দুই পয়সার মানুষ
ফয়জুল ইসলাম
বাণী সিনেমাহলের চত্বরের পশ্চিমদিকে দুলুর পানবিড়ির দোকান। দোকানের ভেতরে বসে জাতি দিয়ে সুপারি কাটতে কাটতে দুলুর আবারো মনে হয়, নাইট শো আসলেই জঘন্য! একটা মেয়েও থাকে না! ম্যাটিনি আর ফার্স্ট শো ভাঙার পর তো রীতিমতো মেয়েদের আমদানি লেগে যায়! ম্যাটিনি আর ফার্স্ট শো শেষ হলে প্রতি দিনই দুলু দেখতে পায়, সিনেমাহল থেকে হড়হড় করে বের হচ্ছে ডয়কা ডয়কা সব মেয়ে। মেয়েদের কেউ কেউ তো ফিল্মের নায়িকাদের মতো করে তার মাথার ভেতরে যার-পর-নেই দপদপানি লাগিয়ে দিয়ে যায়! পাশের পানবিড়ির দোকানের লগি মজিদ ঠিকই বলে—শালা দেহিছিস! মিয়েগুলের গায়ের থেন যিন কারেন্ট বারাচ্ছে এহেবারে! আমি তো আর বাঁচপ না মনে কয় ভাই!
এই মুহূর্তে বাণী হলের নাইট শো ভেঙেছে। গাদাগাদি মেরে খালাস হচ্ছে কেবল রাজ্যের মিনশেরা—দেখ! একটাও মেয়ে নেই! একে তো চৈত্রের চাঁদি ফাটানো গরম, তার ওপর আবার হাউসফুল। তাই কারো ঘামে ভেজা জামার ওপরের দিকের ক’টা বোতাম খোলা, কারোবা সবগুলোই। গরমে কেউ কেউ জামা খুলে ফেলে ঝুলিয়ে রেখেছে ঘাড়ে। মিনশেরা আবার হাঁটুর ওপর লুঙ্গি তুলে মাজায় গেরোও দিয়েছে দেখ! হিরোইনের শরীরের ঢলক দেখে এত ক্ষণ তো খুব শিস মেরেছিস! এখন আবার হল থেকে বের হতে হতে শিস মেরে কান ফাটাচ্ছিস কেনরে শালারা? রাত তো আর কম হ’ল না—ইতোমধ্যে রাত বারটা পার হয়ে গেছে! পানবিড়ির দোকানদারের কি ক্লান্তি আসে না, ঘুম পায় না নাকি?
সেই সকাল সাড়ে আটটার দিকে আর সব দিনের মতো আজো দোকান খুলেছে দুলু। মালিকের আদেশ—নাইট শু শ্যাষ না-হলি পরে খবরদার দুকান বন্ধু করবু না! শালার খচ্চর মালিক তো এত ক্ষণ নিশ্চয় বুড়ি বউয়ের ঝুলঝুলে বুকের ভেতর পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে! তবু সে মালিক। আর মালিকের কথা শিরধার্য। নয়-দশ বছরের একটা হেল্পার অবশ্য দেয়া হয়েছে তাকে। হেল্পারটা আছে বলেই দুলু কোনো একটা কাজে দোকান ছেড়ে বের হতে পারে, চাপ না-থাকলে হলের পেছনের কোনো হোটেলে গিয়ে দুপুরের খাওয়াটাও সেরে আসতে পারে সে। সন্ধ্যার পর পরই মুরগির মতো ঝিমাতে ঝিমাতে বাড়ি চলে যায় তার হেল্পার। ঐ ছোকরাটা থাকলে কি আর আলসেমি সরিয়ে রেখে এখন এই একহাতে নাইট শো ভাঙা কাস্টমারদেরকে নিয়ে তাকে পড়তে হয়? যন্ত্রণার একশেষ!
