You are currently viewing বাংলা নববর্ষ ১৪২৯,  ৫টি গল্প

বাংলা নববর্ষ ১৪২৯, ৫টি গল্প

ভাত দে

অলকানন্দা রায়

আমারে একটু পানি দিবা? নামাজের সময় ওইয়া গ্যালো জ্ঞা…। ক্যারা যাও এইহান দিয়া? ও বউ হুনছো…?  ও সকিনার মাও, কতক্ষণ ধইরা ডাকতাছি হুনোও না। তোমরা এবা ক্যা? আমি বুড়া অইয়া গেছি। হাত রথ গেছে সুমসারে আমার আর কদর নাই। বুঝবা বুঝবা! দিন তুমগোরও আবো। হক্কল হিসাবই তহন মিটান নাগবো।

ওই সামিনা, সকিনারে হুনছস! ফাঁডা কপাল! ওই ছেড়া সবজল… এক নাগাড়ে ডাকতে ডাকতে মিইয়ে আসে নব্বই কী পঁচানব্বই পেরুনো বৃদ্ধ মোয়া খাঁর গলা।  তার ঘরের কোণা-কানচিতে টুক-পলান্তি খেলছে তারই নাতি নাতনি আমিনা, শরিফা, সামিনা, ছকিনা, বুলবুলি, সবজলদের বিশাল দল।

ঘরের সামনে দিয়ে এ কাজে, ও কাজে হনহনিয়ে যাচ্ছে আসছে ছেলে বউরাসহ তার নিজের বউও। তাদের কাঁখে ধান ভর্তি ধামা। হয় বারবাড়িতে শুকাতে নিয়ে যাচ্ছে নয়তো শুকনো ধান ঘরের গোলায় তুলতে বাড়ির ভেতর নিয়ে যাচ্ছে। নয়তো যেখানে সদ্যই কামলারা ক্ষেত থেকে কেটে এনে তেলের ড্রামে বা শক্ত কাঠের ওপর পিটিয়ে পিটিয়ে আঁটি থেকে ধান ছাড়াচ্ছে সেখান থেকে ভেজা ভেজা ধান তুলে নিয়ে যাচ্ছে খোলায়, দক্ষিণা ফিনফিনে বাতাসে ধান উড়িয়ে খড়-কুটো পরিস্কার করতে। আবার সেই পরিস্কার ধান তুলে নিয়ে উঠোনের রোদে ছড়িয়ে দিচ্ছে শুকাতে। একটু পর পর আবার ছুটে আসছে সেই ছড়ানো ধান দু’পায়ের নিপুণ কায়দায় উল্টেপাল্টে দিতে। যাতে সমান ভাবে শুকোয় প্রত্যেকটা ধান। ধানগুলো চড়া রোদের আঁচে খসখসে সোনা রঙ খোসার ভেতরের শাঁসটা শুকিয়ে শক্ত দানা হলে তবেই না নোটে ফেলে রাতজুড়ে বাড়ির বউ, ঝি মিলে ঢেঁকিতে পাড়ের পর পাড় দিলে বেরিয়ে আসবে চাল। সেই চালই আবার হাঁড়িতে মাপা জল, তাপে সেদ্ধ করলে উথলে ওঠা ঘন ফ্যানের ভেতর উঁকি দেবে ভাত। আহা! ভাত। সাদা সাদা ভাত। বিলের জলে সাত সকালে ফুটে থাকা শাপলা ফুলের পাপড়ির মতো সাদা!

এতটুকু জিরোবার সময় নেই কারো হাতে। না বউ, না ছেলে, না বৌমাদের, না নাতি-নাতনিদের। সকলেই এদিক দিয়ে যাওয়া আসার পথে শুনতে পায় ‘‘কেউ একটু ওজুর পানি দিবা গো?”  কিন্তু কারো এক চিমটি সময় নেই অশতিপর সেই সাথে অকর্মন্য বৃদ্ধের ডাকে তৎক্ষনাৎ সাড়া দেবার।

