ভাটির টানে/এলিজা খাতুন
বৃষ্টি থেমেছে ; সায়েমা পেছনে পিচের রাস্তা ফেলে এসেছে অনেক্ষণ। ইট সলিংএ খানিক পথ এগিয়েছে বেশ ভালোভাবেই। এখন সামনে যত যাচ্ছে পিছলে পড়ার সম্ভাবনা বাড়ছে। সায়েমা আগেই শুনে এসেছে দুই কিলোমিটার পথ কাঁচা। মাঠে আসার আগে নিশান্তর কাছ থেকেও এনজিও সম্পর্কে জেনেছে অনেক কিছুই।
গ্রামের মানুষগুলো সকাল থেকে শহরের দিকে আসছে। পায়ে পায়ে কাদা উঠে আসছে এদিকে, ইটসলিং এর উপরে পানি কাদার প্রলেপ পড়েছে জায়গা জায়গা। দূর থেকে সামনে যতদূর দেখা যাচ্ছে ইটের লাল রং তত অস্পষ্ট। মাটির পথ খুব কাছেই। খটং মটং শব্দে পাশ কেটে দু’একটা করে বাইসাইকেলে দুজন করে করে পার হয়ে পিচের রাস্তার দিকে উঠে আসছে। সায়েমা পিচ পথ, ইটসলিং সব পেছনে ফেলে আড়াআড়ি উঁচু মেঠো পথের গায়ে এসে ঠেকলো। বেশ উঁচু পথ, মাটি দিয়ে বাঁধ দেওয়া, বাঁধের উপরে মাটির পথ। নিচু জমির এলাকা ও রাস্তাঘাট থেকে বাঁধের উপরের মেঠো পথের অবস্থা ভালো মত বোঝা যাচ্ছে না। তবু স্বস্তি হচ্ছে সায়েমার- অফিসের ম্যানেজারের বর্ণনা অনুযায়ী মিলে যাচ্ছে পথ ঘাট।
মোটা জিবলী গাছের কচা টেনে তাতে ভর করে উঁচু পথের উপরে উঠতে হলো। পথের দিকে দূরে তাকিয়ে সায়েমা মনে মনে বলল- একি অবস্থা ! ধান রোয়ার আগে ক্ষেত যেমন থকথকে কাদা করে তোলা হয়, এ মাটি-পথ তেমনই ! থকথকে কাদার আবাদ করে রেখেছে যেন কেউ।
সায়েমা দাঁড়িয়ে একটু দম নিয়ে ; চোখের ভেতর পথের দূরত্ব তীরের মত বিধিয়ে নেয়। পথ উপচানো কাদার ভেতর পায়ের চিহ্নগুলো কাঁথায় সেলাই ফোঁড় তোলার মত বিছিয়ে আছে। দু পাশে সারি সারি বাবলা গাছ, বাবলার ছোট হলুদ ফুল, কাঁটা কাদা মিলেমিশে একাকার।
পা থেকে জুতো জোড়া খুলে এক হাতে নিল, অন্য হাতে পাজামা টেনে গুটিয়ে এক পা দু’পা তুলে এগোনোর চেষ্টা সায়েমার। ডানে বামে চেয়ে দেখছে দু পাশে নিচু বিস্তীর্ণ ধানের জমি। আবার সামনে দৃষ্টি ; এক একটা পদক্ষেপ কাদার ভেতরে যত সহজে পুতে যাচ্ছে, পুনঃ পদক্ষেপের জন্য সেখান থেকে পা টেনে তোলা ততটা সহজ নয়। কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে এভাবে কিছুদূর চলল। প্রচন্ড গরম না পড়লেও কাদার সাথে পদযুদ্ধে এতক্ষণে পিঠ ভিজে উঠেছে ঘামে। কপালে বিন্দু ঘাম, দু’পাশে কানের লতির নিচ দিয়ে, কন্ঠা চুঁয়ে আসা ঘাম গলার নিচে এসে মিলছে।
একজন বয়স্ক মানুষ ওদিক থেকে আসছে, সায়েমা মুখ তুলে দেখলো পথের ধার দিয়ে হাঁটছে লোকটি, খুব সহজ ভঙ্গিতে। স্বাভাবিক তার পায়ে চলার গতি। সায়েমার পাশ দিয়ে বিপরীতমুখী অর্থাৎ শহরের দিকে যেতে যেতে বলল-
– উরাম মদ্যিখানতে হাঁটলি বোলো আগুতি পারবা না খুকি, ধারদে ধারদে হাঁটা ধরো। ও যোমের মদ্যি পুততি গিছাও ক্যান !