প্রথমে আসে সুতার ব্যবসায়ী রন্টু। সে জেলাপাড়ায় থাকে। তার একটা গোল্ড লিফ সিগারেট চাই। দুলু সিগারেট বের করে দেয়।
দ্বিতীয় জনকে দুলু চেনে না। তার চাই ডাবল পান আর চারটা স্টার ফিল্টার। তাকে সে সব দেয়া হয়। চেহারার দিকে তাকিয়ে বোঝা যায়, এই কাস্টমার পাবনা শহরের কেউ নয়। হয়তবা সে বাণী হলের উল্টোদিকের রিদ্দিক হোটেলের কোনো বোর্ডার হবে।
তৃতীয় জন আল্লেক—নিলুর ওয়েল্ডিংশপের কর্মচারি। একটা বিড়ি দেয়া আর পয়সা বুঝে নেওয়ার ফাঁকে ফাঁকে তার সাথে একটু কুশল বিনিময় হয়।
তারপর আসে হলের সামনের লাহিড়ীপাড়ার বকুল—শাহীন ফোর্সের নতুন মস্তান। মাঝে মাঝে সে কোমরে পিস্তল নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। বকুল এসেই শুরু করে দেয় ফরফর, ‘এ দুলু! দু’ডে বেনসন দে তো!’ দুলু ভাবে: বকুল পয়সা দেবে তো আজ? মস্তান হিসাবে নাম করার পর থেকে বকুল কোনো দিনই তো পান-সিগারেটের দাম দেয় না! সন্দেহ নিয়েই তবু সিগারেট বের করে দেয় দুলু। একটা সিগারেট ধরিয়ে, আরেকটা বুক পকেটে ঢুকিয়ে হাঁটা দেয় বকুল। যথারীতি পয়সা দেয় না সে; দুলুকে বলে—খাতাত লিখে রাখেক। পরে দাম দেবনে। আর তা’তে মেজাজটা আরো কষটে যায় দুলুর! মনে মনে সে বলে: আর পয়সা দিছেও তুমি!
ততক্ষণে দুলুর দোকানে হামলে পড়েছে একগাদা কাস্টমার। ব্যস্ততায় আর কারো চেহারায় তাই চোখ ফেলতে সময় পাচ্ছে না দুলু। দ্রুত গতিতে তার হাত চলছে পান, সুপারি, জর্দা, চুন আর খয়েরের কৌটায়, নানান ব্রান্ডের সিগারেট আর বিড়ির প্যাকেটে। একটু শ্লথ হলেই বিপদ—পাশেই লগি মজিদের দোকানে পিছলে যাবে কাস্টমারেরা।
তখন খুব পরিচিত কন্ঠে কেউ তাকে ডাকে, ‘দুলুরে! একখেন ইস্টার ফিল্টার দে তো রে ভাই!’ কন্ঠটায় শব্দগুলো কেমন যেন জড়িয়ে গেছে, একটা শব্দ উঠে বসেছে আরেকটা শব্দের পিঠে। এটা আবার কে? কাজ থেকে মাথা তুলে তাকিয়ে তখন যার-পর-নেই চমকে যায় দুলু।
খলিল? পাঁচ বছর পর পাবনা শহরে? কী আশ্চর্য! চোখ দু’টো বার বার বন্ধ হয়ে আসছে বাণী হলের প্রাক্তন লাইটম্যান খলিলের। সস্তা মদের গন্ধও বের হচ্ছে তার মুখ থেকে। মদ টানার পুরনো অভ্যাসটা সে এখনো তবে ছাড়েনি! দুলুর দিকে না-তাকিয়েই খলিল শার্ট আর প্যান্টের পকেটে টাকা খুঁজতে বসেছে। শেষে তার প্যান্টের পকেট থেকে বের হয় দশ টাকার একটা নোট। নোটটা দুলুর দিকে এগিয়ে দিতে দিতে তারপর খলিল তাড়া মারছে, ‘জলদি সিগারেট দে না কীকামে! দাঁড়াবের পারতিছিনে মোটেই!’
ছোট দোকানটার ওপাশের দরজা দ্রুত খুলে দিয়ে দুলু তার বন্ধু খলিলকে দোকানের পাটাতনের ওপরে বসতে দেয়। সাথে সাথেই সেখানে বসে পড়ে খলিল। দোকানের আলোতে এবার ভাল করে সমবয়সী খলিলের দিকে তাকায় দুলু। বেটেখাট আর চওড়া নাকের খলিলের মিশমিশে কালো শরীরটা সেই পাঁচ বছর আগের চাইতে আরো বেশি মোটাতাজা হয়েছে। খলিলের মুখে এখন সংযোজিত হয়েছে একগাদা কালো দাঁড়ি আর তার গোল গোল চোখ দু’টো এখন আগের চাইতেও অনেক বেশি লাল। সবমিলিয়ে খলিলের শরীরে মধ্য-তিরিশের ঢিলেঢালা ছাপ বসে আছে এখন। অথচ তার বয়স এখন তেইশ কি চব্বিশ হবে!