নাতি-নাতনিরা খুব যে ছোট তা নয় আবার খুব যে বড় তাও নয়। বৃদ্ধ দাদার ওজুর পানি তারা এনে দিতে পারে এতটা বড় তারা হয়েছে। ক’ আঁটি ধানও তারা কাটতে পারবে। মাথায় তুলে বাড়ি বয়ে আনতেও পারবে। এমন প্রায় সব বাড়ির ছেলেমেয়েরাই হাত পা একটু বড় হতেই করে থাকে। আসলে তাদের করতে হয়! এদের বাবা-মা চুলের ঝুঁটি ধরে কাজে নামায় না তবে আরেক বাড়ির ছেলেটা মেয়েটা বড় হয়ে গেছে তবুও কাজ করে কম তা নিয়ে বিস্তর কানাঘুষো করে।

সাত গাঁয়ের ডাকাবুকো ঝগড়– মানুষটি তাদের দাদী হওয়া সত্তে¡ও নাতি নাতনিরা কেমন করে যেন ছাড়া পেয়ে তাই খেলছে তো খেলছেই। তবে খেলাই যে তাদের কাজ তা নয় চরম ঝগড়া-ঝাটি, কুটনামি, বদনাম, অন্যের খেলনাবাটি চুরিতে তারা সিদ্ধহস্ত। গালাগাল- গলাবাজিতে দাদীর ওপরে!

এত কিছুর চাপে তাদের সময় হয় না বুড়ো মোয়া খাঁর ওজুর পানি এনে দিতে। ইচ্ছেও করে না তাদের।

মোয়া খাঁ ফের ডাকতে থাকে ‘‘একটু ওজুর পানি দেও গো… বেইল পইড়া গ্যালো… খিদা নাগছে।

ওই ওই ছেড়ি তুই কেড়ারে? গোসাইর বুইনে? একটু ইনু আহেক ছে! টিপ টিপ পায়ে এগিয়ে যায় ও বাড়ির গোসাইর বোনটা। লাঠি হাতে চৌকির কিনারায় পা ঝুলিয়ে বসে আছে মোয়া খাঁ। বয়েসের ভারে সমস্ত শরীরটা বেঁকে ইংরেজি ইউ হরফের মতো হয়ে গিয়েছে। মুখের চামড়ায় অজস্্র ভাজ। ঝুলছে হাতের চামড়া। কাছে যেতেই খপ করে মেয়েটার হাতটা শক্ত করে ফেলে প্রায়ান্ধ মোয়া খাঁ। পরম পাওয়ার মতো ফোকলা মুখে হাসি ফুটিয়ে জানতে চায় “তুই হুমারে?” মেয়েটি উত্তরে হ্যাঁ জানালেও মোয়া খাঁ আরো খানিকটা চিৎকার করেই ফের প্রশ্ন করে ‘‘তুই হুমা? মেয়েটি এবার মুখ মোয়া খাঁর কানের কাছে নিয়ে একটু জোরেই বলে, ‘হ্যাঁ’। শুনতে পেয়ে খুশি  মোয়া খাঁ আব্দারের সুরে বলে, আমারে একটু ওজুর পানি আইন্না দিবি?

-হ্যাঁ দেবো।

– ওইখানে বদনি আছে। ডান হাতের তর্জনী তুলে চিড়ে-চ্যাপ্টা ঘরের দরজার কোণ দেখায়। হাতের আঙুল বরাবর তাকিয়ে দেখতে পায় একটা সীসার অতি পুরানো বদনা ঘরের মেঝেয় গড়াগড়ি খাচ্ছে। মেঝে খানিটা ভেজা। বৃদ্ধ মোয়া খাঁর মতো শতবর্ষী হাজারটা ট্যাপ খাওয়া বদনিটায় বোধহয় ফুটো আছে। তার গায়ের ময়লা জমে জমে এমন একটা অবস্থা হয়েছে যে মেয়েটির কেমন ঘিনঘিনে ভাব হয়। তবুও তো…

মেয়েটি হাত ছাড়িয়ে বদনা আনতে গেলে বৃদ্ধ ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে আরো জোরে হাতখানা চেপে ধরে। যদি সে পালিয়ে যায়! মেয়েটি তাকে আশ্বস্ত করে-

-আপনাকে পানি এনে দেই।

– না না বদনিটাসহ আমারেও কলপাড়ে নিয়া যা। ওইহানেই কল চাইপা এক বদনা পানি দেইস।

মেয়েটি এক হাতে প্রাচীন বদনা, অন্য হাতে প্রাচীন মোয়া খাঁকে ধরে ঘরের বার হয়ে পা টিপে টিপে কলপাড়ে নিয়ে যেতে থাকে। খেলে বেড়ানো বৃদ্ধর নাতি নাতনির দল এ দৃশ্য দেখতে পেয়ে একচোট হেসে নেয়। বুইড়্যা আইজকা তোরে ধরছে! ভালাই অইছে তুই বুইড়ার হাতে (সাথে) অজু অজু খ্যাল।

