You are currently viewing হেলিকপ্টার ও সোনার তলোয়ার (কিস্তি- নয় )>  খালেদ হামিদী

হেলিকপ্টার ও সোনার তলোয়ার (কিস্তি- নয় )> খালেদ হামিদী

হেলিকপ্টারসোনার তলোয়ার 

খালেদ হামিদী

কিস্তি: নয় 

১৭

শুধু বাবু নয়, আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করে, এদের কারও কারও বাড়িতে দাওয়াত খেয়ে, বন্ধুদের সাথে ইচ্ছামতো আড্ডা দিয়ে, অন্যান্যবারের মতো দেশ থেকে এবারও একা ফেরে খোকন। অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধু তন্ময়ের সাথে, ছুটি উদ্যাপনকালে, ফোনে দুবার কথা হলেও দেখা হয়নি। ভিলায় ফেরার সাথে সাথে, কিছুটা অদ্ভুতভাবে, খোকনের হাতে আসে ওরই চিঠি। মহামারিকালে লকডাউন দ্বিতীয়বার যখন শিথিল হয়, তখনই, দেশ থেকে এটা ছাড়ে তন্ময়। পত্রটা অনেক দীর্ঘ, পড়ার তিন দিন পর বর্ণনাবিলাসী খোকনের মাথায় যা এভাবে চিত্রিত হয়:

বিপদে মানুষ চেনা যায়।

ব’লেই, তন্ময়, দেশে ‘সাধারণ ছুটি’ শুরুর প্রথম দিনই, দুপুরের দিকে, বারান্দাযুক্ত দুই বেডরুমের বাসার মেঝে মোছার মপ খুশিতে দুই হাতে সজোরে চেপে ধরে। স্টিলের হাতলঅলা এই মপ ওর স্ত্রী শান্তির কাছে ভারি ঠেকে বিধায়ও এর প্রথম ব্যবহারে সে স্বতঃপ্রণোদিত হয়। কাজের বুয়া না এলে ন্যাকড়া ভিজিয়ে হাতে ফ্লোর মোছার কষ্ট থেকে মুক্তি দিতে শান্তিকে ওর মা-ই কিনে দেন এই মপ।

বুয়াকে ছুটি দিয়ে দাও। নইলে আমি এ-বাসায় থাকবো না!

তন্ময়ের এমন হুমকিস্বরূপ আদেশ প্রায় হাসিমুখে মেনে নেয় শান্তি। ঘর মোছা দূরে থাক, যাকে সাপ্তাহিক দুই ছুটির দিনেও নিজের লুঙ্গি-গেঞ্জিও ধুতে দেখেনি কেউ, সেই তন্ময়, তার ও নয় বছরের একমাত্র শিশুপুত্র চিন্ময়ের জামা নিয়মিত কাচে কেবল নয়, বাড়তি কিছু কাপড়ও ধোয় কয়েকবার। একদিন তো বিছানার চাদর এবং বালিশের কভারও ধুতে দ্বিধাগ্রস্ত হয় না মোটেও। কমোড, বেসিন ও ফ্লোরসহ নিজের ওয়াশরুম পরিষ্কার করতেও নিঃসংকোচ থাকে সে। এক সময়ের তুমুল আড্ডাবাজ তন্ময় বিয়ের দ্বিতীয় বছর থেকেই, বলতে গেলে, আড্ডাহীন। এ জন্যেই হয়তো করোনাকালীন এই গৃহবন্দিত্ব সে প্রায় সাদরে বরণ করে নেয়। কোভিড-পূর্বকালে যে কি না অফিস থেকে ফিরে নিয়মিত পত্রিকাও পড়েনি, টিভিতে খবরও দেখেছে অনিয়মিত, সে এখন একাধিক চ্যানেলে প্রচারিত সংবাদ শুনতে-দেখতে উদ্গ্রীব। হকারকে বাসায় কাগজ দিতে বারণ করে দেয়ায়ও হয়তো সে হয়ে ওঠে টিভির নিয়মিত দর্শক। ময়লা কাগজ ছুঁলেও সাবানযোগে হাত ধোয়া অভ্যাসে পরিণত হয় ওর দেখাদেখি দুই সন্তানেরও।