পথের ধারের দিকে তাকালো ; শিউরে ওঠে সায়েমার শরীর, কাদার গভীরতা কম হলেও ভয়ানক পিচ্ছিল। দু’পাশে খুব ঢালু ধানের জমি, কোমর সমান পানি। এসব জলাভূমিতে এখন আমন ধান হয়েছে। থৈ থৈ পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে ধানগাছের আগা।
নিম্নপক্ষে সাত-আট ফুট লম্বা হয় আমন ধান। কোনভাবে পা পিছলে পড়লে সায়েমাকে ধানগাছগুলোর মতো গলা ডুবিয়ে থাকতে হবে।
কিন্তু এভাবে আর কতদূর ? হাঁপিয়ে উঠেছে, পেছনে ফিরে তাকায় ; চলার গতি থেকে অনুমান করার উপায় নেই কতদূর এলো, আর কতদূর বাকি ?
তখন পেছন দিক থেকে ইট বোঝাই একটা পাওয়ার টিলার আসতে দেখা গেল। এই কাদাপথটাকে পাওয়ার টিলারের চাকাগুলো ধানের জমি হিসেবে নিয়েছে যেন! পাওয়ার টিলারে ভরা ইটগুলো উপরে সমতল করে সাজানো। তার উপরে একজন পুরুষ একজন মহিলা বসা। চালক সহ তিনজন। কাদায় পা ডুবিয়ে সায়েমা পেছন ফিরে তাকিয়েছে, টিলারের উপরে বসা মহিলাটিও দূর থেকে দেখতে দেখতে আসছে। সায়েমার পরিপাটি জামাকাপড়, কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ দেখে বুঝতে অসুবিধা হলো না তার- মেয়েটি এ পথে হাঁটতে অনভ্যস্ত।
টিলারের ভটভট শব্দের সাথে পাল্লা দিয়ে চেঁচিয়ে সায়েমাকে উদ্দেশ্য করে বলল-
– ও মেইয়্যে ! গাঁয়ে পা দিতি হেনো মিলা দূরস্তার ; ওটপা নাই ?
চালকের দিকে হাত বাড়িয়ে থামতে বলে,-
– এ ময়না খাড়া খাড়া, তোর ইসটাট থামা, মেয়েডারে উটায় নে।
বলতে বলতে পাওয়ার টিলারটি সায়েমাকে ছাড়িয়ে গেছে কয়েক ধাপ। পানের পিক ফেলতে ফেলতে এড়ানো কথার মত করে বলল সায়েমাকে-
– তোড়ে এস্যু
সায়েমা ভাবছে মন্দ হয় না। না উঠার সিদ্ধান্ত নেবারও সময় নেই ; এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। কাদায় ভারি হয়ে যাওয়া পা দু’টো কোনমতে দু’চার ধাপ বাড়িয়ে পাওয়ার টিলারের উপরে উঠল, মহিলাটি একপ্রকার টেনে তুলল। পা ঝুলিয়ে পেছনে বসল। কোলের পরে কালো ব্যাগ, অন্য হাতে জুতো জোড়া।
ইতোমধ্যে পাশে বসা মহিলাটি পাতার বিড়ি ধরিয়েছে। সায়েমার মাথা ঘুরছে। কাদার সোঁদা গন্ধ, বাবলা পাতা-ফুলে বাতাসের মাখামাখি হালকা গন্ধটাও মন্দ লাগেনি এতসময়। মহিলার নাক মুখ দিয়ে ভক ভক করে বের হওয়া তামাকের ধোঁয়া সায়েমার পেটের ভেতর থেকে গুলিয়ে আনছে। নামতে পারলে বেঁচে যায়।
খানিকটা পথ যাবার পর স্টার্ট বন্ধ করে মহিলাটি বলল-
– লাবতি পারবানে ?