তারা যেমন ঝড়ের বেগে এদিকে এসেছিলো তেমনি ঝড়ের মতেই পুব থেকে পশ্চিমে নাকি উত্তর থেকে দক্ষিণে ধেয়ে যায় অসভ্য বানের জলের মতো কলকল খলখল করতে করতে। ধানের ধামা কাঁখে নিয়ে হনহনিয়ে দেখেও না দেখার ভানে চলে যায় মোয়া খার বয়সী বউ। গা থেকে প্রায় খুলে পড়ছে তার এক প্যাচে পরা বারো হাতি শাড়িটা। পেটিকোট, বøাউজের বালাই নাই। আড়াল থেকে নয় প্রায় সরাসরিই দু’পাশ থেকে উঁকি দিচ্ছে তার শুকিয়ে ঝুলে পড়া স্তন জোড়া। মেঝ ছেলের বউ ছকিনার মা দেখতে পেয়ে যেতে যেতে বলে যায়, হুমা তোর ভালা অবো রে। তোর ভালা অবো। বুড়া মাইনষ্যেরে অজুর পানি আইন্না দিলে আল্লায় তার ঠিকই ভালা করবো। কে জানে! ছকিনার মায়ের চুন লেগে নষ্ট হয়ে যাওয়া সাদা মার্বেলের মতো চোখে কী খেলা করে!

মোয়া খাঁ অজু করে পরম ভক্তি ভরে। কোন এক সুরা আওড়াতে আওড়াতে মেয়েটির ছোট হাতে ভর করে ফের ঘরে ঢোকে। একটা প্রায় শেষ হয়ে আসা দিনে এই একরত্তি মেয়েটা ছাড়া আর কেউ তার কাছে আসে নাই। তাই বুঝি হাতটা সে ছাড়তে চায় না। বয়সী খসখসে মুঠোর দখলে রেখেই সে বলে,

-ওই হুমা আমারে এক থালি ভাত দিবি? খামু।

মেয়েটি চমকে ওঠে ভাত! ভাত সে কোথায় পাবে? নিজের বাড়ির হাড়িতে এক থালা ভাত তো দূর, এক কনা ভাতও নেই। ঘরের কোণে ধোয়া মোছা হাঁড়ি পাতিল উপুড় করে রাখা। একটা চালই যে তাদের ঘরে নেই। ভাত হবে কী করে? ক্ষিধেয় পেট তারও যে জ্বলতে জ্বলতে থেমে গেছে সেই কখন! কাঁদো কাঁদো কন্ঠে সে জানায়

-আমি ভাত কোথায় পাবো? আমাদের ঘরে তো ভাত নাই। মোয়া খাঁ যেন শুনেও শুনতে পায় না। অবুঝ ছেলের মতো বায়না করে বলতেই থাকে,

-ওই হুমা খাড়াইয়া রইছস ক্যা? দে-রে চাইড্ডা ভাত। মেলা খিদা নাগছে। চোখে আন্ধার দিতাছে। হেই কোন বিয়ানবেলায় দুইডা পান্তা দিছাল… মেয়েটির দুই চোখ ভরে জল আসে। ফুলে ফুঁপিয়ে ওঠে ঠোঁট জোড়া। বুক খুলে অস্ফুটে বেরিয়ে আসে, “মাআআআ!” সে আর থাকতে পারে না। জোর করে হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে পালায়।

ছুটতে ছুটতে শুনতে পায় মোয়া খাঁ আহির ভৈরবে গাইছে, ‘‘আমারে এক থালি ভাত দিবি? খিদা নাগছে। আমি খামু-উ-উ-উ…।’’

 

