
মজিবর রহমান খোকা নামেই যার পরিচয়ের ব্যপ্তি ফুটে ওঠে শিল্প-সাহিত্য জগতে। সেই কিশোর বয়সেই দেশ মাতৃকাকে শত্রুমুক্ত করতে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছেন। অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন সম্মুখ সমরে। সুদীর্ঘ প্রায় চল্লিশ বছর ধরে জড়িত আছেন প্রকাশনার সাথে। বিদ্যাপ্রকাশের কর্ণধার। প্রকাশনা শিল্পে বিপ্লব ঘটিয়ে এনেছেন আমূল পরিবর্তন। দেশ এবং বিদেশে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছেন বাংলা সাহিত্য, শিল্প এবং সংস্কৃতিকে সমুন্নত করতে। শ্রদ্ধেয় এই গুনীজনের সাথে আলাচারিতায় উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের পূর্ববর্তী বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ এবং শিল্প- সাহিত্যের নানাবিধ বিষয়।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি,কথাসাহিত্যিক, প্রকাশক ও সম্পাদক – জলধি নাহিদা আশরাফী এবং কবি ও কথাসাহিত্যিক নুসরাত সুলতানা
নুসরাত সুলতানাঃ আসসালামু আলাইকুম। শুভ সময়। কেমন আছেন?
মজিবর রহমান খোকাঃ ভালো আছি, আপনি ভালো আছেন?
নুসরাত সুলতানাঃ আপনার জন্ম, শৈশব, পরিবার-পরিজন নিয়ে সংক্ষেপে আমাদেরকে বলুন।
মজিবর রহমান খোকাঃ আমার বাবার নাম মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন এবং মায়ের নাম মন্নুজান খানম। আমার জন্ম রংপুরে। আব্বা ছিলেন সরকারি চাকরিজীবী। সেই সুবাদে আমার লেখাপড়া রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, গুরুদাসপুর নাটোর আবার রাজশাহী। আমরা আট ভাইবোন। আমার এক ভাই মারা গেছে। বর্তমানে আমরা সাত ভাইবোন।
নুসরাত সুলতানাঃ আপনি সবার বড় ?
মজিবর রহমান খোকাঃ আমি ভাইদের মধ্যে বড়। আমার বড় দুই বোন আছে।
নুসরাত সুলতানাঃ প্রাথমিক শিক্ষা জীবন কোথায় শুরু হয়েছিল? কেমন ছিল?
মজিবর রহমান খোকাঃ প্রাথমিক শিক্ষা জীবন শুরু হয়েছিল বগুড়ায় সুবিল প্রাইমারি স্কুলে। করনেশন ইনষ্টিটিউটে প্রাইমারি শিক্ষার পর রাজশাহী। অই যে বললাম বিভিন্ন জায়গায় আমি গিয়েছি। আমি সর্বমোট আট -নয়টি স্কুলে পড়েছি।
নুসরাত সুলতানাঃ তখন আপনার বয়স কত ছিল? কত সালের দিকে হবে?
মজিবর রহমান খোকাঃ বয়স তো ছয়- সাতের ভেতরেই হবে। তখন আইয়ুব খানের শাসন চলছে। ১৯৬১ সাল হবে।
নুসরাত সুলতানাঃ তখন স্কুলড্রেস কেমন ছিল, স্কুলে কী লেখাপড়া করতেন, মেয়েরা স্কুলে যেত কিনা এসব বিষয়ে বলুন।
মজিবর রহমান খোকাঃ সরকারি স্কুলগুলোতে ড্রেস ছিল। অন্য স্কুলগুলোতে তেমন কোনো ড্রেস দেখতে পাইনি। একেক স্কুলে একেক রকম ড্রেস ছিল। আমি কয়েকটি সরকারি স্কুলে পড়েছি। কোনো স্কুলে পাজামা -পাঞ্জাবি ছিল আবার কোনো স্কুলে খাকি প্যান্ট সাদা শার্ট ছিল।
নুসরাত সুলতানাঃ তাহলে কী আমরা এমন ভাবতে পারি যে, তখন বৃটিশ কালচারের রেশ কিছুটা রয়ে গেছে আর পাকিস্তানি কালচার কিছুটা শুরু হয়েছে?