সায়েমা বসে থেকেই চারপাশে তাকিয়ে ম্যানেজারের বর্ণনার সাথে এ স্থানের মিল খুঁজছে। বড় নিমগাছ, নিচে ছোট্ট দোকান, দশ বারোটা বয়োমে- কাঠি চকলেট, গুলিমিঠাই, মিছরি, লবন, হলুদ ইত্যাদি, পাঁচ ছয়টি রং বেরং এর মোড়কে সাবান।
ততক্ষণে মহিলাটি নেমে পেছনে এসে সায়েমাকে নামতে সাহায্যের জন্য হাত বাড়ালো। এখানটায় কাদা কিছুটা কম, কেন তা বোঝেনি এখনও। মহিলার হাতে ভর করে নেমে পড়ল একলাফে। সামনে ফিরে বুঝতে পারলো পাওয়ার টিলার এসে থেমেছে একজনের বাড়ির উঠোনে। রাস্তার দিকে ঢালু হয়ে নামা উঠোনের একপাশে বালির স্তুপ ; পানি দাঁড়ায় না; উপরন্তু বালি ধুয়ে গড়ে সারা উঠোনে ছড়িয়েছে খানিক, কাদা বিহীন উঠোন।
মহিলাটি মুখে রহস্য হাসি নিয়ে প্রশ্ন করল
– ঠিক জাগামত নে আইছি তো আফা ?
মহিলাটি সায়েমাকে হাতের ইশারা করে ডেকে নিয়ে সামনে সামনে চলল; কিছুদূর এগিয়েই চোখ পড়ল- একটা কাঁঠাল গাছে পেরেক ঠুকে ঝুলানো সাইনবোর্ডে অফিসের নাম লেখা – ‘প্রসারণ ক্ষুদ্রঋণ, ইসলামপুর মহিলা সমিতি’।
এবার সে নিশ্চিত হলো গন্তব্যে এসে গেছে। হাঁটু পর্যন্ত কাদা পা, কাঁধে কালো ব্যাগ, লম্বা গড়ন, পরিপাটি পোশাকে সায়েমাকে দেখে দুজন মহিলা এগিয়ে এলো,
প্রথম জন– ও আফা আইজগেত্তে তুমি আসপেন ?
২য় জন – মিলা সমাত্তে বসি রইছি। পত্তম দিন আপনার সঙ্গে লোক দেইনি ক্যান ?
সায়েমা স্মিত হেসে বলল-
– রাস্তার যা অবস্থা ! লোক দিলেই বা কি হতো
বারান্দার চৌকিতে হাত বাড়িয়ে ব্যাগটা রেখে টিউবয়েলে পা ধুয়ে নিচ্ছে ; ততক্ষণে পরিচয় পর্বও প্রায় এগোচ্ছে, ইতোমধ্যে আরও জনা চারেক হাজির,
– আফার বাড়ি কোয়ানে ?
– আফা তোমার বে হয়্যি ?
– ও আফা তুমি থাকপান তো ? আমাগের কেন্দ্রে কোন সার আফা বেশিদিন টেকে না ; ক্যান তা কিজাইন ?
সায়েমা ব্যক্তিগত প্রশ্নগুলো এড়িয়ে উত্তর দিল।
– আপনাদের গ্রুপে কতদিন আসতে পারবো পরিস্থিতি বলবে। ভালো আছেন আপনারা সবাই ?
একসাথে কয়েকটি কন্ঠে উত্তর- হ্যায় !!
প্রশ্নটি করে সায়েমা নিজের কাছেও প্রশ্নের সম্মুখিন হলো। এই মানুষগুলোর ভালোথাকাটা কোন পর্যায়ের? কতটুকু ভালো থাকলে ওদের সঠিক ভালো থাকা বলা যায় ?