বাসার জিনিসে সমস্যা নেই।

এক সন্ধ্যায় শান্তির স্মিত হাসির এই কথায় অভয় লাভ করে তন্ময়। তবু চিন্ময়ের পাশাপাশি ওর তিন বছরের বড় একমাত্র বোন পিপাসাও ‘ধুতে থাকো, ধুতে থাকো’র মতো পরামর্শ অনুসরণে ব্যত্যয় ঘটায় না। পরিচ্ছন্নতার পৈতৃক রীতি অটুট রাখতে ওরা মায়ের আড়ালে হাত ধুয়ে ফেলে। দু’মাস ছ’দিনের ছুটির মধ্যে প্রায় পৌনে দুই মাসই তন্ময়কে ভাড়া বাসার বাইরে পা রাখতে হয় না, প্রয়োজনীয় প্রায়-নৈমিত্তিক কেনাকাটা প্রসঙ্গে শান্তিরই সিদ্ধান্তের বিরোধিতায় সে প্রবৃত্ত হয় না বলে। হেতু একটিই, তন্ময়ের বøাড শুগারের সমস্যা। ল্যাবে পরীক্ষাও করায় মহামারি শুরুরও মাস দুয়েক আগে। এভাবে, বলতে গেলে, প্রায়ই স্বস্তিতেই কাটে তন্ময়ের প্রথম দু’মাস।

ওর প্রায় অর্ধেক বয়সী শান্তির মুখে কাঁচা বাজারে ভিড়ের কথা শুনে একদিন আঁৎকে ওঠে পঞ্চাশোর্ধ্ব তন্ময়। সঙ্গে সঙ্গে রেগে শ্রোতাকে বিস্ময়াহত করে শান্তি এই ব’লে:

আপনি যান না কেন বাজারে! কালকে থেকে আপনি যাইয়েন।

পৌনে দু’মাস ধরে স্ত্রীর কথা মানার কোনো সুফল না মেলায় অল্প রাগ হয় তন্ময়েরও। শান্তিকে তার সেই সিদ্ধান্ত মনে করিয়ে না দিয়েই শুধু বলে:

ঠিক আছে। আরও ভালো। আমিই যাবো।

ফলে এতোদিন ওর যেসব নির্দেশনা স্ত্রী মেনে চলে সেসব পরিপালন করতে শুরু করে তন্ময় নিজেও। জুতা-স্যান্ডেল বাইরে রেখে বাসায় ঢুকেই সোজা কমন ওয়াশরুমে গমন, হাত ও পায়ের পাতা অধিক ক্ষারযুক্ত বাংলা সাবানে ধোয়া, ঘরের হেঁটে-আসা পথটুকু সেভলন মেশানো পানি ছিটিয়ে পা যোগে ন্যাকড়ায় দু’বার মোছা, ফের ওই বাথরুমে ঢুকে পরিহিত সব জামা-কাপড় হুইল পাউডার ও গরম পানিতে কয়েক মিনিট ভিজিয়ে রাখা, ফেনা তুলে সেগুলো কেচে শ্যাম্পু-সাবানে নিজের স্নান সারা ইত্যাদি চিরকালীন অভ্যাসে পরিণত হয় যেন। এসবের ঢের আগেই পরিবারের সবার আহার-নিদ্রার সময়সূচি বদলে যায়। শান্তি এমনিতেই রাত দ্বিপ্রহর এবং কখনো তৃতীয় প্রহর অব্দি অনলাইনে ব্যস্ত থাকে। কানে হেডফোন, হাতে স্মার্ট ফোন, ড্রয়িং রুমে বসে থাকে সে। কিন্তু ছেলে-মেয়ে কমন বেডরুমে থাকতে চায় না বলে ওরা ওদের বাবার সাথেই মাস্টার বেডরুমেই ঘুমিয়ে পড়ে রাত দুটোর দিকে। সকাল এগারোটার আগে ঘুম ভাঙে না কারোরই। ফলে পানাহারের সময় আশঙ্কাজনকরূপে পাল্টে যায়। তন্ময়ের তুলনায় ঢের বেশি কাজের চাপে ভেতরে ভেতরে অতিষ্ঠ হয়ে-পড়া শান্তি কোনও কোনোদিন দুপুর সাড়ে বারোটা, একটার আগে রান্নাই শুরু করে না। কিন্তু ওর অবস্থা ঠিকভাবে বুঝতে না পেরে আরও কিছু তুচ্ছ বিষয়ে তন্ময় আপত্তি জানাতে শুরু করলে শান্তির মেজাজও বেসামাল হয়ে পড়ে। করোনাকালের সোয়া এক মাসের মাথায় একদিন হঠাৎ ভরদুপুরে হিজাব পরার ধরনে মুখ ঢেকে দোকানে যায় শান্তি। ফেরার পরে, মাস্ক পরেছে কি না জানতে চাইলে তন্ময় শোনে:

বারান্দায় শুকাইতে দিছি, দ্যাখেন।

এরপর নিজে স্নান সেরে বারান্দা হয়ে ডাইনিং রুমে খেতে এসে মাস্ক না দেখার কথা জানানোর সাথে সাথে  তেলে-বেগুনে জ¦লে ওঠে শান্তি। আছাড় মারার ধরনে টেবিলে সজোরে ফেলে ভাতের বড় চামচ। তন্ময় বলে ওঠে:

রুক্ষ পুরুষদের কেউ কেউ এরকম ভাঙচুর করে শুনেছি। এসব কেমন আচরণ!

ওরকম বেটা আমি দেখি নাই।

ব’লেই টেবিলকে একইভাবে আবার আহত করে শান্তি।

তন্ময় প্রশ্ন ছোড়ে:

আমি বউ বা শ্বশুরের কামাই খাই নাকি?

উত্তর না মেলায় খেতে বসতে চায় না সে। কয়েক মিনিট পরেই মনে মনে ‘আমি তো আমারই কামাই খাই’ ব’লে খাওয়া শুরু করে। এর দুয়েকদিন পরে কেনা-কাটা, গার্হস্থ্য কাজকর্ম ইত্যাদি সেরে উঠতে বিকেল সাড়ে চারটা হয় শান্তির। দেরি দেখে তন্ময় ওকে খেয়ে নিতে বলার সঙ্গে সঙ্গে সম্পূর্ণ অচেনারূপে বিস্ফোরিত হয় সে:

এই নিমক হারাম! এতোক্ষণ কি করছি দেখস নাই? আমি কি হাভাতে ঘরের মেয়ে? নাকি আমার মা-বাপে আমাকে খাওয়াতে না পেরে তোর মতো বুড়া বেটার কাছে বিয়া দিছে!

মাস্টার বেড থেকে বেরিয়ে ডাইনিং রুমের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে, দু’পাশের ফ্ল্যাটবাসীদের শুনিয়ে, আরও নানা কিছু বলতে থাকে শান্তি। পিপাসা ও চিন্ময় আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে পড়ে। ড্রয়িং রুমে ওদের পাশে বসা ত্রস্ত তন্ময় মুখে রা করে না। এই মহামারিকালে এই প্রথম সে সহজাত সহনশীলতার পরিচয় দেয়। ওর অজানা অপরাধ বিষয়ে ভাবে। শান্তি ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়ে স্মার্ট ফোন হাতে বিছানায় বসতেই তন্ময় ওকে আহারের কথা বলে। এতেই তুমুল অশান্তির শুরু।

আমি সারাদিন কি করছি দেখেন নাই? এখন একটু বসছি আর আমাকে জ্বালাইতে আসছেন?

এতে শান্তি শোনে তন্ময়ের স্বভাবসুলভ খোঁচা:

বসো নাই, কাজ করছো!

এ-কথায় আগুন লেগে যায়। শুধু তা-ই নয়, দিনে আর খাবার মুখে তোলে না শান্তি। সন্ধ্যায়ও না, বাকি তিনজনকে চা-নাশতা দিলেও। রাতেই অল্প খায় তন্ময়ের অনুরোধে।

 

এক সন্ধ্যায় বড় শোবার ঘরের পুব দেয়ালে স্থাপিত রাধা-কৃষ্ণের প্রতিমায় মাথা ঠুকিয়ে শান্তিকে প্রণাম করতে দেখে তন্ময় জানতে পারে, পূজারী ব্রত পালন করছে।

অতিমারি না হলে নাশতা কিনে আনা যেতো।

এ-কথায় নিরুত্তর শান্তি, কিছুক্ষণ পর, ডাইনিং রুমের ডীপ ফ্রিজের সামনে পিপাসার প্রতি মারমুখো হয়ে ওঠে। বিকেলের ঘুম শেষে মুখ ধুয়ে টাওয়েল হাতে তন্ময় হল্লা শুনতে পায়। কিছুই বলে না। চুল আঁচড়ায়। শান্তি সবার কান ফাটিয়ে প্রশ্ন ছোড়ে:

মেয়ে যে আমার শরবত ফ্রিজের ভেতরে ফেলে দিয়েছে দেখতে আসিস নাই কেন!