মজিবর রহমান খোকাঃ পাকিস্তানি কালচার কিছু ছিল না মূলত ব্রিটিশ কালচারই ছিল। ব্রিটিশরা যেভাবে ড্রেসগুলো ডিজাইন করেছিল সে ভাবেই চলছিল। আমরা তো তখন ছোট ছিলাম রাজনৈতিক ব্যাপার গুলো বুঝতাম না। পরে অবশ্য বুঝেছি ব্রিটিশ কলোনিয়াল দেশ হওয়ার কারণে ড্রেসগুলো এমন ছিল। শার্ট আর পাজামা যে ছিল সেটা ছিল মাদ্রাসা হাই-স্কুল।
নুসরাতসুলতানাঃ আপনাদের ক্লাসে মেয়েরা পড়ত? আপনার কোনো মেয়ে বন্ধু ছিল?
মজিবর রহমান খোকাঃ হ্যাঁ, প্রাইমারি স্কুলে কো-এডুকেশন ছিল। রাজশাহী গুরুদাসপুরে ক্লাস এইটে পড়তাম সেখানেও মেয়েরা ছিল।
নুসরাত সুলতানাঃ মেয়েরা যে পড়ত তাদের সাথে কথা-বার্তা, আচার-আচরণ কী সহজ এবং সাবলীল ছিল?
মজিবর রহমান খোকাঃ আমি গুরুদাসপুরের কথা বলছি। মেয়েরা একটা রুমে থাকত। তারা শিক্ষকদের সাথে শ্রেনীকক্ষে আসত আবার শিক্ষকদের সাথে বেরিয়ে যেত। এমনকি আমি যখন নাটোর কলেজে পড়ি তখনও এটা দেখেছি যে, শিক্ষকের সাথে মেয়েরা আসতো আবার শিক্ষকের সাথে বেরিয়ে যেত।
নুসরাত সুলতানাঃ কলেজে পড়তেন, সেটা কত সালের কথা?
মজিবর রহমান খোকাঃ ১৯৭২ সাল। এরপরে যখন রাজশাহী ইউনিভার্সিটি তে পড়েছি তখন আর মেয়েরা বেরিয়ে যেত না। তখন মেয়েদের ছেলেদের সাথে একসাথে বসতে, আর গল্প করতে আর কোন বাঁধা ছিল না। মোটামুটি স্বাভাবিক ভাবে মিশত তারা।
নুসরাত সুলতানাঃ তাহলে নারী বন্ধুদের সাথে স্বাভাবিকভাবে মেশার সুযোগ এসেছে বিশ্ববিদ্যালযয়েপড়ার সময়?
মজিবর রহমান খোকাঃ হ্যাঁ। বিশ্ববিদ্যালয়ের আগে সেভাবে দেখিনি। বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রথম মেয়েদের সাহচর্যে এসেছিলাম। কিন্তু আরেকটা জিনিস ছিল না যেটা এখন আমরা দেখি। এখন যেভাবে ক্লাস থ্রি থেকে মেয়েদের বোরখা পরানো হয় সেটা কিন্তু তখনকার ছাত্র সমাজে ছিল না। আমাদের স্কুলে যেসব মেয়েরা ক্লাসে আসত তারা স্বাভাবিক কাপড় পরেই আসত। এমনকি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও আমি বোরকা পরতে দেখিনি মেয়েদের।
নুসরাত সুলতানাঃ ইতিমধ্যে অনেকখানি বলেছেন। তারপরও একটু বলুন আপনার মাধ্যমিক পর্যায়ে কখন শুরু হল এবং তখন সমাজের পরিবর্তনগুলো কেমন ভাবে ঘটছিল? ব্রিটিশ আমল থেকে পাকিস্তানি আমল শুরু হল। পরিবর্তনটা কীভাবে সাধিত হচ্ছিল?
