You are currently viewing কথোপকথনের শিল্পকলা এবং ভাষার বিশ্বায়ন/ মনজুরুল ইসলাম

কথোপকথনের শিল্পকলা এবং ভাষার বিশ্বায়ন/ মনজুরুল ইসলাম

মনজুরুল ইসলাম

কথোপকথনের শিল্পকলা এবং ভাষার বিশ্বায়ন

{প্রবন্ধটি স্নাতক ও  স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি প্রমিত ভাষায় উৎকর্ষ অর্জনে আগ্রহীদের জন্য রচিত। এবং প্রমিত পদ্ধতিতে কথোপকথনের সংস্কৃতিবিশেষত প্রান্তিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যাতে গড়ে ওঠে সেটিও এই রচনার অন্যতম উদ্দেশ্য। একইসাথে অনুবাদ সাহিত্যে ব্যুৎপত্তি অর্জনের প্রয়োজনে মাতৃভাষাসহ বিদেশী ভাষায় দক্ষতা অর্জনের সাথে দেশীয় ভূখণ্ডে চল্লিশটি ভাষার সংরক্ষণ এবং তত্ত্বাবধায়নে স্বতন্ত্র ভাষানীতি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা ব্যক্ত করা হয়েছে। সংযুক্ত হয়েছে বাংলা ধ্রুপদী সাহিত্যের বিশ্বায়নে কিছু মতামত যা সাহিত্যানুরাগী পাঠকদের চিন্তায় ইতিবাচক অনুভূতিক উদ্রেক ঘটাতে পারে। প্রবন্ধটিতে অন্তর্ভুক্ত প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহের  ক্ষেত্রে গুণগত এবং সংখ্যাগত উভয় পদ্ধতি  ব্যবহার করা হয়েছে।}

আবেগ ও আবহের ডানাগুলিকে অতি বাস্তবতার সুদৃশ্য মোড়কে উন্মোচনের মূল মাধ্যম হচ্ছে ভাষা। ভাষার উৎকৃষ্ট ও নান্দনিক পরিবেশনায় ভালোবাসার রং হয় নিবিড়। সময় যতই গড়িয়েছে, ভাষার প্রয়োজনীয়তা ততই বেড়েছে। যোগাযোগের সেতু হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে ভাষার উপযোগিতা। সঙ্গত কারণে আজও ভাষার সৃষ্টি, সংখ্যা এবং বয়স সম্পর্কিত প্রশ্নগুলি মনন থেকে মননে নাড়া দেয়। ভাষা সৃষ্টির প্রকৃত সময় সম্পর্কে প্রত্যক্ষ কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। কারণ, “মানুষের বাগযন্ত্রগুলি নরম পেশিকলা দিয়ে তৈরি বলে সেগুলির কোনো অস্তিত্ব নেই। সে কারণেই, নৃবিজ্ঞানীদের ভাষার বয়স প্রমাণের জন্যে খুলির হাড়ের ওপর ভিত্তি করেই প্রমাণ সংগ্রহ করতে হয়েছে এবং হচ্ছে।” তবে আমরা যে ভাষায় কথা বলি তা সাধারণভাবে ছ’হাজার বছরের পুরনো (টলারম্যান এবং গিবসন, ২০১২)। এবং পৃথিবীতে প্রচলিত ভাষার সংখ্যা প্রায় সাড়ে ছয় হাজার (হ্যামারস্ট্রম, ২০১৬)। উৎপত্তি কিম্বা ভাষার সংখ্যা যাই হোক না কেন, ভাষা সৃষ্টিতে আদিম সমাজে নিরক্ষর মানব সম্প্রদায় যে প্রয়োজনের তাগিদে কণ্ঠে অসংযত শব্দের মাধ্যমে ভাষার ব্যবহার শুরু করেছিল তা নিঃসন্দেহ। ভাষাবিদ সুকুমার সেনের মতে, ‘‘ভাষার মধ্য দিয়া আদিম মানুষের সামাজিক প্রবৃত্তির প্রথম অঙ্কুর প্রকাশ পাইয়াছিল। ভাষার মধ্য দিয়াই সেই সামাজিক প্রবৃত্তি নানাদিকে নানাভাবে প্রসারিত হইয়া আদিম নরকে পশুত্বের অন্ধজড়তা হইতে উদ্ধার করিয়া তাহাকে মননশীল করিয়াছে।’’