তন্ময় সেদিকে এগুতেই হাফ কেজি তরল দুধের শক্ত প্যাকেট বাপ-বেটির পায়ের দিকে ছুড়ে মারে শান্তি। ভাগ্যক্রমে তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। শান্তির তিলকে তালকরণ কিংবা মশা মারতে কামান দাগানোর দুঃসহ স্বভাব অগত্যা মেনে নেয়া তন্ময়ের অভিজ্ঞতায় এই হানা নতুন সংযোজন। বিশ্বব্যাপৃত ভাইরাস-আতঙ্কের সাথে এই ভয়াবহতা যুক্ত হওয়ায় প্রথমবারের মতো অসহায় বোধ করে সে। সেই সঙ্গে ব্রত না ভেঙে শান্তিকে শুয়ে পড়তে দেখে ওর ধার্মিকতার প্রকৃতি বিষয়ে নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ হয় তন্ময়। তবুও যথারীতি করজোড়ে মিনতি জানালে, লগ্ন পেরুবার ঢের পরে, রাতে অন্ন মুখে দেয় শান্তি।

বর্তমান দুর্যোগের আগেও এমনও হয়, ভোগ্যপণ্যের ভারে দুই হাত ছিঁড়ে পড়ার উপক্রম হলেও সেগুলো বাসায় রেখেই ফের বাজারে ছুটতে হয় তন্ময়কে। কোভিডকালে এর খানিকটা ব্যতিক্রম ঘটে। ওকে দ্বিতীয়বার না পাঠিয়ে শান্তি নিজেই ছোটে অসময়ে। এরই মধ্যে একদিন বাসার অদূরের এটিএম বুথ থেকে ডেবিট কার্ডে টাকা তুলতে গিয়ে তন্ময় জানতে পারে, ওর কার্ডের মেয়াদ শেষ। ফলে, পরে আরেকদিন, নীচ তলা থেকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে, শেষে ধীরে ধীরে উঠে, দোতলার ব্যাংক থেকে ক্যাশ চেকের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করতে হয়। কিউতে তিন ফুট ফিজিক্যাল ডিসট্যান্সিং বজায় রাখা হলেও ব্যাংকের কলাপ্সিবল গেইটের মুখের এক অণুঘটনায় সত্যিই আশঙ্কিত হয়ে পড়ে তন্ময়। সে লাইনে থাকতেই উপরে উঠে-পড়া তিন হিজড়ার একজন, সাহায্য না পেয়ে গালমন্দমুখর, ওই তিন ফুট প্রস্থের তোরণের সামনে, তন্ময়ের পাশে এক ফুট ব্যবধানে দাঁড়িয়ে, শাড়ি তুলে ব্যাংকেরই দুই প্রহরীকে তার গোপনাঙ্গ দেখিয়ে দেয়। সেদিনের পরের চতুর্দশতম দিনের তারিখটি মাথায় গেঁথে রাখে তন্ময় আর মনে মনে, নিরোগ থাকার প্রার্থনায়, ঠাকুরকে ডাকে।

