You are currently viewing অকর্মণ্য/  নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর

অকর্মণ্য/ নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর

অকর্মণ্য

নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর

আমি বেচারাম শীল। আমার বাপ ভুবন শীল, দাদা পৃথ্বি শীল। আমরা বংশানুক্রমিক নাপিত। আমার দাদা ছিলেন জমিদারের ক্ষৌরকার। জমিদার বাহাদুর দেশ ছেড়ে চলে যাবার আগে দয়াপরবশ হয়ে হাট-চান্দিনার এক কোণে চুল কাটতে বসবার জন্য দাদার নামে একটা পাট্টা সই করে গিয়েছিলেন। জমিদারের সইকরা পাট্টা নিয়ে দাদার গর্বও কম ছিল না। জমিদার মহাশয় কলকাতা চলে গেলে পর জমিদারের দেওয়া চান্দিনার ভিটির ওপর একটা চালাঘর তুলে দাদা লোকের চুল কাটতে শুর করেছিলেন। জমিদারের ক্ষৌরকারকে হাটে বসে চুল কাটতে দেখে লোকে কটাক্ষ করে বলত, জমিদার দেশ ছেড়ে চলে গেল। সঙ্গে তুমিও গেলে পারতে। দাদা বলত, আমি আমার দেশ ছেড়ে কোথাও যাব না। যতদিন ভগবান বাঁচিয়ে রাখবে বাপদাদার ভিটিতেই থাকব। আর যখন মরণ আসবে স্বদেশের মাটিতেই মরব। প্রার্থনা করি, আমার মনোবাসনা যেন ভগবান পূরণ করে। দাদার ইচ্ছা ভগবান পূরণ করেছিল। দাদাকে তাঁর দেশ ছেড়ে যেতে হয়নি।দাদার স্বর্গলাভ হলে দাদার কর্মভার বাবার উপর বর্তায়। তাঁর রেখে যাওয়া চান্দিনা ভিটির উপর নাপিতের বাক্স খুলে আমার বাবাও চুল কাটতে শুরু করল।

পুনর্বার ৬৫ সালে রায়টের সময় হিন্দুরা দেশ ছেড়ে চলে যেতে থাকলে বাবাকেও কেউ কেউ একইরকম প্রশ্ন করেছিল, রাতের আঁন্ধারে পাল আর চক্রবর্ত্তীরা ইন্ডিয়া চলে গিয়েছে; তুই কবে যাবি? যার ইচ্ছা হয় সে যাক, আমি দেশ ছেড়ে যাব না। দেশটা এখন মুসলমানের, ব্রাহ্মণ হোক আর নাপিতই হোক― সব হিন্দুকে এ দেশ ছেড়ে ইন্ডিয়ায় চলে যেতে হবে। আমার বাপ ভুবন শীল তবু বাপদাদার ভিটি ছেড়ে যায়নি। বাবা বলত, আমার একটাই নিবাস, একটাই দেশ।

আমি দেশ ছেড়ে পালাব না। জান গেলেও না।  কয়েক বছর পর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো। পাকিস্তানি মিলিটারি গ্রামে গ্রামে আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে, যাকে পায় তাকেই গুলি করে মারছে। যে যেখানে পারে পালিয়ে বাঁচতে চেষ্টা করছে। কেবল হিন্দু নয়, জান বাঁচাতে সে বছর অনেক মুসলামানও ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। আমার মা পর্যন্ত বাবাকে বলেছিল, মুসলমানও ইন্ডিয়া চলে যাচ্ছে, আর তুমি যেতে চাও না। তোমার কি নিজের জানেরও মায়া নাই? তবু আমার বাপ গেল না। বাবার এক কথা

যুদ্ধের ডামাঢোলের মধ্যেও নাপিতের ঘরে বসে থাকলে চলে না। চুল কাটা ছাড়া তার আর কোনো উপায়ও ছিল না। এমন অশনি দিনে তাকে চুল কাটতে যেতে দেখে লোকে আশ্চর্য হয়ে বলত, ভুবন, পাক সেনারা হিন্দু-মুসলিম বাছে না। যারে তারে গুলি করে মারে। তুই মারা পড়বি, ইন্ডিয়া চলে যা, জান বাঁচা। বাবা বলত, আমি নাপিত। লোকের চুল-দাড়ি কাটি, আমাকে ওরা মারবে না। আর বাঁচামরা ভগবানের কৃপা। তার ইচ্ছায় যখন মরণ হবে, দেশের মাটিতেই মরব। ভগবানের ইচ্ছেও হয়ত সেরকমই ছিল। বাবাকে তার দেশ ছেড়ে কোথাও যেতে হয়নি।

