একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও হৃদয়মথিত কালো অধ্যায়ের নাম পচাত্তরের ১৫ই আগস্ট।এইদিনে বাঙালি জাতি হারিয়েছে তার সহস্র বছরের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম সন্তান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। একদল নরপিশাচ একাত্তরে পরাজিত হায়েনাদের যোগসাজশে রাতের অন্ধকারে নির্মমভাবে হত্যা করে মুক্তিযুদ্ধের প্রাণপুরুষকে। এমন নৃশংসতায় বোবা হয়ে গিয়েছিলো পুরো জাতি। জাতির সেই বোবাকালে খুবই ক্ষুদ্রাকারে ও ক্ষীণকন্ঠে শোকের সমুদ্র থেকে জেগে উঠেছিলো অল্পকিছু কন্ঠস্বর- মিনার মনসুর তাদের মধ্যে অন্যতম। বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের স্বপ্নাপ্লুত তারুণ্যের সেই মিনার মনসুর আজ দেশের একজন স্বনামখ্যাত কবি। তাঁর কবিতা ও কাব্যমানস নিয়ে মনমানচিত্র-এর এই প্রতিকৃতি আয়োজন।এই আয়োজনে সন্নিবেশিত হয়েছে মিনার মনসুরের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি, একগুচ্ছ কবিতা, কাব্যভাবনা নিয়ে লিখেছেন শামস আরেফিন এবং বই আলোচনা করেছেন কামরুল হাসান।


মিনার মনসুর: কবি ও কবিতার ভুবন
মিনার মনসুর বঙ্গবন্ধু-হত্যাপরবর্তী প্রতিবাদী সাহিত্যধারার নিবেদিতপ্রাণ এক কবি, সংগঠক ও গবেষক। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রথম মাইলফলক স্মারকগ্রন্থ ‘শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ’ সম্পাদনা ও প্রকাশ করেছেন ১৯৭৯ সালে। ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে বাংলা একাডেমি গ্রন্থটি পুনর্মুদ্রণ করেছে ২০২০ সালে। বঙ্গবন্ধুর তৃতীয় শাহাদত বার্ষিকী উপলক্ষ্যে ১৯৭৮ সালে প্রকাশ করেছেন বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত লিটলম্যাগ ‘এপিটাফ’। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে ‘আবার যুদ্ধে যাবো’ শিরোনামে একটি বিশেষ বুলেটিন প্রকাশ করেছেন ১৯৮০ সালে। এতে পঁচাত্তরের ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া তুলে ধরা হয়েছে। এটিও পুনর্মুদ্রণ করেছে বাংলা একাডেমি। ১৯৮৩ সালে সামরিক জান্তা কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়েছে জাতির পিতাকে উৎসর্গকৃত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘এই অবরুদ্ধ মানচিত্রে।’
বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদের পাশাপাশি তাঁর রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে অক্লান্তভাবে লেখালেখি করে চলেছেন চার দশকেরও বেশি সময় ধরে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তাঁর দুটি প্রবন্ধগ্রন্থ ‘আমার পিতা নয় পিতার অধিক’ এবং ‘বঙ্গবন্ধু কেন দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন’ বহুল পঠিত। কিশোর-তরুণদের জন্য তাঁর লেখা বঙ্গবন্ধুর জীবনভিত্তিক গ্রন্থ ‘অনন্য এক পিতাপুত্রীর গল্প’ ইতোমধ্যে ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। প্রকাশের অপেক্ষায় আছে বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব নিয়ে একটি অণুপুঙ্খ গবেষণাগ্রন্থ ‘কী ছিল বঙ্গবন্ধুর মনে’। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে ‘মুক্তিযুদ্ধের উপেক্ষিত বীর যোদ্ধারা’ নামে গুরুত্বর্পূণ একটি গবেষণাগ্রন্থ।