অফিস খোলার ঘোষণা এলে তন্ময়ের ত্রাসবোধ গাঢ়তর হতে থাকে। এর আগে, প্রথম দিকে, ওর বসবাসের এলাকার অদূরে, ওদেরই শহরের প্রথম করোনাক্রান্তজন হিসেবে প াশোর্ধ্ব পুরুষ সংবাদ শিরোনাম হয়ে উঠলে, সস্ত্রীক সে যেমন ভয় পায় এই অনুভ‚তি তেমন নয়, ঢের ভিন্নতর। যেন মৃত্যুর দিকে তাকিয়ে থেকে জীবনের জন্যে জীবিকা সকাশে ফেরা। অণুজীবটিকে মোহীত উল আলম ফুলের সঙ্গে উপমিত করেন তাঁর করোনার ফুল কবিতায়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক তন্ময়ের প্রিয় মোহীত স্যারের কবিতাটি সে পড়ে ফেইসবুকে। কোভিডকালের প্রথম মাসের শেষের দিকে স্যারের টাইমলাইনে তা পেয়েই সেইভ করে রাখে সে আর মাঝে মাঝে মুখস্ত আওড়ায়: “জানলার পাশে থোকা থোকা করোনার ফুল, দোলে/হাওয়ায়। ফুলগুলোর মুকুটে রাজপ্রভা  যেন/শৌর্য, যেন পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র, যেন রক্ত।/হাওয়ায় রক্তের ঢেউ, মানুষের কলিজা যেন।/আজ দক্ষিণ  থেকে হাওয়া বইছে দুপুর’তক/করোনার মুকুট থেকে শলা পালকের মতন/উড়ছে, পড়ছে চোখে, মুখে, আর হাতে মানুষের।/জোঁকের মতো নির্বিশেষ তাদের চোষা, রক্তগ্রন্থি।/পথঘাট, ইমারত, ভাঙ্গাচালা বস্তিপাড়া, সব/যেন শরশয্যা, অনিদ্রায় রাত কাটে ভয়ে; ফুল/করোনার, অথচ সুবাসিত গন্ধ নেই, ফুলেল/রূপ, হাওয়ায় থোকা থোকা  দোলে, চোখের আড়ালে।/মুথ থুবড়ে পড়া, বিচ‚র্ণ দর্পিত মানুষ খোঁজে/পরিত্রাণ; জানলার পাশে করোনার ফুল দোলে।” তন্ময় ভাবে, নানা মিডিয়ায় প্রদর্শিত ভাইরাসটার ছবি কবির এই মর্মভেদী অনন্য মেটাফরকে প্রমাণিত করে। কেননা অণুজীবটা কিছুটা গাদা কিংবা কদম ফুলের মতোই, অথচ অদৃশ্য এবং রক্তিম। তন্ময় স্বগতোক্তি করে: লাল মৃত্যুফুল!

দু’মাস ছ’দিন পর গৃহবন্দিত্ব ঘোচে। তন্ময় অফিসে যায়। তার ওয়ার্ক স্টেশন দু’সপ্তাহের জন্যে নীচ তলা থেকে দোতলার পুরোনো বোর্ড রুমে স্থানান্তরিত হয়। অফিস খোলার তৃতীয় দিন বেলা এগারোটার দিকে খবর আসে: সহকর্মি করিম আর নেই! শোনামাত্র সে প্রায় কেঁদে ওঠে। সদা হাস্যোজ্জ্বল রসিক মানুষটা কিভাবে শিকার হয় এই জীবাণুর! তন্ময়ের ব্যাচ মেইট করিমের ডিপার্টমেন্টের একমাত্র কলিগ মিনহারের দুই চোখে দুই নদী তন্ময় ভুলতে পারে না। এদিকে শান্তিও সহানুভ‚তিশীল হয়ে ওঠে তন্ময়ের প্রতি। প্রথম দু’মাসের ধারাবাহিকতায় তৃতীয় মাসেও গৃহপরিচারিকাকে নিরবচ্ছিন্ন ছুটি দেয়ার বিষয়ে আপত্তি করে না। এর আগে বুয়াকে ডেকে কয়েকদিন কাজ করানো হয়। ওদিকে করিমকে হারানোর তৃতীয় দিন সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনা রোস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন শুরু করলে আবারও আরাম ফিরে পায় তন্ময়। কিন্তু ওর ভীষণ ভীতি কাটে না। গরম পানি চায়ের ধরনে খেতে শুরু করে বাসায়। সসন্তান সিভিট তো খায়ই। জিংক ও ভিটামিন ডি ট্যাবলেট প্রথম দিকে বাজারে না থাকায় পরে আর কেনে না। তন্ময় এক সন্ধ্যায় ওরই এক নারী সহকর্মির বিস্ময় শান্তিকে শোনায়:

আপনি অনেক শুকাই গেছেন! অসুস্থ ছিলেন নাকি?

এতে বিরক্তি ঝাড়ে শান্তি:

গরম পানি খেয়ে খেয়েই নিজের এই হাল করছেন! আমি আর কী বলবো!

এই অস্বস্তি ক্রমান্বয়ে ঘৃতাহুতি অথবা গরম তেলে পানি পড়ার অবস্থায় পরিণত হতে শুরু করে। তন্ময় ভাবে:

বিপদে গার্হস্থ্য কাজে হাঁটুজলে নেমেও ওর সন্তুষ্টি আর মেলে না আমার!