একদিন রাজাকাররা পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে হাটে এসে বাবাকে চান্দিনা ভিটিতে পেল। বাবার বুকে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে বলল, সাচ সাচ বাতাও, মুক্তি কাঁহা। বাবা বন্দুকের নল দেখেই হয়ত বোবা হয়ে গিয়েছিল; মুখে রা ছিল না তার। তাক করা বন্দুকের নলের দিকে ফ্যাল ফ্যাল চোখে তাকিয়ে ছিল কেবল। রুস্তম রাজাকার বাবাকে ধমক দিচ্ছিল বারবার, মুক্তি কোথায় থাকে, বলে দে, মালউনের বাচ্চা। তাতেও বাবা কোনো জবাব দেয়নি, অথবা দিতে পারেনি। মুক্তিযোদ্ধারা কোথায় লুকিয়ে আছে সে খবর না দেওয়ার জন্য অথবা উর্দুতে কথা বলতে না পারায়, অথবা ছোটো জাতের হলেও নাপিত যে হিন্দু সে কথা রুস্তম রাজাকার নিশ্চিত করায় পাকিস্তানি সেনারা বাবার হা করা মুখের ভেতরই গুলি করেছিল।

এসব কিছু আমার জানার উপায় ছিল না। বাবার মৃত্যুর ঘটনা আমি জানতে পারি সোমারু কাকার মুখে। পাকিস্তানি সেনারা হাটে আসবার আগে আগে সোমারু কাকা বাবার কাছে চুল কাটাচ্ছিলেন। ভগবান সহায় ছিল, সেনাদের আসবার আগে তার চ’ও কাটানো শেষ হয়েছিল। আর বের হয়েই লোকজনের আতঙ্কিত ছুটাছুটি দেখেই কাকা ভয়ে হাটের পাশের নদীর ঢালুতে নেমে পড়ে পাকসেনা দেখতে পেয়ে খাগড়ার ঝোপে কোনো রকমে গা ঢাকা দিয়ে লুকাতে পেরেছিলেন। বাবাকে জেরা করার সময় সোমারু নদীর ঢালুর ঝোপে লুকিয়ে শুনছিলেন। বাবাকে গুলি করে ফেলে রেখে পাক সেনা আর রাজাকাররা চলে গেলে সোমারু কাকা দেরী না করে কোনোরকম গা ঢাকা দিয়ে আমাদের বাড়ি এসে বাবার মৃত্যুর খবর দিয়েছিলেন। খবরটা শুনে দৌড়ে গিয়ে আমি দেখেছিলাম, বাবার নিথর দেহ কাঁঠাল গাছের তলে লুটিয়ে পড়ে আছে, চোখ খোলা, তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে, হা করা মুখ আর তাজা রক্তে ভিটি লাল।

বাবার জীবনাবসানের অল্প ক’দিন পরই দেশ স্বাধীন হয়ে গেল। আমিও বাপ-দাদার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাদের রেখে যাওয়া ক্ষুর-কাঁচি নিয়ে একই ভিটিতে চুল কাটতে শুরু করলাম।