বাংলাদেশ

আকিমুন রহমান

আউজকা বাসে ওটোনের সোম একটা আচানক বিত্তান্ত ঘটছে। আমি- এই যে রিয়াজুল- আমি এই- নাক চোখ খোলা রিয়াজুলে তক- ট্যাপ খাইয়া গেছি- বিত্তান্তের গুণে! বিত্তান্তটা বিরাট কিছু না। কিন্তুক আমারে টাসকি খাওয়াইয়া দিছে। আতকা ঘটছে কিনা! টাসকি না খাইয়া যাই কই! নাইলে, এই ত্রিয়েস্তে আমি আছি আউজকা ধরতাছি পাঁছ বচ্চর যাইতাছে গা, নিয়ম-সিয়ম ভালাবুরা- এই দেশের চলাচলতি- বালামতন বোজার আমার বাদ নাই। সে কয়জন দেশি পোলা আমরা আছি এই ত্রিয়েস্তায়, সবটি সবটিরে চিনি! ঠায়-ঠেকায় সগলতে লগে লগে থাকি, নাইলে যে যার মোতন থাকি ছাড়া ছাড়া! কেউঅইর খোঁজ কেউঅই রাখি না। খইয়া-লইয়া তো কাম আর নাই, যে, খালি এর-তার পোন্দের পিছে এয়-তায় থাকতে থাকমু!

তয়, আমাগো সবটির লগেই সবটির দেখাসাক্ষাৎ হয়, কিন্তুক দিইন-রাইত একলগে গলাগলি নাই! যেরা যেরা এক বাসাত থাকে, তারা তারা এক গুরুপ নিজেরা নিজেরা। এই যেমুন আমি থাকি সুবার বাসায়। ফেলাটটা অয় কিনছে। তার একটা ঘর আমি ভাড়া লইছি। আরেক ঘর ভাড়া লইছে ইলিয়াছে। অন্যটাতে সুবা হালার পুতে নিজে থাকে। অয়ে এই দেশে আছে-নয় বছর দইরা। কয় বোলে, উয়ে এইনেই থাইক্কা যাইবো পুরা জিন্দিগি। তয় উয়ে থাকতে পারে! অরা তো আমাগো মোতন না। অগো দ্যাশ-খেশের লেইগা টান কম। আমাগো যেমুন বাড়ির লেইগা কইলজা ফাইট্টা যাইতে থাকে সব সোম, উয়ে তো দেখতাছি হেমুন না!

উয়ে কয়, এইনেই উয়ে বাদবাকি জিন্দিগির লেইগা থাম্বা গাইড়া বইবো! আর হেইটাই তো করছে অয়ে! ফেলাট কিইন্না বাড়িঅলা অইয়া গেছে গা, একদমে। তয় অরা পারেও শালার! দেশবাড়ির লেইগা কান্দাকান্দি করতে থাকা পরান নিয়া- অর তো দেহি কোনো ঝামেলা অয় না। আমি অরে হেইটাই খালি জিগাই! টাইমে টাইমে জিগাই, ‘আরে সুব্রইত্তা, তুই পারস কেমনে?’

সুব্রত পারে। উয়ে পারে পারুক, কিন্তুক আমি এমুন পারতে চাই না। আমি এই দেশে পইড়া থাকোনের লেইগা আহি নাই। ট্যাকা কামানের লেইগা আইছি। কামাইতাছি। বাইত পাটাইতাছি দুই হাতে। বাবায় জায়গা জমি কিনতাছে। বিল্ডিং তোলছে বাইত। সুদিতে ট্যাকা লাগাইছে। দেখতে দেখতে চাইর বচ্ছর গেছে গা। আমার তো ইচ্ছা, যাউক গা আরো চাইর পাঁচ বচ্ছর। হাতে বালামোতন ক্যাশ টাকা বাইন্দা, আল্লা আল্লা কইরা দ্যাশো ফিরা যামু। ব্যবসা করুম হেইর পর! দ্যাশে থাইক্কা ব্যবসা করমু।

ট্যাকা খেপে খেপে বাইতও পাটাইতাছি, নিজের কাছেও ব্যাংকে রাখতাছি এইনে। খায়-খরচ আর বাড়িভাড়া বাদে বেহুদা খরচার মইদ্দে আমি নাই। ট্যাকা অইলো জমানের লেইগা! এই ট্যাকা কামাইয়ের লেইগাই তো এইনে আওন, নাকি? কিন্তুক, কথাটা কি পুরা হাছা হইলো! এই যে কইলাম- ট্যাকা কামাইয়ের লেইগাই আইছি। পুরা হাছা না এইটা ! আরো কথা আছে- এইর পিছে। তয়, অহন কতা কিন্তু হেইটা না।  কতা অইলো- এতো চোখকান খোলা থাকোনের পরেও- এই যে বাসে ধরাটা খাইলাম আমি! যেমুন তেমুন ধরা খাওয়া না কিন্তু!