লেখালেখির শুরু সত্তরের দ্বিতীয়ার্ধে। মূলত কবি। তবে গদ্যেও দ্যুতিময় তাঁর কলম। একেবারেই স্বতন্ত্র স্বর – সেটি কী সাহিত্যে কী ব্যক্তিত্বে। নিভৃতচারী হলেও নিরন্তর নিরীক্ষা এবং নিজেকে অতিক্রমণের প্রবল প্রয়াস তাঁকে করে তুলেছে বাংলা কবিতার বিশিষ্ট এক কণ্ঠস্বর। সহজতা ও সুদূরতা, অস্তিত্ব ও অস্তিত্বহীনতা এবং মৃত্যু ও মৃত্যুহীনতা হাত ধরাধরি করে চলে তাঁর কবিতায়। তবে প্রায়শ সবকিছুকে ছাপিয়ে ওঠে পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণ ও ধূলিকণার জন্যে অনন্য এক মমত্ববোধ।
২
বঙ্গবন্ধু পরিষদের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এবং বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (কাদের চুন্নু) মনোনীত প্রার্থী হিসেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু)-এর নির্বাচিত বার্ষিকী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন পঁচাত্তরপরবর্তী কঠিন সময়ে। শোককে শক্তিতে পরিণত করার প্রত্যয়ে তরুণদের সংগঠিত করেছেন। পরিচালনা করেছেন ‘শেকড়’ নামে একটি পাঠচক্র। প্রতিবাদী ও আপসহীন ভূমিকার কারণে সামরিক জান্তার রোষানলেও পড়তে হয়েছে তাঁকে। গদ্যপদ্য মিলিয়ে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থসংখ্যা ৩০টির অধিক। সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্যে ‘শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মৃতিপদক’ (২০১৭) ও পটিয়া ফাউন্ডেশন প্রদত্ত গুণী সম্মাননা (২০২২)সহ পেয়েছেন বেশকিছু স্বীকৃতি ও সম্মাননা।
মিনার মনসুরের জন্ম ২০ জুলাই ১৯৬০ সালে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার বরলিয়া গ্রামে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (১৯৮৩) ও স্নাতকোত্তর (১৯৮৪)। উভয় পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্তির জন্যে শহীদ নূতন চন্দ্র সিংহ স্মৃতি পুরস্কারপ্রাপ্ত। সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন দীর্ঘকাল। দৈনিক ‘সংবাদ’-এর সহকারী সম্পাদক ছিলেন। দীর্ঘ প্রায় এক যুগ কাজ করেছেন দৈনিক ইত্তেফাকের সহকারী সম্পাদক ও সম্পাদকীয় বিভাগের প্রধান হিসেবে। ২০১৯ সাল থেকে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জাতীয় প্রেসক্লাবের স্থায়ী সদস্য এবং বাংলা একাডেমির জীবন সদস্য।
৩. উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ
কবিতা:
এই অবরুদ্ধ মানচিত্রে (১৯৮৩, বাজেয়াপ্ত);
জলের অতিথি (১৯৯৪)
কবিতা সংগ্রহ (২০০১)
মা এখন থেমে যাওয়া নদী (২০১২)