সে একবার, এ-সময় পার্লারে যাওয়া যাবে না বলায় তেলে পানি পড়ে, রাত দেড়টায়। ডিসেন্ডিং অর্ডারে প্রসঙ্গান্তর ঘটিয়ে মুখরা শান্তি তন্ময়কে ‘অক্ষম’ আখ্যা দিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হয় না। বউ-বাচ্চার জামা-প্রসাধন-খেলনা বিষয়ে ওর উদাসীনতাই এই অপারগতার অপবাদ এনে দেয়। সেসব সে কেনে না কেবল নয়, নিজের লুঙ্গি-গেঞ্জিও খরিদ করতে শপিং সেন্টারে যাওয়া হয় না ওর। অন্তত নিজের কেনাকাটার বিষয়েও কিভাবে, কবে থেকে যে সে শান্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে তার আর মনেই পড়ে না। বরং শপিং মলে ঘোরা শান্তিরই বেশি পছন্দের ধরে নিয়ে প্রায়ই নিশ্চিন্ত থাকে। অফিস থেকে পাওয়া কার লোনের সুবাদে কেনা গাড়িটাও বাচ্চাদের স্কুল ডিউটি আর শান্তির শপিং-এর কাজেই ব্যস্ত থাকে বেশি। শুধু প্রতি কার্যদিবসে কর্মস্থলে যাতায়াত আর মাঝেমধ্যে বইয়ের দোকানে যেতেই বাহনটি দরকার হয় তন্ময়ের। তারপরও কোনও কোনোদিন বুয়া না এলে শান্তির মেজাজ এমন বিগড়ে যায় যে তন্ময়কে সে ‘দায়িত্বহীন’ বলতেও দ্বিধান্বিত হয় না। কোভিডকাল শুরুর আরও আগেও এই ভিত্তিহীন অভিযোগের জবাবে তন্ময় বলে:

কেন, আমি কি উপার্জন করি না? তাছাড়া, বুয়াকে কি আমিই আসতে মানা করি?

কিন্তু বিপরীতে শান্তি রান্নাবান্নার খোঁটা দেয়। তন্ময় একান্তে চিন্তিত হয় এই ব’লে:

পাঁচ বছর যাবৎ ওর ফেইসবুকিংই কি ওর এই নতুন খোঁটার হেতু? কে বা কারা তাকে মন্ত্রণা দেয়? শান্তি ওর স্মার্ট ফোনে পাসওয়ার্ড দিয়ে রাখে। তন্ময় এর হেতু জানতে চাইলে জবাব মেলে:

বাচ্চারা যাতে এর ব্যবহার না শেখে।

কিন্তু দুয়েকটা ইনকামিং কলের ক্ষেত্রে শান্তিকে আস্তে কথা বলতে অথবা বারান্দায় যেতে দেখে সন্দেহে যে দীর্ণ হয় না তন্ময় তা নয়। কিন্তু সন্দেহ একটা রোগ বিধায় সে অসুস্থ হতে চায় না। বরং সংসারে শান্তির অবদানের ইতিহাস কখনো কখনো সংক্ষেপে স্মরণ করে। স্বামীর নিয়মিত শেভ না করাসহ প্রায় পুরো সপ্তাহ জুড়ে একটা শার্ট ও মাস ব্যেপে একটা প্যান্ট ব্যবহারের অভ্যাস বদলে দেয়া, শাশুড়ির দেখভাল, বিবাহিত দ্ইু ননদকে সপরিবার আপ্যায়ন, ওদের রোগশোকে দৌড়ে যাওয়া, পাশাপাশি ব্যয় সংকোচন, ধমক দিয়ে হোক, চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে হোক প্রথমে জমি, পরে কিস্তিতে ফ্ল্যাট কেনার প্রক্রিয়ার সঙ্গে তন্ময়কে যুক্ত করা কেবল নয়, বর্তমানে প্রায়-নির্মিত নিবাসের অভ্যন্তরীণ অঙ্গসজ্জার ব্যবস্থাকল্পে নিজে তৎপর হওয়া-শান্তির এসব ভ‚মিকার কোনোটাই অস্বীকারযোগ্য নয় কিছুতেই। কিন্তু তন্ময় প্রশংসায় প্রায় অপটু। কর্মক্ষেত্রেও সে তেমনই ব’লে ওর প্রমোশন বিলম্বিত হয়। যদিও, সেই প্রেক্ষাপট ভিন্ন।