খলিলের হাতে একটা স্টার ফিল্টার সিগারেট তুলে দেয় দুলু কিন্তু বিনিময়ে সে পয়সা নেয় না। তারপর দুলু খলিলকে বলে, ‘বসেক। কাম সারে লেই আগে। তারপর কথা হবিনি। কদ্দিন পরই না তোর সাথ দেহা হলে!’
বাড়িত যাব ব্যাটা! বেশি ক্ষণ কইল বসপের পারব লয়, বুঝলু! কাঁপা হাতে ম্যাচ জ্বালিয়ে সিগারেট ধরাতে ধরাতে খলিল দুলুকে জানায়। দুলুর তখন মনে পড়ে, ছোটকালে লিয়াকত স্কুলে পড়ার সময় দুলুরা খলিলকে ‘খৈল’ বলে ডাকত। ক্লাস সেভেনে খলিল পর পর দু’বার ফেল করেছিল এবং তাকে তখন স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল। কালক্রমে খলিল বাণী হলে চাকরি নিয়েছিল লাইটম্যান হিসাবে। তারপর এক দিন সে পাবনা টাউন থেকে হাওয়া হয়ে গিয়েছিল।
এই মুহূর্তে রাত প্রায় সাড়ে বারটা। বাণী হলের চত্বরটা একেবারেই ফাঁকা হয়ে গেছে। যেই রিকশাগুলো সওয়ারি পায়নি, বাণী হলের চত্বর ছেড়ে চলে গেছে তারা। হলের সামনের নির্জন আব্দুল হামিদ রোড ধরে হেঁটে যাচ্ছে দু’এক জন মানুষ। রাস্তা ধরে দু’একটা রিকশা চলছে আর টপ গিয়ারে গোঁ গোঁ করতে করতে ট্রাফিক মোড়ের দিকে ছুটে যাচ্ছে গোঁয়ার গোবিন্দ একটা ট্রাক। নাইট শো শেষ হয়ে গেছে বলে লম্বা শরীরটাকে ঝুঁকিয়ে লগি মজিদ এদিকে তার পানবিড়ির দোকানটার ডালায় তালা লাগাতে বসেছে। দোকান বন্ধ করবে দুলু নিজেও। দোকানের পাটাতনে ধুম মেরে বসে থাকা খলিলকে তাই উঠে পড়তে বলছে দুলু, ‘চলরে খৈল! বাড়িত যাই। যাতি যাতি আলাপসালাপ হবিনি।’
দুলুর দোকানের পাটাতন থেকে উঠে বসতেই নেশার ঘোরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যেতে নেয় খলিল। তবে সাথে সাথেই সে পাশের ইলেকট্রিসিটির পোলটা ধরে সামলে ফেলেছে নিজেকে।
দোকানের ডালা নামিয়ে চারটা বড় বড় তালা আটকায় দুলু। পরনের লুঙ্গিটাকে সে ঝেরেঝুরে ফের শক্ত করে বেঁধে নেয়। ইলেকট্রিসিটির পোলে চেইন দিয়ে আটকানো পুরনো র্যালি সাইকেলটাকেও প্রতি দিনের মতো তালা থেকে সে মুক্ত করে। তারপর সাইকেল ঠেলে সামনে হাঁটতে শুরু করে দুলু। এলোমেলো পায়ে তার পিছে পিছে চলেছে মাতাল খলিল।
দুলু ভাবে, রাত হয়েছে তো কী হয়েছে, এক কাপ চা খাওয়া দরকার। চা খাওয়ার ছুতায় যদি খলিলকে ধরে রাখা যায় আরো কিছু ক্ষণ! শালা তো মদে পড়েছে! এখন খোঁচাখুঁচি করলে বের হয়েও আসতে পারে খলিলের পেটের ভেতর কপাট মেরে রাখা কথাগুলো। পাবনা টাউনের সকলেই জানে, খলিলের কাছে একটা গল্প আছে—অনেক অনেক পুরনো গল্প! এই খলিলই এক দিন ফেরদৌসি বেগম রত্না নামের এক জন সুন্দর মেয়েকে অপহরণ করে পাবনা শহরে সোর তুলেছিল। তারপর খলিল নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়াতে শহরের আর কেউই জানতে পারেনি গল্পটা। কাছের মানুষ হলেও দুলুরও তো সে গল্পটা জানা হয়নি! কাজেই ভাতের খিদে খাম করে দুলু এখন এই ওবেলায় খলিলকে নিয়ে চা খেতে বসতে চাইতেই পারে! দুলুর সে প্রস্তাবে রাজিও হয়ে যায় মাতাল খলিল।
রাত প্রায় সাড়ে বারটা এখন। সেলিমের চা’র দোকান বাদে বাণী হলের পশ্চিমপাশের আর সবগুলো দোকানেরই শাটার বন্ধ। খলিল আর দুলুর পুরনো বন্ধু সেলিমও তার চা’র দোকানের চুলা নিভিয়ে ফেলেছে। শলা দিয়ে ঝাঁট দেয়া চলছে সেলিমের ছোট্ট দোকানের মেঝেটা। তাই অবেলায় দুলু আর খলিলকে দোকানে ঢুকতে দেখেই দাবড়ানি মারছে সেলিম, ‘আয়লো শালারা অসুমায়! নাইট শু তো শ্যাষ হয়ছে সেই কহুন! আগে আইসপের পারিছিলু না? এহুন চা হবিনানে, যা!’