মজিবর রহমান খোকাঃ আমি যখন মাধ্যমিকে তখন ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করলাম যে, পশ্চিম পাকিস্তানিরা কখনোই ক্ষমতা পূর্ব পাকিস্তানের হাতে দিতে চায় না। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থাকবে পশ্চিম পাকিস্তান। দেশভাগ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত দেখেছি ক্ষমতা তাদের হাতেই ছিল। বঙ্গবন্ধু যখন নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখন বিভিন্ন জায়গায় তিনি ভাষণ দিতেন। সেসব ভাষণগুলো আমরা শুনতে যেতাম, শুনতাম। রাজশাহী এবং নাটোরে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ প্রাঙ্গণে আমি ভাষণ শুনেছি। ওই ভাষণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের শোষণের বিষয়টা এবং পার্থক্যগুলো আমাদের ভেতরে তুলে ধরতেন। আমরা যে নির্যাতিত হচ্ছি, শোষিত হচ্ছি, বঞ্চিত হচ্ছি সেটা বঙ্গবন্ধু চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতেন। তখন বাঙালিদের সংঘটিত হওয়ার একটা চেতনা তৈরি হয়ে গেছে প্রত্যেকের ভেতরে। বাঙালি যে শোষিত হচ্ছে সেটা বুঝে গিয়েছিল ৬৯- ৭০ বা তারও আগে থেকে।
নুসরাত সুলতানাঃ তাহলে আমরা বলতে পারি যে, আপনি যখন মাধ্যমিক পর্যায়ে ছিলেন তখনই বাঙালির আলাদা জাতিসত্তা প্রস্ফুটিত হতে শুরু করেছিল? বাঙালি যে আলাদা জাতি, আলাদা সংস্কৃতি আলাদা চিন্তাভাবনা সেটা ক্রমশ স্পষ্ট হতে আরম্ভ করে?
মজিবর রহমান খোকাঃ তার আগে রাজনৈতিক ব্যাপারটা আমরা বুঝিনি। তবে বাসায় যে আলাপ-আলোচনা হতো তাতে আমরা উদ্বুদ্ধ হয়েছি।
নুসরাত সুলতানাঃ আপনি ইতিমধ্যে বলেছেন যে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আপনার গ্রাজুয়েশন। সেই সময় ছাত্র রাজনীতিতে পরমত সহিষ্ণুতা, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন এই ব্যাপারগুলো কেমন ছিল?
মজিবর রহমান খোকাঃ এটা খুব একটা সুখকর ছিল না। স্বাধীনতার পরে যখন আমরা কলেজে ভর্তি হলাম- দেখলাম যে, ছাত্ররাজনীতির ভেতরে অসহিষ্ণুতা ও এক ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। স্বাধীনতার পূর্বে মুসলিম লীগের ছাত্র সংগঠন যেমন আওয়ামী ছাত্র সংগঠন ওপর হামলা করত, স্বাধীনতার পরে দেখা গেল, আওয়ামী-ছাত্রলীগ আর জাসদ ছাত্রলীগ দুটো ভাগ হওয়ার পরে গোলাগুলি মারামারি এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রম চরমভাবে চলতে লাগল। এটা এমন ভাবে ছড়িয়ে গেল যে, মুহূর্তের ভিতর সারাদেশব্যাপী এর সাথে যুক্ত হলো আরো অনেকে। আমি তখন রাজনীতির সাথে জড়িত না থাকলেও এগুলো আমাকে ভীষণ পীড়া দিত। কিন্তু এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য আমরা সংগঠিত ছিলাম না। এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে আমি একটি গুপ্ত সংগঠন করেছিলাম যারা দুর্নীতি করত, কালোবাজারি করত তাদের উপর আক্রমণ করতাম। যাদের দুর্নীতির প্রমাণ পেতাম তাদের সরাসরি আক্রমণ করতাম। কয়েকজন দুর্নীতিবাজের উপর কয়েকটা আক্রমণ করেছিলাম। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি জেনে যায়। আব্বা যেহেতু সরকারি চাকরি করতেন প্রশাসনের মাধ্যমে আব্বার কানে যায় যে, আমি এই কাজগুলো করছি। তখন আব্বা আমাকে বললেন যে, তুমি এই সংগঠন করা বাদ দাও অথবা বাসা থেকে চলে যাও। এরকম কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেলে আমার (আব্বার) চাকরিতে সমস্যা হবে। বাসা থেকে গিয়ে কোথায় থাকবো? তাই সংগঠনটিই বাধ্য হয়ে বাদ দিলাম।
নুসরাত সুলতানাঃ কতদিন ছিল ওই সংগঠন?