মিনার মনসুরের দ্রোহের কবিতা (২০১৩)
মিনার মনসুরের প্রেমের কবিতা (২০১৩)
পা পা করে তোমার দিকেই যাচ্ছি (কলকাতা, ২০১৬)
নির্বাচিত কবিতা (২০১৬)
আমার আজব ঘোড়া (২০১৯)
নির্বাচিত ১০০ কবিতা (২০২০)
ব্রাসেলসের সন্ধ্যাটি ছিল মনোরম (প্রকাশিতব্য)
গল্প:
অতল জলের টানে (২০১৭)
ছড়া:
চিরকালের নেতা (২০২০)
গবেষণা:
হাসান হাফিজুর রহমান: বিমুখ প্রান্তরে নিঃসঙ্গ বাতিঘর (বাংলা একাডেমি, ১৯৯৯)
ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত: জীবন ও কর্ম (বাংলা একাডেমি, ২০১২)।
প্রবন্ধ:
কবি ও কবিতার সংগ্রাম (২০১৩)
আমার পিতা নয় পিতার অধিক (২০১৯)
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শত্রুমিত্র (২০১৯)
বঙ্গবন্ধু কেন দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন (২০২১)
কী বার্তা বয়ে আনে ষাটোর্ধ্ব একুশ (২০২১)
কালান্তরে কবির মুখ ও মুখোশ (২০২১)
শেখ হাসিনার স্বদেশযাত্রা: কী ট্র্যাজিক কী মহাকাব্যিক (প্রকাশিতব্য)
জীবনী:
ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত (বাংলা একাডেমি, ১৯৯৬)
কিশোরগল্পগ্রন্থ:
জলপাইরঙের একটি হেলমেট আর এক জোড়া বুট (২০১৮)
কিশোরইতিহাসগ্রন্থ:
অনন্য এক পিতাপুত্রীর গল্প (২০২১)
An Extraordinary Father-Daughter Story (২০২২)
৪. সম্পাদিতগ্রন্থ
শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ (প্রথম প্রকাশ: ১৯৭৯)
শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মারকগ্রন্থ (১৯৯৪, যৌথ)
শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের আত্মকথা (১৯৯৫, যৌথ)
মুক্তিযুদ্ধের উপেক্ষিত বীর যোদ্ধারা ( প্রথম প্রকাশ: ২০০৮);
বাংলাদেশের সমাজ, রাজনীতি ও উন্নয়ন: বিশিষ্টজনের ভাবনা (প্রথম প্রকাশ: ২০১০)
সিকদার আমিনুল হক রচনাসমগ্র (২০১৫)
তারুণ্যের চোখে বঙ্গবন্ধু (২০২০)
মিনার মনসুর: কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক। পরিচালক: জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র।
মিনার মনসুরের একগুচ্ছ কবিতা
কোথায় তোমার এত ঢাল–তলোয়ার?
তিনি কোনো আগন্তুক নন;
মোটেও অপ্রত্যাশিত নয় তার আগমন।
যেভাবে বিদ্যুৎ কিংবা পত্রিকার বিল নিয়ে আসে
ঝকঝকে জিন্স পরা অস্থির তরুণ;
আসে মুরগিওয়ালা, মাছের বেপারি, সেইভাবে–
ঠিক… ঠিক সেইভাবে তিনিও আসেন–
তুমি চাও বা না চাও!
বেজে ওঠে কলিংবেল একঘেয়ে স্বরে–
কখনো বাজে না তাও; তবু তিনি ঠিক পৌঁছে যান
প্রার্থিত গন্তব্যে তার এবং আচমকা
তুমি দেখো– নেই, নেই; যেখানে তোমার
হৃৎপিণ্ড রাখা ছিল– সেটি আর কোনোখানে নেই!
শুধু তোমার বেসুরো চিৎকার মাথা ঠুকে মরে
ইঁট-কাঠ-কংক্রীটের নিধুয়া পাথারে।
শুনে ডন কিহোতের ঘোড়ারাও মুখ টিপে হাসে–
ভ্রুকুঞ্চিত করে যত যুধ্যমান পাড়া-প্রতিবেশী!
তিনি আসছেন– যেভাবে আসেন তিনি সর্বদাই!
তফাৎ কেবল এই…এইটুকু যে এবার তিনি আসছেন
দামামা বাজিয়ে! প্রিয় পাড়া-প্রতিবেশী
কোথায় তোমার এত ঢাল-তলোয়ার?