আল্লাহর কিড়ে লাগে ভাই! চা দে ইট্টু! বিশ্বেস করেক, মাথাডা ধরেছে খুব! মিথ্যে কথাটা অনুনয় করে বলছে দুলু। তবে খলিল নির্বিকার। সেলিমের দোকানের বাইরের দেয়ালে হেলান দিয়ে সে ঝিম মেরে দাঁড়িয়ে আছে।
একটু ভাবে সেলিম। তারপর বিরক্তি নিয়ে সে বলছে, ‘কেতলিত কুসুম গরম পানি রয়ছে খাইনটেক। তুরা রাজি হলি পরে তা দিয়ে চা বানা দিবের পারি। পয়সা আবার কম দিবের পারবু লয় কিন্তুক, হ্যাঁ!’
আর উপায় কী? সেলিমের প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেছে দুলু।
চা বানাতে বানাতে খলিলকে সেলিম জিজ্ঞাসা করছে, ‘মেলা দিন পর তোক পাবনা টাউনি দেখলেম! কোনে ছিলু তুই? তা কবে আলু?’
বাড়িত আইছি দিন দশেক তো হবিই! সেলিমের দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর দেয় খলিল। মাতাল খলিল হয়ত সেলিমের প্রথম প্রশ্নটা ভুলেই গেছে! তবে খলিলের উত্তরটা মোটেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না দুলুর কাছে। মদের ঘোরে কী না কী বলছে খলিল আল্লাই মালুম! এমনো তো হতে পারে যে গতকালকেই পাবনায় এসেছে সে!
যাহোক, সেলিম আবারো খলিলের কাছে জানতে চাচ্ছে, ‘তোর নামে পুলিশের খাতাত কীসব কেসটেস উঠিছিলে বলে শুনিছিলেম? সিসব নেকি মিটিও গিছিলে? তা’লি পরে তুই ফেরার হলু কীকামে?’
সেলিমের সে প্রশ্নটাও খলিল বোধহয় শুনতেই পায়নি! প্যান্টের পকেট থেকে কী একটা কাগজ বের করে সে মনোযোগ দিয়ে উল্টেপাল্টে দেখছে কাগজটা। আর কিছু না-বলে তখন চা বানাচ্ছে সেলিম।
কুসুম গরম পানির চা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে সহজেই। দুলুর মনে হচ্ছে, এর চাইতে ছাগলের মুত খাওয়াটাও ভাল! অতৃপ্তিতে তাই ব্যাদান হয়ে গেছে তার চেহারাটা।
এদিকে মাথা নিচু করে আনমনে চা খাচ্ছে খলিল। তাকে জিজ্ঞাসা করছে দুলু, ‘তা ব্যাটা, চিটাগাংই তো ছিলু, নেকি?’
পাবনা ছাড়ার পরথম কয়ডা দিন ঢাহাত ছিলেম। তারপর থেন টানা চিটাগাং শহরে।
কদ্দিন পরই না পাবনাত আলু তুই!