বিশ্বায়নের প্রভাবে মেধা বিকাশের অফুরন্ত সুযোগ আজ অবারিত। তাই মাতৃভাষা এবং আন্তর্জাতিক ভাষাসহ প্রয়োজনানুসারে অন্যান্য   ভাষার নিগূঢ় তাৎপর্য অনুধাবনে প্রয়াসী সবাই। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে মাতৃভূমির বীরোচিত উপস্থাপন এবং দেশীয় সীমানায় নিজ যোগ্যতার উৎকর্ষ সাধনে বাংলা এবং ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষার ভূমিকা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। প্রতিনিয়ত প্রশ্নের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে হৃদয় থেকে হৃদয়ান্তরে। কীভাবে ভাষার অসীম সায়রে অবগাহন করা যাবে? অবলীলায় মনের ভাব প্রকাশের পাশাপাশি লেখ্যরূপে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কল্যাণে নিজেকে নিবেদন করা যাবে? উপলব্ধির সিঁড়ি বেয়ে প্রচ্ছন্নভাবে মানব মনীষা প্রত্যক্ষ করছে বিভিন্ন ভাষার হার্দিক সম্পর্ক। ভাষাবিজ্ঞানীগণ উপলব্ধি করতে পারছেন, কতটা শৃঙ্খলিত ও সুবিন্যস্তভাবে গড়ে উঠেছে এক ভাষার সাথে অন্য ভাষার গভীর মমত্ব। সন্দেহাতীতভাবে একটি বিষয় সকলের অন্তর্দৃষ্টিতে স্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছে, ভাষার দৃষ্টিনন্দন ও হৃদয়গ্রাহী শৈলী আয়ত্তে আনবার প্রাণান্ত প্রচেষ্টা কতটা প্রয়োজনীয়।

মূল প্রসঙ্গে আসি। ভাষার অবগুণ্ঠন খুলে অতলান্তে প্রবেশ করি। দেখি, কতটা বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ ভাষার সুপ্ত সৌন্দর্য। কতটা সুশৃঙ্খলভাবে বিন্যস্ত ভাষার লেখ্য এবং কথ্য রূপ, এক ভাষার সঙ্গে অন্য ভাষার বন্ধুত্ব সৃষ্টির রহস্য। প্রয়োজনীয়তার ক্রমিক অনুসারে ভাষা নিয়ত পরিবর্তনশীল এবং সুনিপুণভাবে শৃঙ্খলাবদ্ধ। ভাষার বর্ণগুলো কখনো শব্দ, কখনো বাক্য হয়ে বক্তার কণ্ঠ থেকে নিঃসৃত হয়। কিন্তু, ভাষা বলতে প্রকৃতপক্ষে আমরা কী বুঝি? প্রচলিত অর্থে, ভাব বিনিময়ের নিমিত্তে বক্তার বাগযন্ত্র থেকে উৎপন্ন ধ্বনি (Sound) বা ধ্বনি সমষ্টি হলো ভাষা। স্পষ্ট করে বললে, বাগযন্ত্রের মাধ্যমে প্রকাশিত ধ্বনির মাধ্যমে আমরা শ্রোতাকে যা বলতে চাই, কিংবা শ্রোতা তার ধীশক্তি দ্বারা বক্তব্য অনুধাবনের পর নিজে শব্দের মালা গ্রন্থিত করে যেভাবে ভাব প্রকাশ করেন তাই ভাষা। আর এই ধ্বনি উৎপাদনের উৎপত্তিস্থল হলো ফুসফুস। “ ফুসফুসে প্রবহমান বাতাস বাগযন্ত্রের মধ্য দিয়ে যাত্রা করে ধ্বনির সৃষ্টি করে। বায়ু প্রবাহের এই প্রক্রিয়াকে বলে ফুসফুসীয় বহির্গামী বায়ুপ্রবাহ কৌশল (Pulmonic Aggressive Airstream Mechanism) (জীনাত ইমতিয়াজ আলী, ২০০১)।” বিপুলা এ পৃথিবীর সব মানুষের কাছে ভাষা গঠনে এই ধ্বনি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা অনিবার্য ও স্বীকৃত।