তন্ময়ের পিতৃপরিবারের প্রায় মধ্যমণি শান্তি ওর স্বামীর সঙ্গে কেন এতো অশান্তিপ্রবণ? সংসারের তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়ও তন্ময়ের নজর এড়ায় না বলে? নাকি সহধর্মিণীর প্রত্যাশা অনুযায়ী তাকে নিয়মিত স্বীকৃতি প্রদানে সে অপারগ বিধায়? হতে পারে ওর কথা বলার ধরনই এমন যে সে মুখে রা করতেই তা বল্লম হয়ে বেঁধে শান্তির বুকে, বক্তার কাছে যা এখনো বিস্ময়কর। দেশের দক্ষিণ পূর্বা লবাসী শাশুড়িকে ফোনে অনেকবার এসব জানায় তন্ময়। কিন্তু শেষের দিকে তার পরিহাসময় বক্রোক্তিসূচক ক্ষোভে অপমানিত বোধ করেন শান্তির মা। সেসব দুর্যোগকালের আগের কথা। কেউ দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি অমন, এসে-পড়া ভয়াবহ দুঃসময়ে, মড়ার ওপর খাড়ার ঘা তুল্য এসব কলহের প্রতিক্রিয়ায় তন্ময় শাশুড়িকে আর ফোন কল দেয় না। কিন্তু শান্তি তার বড় ননদকে প্রথমবারের মতো এমন একটি অঘটন অবহিত করে যার ক্রীড়নক মূলত সে নিজেই। এক ভোরে সিআরবি সাত রাস্তার মোড় এলাকায় কার চালনার চর্চা সেরে ফেরার পথে লাভ লেইন থেকে, বাজার যেখানে দু’ঘণ্টার জন্যে বসে, কয়েক প্রকার সতেজ মাছ কেনে শান্তি। সেগুলো সানন্দে বরকে দেখানোর সময় হঠাৎ ওর খুশিতে ছেদ পড়ে।

কাল বিকেলে কি ড্রাইভারকে আজ ভোরে আসার কথা বলে দিয়েছিলে?

তন্ময়ের এই শান্ত, স্বাভাবিক প্রশ্নে অগ্নিকান্ড শুরু হয় কল্পনাতীতরূপে।

নিমক হারাম!

আবারও এই অপবাদ শোনা মাত্র প্রচন্ড রাগে অট্টহাসিতে প্রায় ফেটে পড়ে তন্ময়। তাতে ঘটে ঢের বিপত্তি। একের বচন কাটে অপরের কথা। ওই হাসির অভাবিতপূর্ব অভিনয়যোগে ডাইনির ভঙ্গিতে তন্ময়ের দিকে বারবার ধেয়ে যায় শান্তি। কুঁদে গিয়ে ওকে ধাক্কা দেয় কয়েকবার। পরে সসন্তান দুপুরের খাওয়া শেষে প্লেট, চামচ ইত্যাদি ধুয়ে কমন বেড রুমে বসে তন্ময়। এর অল্প কিছুক্ষণ পরেই গোসল সেরে বেরিয়ে আবার জ¦লে ওঠে শান্তি। ডাইনিং টেবিল থেকে রাইস কুকার না সরানোর অপরাধে তন্ময়কে নানা কথা শোনানোর সময় ভাতের সেই বড় চামচ সজোরে কিচেনের সিংক-এর দিকে ছুড়ে মারে। অনতি পরেই প্রথমবারের মতো অশ্রাব্য গালি দেয় সে নিশ্চুপ তন্ময়কে। এতে পিতা জিভ কেটে কন্যার দিকে তাকায়। কিছুই বলে না। শুধু শোনে শান্তির ঘোষণা:

তুই না চাইলেও ড্রাইভিং লাইসেন্স আমি নিয়েই ছাড়বো।

তন্ময় নীরবে মর্মাহত হয় এ জন্যে যে, মহামারির ভয়েই সে বিআরটিএ আয়োজিত আগামী ড্রাইভিং টেস্টে শান্তিকে অংশ নিতে বারণ করে। নইলে কিভাবে গত বছর শান্তিকে ড্রাইভিং শেখার অনুমতি দেয়? পরিচিত এক চালক-প্রশিক্ষককে পারিশ্রমিকও দেয় সে। তবুও পৃথিবীব্যাপী চলমান বিপদের প্রথম মাসেই ওই পরীক্ষার খবর শুনে মহাতঙ্কে আর্তনাদ করে ওঠে তন্ময়: হায় রাম!