তা পাঁচ বচ্ছর তো হবিই! এই বলে জামার বুকপকেট হাতড়াচ্ছে খলিল। সে সিগারেট খুঁজছে নিশ্চয়ই। চটজলদি পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা স্টার সিগারেট বের করে দুলু খলিলের হাতে তুলে দেয়। দুলু মনে মনে বলে—খা বাবা! যত লাগে সিগারেট খা! তবু রত্নার ঘটনাটা আজকে ভেঙে বল তুই! বছর পাঁচেক হয়ে গেছে, পাবনা শহরের অনেকেই এখনো সেকথা ভোলেনি। এই মুহূর্তে সেলিমও হয়ত রত্নার অপহরণের ঘটনাটাই ভাবছে।
খলিলকে দুলু জিজ্ঞাসা করছে, ‘চিটাগাং টাউনি গাড়ি চালাতু বলে শুনিছিলেম? তোর ছোড ভাই কইছিলে একবার।’
খলিল বলছে, ‘হ! পয়লাত…খাড়া! জায়গাডার নাম যিন কী…ও হ্যা! মনে পড়েছে—লালখান বাজার…লালখান বাজারের এক বাসাত পিরাইভেট চালাইতেম, পরে কুলসিত। ভালই ছিলে সব। কিন্তুক মন আর টিকলে না, বুঝলু? নিজির বাড়ি ছাড়ে কয় দিন আর হিল্লিদিল্লি ঘুরা যায়, ক?’
খলিলের আঙুলের ফাঁকে সিগারেট জ্বলছে। কিন্তু সে সিগারেট টানছে না। ঝুলতে ঝুলতে বাঁকা হয়ে গেছে সিগারেটের দীর্ঘ ছাই। ছাইটা হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাবে যেকোনো সময়ে। অর্থাৎ সিগারেট টানাতে খলিলের মন নেই। হয়ত সে কিছু একটা নিয়ে ভাবছে।
দুলু তখন সকৌতুকে হাসতে শুরু করেছে এই বলে: ‘কুলসি’ শুনে আমার কইল ‘কলসি’-র কথা মনে হলে! আর তা’তে রেগে গিয়ে খলিল দুলুকে বলছে, ‘ফাইজলামো করিসনে তো! পাবনা টাউনির বাইরে তো কুনু জায়গাই চিনলু না তুরা! কুলসিত চিটাগাং টাউনির বড়লোকেরা থাহে! চোদন আছে, বুঝলু?’
মাতাল খলিলকে কথা বলতে দেখে তখন উদ্দীপিত হচ্ছে দুলু। খলিলের কথাকে আরেকটু চড়িয়ে দিতে সে খলিলকে আবারো জিজ্ঞাসা করছে, ‘ব্যাতনট্যাতন তো ভালই পাইস, নেকি?
ব্যাতন পাঁচ হাজার ট্যাকা। থাকা-খাওয়া ফিরি। চাঁদে চাঁদে গাড়ির ত্যালম্যাল বেচে সারে আরো কিছু ট্যাকা পকেটে আসে পড়ে।
তালি পরে তো ডাঁটেই আছিস দেহা যায়!
তা ঠিকই কইছিস। কিন্তুক ব্যাটা শোনেক, পাবনা টাউন ছাড়ে ইবার আর কোনেও যাব না আমি। দেহি, কোন শালা আমাক কী করে! আমি হলেম সাধুপাড়ার ছাওয়াল! হারামজাদাক মারে হাড়হাড্ডি সব আলাদা করে দিবের পারি, বুঝলু? এভাবে হঠাৎই রেগে গেছে খলিল।
তোর জায়গাত তুইই থাকপু। তা’ত কার কী? কথার পিঠে এটুকুই বলছে দুলু। সে ভাবছে, খলিলের কথায় কেমন যেন একটা রহস্যের আভাস! ব্যাপার কী? খলিল ক্ষেপে গেল কার ওপরে?