সবাই তখন প্রমিথিউসকে খুঁজছিল
সত্যিই সেটি ছিল আমাদের এ যাবৎ কালের দেখা ভয়ঙ্করতম দুঃস্বপ্ন। আমি ক্রমাগত হাত-পা ছুড়ছিলাম আর ঘামছিলাম। আমার স্ত্রী চোখেমুখে জল ছিটাচ্ছিল আর আমার অবাধ্য হাতপাগুলোকে শান্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল অক্লান্তভাবে। আচমকা ধেয়ে আসা অতিকায় এক সাদা তিমির বিশাল কালো হা-এর ভেতর তলিয়ে যেতে যেতে আমি আবার ভেসে উঠি। আনন্দে লাফিয়ে উঠে ছুটে যাই রৌদ্রস্নাত ভোরের বারান্দায়– যেখানে তখনো দুটি দুরন্ত বুলবুলি ঝগড়া করছিল আর পুঁইশাকের বেগুনি ডগাটি মাথা নাড়ছিল আপনমনে!
আর তখনই তাকে ত্রস্ত ছুটে আসতে দেখি আমাদের পশ্চিম ধানমন্ডির সংকীর্ণ গলিপথ ধরে। এমন ভয়ার্ত মুখ কেউ কখনো দেখেনি আগে। যদি বলি তিনিই আমাদের আদিমাতা তাহলে সামান্যই বলা হবে। কত নিবিড়ভাবেই না চিনি আমরা তাকে– সর্বসংহা, অজাতশত্রু, শাশ্বত এ মাতৃমূর্তিটিকে! তার বিদীর্ণ বক্ষ থেকে ছিন্নভিন্ন মাংসপিণ্ডের মতো খসে পড়ছিল শত সহস্র সন্তানের শব!
হীরক ও স্বর্ণখচিত পদকগুলো ছিল পরিত্যক্ত। ঝলমলে পতাকাগুলো ছিল অর্ধনমিত। নাচঘর আর পানশালাগুলোতে উড়ছিল শোকের পতাকা। খাঁচাবন্দি শিশুদের অবাক হয়ে দেখছিল তাদের পোষা কুকুর ও প্রিয় পুতুলবাহিনী। বাতিগুলো নিভে আসছিল একে একে। বাতিগুলো নিভে আসছিল একে একে।
বাইরে খুব হট্টগোল। সবাই তখন প্রমিথিউসকে খুঁজছিল।
যুদ্ধ জারি আছে
জানি, তোমার অদৃশ্য থাবা দুমড়েমুচড়ে দেবে
দক্ষিণের বালাখানা– থেমে যাবে ক্লান্ত বায়ুকল।
সব, সবই কি থেমে যাবে!
তুমিই থামিয়ে দেবে মহাজাগতিক ঘড়ি? তুমি?
আমাদের সন্তানেরা তখনো থাকবে।
আমাদের সন্তানেরা তখনো থাকবে।
তাদের অকুতোভয় তরবারি আর ঝলমলে শিরস্ত্রাণ
সাক্ষ্য দেবে– যুদ্ধ জারি আছে, থাকবেই।
হিসাবটা সাদাকালো
সকালেই যাহা তিনশত নয় ঠিক
দুপুরেই দশরাজ!
গতকাল যিনি কুতুব মিনার তিনি
শুধুই সংখ্যা আজ।
মিনার ভাঙবে মিনার উঠবে– সূর্য
ফেরি করবেই আলো;
ফিঙেরা গাইবে বেলিরা দোলাবে মাথা–
হিসাবটা সাদাকালো!
টাকার পাহাড়ে গড়াগড়ি যাও কিংবা
সন্ন্যাস নাও বনে;
আখেরে তো সেই বিশাল শূন্য এক
খেলিছে আপন মনে।
তবু বুক কাঁপে
বলছি বটে যে– পাচ্ছি না ভয় মোটে;
ডুবলে ডুবুক– নাগনাগিনীর ভোটে
অনেক সাধের সপ্তডিঙ্গাখানি;
বণিকের মাথা ঠিক উঁচু রবে, রানি!
বলছি বটে যে– যত জারিজুরি তার
জানা আছে সব; করি না পরোয়া আর!
দেবী বা ডাকিনি–কিবা আসে যায় তাতে–
কলিজাই খাবে কিংবা মারবে ভাতে!
বলছি বটে যে– তৈরি হয়ে আছি; মাছি
দেখুক মানুষ– কলজেটা ধরে আছি!