মহিলাটি ততক্ষণে অস্থির হয়ে উঠেছে ;
– আফা এবারডা আমার ছাড়ো, এট্টু ব্যস্ত ব্যস্ত লিকি দ্যাও, বলেই একশত টাকা এগিয়ে দিলো।
সায়েমা পাশবই হাতে নিয়ে দেখলো পাঁচ হাজার টাকা ঋণের সাপ্তাহিক পরিশোধের কিস্তি আকারে একশ পঁচিশ টাকা, সাপ্তাহিক সঞ্চয় পঁচিশ টাকা। সায়েমা মেয়েটির মুখের দিকে চাইল; এখনও ৫০ টাকা ঘাটতি।
কিছু বলার আগেই মহিলাটি ঝটপট করে বলল-
– আফা পঁচিশ টাকা কম আছে, দেকি বাড়ি যেইয়্যে। কডা হাঁসের ডিম বিক্কির কইরে দে যাতি পারি কি।
– ২৫ নয়, ৫০ টাকা ঘাটতি। প্রথমত পঁচিশ টাকা আপনার সাপ্তাহিক সঞ্চয়, আরও পঁচিশ টাকা আপনার ঋণ পরিশোধের দরুণ । সঞ্চয় করাটা বেশি জরুরী।
– এ আফা দেকতিছ উল্ডো কতা কচ্ছে। হ্যাতোকাল ঝ্যাতো স্যার এয়্যিছে সকগুলি কইছে- সঞ্চয় দেও চাই না দেও কিস্তি মাপ নেই।
পাশবই হাতে নিয়ে সায়েমা খেয়াল করল- সুদসহ ঋণ পরিশোধের ঘর পূরণ থাকলেও প্রত্যেকেরই সঞ্চয়ের ঘর ফাঁকা। সঞ্চয় মনোভাবহীন এরা সবাই। বরং ঋণ পরিশোধ করে আবার ঋণ গ্রহণ করে।
রেজিস্টার লেখার ফাঁকে ফাঁকে আনমনা হওয়া সায়েমার মুখে তাকিয়ে একজন বৃদ্ধা বলে উঠল-
– খুকি, কিস্তি নিকতি ভুল কইরে না, আমাগের নক্ত পানি কুরা টাকা। আগের সার আমার দুই কিস্তির টাকা মেইরে দেছে। আমি তো নোজ নোজ আসতি পারিনে, ছাওয়ালের বউ নে আসে ; বউডা এট্টু সরলপানা। কদিন কাদা পাইনতে পাতা মেইরে আমার পার তুলা ফেইটে হা হই গে। নক্ত বের হতিলো দেক্যি সুক্কাল বিলা বউ কল্যে আইজগে তুমার পাতা মারতি যেত্যি হবেনা, আমি যাবানে। তুমি নাই বইকান নে সুমিতিত যাইয়্যানি। তাইতি আইচি খুকি। দেকি শুন্যি ঠিক করে নেকো ।
বৃদ্ধার ভাঙাচুরো এবড়ো থেবড়ো দাঁতে চিবোনো পান খাওয়া বেশ ভালো লাগলো ; ফুক ফুক করে বের হয়ে আসা জর্দার ঘ্রাণটুকুও।
বৃদ্ধার কথা শুনে অন্যজন বলল-
– ওরে আর কইস নে, সানু’গের বাড়িতি যে সমিতি বসে উকিনতে লোন নিলাম, আমারও দুডো তিনডি কিস্তির টাকা মেইরে নেছে ঐ দাঁত ক্যালানি আফা।
ওদের উচ্চারিত প্রত্যেকটি কথা শুধু শুনছে না সায়েমা, শব্দগুলো আঘাত করছে মাথায় ; নিজেকে খুব অসহায় লাগছে এই ভেবে যে- এসব হতদরিদ্র মানুষদের কাছে কিভাবে কোন্ উপায়ে নিজেকে প্রমাণ করবে,- এই মেয়েটি ওদের কষ্টের টাকা ফাঁকি দিয়ে নেবে না। নিজের হিসাব-বইয়ে এন্ট্রি দেওয়া হিসাবটা পড়তে পারে না যারা ; আসলেই কি ওরা ফাঁকির চোরাবালিতে ডুবছে না ? চক্রবৃদ্ধির অংক শিখে যারা এ অংকের অপব্যবহার করে লুফে নিচ্ছে চক্রবৃদ্ধিহারে সুদের সমুদ্র ; তারা ফাঁদ পেতে রেখেছে রক্তচোষার মত।
সম্বিত ফিরলো চাচির কথায়-
– ও খুকি, পচ্চিম পাড়ার গুরুপ চেনো তো ? এ মনা … এ মেয়েডার সাথে গে দিকাই দে আয়, পেত্তম দিন চেনবেন না।
– আফা চলো, তুমার দিকাই দে এস্যি কডা ঘ্যাঁটকোল তোলবো। আমি মেইয়ে লোক হইয়ে কদিন চালাবো কও দিনি ? আইজগের কিস্তির টাকা জোগাড় করিচ কুঁড়ো বেচে।
কুঁড়ো বেচা কথাটা শুনে চমকে উঠলো সায়েমা। বাড়ির কথা মনে পড়ল, সেই সাথে মায়ের মুখটা। ইতোমধ্যে সায়েমা রেজিস্টার, ব্যাগ, টাকা গুছিয়ে উঠে পড়েছে।
পথ প্রদর্শক মহিলা আগে না চলে পাশাপাশি হাঁটছে, গলার স্বর নামিয়ে বলল-
– আফা এইবারডা এট্টু বেশি করে লোন দেবেন, আগেরবার টাকা নে কুলোন দেয়নি।
– কি করেছিলেন ?