হইছিলো কি, কামের তেনে ফিরতি কালে, আমি খাড়াইয়া রইছি বাস ইস্টপে। কুড়ি মিনিট পরে বাস। এহন, আমার ইস্টপে যাইতে গেলে ৬ নং বাসে গেলেও চলে,  ৩৬-এ গেলেও অয়। আমি খাড়াইয়া রইছি, এহন যে কোনো একটা আইলেই উটমু। দেহি যে ৩৬ জন আইতাছে। আহুক। যাওন দা হইছে কথা। অমা, বাসে উইট্টা সারি নাই, কে জানি হুড়ামুড়াইয়া উইট্টা- আমারে এই  বিরাট এক ধাক্কা দিয়া ফালাইয়া দিতে দিতে, ঝুপ্পুস কইরা ধইরা ফালাইলো; আর নিজের পড়োন ঠেকানের লেইগা, ঝপঝপন্তি সিটের একটা হাতল ধইরা লইলো!

কালা আন্ধাইরা এক- কালা বাউশ হালার পুতে! আবার কয়, ছরি ছরি ছরি- ইস্কটিমি ছরি। তর ছরির খ্যাতা পুড়ি। আরে,  বাসের অই শেষ টাইমে, দরজা বন্ধ হয় হয় টাইমে, দৌঁড় পাইড়া তর ওটোনের কাম কি রে ব্যাটা! ধাক্কা খাইয়া আমি যেই দুঃক্ষুটা পাইলাম- ছরি দিয়া হেইটা উশুল হইবো! মনে মনে গাইল দিয়া তো অখন আমার কোরোধ কমবো না! মুখ দিয়া গাইল দিতে হইবো। বাংলা এইনে কেটায় বুঝতাছে! আমি অন্যদিকে চাইয়া-গাইল দেওয়া ধরলাম। ‘শালার পুতেরা! শ্রীলংকা থুইয়া এইনে কোন মরা মরতে আইছস রে বেটা! শালার পুত। হালার ঘরের হালা!’

“আপনি গালিটা বেশি দিয়ে ফেলছেন না ভাই? আমি ইচ্ছে করে করিনি কাজটা। ব্যালান্স রাখতে পারি নাই যে!”

‘হায় হায়- শ্রীলঙ্কাইন্নাটায় দি বাংলা কয়! আমার দেশি ভাই নি? ইয়া আল্লা!’ হুড়ুত কইরা মনের ভিতরে আফশোস আইসা ধাক্কা দিলো। শরম পাইলাম। দেশি পোলা না? নতুন আইছে লাগে। আমরা পুরানরা এমুন করলে- অগো উপায় কি! চলতি বাসেই শেষে অর লগে কোলাকুলি করোন খালি বাকি রাখি। কেমনে আইলো – কোন রাস্তা দিয়া আইলো – কয়দিন ধইরা আসছে- আমাগো দেশিগো কার বাড়িত আছে- এমুন কতো কতাই না হেরে জিগাই  আমি! হেয় খালি চক্ষু বড়ো বড়ো কইরা আমার কতা শোনে। কিন্তু কোনো জব দেয় না! ঘটনা কি? পোলাটায় এমুন ক্যান! নাকি দুই নম্বর! দুরঅ- কি কই- আমরা সকলতে- দুই নম্বর না অইয়া- এইনে আইতে পারতাম নি? আমরা বেবাকটিই হইতাছি  দুই নম্বর। তয়, অয়ে কি? কতা খালি হোনে, জব দেয় না। আমার ইস্টপ অইয়া পড়তাছে না! আমি আবার জিগাই, বিত্তান্ত কি? শেষে সেয় মোক  খোলে। কয়, আমি স্টুডেন।

আরে আল্লা! দেশে অখন স্টুডেন  ভিসা দিয়া বিদেশ পাঠানোর সুবিধা হইছে নাকি! নামে স্টুডেন কামে ট্যাকা কামাইয়েরর ধান্দা- সেই কেইস নাকি! হইলে, খুইল্লা কইতে দোষটা কোনখানে! এইনে, এই বিদেশে, দেশি ভাইগো মইদ্যে আবার লুকাছাপা কি?