শবভুক তুমি– তোমার দৌড় তো জানি–
তবু বুক কাঁপে–কাঁপছে ভুবনখানি।
সহস্র এক রজনীর গল্প
আমি বললাম, ‘তোমরা একে অপরের শত্রু হিসেবে নেমে যাও। পৃথিবীতে কিছুকালের জন্য তোমাদের বসবাস ও জীবিকা রইল।’[সুরা বাকারা, রুকু-৪, আয়াত-৩৬]
১
তাহলে লাল টিপ দিয়েই শুরু করা যাক সহস্র এক রজনীর গল্প…। শাহজাদি তার গোলাপি নেকাবে ঢাকা অবয়বে শীতসকালের ধলেশ্বরীর মতো আলো-জলে মাখামাখি অদ্ভুত এক ঢেউ তুলে বাঁকা চোখে তাকালেন সেনাপতির দিকে। সেনাপতি গর্জে উঠলেন: ‘ইউক্রেন নয় কেন?… খাঁ সাহেবের উইকেট যদি উড়ে যায়—দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ক্যাপ্টেন্স হেরেমের হবেটা কী গো! কৌন বাঁচায়গা হামারে পেয়ারে ইসলাম কো! হা হা হা।’গোলাপি দুলতে থাকেন—দুলতেই থাকেন—যেন জবরদস্ত এক কাওয়ালির আসরে জাঁদরেল কোনো প্রতিপক্ষের মুখোমুখি তিনি। তার চোখ জেনারেলের উপচে পড়া গ্লাসে। আর তার গনগনে ঠোঁট থেকে অনিচ্ছুক আঙুরের মতো গড়িয়ে পড়ে কিছু শব্দ: ‘কথা তো সেই একই, জাহাঁপনা। প্রতি রাতে আমাদের একটি নাদুসনুদুস শিকার চাই। নাদুসনুদুস শিকার! তাকে কীভাবে মারা হবে, সেটা নির্ভর করছে আপনার মেজাজ-মর্জির ওপর। বন্দুকে অরুচি হলে আমরা টেঁটাও ব্যবহার করতে পারি। খাঁটি নরসিংদীর টেঁটা!’
২
পিষেই তো ফেলতে চাই আমি আপনাকে, আপনি আমাকে। টম অ্যান্ড জেরি। জেরি অ্যান্ড টম। আজ রাতে আপনি টম, আমি জেরি। আবার দাবার ছক পাল্টেও যেতে পারে এই রাতে কিংবা অন্য কোনো রাতে। সারকথা হলো, আপনি আমাকে নিয়ে খেলছেন, আমি আপনাকে। বিশাল এক দাবার বোর্ডের দুই প্রান্তে থাবা পেতে বসে আছি আমরা দুজন।কী দুঃসাহস! আপনার-আমার মাথা টপকে এরই মধ্যে বাচ্চা মেয়েটি স্কুটি নিয়ে উঠে যায় কুড়িল ফ্লাইওভারে। [তসলিমা নাসরিনের মতো] সেও কিনা ভাবছে, দুনিয়াটাকে ভড়কে দেবে! দেবেই তো। দেবেই তো। একশবার দেবে। হাজারবার দেবে। কেননা ওর পিঠে সিগ্রেটের পোড়া দাগ। ওর হৃৎপিণ্ডে মনুষ্যনখরের দগদগে ঘা।বাচ্চা মেয়েটি জানে না, কোনো খেলাই একতরফা নয়!