– গাভী কেনার জন্যি নিলাম,
– কয়টা গাভী আছে বর্তমান ?
– গাভী নেই
– মানে ? বেচে দিয়েছেন ?
– না, সে কিনতি পারিনি। মেয়ে বিয়ে দিলাম
সায়েমা হঠাৎ হাঁটার গতি কমিয়ে মহিলার মুখের দিকে তাকালো, আস্তে করে উত্তর দিল-
– ও , তা এবার কি কাজের জন্য নেবেন ?
– গাভী পালন
– কত টাকা হলে একটা গাভী কিনতে পারবেন ?
– এই যুগে গাভী কিনে পুষ্যে লাভ করা মুকির কুতা ? কাগজে লিকতি হয় তাই তুমি লিকি দিয়ানে। শোন মা , তুমি তো অপিসি কতি যাচ্চাও না, তুমার সঙ্গে কলি দোষ নিই। তুমি হলি নিজেগে লোক। এইবারা টাকা তুলতি হচ্ছে মেইয়ের সিজার করাতি লাগবে তাই। এইরাম বিপদ আপদের সময় কাজে লাগবে, তাইতি সমিতি করিচ মাগো।
সায়েমা বাকরুদ্ধ।
পদে পদে নিশান্তর কথা মনে পড়তে লাগলো সায়মার। আজকাল শিক্ষিত মেয়েদের বেশি বেশি চাকরি হয় এনজিওতে। নানা রকমের বাণী-বক্তব্য চালু আছে এ নিয়ে, নারী-সমতা কথাটা তার মধ্যে বেশি চালু। এখানে যে টাকা আদায়ের জন্য এসেছে সে, এখানেও নারী সদস্যদের সংখ্যাই বেশি। আসার পথে যত মানুষ শহরমুখো যেতে দেখেছে- প্রায় সবই নারী, তাদের হাতে ঝুড়ি কোদাল। নিশান্ত অনেক জ্ঞান দিয়েছে তাকে, নিজের প্রাত্যাহিক কাজকর্ম আর চাকরি জীবনের নানা মজার গল্পও শুনিয়েছে,-
সেদিন নিশান্ত আলু সেদ্ধ দিয়ে রাইসকুকারে ভাত বসিয়ে বাড়ির সব কাজ দেখভাল করে,মা বাবাকে সকালের ঔষধ- চা-টোস্ট দিয়ে, ঘরদোর গুছিয়ে, স্নান সেরে রেডি হয়ে অফিস বেরুলো ; উদ্দেশ্য সময়মত পৌঁছাতে পারা !
বাড়ি থেকে মিনিট পাঁচের পথ ইট সলিং, তারপর পিচ রাস্তা। পানি জমে ছপ ছপ করছে। রাস্তায় জমে ওঠা লালচে কাদা পানি পচাৎ করে ছিটকে এসে কামিজে পড়ল। সাদা জামায় পানির লালচে দাগ গুলো তাকিয়ে আছে যেন। সকালে স্বচ্ছ রোদ দেখে সাদা পরেছে, আকাশের গোমড়াভাব আগে টের পেলে অন্তত এটা পরতো না। জামার অবস্থা দেখে মেজাজ বিগড়ে গেল, অবশ্য অফিসে এক্সট্রা ড্রেশ রাখা আছে। সামনে কিছুদূর এগোলেই চার রাস্তার মোড়। দু’চারটে চা’এর দোকানে পাড়ার গোটাপাঁচেক নামধারী সমাজসেবক বসে থাকে, চা’এর কাপে তাদের অলস ভোরগুলোকে ঝাঁকিয়ে গুলিয়ে পান করে।
বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়ানোর পর অবশেষে একখানা পা চালিত ভ্যান পেল নিশান্ত।
– চাচা যাবেন ?
ভ্যান চালক চাচা ইশারায় উঠতে বলে দাঁড়ালেন, হাঁপাচ্ছেন, ঘামে গোসল করছেন। দেরি না করে চেপে বসল, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভাড়া আগে থেকে চুৃকিয়ে উঠলেও আজ সময় নেই। মোড়ের বাঁক ঘুরে টানা পিচ রাস্তায় এসে নিশান্ত জিজ্ঞেস করল-
– চাচা, গত দুদিন থেকে ব্যাটারি চালিত ভ্যান একটাও দেখছিনা, একেবারেই বন্ধ করে দিল ?