তবে খলিলকে বেশি কিছু বলতে যায় না দুলু। এই মুহূর্তে খলিলকে কোনো প্রশ্ন করাটা মোটেই ঠিক হবে না। ভ্যাবলার মতো চেহারা বানিয়ে ক্যাশ গুনলে কী হবে, ঠিকই কান খাড়া করে সবকথা শুনছে পেট পাতলা সেলিম। খলিল কিছু গুমোর খুল্লে কাল সকালেই বাণী হল, সমবায় মার্কেট, গোবিন্দা এমনকি ট্রাফিক মোড় পর্যন্ত সেলিম সব ঢোল মেরে দেবেই দেবে! এটা সেলিমের পুরনো অভ্যাস। নেশায় বোম হয়ে আছে খলিল। কখন কী বলে ফেলে সে—তার তো ঠিক নেই! তাই খলিলকে নিয়ে সেলিমের চা’র দোকান থেকে জলদি উঠে পড়েছে দুলু। এই মুহূর্তে খলিলকে তার একা চাই। গোপালপুরের রত্নার অপহরণের গল্পটা খলিল ছাড়া আর কেইবা জানে! আজ থেকে বছর পাঁচেক আগে খলিলই তো পাবনা টাউনের গোবিন্দা এলাকা থেকে একসময়ের শহর কাঁপানো সুন্দরী রত্নাকে হাইজ্যাক করেছিল! শহরের অদূরের বাঁশের বাদা থেকে রত্না বাড়ি ফিরে আসার পর পর উধাও হয়ে গিয়েছিল খলিল। খলিল কেন রাতারাতি উধাও হয়ে গিয়েছিল সেকথা খলিলকে আর জিজ্ঞাসা করার সুযোগই হয়নি দুলুর। পাবনা টাউন থেকে চলে যাওয়ার পর খলিলের সাথে তো আর দুলুর দেখাই হয়নি কোনো দিন!
সেলিমের দোকান থেকে উঠে বাড়ি যাবে বলে বাণী হলের পেছনদিক দিয়ে আগাচ্ছে দুলু আর খলিল। সাইকেলটার হ্যান্ডেল ডান হাতে ধরে রেখে সমুখে হাঁটছে দুলু। খলিল ঠিক তার পিছে। ছোট একটা ব্রিজ পার হয়ে দক্ষিণদিকে গেলে গোবিন্দা, তারপর কৃষ্ণপুর, তারপর লাইব্রেরি বাজার। লাইব্রেরি বাজার থেকে পশ্চিমে আরেকটু আগালেই উদ্দিনের গলি। দুলুদের বাড়ি সেখানেই। খলিলের বাড়ি সাধুপাড়া—লাইব্রেরি বাজার থেকে সামান্য দক্ষিণে, দুলুদের বাড়ি থেকে মোটেই দুরে নয়। কাজেই দুলুর সাইকেলের সামনের রডে বসে খলিল সহজেই লাইব্রেরি বাজার পর্যন্ত যেতে পারবে। দুলু ভাবছে, যেতে যেতেই খুলতে চেষ্টা করা যাবে রত্নার অপহরণের রহস্যটা। কিন্তু খলিল সাইকেলে উঠবে না কিছুতেই! টলোমলো পায়ে হাঁটতে হাঁটতে ব্রিজটার গোড়ায় দাঁড়িয়ে গিয়ে খলিল চেঁচিয়ে বলছে, ‘শালা বোকাচুদা! চিনিস আমি কিডা? চার বচ্ছর ধরে টয়োটা কোম্পানির পিরাভেট কার চালাই আমি, হ্যাঁ! আমার একখেন পেস্টিজ নেই নেকি? সাইকলের রডে চড়বের পারব লয়। রিকশা লে তুই।’
মর ভরাপরা! তা’লি পরে রাইত-বিরেতে সাইকেল রাখপ কোনে? দ্বিধায় পড়ে গিয়ে তাই খলিলকে জিজ্ঞাসা করছে দুলু।
তার আমি কী জানি! সাইকলখেন কি আমার? দরকার হলি পরে পকেটে ঢুকা লেগা, যা! ব্রিজের গোড়ায় দাঁড়িয়ে থেকেই উত্তর দিচ্ছে খলিল আর সে হাসতে শুরু করেছে গলা ফাটিয়ে।
খুব ভাঁজ নিচ্ছে এই শালার খলিল! চাইলে কি আর দুলু ওর মতো টয়োটাগাড়ি চালাতে পারত না, ড্রাইভারের চাকরি নিয়ে যেতে পারত না সৌদি আরবে? ড্রাইভারি করাটা কী আর এমন কঠিন কাজ? সিটে বসে বসে স্টিয়ারিং ঘুরালেই তো হয়! আর মাঝে মাঝে গিয়ার পাল্টানো—এইতো?