৩
চোরাই মোটরবাইকের ওপর আপনিই বসে আছেন আজানুলম্বিত আলখেল্লা পেতে। আর আমি হেঁটে যাচ্ছি খামারবাড়ির ভাঙা ফুটপাত ধরে। ঈগলের চেয়ে তীক্ষ্ণ আপনার চোখ। কত উঁচুতে আপনার আসন, তারপরও মুহূর্তে সব দেখে ফেলেন। স-অ-ব। আর কী আশ্চর্য, আপনি হুকুম জারি করবার আগেই খাঁটি নরসিংদীর টেঁটার মতো নেমে আসে আপনার ভয়ংকর থাবা। কেননা শিকারের ঘ্রাণ পেয়েছে সে। নাদুসনুদুস শিকার!থাবা তো আর জানে না, শিকারটি অকস্মাৎ ঘুরে দাঁড়াবে। তার উদ্যত ফণা পৌঁছে যাবে আপনার কণ্ঠনালি পর্যন্ত। আর জানলেই-বা কী, গল্পটা তো শেষ পর্যন্ত শিকার ও শিকারির! চোরাই মোটরবাইকের ওপর আমিই বসে থাকতে পারতাম উত্তাল শরীরের মায়াবী টোপ ফেলে। আর হেঁটে যেতে যেতে জামাল খাসোগির মতো আচমকা বড়শিতে বেমক্কা ঝুলে যেতে পারত আপনার চর্বিবহুল দেহ।যুবরাজ জানে, কোনো খেলাই একতরফা নয়। কিন্তু পরোয়া করে না—কেননা তার আছে আলাদিনের আশ্চর্য এক চেরাগ।
৪
ভলোদিমির জেলেনস্কি জেনেশুনেই ফাঁদ পেতেছিল। টোপও ছিল খাসা। আরেক ভ্লাদিমির ক্ষুধার্ত শ্বেতভল্লুকের মতো সেই টোপ গলা পর্যন্ত গিলে বসে আছে! দেখুন, ইউক্রেন যখন পুড়ছে, তার দেবদূতসদৃশ নারীশিশুসমেত, জেলেনস্কি তখন মুখ টিপে হাসছেন—বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করছেন—সার্কাসের জোকারের মতো। বেকুব ভল্লুকটাকে এবার বরফজলে চুবিয়েই ছাড়বেন তিনি!‘শেহেরজাদি!’—হুংকার ছাড়লেন জেনারেল, ‘তুমি জানো, ওসব ফালতু গল্প শোনার সময় আমার নেই।’‘জাহাঁপনা, আপনিই তো শুনতে চাইলেন…।’‘তুমি কি অই বেকুব ভল্লুকটার মতো আমাকেও বেকুব মনে করো, অ্যাঁ? বরফসমুদ্রে যার জন্ম তুমি কিনা তাকে বরফজলের ভয় দেখাচ্ছ!’‘জাহাঁপনা, সে তো দুনিয়া জানে। [কেবল ভলোদিমির জানে না!]
৫
আসলে সেটি ছিল সত্যিকারের এক রক্তসমুদ্র। তার ভাইয়ের রক্ত এসে মিশেছিল সেখানে। তার গর্ভধারিণীর সম্ভ্রম এসে মিশেছিল সে সমুদ্রে। তার পাড়া-প্রতিবেশী-স্বজন—যাদের সঙ্গে সে খেলত শৈশবে, তাদের রক্ত এসে মিশেছিল সেখানে। আত্মভোলা যে-কিশোরটিকে দেবে বলে যত্নে গেঁথেছিল বকুলের মালা—সেই অধরা স্বপ্নের রক্ত এসে মিশেছিল সেখানে। তাই সমুদ্রটিকে সিঁদুরের মতো আপন ললাটে ধারণ করেছিল মেয়েটি—মহামতি শিব যেভাবে তার জটায় ধারণ করেছিল স্বর্গজাত পবিত্র গঙ্গাকে।