মজিবর রহমান খোকাঃ এক বছর ছিল এবং এরমধ্যে কয়েকটা ছোটখাটো অপারেশন আমরা করেছিলাম।
নুসরাত সুলতানাঃ একটা অপারেশন বিস্তারিত বলবেন?
মজিবর রহমান খোকাঃ না ( মৃদুহাসি)। ওটা না বলাই ভালো। ওটা গোপন ছিল গোপনই থাক।
নুসরাত সুলতানাঃ সেই বন্ধুরা এখন কোথায় আছে?
মজিবর রহমান খোকাঃ সেই বন্ধুরা রাজনীতিতে হাই প্রোফাইলে চলে গেছে। মন্ত্রী হয়েছেন অনেকেই পরবর্তীতে।
নুসরাত সুলতানাঃ আপনি কত সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন?
মজিবর রহমান খোকাঃ ১৯৭৪ সাল।
নুসরাত সুলতানাঃ বাংলাদেশ তখন একটা স্টেজ অতিক্রম করছে মুক্তিযুদ্ধে কিভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন?
মজিবর রহমান খোকাঃ আমরা যখন মাধ্যমিক স্কুলে পড়ি, তখন রাজনীতিতে জড়িত ছিলাম না। বন্ধু-বান্ধবদের সাথে ইলেকশনের সময় মিটিং- মিছিল করছি,আনন্দ করতাম। কিন্তু নির্বাচনের পর যখন বঙ্গবন্ধুর হাতে ক্ষমতা দিতে গড়িমসি করছে তখন আমরা সবাই খুব অস্থির হয়ে উঠলাম। তথাপি প্রতিরোধের বিষয়গুলো তখনও আমাদের মাথায় ছিল না। ভবিষ্যতে কী হবে সেটাও ভাবিনি। একসময় না একসময় বঙ্গবন্ধুর হাতে ক্ষমতা দেবেই এমনই ভেবেছি। যখন দিচ্ছে না এবং ২৫শে মার্চ বঙ্গবন্ধুকে এরেস্ট করে নিয়ে গেল এবং সারাদেশে নির্মম হত্যাকাণ্ড শুরু হলো, তখন নাটোরে গুজব ছড়ানো হল যে, নাটোরে বিহারী পট্টিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সিভিল ড্রেসে এসে জড়ো হয়েছে নাটোর আক্রমণ করার জন্য। তখন আব্বার কাছে বন্দুক ছিল। নাটোর মহাকুমা প্রশাসন থেকে মাইকিং করা হল, যাদের কাছে বন্দুক আছে তাদেরকে বিহারী পাড়ায় গিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীদেরকে মোকাবেলা করার জন্য। তখন আব্বা গেলেন, আব্বার সাথে আরও কয়েকজন গেলেন। কয়েকজন পুলিশ ছিল। এরা সবাই মিলে গোলাগুলি করার পরে বিহারী পট্টি থেকে থেকে সাদা পতাকা ওড়ানো হলো। তারা বলল যে, আত্মসমর্পণ করেছে। আত্মসমর্পণের পরে তাদেরকে নাটোর জেলে বন্দি করে রাখা হলো। ওই ঘটনা থেকেই আমাদের মনে হতে থাকে যে, এই ঘটনা অন্য দিকে মোড় নেবে। বঙ্গবন্ধুর হাতে আর ক্ষমতা দেবে না। এরপর এপ্রিলের ১৪ তারিখের দিকে নাটোরে পাকবাহিনী প্রবেশ করে। তার আগেই আমাদের