রাইস কুকার ঘেরা সেই বিক্ষোভের কারণ শান্তির ব্রত পালন, যা সেদিন জানা থাকেনি তন্ময়ের। ওর ভাইরাস-ত্রাস এমন যে ভোরে বাসার কলিং বেল বাজলেই সে ঘুমের মধ্যেই আঁৎকে ওঠে এবং এক লাফে উঠে বসে। এতে শান্তি খুবই আপত্তিমুখর হয়ে ওঠে। শুধুই কি তা-ই? এদিকে তন্ময়ের ভাই ও ছোট ভগ্নিপতি কি কি কাজে এলে দরজা থেকেই ফিরে যেতে হয় তাদের। তন্ময়ের ভীরুতা দেখে ওরাও দ্রুত কথা বা কাজ সেরে চলে যায়।  ভেতরে আসে না। স্মার্ট ফোনে ভিডিও চ্যাটেই রাতে সরব হয়ে ওঠে ভাই ও বোনেরা। এদিকে সন্তানদেরও নতুন অভিজ্ঞতা হয়। স্কুল বন্ধ থাকার এক পর্যায়ে সংসদ টিভিতে ক্লাস শুরু হয়। তবে সকলের ঘুমকাতরতার দরুন, সকালে টিভির সামনে বাচ্চাদের বসা অব্যাহত থাকে না। এরও পরে, পিপাসার স্কুলের শিক্ষকগণই দুপুর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে ক্লাস নিতে শুরু করেন।

করোনাকালের চতুর্থ মাসে বুয়াকে ডাকার কথা শুনে ভয়ে তন্ময় সম্মতি না দেয়ায় এক রাতে আবার কলহে লিপ্ত হয় শান্তি। কিচেনের ক্যান, ফ্রাই প্যান ইত্যাদিতে মাকে ঝংকার তুলতে দেখে পিপাসা প্রথমবারের মতো প্রতিবাদী হয়ে ওঠে:

স্টপ ইট! স্টপ ইট!! তোমরা কি শুরু করেছো এসব!!!

এ সময় পিপাসার ডান চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে দেখে তন্ময়ের বুক ভেঙে পড়ে। পরে স্ত্রীকে সে বলে:

সন্তানদের সঠিক বিকাশের স্বার্থে আমাদের দেখতে হবে এসব যাতে আর না হয়।

তবুও কোভিডসময়ের পঞ্চম মাসে তন্ময়ের সংসারে সেই নব্বইয়ের দশকের বিরোধীদলীয় ’ইস্যুবিহীন হরতালের’ পুনরাবৃত্তি ঘটে প্রায়। বারান্দার গ্রিলে শুকাতে দেয়া বালিশগুলোর একটি শোবার ঘরে আনার সময় ছিঁড়ে যায়। ওড়ে তুলারাশি। স্ত্রীর সপ্রশ্ন অভিযোগ, স্বামী তার ছেঁড়া বালিশের কথা আগে জানায়নি কেন! তন্ময় বারবার মাথার নীচে তুলা না দেখার কথা বললেও শান্তির আগুন, কয়েক ঘণ্টা বিরতির পরে, রাত প্রায় দ্বিপ্রহরে, লেলিহান শিখায় পরিণত হয়। অপর শোবার ঘর থেকে তন্ময় একটা বালিশ নিয়ে এলে তা ওর গায়ে ছুড়ে মারে শান্তি। এতে নিজের চুপ থাকার পূর্বপ্রতিজ্ঞা ভেঙে আক্রান্তজন বলে ওঠে:

এই সন্ত্রাসী!

তাতেই সারা বাসায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে। মুখের সামনে আঙুল তুলে কি কি সব বলার সময় তন্ময় এবার ছোড়ে নতুন প্রশ্ন:

এমন করছো কেন? তোমার বাপের খাই নাকি?

এতেই শুরু হয় শান্ত