দিগন্তজোড়া সবুজ কলরোল নিয়ে সেই রক্তসমুদ্র এখন পতপত করে উড়ছে জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে—এমনকি ধূলিমগ্ন তেজগাঁও কলেজেও। আমাকে বলতেই হবে, জাহাঁপনা, সবটাই এক অলৌকিক তর্জনীর কারসাজি। এ হলো আমাদের আলাদিনের চেরাগ—যা কখনোই নির্বাপিত হয় না। তেরশত রক্তনদী পার হয়ে আলোকের সেই ঝরনাধারায় স্নাত হতে হতে সুবর্ণজয়ন্তীর কুসুমাস্তীর্ণ পথরেখা ধরে মেয়েটি হেঁটে যাচ্ছিল আনমনে [হয়তোবা গুনগুন করে গাইছিল—‘ও আমার দেশের মাটি…’], তখনই ষাঁড়টি গর্জন করে উঠেছিল। জাহাঁপনা, ঠিক তখনই।‘শহরে আবার ষাঁড় এলো কোত্থেকে? কী সব গাঁজাখুরি গল্প…!’গোস্তাকি মাফ করবেন, জাহাঁপনা। রেড ওয়াইনসহযোগে আস্ত দুম্বার রোস্ট খেতে খেতে ষাঁড়টিকে আপনি ঠিকই দেখেছেন কলোসিয়ামে, প্লাজা ডি তোরোসে, গুয়ের্নিকায়। কুরুক্ষেত্র থেকে, কারবালা থেকে, রায়েরবাজার থেকে, চুকনগর থেকে, বত্রিশ নম্বর থেকে, জালিয়ানওয়ালাবাগ থেকে, মিরপুর জল্লাদখানা থেকে, আউশউইৎস বন্দিশিবির থেকে অবিরাম ভেসে আসছে সেই শিংয়ের গর্জন।জাহাঁপনা, আপনি কি একটু দোচুয়ানি ট্রাই করে দেখবেন?
একজন ব্যতিক্রমী কবি মিনার মনসুর এবং তাঁর প্রেমের কবিতা
শামস আরেফিন
প্রেম বা আবেগের বহিঃপ্রকাশে পৃথিবীতে মানুষের কোনো বিভেদ নেই। এই বিভেদ না থাকার কারণেই আজও প্রেম নামের বেলি ফুল ফোটে আর পৃথিবীকে তার সৌরভে মুগ্ধ করে। প্রেমের এই দান-দক্ষিণার পেছনে দেবী আফ্রোদিতির যতোটা না অবদান- তার চেয়ে কিন্তু স্রষ্টার অবদান কোনো ক্ষেত্রে কম নয়। চাই সে-প্রেমের স্রষ্টা কবিতার কবিই হোক, বা হোক কোনো যুগল- যাদের পদভার বুকে ধারণ করে পুলকিত হয় পৃথিবী। প্রত্যেক কবিরই থাকে স্বীয় কাব্যভাষা। এ কাব্যভাষাই কবিকে অকবি থেকে আলাদা করে। সমাজ সংস্কৃতি, জীবনবোধ, আত্মবিশ্বাস ও কাব্যদর্শন- কাব্যভাষা বিনির্মাণে রাখে প্রধানতম ভূমিকা। তার পর কবিতার শরীর নির্মাণে রূপক, উপমা, অলংকার, চিত্রকল্প, শব্দ ও শব্দ-সংস্থান ইত্যাদির উপর নির্ভর করে দাঁড়ায় কাব্যভাষা। বছরের পর বছর লিখেও কোনো কবি নিজস্বকাব্যভাষা তৈরি করতে পারেন না। কালস্রোতে শুধু তার নামের আগে ‘কবি’ শব্দটি ব্যবহারের বৈধতা আদায় করেন। আবার কেউ মহাকালে টিকে থেকে সমসাময়িক কবিদের স্বীকৃতি না পেয়েও কবি হিসেবে বেঁচে যান। কারণ সময় বলে দেয় কে প্রকৃতি কবি- আর কে নয়। আর সেই সময় হচ্ছে পাঠক- যারা কবিতা বুকে ধারণ করে কবিকে অমরত্ব দান করেন।
নদীর যেমন বেঁচে থাকার প্রমাণ তার তেজস্বিনী স্রোতের উপস্থিতি, ঠিক তেমনি জীবিত কবির প্রমাণ হলো- নিজেকে ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে স্বীয় সুর ও কাব্যভাষার বিবর্তন। আর অবশেষে কাব্যভাষার স্বকীয়তা অর্জন করা। সেই স্বকীয়তা অর্জনের