চান্দিনা ভিটিতে চুল কাটতে কাটতে আমি ভুলে যেতে চাইতাম, আমার বাপ আমার হাতে ক্ষুর-কাঁচি তুলে দিতে চাইত না। বাবার ইচ্ছা ছিল, আমি স্কুলে পড়ালেখা করে অফিসে চাকরি করব। তখন লোকে আর নাপিত বলে, ছোটো জাত বলে গালি দেবে না। বংশ পরম্পরা নাপিতের জীবন থেকে তার ছেলে মুক্ত হবে। বাবার সে ইচ্ছার কথা মনে করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেও আমি বুঝতে পেরেছি, বাবার একটা ইচ্ছা পূরণ করলেও আরেকটা ইচ্ছা পূরণ করা ভগবানের ইচ্ছা ছিল না। ভগবান যাকে নাপিত করে পৃথিবীতে পাঠান হয়ত তাকে নাপিতই রাখতে চান। আমি এখন আর আফসোস করি না। সবই ভগবানের ইচ্ছা। ভগবান কৃপা করে মানব জনম দিয়েছেন সেটাই কম কিসে। তিনি তো আরও অধম করে পৃথিবীতে আমাকে পাঠাতে পারতেন। হঠাৎ কখনো এমনও মনে হতো আমি যেন পৃথ্বী শীল। জমিদারের ক্ষৌরকার; কখনো মনে হতো আমি তারও আগের কোনো নাপিত। কত হাজার বছর আগে শূদ্র হিসেবে আমার পূর্বপুরুষের জন্ম হয়েছিল সে কথা আমি কী করে জানব? মানুষই বা কখন চুল-দাড়ি কাটাতে শুরু করেছিল আমি কী জানি? অবশেষে আমি বিশ্বাস করতে চেয়েছিলাম, সকলেরই কর্ম বদলায় কেবল নাপিতের ছাড়া। আমি ক্ষুর-কাঁচি হাতে একই কর্ম করছি যুগের পর যুগ, আর ভাবিকালেও করে যাব।

কাঁঠাল গাছের তলে দাঁড়িয়ে গাছটার দিকে কখনো চোখ গেলে বাবার কথা আমার মনে পড়ত। বাবার মুখেই আমি শুনেছিলাম, বাবা নিজহাতে ভিটির পাশে কাঁঠাল চারা লাগিয়েছিল। বাবার রোপিত কাঁঠালের চারা আর আমি একই সঙ্গে বেড়ে উঠছিলাম। বাবা ছিল না, তবু তার স্মৃতি আমারই চোখের সামনে একদিন ফলবানও হয়েছিল। সে গাছের কাঁঠাল বাড়িতে নিয়ে গিয়ে মাকে বলেছিলাম, মা, দেখ, বাবার লাগানো চারাগাছ বড় হয়েছে; ফল ধরেছে। মা আশীর্বাদ করে বলেছিল, তোর বাপ বেঁচে নাই। আমি আশীর্বাদ করি, তোর জীবনও এমন ফলবান হোক। সন্তানের জীবন ফলবান করার জন্য মা আমার বিয়ে দিয়ে সংসারে শেফালি নামের একজনকে আমার বউ করে নিয়ে এল। মা বেঁচে থাকতে থাকতেই তার আশীর্বাদে আমার সংসারে নতুন মুখ এল। আমি পুত্রের মুখে বাবার আর নাতির মুখে মা তার স্বামীর ছায়া দেখে অতীতের দুঃখ খানিকটা ভুলে যেতে পেরেছিলাম।

বাপ-দাদার মতো চান্দিনা ভিটির উপর চুল কেটে কেটে আমার সংসারজীবন কেটে যাচ্ছিল। বাবার মতো আমার চুল কাটাও সকলের পছন্দ। কারও ত্বকে সামান্য আঁচড় পর্যন্ত লাগে না। এ তল্লাটের সকলেই আমার সেবা গ্রহণ করেন। বিশ্বকর্মার ইচ্ছায় মানুষের সেবা করে আমার পরিবারের আহার যেমন জোটে তেমনি মানুষের সেবা করে আমিও আনন্দ পাই। নাপিতের জীবন পেয়ে নিজেকে তখন ধন্য মনে হয়। পূর্বপুরুষ দাদা আর বাবাকে মনে মনে প্রণাম করে প্রতিদিন বিশ্বকর্মার নাম জপে চুল কাটতে বের হই। আর চুল কাটতে কাটতে কানো কোনো সময় আমার এরকমও মনে হয়, চান্দিনা ভিটির মাটিতে প্রোথিত কাঁঠাল গাছের শিকড়ের মতো আমার জীবন-শিকড়ও এই ভিটিতে গাঁথা আছে। এই ভিটির মাটি গাছটাকে যেমন বাঁচিয়ে রেখেছে তেমনি এই ভিটি আমার সংসারের মুখগুলোর জীবনও খাইয়ে পরিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে।