প্রাসংগিকভাবেই ভাষা চর্চায় আমাদের প্রচেষ্টার বিষয়টি উঠে আসে। এবং সেটি হলো- প্রমিত ভাষায় কথোপকথনে আমরা কতটুকু  ব্যাকরণের নিয়মাবলী অনুসরণ করি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ভাষার সঠিক প্রয়োগে আমরা প্রায়শই ব্যাকরণ চর্চায় উদাসীনতার পরিচয় দিই এবং ব্যাকরণের সাহায্য ছাড়াই কথোপকথনের চেষ্টা করি। ফলে লেখ্য রূপেও এর প্রভাব পড়ে এবং ব্যাকরণ প্রমাদ স্পষ্টতই প্রতিফলিত হয়। আমরা ভুলে যাই, যে-কোনো ভাষায় ব্যুৎপত্তি অর্জনে ন্যূনতম ব্যাকরণিক ধারণা অর্জন অবশ্যম্ভাবী। বাক্য (Sentence), কাল (Tense) এবং পদ (Parts of Speech)-এর ওপর দক্ষতা অর্জন ব্যতীত ভাষার সুপ্ত সৌন্দর্যটি কি আয়ত্তে আনা সম্ভব? আদৌ কেউ কি আয়ত্তে আনতে পেরেছেন? জীবনের প্রতিটি পর্বে বিষয়গুলো অহর্নিশ চলমান। এই মুহূর্তে আপনি প্রবন্ধটি পড়ছেন। পাঠ শেষে মন্তব্য করবেন। মন্তব্য ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক হতে পারে। যাই হোক না কেন, প্রকাশভঙ্গি কেমন হবে? প্রবন্ধ থেকে প্রাপ্ত বার্তা কীভাবে অনুসরণ করবেন? অথবা, অনুশীলন থেকে কীভাবে পিছিয়ে পড়বেন? সহপাঠী এবং অনুজদের কী কী বার্তা প্রদান করবেন? সেই বার্তা প্রদানের ধরনই বা কেমন হবে? কোনো অস্পষ্টতা গোচরীভূত হলে তা প্রশমনে কী কী প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করবেন? ভবিষ্যতে কোন কোন নির্দেশনা অনুশীলন করবেন? ভালো করে প্রশ্নগুলো লক্ষ করুন এবং মাতৃভাষায় উত্তর লিখে তা ইংরেজিতে অনুবাদের চেষ্টা করুন। উপর্যুক্ত প্রতিশ্রুত প্রশ্নগুলির উত্তর পেয়ে যাবেন। ধরুন, কেউ তার কর্মক্ষেত্র থেকে বাসায় গেলেন অথবা বাসা থেকে কর্মক্ষেত্রে আসলেন। পথিমধ্যে ঘটে যাওয়া বিষয়গুলো যদি তিনি প্রথমে বাংলায় সাজিয়ে নেন। অতঃপর বাক্য, কাল এবং পদের প্রয়োগ ঘটিয়ে ছোটো ছোটো বাক্য তৈরি করেন, বাক্যের অর্থে যদি বৈচিত্র্য, সৌন্দর্য ও চাতুর্য ফুটিয়ে তুলতে পারেন, বাক্য ব্যবহার করে শ্রোতাকে যা বোঝাতে চাচ্ছেন তা বোঝাতে যদি সক্ষম হন, তবে বুঝতে হবে, উপর্যুক্ত বিষয়গুলো অনুধাবনে তিনি সফলতার পরিচয় দিয়েছেন।

