখিয়েছে- ভেদহীন মানুষ হও, সৎ, সংবেদনশীল মানুষ হও, কমিটমেন্টাল মানুষ হও। এইসব জিনিসগুলো যে আমরা শিখিনি, তাহলে আমরা যা শিখেছি, তার গোড়ায় গণ্ডগোল। একটা মানুষ মনোজগতে যে যাপন করবে, সে সুযোগ তো সমাজে নেই। এই ক্রিয়েটিভিটির স্পেসটা সমাজে নেই। এই স্পেসটার জন্যই পাঠাগারের মতো বিষয়গুলো জরুরি। কাগজে যেভাবে লিখি বা মুখে যেভাবে বলি- ভেদহীন সমাজ, মানবিক সমাজ, প্রাকৃতিক সমাজ, অগ্রায়ানের সমাজ, সমতার সমাজ- তার জন্যেই কিন্তু পাঠাগার আন্দোলনটা দরকার।

লাবণী মণ্ডল : আপনি একটি সৃজনশীল প্রকাশনার সঙ্গে জড়িত। একইসঙ্গে চিন্তাশীল লেখালেখি ও গবেষণায় যুক্ত রয়েছেন। প্রকাশনার সঙ্গে পাঠাগারের সম্পর্কের বিষয়টি কীভাবে দেখেন?

খান মাহবুব : প্রকাশনার সঙ্গে তো পাঠাগার অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। প্রকাশক হিসেবে যদি বলি- ভালো বইয়ের জন্য ভালো পান্ডলিপি লাগে। আর ভালো পান্ডুলিপি হওয়ার জন্য ভালো চিন্তা লাগবে, ভালো চিন্তার খোরাক লাগবে, ভালো পঠন লাগবে। মননশীলতার পূর্বসূত্র পঠন। ভালো চিন্তা করার জন্য যে আপনার মানসিক পটভূমি দরকার, তার জন্য কিন্তু পাঠাগার আবশ্যক।

লাবণী মণ্ডল : মানুষ পাঠবিমুখ হচ্ছে, শুধু ছুটছে মানুষজন। এ থেকে মুক্তি কীভাবে মিলবে?

খান মাহবুব : ছোটবেলায় আমাদের শেখানো হয় অমুকে দেখ কত বড় হয়েছে, কত বড় গাড়ি কিনেছে। এই যে মানুষজন বাচ্চার কাঁধে এতগুলো বই ঝুলিয়ে দিয়েছে, এত বইয়ের দরকার নেই তো। অন্যের সঙ্গে তুলনা দেওয়াটা কিন্তু মানুষকে এক ধরনের খারাপের মধ্যে টেনে নিয়ে যায়। তাকে প্রতিযোগিতার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। সেটা কিন্তু অসম একটা প্রতিযোগিতা। অর্থাৎ তাকে তো জীবনযাপন করার সুযোগ দিচ্ছি না। শুধু চাওয়াগুলো প্রতিনিয়ত জ্যামিতিক হারে বাড়ছে মানুষের। ধরুন, একজন মানুষের একটা বাড়ি, একটা গাড়ি, দশ কোটি টাকা ব্যাংক ব্যালেন্স, প্রতি মাসে দুই লক্ষ টাকা আয় তার কেন দরকার। তাতেও কি স্বস্তি মিলবে? সমাজ কিন্তু তাকে থামতে দিচ্ছে না, প্রতিযোগিতার দিকে ঠেলছে। সে প্রতিযোগিতা হলো অসম, অনৈতিক প্রতিযোগিতা, বিবেকবর্জিত প্রতিযোগিতা। যেমন- ইউরোপীয় শহরে কিন্তু আপনি ইচ্ছা করলেই এক সঙ্গে পাঁচটা বাড়ি বানাতে পারবেন না, আবার বেশি আয় করলে আপনাকে ট্যাক্স দিতে হচ্ছে। 

আমাদের সামাজিক রেনেসাঁস দরকার। তার জন্য গোটা সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন দরকার। মানুষের চাওয়া, শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শুরু করে সবকিছুর মৌলিক পরিবর্তন দরকার। সামাজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই তা সম্ভব। তবে পরিবর্তন আসবেই। তবে আপাতত তেমন কোনো আশার আলো দেখছি না।

লাবণী মণ্ডল : রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অনেক মেগা প্রজেক্ট চলছে। সেই সঙ্গে আবার মসজিদ, মন্দির, গির্জা নির্মাণের টাকা রাষ্ট্রীয়ভাবে দেওয়া হয়। করোনাকালে পাঠাগার ও প্রকাশনা খাত ভীষণভাবে আক্রান্ত হয়। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এসব ক্ষেত্রে তেমন কোনো অনুদান দেখা যায়নি…