আমার সন্তান বড় হতে থাকলে তার মুখের আদল বাবার মুখের মতো দেখতে পেয়ে সহসা একদিন তার ইচ্ছার কথা মনে পড়ল। আমার আবার মনে পড়ে, আমার বাপ আমার হাতে ক্ষুর-কাঁচি তুলে দিতে চাইত না। বাবা বলত, আমি পড়ালেখা শিখে চাকরি করব। পড়ালেখা করলে লোকে ছোটো জাত বলে, নাপিত বলে গালি দেবে না। বংশপরম্পরা নাপিতের জীবন থেকে তার ছেলে মুক্ত হবে। বাবার ইচ্ছাপূরণ আমি আমার সন্তানের জীবনে করতে পারি না? আমি নতুন করে স্বপ্ন দেখতে থাকি, আর হৃষ্টচিত্তে কাজ করে যাই। ভগবানের দয়ায় দিনও চলে যায়। গরিব ধনী, আশপাশের সকল লোকই আমার কাছে চুলদাড়ি কাটাতে আসে।

সে দিন তহশিলদার কাকা চুল কাটাতে এলেন। প্রতিবার চুল কাটাতে এসে তিনি বাবার জন্য আফসোস করেন। বাবার স্মৃতি মনে রাখায় আমি তাকে যথেষ্ট সম্মান আর সমাদরও করি। আমি বুঝতে পারি, তিনিও আমাকে স্নেহ করেন।

আমি চুল কাটতে থাকলে তহশিলদার কাকা বাবার প্রসঙ্গ তুললেন, একটা সহজ সরল ভালো মানুষ ছিলেন তোর বাপ। আমি তার কথা কোনোদিন ভুলব নারে, বেচারাম। নিজের বুকে গুলি নিল, তবু মুক্তিবাহিনী কোথায় আছে সেকথা পাঞ্জাবিকে বলল না। তিনি আরো বললেন,  আমার চাকরি থাকতে থাকতে তোর বাপ-দাদার স্মৃতি জড়ানো এই ভিটিখানার একটা নথি করে নিতে পারলি না?

আমি জানতাম চান্দিনা ভিটিখান জমিদার মহাশয় দাদাকে পাট্টা লিখে দিয়ে গিয়েছেন। তাকে সে কথা বললাম, কাকা, ঠাকুরদার নামে জমিদারের পাট্টা লেখা আছে। কাকা বললেন, দুর বোকা! জমিদারের পাট্টা দিয়া কি যুগে চলে? জমিদারও নাই, পাট্টাও অচল। দাড়ি কাটা হয়ে গেলে কাকা বললেন, একটা লিজ নথি করে নিলে তো আর কোনো দুশিন্তা থাকে না। লিজ নথি? দিনকাল ভাল না, কে কখন কাগজ করে নেয়। আমি ভাবনায় পড়ে গেলাম, কী করা লাগবে, কাকা? সরকার থেকে বন্দোবস্ত করা লাগবে। দরখাস্ত নিয়া অফিসে আসিস। একটা নথি করে নিলে আর দুশ্চিন্তায় থাকতে হবে না। তহশিলদার কাকার কথা শুনে আমিও দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম। তাকে বললাম, কাকা, আমরা বংশ পরম্পরায় আপনাদের সেবা করে বেঁচে আছি। আমার বাপ আপনাদের সেবা করতে করতেই স্বর্গে গিয়েছে। আমিও তার মতোই আপনার এবং এলাকার সকলেরই সেবা করে যাচ্ছি। আমি আপনার অফিসে যাব, কাকা। দয়া করে একটা ব্যবস্থা করে দিয়েন। আচ্ছা, ঠিক আছে।

দু’দিন পরই দেখি, হাটের আরেক পাশে, যেখানে এতকাল ধরে ছাপড়ার তলে পসারি দোকান বসত সেখানকার চালাঘর সরিয়ে কে বা কারা ইটের গাঁথুনি দিয়ে পাকাঘর তুলছে। আমি কাছে গিয়ে মিস্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম, কে তুলছে পাকা ঘর?