দুলুর মেজার খারপ হয়ে যাচ্ছে কেননা সে বুঝতে পারছে যে আচ্ছা একটা কলে তাকে আটকে দিয়েছে খলিল! এত রাতে রিকশা পাওয়া যাবে কই? আর তা পেলেও তার এই সাইকেলটা সে কোথায় রেখে যাবে? এমন একটা ঝামেলাতে পড়লেও খলিলকে তো এখন ছাড়া যাবে না কিছুতেই! আবার কবে খলিলের সাথে দেখা হবে তা কে জানে! হয়ত দেখা যাবে, কালকেই ব্যাটা আবারো নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে! কাজেই গোপালপুরের রত্নাকে কেন হাইজ্যাক করতে গিয়েছিল খলিল তা আজই জানতে পারলে ভাল হ’ত। রত্নার মতো অপরূপ একটা মেয়েকে তুলে নিয়ে গিয়ে খলিল তাকে বিয়ে করেনি বলে জানা যায়। তবে রত্নাকে তুলে নিয়ে গিয়ে কী করেছিল বাণী সিনেমাহলের লাইটম্যান খলিল? রত্না কি ভালবেসেছিল খলিলকে? আল্লায় জানে! আহা! রত্নার চেহারাটা মনে পড়লে এখনো কেমন উদাস-হতাশ লাগে দুলুর! তখন পাবনা টাউনে রত্নার মতো ওত সুন্দর মেয়ে আর একটাও ছিল না! লিয়াকত স্কুলের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে কত দিন দুলু তার বন্ধুদের সাথে পাবনা গার্লস স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে থেকেছে রত্নাকে শুধু একচোখ দেখার জন্য!
এত রাতে সাইকেল রাখার জন্য শেষপর্যন্ত সেই সেলিমেরই দ্বারস্থ হতে হয়েছে দুলুকে। হারুনের হার্ডওয়ারের দোকান খোলা থাকলে আর ভাবতেই হ’ত না দুলুকে কেননা সেলিমের চাইতে হারুন তার অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ বন্ধু। যা হয়, একরাতের জন্য দোকানে সাইকেল রাখার প্রস্তাব শুনে সেলিম একটা খেটকি মেরেছে। সাইকেল রাখতে রাজি হয়েও অসন্তুষ্ট সেলিম চুপ করে থাকছে না। সে বলছে, ‘দুলু! তোর চিহারা দেখলি পরে না দিনডা মাটি হবিই হবি! সাইকল থুয়ে কোনে যাচ্ছেও শালারা, বুঝিনে না? এ! তোরে ঘরে বউ নেই যে লোটিবাড়িত যাইস তুরা?’
হাসতে হাসতে এই মুহূর্তে মাতাল খলিল সেলিমকে বলছে, ‘দুলুর বউ আটুয়াত। আমার বউ কুলসিত। তারা যার যার ঘরেই রয়ছে, বুঝলু? আমারে আর লোটিবাড়িত যাওয়া লাগবিনানে। তুইই যাগা! তয় আমি এহুন চাকীবাড়িত যাচ্ছি। টিন কাটা বাংলা মদ খোলা হয়ছে আইজ। আরেক পাক ঘুরে আসিগে!’
সাইকল গছা দিয়ে যাচ্ছেও আবার লেকচারও মারতিছেও? কাটে পড়েক এহুন হেন থেন, যা! না-গেলি পরে মারে তোরে দাঁত খুলে ফেলাবনে কলেম! রাইতের বেলা আসে তান্না লাগা দেছে তারা! দোকানের শাটার নামাতে নামাতে এভাবে খেউখেউ করে উঠছে সেলিম।
দুলু ভাবছে: সেকি? এখন এত রাতে আবার চাকীবাড়িতে বাংলা মদ টানতে যাবে খলিল? এমনিতেই খলিল যথেষ্ট মাতাল হয়ে আছে! মদ বেশি খেলে তার মাতালামি তো চাড়া দেবেই! তখন হয়ত খলিল আর সাজিয়েগুছিয়ে কথাও বলতে পারবে না! রত্নাকে হাইজ্যাক করার পরের ঘটনাগুলো তা’হলে জানা যাবে কী করে? খলিলের সাথে আদারেপাদারে পড়ে থাকতে থাকতেই উল্টো সকাল হয়ে যাওয়ার জোর সম্ভাবনা! আচ্ছা হুজুগে পাবলিকের ফ্যারে পড়া গেল! কাজেই চাকীবাড়িতে পৌছানোর আগেই খলিলের পেট থেকে রত্নার অপহরণের গল্পটা বের করে নেয়া দরকার।
চাকীবাড়িতে যাওয়ার জন্য বাণী হলের পাশের রাস্তাটা দিয়ে খলিল এসে দাঁড়িয়েছে আব্দুল হামিদ রোডের ধারে। এটাকেই পাবনা শহরের বড় রাস্তা বলা হয়। রাতের রাস্তায় একটাও রিকশা নেই। তাই অনেক ক্ষণ ধরে দুলু আর খলিল ঠ্যাংয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। দক্ষিণের রায় বাহাদুরের গেট পার হয়ে শেষপর্যন্ত মোড়ের দিকে রিকশা আসে একটা। ধীরে ধীরে চালাও প্যাডেল—রিকশাওয়ালা এ গানটা গাচ্ছে গলা ছেড়ে। হাত তুলে তাকে থামতে বলছে খলিল, ‘এই ব্যাটা! চাকীবাড়ি’ত যাবু?’