পরিবারের অধিকাংশ সদস্য শহর থেকে নিরাপদ স্থানে সরে গিয়েছিল। ১৪ তারিখে আমি, আব্বা আর আমার ছোট ভাই পাক বাহিনীর সামনে পড়ে গিয়েছিলাম। সৌভাগ্যবশত সেদিন আমরা মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিলাম। ওখান থেকে আমরা হালদি নামক একটা জায়গায় চলে যাই সেখানে আব্বার সাইট অফিস ছিল।
এর ভেতরে মুজিবনগর সরকার গঠিত হলো। আব্বা বললেন যে, আমরা দেশে চলে যাই আমি আর চাকরিতে যাব না। ওখান থেকে বড় একটা নৌকা ভাড়া করে আমাদের গ্রামের বাড়ি তেজখালী বাঞ্ছারামপুরে যাই। গুরুদাসপুর থেকে গ্রামের বাড়ি যেতে দশ দিন লেগেছিল আমাদের। নৌকায় যাওয়ার পথে আমরা দেখেছি কিভাবে শত শত মানুষ আর পশু-পাখির লাশ ভেসে যাচ্ছে পাক বাহিনীর গনহত্যায়! নদীর ধারের বাজারগুলো কিভাবে পুড়ে বিরান হয়ে গেছে! এগুলো দেখতে দেখতে আমরা বাড়ি যাই। বাড়ি গিয়ে সিদ্ধান্ত নিই যে, একটা কিছু আমাদের করতে হবে। যুদ্ধতো শুরু হয়ে গেছে আমরা জানতাম কিন্তু কিভাবে যুদ্ধে যাবো সেই পথটা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। মে মাসের ৩০ তারিখে আমাদের বাড়ির কাছের নদী তিতাস নদীর ঘাটে একটা নৌকা ভিড়েছিল। নৌকা থেকে কিছু লোক আর্মস, গোলা-বারুদ নিয়ে নেমেছিল। এটা দেখে সবাই ছোটাছুটি করে গ্রাম খালি হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা হয়। তারা ডেকে বললেন যে, আমরা রাজাকার না পাকিস্তানি আর্মি ও না। ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়ে এসেছি আমরা মুক্তিযোদ্ধা। আমরা আপনাদের এখানে কিছুদিন থাকব। রাজাকার বা পাকিস্তানি আর্মি হলে তারা গোলাগুলি করতে করতে আসত। তারা গোলাগুলি করেনি এবং একজন মুরুব্বীকে তারা ডাকছিলেন। ডেকে বললেন, এই বাসায় মুরুব্বি কে আছেন? একটু আসেন। তখন সবাই মোটামুটি আশ্বস্ত হয় যে তাঁরা মুক্তিযোদ্ধা। এরপর আব্বা গিয়ে তাদের সাথে কথা বলেন। তাদেরকে ডেকে নিয়ে তিনি থাকা এবং খাওয়ার ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু এর ভেতরে আমি আমাদের বাড়িতে ছিলাম না। আমি ছিলাম আমাদের গ্রাম থেকে দুই গ্রাম দূরে ফুপুদের বাড়িতে। খবর পেয়ে চলে আসলাম। তারপর তাদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করলাম। তাদের