আমার বোকা বোকা প্রশ্ন শুনে রাজমিস্ত্রী হেসে বলল, পাকাঘর তুলবার ক্ষমতা যার আছে, সেই তুলছে। আমি তবু হাঁদারাম হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে বলে, তোর ভিটায় যখন তুলবে তখন টের পাবি হাটচান্দিনায় পাকা ঘর কে তুলতে পারে।

আমি আর কথা বাড়ালাম না। কেবল আমি নই, এ তল্লাটের সকলেই জানে এই ভিটির উপর রুসমত আর হাফিজ কাকারা পসারির ডালা সাজিয়ে হাটবারে বসে। কিন্তু আশপাশের সকলেই একথাও জানে, চান্দিনা ভিটি কেন, তাদের পক্ষে বাপদাদার ভিটিতেও পাকা দেওয়ালের উপর ঘর তোলা সম্ভব না। তাহলে এ ঘর কে তুলছে?

নিজের ভিটিতে ফিরে আসার পরও আমার নিজের মনেই প্রশ্নটা কাঁটার মতো খচ খচ বিঁধতে লাগল। তখন তহশিলদার কাকার কথাগুলো মনে পড়ল। আর দেরি না করে আমি তহশিল অফিসে গেলাম। কাকা, আমার একটা ব্যবস্থা করে দিন।

লিজমানি জোগাড় করছস? লিজমানি? নথির জন্য টাকা দেওয়া লাগবে না? কত লাগবে?

এক শতক জায়গা। দাদার আমল থেকেই তো দখলে আছিস। তেরশ ছিয়াশি সন থেকে হিসাব ধরলেও বকেয়া বিশ হাজার টাকার কম আসবে না। অত টাকা লাগবে! বলিস কী! আর কেউ হলে তো আমিই বিশ হাজার টাকা নিতাম। আমাকে না হয় কিছু না দিলে, সরকারের টাকা না দিয়ে কি লীজ হবে?’

অত টাকার কথা শুনে আমার মন দমে গেল। আমি হতোদ্দম হয়ে মনে মনে বললাম, সাতমন ঘিও ঢালতে পারব না, আমারও ভিটি বন্দোবস্ত পাওয়াও হবে না। আমতা আমতা করে বললাম, আচ্ছা, আমি টাকা জোগাড় করে তার পর আসব।

দেরি করিস না। আমি চোখে অন্ধকার দেখতে দেখতে বাড়ি ফিরলাম। বাড়ি এসে একদিকে ভিটি হাতছাড়া হওয়ার শঙ্কা অন্য দিকে টাকা জোগাড়ের কোনো সম্ভাবনা না থাকায় ছটফট করতে লাগলাম। অতটাকা কোথায় পাব? আমার অস্থিরতা দেখে বউ বলল, তোমার কী হয়েছে গো, এমন করছ কেন? অত টাকা আমি কোথায় পাব? সব শুনে আমার বৌ তার যৎসামান্য গয়না যা ছিল সব আমার হাতে তুলে দিল। আমি বৌ-এর গয়না বেচে কিছু টাকা জোগাড় করলাম। তবু অর্ধেকমাত্র। দশ হাজার টাকা জোগাড় করার কোনো উপায়ই দেখতে পেলাম না।