না ভাই, যাব লয়। খলিলের ডাকে রিকশার গতি কমিয়ে উত্তর দিচ্ছে রিকশাওয়ালা।
শালার ব্যাটা শালা! তা’লি পরে তুই কোনে যাবু? তোর শ্বশুরবাড়িত? রিকশাওয়ালার উত্তর শুনে ক্ষিপ্ত হয় গেছে খলিল।
বাড়িত যাচ্ছি। রাইত হয়ছে। খেপ আর লেব না ভাই! খলিলের খোঁচা খেয়েও কিছু না-বলে নির্বিকার রিকশাওয়ালা প্যাডেল মেরে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে।
মারাও গা যায়ে! ব্যাটা শালা আমার! রিকশাওয়ালার ওপরে খলিলের রাগ আর থামছেই না!
দুলু ভাবছে, সাইকেল নেই, রিকশাও পাওয়া যাচ্ছে না তা’হলে তারা এই গভীর রাতে চাকীবাড়ি পর্যন্ত যাবে কী করে? খলিলের মতো পাঁড় এক মাতালকে নিয়ে হেঁটে যাওয়া যাবে অত দূর? তাই দুলু খলিলকে বলছে ‘এই রাত্তিরবেলা চাকীবাড়িত যায়ে আর কী করবু ব্যাটা? শোনেক খৈল, তার থেন চলেক হাঁটতি হাঁটতি বাড়িত যাই আর গল্প করিগে। কী কইস?’
কথাটা বলেই দুলুর ভয় হচ্ছে। চওড়া পাঞ্জা দিয়ে খলিল আবার তাকে চাটি মেরে না-বসে! রোগাপটকা দুলু তা সামলাতে পারবে না মোটেই।
এই মুহূর্তে উত্তর দিচ্ছে বিমর্ষ খলিল, ‘কী ছাতার গল্প করবু তুই? আমার মতন ফাটাকপালের জীবনে কুনু গল্প থাহে নেকি, তুইই ক? শালার লাইফখেন তো ফাতাফাতাই হয়ে গেল। আর কুলাবের পারতিছিনেরে ভাই!’
তা ঠিকই কইছিস! লাইফ হলে ফুটেফাটা লৌকার মতন, বুঝলু? পানি ওঠতেছে, পানি ওঠতেছে…। যেই পানি ছেঁচপের ভু্ল্লু, ওম্বাই—যাহ্। টুক্কুস করে ডুবে গেল! এভাবে খলিলকে সহমর্মীতা জানাচ্ছে দুলু।
দুলুর কথা শুনে হো-হো করে হাসি লাগিয়েছে খলিল। খলিল তাকে বলছে, ‘মাইনষের লাইফখেন যে ফুটে হয়ে যাওয়া লাওয়ের মতন—এই কথাডা কইল আগে আমি ভাবিই নেই! ভাল কথা কইছিস তুই ব্যাটা!’
মাতাল খলিলকে কথা বলতে দেখে দুলু এবার জলদি প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে ফেলে আসল প্রসঙ্গে ঢুকতে চায়। তাই খলিলকে সে বলছে, ‘কচ্ছিলেম কী, রত্নার ব্যাপারডা লিয়ে তো তোর সাথ কুনু দিন কুনু কথাই হলে না! তার আগেই তো তুই পাবনা ছাড়লু!’
ধাম করে কথাটা বলে ফেলে দুলু একটু অপ্রস্তুত হয়ে যায়। কিন্তু দুলুর কথাতে খলিলের বিন্দুমাত্র অস্বস্তি নেই! বরং সে হাসতে হাসতে বলছে, ‘রত্নার গল্প শুনবু? তা’লি পরে তো