পক্ষান্তরে, বাক্যে অসঙ্গতি পরিলক্ষিত হলে তা ব্যর্থ প্রয়াস বলে বিবেচিত হবে। বক্তা যদি দীর্ঘ এবং জটিল বাক্য ব্যবহারের পরিবর্তে সংক্ষিপ্ত ও সাবলীল বাক্য ব্যবহার করেন তবে ভুল হওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে আসবে। সেজন্য প্রচেষ্টার প্রথম প্রহর থেকেই জীবন সংশ্লিষ্ট বিষয় ও ভাবনাগুলো বাংলা এবং ইংরেজি বাক্যে রূপায়ণের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা জরুরি। শিক্ষার্থীরা যখন একটি পূর্ণাঙ্গ বাক্য গঠনে প্রতিটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয় অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণে অনুসন্ধিৎসু হয়ে উঠবে তখন ব্যাকরণের অন্তর্দরজার অর্গল খুলে যাবে। প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি পর্ব ভাবনার কুটিরে অর্গলবদ্ধ করে ব্যাকরণের ফ্রেমে বাঁধলে ব্যাকরণের নিগূঢ় রহস্য অনুধাবন সহজ হবে। অভিজ্ঞতা ও অবিরত অধ্যয়নের মেলবন্ধনে একটা সময় আসবে, যখন বাংলা এবং ইংরেজিতে মনের ভাব প্রকাশে বাক্য সাজানোর প্রয়োজন পড়বে না, ভাবনাগুলো অবিকৃতভাবে চলে আসবে। ভবিষ্যতে বাংলা এবং ইংরেজিতে ইচ্ছানুযায়ী যে কোনো বিষয়ে নিবন্ধ লেখা যেমন সহজ হবে তেমনি কথোপকথনে আসবে সমুজ্জ্বল স্বতঃস্ফূর্ততা। কিন্তু, আমরা যদি উপর্যুক্ত মৌলিক বিষয়ে দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ হই তবে প্রমিত বাংলা এবং ইংরেজিতে যুগপৎ মনের ভাব প্রকাশে ব্যর্থ হবো। শুদ্ধভাবে লেখা হবে তো আকাশ কুসুম কল্পনা। একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন – বক্তা মনের ভাব প্রকাশের পূর্বেই অবচেতন মনে তার মস্তিষ্ক বাক্য তৈরি করে নেয়। এক্ষেত্রে পরিপূর্ণ বাক্য গঠনের পর কেবল তা আওড়াতে থাকেন। মস্তিষ্কের সেই কারখানায় বাক্য স্থাপনের ক্ষেত্রে তিনি অবশ্যই ব্যাকরণের মৌলিক বিষয়ের ওপর দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করবেন চরমভাবে।

প্রাথমিক পর্যায়ে ভাষা শিখনে হামাগুড়ির পর্ব সম্পন্ন করে কল্পিত ভাবনা এবং বাক্যে ব্যবহৃত অর্থকে মনোহর, রসহীন প্রপঞ্চকে রসমণ্ডিত ও হৃদয়গ্রাহী করে তুলতে লেখক এবং বক্তা উভয়েরই উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। তাহলে বক্তব্য ও লেখনী অধিকতর প্রাঞ্জল, প্রাণিত ও সুষমামণ্ডিত রূপায়ণে লেখক এবং বক্তা উভয়েই সক্ষম হয়ে উঠবেন। যদি ব্যর্থ হন সেক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত হোঁচট খাবার আশঙ্কা সৃষ্টি হবে। কারণ, তিনি উপলব্ধি করতে পারবেন প্রশ্নমালা (Questionnaire), বাগধারা (Idioms), ক্রিয়ার রূপের গঠন (Forms of Verbs) এবং শব্দ ( Vocabulary) ব্যবহারে তার সীমাবদ্ধতা।