আমি তারে কই, ‘আরে মিয়া! খোলাসা কইরা কন। কতো লাগলো আইতে- আওয়া হইলো কোন রাস্তা দিয়া, এহন কি করোনের ধান্দা-’

আমার কথা শুইন্না সে- করকরা চক্ষে আমারে দেখতে থাকে তো দেখতেই থাকে, কোনো কথা নাই! অনেক খোন কোনো কথা নাই। শেষে মুখ খোলে।

“আমি স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে এসেছি এখানে।”

‘বাড়িত তেনে কত ট্যাকা পয়সা নিয়া আসতে হইছে?’

“নিয়ে আসতে হয় নি তো তেমন কিছু! ক্যান?”

‘তাইলে চলেন ক্যামনে? খরচাপাতি চলে ক্যামনে?’

“ইউনিভার্সিটি দেয়- বললাম না? এসব কেন জিজ্ঞেস করেন?”

‘না জিগাইলে জানমু ক্যামনে?’ আমি তারে বুঝ দিয়া বলি। বলি বটে, তবে আমার কইলজাটা চিনচিনায়। পোলাটা ল্যাখাপড়া করতে আসছে- কলারশিপ বোলে পায়- দেশি পোলা। কিন্তু ব্যবহারের তাছির দ্যাখো! কথা বাইর করতে হইতাছে- ঠেইল্লা! গুতা দিয়া দিয়া!  ফুটানি করতাছে নি! করলে করুক গা! শিক্ষিত কিনা- ফুটানি দেহায়! দুইদিন পর কই যাইবো গা, গুড়–ম গাড়–ম। তহন দেশি ভাইগো বিছারাইয়া- বেদিশা হইয়া কুল পাইতো না!

“আপনি ধারে কাছেই থাকেন?” পোলাটায় আমারে জিগায়। এইত্তো বোল ফুটতাছে- আমি মনে মনে এই কথা বইল্লা মুখে কই, ‘এই যে আর দুই ইস্টপ পরেÑ রাইয়ানো। সেইখানে আমার বাসা।’ এইটা তো ধইরাই নেওয়া যায় যে, এইর পর সেয় নিজেই- তার থাকানোর জায়গার কথা বলবো! আমার তো তেমুনই মনে হইছিলো। কিন্তুক শেষে দেখি, সে সে আর কোনো কথাই তোলে না! না-পাইরা আমিই জিগাই; ‘আপনে কই থাকেন?’

“ এই-একটু দূরে- বারকোলায়! সালিতা কনতোভেল্লিতে আমার ফ্ল্যাট।”

অ! সেইটা খুব বেশি দূরে না। আমার ইস্টপের পরে তিনটা ইস্টপ। তার বাদেই বারকোলা। আমি ঝুম ধইরা বইসা থাকি, দেখি সে আর কোনো কথা কিনা! রাইয়ানো- আমি ইস্টপ আসতে তো আর বাকি নাই।

কিন্তুক পোলাটার মুখে কোনো কথা নাই। আরে! ঠায়-ঠিকানা না নিলে, চলতে-ফিরতে ঠেকায় পড়লে যাবি কই! কিন্তুক ঠায়-ঠিকানা নেওনের লেইগা- তার কোনো লড়াচড়ি দেখা যায় না! তাইলে আমার দিক দিয়া আমি কিলিন হইয়া থাকি। দেশিভাই যখন, আমার বাসার নম্বরটা অন্তত- দিয়া থুইয়া যাই। বাস আইসা আমার ইস্টপে থামতে থামতে, আমি তারে আমার বাসার নাম্বার বলি। রাস্তা পার হইয়া- হাতের ডাইনে গিয়া- হাতের ডাইনের চাইরতলা বিল্ডিংয়ের তিনতলা। কি মনে কইরা- সে আমারে তার নাম বলে। তারপর আমার নাম জিগায়। আমার নাম তো রিয়াজুল। অর নাম বোলে রকিব।