– আপনার আর কি বলবো মাগো ; তাগ্যের সব আইন কানুন গরীব-গুরবার উপরে, সমিতি থেইকে তিরিশ হাজার টাকা ঋণ তুইলে চার্জার ব্যাটারি কিনিলাম, সিডা এখন থানায় আটকানি। কিস্তি দিতি পারতিছিনে, সমিতির ছার এসে ঘরের চাল খুইলে নিতি চায়, ঝ্যাতো জ্বালা আমাগ্যের।
পথিমধ্যে একজন ভদ্রলোক উঠলো ভ্যানের সামনে ডানদিকের সিটে।
নিশান্ত স্বভাবসিদ্ধ চালে ভ্যান চালকের সাথে আলাপে মেতে উঠলো, বাড়ির খোঁজখবর নিল। এক সময় ভ্যান চালক দুঃখ করে বলল-
‘গতরডারে এট্টু আরাম দেই, সে কুপাল নে আসিনি মাগো ; এদিকি পুলিশি ব্যাটারী খুল্যে নেছে, আবার ওদিকি ঠিকই ঋণের কিস্তি টানতি হতিছে, এদিকতে চুষতিছে, ওদিকতে চুষতিছে”
নিশান্ত চাচার কথার মধ্যেও খুঁজছে তার ঘাম-ভেজা টাকায় কেনা ব্যাটারির বৈধতা-অবৈধতা। ঘামে ভেজা টাকা’ই তো! তা দিয়েই তো ব্যাটারী কেনার ঋণ শোধ করছে তাও আবার সুদেআসলে। পাশে বসা লোকটির কথায় নিশান্তর সম্বিত ফিরলো ;
– ঋণ নিলে তো শোধ করতেই হবে চাচা ! দেশে এনজিওগুলো এসেই গরীব মানুষগুলো বেঁচে গেল।
অবশ্য চালক চাচাও সে কথায় সম্মতি দিল-
– হ্যায় ! তা না হলি একসাথে এত টাকা নিজের ভাইও ভাইকে দেয় না আজকাল।
– গরীব নিঃস্ব মানুষগুলো টাকার মুখ দেখেছে, সংসারের উন্নতি হয়েছে তাদের সব এনজিওদের বদৌলতে, কি বলেন আপা ? বলল লোকটি।
আপা শব্দটি কানে আসতেই নিশান্ত ভাবল- সৌজন্যর সুবাদে তার উত্তর করা উচিত।
– হুম, বেঁচে গেল বলছেন, সেটা কিরকম ?
– এই যে দ্ররিদ্র শ্রেণীর মানুষেরা সহজেই টাকা পাচ্ছে, এটা কি কম ব্যাপার ?
– ব্যাপার কম নয়, বেশ লাভজনক। তবে তা দরিদ্র মানুষগুলোর নয়।
– মানে ? লোকটি যে মতামত আশা করেছিল তা দপ করে নিভে গেল। নিশান্ত আবার বলল-
– আচ্ছা বলেন তো – এত বছর ধরে আপনারা দরিদ্রশ্রেণীকে টাকা দিয়েই যাচ্ছেন, তাতে কি দারিদ্র্য মোচন হয়েছে কানাকড়িও ?
– তাহলে এসব এনজিও যে এত হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ টাকা ছড়িয়ে দিচ্ছে গ্রামে গ্রামে সেসব কিচ্ছু না!
– ক্ষুদ্রঋণ আসলে ঋণগ্রহীতার দারিদ্র্য কমায় না, বরং আরও বাড়ায় ।
– ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে কেউ কি স্বাবলম্বী হচ্ছে না ?
– হচ্ছে, আচ্ছা বলুন তো- মহাজনী কাজ কারবারের সঙ্গে বিদ্যমান ক্ষুদ্রঋণের তফাৎ কতটুকু ?
– শুনুন আপনি কিন্তু এভাবে আঙ্গুল তুলতে পারেন না। ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে ঋণগ্রহীতার উন্নতির অনেক সুন্দর সুন্দর প্রমাণ আছে। আপনি দেখবেন ?
– এমন মানুষের সংখ্যা কত ? ক্ষুদ্রঋণের সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার এই যে- এটা দারিদ্্র্য দূরিকরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ একটা প্রোগ্রাম। এই দুর্ভাগ্যজনক প্রপঞ্চটি বাস্তব এবং সত্য হওয়ার পরেও এটি টিকে আছে !