আমার মতো নাপিতকে দশ হাজার টাকা কে দেবে?  আমার স্ত্রী বলল, যার কেউ নাই তার ভগবান আছে। আমার গৃহলক্ষ্মী স্ত্রীর বিশ্বাসের ফলও আমি অচিরেই পেলাম। পরদিনই ভগবানের সাক্ষাত প্রতিনিধি আমার চালাঘরের সামনে এসে তাঁর মটর সাইকেল থেকে নামলেন। এর আগে কখনো আমার এই তুচ্ছ চালার তলে তিনি চুল বা দাড়ি কাটাতে আসেন নি। তিনি বরাবরই আমাকে তাঁর বাড়িতে ডেকে নিতেন। তিনি আয়েশী মানুষ, তাঁর বহির্বাটির হাওয়া ঘরের খোলা চত্বরে অথবা বেলগাছের তলে আরাম চেয়ারে আয়েশ করে শরীর এলিয়ে দিয়ে আমাকে দিয়ে চুল-দাড়ি কাটান। চুল-দাড়ি কাটা হয়ে গেলে আমাকে দিয়ে তিনি তাঁর নাদুসনুদুস শরীরটা আচ্ছামতো দলাই-মোচড়াই করিয়ে নেন। আমিও খুব যত্নসহ তাঁর সেবা করি। ষাঁড়ের কুঁজের মতো তাঁর গর্দান, ভীমের গদার মতো দুটি মাংসল বাহু, ঘন চুলের তলে বড়সড়ো একটা তালের মতো মাথায় আঙুল আর হাতের চেটোয় দীর্ঘক্ষণ যাবত মালিশ করে দিই। শুরুতেই তিনি আদরখাওয়া শিশুর মতো আরামে চোখ বোজেন, তারপর কখনো বা আরাম খেতে খেতে এক পশলা ঘুমিয়েও নেন। আমিও তখন আর সময় হিসেব করি না। তাঁকে সেবা করার বিনিময়ে যা প্রত্যাশা করি না তিনি এর চাইতে অনেক বেশি টাকা পকেট থেকে বের করে আমাকে দেন। বলতে হয়, তাঁর দান আমাকে চৈত্রের বৃষ্টির চাইতেও বেশি খুশি করে। চুল-দাড়ি কাটার পর এই ভয়ানক ক্ষমতাধর মানুষটাই যখন আমার মালিশে পরম তৃপ্তি নিয়ে দিকে তাকিয়ে হাসেন, তখন আমিও পরম আনন্দ পাই। আমি শুধু কৃতজ্ঞ বোধ করি তা নয়, বরং তিনি যখন হাতে বড় একটা নোট তুলে দেন তখন আমার মনে হয়, আমি তাঁর খুব কাছের মানুষ। আমার বিশ্বাস ছিল, যতদিন তাঁর দয়া বর্ষিত হবে ততদিন ছেলেপুলে নিয়ে বাঁচার জন্য আমার চিন্তার কোনো কারণ নেই।

সেদিন তিনি প্রথমবার আমার তুচ্ছ চালাঘরে চুলকাটাতে আসায় আমি খুব খুশি হয়েছিলাম। তাঁকে আমার চালার তলে প্রথমবার পেয়ে আমি পরম আনন্দে অভিভুত। তাঁর বাড়িতে যে রকম করে সেবা করি, সেরকম সেবাই তাঁর করছিলাম। দাড়ি কামানো শেষ করে তাঁর ঘাড়ের চেকনাইওয়ালা মাংসের উপর দু’হাত দিয়ে আলতো করে টিপে দিতে থাকলে তিনি চোখ বন্ধ করে মালিশ উপভোগ করছিলেন।

আমার হাতের আরাম নিতে নিতে মান্যবর হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, এই জায়গাটা তুই লীজ নিবার চাস? আজ্ঞে, কর্তা। টাকা জোগাড় করছস?

সব পারি নাই। আরো দশ হাজার দরকার। সেইটা জোগাড় করতে না পারায় দুর্ভাবনায় আছি। টাকাটা জোগাড় করতে পারলেই লীজ নথি করতে পারব। মান্যবর একঝটকায় উঠে বসলেন। চেয়ারটা মার খাওয়া প্রাণীর মতো কঁকিয়ে উঠল। গায়ের উপর থেকে কাটাচুলসহ পর্দাটা মাটিতে ফেলে দিলেন। মনে হলো, সাদা পর্দাটার তল দিয়ে কোনো পোকা ঢুকে তাঁকে কামড়ে দিয়েছে। চোখ মেলে আমার দিক এমন করে তাকালেন যেন পোকাটাকে আমিই তাঁর গায়ে উঠতে দিয়েছি। অথবা পোকা যাতে তাঁকে না কামড়ায় আমার অবশ্যই খেয়াল রাখা উচিত ছিল। আমি শেষে বুঝলাম, পোকাটোকা কিছু না। বরং তিনি পকেট থেকে টাকা বের করলেন। একটা দু’টো নোট না, একতোড়া টাকা। মান্যবর সবগুলো টাকাই আমার দিকে বাড়িয়ে ধরলেন, নে, ধর। এখানে দশ হাজারই আছে। অতগুলো টাকা হঠাৎ দেখে আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল এবং আমি চোখের পাতাও ফেলতে পারছিলাম না। হতবাক হয়ে হা করে তাকিয়ে ছিলাম, মুখে কোনো কথা আসছিল না। মান্যবরের দয়ার সীমা অনুধাবন করি আমার মতো নাপিতের বেটার সাধ্য কী? আমি কিছুতেই মনে করতে পারছিলাম না, তাঁর দয়ার বিনিময়ে কী কথা বলে তাঁর প্রতি ঋণ স্বীকার করব, তাঁর জন্য আর কী কী করব। আমি অতীতেও দেখেছি, চুলই হোক, আর দাড়িই হোক যাই কাটি না কেন, তিনি আমাকে যা দেন হাত খুলেই দেন। কিন্তু এত টাকা কোনো দিনই দেন নি!