দলনেতা ছিলেন ক্যাপ্টেন জামান। আমাদের ঘরের ভেতরে একটা আলাদা রুমে উনারা খেয়েদেয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম , আমি একটু আসবো? জামান সাহেব বললেন আসো। তারপর আমাকে গোলাগুলি, আর্মস দেখালেন। কোন আর্মস থেকে গুলি ছুড়লে কতটুকু যায়, মাইন, গ্রেনেড, ডিনামাইট আমাকে সবকিছু দেখালেন। আমি জানতে চাইলাম আমি কিভাবে যুদ্ধে যেতে পারি? ক্যাপ্টেন জামান বললেন তোমাকে যুদ্ধে যেতে হলে ভারতে যেতে হবে ট্রেনিং নিতে। আমি বললাম আমি ভারতে কোথায় যাব? কীভাবে যাব? ক্যাপ্টেন জামান বললেন এখানে কেউ একজন নিশ্চয় আছেন যিনি সুপারিশ করে দেন। তুমি খুঁজে বের করো। সুপারিশ নিয়ে যাও তাহলে ওখানে রিক্রুট ক্যাম্পে দিলে ওরা তোমাকে ট্রেনিং সেন্টারে পাঠাবে। খোঁজ খবর নিয়ে দেখলাম আমাদের বিষ্ণুরামপুর বাজারে একজন ডাক্তার আছেন। আমরা জানতাম না যে তিনি এই কাজটি করেন। তার নাম শামসুল ডাক্তার। তিনি কয়েকদিন পরপরই লোকজনকে এভাবে ভারত পাঠান। আমাদেরকেও পাঠিয়ে দিলেন। আমরা দশজন গেলাম। ওখান থেকে সিএনবি রোড আছে একটা।
সেই রোড পার হতে গিয়ে আমরা বিপদে পড়ে গিয়েছিলাম। পাকিস্তানি আর্মিদের সামনে পড়ে গিয়েছিলাম। তখনো দৈবক্রমে বেঁচে গিয়েছিলাম। কিছু অলৌকিক ঘটনা জীবনে ঘটেছে। বেঁচে গেছি বিভিন্ন দুর্বিপাক থেকে। কোনভাবেই বাঁচার কথা ছিল না। সামনে পড়ে গিয়েছি অন্যদেরকে গুলি করে মেরেছে কিন্তু আমাদেরকে দেখে ও হয়তো দেখেনি। তারপরে আগরতলা গিয়েছি। আগরতলা তিনদিন থেকে রিক্রুট করে আমাদেরকে আসামে পাঠিয়ে দেয়। আসামে লোহারবণ ট্রেনিং সেন্টার। ভারতীয় সেনাবাহিনী দ্বারা পরিচালিত হতো। তারা প্রথমে একমাস ট্রেনিং দিত। সেখান থেকে বাছাই করে অল্প কজনকে আরো দুই সপ্তাহ লিডারশিপ ট্রেনিং দিত। আমি লিডারশীপ ট্রেনিংটাও নিয়েছি। তারপর ওখান থেকে সিলেট জালালপুর সাব সেক্টর ওখানে দুই-তিন সপ্তাহ যুদ্ধ করেছি। এরপর ওখান থেকে ফিরে আগরতলা হয়ে আবার আমাদের বাঞ্ছারামপুর থানায় ফিরে ওখানে যুদ্ধ করেছি। স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত।
নুসরাত সুলতানাঃ এমন কোন স্মৃতি আছে যা আপনাকে তাড়িয়ে বেড়ায় বা আপনি ঘুমের ভেতরেও চমকে ওঠেন বা একা যখন থাকেন ওই স্মৃতিতে অবগাহন করেন?