– ঠিক আছে যুক্তি দেন…
– এই হতদরিদ্র গোষ্টিটার পক্ষের যুক্তি-তর্ক সময়ের কাছে বাঁধা পড়ে যায় সর্বদা।
– তার মানে ?
– মানে আমাকে এখানেই নামতে হচ্ছে, সেই সাথে থামতেও হচ্ছে ; তবে প্রসঙ্গটা থামানোর নয়।
গেটের উপরে সাইনবোর্ডে বড় অক্ষরে লেখা ‘ মানবিক সাহায্য সংস্থা ’ এটা দেখিয়ে লোকটি বলল-
– এটাই আপনার অফিস ?
– জ্বি,
নিশান্ত ভ্যানভাড়া মেটানোর ফাঁকে লোকটি কার্ড বের করে এগিয়ে দিল। ভ্যান চলেও গেল। রাস্তা ক্রস করে অফিস ক্যাম্পাসে ঢুকে কার্ডটিতে চোখ রেখে আশ্চর্য হলো। এতক্ষণ ক্ষুদ্রঋণের বিরুদ্ধে নিশান্ত যাকে এত কথা শুনিয়েছে, ইনি ক্ষুদ্রঋণ প্রোগ্রামের রিজিওনাল ম্যানেজার ! এ ধরণের বিব্রতকর অনেক গল্প আছে নিশান্তর জীবনে।
৩য় গ্রুপে যাবার মাঝপথ, মাঠ ছাড়িয়ে দূরে চোখে পড়লো ফাঁকা বিলে চিকোন আইলে ঘেরা কাদাপানির এক একটি জমিতে সারিবেঁধে ধান রোপণ করছে নারীরা। বাঁ দিকে বাঁশতলার নিচ দিয়ে ছায়া ছায়া সরু পিচপথ। সায়েমা হাঁটতে হাঁটতে সভানেত্রীর নাম জিজ্ঞাসা করে জানলো সম্মুখে কিছুদূর এগিয়ে কেন্দ্র।
চিতোই বেড়ায় ঘেরা বাড়ির উঠোনে ঢুকলো সায়েমা বাঁশের চটার গেট ঠেলে। লম্বা বারান্দাসমেত এলশেপড মাটির বাড়ি। সিমেন্টের বস্তা বিছিয়ে বারান্দায় পা মেলে বসে মায়ের সাথে খুঁনসুটি করছে একটি কিশোর।
মহিলাটি সায়েমার দিকে তাকিয়ে বসতে বলল, ‘আগের দিন স্যার কয়্যে গেলো, সুমিতির আফা তুমি?’
– হ্যাঁ । সদস্য কেউ আসেনি ?
ওপাশ থেকে আরেকজন-
– ইকিন সদস্য কোয়ানে পাবা ? সগ্গুলির বাড়ি গে নে এসতি হয়, তামাদি হয়্যি গে সব।
রেজিস্টার খুলে দেখলো তেইশজন সদস্য। পাঁচ/ ছয়জন ছাড়া অনিয়মিত সবাই। সদস্যদের ডেকে আনতে বড় বউ বাইরে গেলো।
দু ‘একজন করে সদস্য আসতে শুরু করলে মেজোবউ বসতে বলে তাদের-
– তোতা’বু এস্যু, বস্যু।
আটপরে কাপড় পরা মধ্যবয়সী মহিলা, হাঁটুর নিচের খানিক অংশ ভেজা। শ্যামলা পুরু পায়ের পাতায় কাদা মাখা, দু‘একটি সবুজ ঘাসের মতো লম্বা পাতার ছেঁড়াছুটো টুকরো লেপ্টে আছে। টাকা সহ পাশবই ধরিয়ে দিয়ে বলল-
– ন্যাও আমারডা এট্টু তোড়ে নেকো, পাতা মারতি মারতি উট্যি আইচি।
সদস্য যারা আসেনি সায়েমা রেজিস্টার দেখে এক এক করে নাম জিজ্ঞাসা করতেই বড় বউ বলতে লাগলো তাদের কার বাড়ি কোন্ দিকে, কতদূর-
– মনোয়ারার বাড়ি উই মাঠের মদ্দি, হালিমা মনোহারির মাল বেচে বিকেলে টাকা দে আসে অফিসি, ছবিরাণী মোড়ের মাতায় তরকারি বিক্কির কত্তেচ ; উকিন গে নিতি হয়। এটুকু বলে বড়বউ ঘরে গেল।
তোতা সায়েমার কানের কাছে মুখ নিচু করে বলল-
– অন্তরার টাকা পেয়্যিছাও ?