আমাকে থ’ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মান্যবর বললেন, হা করে তাকিয়ে আছিস কেন? টাকার মনে হয় তোর দরকার নাই?

আজ্ঞে, টাকার ত আমার খুবই দরকার। আপনার অনেক মেহেরবানি, কর্তা।

আমি টাকাটা হাতে তুলে নিয়ে ভগবান অথবা মান্যবরের উদ্দেশ্যে কপালে হাত ঠেকালাম।

বের হয়ে যাওয়ার আগে মান্যবর বলে গেলেন, পরে কোনো ঝামেলা করিস না কিন্তু। তোদের তো বিশ্বাস করা যায় না।

আমি বলতে চাইলাম, ভগবানে আমার বিশ্বাস আছে, আমি সে বিশ্বাস ভঙ্গ করব না। আমি যেভাবে পারি, এ ঋণ শোধ করব। কিন্তু আমি কোনো কথা বলার আগেই তিনি মটর সাইকেলে চড়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করলেন। আর আমি টাকা নিয়ে মান্যবরের জন্য ভগবানের কাছে আশীর্বাদ করতে করতে বাড়ি গেলাম।

বাড়ি গিয়ে মনে হচ্ছিল, আজ আমার পরম আনন্দের দিন। আমি স্থির হয়ে বসতেও পারছিলাম না। উঠোনে আর সারাবাড়ি পায়চারি করলাম। নদীর ধারে গেলাম, জীবনে প্রথম মাছরাঙার মাছ ধরা দেখলাম, কানি বক ধ্যান করে বসে আছে তাকে দেখে শিশুকালের মতো হাসলাম। কেবল আজই যেন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে আকাশটা ঘরে যাবার জন্য নতুন বধুর মতো রঙিন শাড়ি পরে সেজেছে বলে মনে হলো। আমি নাপিতের বেটা, ক্ষুর আর কাঁচি হাতে আমার সকাল-সন্ধ্যা কাটে, এমন করে একটা বিকাল কোনোদিন কাটাই নি, আজ কাটালাম।

রাতের আহারের পরও আমার ঘুম আসছিল না। ছেলেমেয়ে দুটোকে তাড়াতাড়ি ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে শেফালি আমার কাছে এসে বসল। খুব যত্ন করে পান বানিয়ে আমার হাতে তুলে দিয়ে বলল, অমন মানুষ এ কলিযুগে হয়!

আমি পান মুখে নিয়ে বললাম, মানুষ বলছ কি, তিনি সাক্ষাত অবতার।

রাত গভীর হয়ে এলেও আমার ঘুম আসছে না দেখে শেফালি আমার মাথায় ওর নরম আঙুলের স্পর্শে মালিশ করে দিতে থাকে। নিশুতিরাতে ওর আঙুলের ছোঁয়ায় আমার শরীর মন জেগে উঠেছিল। তার দেহের ঘ্রাণ আমার কাছে সত্যি সত্যি শেফালি ফুলের সুবাস বলে বোধ হলে আমি সেই সুবাস উপভোগও করলাম।

তারপর ঘুমিয়ে পড়লে স্বপ্ন দেখতে থাকলাম―চান্দিনা ভিটির ওপর আমি ইটের একটা ঘর তুলেছি। আমার ছেলে নিধিরাম শীল সাবালক হয়ে গিয়েছে। সে আরামদায়ক ঘুর্ণিচেয়ারে বসিয়ে লোকের চুলদাড়ি কাটে। আমার আর কোনো অভাব নেই। আমার মেয়েটার বিয়ে হয়ে গিয়েছে। ছেলেটার বিয়ে দেবার জন্য একটা টুকটুকে মেয়ে খুঁজছি।