মজিবর রহমান খোকাঃ স্মৃতি তো অনেক আছে কিন্তু আমার একটা ব্যর্থ স্মৃতি আছে। ব্যর্থ স্মৃতি হচ্ছে, আমরা যখন বাঞ্ছারামপুরে এলাম আমাদের কোম্পানিতে একটা এলএমজি ছিল না। আমি যখন সিলেটে যুদ্ধ করেছি তখন আমি সেকশন কমান্ডার ছিলাম। বাঞ্ছারামপুরেও আমি সেকশন কমান্ডার ছিলাম কিন্তু সিলেটে সেকশন কমান্ডার থাকাকালীন সময়ে এলএমজি ছিল। বাঞ্ছারামপুরে ছিল সেল্ফ লোডিং রাইফেল বা এসএলআর। একারণে যুদ্ধ করার জন্য ভালো অস্ত্র ছিল না। ভালো অস্ত্র না থাকলেতো যুদ্ধ করা যায় না। সিলেটে ভালো অস্ত্র ছিলো। বাঞ্ছারামপুরে একশো বিশজনের জন্যও একটা এলএমজি ছিল না। যেখানে সিলেটে প্রতি দশজনের জন্য একটা করে এলএমজি ছিল। বাঞ্ছারামপুরে আমাদের এসএলআর ছিল তাও একটা কোম্পানিতে মাত্র ষোলটা এসএলআর। ও দিয়ে তো আসলে যুদ্ধ হয় না কিন্তু আমার মনোবল ছিল প্রবল। যুদ্ধ করব এই তাড়নায় যুদ্ধ করে গেছি রাইফেল আর এস এল আর দিয়েও ওদেরকে যথেষ্ট পরিমাণে ঘায়েল করেছি, মেরেছি এবং আহত করেছি। তাদের থানা কম্পাউন্ড থেকেই বেরোতে দেইনি এরকমভাবে ঘিরে রেখেছিলাম। ওটা ছিল প্রবল সাহস এবং মনোবলের ফল। এভাবেই ভেবেছি যে, যুদ্ধ যখন করতে এসেছি যুদ্ধই করব। একদিন আমরা দেখলাম আমরা যখন যুদ্ধ করে ফিরে আসছি তখন ওরা লাইন দিয়ে মার্চ করে আসছিল। আমার কাছে যদি এলএমজি থাকতো তাহলে আমি নিশ্চিত থাকতাম যে, আমি বিজয় অর্জন করব। আমার হাতে আছে এসএলআর। এসএলআর দিয়ে এক রাউন্ড করে গুলি হয়। এলএমজির মত ব্রাশফায়ার হয়না। আমার দরকার ব্রাশফায়ার একসাথে সবগুলোকে টার্গেট করা। তখন আমার মনে পড়েছিল ট্রেনিংয়ের সময় বলেছিল, যদি এসএলআর দিয়ে ব্রাশফায়ার করতে হয় তাহলে সেপটিপিন খুলে নিতে হবে। আমি কোনদিন এসএলআর দিয়ে ব্রাশফায়ার করিনি। সেদিন সেপটিপিন খুলে ফেলেছি। বেশিক্ষণ গুলি হবে না কিছুক্ষণ হওয়ার পর আমার ব্যারেল মানে যেটা দিয়ে গুলি বের হয় সেটা বাঁকা হয়ে যেতে পারে। তবুও আমি রেডি আমার রেঞ্জের ভিতরে চলে আসছে। আমি প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম একসাথে কয়েকটা গুলি বের হওয়ার পর আর বের হবে কিনা জানিনা । ভেবেছিলাম যেভাবে হয় সেভাবেই আক্রমণ করব। কিন্তু ওরা আগায়নি, ফিরে চলে গেছে। ওই যে ফিরে চলে গেছে। ওই ফিরে চলে যাওয়াটাই আমার কাছে সবচেয়ে বিরক্তিকর এবং ব্যর্থ হওয়ার স্মৃতি। সামনে যে ছিল সে ক্যাপ্টেন ছিল যদি তাকে মারতে পারতাম আরো কয়েকজনকে মারতে পারতাম তাহলে একটা বড় অর্জন হত। এই ব্যর্থতাই আমাকে সারাজীবন তাড়িয়ে বেড়ায়।