খান মাহবুব : আপনি সুন্দর, যৌক্তিক একটা কথা বললেন। রাষ্ট্র কোথায় অগ্রাধিকার দিবে, কোথায় বাজেটের বরাদ্দ বেশি, সেটা দেখলেও বোঝা যায়- আমরা কোনপদিকেও যাচ্ছি। এখানে কোনো মন্ত্রী বা এমপির কাছে গিয়ে বলবেন, একটা পাঠাগার করতে চায়, বা একটা এলাকাভিত্তিক ইতিহাস নিয়ে বই করতে চাই- সেটিতে কিন্তু আগ্রহী হবে না। কিন্তু আপনি যদি বলেন যে, আমি একটা রাস্তা করতে চাই, ড্রেন করতে চাই; তাহলে দেখবেন যে, তারা টাকা ঢালবে, উদ্বোধন করবে; নিজের নামে ফলক তৈরি করবে। একটা হাস্যকর বিষয় যে গ্রামে একটা কালভার্ট তৈরি করতেও তিন-চার কোটি টাকা লাগে। আমি অনেক বার জাতীয় গ্রন্থাগারের সদস্য ছিলাম, অনেক ধরনের একাডেমিক বাজেট মিলে পাঁচ কোটি টাকা! এখানে তো পাঁচশ কোটি হওয়া দরকার। বেসরকারি লাইব্রেরিগুলোর জন্য  তো সরকারি তেমন কোনো অনুদানই নেই। যা অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়, তা খুব হাস্যকর! একটা তৃতীয় ক্যাটাগরির লাইব্রেরির অনুদান পঞ্চাশ হাজার টাকা। প্রথম ক্যাটাগরি হলে ৬০-৭০ হাজার টাকা। 

বেশিরভাগ পাঠাগারে কিন্তু সরকারি কোনো অনুদান নেই। বাংলাদেশে তিন হাজার লাইব্রেরির মধ্যে দেড় হাজার লাইব্রেরিতে বছরে তিনলক্ষ টাকা দিতে পারে। বাংলাদেশে ৫৭-৫৮টা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে, কিন্তু এর তেমন কোনো কাঠামো দাঁড়ায়নি। না আছে পড়ানোর যোগ্যতা, না আছে কোনো স্ট্রাকচার, না আছে ছাত্র!

লাইব্রেরি নিয়ে গর্ভমেন্টের সুন্দর সুন্দর কথা আছে; কিন্তু মূল যে প্রভাবক ফান্ড। সেটি কিন্তু খুবই কম। এদিকে নজর দিতে হবে। শিল্পকলা, নাচ-গানের জন্য যে অনুদান রয়েছে, লাইব্রেরি জন্য তার কিছুই নেই। যে কারণে এত বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশুনা করেও বাংলাদেশে কেউ পাঠাগার আন্দোলন গড়ে তোলার সাহস পায় না। এটা তো আলটিমেটলি রাষ্ট্রেরই দায়।

লাবণী মণ্ডল : আপনি জেলা শহরের মানুষ। এইচএসসি পর্যন্ত ওখানেই ছিলেন। সে সময় কি পাঠাগার ছিল কিংবা নিয়মিত যাওয়া হতো; সে স্মৃতি সম্পর্কে জানতে চাইছি। 

খান মাহবুব : আমাদের পরিবার খুব কালচারাল ছিল। আমিও সেই পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠেছি। ক্লাস থ্রি-ফোর থেকে কালচারাল সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। এইচএসসিতে পড়া অবস্থায় শিক্ষা সপ্তাহে থানা-জেলা এবং জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণ করেছি, গোল্ড মেডেল পেয়েছি। আমাদের কিন্তু উপশহরে বাসা। জেলা শহর থেকে আড়াই মাইল দূরে। 

আমাদের পাঠাগারটির নাম ছিল রমেশ হল। আমাদের কেন্দ্রই ছিল ওই পাঠাগার। আবৃত্তিচর্চা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা এসবের মধ্যেই বেড়ে উঠা। বৃহস্পতিবার বিন্দুবাসিনী সরকারি স্কুলের লাইব্রেরি খুলে দিত। হুড়হুড় করে ঢুকে পড়তাম। সে অন্যরকম আনন্দানুভূতি। 

স্কুল থেকে মুকুলিকা বের হত। শশধর সাহা স্যার ওই কাজে লিড দিতেন। আমাদের সে কী উৎসাহ! একটা কবিতা প্রকাশের জন্য স্যারের কাছে ম্যাও-ম্যাও করেছি। স্যার খুব রাগী ছিলেন। মাঝে মধ্যে বলতেন, তোর কবিতা হয়নি। আবার কেটে-কুটে সুন্দর করে ছেপে দিত। স্কুলের ক্লাব ছিল নবারুণ, ত্রিশালয়। বিভিন্ন ক্লাবের মধ্য দিয়ে আন্তঃপ্রতিযোগিতা হতো। ক্লাস সেভেন-এইট থেকেই কিন্তু বাঙালির বেদিমূলের বই শরৎ-বিভূতি-মানিদের বই পড়ে ফেলেছি। লাইব্রেরিয়ানের সঙ্গে অনেক সুহৃদের ব্যবহার করতাম, যাতে একটু বেশি সময় থাকতে দেয়। 

টাঙ্গাইল সাধারণ গ্রন্থাগারে যেতাম। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পত্রিকা পড়তাম। তাতে অন্য রকম আনন্দ ছিল। মানুষের ভিড় লেগে থাকত। সিনিয়ররা সব দখল করে