বাস থেকে রিয়াজুলের, নাকি রেজাউল- ওই, আই অ্যাম কনফিউজড- নামা দেখতে দেখতে মনে হলো- আরে! এর সঙ্গে তো আরেকটু কথা বলা যেতো! কিন্তু, ও থাকতে থাকতে এ-কথাটা আমার মনেই আসে নি! বা আমিই মনে আসতে দেই নি যে, আরেকটু কথা বলা যেতে পারে! বাঙালির সঙ্গ খোঁজার জন্য কি এখানে এসেছি আমি? তাইলে বাংলাদেশ আছে- কোন প্রয়োজনে! ওইসব দেশি ভাইবন্ধু খুঁজে বের করে- একটা কর্ণার বানিয়ে- মিনি বাংলাদেশ দাঁড় করানোর ইমোশন- আমি ফিল করি নাকি? নাহ্, করি না তো! তাই রিয়াজুলের সঙ্গে কথা বাড়ানোর ইচ্ছে হলো না। ত্রিয়েস্ত আর এমন কী বড়ো শহর! ডাউন-টাউন কী পিয়েৎসা ওবেরদানে- কোনো না কোনো উইকঅ্যান্ডে দেখা হয়ে যাবেই। এই সাতদিনে দেখা গেছে- যখুনই ডাউন-টাউনের দিকে আসা গেছে- ঘুরে-ফিরে অনেকবার- একটা-দুটো মুখের সঙ্গে দেখা হয়েছে! আর একই রুট ধরে যখন আসা-যাওয়া চালাতে হবে- দেখা হয়ে যাবেই। ওফ! এই ব্যাপারটা- এখনই মনে করে-আমার অশান্তি লাগছে! আমার কোনো বঙ্গদেশী দরকার নেই! একজনও দরকার নেই! আমি কমপ্লিটলি বঙ্গভাষা ব্যবহার না-করার পরিস্থিতি পেতে চাই! অনেক হয়েছে বঙ্গভাষা ব্যবহার। অনেক হয়েছে বাঙালির মুখ দেখা, বাঙালি দিয়ে ঘিরে থাকা। বাট লুক রকিব- হোয়াট অ্যা সারপ্রাইজ দ্যাট ইয়ু কুডন্ট ফরগেট অ্যানি থিং। সাতদিন হলো তো। হাজার মাইল দূরে আসা হলো তো- ঘোর মনোযোগ দিয়া পড়া শুরু করে দেওয়া তো হলো! এই সাতদিনে মনে হলো-  বাসার সকলের কাছ থেকে-সাত আলোকবর্ষ দূরে চলে আসা হলো! মনে মনে চলে আসা হলো! কিন্তু যেগুলো থেকে দূরে চলে আসার জন্য অ্যাডামেন্ট হয়ে উঠেছিলাম, সেগুলো আমার মধ্যেই আমার সঙ্গেই পায়ে পায়ে চলছে।  খুব আশ্চর্যের ব্যাপার তো! বিষয়টা মনে রাখতেই চাই না। বাট নাউ মাই রিয়ালাইজেশন এমন যে, ওগুলো আমার রক্তকণা হয়ে গিয়েছিলো! এখন, ওই রক্তকণা ঝরিয়ে ফেলে নতুন রক্তকণা বানাতে কতোদিন লাগবে? কতোদিন! হেই অ্যাড্রিয়াটিকÑ ডু ইয়ু হ্যাভ এনি আইডিয়া হাউ লং ইট উইল টেক? অ্যাড্রিয়াটিক কি আমার কথা শোনে, শুনতে পায়?

অ্যাড্রিয়াটিক- এই তো আমার বাঁয়ে! ওকে বাঁয়ে রেখে চলতে চলতে শেষে মিরামারে- লাস্ট স্টপ! অ্যাড্রিয়াটিকের একদম পাশে- আমার য়্যুনিভার্সিটি। ডাউন-টাউন থেকে অনেকখানি দূরে। ওই যে রিয়াজুল ছেলেটা নেমে গেলো- রাইয়ানোতে- ওখান থেকেও বেশ দূরে। ডাউন-টাউনে আজকে আসাটা-একেবারে অকারণেই ছিলো। ক্লাস শেষে মনে হলো, যাই! একটু চেনাশোনা হয়ে আসি ডাউন টাউনের সঙ্গে! জাস্ট একটু হ্যালো বলা আর কী মনে মনে, পথ-ঘাটগুলোকে! শহরের গন্ধটার সঙ্গে ফ্যামিলিয়ার হয়ে ওঠা! এই আর কী! ঘুরতে ঘুরতে বাসস্টপের কাছে যেতে যেতে দেখি, বাস ছেড়ে দেয় দেয়! বাস থার্টিসিক্স। ওহ! ওটাকে মিস করলে ফের বিশ মিনিটের ধাক্কা! দৌঁড়ে উঠে যাওয়া ছাড়া- দেয়ার ওয়াজ নো আদার ওয়ে! কিন্তু উঠে – তাল সামলাতে না পেরেই তো- ওই ঝক্কিটা বাঁধলো!