প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চ স্তরের পাশাপাশি যে কোনো পর্যায়ের উৎসাহী শিক্ষার্থীরা – যে কোনো স্তরে শুদ্ধ বাচনে উদ্যোগী হলে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্নমালা তৈরির প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করবেন। অনুশীলনকালীন যে প্রশ্নগুলো তিনি তৈরি করবেন, তার উত্তর প্রদানে মৌখিক অনুশীলন প্রথম শর্তেই অনিবার্য। প্রশ্নগুলো এমনভাবে তৈরি করবেন যার উত্তর বক্তার অর্জিত জ্ঞানের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে। সম্ভব হলে বক্তা সঙ্গীকে তার প্রণীত প্রশ্নগুলো জিজ্ঞেস করবেন এবং তিনি যে প্রশ্নগুলো প্রণয়ন করেছেন, তার উত্তর দেয়ার চেষ্টা করবেন যদি তিনি জিজ্ঞাসিত হন। ফলে, বক্তার বক্তৃতা প্রদানের ক্ষমতা যেমন বাড়বে, তেমনি যার সঙ্গে কথা বলবেন তাকে বিভিন্ন কোণ থেকে প্রশ্ন করতে পারবেন অবলীলায়। প্রশ্নের যাত্রা শুরু হতে পারে ঘর থেকেই। যেমন – পরিবার, ভবিষ্যৎ লক্ষ্য, বক্তার বাসা, বিদ্যালয় ইত্যাদি। সহজ ভাবনায় ছন্দোবদ্ধ অনুশীলনের দ্বারা কণ্ঠনালীর ( Vocal Cords) জড়তা কেটে যাবে। সেই প্রেক্ষিত বিবেচনায় দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে মৌলিক বিষয় নির্ধারণ করলেও অনুশীলনে বেগ পেতে হবে না। এবং উত্তর প্রদানের ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক প্রসূত বিবেচনায় গুরুত্ব প্রদানে ব্রতী হলে ভাবনায় পরিপক্বতা আসবে। গ্রন্থের সাহায্য নিয়েও উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলা করা যেতে পারে যদি সেই ধরনের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়।

বাক্য ব্যবহারে সৌকর্যের মাত্রা বৃদ্ধির বিষয়টি নিশ্চিতের ক্ষেত্রে এবং সময়ে সময়ে বৈচিত্র্য নিয়ে আসতে বাগধারার প্রয়োগ বিশেষভাবে অগ্রগণ্য। কিছু কিছু শব্দ রয়েছে যা নির্দিষ্ট শ্রেণি অথবা সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীর কাছে অদ্ভুত হিসেবে পরিগণিত হয়। আবার সেই একই শব্দগুলো ভিন্ন কোনো শ্রেণি অথবা সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে স্বাভাবিক প্রতিপন্ন হয়। এই বিব্রতকর দিকটি বিবেচনায় রেখে বাগধারার ব্যবহার সমন্বিতভাবে উভয় জনপদের মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তাছাড়া কোনো নির্দিষ্ট জনপদের সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক নিগূঢ় তথ্যাদি সহজভাবে পরিবেশন কিংবা আয়ত্তের ক্ষেত্রে সাধারণ জীবন থেকে সঞ্জাত বাগধারার সময়োচিত প্রয়োগ বক্তা এবং শ্রোতা উভয়কেই তাদের নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সহায়ক হবে। এবং শুদ্ধভাবে লিখবার অথবা বলবার ক্ষেত্রে ক্রিয়ার শুদ্ধ ব্যবহারে সচেতনতা সৃষ্টি বক্তাকে প্রতিনিয়ত তাড়িত করবে। যেহেতু ক্রিয়ার যথার্থ ব্যবহারই বক্তার প্রদত্ত বক্তৃতাটির প্রকৃত অবস্থাকে চিহ্নিত করে।