রেজিস্টারে চোখ রেখে সায়েমা বলল-
– আচ্ছা অন্তরার কোন্ বাড়ি ?
মেজবউ সায়েমাকে ইশারা করে বললো- ‘অন্তরা এ বাড়ির মেয়্যি, আমাগের ননদ, শ্বউর বাড়ি থাকে। বড় বউ কিস্তি চালাবে কুতা দিয়্যি তার কাছতে লোন তুল্যি নেছে।’
বড়বউ ঘর থেকে চেঁচিয়ে বলল-
– ফিরতি পতে এইস্যান। আমি দুবানে অন্তরার টাকা।
সায়েমা রেজিস্টার গুছিয়ে উঠে আরেকটা মোড়ে চাচিকে খুঁজে খুঁজে বের করলো। চাচি চটের বস্তা ভাঁজ করে আসন পেতে বসে তরকারি বিক্রি করছিলো। সায়েমা কিস্তি চাইতে চাচি বস্তার মুখের ভাঁজ উল্টে পলিথিন মোড়ানো পাশবই বের করে সায়েমার দিকে হাত উঁচু করে ধরে বললো-
– আমার বইতি বোলো কোন সমষ্যি নেই। আর পেত্তেক সুপ্তায় ইকিনতে আমার কিস্তির টাকা নুবা। আগের ছারেরাও এরাম করে নিতো। মালামাল থুয়ে বোলো ওটবার কায়দা নেই। কাঁচামালের ব্যাপসা করি্য এই ন’বচ্চর সুমিতি চালাচ্ছি, এট্টা সুপ্তাও খেলাপির রেকর্ড নেই।
সায়েমা হাঁটছে আর ভাবছে চাচির কথা “ন’বচ্চর সুমিতি চালাচ্ছি”। ন’ বছরে ন’বার নেওয়া সমিতির ঋণ কতটুকু পরিবর্তন এনেছে চাচির জীবনে!
সব গ্রুপের কালেকশন শেষে ফেরার পথে সায়েমা বড়বউ এর এখানে পুনরায় এলো অন্তরার কিস্তি নিতে। খাড়া দুপুর, ঘরে ঘরে যে যার মতো খাওয়া বিশ্রামে ব্যাস্ত। বড়বউ সায়েমার হাত ধরে টানতে টানতে অন্তরার ঘরে নিয়ে গেল। ছোট্ট ঘর, একটা চৌকি, মাটির দেওয়ালের চারিপাশ রঙ্গিন কাগজে ফুল কেটে লাগানো, ঠিক চৌকির সোজাসোজি উপরে চালার সাথে ঝাড়বাতির মতো ঝুলনো একটা বড় কাগজের ফুল। ঘরে ঢুকেই মেথির ঘ্রাণ নাকে এলো ; দেওয়ালে চারকোণা করে মাটি কেটে বানানো কুঁদলিতে খোলা মুখের কাঁচের বোতলে নারকেল তেলের সাথে মেথি মেশানো।
মাথার দিকের বালিশ উঁচু করে দু‘খানা কাঁথা বের করে সায়েমাকে দেখানো শুরু করলে সায়েমা বললো-
– আপা অনেক দেরি হয়ে গেছে, এসব অন্যদিন দেখায়েন, এখন কিস্তি দিয়ে বিদেয় করেন।
– সেই জন্যি কচ্ছি। এগুনু অন্তরার খ্যাতা, আমার বেচতি কয়্যেছে।
– তা বেইচেন, কিন্তু এখন তো দেরি করা যাচ্ছে না, কোনভাবে ম্যানেজ করেন।
– চেষ্টা তো কম কল্লাম না আফা, পাল্লামনা।
একটু ঢোক গিলে বড়বউ সায়েমার হাত চেপে ধরলো-
– ও আফা, তুমি নে যাও খ্যাতা দুডো। কিস্তিতে যা লাগে দে দিয়্যানে। একদম নতুন খ্যাতা। তোমার লস হবেন না।
কান্না জড়ানো কন্ঠে এসব বলেই বড়বউ কাঁথা দুটো একটা শপিং ব্যাগে ভাঁজ করে সায়েমার হাতে ধরিয়ে দিল।
সায়েমা হতভম্ভ। কিছুক্ষণ থ হয়ে বস