তবুও কি গল্পগুলি আড়ালেই রয়ে যাবে?
মনজুরুল ইসলাম
লেখকের মননে অন্তরিত ভাবনা এবং সে ভাবনার উপস্থাপন শৈলী সময়ের সাথে সাথে কখনো উৎকর্ষ অর্জন করতে পারে, আবার কখনোবা একটি নির্দিষ্ট স্তরে অবস্থান করতে পারে। অথবা সে স্তরটি হয়ত স্থিত স্তর থেকে নিম্ন স্তরে পৌঁছতে পারে। তবে পুরো বিষয়টি নির্ভর করে লেখকের নিয়ত চর্চার ব্যাপ্তি ও সামাজিক আবহকে নিরীক্ষণের তীব্রতার ওপর। স্পষ্ট করে বললে, লেখকের অতীত পাঠ থেকে বর্তমান পাঠের উৎকর্ষগত পার্থক্য এবং নানামুখী জীবনাচরণ পর্যবেক্ষণ দৃষ্টির গভীরতা। পাঠ ও জীবনাচরণের ওপর লেখক যত পরিমাণে অনুধাবনের দক্ষতা অর্জন করতে পারবেন ততই তিনি তার লেখার ওপর ইতিবাচক প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হবেন। অর্থ্যাৎ লেখক নিজেই নিজের সৃষ্টিকে ভেঙ্গে পুনরায় অধিকতর সৌন্দর্যের প্রলেপনে তার সৃষ্টিটিকে প্রলেপিত করতে সক্ষম হবেন। সেটি হতে পারে গল্প, প্রবন্ধ কিংবা সাহিত্যের যে কোনো শাখা। তবে যে শাখাতেই হোক না কেন, ভাবের বিস্তার ও উপস্থাপনার অনুপম শৈলীর সমন্বয় যে সন্দেহাতীতভাবেই দীর্ঘকাল থেকে একটি স্বীকৃত মানদণ্ড তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
স্বীকৃত এই ভাবনাকে অবলম্বন করে যখন একজন লেখক বিশেষত গল্পকার, গল্প সৃজন করতে থাকবেন তখন হয়ত তার সৃজন প্রক্রিয়ায় অতীত এবং বর্তমান উপস্থাপনার মধ্যে একটি ইতিবাচক পার্থক্য প্রতীয়মান হয়ে উঠবে। উদাহরণস্বরূপ, শুরুর দিকের গল্প নির্মাণ প্রক্রিয়ায় ঘটনার প্রাধান্য দৃশ্যমান হলেও পরবর্তীতে হয়ত সেই ঘটনাটির উপস্থাপন ভিন্নভাবে উপস্থাপিত হবে। এবং এটি হবার সম্ভাবনাই বোধকরি অধিকতর হবে যদি লেখকের মধ্যে অনবরত উদ্ধৃত বিশিষ্টতা দুটির কর্ষণ চলতেই থাকে। সেক্ষেত্রে তার রচনার প্রতি পাঠকের আগ্রহ বেড়েই যাবে, পাঠক যখনই তার লেখা দেখবেন তখনই তা গ্রোগাসে গিলত থাকবেন। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, “ যে রসের পরিবেশনে মহারসিক জীবনের অকৃত্রিম আস্বাদনের দান থাকে সে রসের ভোজে নিমন্ত্রণ উপেক্ষিত হবার আশঙ্কা থাকে না (১)।’’
মিজানুর রহমান নাসিম, একজন গল্প লেখক। মাজহার জীবন সম্পাদিত সাহিত্য পত্রিকা ‘লেখালেখির উঠান’। সে পত্রিকায় বিড়াল শিরোনামে গল্পটি পাঠের মাধ্যমে তার লেখার সাথে প্রথম পরিচয়। গল্পের শুরু থেকে শেষ অবধি পড়বার পর তীব্র এক দায়বোধ নিজের মধ্যে অনুভূত হয়েছিল অথবা গল্পকার দায়বোধটি সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু কীভাবে?
বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার প্রয়োগ ঘটিয়ে যখন পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ, সমস্ত প্রাণীকূল ও প্রকৃতির প্রকৃত রূপকে নির্ভার পদচারণার সুযোগ করে দিতে সক্ষম হবে ঠিক তখনই মানুষ হিসেবে তাদের স্বকীয়তা প্রোজ্জ্বলরূপে প্রতীত হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, মানুষের মাঝে সেই অনুভূতিলব্ধ দায়বদ্ধতাটি ক্রিয়াশীল নয় আজ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই। এবং এ বিষয়টিই অত্যন্ত সার্থকভাবে ফুটে উঠেছে“বিড়াল” নামীয় গল্পটিতে। গল্পকারের বয়ানে “পৃথিবী সত্যিই শুধু মানুষের দখলে। এখানে অন্যদের নির্ভার হওয়ার সুযোগ নেই। এখানে ইতর প্রাণীদের, বিড়ালের, পথ কুকুরের, শেয়ালের চোখের দিকে তাকালেই তাদের চোখের মনিতে ফুটে ওঠে অনুকম্পা প্রাপ্তির আশা। কিন্তু তারা যে প্রতিনিয়ত অনুকম্পা থেকে বঞ্চিত হয়ে উদ্ধাস্তু ফেরারীর মতো জীবন যাপন করে তারই সুনিপূণ উপস্থাপনা গল্পটি। গতানুগতিক ভাবনা ও পরিবেশনার থেকে স্বতন্ত্র এ গল্পটি যেন সূচনালগ্নে বর্ণিত শোভমান রচনার একটি আদর্শ উদাহরণ।
উপরোক্ত গল্পটির সূত্র ধরেই অতঃপর একে একে পড়া হলো গল্পকারের নিঘুমওয়ালা, সমাধি, গোধূলী রঙের গল্প, অন্তর্দাহ, পাতিপিসি, যুদ্ধ দিনে, দিগম্বর, প্রজাপতি এবং সর্বশেষ বাসন্তী গল্পটি। প্রতিটি গল্পের বর্ণনা বৈভব, উপস্থাপনা শৈলী, বিষয়ের বিচিত্রতা এবং বিশেষভাবে প্রতীকের ব্যবহার গল্পগুলি পাঠের উপযোগীতাকে অবশ্যম্ভাবী করে তোলে পাঠক তো অবশ্যই, লেখকদের ক্ষেত্রেও। এবার সেই উপযোগিতার যথার্থতাকে প্রমাণের নিমিত্তে সামনের দিকে এগুনো যাক।
নির্মোহ দায়বোধ এবং চরম নিঃসঙ্গতা যে একজন মানুষকে উত্তাল ঢেউয়ের মতো আন্দোলিত করতে পারে, চিত্তের গভীরে নিরন্তর জ¦লতে থাকা ক্ষোভগুলোকে অবলীলায় প্রকাশ করতে পারে– সেটির সত্যতা হয়ত গল্পের মুখ্য চরিত্র মহুবরের মতো হাজারো শ্রমিকের কণ্টকাকীর্ণ জীবনের মধ্যে দিয়ে প্রমাণিত হতে পারে। পুঁজিপতিদের ভোগসর্বস্ব জীবনের প্রতি ঘৃণা লালন করেও তারা যে দায়বদ্ধতা থেকে বিন্দু পরিমাণ সরে আসেন না; এমনকি কর্তব্যের মাত্রাকে বলিষ্ঠ করতে কুকুরদের বন্ধু হিসেবে অবলীলায় গ্রহণ করেন তা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে ‘নিঘুমওয়ালা’ গল্পটিতে। গল্পের অন্তিম অনুছেদে সে যন্ত্রণাক্লিষ্ট অনুভবটি ফুঠে ওঠে এভাবে “এ দুনিয়াতে ওরা ছাড়া (কুকুররা) কে আমাকে এমন সম্মান বা দয়া দেখায়, কে বিনে পয়সায় সঙ্গ দেয় রাতের পর রাত আর অভিশপ্ত নির্ঘুম রাতগুলোতে ঘিরে থাকে প্রেমিকার মতো। ওরা আছে বলেই কিনা ছিঁচকে চোরদের সামনে আমার বুড়ো হাঁড়ের তাগদটা বেড়ে যায়।’সমতার পৃথিবী নির্মাণের যে তাড়না মহুবরের মধ্যে দিয়ে গল্পকার পাঠকের বোধবৃত্তে স্থাপন করে গেলেন তা নিশ্চিতভাবেই অস্থির সমাজের একটি অভাবনীয় প্রতিবিম্ব।
একই সাথে অতীত হারিয়ে অতীতকে খুঁজে পাবার মধ্যে যে শুধুমাত্র বেদনামিশ্রিত নিঃসঙ্গতাই প্রাপ্তি হিসেবে ধরা দেয় তার একটি স্নিগ্ধতাময় সৃজন “সমাধি” গল্পটি। গল্পটি মূলত গভীর দুঃখবোধ থেকে উৎকলিত পূর্বাহিক ভাবনার একটি অনুপূক্সক্ষ বিশ্লেষণ; যেখানে স্থান পেয়েছে পরিবার ও প্রতিবেশের নস্টালজিক স্মৃতিচারণ। এবং এই স্মৃতিচারনের সাথে গল্পকারের অন্তর্গত চিন্তার তুলনামূলক দৃষ্টান্তের আখ্যান। এবং সেটি উন্মোচিত হয়েছে কখনো মোহনীয় সুরে, কবিতার <