কথোপকথনের ক্ষেত্রে, বিশেষত নতুন শিক্ষার্থীরা প্রায়শই বিশাল শব্দ ভাণ্ডারের ভেতর থেকে প্রয়োজনীয় শব্দ আহরণ করতে সক্ষম না হওয়ায় বিপাকে পড়েন। প্রতিদিন একটি  সক্রিয় (Active) শব্দের অর্থ রপ্ত করে সেই শীর্ণ আত্মবিশ্বাসে শৌর্য জাগাতে প্রয়াসী হলে প্রতুল প্রশান্তি হৃদয়ে দোলা দেবে। ৩৬৫ কিংবা ৭৩০ দিনের সমপরিমাণ শব্দের অর্থের ওপর দক্ষতা অর্জিত হলে আত্মবিশ্বাসের পাল্লা ভারী হবে। শৈশব হতেই আমরা বাংলা এবং ইংরেজি শব্দের তরীতে ভেসে চলেছি। কিন্তু, সমস্যাটি হলো স্পষ্ট দিবালোকের মত সত্য এই স্মৃতি ধারণে আমরা নিস্পৃহ রয়ে যাই। একটু সতর্ক হয়ে সেই তরীতে সঞ্চিত শব্দগুলো উত্তোলন করে পুনরায় স্মৃতির পিঞ্জরে পুঞ্জীভূত করলে প্রকারান্তরে আমরাই যে লাভবান হবো তা বুঝতে চাই না। বাংলা এবং ইংরেজি, যে ভাষাতেই লিখতে চাই অথবা কথা বলবার চেষ্টা করি না কেন, শব্দের অলংকার স্থাপন করতে না পারলে তা কখনোই গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। বিষয়টি বিপরীত হলে লিখতে গিয়ে কলমের কালি যেমন ফুরিয়ে আসবে, তেমনি বলতে গিয়েও অনবরত শব্দের শিল্পিত পালক ঝরে পড়বে। তবে লেখকবৃন্দের ক্ষেত্রে যিনি গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা কিম্বা উপন্যাস লিখবেন অবশ্যম্ভাবীভাবে তাকে তার শিক্ষাজীবনের শুরু থেকে বিরতিহীন চর্চা চালিয়ে যাবার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেবার প্রশ্ন আসবে। শব্দের সীমাবদ্ধতা থাকলে তার লেখা স্বাভাবিকভাবেই অধিকতর গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে না। একই শব্দ যখন বারবার একটি গল্প, প্রবন্ধ কিংবা কবিতায় ব্যবহৃত হবে তখন তার সীমাবদ্ধতা যেমন গোচরীভূত হবে তেমনি পাঠকের মননে সৃষ্টি হবে বিরক্তির ভাব।

যাই হোক, অতঃপর বক্তা প্রস্তুতি ব্যতীত এবং আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা এবং ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে কীভাবে বক্তৃতা প্রস্তুত করবেন, কী কী বিষয়ে, কীভাবে বক্তৃতা শুরু ও শেষ করবেন তার কৌশল আয়ত্ত করবেন। মনে রাখতে হবে, কোনো সেমিনার কিংবা আয়োজিত অনুষ্ঠানে হঠাৎ করে বক্তৃতা শুরু করা বিব্রতকর এবং বক্তা যদি আনাড়ি হয়, তবে তো কথাই নেই। যথাসম্ভব আনুষ্ঠানিকতা বজায় রেখে বক্তব্য শুরু এবং শেষ করবার দিকে মনোযোগী হতে হয়। সুতরাং, আড়ম্বর কিংবা অনাড়ম্বরপূর্ণ যে কোনো অনুষ্ঠানে মানসম্পন্ন বক্তৃতা প্রদানে বক্তাকে কিছু প্রপঞ্চের (Phenomenon) ওপর গুরুত্ব প্রদানে যত্নশীল হতে হবে – যার কোনো বিকল্প নেই। শব্দ অনুশীলন (Word Study) হতে পারে সেই প্রপঞ্চের প্রথম সোপান। বক্তা তার চতুর্দিকে ছড়িয়ে থাকা অজস্র শব্দ দিয়ে কথার মালা গ্রন্থিত করলে ধীর গতিতে হলেও তিনি পরিপূর্ণতার দিকে এগুতে থাকবেন। প্রথমেই একটি পছন্দসই শব্দ নির্বাচন করা যেতে পারে। শব্দটি হতে পারে “মা” (Mother) কিংবা “ফুল”(Flower)। অতঃপর উক্ত শব্দ নিয়ে বক্তা তার চিন্তার স্রোতকে চতুর্দিকে প্রবাহিত করবেন। “ফুল’’ এবং “মা” শব্দ দুটো কোন কোন বাক্যের ক্ষেত্রে সম্পর্কিত করলে শব্দ দুটির গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে তা বক্তৃতা প্রদানকারী বিবেচনা করে বাক্য গঠন করবেন। এবং তা বক্তৃতা আকারে প্রকাশের চেষ্টা করতে থাকবেন নিয়মিতভাবে।