ঊষাকালে ঘুম ভাঙলে স্বপ্নটা আমাকে বিলের বুকের নৌকার মতো দোলাচ্ছিল। স্বপ্নের দোলায় দুলতে দুলতে আমি তহশিল অফিসে গিয়ে উপস্থিত হলাম। কিন্তু তহশিলদার কাকা যেন আজ কেমন করে তাকালেন। মনে হলো, তিনি যেন আমাকে ঠিক চিনতেও পারছেন না। আমি বুঝলাম, তহশিলদার কাকা তার অফিসে অন্যরকম। চুল কাটাবার সময় কাকা হলেও অফিসে তিনি তহশিলদার সাহেব। আমি প্রতীক্ষা করতে লাগলাম, কখন তাঁর দৃষ্টি আমার দিকে প্রসন্ন হয়।

আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেয়াল করছিলাম, আমাকে বসিয়ে রেখে তহশিলদার কাকা এটা ওটা নাড়ছেন অথবা কাগজে কলম দিয়ে কিছু লিখছেন। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আমার মনে হলো, তিনি কী যেন ভাবছেন। ধৈর্য ধরে রাখতে না পেরে অবশেষে আমি তাঁর কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। তিনি তখন কাগজ থেকে কলম তুলে আমার দিকে তাকালেন।

তুই দেরি করে ফেলেছিস―আরো আগে আসা দরকার ছিল।

কাকা, সব টাকা জোগাড় করতে করতেই না দেরি হয়ে গেল। ভগবানের কৃপায় কালই টাকাটা জোগাড় করতে পারলাম।

টাকা কীভাবে জোগাড় করেছিস?

মান্যবর দশ হাজার টাকা দিয়েছেন।

দশ হাজার টাকা এমনি এমনি তোকে দিলেন!

তিনি আমাকে দিয়ে সবসময় চুলদাড়ি কাটান। আমাকে স্নেহ করেন। তিনি আমার পিতৃতুল্য, কলিযুগে তাঁর মতো মানুষ হয় না।

সত্যি বলছিস!

আমি সবিস্তার তহশিলদার কাকাকে মান্যবরের দয়ার কথা বললাম। কাকা আমার কথা শুনে অবাক হলেন কিন্তু কোনো মন্তব্য করলেন না। খুশি হয়েছেন বলেও মনে হলো না। আমার মতো এক নাপিতকে একজন গণ্যমান্য ব্যক্তির এতগুলো টাকা দেওয়ার বিষয়টা সম্ভবত তহশিলদারের মনঃপুত হয়নি। যা হোক, তাতে আমার কিছু আসে যায় না। মান্যবর কি কেবল তেলের মাথায় তেল ঢালবেন? তিনি কি ভুখানাঙা মানুষের দিকে তাকাবেন না? সেটা না করলে তিনি কী করে আরও বড় নেতা হবেন? লোকে বলে, গরিব মানুষের দিকে যার হাত যত প্রসারিত, নেতাও তিনি তত বড়।

আমি সে চিন্তা বাদ দিয়ে তহশিলদারের কাছে জানতে চাইলাম, কাকা, ডিসি অফিসে কবে যাওয়া লাগবে?

শুকনো মুখ তহশিলদার বললেন, তোর আর ডিসি অফিসে যাওয়া লাগবে না।

না গেলেও চলবে?

লিজ নথি অনুমোদনের জন্য ডিসি অফিসে চলে গিয়েছে।

ততদিনে লিজ নথি কীভাবে, কোথায় অনুমোদন হয় সে সম্পর্কে আমি কিছুটা ধারণা পেয়েছিলাম। তহশিলদারের কথা শুনে আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বার অবস্থা।

আমি তো আবেদনই করিনি! আবেদন ছাড়াই নথি চলে গিয়েছে?

এজন্যই লোকে তোর নাম দিয়েছে হাঁদারাম।

লোকে আমাকে যা বলে বলুক, তহশিলদার আমাকে হাঁদারাম বলার কারণ আমি বুঝতে পারছিলাম না। আমি তাঁর উপর খুব অসন্তুষ্ট হয়েছিলাম। আমার মনে হয়েছিল, তহশিলদার ভেবেছিলেন অত সহজে আমি টাকা জোগাড় করতে পারব না, আর লীজও নিতে পারব না। হয়ত আমার নিকট থেকে ঘুষ পাওয়ার জন্য