তো স্যরি বলো আর অ্যাপোলজি যতো করো- সে লোকের বিড়বিড়ানো বকা দেওয়া থামে না। আরে! দুষছে কাকে! শ্রীলঙ্কানদের। ফানি। আই নো, মাই কমপ্লেকশান এই ধারণা মনে আনতে পারে, খ্বুই পারে যে, আমি শ্রীলঙ্কান। ইট ইজ ডার্ক – ভেরি ডার্ক! দেশে থাকতে এটা নিয়ে মাথা ঘামাতে হয়নি! কিন্তু যেই দুবাই থেকে রওয়ানা দিলাম ত্রিয়েস্তের দিকে; আমি জিজ্ঞাসিত হওয়া শুরু করলাম- শ্রীলঙ্কান? আচ্ছা! এরকম বাংলা বানানো শুরু করেছি আমি? জিজ্ঞাসিত হওয়া শুরু করলাম! হা হা হা! আমরা এভাবে বলি? নয় কেন! আম্মাকে ফোনে বলবো এই কথা। আর বলবো- পার হয়ে এসেছি তো! তুমি এখন নির্বিঘ্ন মনে করো আম্মা- নির্ভাবনা হও। উহু! হলো না! এখানে বলতে হবে, ভাবনামুক্ত হও। কিন্তু কেনো বলা যাবে না- নির্ভাবনা হও! নির্ভাবনা হও- বলাটা অনেক বেশি জোরালো শোনায় না, ভাবনামুক্ত হও বলার চেয়ে? যা খুশি তা হোক গে। তো, বাসের ভাইজান আমাকে ঠেসে বকা দিচ্ছিলো শ্রীলঙ্কান বলে। ফানি। দেন ইট মেড মি ইগার টু মেক হিম সারপ্রাইজড। সে কারণেই বাংলা বলা! দেখি না কী করে! কী করে আবার! হতভম্ব হয়ে যায়! হা হা হা। পার হয়ে আসার পরে, আবার, বঙ্গভাষীর বেষ্টন আমাকে নিতে হবে কেনো! আই হেইট আই হেইট আই হেইট য়্যু বাংলাদেশ- মাই লাভÑ মাই লাভ- মাই লাভ-

আম্মা খালি বলতেন- তোকে আল্লা আল্লা করে- পার করতে হবে এইখান থেকে। আল্লা! আমার বাচ্চাটাকে নিরাপদে পার করতে দিয়ো। আমি কি ঘোর ঝঞ্ঝার কালে অথৈ নদীতে পড়েছিলাম নাকি? কোথায় ছিলাম! কোথায়! আমার দেশে। বাংলাদেশে।

বাস তেনে নামোনের এক সেকেন আগে পর্যন্ত মনে অয় নাই যে, আমার এহন বাইত যাইতে মোন চাইবো না। পুরাটা দিন কাম করতে হইছে- কম্পানি পাঠাইছে ডাউন-টাউনের শেষ মাথার একটা বাড়ির কামে। আমি করি ওয়েল্ডিংয়ের কাম। সারাটা দিন খাড়ার উপরে! ঝালাই দেও জোড়া দেও। কাহিলের উপরে দিয়া কাহিল হইয়া গেছি গা! অন্যদিন হইলে তো রুমে গিয়া ধুপ্পুস। এহন মনে অইতাছে, একটা রেস্টুরেনে বইয়া এট্টু কাফি খাই! নাকি হাঁটমু! পোলাটার বেবহার আমার মিজাজটা গা›ন্ধা কইরা দিছে! উয়ে ফুটানি করলো না? ল্যাখাপড়া জানোনের ফুটানি? আরে! আমরা কমলা মানুষ আছি- একেকজোনে কত্তা ট্যাকা কামাই করি- দেশের হিসাবে! খেয়াল করবি তো! ল্যাখাপড়া আমাগোও হইতো না, বাও মোতন চললে? বাও মোতন চলোনের উফায় আছিলো- সম্বন্ধীর পুতের দেশে !

চৈত মাসের বিয়ানবেলা- আমি খাড়াইয়া রইছি গোল