যে কোনো ভাষায় অনর্গল ভাব প্রকাশের ক্ষেত্রে কথোপকথনে (Conversation) ব্যক্তিক, রাষ্ট্রিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, শৈক্ষিক এবং মানবিক বিষয়ের অন্তর্ভুক্তি অপরিহার্য। প্রারম্ভিক পর্যায়ে ভীতির মৌচাকে ঢিল ছুঁড়ে সক্ষমতা অর্জনে কথোপকথন পাঠ দেখে দেখে অনুশীলন করতে হবে। পরবর্তী সময়ে বিষয় নির্ধারণ এবং তাৎক্ষণিকভাবে যে-কোনো বিষয়ের ওপর দু’জন শিক্ষার্থী কথোপকথন অনুশীলন করবেন। বর্তমানে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুদ্ধ বাংলা এবং ইংরেজিতে কথোপকথনের ক্ষেত্রে অকারণ লজ্জা অনুভব করেন। শিক্ষার্থী যত বেশি শুদ্ধ ভাষায় কথোপকথন করবেন, ততই তার ভেতরে আজন্ম আশ্রিত জড়তা কেটে যাবে। এবং শিক্ষার্থীর অন্তঃকরণে যে ধারণাটি ধীরে ধীরে মূর্ত হয়ে উঠবে সেটি হলো – নিজেকে যোগ্য বক্তা হিসেবে প্রস্তুতে নিরন্তর কথোপকথনের বিরতিহীন চর্চা। যেহেতু যে কোনো ভাষায় শুদ্ধভাবে মনোভাব প্রকাশ একটি স্বাভাবিক এবং চলমান প্রক্রিয়া সেহেতু শুদ্ধ বাচনের অভ্যাস যিনি যত দীর্ঘ সময় ধরে করতে পারবেন তিনি তত বেশি পারঙ্গমতা অর্জন করতে সক্ষম হবেন। কিন্তু, কথোপকথন প্রক্রিয়ায় নিয়মিত বিরতি প্রকৃতই কোনো সুফল বয়ে আনবে না। তাই, একজন সঙ্গী নির্বাচন করে সর্বাবস্থায় কথোপকথনের অবিরাম প্রয়াস- প্রস্তুতিতে নিয়ে আসবে ভিন্ন মাত্রা। বক্তা এবং শ্রোতা, উভয়ই কোন কোন বিষয়ের ওপর আলোচনা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন – সেটি হতে হবে স্পষ্ট। পারস্পরিক এই সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব শিখন-প্রক্রিয়ায় অনুরঞ্জনের সৃষ্টি করবে। দুজন দুজনকে বুঝবার উপলব্ধি শিখনের ক্ষেত্রে উভয়কেই সমৃদ্ধির পথে ধাবিত করবে।

কথোপকথনে অপেক্ষাকৃত দুর্বোধ্য ভাষার (Flowery Language) ব্যবহার পরিত্যাগে মনোনিবেশ বাঞ্ছনীয়। সবসময়ই সহজ শব্দ ব্যবহার করে বক্তা তার সঙ্গীকে যা বোঝাতে চান তা বোঝাতে পারাই হবে বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। যে কোনো বিষয়ে বক্তৃতা প্রদানে দীর্ঘসূত্রিতা পরিত্যাগকরণ বক্তৃতার গতি সচল রাখে। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে, পরিস্থিতি দীর্ঘ বাক্য ব্যবহারে আবহ সৃষ্টি করলে পৌনঃপুনিক সূত্র (Recurcive Rule) ব্যবহার করে বাক্যের অন্তর্দ্বার উন্মোচনের অসীমতা সৃষ্টি করা যাবে, অবলীলায় দীর্ঘায়িত যৌগিক বাক্য ব্যবহার কবে বক্তৃতায় ব্যঞ্জনার পুঞ্জ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। বন্ধুর সঙ্গে কথোপকথনে ব্যাকরণের দিকে মনোযোগ না দেয়াই শ্রেয়। বরং অনর্গল কথা বলার দিকে (Fluency) মনোনিবেশই প্রথম ও প্রধান কর্তব্য হওয়া উচিত। পরবর্তীকালে যখন বাকপটুতা (Fluency) আসবে তখন নির্ভুলতার (Accuracy) পথে তরী বেয়ে যাওয়াকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মাধ্যমেও কথোপকথনে গতি সঞ্চার করা যেতে পারে। যেহেতু উক্ত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে কথোপকথনের অবারিত দ্বারটি উন্মোচিত হয়ে থাকে শিক্ষার্থীদের কাছে। পাশাপাশি শিক্ষকের সাথে শিক্ষার্থীর যোগাযোগের  পথটি মসৃণ হয়ে ওঠে এবং শিক্ষার্থীদের সাথে গড়ে ওঠে গভীর বন্ধুত্ব। শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয় তাদের চিন্তার স্রোতটিকে বিভিন্ন দিকে প্রক্ষিপ্ত করতে। যেহেতু সূক্ষ্ম চিন্তাশক্তি ও যথার্থ যুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বিপরীত দলের সাথে সাফল্যের অভিপ্রায়ে মুখোমুখি হবার বিষয়টি সামনে এসে উত্থিত হয়। সৃজনশীলতার বীজটিও উদগমিত হয় তার বোধের গর্ভে – তারই অন্তরালে। এবং স্বাভাবিক জীবন প্রবাহের প্রতিটি ক্ষেত্রে শুদ্ধভাবে মনোভাব প্রকাশের বিষয়টি প্রতীত হয়ে ওঠে অত্যন্ত সহজ এবং সাবলীল হিসেবে।

এ লক্ষ্যে প্রতিদিনই এক পৃষ্ঠা পাঠানুশীলনকরণ ( Reading) নির্ভুলতায় দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে অপরিহার্য ভূমিকা হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশেষত বাকপটুতায় (Fluency) দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে। শিশু চিত্তে সরব পাঠের অভ্যাস গঠনের প্রয়োজনীয়তা বিপুল। পরিণত বয়সে পাঠক সরব ও নীরব উভয় পাঠের অভ্যাস গঠন করতে পারেন। সরব পাঠের ক্ষেত্রে যদি পাঠকের চিত্ত ও মস্তিষ্কের মিলন না ঘটে তবে নীরব পাঠই শ্রেয়। প্রারম্ভিক পর্যায়ে ধীরগতিতে পাঠ শুরু করে পরবর্তীকালে দ্রুততার সাথে পাঠাভ্যাস একজন প্রকৃত পাঠকের বিশিষ্টতা। এই ধরনের পাঠক সহজেই অনুধাবন করতে পারেন-পাঠের বিষয় প্রাথমিক পর্যায়ে হবে অতীব সহজ এবং পরবর্তী সময়ে হবে তুলনামূলক জ্ঞানগর্ভ। তিনি প্রবলভাবে অপেক্ষা করেন সেই মুহূর্তটির জন্য, যখন সময় নির্ণায়ক ঘড়িতে নিরীক্ষার দৃষ্টি স্থাপন করে দেখবার প্রয়াস পান, কত অল্প সময়ে অধিক শব্দ পাঠ করতে পারছেন। এবং অবশ্যম্ভাবীরূপে পাঠককে পাঠের ভাব আত্মস